📘 সবর ও শোকর > 📄 বিপরীত শক্তির প্রভাব

📄 বিপরীত শক্তির প্রভাব


প্রত্যেকের মনে দুটি বিপরীত শক্তি ক্রিয়াশীল থাকে: একটি হচ্ছে এগিয়ে নেবার শক্তি, অপরটি পিছিয়ে দেবার শক্তি। সবরের প্রকৃতি হচ্ছে, তা এগিয়ে নেবার শক্তিকে ব্যয় করে উপকারী জিনিস অর্জন করে, এবং পিছিয়ে দেবার শক্তিকে বিরত রাখে যাতে করে নিজের ক্ষতি না হয়।

কিছু মানুষের উপকারী কাজ করার জন্য এবং তাতে অবিচল থাকার জন্য মজবুত ধৈর্য রয়েছে। কিন্তু ক্ষতিকর বিষয়গুলো থেকে দূরে থাকার বেলায় তাদের ধৈর্য অত্যধিক নাযুক। তাই আমরা এমন লোক দেখি, ইবাদাতে যার অগাধ ধৈর্য, কিন্তু প্রবৃত্তির প্ররোচনা থেকে বিরত থাকার বেলায় তার নিজের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এ কারণে হয়তো সে হারাম কাজ করে বসে। অপরদিকে কিছু লোক আছে, যারা নিষিদ্ধ কাজগুলো থেকে বিরত থাকার বেলায় প্রবল ধৈর্যশীল, কিন্তু আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মানার ক্ষেত্রে, ইবাদাতের কাজগুলো করার ক্ষেত্রে তাদের ধৈর্যশক্তি যথেষ্ট কম। কারও কারও তো দুটোর কোনোটার বেলায়ই ধৈর্য নেই। আর এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, তারাই শ্রেষ্ঠ যাদের ব্যক্তিত্বে এই উভয় প্রকারের ধৈর্য আছে।

সুতরাং প্রচণ্ড গরম কিংবা শীতের প্রকোপ, যে অবস্থাই হোক না কেন, সারারাত সালাতে দাঁড়িয়ে থাকবার ধৈর্য কারও হয়তো আছে, কিন্তু কোনো নারীর দিকে না তাকানোর জন্য কিংবা দৃষ্টি অবনত রাখার ক্ষেত্রে তার ধৈর্য একেবারেই নেই। অন্যজনের হয়তো দৃষ্টি অবনত রাখায় সমস্যা হয় না, কিন্তু সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধে তার ধৈর্যের ঘাটতি আছে এবং কাফির-মুশরিকদের বিরুদ্ধে জিহাদে সে দুর্বল ও অসহায়। উভয় প্রকার ধৈর্যের কোনো একটা নেই এমন লোকই বেশি, আর কোনোটাই নেই এমন লোক খুব কম।

📘 সবর ও শোকর > 📄 ধৈর্যের আরও কিছু সংজ্ঞা

📄 ধৈর্যের আরও কিছু সংজ্ঞা


একজন আলিম বলেন, “ধৈর্য হচ্ছে প্রবৃত্তি ও কামনা-বাসনার বিপরীতে বোধশক্তি ও দ্বীনের প্রেরণার ওপর অটল থাকা।” মানুষের মধ্যে কামনা-বাসনার প্রতি ঝোঁক থাকাটা খুবই স্বাভাবিক একটি ব্যাপার। কিন্তু সহজাত বিবেচনাশক্তি ও ধর্মীয় প্রেরণার মাধ্যমে এই ঝোঁকের লাগাম টেনে ধরা উচিত। এই দুই পরাশক্তি পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে-কখনো বিবেক-বুদ্ধি ও ধর্মীয় মূল্যবোধ জয়ী হয় আবার কখনো প্রবৃত্তি ও কামনা-বাসনা বিজয়ী হয়। এই মারাত্মক যুদ্ধের ক্ষেত্র হচ্ছে মানুষের মন।

