📄 ধৈর্য সম্পর্কে আলিমগণের মতামত
কতক আলিম ধৈর্যকে একটি উত্তম মানবিক গুণ অথবা নৈতিক মূল্যবোধ বলে অভিহিত করেছেন, যার সাহায্যে আমরা নিজেদের খারাপ কিছু থেকে বিরত রাখি। ধৈর্যবিনে মানুষ সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন জীবনযাপনে সক্ষম নয়।
আবু উসমান বলেন, “(ধৈর্য হচ্ছে তা) যা ব্যক্তিকে অপছন্দনীয় বিষয়সমূহের আক্রমণে অভ্যস্ত করে তোলে।” আমর ইবনু উসমান আল-মাক্কি বলেন, “ধৈর্য হচ্ছে আল্লাহর সাথে দৃঢ়ভাবে লেগে থাকা এবং তাঁর পক্ষ থেকে আগত বিপদ-আপদ নিশ্চুপভাবে শান্তমনে গ্রহণ করা।” আল-খাওয়াস বলেন, “ধৈর্য বলতে কুরআন-সুন্নাহর বিধানকে আঁকড়ে ধরা বোঝায়।” আরেকজন আলিমের মতে: “কেবল আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়াই ধৈর্য।” আর আলি ইবনু আবী তালিব বলেন, “ধৈর্য হলো পশুর পিঠে আরোহণ করার মতো, যা থেকে তুমি ছিটকে পড়বে না।”
দুঃখ-দুর্দশার সময়গুলোতে ধৈর্যশীল থাকার অবস্থা ভালো, নাকি এমন অবস্থা ভালো যাতে ধৈর্যের কোনো প্রয়োজনই পড়ে না?
আবূ মুহাম্মাদ আল-হাবিরি বলেন, “ধৈর্য হচ্ছে সুদিন ও দুর্দিনকে আলাদা করে না দেখা এবং সকল অবস্থায় সন্তুষ্ট থাকা।" আমি (ইবনু কায়্যিম) বলি, এটা খুবই কঠিন, আর এমনটা করতে আমাদের নিদের্শও দেওয়া হয়নি। আল্লাহ আমাদের এভাবেই সৃষ্টি করেছেন যে, আমরা সুসময় ও দুঃসময়ের মধ্যকার পার্থক্যটা অনুভব করতে পারি। আর বড়জোর চাপের সময় উদ্বিগ্ন হওয়া থেকে নিজেদের বিরত রাখতে পারি। ধৈর্যের মানে ভালো-মন্দ উভয় অবস্থায় একইরকম অনুভূতি নয়-এটা আমাদের আয়ত্তের বাইরে এবং তা মানবীয় প্রকৃতির মধ্যেও পড়ে না।
কঠিন অবস্থার চেয়ে স্বচ্ছন্দ অবস্থাই আমাদের জন্য ভালো। যেমনটা নবিজি তাঁর একটি প্রসিদ্ধ দুআতে বলেছেন:
إن لم يكن بك غضب على فلا أبالى غير أن عافيتك أوسع لى
"আপনি যদি আমার প্রতি ক্ষুব্ধ না হন, তাহলে আমি আর কোনো কিছুর পরোয়া করি না। তবে আপনার দেওয়া সুস্থতা ও সুখ-শান্তি আমি চাই।”[১২]
এটা সেই হাদীসের বক্তব্যের সাথে সাংঘর্ষিক নয়, যেখানে বলা হয়েছে:
وَمَا أُعْطِيَ أَحَدٌ عَطَاءً خَيْرًا وَأَوْسَعَ مِنَ الصَّبْرِ
"কাউকে ধৈর্যের চেয়ে উত্তম ও ব্যাপকতর কিছু দেওয়া হয়নি।”[১৩]
কারণ এর থেকে বোঝা যায়, আমাদের ধৈর্যশীলতার পরিচয় মেলে দুর্দশায় পতিত হওয়ার পর। কিন্তু সহজতাই শ্রেয়।[১৪]
টিকাঃ
১২. হাদীসটি মশহুর বা প্রসিদ্ধ, তবে অন্যান্য মতনে إن لم يكن بك غضب এর বদলে إن لم تكن ساخطا على রয়েছে। শাইখ নাসিরুদ্দীন আলবানি এ সনদকে ঘইফ বলেছেন। ঘইফুল জামি, হাদীস : ১১৮২
১৩. আস-সহীহ, বুখারি: ১৪৬৯
