📘 সবর ও শোকর > 📄 আল-হাদিসে ধৈর্য

📄 আল-হাদিসে ধৈর্য


১. বিপদাপদের সময় ধৈর্য ধরা এবং ইন্না লিল্লাহ পড়া :

উম্মু সালামাহ থেকে বর্ণিত:

তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ -কে বলতে শুনেছি: "কোনো মুসলিমের ওপর মুসিবত আসলে যদি সে আল্লাহ যা হুকুম করেছেন তা—অর্থাৎ 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া- ইন্না ইলাইহি রাজিউন' ('আমরা আল্লাহরই জন্যে এবং তাঁরই কাছে ফিরে যাব')— বলার পর এবং এ দুআ পাঠ করে:

اللَّهُمَّ أَجُرْنِي فِي مُصِيبَتِي وَأُخْلِفْ لِي خَيْرًا مِنْهَا

'হে আল্লাহ, আমাকে আমার মুসীবাতের প্রতিদান দান করুন এবং এর বিনিময়ে এরচেয়ে উত্তম বস্তু দান করুন।'

তবে মহান আল্লাহ তাকে এরচেয়ে উত্তম বস্তু দান করে থাকেন।[৯৪]

উম্মু সালামাহ বলেন, এরপর যখন আবূ সালামাহ্ ইনতিকাল করেন, তখন আমি নিজে নিজে বললাম, "কোন মুসলিম আবূ সালামাহ্ থেকে উত্তম? তিনি প্রথম ব্যক্তি, যিনি হিজরাত করে রাসূলুল্লাহ -এর নিকট পৌঁছেছেন। যাহোক আমি এ দুআগুলো পড়লাম। এরপর মহান আল্লাহ আবূ সালামাহ'র বদলে রাসূলুল্লাহ -এর মতো স্বামী দান করেছেন।"

উম্মু সালামাহ বলেন, আমার নিকট বিয়ের পয়গাম পৌঁছুনোর উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ হাত্বিব ইবনু আবূ বাল্লাআহ-কে পাঠালেন। আমি বললাম, "আমার একটা কন্যা আছে আর আমি একটু অভিমানী।" তখন রাসূলুল্লাহ বলেন, "أبنها فادعوا الله أن يغنيها عنها وادعوا الله أن يذهب بالغيرة তাঁর কন্যার জন্য আমি আল্লাহর কাছে দুআ করব, যাতে তিনি তার সুব্যবস্থা করে দেন। আর (উম্মু সালমাহ সম্পর্কে) দুআ করব যেন আল্লাহ তার অভিমান দূর করে দেন।" অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহ -কে বিয়ে করেন।

২. সন্তানের মৃত্যুতে ধৈর্যধারণকারীর জন্য জান্নাতে গৃহ নির্মাণ:

আবূ মূসা আশআরি থেকে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ বলেন,

اذا مات ولد العبد قال الله لملائكته قبضتم ولد عبدى فيقولون نعم فيقول قبضتم ثمرة فؤاده فيقولون نعم فيقول ماذا قال عبدى فيقولون حمدك واسترجعك فيقول ابنوا لعبدي بيتا في الجنة وسموه بيت الحمد

"যখন কোনো বান্দার সন্তান মারা যায়, তখন মহান আল্লাহ স্বীয় ফেরেশতাদের বলেন, 'তোমরা আমার বান্দার সন্তানকে কবয করেছ।' তারা বলে, 'হ্যাঁ।' তিনি বলেন, 'তোমরা তার কলিজার টুকরাকে কবয করেছ?' তারা বলে, 'হ্যাঁ।' তিনি বলেন, 'সে সময় আমার বান্দা কী বলেছে?' তারা বলে, 'সে আপনার হামদ (প্রশংসা) করেছে ও ইন্না লিল্লাহি ওয়া-ইন্না ইলাইহি রাজিউন পাঠ করেছে।' মহান আল্লাহ বলেন, 'আমার এই বান্দার জন্য জান্নাতের মধ্যে একটি ঘর বানাও, আর তার নাম রাখো, বায়তুল হামদ (প্রশংসা-ভবন)'।"[৯৫]

৩. আঘাতের প্রথম চোটেই ধৈর্যধারণ করতে করা উচিত:

আনাস বলেন, একবার নবি একজন নারীর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। সে তখন একটি কবরের পাশে কাঁদছিল। নবি তাকে বললেন : "اتقي الله واضيري আল্লাহকে ভয় করো এবং ধৈর্যধারণ করো।" তখন সে বলল, "তুমি আমার বিপদ কি উপলব্ধি করবে?"

