📘 সবরের পুরস্কার 📄 ধৈর্যের পাহাড় হযরত আইয়ুব (আ.)

📄 ধৈর্যের পাহাড় হযরত আইয়ুব (আ.)


হযরত আইয়ুব (আ.) ছিলেন একজন ধনী ব্যক্তি। আল্লাহ তায়ালা তাকে অগাধ ধন-সম্পদ দিয়েছিলেন। তিনি অনেক ভূমি ও বাগ-বাগিচার মালিক ছিলেন। তার ছিলো অনেক সন্তান-সন্ততি। তিনি ছিলেন সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। এতো ধনী হওয়া সত্ত্বেও তার কোনো গর্ব বা অহংকার ছিল না। তিনি সর্বদা তার এই ধন-সম্পদের জন্য আল্লাহর শোকর আদায় করতেন ও আল্লাহর ওপর কৃতজ্ঞ হয়ে থাকতেন。

কিন্তু, আল্লাহর নিয়ম হলো তিনি মানুষকে দিয়েও পরীক্ষা করেন আবার নিয়েও পরীক্ষা করেন। আর যেসব মানুষ আল্লাহর বেশি প্রিয় তাদের তিনি অনেক বড় পরীক্ষা নেন। হযরত আইয়ুব (আ.) ছিলেন আল্লাহর একজন অতিপ্রিয় দাস ও নবী। তাই আল্লাহ তায়ালা হযরত আইয়ুব (আ.) কে চারটি বড় পরীক্ষার সম্মুখীন করেছিলেন।

১. তার ধন-সম্পদ, জমিজমা নষ্ট করার মাধ্যমে পরীক্ষা করেছিলেন।
২. তার সারা শরীরে কঠিন যন্ত্রণাদায়ক রোগের মাধ্যমে পরীক্ষা করেছিলেন।
৩. তার স্ত্রী ছাড়া সকলে তাকে দূরে রেখে চলে যায়। সে সময় অসহায় বা নিঃস্ব অবস্থায় পরীক্ষা করেছিলেন।
৪. শয়তানের প্ররোচনার মাধ্যমে পরীক্ষা করেছিলেন।

এতো বড় বড় পরীক্ষা সম্মুখীন হওয়ার পরও হযরত আইয়ুব (আ.) ভেঙে পড়েননি। তিনি সবরের পথ অবলম্বন করেন, ধৈর্যধারণ করেছিলেন। প্রতি মুহূর্তে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি সুসময়ে যেমন তার প্রভুর কৃতজ্ঞ বান্দা ছিলেন, দুঃসময়েও ঠিক তেমনি।

আল্লাহ তায়ালা কুরআন মাজীদে চমৎকারভাবে সে কথা উল্লেখ করেছেন এভাবে- وَأَيُّوبَ إِذْ نَادَى رَبَّهُ أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ . فَاسْتَجَبْنَا لَهُ فَكَشَفْنَا مَا بِهِ مِن ضُرِّ وَآتَيْنَاهُ أَهْلَهُ وَمِثْلَهُم مَّعَهُمْ رَحْمَةً مِّنْ عِندِنَا وَذِكْرَى لِلْعَابِدِينَ ، وَإِسْمَاعِيلَ وَإِدْرِيسَ وَذَا الْكِفْلِ كُلٌّ مِّنَ الصَّابِرِينَ .
অর্থাৎ, আর স্মরণ কর আইয়ুবের কথা, যখন সে তার রবকে আহ্বান করে বলেছিল, 'আমি দুঃখ-কষ্টে পতিত হয়েছি। আর আপনি তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু'। তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম। আর তার যত দুঃখ-কষ্ট ছিল, তা দূর করে দিলাম এবং তার পরিবার-পরিজন তাকে দিয়ে দিলাম। আর তাদের সাথে তাদের মতো আরো দিলাম আমার পক্ষ থেকে রহমত এবং ইবাদতকারীদের জন্য উপদেশস্বরূপ। আর স্মরণ কর ইসমাঈল, ইদরীস ও যুল্ কিফল এর কথা, তাদের প্রত্যেকেই ধৈর্যশীল ছিল। (সূরা আম্বিয়া: ৮৩-৮৫)

