📄 ধৈর্যের স্তরসমূহ
ধৈর্য দু-ধরনের হতে পারে: হয় শারীরিক, না-হয় মানসিক। আর উভয় প্রকার ধৈর্য ঐচ্ছিক হতে পারে, অনৈচ্ছিকও হতে পারে। এগুলো মোট চার প্রকার :
১. ঐচ্ছিক শারীরিক ধৈর্য: যেমন: স্বেচ্ছায় কঠোর পরিশ্রম করা।
২. অনৈচ্ছিক শারীরিক ধৈর্য : যেমন: নিরুপায় অবস্থায় ধৈর্যের সাথে রোগ-শোক ও মারপিট ভোগ করা, গরম বা শীতের প্রকোপ সহ্য করা।
৩. ঐচ্ছিক মানসিক ধৈর্য : যেমন: বিবেকের বিচার বা শরীয়তের দৃষ্টিতে উভয় দিক দিয়ে অন্যায়, এমন কিছু থেকে ধৈর্য-সহকারে বিরত থাকা।
৪. অনৈচ্ছিক মানসিক ধৈর্য : যেমন: ভালোবাসার মানুষ থেকে বিচ্ছিন্নতা মেনে নেওয়া।
ওপরে যেমন বলা হয়েছে ধৈর্য দু-ধরনের: ঐচ্ছিক এবং অনৈচ্ছিক। ঐচ্ছিক ধৈর্যের মর্যাদা অনৈচ্ছিক ধৈর্যের চেয়ে উঁচু স্তরের। দ্বিতীয়টি সাধারণত সবার ক্ষেত্রেই দেখা যায়, কিন্তু প্রথমটি অর্জন করে নিতে হয়। এ কারণে আজীজের স্ত্রীর (গুনাহের প্ররোচনায় সাড়া না দিয়ে) অবাধ্য হওয়া এবং এর জন্য কারাভোগ করার সময় ইউসুফ এর যে ধৈর্য প্রদর্শন করেছিলেন, তা তার ভাইদের অন্যায় আচরণের সময় তার প্রদর্শিত ধৈর্যের চেয়ে উঁচু স্তরের ছিল। ভাইয়েরা তাকে কূপে নিক্ষেপ করেছিল, তাকে বাবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল এবং তাঁকে বিক্রি করা হয়েছিল দাস হিসেবে-এ সবকিছুর পরও ইউসুফ তাদের সাথে সুব্যবহারে ধৈর্যের অনন্য দৃষ্টান্ত রেখেছিলেন। এই উঁচু স্তরের স্বতঃস্ফূর্ত ধৈর্য হচ্ছে ইবরাহীম, মূসা, নূহ, ঈসা, সর্বশেষ নবি মুহাম্মদ -এর ধৈর্য। নবি-রাসূলগণের এই ধৈর্য ছিল মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বানের ক্ষেত্রে এবং আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে নিরন্তর জিহাদের পথে।
ওপরের চার ধরনের ধৈর্য কেবল মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। চতুষ্পদ প্রাণীদের মধ্যে কেবল দু-ধরনের ধৈর্য দেখা যায়, যাতে তাদের ইচ্ছের কোনো দখল নেই। ধৈর্যধারণে ইচ্ছের স্বাধীনতা মানুষকে প্রাণীজগৎ থেকে বিশিষ্টতা দান করেছে। এরপরেও অনেক মানুষের কেবল প্রাণীদের মতো ধৈর্যটুকুই রয়েছে, অর্থাৎ অনৈচ্ছিক ধৈর্য।
📄 জীবনের ধৈর্য
মানুষের মতো জিনেরা যেমন নিজেদের কাজের দায়ভার বহন করে, তেমনি ধৈর্যের ক্ষেত্রে তারা মানুষের মতোই। আমাদের মতো জিনেরাও আল্লাহর নির্ধারিত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ধৈর্যের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। কারও মনে প্রশ্ন জাগতে পারে : তারা কি হুবহু আমাদের মতোই দায়বদ্ধ, নাকি তাদের রয়েছে আলাদা নিয়ম?
