📘 সবর ও শোকর > 📄 ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা

📄 ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা


যারা আল্লাহকে ভালোবাসে, ধৈর্য তাদের অন্যতম সেরা একটি গুণ। ধৈর্যের স্তর নির্ধারণ করে দেয়, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার দাবিতে কে একনিষ্ঠ আর কে নয়। দুর্দশা ও সংকটকালে ভালোবাসার একনিষ্ঠতা প্রমাণের জন্য উঁচু স্তরের ধৈর্যের প্রয়োজন হয়।

অনেকের দাবি তারা আল্লাহকে ভালোবাসেন; কিন্তু আল্লাহ যখন দুঃখ-কষ্ট দিয়ে তাদের পরীক্ষা নেন, তখন তারা ভালোবাসার মর্মের কথা ভুলে যান। ধৈর্যশীল আর অধ্যবসায়ীরাই কেবল আল্লাহর ভালোবাসায় লেগে থাকতে পারে। যদি ভালোবাসার, এবং একনিষ্ঠতার পরীক্ষা না থাকত তবে আল্লাহর প্রতি কারও ভালোবাসার একনিষ্ঠতা প্রমাণিত হতো না। যে আল্লাহকে যত বেশি ভালোবাসে, তার ধৈর্য তত বেশি উঁচু স্তরের।

এই কারণে আল্লাহ ধৈর্যশীলদেরকে তাঁর বন্ধু এবং প্রিয়জন বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি তাঁর প্রিয় বান্দা আইয়ূব সম্পর্কে বলেন:

... إِنَّا وَجَدْنَاهُ صَابِرًا نِعْمَ الْعَبْدُ إِنَّهُ أَوَّابٌ )

"...আমি তাকে পেয়েছিলাম পূর্ণ ধৈর্যশীল, কতই-না উত্তম বান্দা, প্রকৃতই (আল্লাহ) অভিমুখী।"[১৩২]

আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের তাঁর কাদরের ফায়সালা গ্রহণে ধৈর্যের নির্দেশ দিয়েছেন। এবং তাদের জানিয়ে দিয়েছেন, ধৈর্য একমাত্র আল্লাহর সাহায্যে আসে। তিনি ধৈর্যশীলদের প্রশংসা করেছেন এবং তাদের উত্তম প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর সকলের প্রতিদান নির্ধারিত এবং সীমিত, কিন্তু ধৈর্যশীলদের প্রতিদান অফুরন্ত। ঈমান, ইহসান ইসলামের সকল স্তরে ধৈর্যের গুণ অপরিহার্য। সেই সাথে এটি ঈমান ও তাওয়াক্কুলের মৌলিক উপাদান।

১. আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ধৈর্য: আল্লাহর প্রতিদানের আশা রাখা এবং তাঁর শাস্তিকে ভয় করা।

২. আল্লাহর সাহায্যে ধৈর্য: যেমন আপনি অনুভব করলেন আপনার কোনো ধৈর্য নেই এবং ধৈর্যধারণের ক্ষমতাও নেই। তবে আপনি জানেন, "আল্লাহ (এর সাহায্য ছাড়া) ছাড়া কোনো ক্ষমতা ও শক্তি নেই।"

৩. আল্লাহর নির্ধারিত ভাগ্যে ধৈর্য: যেমন আপনি অনুধাবন করলেন মহাবিশ্বে যা-কিছু আছে তার একমাত্র নিয়ন্ত্রক ও ব্যবস্থাপক আল্লাহ। সুতরাং আপনি ধৈর্যের সাথে তাঁর ভাগ্যের ফায়সালা মেনে নিলেন, আপনার অবস্থা ভালো বা মন্দ যা-ই হোক না কেন।

আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ধৈর্যধারণ আল্লাহর সাহায্যে ধৈর্যধারণের চেয়ে উঁচু স্তরের। যেখানে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ধৈর্য ধরার ব্যাপারটি আল্লাহর 'উলুহিয়াতের' বা ইলাহ হওয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট, সেখানে আল্লাহর সাহায্যে ধৈর্য ধরাটা আল্লাহর 'রবের' ধারণার সাথে সম্পর্কিত। আল্লাহর ইলাহ হওয়ার সাথে যা-কিছুই যুক্ত (যেমন তাঁর উদ্দেশ্যে ধৈর্যধারণ), তা হচ্ছে ইবাদাত। এটা তাঁর 'রব হওয়ার' সাথে যুক্ত সবকিছুর চেয়ে বৃহত্তর, যেমন ধৈর্যের উদ্দেশ্যে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করার বিষয়টি। ইবাদাত হচ্ছে চূড়ান্ত লক্ষ্য, সেখানে সাহায্য চাওয়া হচ্ছে তা সম্পন্ন করার একটা উপায়মাত্র। "লক্ষ্য নিজেই একটি প্রত্যাশিত বিষয়, কিন্তু 'উপায়' অন্য কিছুর অনুসন্ধান করে।" আল্লাহর সাহায্যে যে ধৈর্য, তা বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী, ভালো ও খারাপ সবার ক্ষেত্রেই সমান। কিন্তু আল্লার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যে ধৈর্য, তা কেবল নবি-রাসূল ও বিশ্বাসীদের অবলম্বন। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ধৈর্য কেবল তাঁর পছন্দের বিষয়ে সীমিত, পক্ষান্তরে আল্লাহর সাহায্যে ধৈর্য আল্লাহর পছন্দ ও অপছন্দ দুটোর ক্ষেত্রেই হতে পারে।

টিকাঃ
১৩২. সূরা সাদ, ৩৮:৪৪

📘 সবর ও শোকর > 📄 ধৈর্যের বিভিন্ন স্তর

📄 ধৈর্যের বিভিন্ন স্তর


১. আল্লাহর উদ্দেশ্যে এবং আল্লাহর সাহায্যে—উভয় প্রকৃতির ধৈর্য : আল্লাহর সাহায্যে এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে ধৈর্যধারণের মানে আপনার এই উপলব্ধি থাকা যে, আপনার নিজের কোনো ক্ষমতাই নেই। এটা ধৈর্যের সর্বোচ্চ স্তর।

২. আল্লাহর সাহায্য ব্যতিরেকে তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ধৈর্য : যেমন কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ধৈর্য ধারণ করলো, কিন্তু সক্রিয়ভাবে তাঁর সাহায্য চাইল না, তার বিশ্বাস ও আস্থাও দুর্বল। এদের পরিণাম ভালো, কিন্তু এরা দুর্বল এবং এরা প্রত্যাশা অনুপাতে ফলাফল অর্জন করতে পারে না। এটা একজন একনিষ্ঠ অথচ দুর্বলতম বিশ্বাসীর অবস্থা।

৩. আল্লাহর সাহায্যে ধৈর্য : যেমন কেউ আল্লাহর সাহায্য চাইল, আল্লাহর ওপর আস্থা রাখল, মেনে নিল নিজের কোনো ক্ষমতা ও সামর্থ্য নেই, কিন্তু তার ধৈর্য আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নয়, আর এই ধৈর্য তার বিশ্বাসের ফলস্বরূপও নয়। এতে লক্ষ্য হয়তো পূরণ হবে কিন্তু তার শেষটা হবে অত্যন্ত মন্দ দিয়ে। এ ধরনের ব্যক্তিদের দৃষ্টান্ত হলো কাফিরদের নেতা এবং শয়তানের অনুসারীদের মতো। এদের ধৈর্য আল্লাহর অভিমুখী হলেও আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিবেদিত নয়।

৪. কোনো রকমের ধৈর্য না থাকা : এটা হলো সর্বনিম্ন স্তরের, এসব লোকদের কপালে আছে সবরকমের ব্যর্থতা।

যাদের ধৈর্য কেবল আল্লাহর উদ্দেশ্যে ও তাঁর অভিমুখী; এরাই তারা, যারা দৃঢ়নিষ্ঠ অর্জনও করে অধিক। যার আল্লাহর অভিমুখী ধৈর্য আছে কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ধৈর্য ধরে না—সে যদিও সক্ষম, কিন্তু অসৎ। আর যার মধ্যে কোনোটাই নেই, সে তো চরম ব্যর্থতায় নিমজ্জিত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00