সূরা ইউসুফে তার ধৈর্যের বিবরণ এসেছে এভাবে-যখন প্রিয়তম পুত্র ইউসুফকে তার ভাইয়েরা অন্ধকার কূপে ফেলে বাড়ি এসে তাদের পিতা ইয়াকুব (আ.) কে বলেছিল হে আমাদের পিতা, আমাদের ভাই ইউসুফকে বাঘে খেয়েছে। তখন এই চরম দুঃখ ও বেদনাদায়ক সংবাদ শুনে তিনি কেবল এতোটুকুই বলেছিলেন-
وَجَاءُوا عَلَى قَمِيصِهِ بِدَمٍ كَذِبٍ ۚ قَالَ بَلْ سَوَّلَتْ لَكُمْ أَنفُسُكُمْ أَمْرًا ۖ فَصَبْرٌ جَمِيلٌ ۖ وَاللَّهُ الْمُسْتَعَانُ عَلَىٰ مَا تَصِفُونَ
অর্থাৎ, আর তারা তার জামায় মিথ্যা রক্ত লাগিয়ে নিয়ে এসেছিল। সে বলল, 'বরং তোমাদের নফস তোমাদের জন্য একটি গল্প সাজিয়েছে। সুতরাং (আমার করণীয় হচ্ছে) সুন্দর ধৈর্য। আর তোমরা যা বর্ণনা করছ সে বিষয়ে আল্লাহই সাহায্যস্থল'। (সূরা ইউসুফ: ১৮)

ছোট ছেলে বিনয়ামিনকে যখন তার ভাইয়েরা চুরির ঘটনায় মিসরে রেখে আসতে বাধ্য করেছিল তখনো তিনি একই ভাষায় বলেছিলেন-
'বরং তোমাদের নফস তোমাদের জন্য একটি গল্প সাজিয়েছে, সুতরাং (আমার করণীয় হচ্ছে) সুন্দর ধৈর্য। আশা করি, আল্লাহ তাদের সকলকে আমার কাছে ফিরিয়ে আনবেন, নিশ্চয় তিনি সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়'। (সূরা ইউসুফ: ৮২)

অন্য আয়াতে ইয়াকুব (আ.) এর ধৈর্যের বর্ণনা ফুটে উঠেছে এভাবে-
قَالَ إِنَّمَا أَشْكُو بَنِّي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ وَأَعْلَمُ مِنَ اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ ۚ يَا بَنِيَّ اذْهَبُوا فَتَحَسَّسُوا مِن يُوسُفَ وَأَخِيهِ وَلَا تَيْأَسُوا مِن رَّوْحِ اللَّهِ ۖ إِنَّهُ لَا يَيْأَسُ مِن رَّوْحِ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْكَافِرُونَ
অর্থাৎ, সে বলল, 'আমি আল্লাহর কাছেই আমার দুঃখ বেদনার অভিযোগ জানাচ্ছি। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে আমি যা জানি, তোমরা তা জান না'। 'হে আমার ছেলেরা, তোমরা যাও এবং ইউসুফ ও তার ভাইয়ের খোঁজখবর নাও। আর তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো পলকাফির সম্প্রদায় ছাড়া কেউই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয় না'। (সূরা ইউসুফ: ৮৬-৮৭)

অবশেষে ইয়াকুব (আ.)-এর দুষ্ট প্রকৃতির দশ ছেলে যখন মিসর শাসকের পরিচয় পেলো। তখন তারা দেখলো এতো তাদেরই সেই ভাই ইউসুফ যাকে তারা অন্ধকার কূপে ফেলে দিয়েছিল। ইউসুফ (আ.) তাদের ক্ষমা করে দিলেন। এবং আল্লাহর হুকুমে ইয়াকুব (আ.) তার দৃষ্টিশক্তি ফিরে ফেলেন。

কুরআন মাজীদে এ ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে এভাবে- وَلَمَّا فَصَلَتِ الْعِيرُ قَالَ أَبُوهُمْ إِنِّي لَأَجِدُ رِيحَ يُوسُفَ لَوْلَا أَن تُفَنِّدُونِ .
অর্থাৎ, আর যখন কাফেলা বের হলো, তাদের পিতা বলল, 'নিশ্চয় আমি ইউসুফের ঘ্রাণ পাচ্ছি, যদি তোমরা আমাকে নির্বোধবৃদ্ধ মনে না কর'। (সূরা ইউসুফ: ৯৪)