১৪. ধৈর্যের নাও বেয়ে ঝড়ের মধ্যে নদী পাড়ি দেওয়ার চেয়ে উপকূলের স্বাভাবিক স্বচ্ছন্দময় অবস্থাই উত্তম। (অনুবাদক)
📄 ধৈর্য এবং অভিযোগ
ধরন অনুসারে অভিযোগ দু-প্রকারের হতে পারে :
১. কেবল আল্লাহর কাছে অভিযোগ জানানো এবং এর সাথে ধৈর্যের কোনো বিরোধ নেই। কোনো কোনো নবির জীবনকাহিনি থেকে এর স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। যেমন ইয়াকূব যখন বললেন:
قَالَ إِنَّمَا أَشْكُو بَيِّي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ وَأَعْلَمُ مِنَ اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ )
"সে বলল, আমি আল্লাহর কাছেই আমার দুঃখ বেদনার অভিযোগ জানাচ্ছি। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে আমি যা জানি, তোমরা তা জানো না." [১৫]
আগে ইয়াকুব বলেছিলেন: 'সাবরুন জামীল'; এর মানে আমার জন্য ধৈর্যই অধিক শ্রেয়। আর কুরআনেও আইয়ূব সম্পর্কে বলা হচ্ছে:
وَأَيُّوبَ إِذْ نَادَى رَبَّهُ أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ )
"স্মরণ করো আইয়ুবের কথা, যখন সে তার প্রতিপালককে ডেকেছিল: (এই বলে যে) আমি দুঃখ-কষ্টে নিপতিত হয়েছি, তুমি তো দয়ালুদের সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।"[১৬]
নবিজি-এর একটি দুআয় ধৈর্যের সারকথা খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে:
اللهم أشكو إليك ضعف قوتي وقلة حيلتي
“হে আল্লাহ, আমি আমার দুর্বলতা ও সামর্থ্যের অভাবের ব্যাপারে আপনার কাছেই অভিযোগ জানাই." [১৭]
মূসা প্রার্থনা করেন:
اللهم لك الحمد واليك المشتكى وأنت المستعان وبك المستغاث وعليك التكلان ولا حول ولا قوة الا بك
“হে আল্লাহ, প্রশংসা সকল তোমার; অভিযোগ কেবল তোমার কাছে, আর একমাত্র তোমার কাছেই আমরা সাহায্য চাই, ফরিয়াদ করি; তোমার প্রতিই আমরা নির্ভর করি এবং তুমি ছাড়া অনিষ্ট দূর করার এবং কল্যাণ দেওয়ার কোনো শক্তি কারো নেই।”[১৮]
২. লোকদের কাছে অভিযোগ করে বেড়ানো—এটা কথার মাধ্যমে সরাসরি প্রকাশ পেতে পারে আবার কোনোরূপ অঙ্গভঙ্গির দ্বারাও হতে পারে—এই প্রকারের অভিযোগ ধৈর্যের সাথে অসংগতিপূর্ণ।
টিকাঃ
১৫. সূরা ইউসুফ, ১২:৮৬
১৬. সূরা আম্বিয়া, ২১:৮৩
১৭. জামিউল মাসানিদ ওয়াস সুনান, ইবন কাসীর: ৬১৯১, হাদীসটি ইমাম তাবারানির সূত্রে বর্ণিত। ইমাম তাবারানি এটি মু'জামুল কাবির-এ উদ্ধৃত করেছেন। এ ছাড়া ইমাম ইবন জারির আত তাবারি তাঁর তারিখে এবং ইমাম ইবন সা'দ তাঁর তবাকাতে উল্লেখ করেছেন। ইমাম হাইসামি বলেছেন, এর সনদে ইবন ইসহাক রয়েছেন, তিনি মুদাল্লিস ছিলেন। বাকি রাবিগণ সিকাত। মাজমাউয যাওয়াইদ: ৬/৩৫; শাইখ ইবন আব্দিল কাদির আস সাক্কাফ বলেন, মুরসালভাবে বর্ণিত, তাখরিজু আহাদীস ওয়া আসার কিতাব ফি যিলালিল কুরআন, পৃ. ১৬
