📘 সবর ও শোকর > 📄 মানবজীবনে ধৈর্যের অপরিহার্যতা

📄 মানবজীবনে ধৈর্যের অপরিহার্যতা


জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আমাদেরকে আল্লাহর কোনো-না-কোনো আদেশ পালন করতে হয়, না-হয় আল্লাহর কোনো-না-কোনো নিষেধ মেনে চলতে হয়, অথবা কখনো আল্লাহর নির্ধারিত অপ্রসন্ন ভাগ্য মেনে নিতে হয়, কিংবা আল্লাহপ্রদত্ত নিআমাতের শুকরিয়া জ্ঞাপন করতে হয়। উল্লিখিত প্রতিটি পরিস্থিতিতেই ধৈর্যের প্রয়োজন। আর তাই মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত মানবজীবনে ধৈর্যের কোনো বিকল্প নেই। আমাদের জীবনে অনুকূল বা প্রতিকূল যা-কিছুই ঘটুক না কেন, সর্বাবস্থাতেই ধৈর্যের প্রয়োজন।

যে ব্যক্তি সুস্বাস্থ্য-নিরাপত্তা-ক্ষমতা-সম্পদ এবং শারীরিক সকল চাহিদা পূরণে সমর্থ, তার এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, এই স্বাচ্ছন্দ্যের অবস্থা চিরকাল থাকবে না। তাকে সতর্ক থাকতে হবে, তার এই সৌভাগ্য যেন তাকে উদ্ধত, অহংকারী এবং উদাসীন করে না দেয়, যা আল্লাহর কাছে খুবই অপছন্দের। সময়, সম্পদ ও শক্তির সবটুকু দৈহিক ভোগের পেছনে ব্যয় করাটা উচিত হবে না। কারণ, অতিভোগ শেষ পর্যন্ত দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাকে যাকাত-সাদাকার মাধ্যমে আল্লাহর প্রাপ্য পরিশোধের প্রতি যত্নবান হতে হবে, অন্যথায় আল্লাহ তার সৌভাগ্য ছিনিয়ে নেবেন। অবৈধ (হারাম) পথে অর্থ ব্যয়ে সংযত থাকতে হবে এবং অপছন্দনীয় (মাকরূহ) পথে অর্থ ব্যয়ে সতর্ক হতে হবে।

এই যাবতীয় কাজের জন্য দরকার ধৈর্য; আর বিশ্বাসে শক্তিমান মুমিন (সিদ্দিকীন) ব্যতীত স্বাচ্ছন্দ্যের সময়ে অন্যদের পক্ষে ধৈর্যে অটল থাকা সম্ভব নয়।

📘 সবর ও শোকর > 📄 সুখের চেয়ে দুঃখের সময়ে ধৈর্যধারণ সহজ

📄 সুখের চেয়ে দুঃখের সময়ে ধৈর্যধারণ সহজ


একজন সালাফ বলেন, “মুমিন ও কাফির উভয়েই বিপদ-আপদের সময় ধৈর্যধারণ করতে পারে, কিন্তু সুস্থতা বা নিরাপত্তার সময় ধৈর্যধারণ করতে পারে একমাত্র সাদিকীনরা।" আব্দুর রহমান বিন আওফ বলেছেন, "আমাদের যখন দুর্ভাগ্য দ্বারা পরীক্ষা করা হলো, তখন আমরা সবর করলাম। কিন্তু যখন সুখ-সমৃদ্ধি দ্বারা পরীক্ষা করা হলো, তখন সবর করতে ব্যর্থ হলাম।”

আল্লাহ সন্তান, সম্পদ ও স্ত্রীর ফিতনা থেকে সতর্ক করে বলেন :

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُلْهِكُمْ أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ...

"হে মুমিনগণ, তোমাদের ধন-সম্পদ আর তোমাদের সন্তানাদি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ হতে গাফিল করে না দেয়।"[৪৬]

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ وَأَوْلَادَكُمْ عَدُوًّا لَكُمْ فَاحْذَرُوهُمْ...