فَلَمَّا أَن جَاءَ الْبَشِيرُ أَلْقَاهُ عَلَى وَجْهِهِ فَارْتَدَّ بَصِيرًا قَالَ أَلَمْ أَقُل لَّكُمْ إِنِّي أَعْلَمُ مِنَ اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ .
অর্থাৎ, অতঃপর যখন সুসংবাদদাতা এলো, তখন সে জামাটি তার চেহারায় ফেলল। এতে সে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেল। বলল, 'আমি কি তোমাদেরকে বলিনি, নিশ্চয় আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে যা জানি তোমরা তা জানো না'। (সূরা ইউসুফ: ৯৫)

এভাবে আল্লাহ তায়ালা হযরত ইয়াকুব (আ.) কে পরীক্ষা করেছেন। এবং তিনি ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। তাই তো কুরআনে তাকে ধৈর্যশীল হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

📘 সবরের পুরস্কার 📄 ধৈর্যের অনুপম দৃষ্টান্ত হযরত ইউসুফ (আ.)

📄 ধৈর্যের অনুপম দৃষ্টান্ত হযরত ইউসুফ (আ.)


সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপর ভরসা করা ও ধৈর্যধারণ করাই হচ্ছে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের বৈশিষ্ট্য। যার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হযরত ইউসুফ (আ.)। জীবনের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে তিনি সম্মুখীন হয়েছেন বিপদ-মুসিবত এবং হয়েছেন ষড়যন্ত্রের শিকার। কিন্তু কখনোই তিনি আল্লাহর ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলেননি। বরং তিনি ধৈর্যের মাধ্যমে যেমনিভাবে তার পবিত্র চরিত্রে কলঙ্ক থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন তেমনিভাবে বিপদ-মুসিবত থেকেও তিনি রক্ষা পেয়েছিলেন।

শৈশবে চুরির অপবাদ
হযরত ইউসুফ (আ.) ছিলেন মহাসম্মানিত নবী। ইব্রাহিম (আ.) এর প্রপুত্র সম্মানিত নবী ইসহাকের পৌত্র। আর সম্মানিত নবী ইয়াকুবের পুত্র। ইয়াকুব (আ.) এর দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন ইউসুফ (আ.) ও বিনইয়ামিন। শেষোক্ত সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর পরই তার মা মৃত্যুবরণ করেন। শৈশবেই তিনি মা হারিয়ে অসহায় অবস্থায় পড়েন এবং তার ভাইদের ষড়যন্ত্র শুরু হয় শৈশবে তার ওপর মিথ্যা অপবাদ আরোপের মাধ্যমে। এ সম্পর্কে কুরআন বলছে-
قَالُوا إِن يَسْرِقْ فَقَدْ سَرَقَ أَخٌ لَّهُ مِن قَبْلُ فَأَسَرَّهَا يُوسُفُ فِي نَفْسِهِ وَلَمْ يُبْدِهَا لَهُمْ قَالَ أَنتُمْ شَرٌّ مَّكَانًا وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا تَصِفُونَ .
অর্থাৎ, তারা বলল, 'যদি সে চুরি করে থাকে, তবে ইতঃপূর্বে তার এক ভাই চুরি করেছিল'। ইউসুফ বিষয়টি নিজের কাছে গোপন রাখল, তাদের কাছে প্রকাশ করল না, সে (মনে মনে) বলল, 'তোমাদের অবস্থান তো নিকৃষ্টতর, তোমরা যা বলছ, সে সম্পর্কে আল্লাহ ভালোভাবেই অবগত'। (সূরা ইউসুফ: ৭৭)