যখন রাসূলুল্লাহ চলে গেলেন, তখন তাকে বলা হলো তিনি তো রাসূলুল্লাহ। তখন তাকে মৃত্যুর মতো ভয় পেয়ে বসল। তৎক্ষণাৎ রাসুলুল্লাহর দরজায় এসে হাজির হলো। সে তাঁর দরজায় কোনো দারোয়ান পেল না (তাই সরাসরি ঢুকে গেল)। সে বলল, "ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি তো আপনাকে চিনতে পারিনি।" রাসূলুল্লাহ বললেন,

إِنَّمَا الصَّبْرُ عِنْدَ أَوَّلِ صَدْمَةٍ

"সবর তো হয় বিপদ আগমনের প্রথম মুহূর্তে।" অথবা বলেছিলেন,

عِنْدَ أَوَّلِ الصَّدْمَةِ

"আঘাতের প্রথমেই।"[৯৬]

৪. প্রিয়বস্তু হারানোয় ধৈর্যধারণকারীদের প্রতিদান জান্নাত:

আবূ হুরাইরাহ থেকে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ বলেছেন: 'আল্লাহ বলেন,

من أذهبت حبيبتيه فصبر واحتسب ، لم أرض له ثوابا دون الجنة

"আমি যে বান্দার কাছ থেকে তার প্রিয় দুটি বস্তু (চোখ) নিয়ে নেওয়ার পর সে সবর করে, তাকে প্রতিদান হিসেবে আমি জান্নাতই দেব।”[৯৭]

৫. স্বেচ্ছায় ধৈর্যধারণকারী মহিলার জন্য জান্নাতের সুসংবাদ :

আতা ইবনু আবূ রাবাহ্ থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, "ইবনু আব্বাস আমাকে বললেন: 'আমি কি তোমাকে একজন জান্নাতী মহিলা দেখাব না?' আমি বললাম: 'অবশ্যই।' তখন তিনি বললেন: 'এই কালো রঙের মহিলাটি, সে নবি-এর নিকট এসেছিল। তারপর সে বলল: আমি মৃগী রোগে আক্রান্ত হই এবং এ অবস্থায় আমি উন্মুক্ত হয়ে যাই। সুতরাং আপনি আমার জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করুন। নবি বললেন:

ان شئت صبرت ولك الجنة وان شئت دعوت الله تعالى ان يعافيك

'তুমি যদি চাও, তো ধৈর্যধারণ করতে পারো—তোমার জন্য আছে জান্নাত। আবার তুমি চাইলে আমি আল্লাহর কাছে দুআ করি, যেন তোমাকে সুস্থ করেন।' স্ত্রীলোকটি বলল: 'আমি ধৈর্যধারণ করব।' সে আরও বলল: 'ওই অবস্থায় আমি উন্মুক্ত হয়ে যাই। তাই দুআ করুন, যেন আমি উন্মুক্ত না হই।' নবি তার জন্য দুআ করলেন।"[৯৮]

৬. কঠিন পরিস্থিতিতেও ধৈর্যশীলতা আম্বিয়া কেরামদের বৈশিষ্ট্য:

আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, নবি একবার কিছু সম্পদ বণ্টন করছিলেন। তখন এক ব্যক্তি বলল, এ তো এমন ধরনের বণ্টন, যা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য করা হয়নি। অতঃপর আমি নবি-কে বিষয়টি জানালাম। তিনি বললেন,

رحم الله موسى قد أوذى بأكثر من هذا فصبر

"আল্লাহ মূসা-এর প্রতি রহম করুন, তাঁকে এরচেয়ে অনেক বেশি কষ্ট দেওয়া হয়েছিল, তবুও তিনি ধৈর্য ধারণ করেছিলেন।" [৯৯]

৭. একটি কাঁটা বিদ্ধ হলেও তার বিনিময়ে ধৈর্যশীল ব্যক্তির পাপ মোচন করা হয়:

আবু সাঈদ খুদরি ও আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন:

قال ما يصيب المسلم من نصب ولا وصب ولا هم ولا حزن ولا أذى ولا غم حتى الشوكة يشاكها الا كفر الله بها من خطاياه

"মুসলিম ব্যক্তির ওপর যে কষ্টক্লেש, রোগ-ব্যাধি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা, কষ্ট ও পেরেশানী আসে, এমনকি যে কাঁটা তার দেহে ফোটে-এ সবকিছুর মাধ্যমে আল্লাহ তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন।" [১০০]

৮. কাঁটার চেয়ে নগণ্য আঘাতের বিনিময়েও ধৈর্যশীলের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়:

আয়িশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন:

মা من مصيبة تصيب المسلم الا كفر الله بها عنه حتى الشوكة يشاكها

"মুসলিম যে বিপদেই আক্রান্ত হোক, এর দ্বারা আল্লাহ তার গুনাহ মোচন করেন, এমনকি তা যদি একটা কাঁটাও বিঁধে তবুও।"[১০১]

৯. কষ্ট বা রোগ-ব্যাধিতে ধৈর্য ধারণকারীর গুনাহগুলো ঝরে যায়:

আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত:

তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ -এর কাছে গেলাম। তখন তিনি ভয়ানক জ্বরে আক্রান্ত ছিলেন। আমি তাঁর গায়ে হাত বুলিয়ে দিলাম এবং বললাম: "হে আল্লাহর রাসূল, আপনি ভীষণ জ্বরে আক্রান্ত।" রাসূলুল্লাহ বললেন, " أجل انى لأوعك كما يوعك رجلان منكم হ্যাঁ, আমি এমন কঠিন জ্বরে আক্রান্ত হই, যা তোমাদের দুজনের হয়ে থাকে।" আমি বললাম: "এটা এ জন্য যে, আপনার জন্য বিনিময়ও দ্বিগুণ।" রাসূলুল্লাহ বললেন, " نعم والذي نفسي بيده ما على الارض مسلم يصيبه أذى من مرض فما سواء الا حط الله عنه به خطاياه كما تحط الشجرة ورقها হ্যাঁ, যার হাতে আমার জীবন তাঁর কসম, দুনিয়ায় যে-কোনো মুসলিমের ওপর রোগ-ব্যাধির কষ্ট বা অনুরূপ কিছু আপতিত হলে আল্লাহ তাঁর গুনাহগুলো ঝরিয়ে দেন, যেভাবে গাছ তার পাতাগুলো ঝরিয়ে দেয়।"[১০২]

