📄 ধৈর্য ঈমানের অর্ধেক
ঈমানের অর্ধেক ধৈর্য এবং বাকি অর্ধেক কৃতজ্ঞতা। এই কারণে আল্লাহ তাআলা ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা পাশাপাশি বর্ণনা করেছেন:
إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِكُلِّ صَبَّارٍ شَكُورٍ
"... নিশ্চয় এতে প্রত্যেক ধৈর্যশীল কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য রয়েছে অসংখ্য নিদর্শন।"[১২৬]
ধৈর্য ঈমানের অর্ধেক এবং কৃতজ্ঞতা বাকি অর্ধেক হওয়ার তাৎপর্য কী, সে বিষয়ে নিচে আলোচনা করা হলো:
১. কথা, কাজ এবং ইচ্ছের সম্মিলিত রূপকে ঈমান বলা হয়। এর ভিত্তি দুটো বিষয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত—কর্মসম্পাদন করা বা কর্মসম্পাদন থেকে বিরত থাকা। কর্মসম্পাদন বলতে বোঝায় আল্লাহর নির্দেশসমূহ মেনে চলা, যা কৃতজ্ঞতার বাস্তব প্রকাশ। কর্মসম্পাদন থেকে বিরত থাকার মানে আল্লাহ যেসব কাজ নিষেধ করেছেন সেসব কাজ না করা, এ জন্য ধৈর্যের প্রয়োজন। সমগ্র ধর্মের ভিত্তিই এই দুটি বিষয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত—আল্লাহ যা আদেশ করেছেন তা মেনে চলা, এবং যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা।
২. ঈমানের স্তম্ভ দুইটি—বিশ্বাস ও ধৈর্য, যা নিচের আয়াটিতে বর্ণিত হয়েছে:
وَجَعَلْنَا مِنْهُمْ أَبِيَّةٌ يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا لَمَّا صَبَرُوا وَكَانُوا بِآيَاتِنَا يُوقِنُونَ
"আর আমি তাদের মধ্য হতে নেতা মনোনীত করেছিলাম, যারা আমার নির্দেশ মুতাবেক সৎপথ প্রদর্শন করত, যতদিন তারা ধৈর্য অবলম্বন করেছিল আর আমার আয়াতসমূহের ওপর দৃঢ় বিশ্বাসী ছিল।"[১২৭]
বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে আমরা আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ সম্পর্কে বা পুরস্কার ও শাস্তি সম্পর্কে জানতে পারি এবং ধৈর্যের মধ্য দিয়ে আল্লাহর আদেশ পালন করতে পারি; আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকতে পারি। সুতরাং এটা পরিষ্কার যে ঈমানের অর্ধেক হলো ধৈর্য, আর অর্ধেক কৃতজ্ঞতা।
৩. মানুষমাত্রই দুটি শক্তির অধিকারী। কোনোকিছু করার শক্তি এবং বিরত থাকার শক্তি—যা তার সকল আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে। এ কারণে মানুষ যা পছন্দ করে তা করে এবং যা অপছন্দ করে তা থেকে বিরত থাকে। ধর্মের সামগ্রিক কাঠামোর ভিত দাঁড়িয়ে আছে করা আর না-করার ওপর। আল্লাহ যা করতে বলেছেন তা করা এবং যা নিষেধ করেছেন তা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। করা বা বিরত থাকা কোনোটাই সম্ভব নয় ধৈর্যের অন্তর্নিহিত শক্তি ছাড়া।
৪. আশা ও ভয় হচ্ছে গোটা ধর্মের সারবস্তু। মুমিন আশায় বুক বাঁধে আবার ভয়ে কম্পমান থাকে। আল্লাহ বলেন:
.... وَيَدْعُونَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا وَكَانُوا لَنَا خَاشِعِينَ )
"তারা আমাকে ডাকত আশা নিয়ে ও ভীত হয়ে, আর তারা ছিল আমার প্রতি বিনয়ী। "[১২৮]
নবিজি আল্লাহর কাছে দুআ করতেন:
اللهم اني أسلمت نفسى اليك ووجهت وجهي اليك وفوضت امرى اليك وألجأت ظهرى اليك رغبة ورهبة اليك
"হে আল্লাহ, আমি নিজেকে আপনার কাছে সঁপে দিলাম। আমার যাবতীয় বিষয় আপনার কাছেই সোপর্দ করলাম, আমার চেহারা আপনার দিকেই ফিরালাম, আর আমার পৃষ্ঠদেশ আপনার দিকেই ন্যস্ত করলাম—আপনাত প্রতি অনুরাগী হয়ে এবং আপনার ভয়ে ভীত হয়ে। "[১২৯]