ভাইদের হিংসার শিকার ও অন্ধকূপে নিক্ষিপ্ত
স্বভাবগত রীতিতে বিমাতা ভাইয়েরা সাধারণত পরস্পর বিদ্বেষী হয়ে থাকে। ইউসুফ (আ.)-এর ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি। ইউসুফ (আ.)-এর ভাইয়েরা তার প্রতি হিংসা শুরু করেছিল, তাদের হিংসার মূল উদ্দেশ্য ছিল- ১. বৈমাত্রেয় বিদ্বেষ ২. পিতার স্বভাবগত স্নেহের আধিক্য ৩. ইউসুফ (আ.) এর রূপ-লাবণ্য, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, আকর্ষণীয় ব্যবহার মাধুর্যের প্রতি হিংসা ৪. স্বপ্ন-বৃত্তান্তের কথা শুনে তার প্রতি হিংসা।
ইউসুফ (আ.) এর গুণ তাদের সহ্য হয়নি। তাই তারা হত্যার সিদ্ধান্ত নিতেও দ্বিধা করলো না। যেমন কুরআন মাজীদে এসেছে-
إِذْ قَالُوا لَيُوسُفُ وَأَخُوهُ أَحَبُّ إِلَى أَبِينَا مِنَّا وَنَحْنُ عُصْبَةٌ إِنْ أَبَانَا لَفِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ • اقْتُلُوا يُوسُفَ أَوِ اطْرَحُوهُ أَرْضًا يَخْلُ لَكُمْ وَجْهُ أَبِيكُمْ وَتَكُونُوا مِن بَعْدِهِ قَوْمًا صَالِحِينَ .
অর্থাৎ, যখন তারা বলেছিল, 'নিশ্চয় ইউসুফ ও তার ভাই আমাদের পিতার নিকট আমাদের চেয়ে অধিক প্রিয়, অথচ আমরা একই দল। নিশ্চয় আমাদের পিতা সুস্পষ্ট বিভ্রান্তিতেই আছে, 'তোমরা ইউসুফকে হত্যা কর অথবা তাকে কোনো যমীনে ফেলে আস, তাহলে তোমাদের পিতার আনুকূল্য কেবল তোমাদের জন্য থাকবে এবং তোমরা সৎ লোক হয়ে যাবে'। (সূরা ইউসুফ: ৭-৯)

যৌবনের মহাপরীক্ষায় ইউসুফ (আ.)
কূপ থেকে উদ্ধারের পর হযরত ইউসুফ (আ.) মিসরের এক মন্ত্রীর পরিবারে রাজপুত্রের সমাদরে বড় হতে থাকেন। এখানেই তিনি পূর্ণ যৌবন প্রাপ্ত হলেন। তখন আল্লাহ তায়ালা তাকে নবুয়্যত দান করেন। তখনকার মিসরের লোকদের নৈতিক চরিত্র ছিলো খুবই খারাপ। তাদের নারী-পুরুষ সবাই নির্লিপ্তের মতো পাপ করে বেড়াতো। কেউ পাপ করলে অন্যরা সেটাকে খারাপ বলে মনে করতো না। ইউসুফ (আ.) যেমন ছিলেন জ্ঞানী ও বিচক্ষণ ঠিক তেমনি ছিলেন অত্যন্ত সুন্দর ও বলিষ্ঠ যুবক। সেই মন্ত্রীর স্ত্রী ও অন্যান্য শহুরে মহিলারা ইউসুফকে চারিদিক থেকে পাপ কাজে লিপ্ত করার জন্য ফুসলাতে থাকে। মন্ত্রীর স্ত্রী জুলেখা এক পক্ষীয়ভাবে ইউসুফের সাথে পাপ কাজে লিপ্ত হওয়ার জন্য পাগল হয়ে ওঠে। কুরআন এ ঘটনা সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছে এভাবে-

আর সে যখন পূর্ণ যৌবনে উপনীত হলো, আমি তাকে হিকমত ও জ্ঞান দান করলাম এবং এভাবেই আমি ইহসানকারীদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। আর যে মহিলার ঘরে সে ছিল, সে তাকে কুপ্ররোচনা দিল এবং দরজাগুলো বন্ধ করে দিল আর বলল, ‘এসো’। সে বলল, আল্লাহর আশ্রয় (চাই)। নিশ্চয় তিনি আমার মনিব, তিনি আমার থাকার সুন্দর ব্যবস্থা করেছেন। নিশ্চয় যালিমগণ সফল হয় না। আর সে মহিলা তার প্রতি আসক্ত হলো, আর সেও তার প্রতি আসক্ত হতো, যদি না তার রবের স্পষ্ট প্রমাণ প্রত্যক্ষ করত। এভাবেই, যাতে আমি তার থেকে অনিষ্ট ও অশ্লীলতা দূর করে দিই। নিশ্চয় সে আমার খালেস বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত। (সূরা ইউসুফ: ২২-২৪)

আর ইউসুফ (আ.) আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করলেন ও ধৈর্যের পথ অবলম্বন করলেন। আর আল্লাহ তায়ালা তাকে সে অবস্থা থেকে রক্ষা করলেন।