"হে মুমিনগণ, তোমাদের স্ত্রী আর সন্তানদের মধ্যে কতক তোমাদের শত্রু। কাজেই তোমরা তাদের হতে সতর্ক হও।"[৪৭]

যে শত্রুতা ঘৃণা ও সংঘর্ষ থেকে সৃষ্ট, আয়াতটিতে সে রকম শত্রুতার কথা বলা হয়নি। বরং এখানে স্নেহ-মমতার কথা বলা হয়েছে, যা অনেকে সময় বাবা-মা'কে বিরত রাখে হিজরত, জিহাদ, জ্ঞানের অনুসন্ধান এবং দান-সাদাকার মতো দ্বীনী কাজগুলো থেকে।

ইমাম তিরমিযি ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন : "একবার এক ব্যক্তি তাঁকে উল্লিখিত আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিল। ইবনু আব্বাস তাকে বলেন, মক্কার কিছু লোক ইসলাম গ্রহণ করে, কিন্তু যখন তারা নবিজি -এর সাথে মিলিত হওয়ার উদ্দেশ্যে মদিনায় হিজরত করতে চায়, তখন তাদের স্ত্রী ও সন্তানরা তাতে বাধা দেয়। পরবর্তী সময়ে, তারা যখন মদীনায় হিজরত করে দেখল অন্যরা ইতিমধ্যে দ্বীনের তাফাক্কুহ (গভীর জ্ঞান) অর্জন করে ফেলেছে তখন তারা নিজেদের স্ত্রী ও সন্তানদের শাস্তি দিতে চাইল। এ সময় আল্লাহ তাআলা আলোচ্য আয়াতটি নাজিল করেন : "তোমাদের সম্পদ ও তোমাদের সন্তান-সন্ততি তো পরীক্ষা-বিশেষ। সূরা আত-তাগাবুন ৬৪:১৪।”[৪৮]

إِنَّ الْوَلَدَ مَبْخَلَةٌ مَجْبَنَةٌ

“নিশ্চয় সন্তান কার্পণ্য ও কাপুরুষতার কারণ”[৪৯]

এই হাদীস থেকে বোঝা যায় স্ত্রী ও সন্তান, মানুষের সাফল্য ও পূর্ণতার পথে কত বড় প্রতিবন্ধক। একদিন নবি খুতবা দিচ্ছিলেন। তখন হাসান ও হুসাইন সেখানে লাল জামা পরিহিত অবস্থায় আসলেন। তাঁরা হোঁচট খেতে খেতে হাঁটছিলেন। ফলে রাসূলুল্লাহ মিম্বার থেকে নেমে এসে তাদের কোলে তুলে নিলেন এবং নিজের সামনে এনে রাখলেন। অতঃপর বললেন, "মহান আল্লাহ সত্য আল্লাহ বলেছেন:

أَنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ

"নিশ্চয় তোমাদের সম্পদ ও সন্তান তোমাদের জন্য ফিতনা।"[৫০]

আমি এই দুটো বাচ্চাকে হোঁচট খেতে খেতে হাঁটতে দেখে আর ধৈর্য ধরতে পারিনি, এমনকি আমি আমার কথা বন্ধ করে তাদের উঠিয়ে নিয়েছি।"[৫১] রাসূল এমনটা করেছেন কারণ, তিনি শিশুদের ভালোবাসতেন এবং উম্মাহর জন্য শিশুদের প্রতি দয়া ও কোমলতার নজির সৃষ্টি করলেন।

সুসময়ে ধৈর্যধারণ অধিকতর কঠিন। কারণ, তখন আমরা কেমন আচরণ করব তার অনেকগুলো বিকল্প থাকে। কোনো ক্ষুধার্ত ব্যক্তির যখন ক্ষুধা মেটানোর খাবার না থাকে তার জন্য ধৈর্যধারণ করা তুলনামূলক সহজ; কারণ, তার ধৈর্য ধরা ছাড়া তো তার কোনো উপায় নেই। কিন্তু খাবারের ব্যবস্থা হওয়ার সাথে সাথে তার ধৈর্যশক্তি নিস্তেজ হতে থাকে (কারণ, এখন তার বিকল্প আছে)। একইভাবে যেখানে নারীর উপস্থিতি নেই, সেখানে যৌন সংযম অধিকতর সহজ।

টিকাঃ
৪৬. সূরা আল-মুনাফিকূন, ৬৩:৯
৪৭. সূরা আত-তাগাবুন, ৬৪:১৪
৪৮. আস-সুনান, তিরমিযি, হাদীস: ৩৩১৭, হাসান সহীহ।
৪৯. আল মুসনাদ, আহমাদ ইবন হাম্বাল: ১৭৫৬২, শাইখ শুআইব আরনাউত্ব ও তাঁর সঙ্গীদের মতে সনদ দ্বইফ; আল মুসান্নাফ, ইবন আবী শাইবা, হা: ৩২১৮০; আস-সুনান, ইবন মাজাহ: ৩৬৬৬, বৃসিরি ও শাইখ আলবানি -এর মতে সহীহ।
৫০. সূরা আল-আনফাল, ৮:২৮
৫۱. আল মুসনাদ, আহমাদ: ২২৯৯৬; শাইখ শু'আইব আরনাউত্ব ও তাঁর সঙ্গীদের মতে এর সনদ শক্তিশালী; আস সুনান, তিরমিযি: ৩৭৭৪, তাঁর মতে হাসান গারীব; আস সহীহ, ইবন হিব্বান: ৬০৩৯

