📘 সবর ও শোকর > 📄 সাহাবাদের মধ্যে ধৈর্যের গুণাগুণ

📄 সাহাবাদের মধ্যে ধৈর্যের গুণাগুণ


আবুস সাফার থেকে বর্ণিত, আবূ বাকর অসুস্থ ছিলেন। কিছু লোক তাঁকে দেখতে গেলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন: "আপনার জন্য কি ডাক্তার ডাকব না?" আবূ বাকর বললেন: "ডাক্তার তো আমাকে দেখেছেন।" তারা জিজ্ঞাসা করলেন: "ডাক্তার কী বলেছেন?" আবূ বাকর জানালেন: "তিনি বলেছেন, 'আমার যা ইচ্ছে আমি তা-ই করি'।” (অর্থাৎ আল্লাহ তার ডাক্তার এবং মানুষের সুস্থতা-অসুস্থতা তাঁর ইচ্ছের ওপর নির্ভরশীল)। "[১১২]

উমার ইবনুল খাত্তাব বলেন, "আমরা যেসব জীবনোপকরণ পেয়েছি তার মাঝে ধৈর্য সর্বোত্তম। যদি ধৈর্য মানুষের রূপ পেত, তাহলে সে হতো একজন সম্মানিত ব্যক্তি।" [১১৩]

আলি ইবনু আবী তালিব বলেন, "ঈমানের সাথে ধৈর্যের সম্পর্ক দেহের সাথে মাথার সম্পর্কের মতো। মাথা কাটা পড়লে দেহের মৃত্যু হয়ে যায়।" তারপর তিনি উঁচুস্বরে বলেন, "নিশ্চয় যার ধৈর্য নেই তার ঈমান নেই।" [১১৪] অপর এক বর্ণনায় রয়েছে, "ধৈর্য হচ্ছে বাহনের মতো তা থেকে পড়ে যেয়ো না। "[১১৫]

উমার ইবনু আব্দুল আজীজ বলেন, "আল্লাহ তার বান্দাকে কোনো নিআমাত দেওয়ার পর তা ছিনিয়ে নিয়ে কেবল ধৈর্যের মাধ্যমেই তার ক্ষতিপূরণ করেন না; বরং তিনি যা-কিছু ছিনিয়ে নেন, তারচেয়ে আরও উত্তম কিছুর মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ করেন। "[১১৬]

টিকাঃ
১১২. আয যুহদ, আহমাদ ইবনু হাম্বাল: ৫৮৭; হিলইয়াতুল আওলিয়া, আবু নুআইম আল আসবাহানি: ১/৩৪
১১৩. আস সবর, ইবন আবিদ দুনইয়া: ৬
১১৪. আস সবর, ইবন আবিদ দুনইয়া: ৮; আল মুসান্নাফ, ইবন আবী শাইবাহ: ৩০৪৩৯; শু'আবুল ঈমান, বাইহাকি: ৪০, ৯৭১৮; হিলইয়াতুল আওলিয়া, আবু নু'আইম: ১/৭৫-৭৬; আয যুহদ, ওয়াকি: ১৯৯
১১৫. আলি থেকে মুসনাদ আকারে বর্ণিত হয়নি। দেখুন: ইমাম কুশাইরি ১৬১-এর রিসালাহ: ২৫৬; আত তামসিল, সা'লাবি: ৩০
১১৬. আর রিসালাহ, কুশাইরি: ২৫৮

📘 সবর ও শোকর > 📄 উরওয়াহ ইবনুল যুবাইর (রা)-এর ঘটনা

📄 উরওয়াহ ইবনুল যুবাইর (রা)-এর ঘটনা


উরওয়াহ ইবনুল যুবাইর এসেছিলেন খলিফা আল-ওয়ালিদ বিন আবৃদিল মালিকের সাথে সাক্ষাৎ করতে। সাথে ছিল সে সময়ের সবচেয়ে সুদর্শন যুবক, তাঁর ছেলে মুহাম্মাদ। যুবকটির পরনে ছিল অভিজাত পোশাক, মাথার চুল ছিল দু- দিকে সিঁথি কাটা। ওয়ালিদ যুবকের দিকে তাকিয়ে বলেছিল: "কুরাইশের যুবকরা দেখতে এমনই হয়।" এই কথা বলে সে তার প্রতি বদনজর হানে। যুবকটি সেই স্থান ত্যাগ করার আগে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এরপর চলে যাওয়ার সময় আস্তাবলে ঘোড়া প্রস্তুতকালে ঘোড়া থেকে পড়ে যায় এবং ঘোড়া তাকে পদদলিত করে মেরে ফেলে। তারপর উরওয়ার পায়ে পচন ধরে এবং ওয়ালিদ তাঁর কাছে ডাক্তার পাঠায়। ডাক্তাররা তাকে পরামর্শ দেয়, পা কেটে ফেলতে হবে নয়তো পচন সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়বে এবং সে মারা যাবে। উরওয়াহ রাজি হলে ডাক্তাররা করাত দিয়ে পা কাটতে শুরু করে। করাত যখন হাড়ে গিয়ে পৌঁছুল তখন উরওয়াহ বেহুঁশ হয়ে গেলেন। যখন হুঁশ ফিরল তখন তার সারা শরীর ঘর্মাক্ত ছিল। তিনি বারবার পড়ছিলেন: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার। অস্ত্রপাচার সম্পন্ন হওয়ার পর কর্তিত পা হাতে তুলে তাতে চুমু খেলেন এবং বললেন, "আমি সেই একক সত্ত্বার শপথ করছি, (এই পায়ে) আমি কখনো খারাপ কাজে যাইনি বা আল্লাহ অপছন্দ করেন এমন কোথাও যাইনি।" তারপর সে নিদের্শ দিলেন পা-টাকে ধুয়ে সুগন্ধী মেখে কাপড়ে মুড়িয়ে কোনো মুসলিম কবরস্থানে দাফন করার জন্য।