📘 সবর ও শোকর > 📄 পরিস্থিতি অনুযায়ী ধৈর্যের বিভিন্ন নাম রয়েছে

📄 পরিস্থিতি অনুযায়ী ধৈর্যের বিভিন্ন নাম রয়েছে


* আপনার ধৈর্য যদি যৌনকামনা রোধ করে, তবে একে বলে পবিত্রতা। এর বিপরীত হচ্ছে অশ্লীলতা, ব্যভিচার ও লাম্পট্য।
* ধৈর্য যদি আপনাকে পেটের অবৈধ কামনা ও খাবারের জন্য তাড়াহুড়ো করা কিংবা বাজে খাবার গ্রহণ থেকে বিরত রাখে, তবে তার নাম 'অভিজাত নফস'। এর বিপরীত হলো লালসা, হীনতা ও নিকৃষ্টতা।
* 'প্রকাশ করা ঠিক নয়' এমন কিছু প্রকাশ না করে চুপ থাকতে উদ্বুদ্ধ করে, তবে এটাকে বলে গোপনীয়তা। এর বিপরীত হলো জনসম্মুখে প্রচার করা, গোপনীয়তা প্রকাশ করে দেওয়া, মিথ্যা অপবাদ, কদর্যতা, গালিগালাজ, মিথ্যা ও দুর্নামকরণ。
* যদি জীবনযাপনে অতিরিক্ত খরচ না করে ধৈর্য ধরা হয়, তবে একে আত্মসংযম বলা হয়। লোভ হচ্ছে এর বিপরীত।
* যদি দুনিয়ায় অল্পে তুষ্ট হন, তাহলে একে বলা হবে অল্পেতুষ্টি। এর বিপরীতও লোভ।
* ধৈর্য যদি আপনার রাগ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হয়, তবে একে বলে সহিষ্ণুতা। হঠকারিতা এবং ত্বরিত প্রতিক্রিয়াশীলতা এর বিপরীত।
* আপনার ধৈর্য যদি আপনাকে ত্বরাপ্রবণতা থেকে বিরত রাখে, তবে একে বলে গাম্ভীর্য, স্থিরতা। এর বিপরীত হচ্ছে ত্বরাপ্রবণতা ও চপলতা।
* ধৈর্য যদি আপনাকে পালিয়ে যাওয়ার ও ছিটকে পড়ার কাপুরুষোচিত স্বভাব থেকে বিরত রাখে, তবে একে বলে সাহসিকতা। যার বিপরীত হচ্ছে কাপুরুষতা ও মাথানত করা।
* ধৈর্য যদি আপনাকে প্রতিশোধ প্রবণতা থেকে রক্ষা করে; তবে এটাকে বলা হয় ক্ষমাশীলতা ও সহনশীলতা। যার বিপরীত হচ্ছে প্রতিশোধ ও শাস্তিদান।
* যদি ধৈর্য আপনাকে কৃপণ হওয়া থেকে বাধা দেয়, তবে তা বদান্যতা। এর বিপরীত হচ্ছে কৃপণতা।
* ধৈর্য যদি আপনাকে নির্ধারিত সময়ে খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ হতে বিরত রাখে তবে এর নাম সাওম।
* যদি ধৈর্য আপনাকে অলসতা এবং অক্ষমতা থেকে দূরে রাখে, তবে একে বলে বিচক্ষণতা।
* আর আপনার ধৈর্য যদি লোকদের দোষারোপ করা থেকে আপনাকে বাঁচিয়ে রাখে, তবে একে বলে পৌরুষ।

পরিস্থিতির ভিন্নতার কারণে এর (ধৈর্যের) নাম যা-ই হোক না কেন, এর মৌলিক বৈশিষ্ট্য এক। এটা প্রমাণ করে, আমাদের ইসলামি জীবনের পূর্ণতা ধৈর্যের ওপর নির্ভরশীল।

📘 সবর ও শোকর > 📄 ধৈর্যের গুণ কি অর্জন করা যায়?

📄 ধৈর্যের গুণ কি অর্জন করা যায়?


যদি একজন লোকের মাঝে প্রাকৃতিকভাবেই ধৈর্য না থেকে থাকে, তাহলে সে যদি ধৈর্যশীলতার ভান ধরে এবং এভাবে ভান ধরে চলতে থাকে, তাহলে পরিণামে একসময় এটা প্রায় তার স্বভাবে পরিণত হবে। নবিজি-এর একটি হাদীসে আমরা এ কথার প্রমাণ পাই:

وَمَنْ يَتَصَبَّرُ يُصَبِّرْهُ اللَّهُ

"যে (নিজে) ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহ তাকে ধৈর্য দান করেন”[১৯]

সুতরাং একজন ব্যক্তি তার যৌনাকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণে এবং দৃষ্টি অবনত রাখতে প্রচেষ্টা চালাতে পারে, যতক্ষণ-না এটা তার স্বভাবে পরিণত হয়ে যায়। একইভাবে এই নীতি স্থিরতা, বদান্যতা ও সাহসের মতো অন্যান্য আকাঙ্ক্ষিত সদ্‌গুণ অর্জনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

টিকাঃ
১৯. আল মুসনাদ, আহমাদ: ১১৮৯০; আস সহীহ, বুখারি: ১৪৬৯; আস সুনান, আবু দাউদ: ১৬৪৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00