১০. দুঃখে-কষ্টে নবিজি ছিলেন সর্বাধিক ধৈর্যশীল মানুষ:

আয়িশা বলেন,

ما رأيت الوجع اشد منه على رسول الله

আমি রাসূলুল্লাহ -এর চেয়ে বেশি রোগযন্ত্রণা ভোগকারী অন্য কাউকে দেখিনি।[১০৩]

১১. পূর্ববর্তী উম্মাতের অপরিসীম ধৈর্যের নমুনা:

খাব্বাব ইবনু আরাত বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ -এর কাছে (মক্কায় আমাদের কষ্টের ব্যাপারে) অভিযোগ পেশ করলাম। তখন তিনি কা'বাঘরের ছায়ায় তাঁর চাদরে ঠেস দিয়ে বসেছিলেন। আমরা বললাম, "আমাদের জন্য কি (আল্লাহর কাছে) সাহায্য চাইবেন না? আমাদের জন্য কি আল্লাহর কাছে দুআ করবেন না?" তিনি বললেন:

قَدْ كَانَ مِنْ قَبْلِكُمْ ، يُؤْخَذُ الرَّجُلُ فَيُحْفَرُ لَهُ فِي الْأَرْضِ ، فَيُجْعَلُ فِيهَا ، فَيُجَاءُ بِالْمِنْشَارِ فَيُوضَعُ عَلَى رَأْسِهِ فَيُجْعَلُ نِصْفَيْنِ ، وَيُمَشَّطُ بِأَمْشَاطِ الْحَدِيدِ مَا دُونَ لَحْمِهِ وَعَظْمِهِ ، فَمَا يَصُدُّهُ ذَلِكَ عَنْ دِينِهِ ، وَاللَّهِ لَيُتِمَّنَّ هَذَا الْأَمْرَ ، حَتَّى يَسِيرَ الرَّاكِبُ مِنْ صَنْعَاءَ إِلَى حَضْرِ مَوْتَ ، لَا يَخَافُ إِلَّا اللَّهَ ، وَالذِّئْبَ عَلَى غَنَمِهِ ، وَلَكِنَّكُمْ تَسْتَعْجِلُونَ

"তোমাদের পূর্বের যুগে একজন ব্যক্তিকে (তাঁর ঈমানের জন্য) গর্ত খুঁড়ে তাতে নিক্ষেপ করা হতো। তারপর করাত এনে মাথার ওপর রাখা হতো এবং তাকে দু- টুকরো করে ফেলা হতো। লোহার শলাকা দিয়ে তার হাড্ডি থেকে মাংস খসানো হতো। তা সত্ত্বেও তাকে তার দ্বীন থেকে ফিরিয়ে আনতে পারত না। আল্লাহর কসম, এ দ্বীন অবশ্যই পূর্ণতা লাভ করবে। এমন হবে যে সানআ থেকে হাযরামাওত পর্যন্ত ভ্রমণকারী ভ্রমণ করবে। অথচ সে আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করবে না এবং নিজের মেষপালের জন্য বাঘের ভয় থাকবে; কিন্তু তোমরা তাড়াহুড়ো করছ।" [১০৪]

১২. আবু তালহা -এর স্ত্রীর ধৈর্যের বিরল দৃষ্টান্ত এবং বরকত লাভ:

আনাস ইবনু মালিক বলেন,

"আবূ তালহা-এর এক পুত্র অসুস্থ হয়ে পড়ল এরপর তার মৃত্যু হলো। তখন আবূ তালহা বাড়ির বাইরে ছিলেন। তাঁর স্ত্রী যখন দেখলেন, ছেলেটি মারা গেছে, তখন তিনি তাকে প্রস্তুত করলেন (গোসল করালেন, কাফন পড়ালেন) এবং ঘরের এক কোণে রেখে দিলেন। আবু তালহা বাড়িতে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, ছেলের অবস্থা কেমন? স্ত্রী জবাব দিলেন, তার আত্মা শান্ত হয়েছে এবং আশা করি সে এখন আরাম পাচ্ছে। আবু তালহা ভাবলেন তাঁর স্ত্রী সত্য বলেছেন। অতঃপর তিনি স্ত্রীর সাথে রাত্রিযাপন করলেন এবং ভোরে গোসল করলেন। তিনি বাইরে যেতে উদ্যত হলে স্ত্রী তাঁকে জানালেন, ছেলেটি মারা গেছে। অতঃপর তিনি নবি -এর সঙ্গে (ফজরের) সালাত আদায় করলেন। এরপর নবি -কে তাঁদের রাতের ঘটনা সম্পর্কে জানালেন। তখন আল্লাহর রাসূল ইরশাদ করলেন : 'لَعَلَّ اللَّهَ أَنْ يُبَارِكَ لَكُمَا فِي لَيْلَيْكُمَا আশা করা যায়, আল্লাহ তাআলা তোমাদের এ রাতে বরকত দেবেন।'"