📘 সবর ও শোকর > 📄 ইবাদাতে ধৈর্য

📄 ইবাদাতে ধৈর্য


মানুষ হিসেবে আমাদের মধ্যে আল্লাহর ইবাদাতের ক্ষেত্রে স্বভাবজাত উদাসীনতা রয়েছে, যেমন সালাত আদায়ের ক্ষেত্রে। আমাদের জন্মগত অলসতাই এটার কারণ। যারা কঠিন মনের, অনেক পাপী, অতিমাত্রায় ভোগবিলাসী, আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন, তারা খুব কমই সালাত আদায় করে। যদিও-বা করে, তা-ও উদাসীনভাবে দ্রুততার সাথে আদায় করে।

যে-কোনো ইবাদাতের প্রতিটি পদক্ষেপে আপনার ধৈর্য দরকার। শুরুর আগে অবশ্যই আপনার নিয়ত শুধরে নিতে হবে। প্রতিটি ইবাদাতের ক্ষেত্রে আপনার ইখলাস যাচাই করে নিতে হবে এবং লৌকিকতার (রিয়া) খোলস থেকে মুক্ত রাখতে হবে নিজেকে। যখন কোনো ইবাদাতে নিজেকে শামিল করেন, তখন তা সুন্দর করার চেষ্টা করুন। নিয়তে বিশুদ্ধ থাকুন এবং কেবল আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার দিকটায় মনোযোগী হোন। কোনো ইবাদাত সম্পন্ন হলে-যেসব কিছু একে মলিন করে দেয়-তা থেকে বিরত থাকুন। আল্লাহ আমাদের বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُبْطِلُوا صَدَقَاتِكُم بِالْمَنِّ وَالْأَذَى كَالَّذِي يُنفِقُ مَالَهُ رِئَاءَ النَّاسِ وَلَا يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَمَثَلُهُ كَمَثَلِ صَفْوَانٍ عَلَيْهِ تُرَابٌ فَأَصَابَهُ وَابِلٌ فَتَرَكَهُ صَلْدًا لَّا يَقْدِرُونَ عَلَى شَيْءٍ مِّمَّا كَسَبُوا وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَافِرِينَ ۞

"হে ঈমানদারগণ, দানের কথা মনে করিয়ে দিয়ে ও কষ্ট দিয়ে তোমরা নিজেদের দান-খয়রাতকে সে ব্যক্তির মতো ব্যর্থ করে দিও না, যে নিজের ধন লোক দেখানোর জন্য ব্যয় করে থাকে; অথচ সে আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী নয়। তার তুলনা সেই মসৃণ পাথরের মতো, যাতে সামান্য কিছু মাটি আছে; অতঃপর প্রবল বৃষ্টিপাত তাকে পরিষ্কার করে ফেলে। তারা স্বীয় কৃতকর্মের ফল কিছুই পাবে না। আল্লাহ কাফিরদেরকে পথপ্রদর্শন করেন না।"[৫২]

তার উচিত নিজের ইবাদাতগুজারীর গৌরব উপলব্ধি থেকে বেরিয়ে আসা, যা অন্যান্য দৃশমান অনেক গুনাহের চেয়ে অধিক ক্ষতিকর। একইভাবে নিজেকে জাহির করার প্রবণতা থেকে মুক্ত রাখতে হবে।

টিকাঃ
৫২. সূরা আল-বাকারাহ, ২:২৬৪

📘 সবর ও শোকর > 📄 পাপ পরিহারে ধৈর্য

📄 পাপ পরিহারে ধৈর্য


নিজেকে অন্যায় থেকে বিরত রাখার সেরা উপায় হলো সমস্ত বদ অভ্যাসগুলো ধ্বংস করা এবং পাপের দিকে আকৃষ্টকারী জিনিসগুলো পরিত্যাগ করা। মানুষের আচরণের ওপর অভ্যাসের প্রবল নিয়ন্ত্রণ-ক্ষমতা রয়েছে। এই অভ্যাস প্রবৃত্তির সহযোগী হলে শয়তানের দল ভারী হয়। তখন শয়তানের এই দুই গুন্ডার (অভ্যাস ও প্রবৃত্তি) সাথে ধর্ম ও মূল্যবোধের শক্তি লড়াইয়ে পেরে ওঠে না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00