📄 ধর্মীয় মূল্যবোধ শক্তিশালী করা
ধর্ম ও মূল্যবোধের সাথে কামনা-বাসনার চলমান যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার জন্য আমারা কিছু হাতিয়ার ব্যবহার করতে পারি। যেমন:
১. গুনাহের সময় আল্লাহর শক্তি ও মাহাত্ম্য সম্পর্কে সচেতন হওয়া। আল্লাহ সব দেখেন, সব শোনেন। যার অন্তরে আল্লাহর মহত্ত্ব উপস্থিত থাকবে, সে নিজেকে গুনাহে নিয়োজিত করতে পারবে না।
২. আমরা যদি দাবি করি, আমরা আল্লাহকে ভালোবাসি, তাহলে আমাদের উচিত ভালোবাসার খাতিরে তাঁর অবাধ্য না হওয়া; কারণ, যে যাকে ভালোবাসে সে তার কথা রাখে। যারা আল্লাহকে ভালোবেসে অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকে আল্লাহর চোখে তাদের মর্যাদা শ্রেষ্ঠতম স্থানে অধিষ্ঠিত; আল্লাহকে ভালোবেসে যারা তাঁর ইবাদাত করে তাদের মতোন। আল্লাহকে ভালোবেসে অন্যায় থেকে বিরত থাকা আর তাঁর শাস্তির ভয়ে অন্যায় থেকে বিরত থাকার মধ্যে অনেক পার্থক্য।
৩. আমাদের উচিত আল্লাহর নিআমাত ও দয়ার কথা ভাবা। কোনো ভদ্র ও সজ্জন কখনোই এমন কারও বিরুদ্ধাচরণ করতে পারে না, যে তার প্রতি সবসময় সদয় আচরণ করেন। শুধু নীচ ও হীন ব্যক্তিদের দ্বারাই এমন কাজ করা সম্ভব। আমরা যদি আল্লাহর দয়া ও আনুকূল্যের কথা একমনে চিন্তা করি, তাহলে আমাদের বিবেক বলবে—তাঁর নির্দেশ অমান্য করা এবং অন্যায়ে জড়িয়ে যাওয়া নিতান্তই অনুচিত।
৪. আমাদের উচিত আল্লাহর ক্রোধ ও শাস্তি সম্পর্কে চিন্তা করা। যে ব্যক্তি নিরন্তর পাপকাজে ডুবে থাকবে আল্লাহ তার প্রতি ক্রোধান্বিত হবেন। দুর্বল মানুষ তো দূরের কথা, কোনো কিছুই আল্লাহর ক্রোধের সামনে দাঁড়াতে পারবে না।
৫. পাপাচারী ব্যক্তি দুনিয়া ও আখিরাতে কী হারায়, তা আমাদের ভাবা উচিত। এটুকু ভাবনাই যে যথেষ্ট—পাপী ব্যক্তি ঈমান হারায়, যে ঈমানের সামান্য অণু পরিমাণ অংশও সমগ্র জাহানের চেয়ে বেশি মূল্যবান।
কেবল একটি মুহূর্তের অনুভূতির জন্য কে চাইবে তার মূল্যবান ঈমান নষ্ট করতে? সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল ﷺ বলেছেন:
لا يزني الزاني حين يزني وهو مؤمن
"ব্যভিচারী ব্যক্তি মুমিন অবস্থায় ব্যভিচার করে না।” [৪১]
এই হাদীসটির মন্তব্যে একজন সাহাবা বলেছেন: “ঈমান তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়, এমনকি তা তার মাথার ওপরে মেঘের মতো অবশিষ্ট থাকে। যদি সে তাওবাহ করে, তাহলে তা ফিরে আসে।”
৬. শয়তানকে পরাজিত করে তার ওপর আধিপত্য ও বিজয় লাভ করার ইচ্ছে আমাদের থাকা চাই; কারণ, মানবশত্রুকে পরাজিত করার তুলনায় শয়তানকে পরাজিত করার স্বাদ, আনন্দ ও সুখ অনেক বেশি।
৭. আমাদের মনে রাখা উচিত যে, আল্লাহ তাআলা সে সমস্ত ব্যক্তিকে পুরস্কার ও প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যারা নিজেদের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং হারাম থেকে সংযত থাকে।
৮. আমাদের উচিত আল্লাহ তাআলার বিশেষ বন্ধুত্বের কথা মনে রাখা। যেমন আল্লাহ বলেন:
إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
"নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।"[৪২]
إِنَّ اللَّهَ مَعَ الَّذِينَ اتَّقُوا وَالَّذِينَ هُم تُحْسِنُونَ
"যারা তাকওয়া অবলম্বন করে আর সৎকর্মশীল, আল্লাহ তো তাদেরই সঙ্গে আছেন।"[৪৩]
... وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ
"অবশ্যই আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদের সঙ্গে আছেন।"[৪৪]
৯. আমাদের মৃত্যুর কথা সব সময় মনে রাখা উচিত-যা বিনা সতর্কতায় যে-কোনো সময় হাজির হতে পারে।
১০. বিপদ-আপদ ও সুস্থতার ব্যাপারে ভাবতে হবে। কেননা, গুনাহ ও তার ফলাফলই আসল বিপদ আর সুস্থতা হচ্ছে আল্লাহর আনুগত্য ও এর প্রতিফল। কাজেই বিপদাক্রান্ত ব্যক্তি তারাই যারা গুনাহগার, যদি-না সুস্থতা অর্জন করে, আর সুস্থ ব্যক্তি তারাই যারা আল্লাহর আনুগত্য করে যদি-না অসুস্থ হয়ে যায়। এ জন্য কোনো এক আলিম বলেছিলেন, "যদি কোনো বিপদগ্রস্ত লোককে দেখো, তাহলে তার জন্য আল্লাহর কাছে সুস্থতার দুআ করো; কেননা, বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিরা আল্লাহর অবাধ্যতা, তাঁর সাথে দূরত্ব ও গাফলতি দ্বারা পরীক্ষিত হয়।"
১১. প্রবৃত্তির সাথে যুদ্ধে করার জন্য ধর্মীয় চেতনাকে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করা উচিত। একবার যদি প্রবৃত্তিকে পরাজিত করার আনন্দ আস্বাদন করতে পারি তো আমাদের প্রত্যয় ও ইচ্ছেশক্তি বহুগুণে শক্তিশালী হবে।
১২. আমাদের উচিত আল্লাহর নিদর্শনসমূহের ভাবনায় মনকে ব্যস্ত করা। তিনি আমাদের এ ব্যাপারে চিন্তা করার জন্য উৎসাহিত করেছেন, চাই সে নিদর্শন কুরআনের ভেতরেই হোক অথবা বাইরের বিপুল বিশ্বচরাচর। প্রতিনিয়ত এ ধরনের ভাবনা আমাদের শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে আত্মরক্ষায় সাহায্য করবে। তার চেয়ে হতভাগা আর কে হতে পারে, যে আল্লাহর কালাম, তাঁর নবি ও নবি -এর সাথিদের কথা না ভেবে মনে শয়তান ও শয়তানের ধ্যানধারণাকে প্রশ্রয় দেয়?
১৩. আমাদের চিন্তা করা উচিত-পৃথিবীর জীবন কত ক্ষুদ্র। এই পৃথিবীর সমুদয় অর্জনকে সে ব্যক্তি ছাড়া কেউই বড় করে দেখবে না, যার কোনো আধ্যাত্মিক লক্ষ্য নেই, হৃদয় মৃত এবং উদাসীন। পরকালে এসব মানুষ যখন বুঝবে তার কাজগুলো কোনো উপকারে আসবে না, তখন আফসোস করবে; সে শাস্তিতে নিক্ষিপ্ত হবে। এমনকি যাদের অনেক সৎকাজের সঞ্চয় আছে তাদের মাঝেও অনুতাপের অনুভূতি জাগবে, যখন বুঝতে পারবে আরও অধিক কিছু অর্জনের ছিল।
১৪. আমাদের জানা উচিত, আল্লাহ আমাদের মৃত্যুহীন এক অনন্ত জীবনের জন্য সৃষ্টি করেছেন। এমন জীবন, যেখানে দুঃখ-দুর্দশা নেই, ভয়ভীতি নেই, দারিদ্র্য নেই, নেই কোনো অপূর্ণতা। আছে সহজ সাবলীলতা, আনন্দ উৎফুল্লতা, আছে প্রাচুর্য, আছে গৌরব। আল্লাহ আমাদের পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন আখিরাতের অনন্ত জীবনের পূর্বে পরীক্ষার্থী হিসেবে। এ জীবনে সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, মান-অপমান, ঝুঁকি ও নিরাপত্তা একসাথে মিশে আছে। অধিকাংশ মানুষ এই পৃথিবীতেই আনন্দ ও আয়েশের সন্ধান করে। অনেকেই পায় না, যারা পায় তারাও আবার বেশিদিন ভোগ করতে পারে না। নবিজি মানুষের পরকালের অনন্ত সুখের প্রাচুর্যময় জীবনের প্রতি আহ্বান করেছেন। যারা তাঁর ডাকে সারা দেবে তারা উৎকৃষ্ট জীবন লাভ করবে এ পৃথিবীতে-যে জীবন আমীর-উমারাদের জীবনের চেয়েও সমৃদ্ধ। কারণ, এ জীবনে ত্যাগেই রয়েছে সত্যিকারের ঐশ্বর্য। এটা একজন মুমিনের এমনতর সম্পদ, যে জন্য শয়তান তাকে সর্বাধিক হিংসে করে থাকে।
১৫. অন্তরকে বাতিল থেকে দূরে রাখতে হবে। মনে বাতিল ধারণা এলে তা ঝেড়ে ফেলে দিতে হবে। তা থেকে মজা লুটা যাবে না। প্রনিয়ত তা বয়ে বেড়ানো যাবে না। নয়তো তা দেউলিয়া করে ছাড়বে।
শুধু ওপরের বাস্তবতাটুকু জানাই যথেষ্ঠ নয়। লক্ষ্যে পৌঁছুনোর জন্য এবং পূর্ণতা প্রাপ্তির জন্য দরকার কঠোর পরিশ্রম। উত্তম পন্থা হচ্ছে আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণকারী অভ্যাসগুলোর শেকল ছিন্ন করা। কারণ, অভ্যাসের দাসত্বই আমাদের সাফল্যের পথে প্রধান প্রতিবন্ধক। আমাদের উচিত ফিতনার স্থান এবং প্ররোচনার পথ পরিহার করা। যেমন নবিজি বলেছেন:
مَنْ سَمِعَ بِالدَّجَّالِ فَلْيَنَا عَنْهُ
"যে কেউ দাজ্জালের কথা শুনবে, তার কাছ থেকে দূরে থাকবে।”[৪৫]
মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকার উৎকৃষ্ট উপায় হচ্ছে, মন্দ কাজে উসকে দেয় এমন-সব জিনিস থেকে দূরে থাকা।
মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য শয়তানের একটা পছন্দনীয় কৌশল হচ্ছে, মন্দের মধ্যে কিছুটা ভালো দেখিয়ে মানুষকে সেদিকে আহ্বান করা। মানুষ সেটার নিকটবর্তী হওয়ামাত্র শয়তানের ঘেরাটোপে আটকা পড়ে। কেবল বুদ্ধিমানরাই এটা পূর্ব থেকে আঁচ করতে পারে।
টিকাঃ
৪১. আস-সহীহ, বুখারি: ২৪৭৫; আস-সহীহ, মুসলিম: ১০০ (৫৭); আস-সুনান, আবু দাউদ: ৪৬৮৯
৪২. সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৩
৪৩. সূরা আন-নাহল, ১৬:১২৮
৪৪. সূরা আল-আনকাবূত, ২৯:৬৯
৪৫. আস-সুনান, আবু দাউদ, হা: ৪৩১৯; আবূ বিশর মুহাম্মাদ আদ-দাউলাবি, আল কুনিয়া ওয়াল আসমা: ৯৫৮, শাইখ আলবানি-এর মতে সহীহ।