সুফিয়ান বিন উয়াইনাহ বলেন, 'একজন আনসারী ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন, আমি আবু তালহা দম্পতির নয় জন সন্তান দেখেছি, তাঁরা সবাই কুরআনের কারী। [১০৫]

১৩. পূর্ববর্তী এক ধৈর্যশীল নবির মহানুভবতা:

আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ বলেন, "আমি যেন লক্ষ করছিলাম যে, নবি কোনো এক নবির কথা বর্ণনা করেছেন, যাকে তাঁর কওম প্রহার করে রক্তাক্ত করে ফেলে, আর তিনি আপন চেহারা থেকে রক্ত মুছছেন ও বলছেন: رَبِّ اغْفِرْ لِقَوْمِي، فَإِنَّهُمْ لَا يَعْلَمُونَ হে রব, তুমি আমার কাওমকে ক্ষমা করে দাও। কেননা, তারা জানে না।”[১০৬]

১৪. ধৈর্যশীলদের জন্য জ্বর পাপরাশি মোচনকারী:

জাবির ইবনু আবদুল্লাহ বলেন, "রাসূলুল্লাহ একদিন উম্মু সায়িব কিংবা উম্মুল মূসাইয়্যাব-এর কাছে গিয়ে বললেন, 'مالك ترفرفين তোমার কী হয়েছে, কাঁদছ কেন?' তিনি বললেন, 'الحمى لا بارك الله فيها ভীষণ জ্বর, আল্লাহ এতে বরকত না দিন।' তখন তিনি বললেন,

لا تسبى الحمى فإنها تذهب خطايا بني آدم كما يذهب الكير خبث الحديد

তুমি জ্বরকে গালমন্দ কোরো না। কেননা, জ্বর আদমসন্তানের পাপরাশি মোচন করে দেয়, যেভাবে হাপর লোহার খাদ দূরীভূত করে'। "[১০৭]

১৫. মুমিন সকল অবস্থায় ধৈর্যশীল এবং আল্লাহর প্রশংসাকারী:

ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, "যখন রাসূলুল্লাহ -এর ছোট মেয়ের মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলো, রাসূলুল্লাহ তাকে উঠিয়ে নিয়ে বুকের সাথে মিলালেন। তারপর নিজের হাত তার ওপরে রাখলেন। এরপর তার মৃত্যু হলো আর সে তখন রাসূলুল্লাহ -এর সামনে ছিল। উম্মে আয়মান কেঁদে উঠলে রাসূলুল্লাহ তাঁকে বললেন,

يَا أُمَّ أَيْمَنَ ، أَتَبْكِينَ وَرَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عِنْدَكِ

হে উম্মে আয়মান, তুমি কাঁদছ অথচ রাসূলুল্লাহ তোমার সামনে উপস্থিত রয়েছেন?'

তিনি বললেন, 'আমি কেন কাঁদব না যখন রাসূলুল্লাহ স্বয়ং কাঁদছেন?' রাসূলুল্লাহ বললেন,

إِنِّي لَسْتُ أَبْكِي وَلَكِنَّهَا رَحْمَةٌ»، ثُمَّ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْمُؤْمِنُ بِخَيْرٍ عَلَى كُلِّ حَالٍ تُنْزَعُ نَفْسُهُ مِنْ بَيْنِ جَنْبَيْهِ وَهُوَ يَحْمَدُ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ

'আমি স্বেচ্ছায় কাঁদছি না; বরং যে অশ্রুর ধারা তুমি দেখছ তা হলো আল্লাহ তাআলার রহমত-বিশেষ।' অতঃপর রাসূলুল্লাহ বললেন, 'মুমিন সর্বাবস্থায় ভালো থাকে, তার পার্শ্বদ্বয় থেকে আত্মা বের করা হয় অথচ তখনো সে আল্লাহ তাআলার প্রশংসা করতে থাকে'। "[১০৮]

১৬. যে যত নেককার সে তত বেশি পরীক্ষিত হয়:

আবূ সাঈদ আল খুদরি বলেন, "আমি নবি-এর কাছে গেলাম, তখন তিনি জ্বরাক্রান্ত ছিলেন। আমি কাপড়ের ওপর দিয়ে তাঁর গায়ে হাত রেখে জ্বরের তীব্রতা অনুভব করলাম। আমি বললাম, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনার জ্বরের তীব্রতা এত বেশি!'

তিনি বললেন,

إِنَّا كَذَلِكَ يُضَعَّفُ لَنَا الْبَلَاءُ وَيُضَعَّفُ لَنَا الأَجْرُ

'এভাবেই আমাদের জন্য বিপদ-আপদ দ্বিগুণ বৃদ্ধি করা হয় আবার এর প্রতিদানও দ্বিগুণ বৃদ্ধি করা হয়।'

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, কাদের সবচাইতে কঠিন বিপদে ফেলা হয়?'