১৮. মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবন তাইমিয়্যা: ১/১১২
📄 বিপরীত শক্তির প্রভাব
প্রত্যেকের মনে দুটি বিপরীত শক্তি ক্রিয়াশীল থাকে: একটি হচ্ছে এগিয়ে নেবার শক্তি, অপরটি পিছিয়ে দেবার শক্তি। সবরের প্রকৃতি হচ্ছে, তা এগিয়ে নেবার শক্তিকে ব্যয় করে উপকারী জিনিস অর্জন করে, এবং পিছিয়ে দেবার শক্তিকে বিরত রাখে যাতে করে নিজের ক্ষতি না হয়।
কিছু মানুষের উপকারী কাজ করার জন্য এবং তাতে অবিচল থাকার জন্য মজবুত ধৈর্য রয়েছে। কিন্তু ক্ষতিকর বিষয়গুলো থেকে দূরে থাকার বেলায় তাদের ধৈর্য অত্যধিক নাযুক। তাই আমরা এমন লোক দেখি, ইবাদাতে যার অগাধ ধৈর্য, কিন্তু প্রবৃত্তির প্ররোচনা থেকে বিরত থাকার বেলায় তার নিজের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এ কারণে হয়তো সে হারাম কাজ করে বসে। অপরদিকে কিছু লোক আছে, যারা নিষিদ্ধ কাজগুলো থেকে বিরত থাকার বেলায় প্রবল ধৈর্যশীল, কিন্তু আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মানার ক্ষেত্রে, ইবাদাতের কাজগুলো করার ক্ষেত্রে তাদের ধৈর্যশক্তি যথেষ্ট কম। কারও কারও তো দুটোর কোনোটার বেলায়ই ধৈর্য নেই। আর এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, তারাই শ্রেষ্ঠ যাদের ব্যক্তিত্বে এই উভয় প্রকারের ধৈর্য আছে।
সুতরাং প্রচণ্ড গরম কিংবা শীতের প্রকোপ, যে অবস্থাই হোক না কেন, সারারাত সালাতে দাঁড়িয়ে থাকবার ধৈর্য কারও হয়তো আছে, কিন্তু কোনো নারীর দিকে না তাকানোর জন্য কিংবা দৃষ্টি অবনত রাখার ক্ষেত্রে তার ধৈর্য একেবারেই নেই। অন্যজনের হয়তো দৃষ্টি অবনত রাখায় সমস্যা হয় না, কিন্তু সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধে তার ধৈর্যের ঘাটতি আছে এবং কাফির-মুশরিকদের বিরুদ্ধে জিহাদে সে দুর্বল ও অসহায়। উভয় প্রকার ধৈর্যের কোনো একটা নেই এমন লোকই বেশি, আর কোনোটাই নেই এমন লোক খুব কম।
📄 ধৈর্যের আরও কিছু সংজ্ঞা
একজন আলিম বলেন, “ধৈর্য হচ্ছে প্রবৃত্তি ও কামনা-বাসনার বিপরীতে বোধশক্তি ও দ্বীনের প্রেরণার ওপর অটল থাকা।” মানুষের মধ্যে কামনা-বাসনার প্রতি ঝোঁক থাকাটা খুবই স্বাভাবিক একটি ব্যাপার। কিন্তু সহজাত বিবেচনাশক্তি ও ধর্মীয় প্রেরণার মাধ্যমে এই ঝোঁকের লাগাম টেনে ধরা উচিত। এই দুই পরাশক্তি পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে-কখনো বিবেক-বুদ্ধি ও ধর্মীয় মূল্যবোধ জয়ী হয় আবার কখনো প্রবৃত্তি ও কামনা-বাসনা বিজয়ী হয়। এই মারাত্মক যুদ্ধের ক্ষেত্র হচ্ছে মানুষের মন।