📘 সবর ও শোকর 📄 সুখের চেয়ে দুঃখের সময়ে ধৈর্যধারণ সহজ

📄 সুখের চেয়ে দুঃখের সময়ে ধৈর্যধারণ সহজ


একজন সালাফ বলেন, “মুমিন ও কাফির উভয়েই বিপদ-আপদের সময় ধৈর্যধারণ করতে পারে, কিন্তু সুস্থতা বা নিরাপত্তার সময় ধৈর্যধারণ করতে পারে একমাত্র সাদিকীনরা।" আব্দুর রহমান বিন আওফ বলেছেন, "আমাদের যখন দুর্ভাগ্য দ্বারা পরীক্ষা করা হলো, তখন আমরা সবর করলাম। কিন্তু যখন সুখ-সমৃদ্ধি দ্বারা পরীক্ষা করা হলো, তখন সবর করতে ব্যর্থ হলাম।”

আল্লাহ সন্তান, সম্পদ ও স্ত্রীর ফিতনা থেকে সতর্ক করে বলেন :

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُلْهِكُمْ أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ...

"হে মুমিনগণ, তোমাদের ধন-সম্পদ আর তোমাদের সন্তানাদি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ হতে গাফিল করে না দেয়।"[৪৬]

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ وَأَوْلَادَكُمْ عَدُوًّا لَكُمْ فَاحْذَرُوهُمْ...

"হে মুমিনগণ, তোমাদের স্ত্রী আর সন্তানদের মধ্যে কতক তোমাদের শত্রু। কাজেই তোমরা তাদের হতে সতর্ক হও।"[৪৭]

যে শত্রুতা ঘৃণা ও সংঘর্ষ থেকে সৃষ্ট, আয়াতটিতে সে রকম শত্রুতার কথা বলা হয়নি। বরং এখানে স্নেহ-মমতার কথা বলা হয়েছে, যা অনেকে সময় বাবা-মা'কে বিরত রাখে হিজরত, জিহাদ, জ্ঞানের অনুসন্ধান এবং দান-সাদাকার মতো দ্বীনী কাজগুলো থেকে।

ইমাম তিরমিযি ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন : "একবার এক ব্যক্তি তাঁকে উল্লিখিত আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিল। ইবনু আব্বাস তাকে বলেন, মক্কার কিছু লোক ইসলাম গ্রহণ করে, কিন্তু যখন তারা নবিজি -এর সাথে মিলিত হওয়ার উদ্দেশ্যে মদিনায় হিজরত করতে চায়, তখন তাদের স্ত্রী ও সন্তানরা তাতে বাধা দেয়। পরবর্তী সময়ে, তারা যখন মদীনায় হিজরত করে দেখল অন্যরা ইতিমধ্যে দ্বীনের তাফাক্কুহ (গভীর জ্ঞান) অর্জন করে ফেলেছে তখন তারা নিজেদের স্ত্রী ও সন্তানদের শাস্তি দিতে চাইল। এ সময় আল্লাহ তাআলা আলোচ্য আয়াতটি নাজিল করেন : "তোমাদের সম্পদ ও তোমাদের সন্তান-সন্ততি তো পরীক্ষা-বিশেষ। সূরা আত-তাগাবুন ৬৪:১৪।”[৪৮]

إِنَّ الْوَلَدَ مَبْخَلَةٌ مَجْبَنَةٌ

“নিশ্চয় সন্তান কার্পণ্য ও কাপুরুষতার কারণ”[৪৯]

এই হাদীস থেকে বোঝা যায় স্ত্রী ও সন্তান, মানুষের সাফল্য ও পূর্ণতার পথে কত বড় প্রতিবন্ধক। একদিন নবি খুতবা দিচ্ছিলেন। তখন হাসান ও হুসাইন সেখানে লাল জামা পরিহিত অবস্থায় আসলেন। তাঁরা হোঁচট খেতে খেতে হাঁটছিলেন। ফলে রাসূলুল্লাহ মিম্বার থেকে নেমে এসে তাদের কোলে তুলে নিলেন এবং নিজের সামনে এনে রাখলেন। অতঃপর বললেন, "মহান আল্লাহ সত্য আল্লাহ বলেছেন:

أَنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ

"নিশ্চয় তোমাদের সম্পদ ও সন্তান তোমাদের জন্য ফিতনা।"[৫০]

আমি এই দুটো বাচ্চাকে হোঁচট খেতে খেতে হাঁটতে দেখে আর ধৈর্য ধরতে পারিনি, এমনকি আমি আমার কথা বন্ধ করে তাদের উঠিয়ে নিয়েছি।"[৫১] রাসূল এমনটা করেছেন কারণ, তিনি শিশুদের ভালোবাসতেন এবং উম্মাহর জন্য শিশুদের প্রতি দয়া ও কোমলতার নজির সৃষ্টি করলেন।