তিনি বললেন, 'الأنبياء নবিগণকে।'

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'এরপর কারা?' তিনি বললেন,

ثُمَّ الصَّالِحُونَ إِنْ كَانَ أَحَدُهُمْ لَيُبْتَلَى بِالْفَقْرِ حَتَّى مَا يَجِدُ أَحَدُهُمْ إِلَّا الْعَبَاءَةَ يُحَوِّيهَا وَإِنْ كَانَ أَحَدُهُمْ لَيَفْرَحُ بِالْبَلَاءِ كَمَا يَفْرَحُ أَحَدُكُمْ بِالرَّخَاءِ

'এরপর নেককারদের ওপর। তাদের কেউ এতটা দারিদ্র্য-পীড়িত হয় যে, শেষ পর্যন্ত তার কাছে পরিধানের কম্বলটি ছাড়া আর কিছুই থাকে না। তাদের কেউ বিপদে এত শান্ত ও উৎফুল্ল থাকে, যেমনটা তোমাদের কেউ ধন-সম্পদ প্রাপ্তিতে আনন্দিত হয়ে থাকে'। "[১০৯]

১৭. রোগাক্রান্ত সময় গুনাহের সময়ের ক্ষতি পূরণ করে:

আবু আইয়্যুব আনসারি বলেন, "রাসূলুল্লাহ একবার এক আনসারিকে অসুস্থাবস্থায় দেখতে গিয়ে তার অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। তখন সেই সাহাবি বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, নয় দিন যাবৎ ঘুমোতে পারিনি।' তখন রাসূলুল্লাহ বললেন,

أي أخى أصبر أى أخى أصبر تخرج من ذنوبك كما دخلت فيها

'ভাই আমার, ধৈর্য ধরো। ভাই আমার, ধৈর্য ধরো। যদি তা করতে পারো তাহলে যেভাবে (সহজে) গুনাহ করেছিলে সেভাবেই গুনাহমুক্ত হয়ে যাবে।' এরপর তিনি আরও বললেন,

ساعات الأمراض يذهبن ساعات الخطايا

'অসুস্থ অবস্থার সময়গুলো গুনাহের সময়গুলোকে (আমলনামা থেকে) মুছে দেয়'।" [১১০]

আনাস থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ বলেছেন,

اذا مرض العبد ثلاث أيام خرج من ذنوبه كيوم ولدته أمه

"যখন বান্দা তিন দিন ধরে অসুস্থ থাকে, তখন তার থেকে গুনাহ এভাবে দূর হয়ে যায়, যেভাবে তার মা তাকে জন্ম দিয়েছিল।"[১১১]

টিকাঃ
৯৪. আল-মুসনাদ, আহমদ: ১৬৩৪৪; আস-সহীহ, মুসলিম: ৯১৮ (৩);
৯৫. আস-সুনান, তিরমিযি: ১০২১; তাঁর মতে হাসান গারীব; ইমাম ইবন হাজার আসকালানি -এর মতে সনদ হাসান-ফুতুহাতুর রাব্বানিয়্যাহ, ৩/২৯৬
৯৬. আস-সহীহ, মুসলিম: ৯২৬ (১৫)
৯৭. আস-সুনান, তিরমিযি: ২৪০১; তাঁর মতে হাসান সহীহ; আস-সহীহ, ইবন হিব্বান: ২৯৩০
৯৮. আস-সহীহ, বুখারি: ৫৬৫২; আস-সহীহ, মুসলিম: ২৫৭৬
৯৯. আস-সহীহ, বুখারি, হা: ৩৪০৫
১০০. আস-সহীহ, বুখারি: ৫৬৪১; আস-সহীহ, মুসলিম: ২৫৭৩
১০১. আস-সহীহ, বুখারি: ৫৬৪০; আস-সহীহ, মুসলিম: ২৫৭২ (৪৯)
১০২. আস-সহীহ, বুখারি: ৫৬৬০; আস-সহীহ, মুসলিম: ২৫৭১
১০৩. আস-সহীহ, বুখারি: ৫৬৪৬; আস-সহীহ, মুসলিম: ২৫৭০
১০৪. আস-সহীহ, বুখারি: ৩৬১২,৬৯৪৩; আস-সহীহ, ইবন হিব্বান: ৬৬৯৮
১০৫. আস-সহীহ, বুখারি: ১৩০১
১০৬. আস-সহীহ, বুখারি, হা: ৬৯২৯; আস-সহীহ, মুসলিম: ১৭৯২ (১০৫), এখানে নূহ-এর কথা বলা হয়েছে, দেখুন-ফাতহুল বারী লি ইবন হাজার: ৬/৫২১, দারুল মা'রিফাহ
১০৭. আস-সহীহ, মুসলিম: ২৫৭৫; আস-সহীহ, ইবন হিব্বান: ২৯৩৮
১০৮. আস সুনানুল কুবরা, নাসাঈ : ১৯৮২; এই সনদে আ'তা বিন আস সাইয়্যিব আছে, যাকে নিয়ে কালাম রয়েছে। তবে শাইখ আলবানি সহীহ সাব্যস্ত করেছেন-সহীহুন নাসাঈ: ১৮৪২
১০৯. আস-সুনান, ইবন মাজাহ: ৪০২৪; ইমাম বুসিরি এ-এর মতে এর সনদ সহীহ, রিজাল সিকাহ, দেখুন: শাইখ ফুওয়াদ আল বাকি'র তা'লিক; আল মু'জামুল আওসাত, তাবারানি: ৯০৪৭; ইমাম হাকিম এই-এর মতে ইমাম মুসলিম এ-এর শর্তে সহীহ-আল মুস্তাদরাক: ৪/৩০৭
১১০. আল মারদ ওয়াল কাফফারাত, ইবন আবিদ দুনইয়া: ৩৪; শু'আবুল ঈমান, বাইহাকি: ৯৯২৫; শাইখ নাসিরুদ্দীন আলবানি-এর মতে অত্যন্ত দুর্বল বর্ণনা-দ্বঈফুত তারগীব: ১৯৯৩
১১১. আল মারদ ওয়াল কাফফারাত, ইবন আবিদ দুনইয়া: ৬১; আল মু'জামুস সগীর, তাবারানি: ৫১৯; শাইখ আলবানি-এর মতে অত্যন্ত দুর্বল-সিলসিলাতুল আহাদীসিদ দ্বঈফা: ২৭১২

📘 সবর ও শোকর > 📄 প্রিয়জনের মৃত্যুতে ধৈর্যধারণ

📄 প্রিয়জনের মৃত্যুতে ধৈর্যধারণ


প্রিয়জনের মৃত্যু মানুষকে শোকে বিহ্বল করে দেয় এবং মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন প্রথা প্রিয় হারানোর বেদনাকে আরও গভীর করে তোলে। মাতম করা, বিলাপ করা এবং কাপড় ছিঁড়ে ফেলার মতো অন্ধকার যুগের প্রসিদ্ধ প্রথা এখনো টিকে আছে মুসলিমদের মধ্যে। এ ধরনের আচরণ ইসলামে বৈধ নয়। জীবনের অন্যান্য দুঃখ-কষ্টের মতো প্রিয়জনের বিয়োগ-বেদনাও ধৈর্যের সাথে গ্রহণ করা উচিত।

কেউ মারা যাওয়ার আগে-পরে বা মৃত্যুর সময় নিচু স্বরে কাঁদা বা নীরবে অশ্রু বর্ষণ করার অনুমতি আছে। তবে ইমাম শাফিঈ ও তাঁর অধিকাংশ সাথির মতে মৃত্যুর পরে কাঁদা মাকরূহ। তবে আত্মা দেহ ত্যাগ করার পূর্ব পর্যন্ত কান্নাকাটি করা অনুমোদিত।[১২৩]

বিশুদ্ধ মত হচ্ছে মৃত্যুর আগে বা পরে কান্নাকাটি করা বৈধ। এর প্রমাণ রয়েছে জাবির ইবনু আব্দিল্লাহ বর্ণিত এই হাদীসে,

"আমার বাবা উহুদ যুদ্ধে শহীদ হলে আমি তাঁর চেহারা থেকে কাপড় সরানোর পর কাঁন্না শুরু করি। লোকজন আমাকে কান্না থামাতে বললেও নবিজি থামতে বললেন না। এরপর আমার চাচি ফাতিমাও কাঁদতে শুরু দিলে নবিজি বলেন,

تَبْكِينَ أَوْ لا تَبْكِينَ مَا زَالَتِ المَلائِكَةُ تُظِلُّهُ بِأَجْنِحَتِهَا حَتَّى رَفَعْتُمُوهُ

'তোমরা কাঁদো আর না-কাঁদো সেটা বিষয় না, ফেরেশতারা তার আত্মা নিয়ে ঊর্ধ্বে আরোহণের আগ পর্যন্ত তাকে নিজেদের ডানা দিয়ে ছায়া দেবে।'"[১২৪]

ইবনু আব্বাস বর্ণনা করেন: “যখন নবিজি -এর কন্যা রুকাইয়্যা মারা গেলে মহিলারা কান্না জুড়ে দেন, আর উমার তাদের থামাতে বেত্রাঘাত শুরু করেন। নবিজি তাকে বলেন,

دعهن يا عمر يبكين وإياكن ونعيق الشيطان ثم قال انه مهما كان من العين ومن القلب فمن الله ومن الرحمة وما كان من اليد ومن اللسان فمن الشيطان

'হে উমার, তাদের একা ছেড়ে দাও এবং তাদের কাঁদতে দাও।' আর মহিলাদের বলেন, 'তোমরা শয়তানী কান্না থেকে বিরত থেকো। এ বিষয়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। চোখ ও হৃদয় থেকে যা উৎসারিত হয়, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে হয় এবং রহমত থেকে হয়। কিন্তু যা হাত ও মুখ থেকে (উৎসারিত হয়), তা শয়তানের পক্ষ থেকে আসে।'"[১২৫]

বেশ কিছু সহীহ হাদীসে উল্লেখ রয়েছে: প্রিয়জনের মৃত্যুতে রাসূল নিজে অশ্রু বিসর্জন করেছেন। রাসূল তাঁর মায়ের কবর জিয়ারত করতে গিয়ে কেঁদেছেন, যা অন্যদেরও কাঁদিয়েছিল। উহুদ যুদ্ধের শহীদ উসমান ইবনে মাদউনকে কবরস্থ করার সময় রাসূল তাকে চুমু দেন এবং উসমানের মুখে রাসূল-এর অশ্রু ঝরে পড়ে। মু'তার ময়দানে রোমান বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জাফর এবং তার সাথিদের মৃত্যুর সংবাদ দেওয়া হলে তাঁর চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।

