📄 আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদাতের ওপর সবর
আল্লাহর আনুগত্যের ওপর সবর হচ্ছে আল্লাহ তায়ালাকে এক ও অদ্বিতীয় হিসেবে মেনে নেয়া, শিরক থেকে বেঁচে থাকা, কবিরা গুণাহ থেকে নিজেকে রক্ষা করা। এ কাজগুলো করার ক্ষেত্রে যদি বিপদ আসে তার মোকাবেলায় ধৈর্যধারণ করা। যেমন কুরআনে এসেছে-
إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ . অর্থাৎ, নিশ্চয় যে আল্লাহর সাথে শরিক করে, তার ওপর অবশ্যই আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন এবং তার ঠিকানা আগুন। (সূরা মায়েদা: ৭২)
আবার কারো মতে, আল্লাহর আনুগত্যের ওপর সবর হচ্ছে নিজের অন্তরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া ও তাকওয়ার পথ অবলম্বন করা। ইবনে কিয়াম বলেন- ততক্ষণ পর্যন্ত তাকওয়া অর্জন হয় না যতক্ষণ না সবরের ওপর অটল থাকা হয়। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন-
إِنَّهُ مَنْ يَتَّقِ وَيَصْبِرْ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ . অর্থাৎ, নিশ্চয় যে ব্যক্তি তাকওয়া অবলম্বন করে এবং সবর করে, তবে অবশ্যই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না। (সূরা ইউসুফ: ৯০)
ফরজ ইবাদতসমূহের ওপর সবর হচ্ছে নির্দিষ্ট সময়ে তা আদায় করা বিশেষ করে ফরয নামাজের ক্ষেত্রে। ঘুমের আনন্দ, সুখময় স্বপ্ন ও অলসতা পরিহার করে নির্দিষ্ট সময়ে নামায আদায় করা। যেমন রাসূল (সা.) বলেছেন- হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, আমি রাসূল (সা.) কে প্রশ্ন করলাম সর্বোত্তম আমল কোনটি? তিনি বললেন সময়মতো নামায আদায় করা। আমি জিজ্ঞেস করলাম তারপর কোনটি? তিনি বললেন, পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা। আমি জিজ্ঞেস করলাম তারপর কোনটি? তিনি বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদ করা। পাছে তিনি বিরক্ত হন এ ভেবে আমি অতিরিক্ত প্রশ্ন করা থেকে বিরত রইলাম। (সহীহ মুসলিম: ১৫৪) এদিকসমূহ বিবেচনা করে ফরয ইবাদত পালনের ক্ষেত্রে সবরকে তিনটি অবস্থায় ভাগ করা যায়:
১. ইবাদতের পূর্বে: ইবাদতের পূর্বে সবর হচ্ছে নিয়তকে বিশুদ্ধ করা, একনিষ্ঠ চিত্তে আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করা, দোষ-ত্রুটি ও আত্ম-প্রদর্শন থেকে বেঁচে থাকা।
২. ইবাদতের মধ্যে: ইবাদতের মধ্যে সবর হচ্ছে ইবাদত পালনের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার গাফলতি না করা এবং সুন্নত ও আদব রক্ষার ক্ষেত্রে কোনো প্রকার অলসতা না করা। সঠিক ও পরিশুদ্ধ ভাবে ইবাদত পালনের চেষ্টা করা।
৩. ইবাদতের পরে: ইবাদত পরবর্তী সবর হচ্ছে প্রদর্শনেচ্ছা থেকে নিজের অন্তরকে হিফাযত করা। অহংকার থেকে নিজেকে বিরত রাখা। খ্যাতি, সুনাম, রিয়া বা লোক দেখানো ইবাদত থেকে নিজেকে বিরত রাখা।১৩
কুরআনে আল্লাহ তায়ালা দিনের দু-প্রান্তে ও রাতের কিছু অংশ অতিবাহিত করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন ইরশাদ হচ্ছে-
وَأَقِمِ الصَّلَاةَ طَرَفِي النَّهَارِ وَزُلَفًا مِّنَ اللَّيْلِ إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ ذَلِكَ ذِكْرَى لِلذَّاكِرِينَ * وَاصْبِرْ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ .
অর্থাৎ, আর তুমি সালাত কায়েম কর দিবসের দু'প্রান্তে এবং রাতের প্রথম অংশে। নিশ্চয়ই ভালোকাজ মন্দকাজকে মিটিয়ে দেয়। এটি উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য উপদেশ। তুমি সবর কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা ইহসানকারীদের প্রতিদান নষ্ট করেন না। (সূরা হুদ: ১১৪-১১৫) রোযা পালনের জন্য আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিচ্ছেন-
ثُمَّ أَتِمُّوا الصِّيَامَ إِلَى اللَّيْلِ .
অর্থাৎ, অতঃপর রাত পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ কর। (সূরা বাক্বারা: ১৮৭) হজ্জ পালনের জন্য আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিচ্ছেন-
الْحَجُّ أَشْهُرٌ مَّعْلُومَاتٌ فَمَن فَرَضَ فِيهِنَّ الْحَجَّ فَلَا رَفَتَ وَلَا فُسُوقَ وَلَا جدَالَ فِي الْحَجِّ .
অর্থাৎ, হজের সময় নির্দিষ্ট মাসসমূহ। অতএব এই মাসসমূহে যে নিজের ওপর হজ্জ আরোপ করে নিল, তার জন্য হজে অশ্লীল ও পাপকাজ এবং ঝগড়া-বিবাদ বৈধ নয়। (সূরা বাক্বারা : ১৯৭) সর্বোপরি আল্লাহর নির্দেশিত ও রাসূল (সা.) এর অনুসৃত পদ্ধতিতে ধৈর্যসহকারে ইবাদত পালনের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জন করাই হচ্ছে মূলত আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদতের ওপর সবর।
টিকাঃ
১৩. মুনজিদ, মুহাম্মাদ সালেহ, আসবর, পৃঃ ১৬-১৯।
📄 বিপদাপদে সবর
রোগ-ব্যাধি, দুঃখ-কষ্ট, বিপদ-মুসিবত ইত্যাদি মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। দুনিয়াতে এমন কোনো মানুষ নেই যাদের ওপর এগুলো পতিত হয়নি। আর মানুষকে আল্লাহ তায়ালা প্রকৃতিগত ভাবেই দুর্বল করে সৃষ্টি করেছেন। বিপদ- মুসিবতে পড়লেই সে ঘাবড়ে যায়। যেমন কুরআনে বলা হচ্ছে-
خُلِقَ الْإِنسَانُ مِنْ عَجَل .
অর্থাৎ, মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে তাড়াহুড়ার প্রবণতা দিয়ে। (সূরা আম্বিয়া: ৩৭)
إِنَّ الْإِنسَانَ خُلِقَ هَلُوعًا • إِذَا مَسَّهُ الشَّرُّ جَزُوعًا .
অর্থাৎ, নিশ্চয় মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে অস্থির করে। যখন তাকে বিপদ স্পর্শ করে তখন সে হয়ে পড়ে অতিমাত্রায় উৎকণ্ঠিত। (সূরা মাআরিজ: ১৯-২০)
আর যখনই মানুষ বিপদে পড়বে তা থেকে উত্তরণের জন্য আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সবর বা ধৈর্যধারণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করা, দুঃখ-কষ্টে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করাই এ প্রকার সবরের দাবি。
যেমন রাসূল (সা.) বলেছেন-
انما الصبر هذا أول صدمة أو عند أول الصدمة .
বিপদের প্রথম অবস্থায় ধৈর্যধারণ করাই হচ্ছে, প্রকৃত ধৈর্যধারণ। এই প্রসঙ্গে লোকমান (আ.) তার পুত্রকে চমৎকারভাবে উপদেশ দিয়েছেন যা কুরআন এভাবে বর্ণনা করছে-
يَا بُنَيَّ أَقِمِ الصَّلَاةَ وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنكَرِ وَاصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَكَ إِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ .
অর্থাৎ, 'হে আমার প্রিয় বৎস, সালাত কায়েম কর, সৎকাজের আদেশ দাও, অসৎকাজে নিষেধ কর এবং তোমার ওপর যে বিপদ আসে তাতে ধৈর্য ধর। নিশ্চয় এগুলো অন্যতম দৃঢ় সংকল্পের কাজ'। (সূরা লুকমান: ১৭)