📄 ইবাদাতে ধৈর্য
মানুষ হিসেবে আমাদের মধ্যে আল্লাহর ইবাদাতের ক্ষেত্রে স্বভাবজাত উদাসীনতা রয়েছে, যেমন সালাত আদায়ের ক্ষেত্রে। আমাদের জন্মগত অলসতাই এটার কারণ। যারা কঠিন মনের, অনেক পাপী, অতিমাত্রায় ভোগবিলাসী, আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন, তারা খুব কমই সালাত আদায় করে। যদিও-বা করে, তা-ও উদাসীনভাবে দ্রুততার সাথে আদায় করে।
যে-কোনো ইবাদাতের প্রতিটি পদক্ষেপে আপনার ধৈর্য দরকার। শুরুর আগে অবশ্যই আপনার নিয়ত শুধরে নিতে হবে। প্রতিটি ইবাদাতের ক্ষেত্রে আপনার ইখলাস যাচাই করে নিতে হবে এবং লৌকিকতার (রিয়া) খোলস থেকে মুক্ত রাখতে হবে নিজেকে। যখন কোনো ইবাদাতে নিজেকে শামিল করেন, তখন তা সুন্দর করার চেষ্টা করুন। নিয়তে বিশুদ্ধ থাকুন এবং কেবল আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার দিকটায় মনোযোগী হোন। কোনো ইবাদাত সম্পন্ন হলে-যেসব কিছু একে মলিন করে দেয়-তা থেকে বিরত থাকুন। আল্লাহ আমাদের বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُبْطِلُوا صَدَقَاتِكُم بِالْمَنِّ وَالْأَذَى كَالَّذِي يُنفِقُ مَالَهُ رِئَاءَ النَّاسِ وَلَا يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَمَثَلُهُ كَمَثَلِ صَفْوَانٍ عَلَيْهِ تُرَابٌ فَأَصَابَهُ وَابِلٌ فَتَرَكَهُ صَلْدًا لَّا يَقْدِرُونَ عَلَى شَيْءٍ مِّمَّا كَسَبُوا وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَافِرِينَ ۞
"হে ঈমানদারগণ, দানের কথা মনে করিয়ে দিয়ে ও কষ্ট দিয়ে তোমরা নিজেদের দান-খয়রাতকে সে ব্যক্তির মতো ব্যর্থ করে দিও না, যে নিজের ধন লোক দেখানোর জন্য ব্যয় করে থাকে; অথচ সে আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী নয়। তার তুলনা সেই মসৃণ পাথরের মতো, যাতে সামান্য কিছু মাটি আছে; অতঃপর প্রবল বৃষ্টিপাত তাকে পরিষ্কার করে ফেলে। তারা স্বীয় কৃতকর্মের ফল কিছুই পাবে না। আল্লাহ কাফিরদেরকে পথপ্রদর্শন করেন না।"[৫২]
তার উচিত নিজের ইবাদাতগুজারীর গৌরব উপলব্ধি থেকে বেরিয়ে আসা, যা অন্যান্য দৃশমান অনেক গুনাহের চেয়ে অধিক ক্ষতিকর। একইভাবে নিজেকে জাহির করার প্রবণতা থেকে মুক্ত রাখতে হবে।
টিকাঃ
৫২. সূরা আল-বাকারাহ, ২:২৬৪
📄 পাপ পরিহারে ধৈর্য
নিজেকে অন্যায় থেকে বিরত রাখার সেরা উপায় হলো সমস্ত বদ অভ্যাসগুলো ধ্বংস করা এবং পাপের দিকে আকৃষ্টকারী জিনিসগুলো পরিত্যাগ করা। মানুষের আচরণের ওপর অভ্যাসের প্রবল নিয়ন্ত্রণ-ক্ষমতা রয়েছে। এই অভ্যাস প্রবৃত্তির সহযোগী হলে শয়তানের দল ভারী হয়। তখন শয়তানের এই দুই গুন্ডার (অভ্যাস ও প্রবৃত্তি) সাথে ধর্ম ও মূল্যবোধের শক্তি লড়াইয়ে পেরে ওঠে না।
📄 প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ধৈর্য