অন্য একটি বিশুদ্ধ বর্ণনায় হযরত আবূ বাকর রাসূল -এর মৃত্যুর পর তাঁকে চুমু খাওয়ার সময় কীভাবে কান্নাকাটি করেছেন তার বিবরণ পাওয়া যায়। সুতরাং যে হাদীসে কান্না করতে বারণ করা হয়েছে, সেখানে কান্নাকে 'বিলাপ' এবং 'মাতম'-এর অর্থে গ্রহণ করতে হবে।

টিকাঃ
১২৩. আল উম্ম, মুহাম্মাদ বিন ইদ্রিস আশ শাফিঈ ১/২৭৯; রাউদাতুত তালিবীন: ২/১৪৫
১২৪. আস-সহীহ, বুখারি: ১২৪৪; আস-সহীহ, মুসলিম: ২৪৭১
১২৫. আল মুসনাদ, আহমাদ: ২০৪৮; শাইখ আহমাদ শাকির -এর মতে সনদ সহীহ, তাঁর তাহকিককৃত মুসনাদু আহমাদ: ৫/৪১; আল জামিউস সগীর, সুয়ুতি: ৪২০১, সনদ সহীহ

📘 সবর ও শোকর > 📄 ধৈর্য ঈমানের অর্ধেক

📄 ধৈর্য ঈমানের অর্ধেক


ঈমানের অর্ধেক ধৈর্য এবং বাকি অর্ধেক কৃতজ্ঞতা। এই কারণে আল্লাহ তাআলা ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা পাশাপাশি বর্ণনা করেছেন:

إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِكُلِّ صَبَّارٍ شَكُورٍ

"... নিশ্চয় এতে প্রত্যেক ধৈর্যশীল কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য রয়েছে অসংখ্য নিদর্শন।"[১২৬]

ধৈর্য ঈমানের অর্ধেক এবং কৃতজ্ঞতা বাকি অর্ধেক হওয়ার তাৎপর্য কী, সে বিষয়ে নিচে আলোচনা করা হলো:

১. কথা, কাজ এবং ইচ্ছের সম্মিলিত রূপকে ঈমান বলা হয়। এর ভিত্তি দুটো বিষয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত—কর্মসম্পাদন করা বা কর্মসম্পাদন থেকে বিরত থাকা। কর্মসম্পাদন বলতে বোঝায় আল্লাহর নির্দেশসমূহ মেনে চলা, যা কৃতজ্ঞতার বাস্তব প্রকাশ। কর্মসম্পাদন থেকে বিরত থাকার মানে আল্লাহ যেসব কাজ নিষেধ করেছেন সেসব কাজ না করা, এ জন্য ধৈর্যের প্রয়োজন। সমগ্র ধর্মের ভিত্তিই এই দুটি বিষয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত—আল্লাহ যা আদেশ করেছেন তা মেনে চলা, এবং যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা।

২. ঈমানের স্তম্ভ দুইটি—বিশ্বাস ও ধৈর্য, যা নিচের আয়াটিতে বর্ণিত হয়েছে:

وَجَعَلْنَا مِنْهُمْ أَبِيَّةٌ يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا لَمَّا صَبَرُوا وَكَانُوا بِآيَاتِنَا يُوقِنُونَ

"আর আমি তাদের মধ্য হতে নেতা মনোনীত করেছিলাম, যারা আমার নির্দেশ মুতাবেক সৎপথ প্রদর্শন করত, যতদিন তারা ধৈর্য অবলম্বন করেছিল আর আমার আয়াতসমূহের ওপর দৃঢ় বিশ্বাসী ছিল।"[১২৭]

বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে আমরা আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ সম্পর্কে বা পুরস্কার ও শাস্তি সম্পর্কে জানতে পারি এবং ধৈর্যের মধ্য দিয়ে আল্লাহর আদেশ পালন করতে পারি; আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকতে পারি। সুতরাং এটা পরিষ্কার যে ঈমানের অর্ধেক হলো ধৈর্য, আর অর্ধেক কৃতজ্ঞতা।

৩. মানুষমাত্রই দুটি শক্তির অধিকারী। কোনোকিছু করার শক্তি এবং বিরত থাকার শক্তি—যা তার সকল আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে। এ কারণে মানুষ যা পছন্দ করে তা করে এবং যা অপছন্দ করে তা থেকে বিরত থাকে। ধর্মের সামগ্রিক কাঠামোর ভিত দাঁড়িয়ে আছে করা আর না-করার ওপর। আল্লাহ যা করতে বলেছেন তা করা এবং যা নিষেধ করেছেন তা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। করা বা বিরত থাকা কোনোটাই সম্ভব নয় ধৈর্যের অন্তর্নিহিত শক্তি ছাড়া।

৪. আশা ও ভয় হচ্ছে গোটা ধর্মের সারবস্তু। মুমিন আশায় বুক বাঁধে আবার ভয়ে কম্পমান থাকে। আল্লাহ বলেন:

.... وَيَدْعُونَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا وَكَانُوا لَنَا خَاشِعِينَ )

"তারা আমাকে ডাকত আশা নিয়ে ও ভীত হয়ে, আর তারা ছিল আমার প্রতি বিনয়ী। "[১২৮]

নবিজি আল্লাহর কাছে দুআ করতেন:

اللهم اني أسلمت نفسى اليك ووجهت وجهي اليك وفوضت امرى اليك وألجأت ظهرى اليك رغبة ورهبة اليك