সুতরাং মুমিন বান্দা একই সাথে আশাবাদী এবং ভীতসন্ত্রস্ত, কিন্তু আশা এবং ভয়ের উৎস হবে কেবল ধৈর্য। ভয় মানুষকে সহনশীল হতে শেখায় এবং আশা মানুষকে কৃতজ্ঞ হতে উৎসাহ যোগায়।
৫. আমাদের প্রতিটি কাজের দ্বারাই দুনিয়া-আখেরাতের কল্যাণ-অকল্যাণ নির্ধারিত হয়; অথবা শুধু দুনিয়াতে কল্যাণ বয়ে আনে অথচ আখেরাতে তা অকল্যাণকর। কিন্তু আমাদের যথার্থ সিদ্ধান্ত হবে আখেরাতের জন্য যা ভালো, তা করা। আখেরাতের জন্য যা মন্দ, সর্বোতভাবে তা পরিহার করা। আর এটাই হচ্ছে ঈমানের স্বরূপ: নিজের কল্যাণের জন্য ভালো কাজ করা হচ্ছে কৃতজ্ঞতা এবং অকল্যাণ থেকে বাঁচতে মন্দ কাজ হতে বিরত থাকাটাই ধৈর্য।
৬. একজন মুমিন হিসেবে আপনার কাজ হচ্ছে আল্লাহর আদেশ মান্য করা, তিনি যা নিষেধ করেছেন তা পরিহার করা এবং তাকদীরের ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকা। সব রকমের পরিস্থিতিতেই আপনাকে ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতার সাথে মোকাবিলা করতে হবে। আল্লাহর আদেশসমূহ পালন করা হচ্ছে আপনার কৃতজ্ঞতা এবং নিষিদ্ধ জিনিসগুলো থেকে বিরত থাকা ও তাকদীর মেনে নেওয়া হচ্ছে আপনার ধৈর্যশীলতা।
৭. মানুষ প্রতিনিয়ত পরস্পর বিপরীতমুখী দুটো টানাপড়েনের মধ্যে থাকে— একদিকে পার্থিব জীবনের ভোগবিলাস ও কামনা-বাসনার টোপ, অন্যদিকে পরকালে আল্লাহর বন্ধুদের জন্য নির্ধারিত চিরস্থায়ী সুখ-শান্তির জান্নাতের দিকে তাঁর হাতছানিতে সাড়া দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা। কামনা-বাসনা ও প্রবৃত্তি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া হলো ধৈর্যশীলতা এবং আল্লাহ ও আখেরাতের ডাকে সাড়া দেওয়া হলো কৃতজ্ঞতা।
৮. ইসলাম দুটো মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত: সংকল্প এবং অধ্যবসায় (ধৈর্য)। নবিজি -এর একটি হাদীসে এর উল্লেখ পাওয়া যায়:
اللهم إني أسألك الثبات في الأمر والعزيمة على الرشد
“হে আল্লাহ, আমার সকল কাজে তোমার কাছে দৃঢ়তা প্রত্যাশা করি এবং সরল-সঠিক পথে টিকে থাকার সামর্থ্য কামনা করি।”[১৩০]
৯. ইসলাম সত্য এবং ধৈর্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এ প্রসঙ্গে কুরআনে এসেছে:
... وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ )
"...পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে এবং পরস্পরকে ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।"[১৩১]
প্রত্যেক মানুষের উচিত সততার সাথে কাজ করা; নিজেকে ও অন্যকে সত্য মেনে নেওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত কর। কৃতজ্ঞতার দাবি এটাই, কিন্তু ধৈর্য ছাড়া আপনি তা অর্জন করতে পারবেন না। এ কারণেই ধৈর্য হচ্ছে ঈমানের অর্ধেক।
আর আল্লাহই অধিক জানেন।
টিকাঃ
১২৬. সূরা ইবরাহীম, ১৪:৫; সূরা লুকমান, ৩১:৩১; সূরা সাবা, ৩৪:১৯; সূরা আশ-শুরা, ৪২:৩৩
১২৭. সূরা আস-সাজদাহ, ৩২:২৪
১২৮. সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:৯০
১২৯. আস-সহীহ, বুখারি: ৬৩১৩; ৭৪৮৮; আস-সহীহ, মুসলিম: ২৭১০
১৩০. আল-মুসনাদ, আহমাদ: ১৭১১৪; শাইখ শু'আইব আরনাউত্ব ৬৬ ও তাঁর সাথিদের মতে হাসান লিগাইরিহ; আল-মুসান্নাফ, ইবন আবী শাইবাহ: ২৯৩৫৮; সুনানুস সুগরা, নাসাঈ: ১৩০৪; আস-সহীহ, ইবন হিব্বান: ৯৩৫
১৩১. সূরা আল-আসর, ১০৩:৩