এর উত্তর হলো: আবেগ ও অনুভূতির বিষয়গুলোতে তাঁরা আমাদের মতোই দায়বদ্ধ। আল্লাহর জন্য কাউকে ভালোবাসা অথবা ঘৃণা করা, বিশ্বাস করা ও আস্থা রাখা, বিশ্বাসীদের বন্ধু এবং অবিশ্বাসীদের শত্রু হিসেবে গ্রহণ করার ক্ষেত্রগুলোতে তারাও আমাদের মতোই দায়বদ্ধ। তবে ওযু, গোসল, হাজ্জ, হায়েজ, নেফাস, খাতনা-এ ধরনের শারীরিক ব্যাপারগুলোতে তারা আমাদের থেকে আলাদা। তাদেরকে যে বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে সৃষ্টি করা হয়েছে, সে অনুসারেই তাদের কর্তব্য নির্ধারিত হবে (এটাই স্বাভাবিক)।
📄 ফেরেশতাদের ধৈর্য
আরেকটি প্রশ্নে জাগতে পারে: ফেরেশতাদেরও কি আমাদের মতো ধৈর্য আছে?
এর উত্তর হতে পারে: ফেরেশতাদের কামনা-বাসনার কোনো পরীক্ষা নেই, যা তাদের যুক্তি এবং জ্ঞানের সাথে বিরোধ সৃষ্টি করতে পারে। তাদের জন্য আল্লাহর ইবাদাত ও আনুগত্য আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো সহজাত।
সুতরাং ফেরেশতাদের ধৈর্যের প্রয়োজন নেই। কারণ, ধৈর্যের প্রয়োজনীয়তা তো সেখানেই হয় যেখানে কারও উদ্দেশ্য, বিবেকবুদ্ধি, ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে তার কামনা-বাসনার বিরোধ বাধে। এ সত্ত্বেও ফেরেশতাদের বিশেষ ধরনের ধৈর্য থাকতে পারে, যা তাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য পূরণে যত্নবান হতে সহায়তা করে এবং তাদের বৈশিষ্ট্যের সাথে মানানসই।
📄 মানবের ধৈর্য
কারও ধৈর্য যদি তার প্রবৃত্তির চেয়ে শক্তিশালী হয়, তবে তার তুলনা হলো ফেরেশতাদের মতো। কিন্তু যদি তার প্রবৃত্তি ও খায়েশ ধৈর্যের চেয়ে প্রবল হয়, তবে সে যেন আস্ত এক শয়তান। খাদ্য, পানীয়, ও যৌনাকাঙ্ক্ষা যদি তার ধৈর্যের চেয়ে শক্তিমান হয়, তবে সে একটা প্রাণীর তুলনায় বিশেষ কিছুই নয়।
কাতাদাহ বলেন, "আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ফেরেশতাদের সৃষ্টি করেছেন বোধশক্তি দিয়ে, প্রবৃত্তি দিয়ে নয়; চতুষ্পদ জন্তুদের সৃষ্টি করেছেন প্রবৃত্তি দিয়ে, বোধশক্তি দিয়ে নয়; আর মানুষকে সৃষ্টি করেছেন বোধশক্তি ও প্রবৃত্তি উভয়টাই দিয়ে। কাজেই যার বোধশক্তি তার প্রবৃত্তির ওপর প্রাধান্য বিস্তার করবে, সে হবে ফেরেশতাদের মতো। আর যার প্রবৃত্তি তার বোধশক্তির ওপর প্রাধান্য বিস্তার করবে সে হবে পশুদের মতো।"
শৈশবে একজন মানুষের মাঝে কেবল খাদ্যের আকাঙ্ক্ষাই দেখা যায়। এ অবস্থায় তার সবর হচ্ছে চতুষ্পদ জন্তুর মতো। এ অবস্থা থেকে আরও বড় হওয়ার পূর্বে তার মাঝে ঐচ্ছিক ধৈর্য থাকে না। যখন তার মধ্যে খেলার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পায়, তখন সে দুর্বলভাবে হলেও ঐচ্ছিক ধৈর্যের জন্য প্রস্তুত হতে থাকে। যখন তার মধ্যে বিয়ের আগ্রহ সৃষ্টি হয় তখন তার ধৈর্যের শক্তিশালী প্রকাশ ঘটে। আর যখন তার মাঝে দৃঢ় বোধশক্তি প্রত্যক্ষ করা যায়, তখন সবরও খুব শক্তিশালী হয়ে ওঠে। যদি হিদায়াতের নূর তার বোধ অর্জনের প্রাথমিক বছরগুলোতে চমকাতে থাকে এবং বয়ঃপ্রাপ্তির সাথে সাথে তা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে, তবে এই দৃঢ় বোধশক্তি ও তার আনুষঙ্গিক শক্তিসমূহ প্রবৃত্তি ও তার আনুষঙ্গিক শক্তিসমূহের বিরুদ্ধে লড়াইতে কোনো অংশেই কম নয়। এ বিষয়টা ফজরের সময়ে উদিত আলোর রেখার মতো, যা দিন বাড়ার সাথে সাথে আরও উজ্জ্বল হতে থাকে।