"হে আল্লাহ, আমি নিজেকে আপনার কাছে সঁপে দিলাম। আমার যাবতীয় বিষয় আপনার কাছেই সোপর্দ করলাম, আমার চেহারা আপনার দিকেই ফিরালাম, আর আমার পৃষ্ঠদেশ আপনার দিকেই ন্যস্ত করলাম—আপনাত প্রতি অনুরাগী হয়ে এবং আপনার ভয়ে ভীত হয়ে। "[১২৯]

সুতরাং মুমিন বান্দা একই সাথে আশাবাদী এবং ভীতসন্ত্রস্ত, কিন্তু আশা এবং ভয়ের উৎস হবে কেবল ধৈর্য। ভয় মানুষকে সহনশীল হতে শেখায় এবং আশা মানুষকে কৃতজ্ঞ হতে উৎসাহ যোগায়।

৫. আমাদের প্রতিটি কাজের দ্বারাই দুনিয়া-আখেরাতের কল্যাণ-অকল্যাণ নির্ধারিত হয়; অথবা শুধু দুনিয়াতে কল্যাণ বয়ে আনে অথচ আখেরাতে তা অকল্যাণকর। কিন্তু আমাদের যথার্থ সিদ্ধান্ত হবে আখেরাতের জন্য যা ভালো, তা করা। আখেরাতের জন্য যা মন্দ, সর্বোতভাবে তা পরিহার করা। আর এটাই হচ্ছে ঈমানের স্বরূপ: নিজের কল্যাণের জন্য ভালো কাজ করা হচ্ছে কৃতজ্ঞতা এবং অকল্যাণ থেকে বাঁচতে মন্দ কাজ হতে বিরত থাকাটাই ধৈর্য।

৬. একজন মুমিন হিসেবে আপনার কাজ হচ্ছে আল্লাহর আদেশ মান্য করা, তিনি যা নিষেধ করেছেন তা পরিহার করা এবং তাকদীরের ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকা। সব রকমের পরিস্থিতিতেই আপনাকে ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতার সাথে মোকাবিলা করতে হবে। আল্লাহর আদেশসমূহ পালন করা হচ্ছে আপনার কৃতজ্ঞতা এবং নিষিদ্ধ জিনিসগুলো থেকে বিরত থাকা ও তাকদীর মেনে নেওয়া হচ্ছে আপনার ধৈর্যশীলতা।

৭. মানুষ প্রতিনিয়ত পরস্পর বিপরীতমুখী দুটো টানাপড়েনের মধ্যে থাকে— একদিকে পার্থিব জীবনের ভোগবিলাস ও কামনা-বাসনার টোপ, অন্যদিকে পরকালে আল্লাহর বন্ধুদের জন্য নির্ধারিত চিরস্থায়ী সুখ-শান্তির জান্নাতের দিকে তাঁর হাতছানিতে সাড়া দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা। কামনা-বাসনা ও প্রবৃত্তি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া হলো ধৈর্যশীলতা এবং আল্লাহ ও আখেরাতের ডাকে সাড়া দেওয়া হলো কৃতজ্ঞতা।

৮. ইসলাম দুটো মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত: সংকল্প এবং অধ্যবসায় (ধৈর্য)। নবিজি -এর একটি হাদীসে এর উল্লেখ পাওয়া যায়:

اللهم إني أسألك الثبات في الأمر والعزيمة على الرشد

“হে আল্লাহ, আমার সকল কাজে তোমার কাছে দৃঢ়তা প্রত্যাশা করি এবং সরল-সঠিক পথে টিকে থাকার সামর্থ্য কামনা করি।”[১৩০]

৯. ইসলাম সত্য এবং ধৈর্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এ প্রসঙ্গে কুরআনে এসেছে:

... وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ )

"...পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে এবং পরস্পরকে ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।"[১৩১]

প্রত্যেক মানুষের উচিত সততার সাথে কাজ করা; নিজেকে ও অন্যকে সত্য মেনে নেওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত কর। কৃতজ্ঞতার দাবি এটাই, কিন্তু ধৈর্য ছাড়া আপনি তা অর্জন করতে পারবেন না। এ কারণেই ধৈর্য হচ্ছে ঈমানের অর্ধেক।

আর আল্লাহই অধিক জানেন।

টিকাঃ
১২৬. সূরা ইবরাহীম, ১৪:৫; সূরা লুকমান, ৩১:৩১; সূরা সাবা, ৩৪:১৯; সূরা আশ-শুরা, ৪২:৩৩
১২৭. সূরা আস-সাজদাহ, ৩২:২৪
১২৮. সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:৯০
১২৯. আস-সহীহ, বুখারি: ৬৩১৩; ৭৪৮৮; আস-সহীহ, মুসলিম: ২৭১০
১৩০. আল-মুসনাদ, আহমাদ: ১৭১১৪; শাইখ শু'আইব আরনাউত্ব ৬৬ ও তাঁর সাথিদের মতে হাসান লিগাইরিহ; আল-মুসান্নাফ, ইবন আবী শাইবাহ: ২৯৩৫৮; সুনানুস সুগরা, নাসাঈ: ১৩০৪; আস-সহীহ, ইবন হিব্বান: ৯৩৫
১৩১. সূরা আল-আসর, ১০৩:৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00