📘 সবর ও শোকর > 📄 ধৈর্যের ভালোমন্দ

📄 ধৈর্যের ভালোমন্দ


খারাপ ধৈর্য হচ্ছে আল্লাহর ইচ্ছে ও ভালোবাসা থেকে দূরে থাকা ও তাঁর থেকে দূরে সরে যাওয়ার ধৈর্য; এটা ব্যক্তির মানবিক উৎকর্ষ সাধনে এবং জীবনের উদ্দেশ্য পূরণে বাধার সৃষ্টি করে। এটা সবচেয়ে জঘন্য এবং সবচেয়ে গুরুতর ধৈর্য; এরচেয়ে মারাত্মক কোনো ধৈর্যই থাকতে পারে না, যা মানুষকে তার সৃষ্টিকর্তা থেকে স্বেচ্ছায় দূরে থাকতে প্ররোচিত করে, এবং তাঁর থেকে এতটা দূরত্বে যাতে তার প্রাণের স্পন্দনটুকুও অবশিষ্ট থাকে না। তার চেয়ে চরম দেউলিয়া আর কে হতে পারে, যে সেসব নিআমাত থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে, যা আল্লাহ আখেরাতে তাঁর বন্ধুদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন? আল্লাহ তার বন্ধুদের জন্য সৃষ্টি করেছেন এমন কিছু, যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান কখনো শোনেনি, আজ পর্যন্ত কোনো মানুষ কখনো কল্পনাও করেনি। এ জন্য এটা সর্বাধিক বড় ত্যাগ।

যেমন একবার একব্যক্তি একজন যাহিদ (দুনিয়াবিমুখ)-কে তার পার্থিব মোহ ত্যাগের প্রশংসা করে বলেছিলেন: "আমি আপনার মতো দুনিয়াবিমুখ মানুষ কখনো দেখিনি।" দুনিয়াবিমুখ লোকটি বললেন: "আপনি আমার চেয়েও বড় ত্যাগী। আমি ত্যাগ করেছি ক্ষণস্থায়ী ও অবিশ্বস্ত দুনিয়াকে অন্যদিকে আপনি ত্যাগ করেছেন চিরস্থায়ী আখেরাত। তাহলে আমাদের মধ্যে অধিক ত্যাগী কে?"

কেউ একজন শিবলি -এর কাছে জানতে চেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন: "সবচেয়ে কঠিন ধৈর্য কী?" শিবলি বললেন: "আল্লাহর কাজে ধৈর্যধারণ করা।" লোকটি বললেন: "না।" শিবলি বললেন: "আল্লাহর জন্য ধৈর্যধারণ করা।" লোকটি এবারও বললেন: "না।" শিবলি বললেন: "আল্লাহর সাথে (তাঁর সাহায্যে) ধৈর্যধারণ করা।" লোকটি আবারও বললেন: "না।" তখন শিবলি জিজ্ঞাসা করলেন: "তাহলে কী?" লোকটি বললেন: "আল্লাহর কাছ থেকে দূরে থাকার ধৈর্য।" শিবলি এমনভাবে চিৎকার করলেন যেন তার জান বেরিয়ে যাচ্ছে।

ভালো ধৈর্য দু-রকম হতে পারে: আল্লাহর জন্য ধৈর্য এবং আল্লাহর সাহায্যে ধৈর্য। আল্লাহ বলেন:

وَاصْبِرْ لِحُكْمِ رَبِّكَ فَإِنَّكَ بِأَعْيُنِنَا

"তুমি ধৈর্য ধরে তোমার প্রতিপালকের হুকুমের অপেক্ষায় থাকো, কারণ তুমি আমার চোখের সামনেই আছ।”[৩২]

আল্লাহর সাহায্য ছাড়া আল্লাহর উদ্দেশ্যে ধৈর্যধারণ করা এক অসম্ভব ব্যাপার।

وَاصْبِرْ وَمَا صَبْرُكَ إِلَّا بِاللَّه

"আর তুমি সবর করো। তোমার সবর তো শুধু আল্লাহর তাওফিকেই।”[৩৩]