প্রিয়জনের মৃত্যুর শোকাবহ ঘটনা, অসুস্থতা, সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি-এমন বিভিন্ন মানবিক প্রতিকূলতা মোটামুটি দু-রকমের:
১. নিয়ন্ত্রণাতীত দুর্দশা : ঝড়, ভূমিকম্প, দুর্ভিক্ষ এ-জাতীয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেগুলোর পেছনে মানুষের কোনো হাত নেই।
২. আরোপিত দুর্দশা : অন্যদের হস্তক্ষেপের ফলে সৃষ্ট আপদ। যেমন: অপবাদ, নির্যাতন, বঞ্চনা ইত্যাদি।
নিয়ন্ত্রণাতীত দুর্দশায় আমাদের প্রতিক্রিয়ার ধরনগুলো যেরূপ হতে পারে :
১. অসহায়ত্ববোধ, অসন্তোষ, আতঙ্ক এবং অভিযোগ।
২. ধৈর্য প্রদর্শন-তা হতে পারে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কিংবা মানবীয় গুণ হিসেবে।
৩. স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়া এবং এ অবস্থায় সন্তুষ্ট থাকা। প্রকৃতপক্ষে এটা ধৈর্য থেকেও উচ্চতর অবস্থা।
৪. খুশিমনে ও কৃতজ্ঞচিত্তে পরিস্থিতি গ্রহণ করা। এটা সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করে নেওয়ার চেয়েও সমুন্নত অবস্থা; কারণ, এ ক্ষেত্রে সংকটকে অনুগ্রহ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং এই পরিস্থিতে নিপতিত হওয়ার জন্য আল্লাহকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।
অন্যদের আরোপিত দুর্দশায় আমাদের প্রতিক্রিয়ার ধরনগুলো কীরূপ হতে পারে:
১. ভুলে যাওয়া এবং ক্ষমা করে দেওয়ার ইচ্ছে করা।
২. প্রতিশোধ না নেবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
৩. তাকদীরের লিখন হিসেবে মেনে নেওয়া। যখন এটা বোঝা যায়, যে ব্যক্তি এই ক্ষতিটা করেছে সে জালিম হলেও, যে মহান সত্ত্বা এই তাকদির লিখেছিলেন তিনি তো জালিম নন। এ রকমের ক্ষতির শিকার হওয়া অনেকটা গরম বা শীতে কষ্ট পোহানোর মতো। এই আপদের সংঘটনকে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, আর গরম ও শীতকে অভিযোগ দেওয়া তো প্রলাপের নামান্তর। যা-কিছু ঘটে তাকদীর অনুযায়ী ঘটে, যদিও তা ঘটার বহু পথ ও উপায় থাকে।
৪. অন্যায় আচরণকারীর সাথে ভালো ব্যবহার করা। এরকম মনোভাবের অনেক উপকার ও কল্যাণ রয়েছে, যা সম্পর্কে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ পুরোপুরি জানে না।
📄 আয়ত্তের বাইরে চলে যাওয়া বিপদে ধৈর্য
যেমন ভালোবাসার ক্ষেত্রে ঘটে থাকে, এর শুরুটা নিজের ইচ্ছের মাধ্যমে হলেও পরবর্তী সময়ে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে যায় বলয়ের বাইরে। অনেকে নিজেই নিজেকে অসুস্থতা ও ব্যথার কারণের হাতে সোপর্দ করে (যেমন: যারা ধূমপান করে বা মদ্যপান করে, এরা নিজেরাই অকল্যাণের পথে চলা শুরু করে) কিন্তু এর পরে এর ফলাফলকে প্রতিরোধ করা আর সম্ভব হয় না। আর অধিক পরিমাণে মাদক গ্রহণ করার পর মাতলামো ছেড়ে দেওয়া সম্ভব হয় না। এ ধরনের আপদের ক্ষেত্রে আমাদের উচিত, শুরুতেই ধৈর্যধারণ করা এবং এসব থেকে বিরত থাকা।