সুসময়ে ধৈর্যধারণ অধিকতর কঠিন। কারণ, তখন আমরা কেমন আচরণ করব তার অনেকগুলো বিকল্প থাকে। কোনো ক্ষুধার্ত ব্যক্তির যখন ক্ষুধা মেটানোর খাবার না থাকে তার জন্য ধৈর্যধারণ করা তুলনামূলক সহজ; কারণ, তার ধৈর্য ধরা ছাড়া তো তার কোনো উপায় নেই। কিন্তু খাবারের ব্যবস্থা হওয়ার সাথে সাথে তার ধৈর্যশক্তি নিস্তেজ হতে থাকে (কারণ, এখন তার বিকল্প আছে)। একইভাবে যেখানে নারীর উপস্থিতি নেই, সেখানে যৌন সংযম অধিকতর সহজ।

টিকাঃ
৪৬. সূরা আল-মুনাফিকূন, ৬৩:৯
৪৭. সূরা আত-তাগাবুন, ৬৪:১৪
৪৮. আস-সুনান, তিরমিযি, হাদীস: ৩৩১৭, হাসান সহীহ।
৪৯. আল মুসনাদ, আহমাদ ইবন হাম্বাল: ১৭৫৬২, শাইখ শুআইব আরনাউত্ব ও তাঁর সঙ্গীদের মতে সনদ দ্বইফ; আল মুসান্নাফ, ইবন আবী শাইবা, হা: ৩২১৮০; আস-সুনান, ইবন মাজাহ: ৩৬৬৬, বৃসিরি ও শাইখ আলবানি -এর মতে সহীহ।
৫০. সূরা আল-আনফাল, ৮:২৮
৫۱. আল মুসনাদ, আহমাদ: ২২৯৯৬; শাইখ শু'আইব আরনাউত্ব ও তাঁর সঙ্গীদের মতে এর সনদ শক্তিশালী; আস সুনান, তিরমিযি: ৩৭৭৪, তাঁর মতে হাসান গারীব; আস সহীহ, ইবন হিব্বান: ৬০৩৯

📘 সবর ও শোকর 📄 ইবাদাতে ধৈর্য

📄 ইবাদাতে ধৈর্য


মানুষ হিসেবে আমাদের মধ্যে আল্লাহর ইবাদাতের ক্ষেত্রে স্বভাবজাত উদাসীনতা রয়েছে, যেমন সালাত আদায়ের ক্ষেত্রে। আমাদের জন্মগত অলসতাই এটার কারণ। যারা কঠিন মনের, অনেক পাপী, অতিমাত্রায় ভোগবিলাসী, আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন, তারা খুব কমই সালাত আদায় করে। যদিও-বা করে, তা-ও উদাসীনভাবে দ্রুততার সাথে আদায় করে।

যে-কোনো ইবাদাতের প্রতিটি পদক্ষেপে আপনার ধৈর্য দরকার। শুরুর আগে অবশ্যই আপনার নিয়ত শুধরে নিতে হবে। প্রতিটি ইবাদাতের ক্ষেত্রে আপনার ইখলাস যাচাই করে নিতে হবে এবং লৌকিকতার (রিয়া) খোলস থেকে মুক্ত রাখতে হবে নিজেকে। যখন কোনো ইবাদাতে নিজেকে শামিল করেন, তখন তা সুন্দর করার চেষ্টা করুন। নিয়তে বিশুদ্ধ থাকুন এবং কেবল আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার দিকটায় মনোযোগী হোন। কোনো ইবাদাত সম্পন্ন হলে-যেসব কিছু একে মলিন করে দেয়-তা থেকে বিরত থাকুন। আল্লাহ আমাদের বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُبْطِلُوا صَدَقَاتِكُم بِالْمَنِّ وَالْأَذَى كَالَّذِي يُنفِقُ مَالَهُ رِئَاءَ النَّاسِ وَلَا يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَمَثَلُهُ كَمَثَلِ صَفْوَانٍ عَلَيْهِ تُرَابٌ فَأَصَابَهُ وَابِلٌ فَتَرَكَهُ صَلْدًا لَّا يَقْدِرُونَ عَلَى شَيْءٍ مِّمَّا كَسَبُوا وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَافِرِينَ ۞

"হে ঈমানদারগণ, দানের কথা মনে করিয়ে দিয়ে ও কষ্ট দিয়ে তোমরা নিজেদের দান-খয়রাতকে সে ব্যক্তির মতো ব্যর্থ করে দিও না, যে নিজের ধন লোক দেখানোর জন্য ব্যয় করে থাকে; অথচ সে আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী নয়। তার তুলনা সেই মসৃণ পাথরের মতো, যাতে সামান্য কিছু মাটি আছে; অতঃপর প্রবল বৃষ্টিপাত তাকে পরিষ্কার করে ফেলে। তারা স্বীয় কৃতকর্মের ফল কিছুই পাবে না। আল্লাহ কাফিরদেরকে পথপ্রদর্শন করেন না।"[৫২]