এই আয়াত থেকে বোঝা যায় আল্লাহর সাহায্য ছাড়া সহিষ্ণুতা সম্ভব নয়, আর আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার জন্য তাঁর সান্নিধ্য জরুরি, যেমনটা হাদীসে কুদসীতে বর্ণিত হয়েছে:

كُنْتُ سَمْعَهُ الَّذِي يَسْمَعُ بِهِ وَبَصَرَهُ الَّذِي يُبْصِرُ بِهِ وَيَدَهُ الَّتِي يَبْطِشُ بِهَا ورجله التي يمشي بها

"আমিই তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শোনে। আমিই তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে। আর আমিই তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে। আমিই তার পা হয়ে যাই, যা দ্বারা সে চলে।”[৩৪]

আল্লাহর সাহায্য বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী সকলে একই ভাবে পায়; উভয়েই আল্লাহর রহমত ও রিযক লাভ করে। এই হাদীস আরও অতিরিক্ত যা বর্ণনা করে, তা হচ্ছে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী বান্দা নফল ইবাদাতের মধ্য দিয়ে তার সান্নিধ্য ও ভালোবাসা অর্জন করে এমন স্তরে উন্নীত হয় যে, স্বয়ং আল্লাহ সে ব্যক্তির শ্রবণশক্তি হয়, যা দিয়ে সে শোনে; তার দৃষ্টিশক্তি হয়, যা দিয়ে সে দেখে এবং সে যা-কিছু করে। তার সাথে আল্লাহ সম্পৃক্ত থাকেন। যে ব্যক্তি এই স্তরে পৌঁছুতে পারে সে আল্লাহর উদ্দেশ্যে ধৈর্যধারণ করতে পারে, আল্লাহর রেজামন্দির জন্য যে-কোনো কষ্টক্লেש অকাতরে সহ্য করতে পারে। যে ব্যক্তি ওই স্তরে পৌঁছুতে পারবে না সে ধৈর্যেও এই উঁচু মর্যাদা অর্জন করতে পারবে না। তার ধৈর্যের মাত্রা আল্লাহর সাথে তার সান্নিধ্যের মাত্রা অনুপাতে নির্ধারিত হবে।

আল্লাহর বন্ধুরা ধৈর্যের যেই স্তরে পৌঁছুতে পারবে, তা অন্যদের জন্য সম্ভব নয়। ধৈর্যশীল ব্যক্তিরা দুনিয়া ও আখিরাত দু-জাহানেই সফল। কারণ, আল্লাহ তাদের সহায়।

إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ

"নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।”[৩৫]

টিকাঃ
৩২. সূরা আত-তুর, ৫২:৪৮
৩৩. সূরা আন-নাহল, ১৬:১২৭
৩৪. আস-সহীহ, বুখারি: ৬৫০২
৩৫. সূরা আল-বাকারাহ, ২:১৫৩