কারাগারের জীবন
ইউসুফ (আ.) দেখলেন এই মহিলাদের চক্রান্ত থেকে উদ্ধার পাওয়ার কোনো উপায় নেই। তখন তিনি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইলেন এই বলে-
قَالَ رَبِّ السِّجْنُ أَحَبُّ إِلَيَّ مِمَّا يَدْعُونَنِي إِلَيْهِ وَإِلَّا تَصْرِفْ عَنِّي كَيْدَهُنَّ أَصْبُ إِلَيْهِنَّ وَأَكُن مِّنَ الْجَاهِلِينَ .
অর্থাৎ, সে (ইউসুফ) বলল, 'হে আমার রব, তারা আমাকে যে কাজের প্রতি আহ্বান করছে, তা থেকে কারাগারই আমার নিকট অধিক প্রিয়। আর যদি আপনি আমার থেকে তাদের চক্রান্ত প্রতিহত না করেন, তবে আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ব এবং আমি মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত হব'। (সূরা ইউসুফ: ৩৩)

আর আল্লাহ তায়ালা তার দোয়া কবুল করলেন। ইউসুফ (আ.) কে কারাগারে প্রেরণ করা হলো।
বালাখানা থেকে জেলখানায় নিক্ষিপ্ত হওয়ার পর এক করুণ অভিজ্ঞতা শুরু হলো ইউসুফের জীবনে। মনোকষ্ট, দৈহিককষ্ট সাথে সাথে স্নেহান্ধ ফুফু ও সন্তানহারা পাগলপারা বৃদ্ধ পিতাকে কেনানে ফেলে আসার মানসিক কষ্ট সব মিলিয়ে ইউসুফের জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিসহ। কেনানে ভাইয়েরা শত্রু, মিসরে জুলেখা শত্রু। নিরাপদ আশ্রয় কোথাও নেই। তারপরও তিনি আল্লাহর ওপর থেকে আস্থা হারালেন না। বরং তিনি পূর্ণ ধৈর্যধারণ করেছিলেন এবং জেলখানাতেই আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত প্রচার করতে লাগলেন। যেমনিভাবে কুরআনে এসেছে-
يَا صَاحِبَي السِّجْنِ أَأَرْبَابٌ مُّتَفَرِّقُونَ خَيْرٌ أَمِ اللَّهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ .
অর্থাৎ, 'হে আমার কারা সঙ্গীদ্বয়, বহু সংখ্যক ভিন্ন ভিন্ন রব ভালো নাকি মহাপরাক্রমশালী এক আল্লাহ?' (সূরা ইউসুফ: ৩৯)

অবশেষে আল্লাহ তায়ালা তার ধৈর্যের ফলে তাকে মিসরের শাসক হিসেবে নির্বাচিত করলেন এবং তার প্রাণপ্রিয় পিতার সাথে সাক্ষাতের সুযোগ করে দিয়েছেন। এতকিছুর পরও তিনি তার বৈমাত্রেয় ভাইদের সাথে খারাপ আচরণ করলেন না, বরং তাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন। যেমন কুরআনে এসেছে-
তারা বলল, 'তুমি কি সত্যিই ইউসুফ'? সে বলল, আমি ইউসুফ। আর এ আমার সহোদর। আল্লাহ আমাদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন। নিশ্চয় যে ব্যক্তি তাকওয়া অবলম্বন করে এবং সবর করে, তবে অবশ্যই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না'। তারা বলল, 'আল্লাহর কসম, আল্লাহ আমাদের ওপর তোমাকে প্রাধান্য দিয়েছেন, আর আমরাই ছিলাম অপরাধী'। সে বলল, 'আজ তোমাদের ওপর কোনো ভর্ৎসনা নেই, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। আর তিনি সবচেয়ে বেশি দয়ালু'। (সূরা ইউসুফ: ৯০-৯২)

এভাবে আল্লাহ তায়ালা ইউসুফকে তার ধৈর্যধারণের ফলে তাকে মর্যাদায় ভূষিত করলেন এবং তাকে প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতার মাধ্যমে প্রশংসিত করেছিলেন।

📘 সবরের পুরস্কার 📄 কুরবানির পরীক্ষায় হযরত ইসমাইল (আ.) ধৈর্যধারণ

📄 কুরবানির পরীক্ষায় হযরত ইসমাইল (আ.) ধৈর্যধারণ


সবরের দিক থেকে হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর সবর ছিল সবচেয়ে উচ্চ মর্যাদাপূর্ণ সবর। কেননা এ সবর ছিল আসসবরু ফি তাআ'তি আল্লাহি বা আল্লাহর আনুগত্য ও নির্দেশ পালনের জন্য সবর। যার দৃষ্টান্ত হচ্ছে এ রকম-
فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يَا بُنَيَّ إِنِّي أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانظُرْ مَاذَا تَرَى قَالَ يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِن شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّابِرِينَ •
অর্থাৎ, অতঃপর যখন সে তার সাথে চলাফেরা করার বয়সে পৌঁছল, তখন সে বলল, 'হে প্রিয় বৎস, আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে যবেহ করছি, অতএব দেখ তোমার কী অভিমত'; সে বলল, 'হে আমার পিতা, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, আপনি তাই করুন। আমাকে আপনি অবশ্যই ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন'। (সূরা আস-সফফাত: ১০২)

ইব্রাহিম (আ.) একদিন স্বপ্ন দেখলেন তিনি তার প্রাণপ্রিয় পুত্রের গলায় ছুরি চালাচ্ছেন। নবীদের স্বপ্ন একপ্রকার অহি বা আল্লাহর আদেশ। আল্লাহর হুকুম শিরধার্য। কিন্তু ইসমাঈল (আ.) কি এ হুকুম মেনে নিবে? আসলে আল্লাহ তো সে পরীক্ষাই নিতে চান। আল্লাহ তো দেখতে চান ইসমাঈল (আ.) আল্লাহর হুকুমের সামনে মাথা নত করে কি না? নিজের জীবনের চাইতেও আল্লাহর হুকুম পালন করাকে বড় কর্তব্য মনে করে কি না? আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সে নিজের জীবনকে কুরবানি করতে প্রস্তুত আছে কি না? কিন্তু ইসমাঈল তো তার পিতার মতোই আল্লাহর অনুগত। আল্লাহর সন্তুষ্টির চাইতে বড় কোনো কাম্য তার নেই। কুরআন সে ঘটনার কথা এভাবে বর্ণনা করছে-

"অতঃপর তারা উভয়ে যখন আত্মসমর্পণ করল এবং সে তাকে কাত করে শুইয়ে দিল তখন আমি তাকে আহ্বান করে বললাম, 'হে ইবরাহীম, 'তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছ। নিশ্চয় আমি এভাবেই সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত করে থাকি'। 'নিশ্চয় এটা সুস্পষ্ট পরীক্ষা'। আর আমি এক মহান যবেহের বিনিময়ে তাকে মুক্ত করলাম।" (সূরা আস-সফফাত: ১০৩-১০৭)

তখন পিতা-পুত্র দু'জনই আল্লাহর হুকুমের সামনে মাথা নত করে দিলেন এবং ইব্রাহিম (আ.) পুত্রকে উপুড় করে শুইয়ে দিয়ে ছুরি চালাতে উদ্যত হলেন তখন আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাকে বললেন, ইসমাঈলের স্থলে একটি দুম্বা রেখে দিতে। তখন ইব্রাহিম (আ.) সেই দুম্বাকে জবেহ করলেন। যেমন কুরআনে এসেছে-
وَإِسْمَاعِيلَ وَإِدْرِيسَ وَذَا الْكِفْلِ كُلٌّ مِّنَ الصَّابِرِينَ . وَأَدْخَلْنَاهُمْ فِي رَحْمَتِنَا إِنَّهُم مِّنَ الصَّالِحِينَ .
অর্থাৎ, আর স্মরণ কর ইসমাঈল, ইদরীস ও যুল্-কিফল এর কথা, তাদের প্রত্যেকেই ধৈর্যশীল ছিল। আর তাদেরকে আমি আমার রহমতে শামিল করেছিলাম। তারা ছিল সৎকর্মপরায়ণ। (সূরা আম্বিয়া: ৭৫-৭৬)

আল্লাহ তায়ালা পিতা-পুত্র দুইজনকেই কবুল করে নিলেন এবং ধৈর্যশীল হিসেবে আখ্যায়িত করলেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px