উরওয়াহ যখন আল-ওয়ালিদের কাছে থেকে মদীনায় ফিরে এলেন তখন তার আত্মীয়-স্বজন শহরের সীমান্তে তার সাথে সাক্ষাতে আসতে থাকল এবং সান্ত্বনা জানাল। প্রত্যুত্তরে তিনি শুধু কুরআনের একটি আয়াত পাঠ করলেন:

.... لَقَدْ لَقِينَا مِن سَفَرِنَا هَذَا نَصَبًا *

'আমরা আমাদের এই সফরে বড়ই ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। [১১৭]

অতঃপর জানালেন, তিনি মদীনায় প্রবেশ করবেন না; কারণ, সেখানকার লোকেরা হয়তো কারও দুর্দশায় নিয়ে মজা করে, না-হয় অন্যদের সৌভাগ্যে ঈর্ষান্বিত হয়। সুতরাং তিনি আল-আকীকে বসবাস করতে লাগলেন। ঈসা ইবনু তালহা তাকে দেখতে আসলেন। তিনি বললেন, তোমার শত্রুরা ধ্বংস হোক এবং তার ক্ষতস্থান দেখতে চাইলেন। উরওয়াহ তার কাটা-পা দেখালেন। ঈসা বললেন, আল্লাহর কসম! আমি আপনাকে যুদ্ধে উসকে দিতে আসিনি। আল্লাহ আপনার অধিকাংশ শরীরকে রক্ষা করেছেন। আপনার মনোবল, আপনার জবান, আপনার দৃষ্টিশক্তি, দুটো হাত এবং একটি পা আল্লাহ হেফাযত করেছেন। উরওয়াহ তাকে বললেন, "আপনার মতো করে আর কেউ আমাকে সান্ত্বনা দেয়নি।"

অস্ত্রপাচারের আগে ডাক্তাররা তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ব্যথ্যানাশক হিসেবে সে মাদক গ্রহণ করবে কি না। তিনি জবাবে বলেছিলেন, "আল্লাহ যেখানে আমার সহ্যক্ষমতা কতটুকু তার পরীক্ষা নিচ্ছেন, সেখানে কী করে আমি তার অবাধ্য হই!"[১১৮]

টিকাঃ
১১৭. সূরা আল-কাহফ, ১৮:৬২
১১৮. আত তারিখ, আবু যুরআ আদ দিমাশকি: ১/২৫৫; ছিলইয়াতুল আওলিয়া, আবু নু'আঈম: ১/৩৫৫

📘 সবর ও শোকর > 📄 উত্তম ধৈর্য এবং আতঙ্ক

📄 উত্তম ধৈর্য এবং আতঙ্ক


মুজাহিদ বলেন, "উত্তম ধৈর্য (সবরুন জামিল) হচ্ছে সেই ধৈর্য, যে ধৈর্যে কোনো আতঙ্ক থাকে না।" [১১৯]

আমর ইবনু কায়েস বলেন, "সুন্দর (সবরুন জামিল) ধৈর্য হচ্ছে দুর্যোগে সন্তুষ্ট থাকা এবং আল্লাহর ইচ্ছের কাছে আত্মসমর্পণ করা।" [১২০]

ইউনুস ইবনু ইয়াজিদ বলেন, "আমি রাবিআ ইবন আবী আবদির রহমানকে জিজ্ঞাসা করলাম, ধৈর্যের চূড়ান্ত রূপ কী?" তিনি বলেন, "বিপদগ্রস্ত অবস্থায় বাহ্যিক দিক থেকে ঠিক তেমন থাকা, বিপদ আসার আগে যেমনটা ছিল। "[১২১] (এর অর্থ এই নয় যে, বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি কষ্ট অনুভব করবে না। এই উদাহরণের অর্থ হচ্ছে বিপদে আতঙ্কিত না হওয়া এবং অভিযোগ করা থেকে বিরত থাকা।)

উত্তম ধৈর্য সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে কাইস ইবনুল হাজ্জাজ বলেন, "বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি লোকদের মাঝে এভাবে থাকবে যে, তাকে (তার বিপদের জন্য) পৃথকভাবে চেনা যাবে না।"[১২২]

টিকাঃ
১১৯. আত-তাফসীর, তাবারি: ১২/১৬৬
১২০. আস সবর, ইবন আবিদ দুনইয়া: ১১৬
১২১. আস সবর, ইবন আবিদ দুনইয়া: ১১৪
১২২. আস সবর, ইবন আবিদ দুনইয়া: ১১৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00