📘 সবর ও শোকর > 📄 আল্লাহর রঙ ধারণ

📄 আল্লাহর রঙ ধারণ


যে ব্যক্তি তার রবের সিফাতসমূহের মাঝে কোনো একটি সিফাতকে ভালোবাসবে, সে ওই সিফাত (তার মতো করে) অর্জন করতে সক্ষম হবে এবং আল্লাহর সাথে যুক্ত হয়ে যাবে। আল্লাহর একটি গুণ হচ্ছে 'আস-সাবূর' বা 'পরম সহিষ্ণু'। বলা হয়, আল্লাহ দাউদ-কে বলেছিলেন: "আমার গুণ ধারণ করো। আমার একটা গুণ হচ্ছে আমি 'আস সাবূর' (পরম সহিষ্ণু)। রব তাআলা তাঁর সিফাতসমূহকে ভালোবাসেন, সিফাতসমূহের চাহিদাকে ভালোবাসেন, এবং বান্দার মাঝে সেসবের প্রভাবের বহিঃপ্রকাশ ভালোবাসেন। তিনি সুন্দর, সৌন্দর্যকে ভালোবাসেন, তিনি ক্ষমাশীল তাই ক্ষমাশীল ব্যক্তিদের ভালোবাসেন, তিনি মহা সম্মানিত, তাই সম্মানিত ব্যক্তিদের ভালোবাসেন, তিনি মহাজ্ঞানী, তাই জ্ঞানী ব্যক্তিদের ভালোবাসেন, তিনি বেজোড় তাই বেজোড়ওয়ালাদের ভালোবাসেন, প্রচণ্ড শক্তিশালী তাই দুর্বল মুমিন অপেক্ষা শক্তিশালী মুমিন তাঁর নিকট অধিক প্রিয়। তিনি পরম সহিষ্ণু তাই সবরকারীদের ভালোবাসেন, তিনি শুকরিয়াকারী তাই শুকরিয়াকারীদের ভালোবাসেন।

যেহেতু তিনি তাঁর গুণাবলিসম্পন্ন মানুষকে বেশি ভালোবাসেন, তাই এই গুণগুলোর যতটুকু তারা অর্জন করছে সেই অংশ অনুযায়ী তিনি তাদের পাশে থাকবেন। এটা বিশেষ এবং এক অনন্য সম্পর্ক।

📘 সবর ও শোকর > 📄 ধৈর্য ধরা এবং আল্লাহর কাছে অভিযোগ করা পরস্পরবিরোধী নয়

📄 ধৈর্য ধরা এবং আল্লাহর কাছে অভিযোগ করা পরস্পরবিরোধী নয়


কান্নাকাটি করা এবং আল্লাহর কাছে অভিযোগ করার অর্থ এই নয় যে, তার ধৈর্য নেই। কুরআনে ইয়াকূব বলেছেন:

فَصَبر جمیل

সুতরাং পরিপূর্ণরূপে ধৈর্যধারণই উত্তম।[৩৬]

কিন্তু তার হারানো মানিক ইউসুফ -কে ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় বলেন, :

يَا أَسَفَى عَلَى يُوسُفَ

“হায়, ইউসুফের জন্য আফসোস।”[৩৭]

'সাবরুন জামিল' অর্থ কোনো বিষয়ে অন্যের কাছে অভিযোগ না করা; বরং কেবল আল্লাহর কাছেই অভিযোগ দায়ের করা। যেমনটা ইয়াকূব বলেছিলেন:

إِنَّمَا أَشْكُو بَيِّى وَحُزْنِي إِلَى اللهِ

"আমি আমার দুঃখকষ্ট কেবল আল্লাহর কাছেই নিবেদন করছি।"[৩৮]

আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূল -কে সাবরুন জামিলের নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং তিনি সে নির্দেশ অনুযায়ী দুআ করেছিলেন:

اللهم اليك أشكو ضعف قوتي وقلة حيلتي

“হে আল্লাহ, আমি আমার শক্তি ও ক্ষমতার স্বল্পতার ব্যাপারে কেবল তোমার কাছেই অভিযোগ জানাই।”[৩৯]

টিকাঃ
৩৬. সূরা ইউসূফ, ১২:৮৩
৩৭. সূরা ইউসূফ, ১২:৮৪
৩৮. সূরা ইউসূফ, ১২:৮৬
৩৯. আল মু'জামুল কাবির, তাবারানি: ১৮১; আদ দুআ: ১০৩৬; ইমাম হাইসামি বলেছেন, তাবারানির সনদের সকল রাবি সিকাহ, তবে ইবন ইসহাক মুদাল্লিস সিকাহ-মাজমাউয যাওয়াইদ: ৬/৩৫; শাইখ আলবানি -এর মতে দ্বইফ, কেননা, এই সনদের সব রাবি সিকাহ হলেই ইবন ইসহাক আন'আনা করে হাদীস বর্ণনা করেছেন-সিলসিলাতুল আহাদীসিদ দ্বঈফা: ২৯৩৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00