তার উচিত নিজের ইবাদাতগুজারীর গৌরব উপলব্ধি থেকে বেরিয়ে আসা, যা অন্যান্য দৃশমান অনেক গুনাহের চেয়ে অধিক ক্ষতিকর। একইভাবে নিজেকে জাহির করার প্রবণতা থেকে মুক্ত রাখতে হবে।

টিকাঃ
৫২. সূরা আল-বাকারাহ, ২:২৬৪

📘 সবর ও শোকর 📄 পাপ পরিহারে ধৈর্য

📄 পাপ পরিহারে ধৈর্য


নিজেকে অন্যায় থেকে বিরত রাখার সেরা উপায় হলো সমস্ত বদ অভ্যাসগুলো ধ্বংস করা এবং পাপের দিকে আকৃষ্টকারী জিনিসগুলো পরিত্যাগ করা। মানুষের আচরণের ওপর অভ্যাসের প্রবল নিয়ন্ত্রণ-ক্ষমতা রয়েছে। এই অভ্যাস প্রবৃত্তির সহযোগী হলে শয়তানের দল ভারী হয়। তখন শয়তানের এই দুই গুন্ডার (অভ্যাস ও প্রবৃত্তি) সাথে ধর্ম ও মূল্যবোধের শক্তি লড়াইয়ে পেরে ওঠে না।

📘 সবর ও শোকর 📄 প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ধৈর্য

📄 প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ধৈর্য


প্রিয়জনের মৃত্যুর শোকাবহ ঘটনা, অসুস্থতা, সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি-এমন বিভিন্ন মানবিক প্রতিকূলতা মোটামুটি দু-রকমের:

১. নিয়ন্ত্রণাতীত দুর্দশা : ঝড়, ভূমিকম্প, দুর্ভিক্ষ এ-জাতীয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেগুলোর পেছনে মানুষের কোনো হাত নেই।
২. আরোপিত দুর্দশা : অন্যদের হস্তক্ষেপের ফলে সৃষ্ট আপদ। যেমন: অপবাদ, নির্যাতন, বঞ্চনা ইত্যাদি।

নিয়ন্ত্রণাতীত দুর্দশায় আমাদের প্রতিক্রিয়ার ধরনগুলো যেরূপ হতে পারে :

১. অসহায়ত্ববোধ, অসন্তোষ, আতঙ্ক এবং অভিযোগ।
২. ধৈর্য প্রদর্শন-তা হতে পারে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কিংবা মানবীয় গুণ হিসেবে।
৩. স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়া এবং এ অবস্থায় সন্তুষ্ট থাকা। প্রকৃতপক্ষে এটা ধৈর্য থেকেও উচ্চতর অবস্থা।
৪. খুশিমনে ও কৃতজ্ঞচিত্তে পরিস্থিতি গ্রহণ করা। এটা সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করে নেওয়ার চেয়েও সমুন্নত অবস্থা; কারণ, এ ক্ষেত্রে সংকটকে অনুগ্রহ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং এই পরিস্থিতে নিপতিত হওয়ার জন্য আল্লাহকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।

অন্যদের আরোপিত দুর্দশায় আমাদের প্রতিক্রিয়ার ধরনগুলো কীরূপ হতে পারে:

১. ভুলে যাওয়া এবং ক্ষমা করে দেওয়ার ইচ্ছে করা।
২. প্রতিশোধ না নেবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
৩. তাকদীরের লিখন হিসেবে মেনে নেওয়া। যখন এটা বোঝা যায়, যে ব্যক্তি এই ক্ষতিটা করেছে সে জালিম হলেও, যে মহান সত্ত্বা এই তাকদির লিখেছিলেন তিনি তো জালিম নন। এ রকমের ক্ষতির শিকার হওয়া অনেকটা গরম বা শীতে কষ্ট পোহানোর মতো। এই আপদের সংঘটনকে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, আর গরম ও শীতকে অভিযোগ দেওয়া তো প্রলাপের নামান্তর। যা-কিছু ঘটে তাকদীর অনুযায়ী ঘটে, যদিও তা ঘটার বহু পথ ও উপায় থাকে।
৪. অন্যায় আচরণকারীর সাথে ভালো ব্যবহার করা। এরকম মনোভাবের অনেক উপকার ও কল্যাণ রয়েছে, যা সম্পর্কে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ পুরোপুরি জানে না।

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية