📄 যাকাতদাতার করণীয়
ইখলাস বজায় রাখা : যে কোন আমল কবুল হওয়ার জন্য পূর্বশর্ত হচ্ছে, তার মধ্যে যথাযথ পরিমাণ ইখলাস বজায় থাকা। সুতরাং যাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে পরিপূর্ণভাবে ইখলাস থাকা বাধ্যতামূলক। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'এ থেকে (জাহান্নাম থেকে) দূরে রাখা হবে আল্লাহভীরু ব্যক্তিদেরকে, যে আত্মশুদ্ধির জন্য তার ধনসম্পদ হতে দান করে। অতঃপর তার উপর মহান পালনকর্তার সন্তুষ্টি ব্যতীত অন্য কোন প্রতিদানযোগ্য অনুগ্রহ থাকে না।' (সূরা লায়ল: ১৭-২০)
আর হাদীসে এসেছে, উমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, নিশ্চয় সকল আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল। অতএব, যাকাত আদায়কারীকেও অবশ্যই ইখলাসের দিকে মনোযোগী হতে হবে, যাতে কোনভাবে এতে ঘাটতি না থাকে। নতুবা এটি লোক দেখানো আমল হিসেবে পরিগণিত হয়ে বড় ধরনের পাপের ভাগিদার হতে হবে।
প্রকাশ্যে যাকাত দিতে গিয়ে অহংকারী না হওয়া:
শরীয়তের একটি মূলনীতি হচ্ছে ফরয ইবাদাতসমূহ প্রকাশ্যে এবং নফল ইবাদাতসমূহ গোপনে করাই উত্তম। যেহেতু যাকাত ফরয ইবাদাতের অন্তর্ভুক্ত, সুতরাং যাকাত প্রকাশ্যে আদায় করাই উত্তম। তবে যদি রিয়ার (লোক দেখানোর) ভয় থাকে, তাহলে গোপনে আদায় করাই উত্তম। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'তোমরা যদি প্রকাশ্যে দান কর, তবে তা উত্তম। আর যদি গোপনে গরীবদেরকে দান কর, তবে তা তোমাদের জন্য আরো ভালো। আল্লাহ তোমাদের গোনাহ ক্ষমা করেন এবং তোমাদের কর্ম সম্পর্কে খবর রাখেন।' (সূরা বাকারা- ২৭১)
অতএব যদি কোন ধরনের গোনাহের ভয় অথবা বিপদের আশংকা না থাকে, তাহলে প্রকাশ্যে যাকাত আদায় করবে এবং অন্যান্য নফল সাদাকা প্রদানের ক্ষেত্রে গোপনীয়তা অবলম্বন করবে। কিন্তু এরপরও যদি তা প্রকাশ পেয়ে যায় এবং এজন্য সে দুনিয়ায় কোন পৃথক সম্মান লাভ করে থাকে, তাহলে এ ক্ষেত্রে উক্ত সম্মানটি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত বলে মনে করবে এবং এ জন্য আরো অধিক হারে শুকরিয়া আদায় করবে।
যাকাত দিয়ে খোঁটা দেয়া যাবে না:
কাউকে কোন কিছু দান করার পর খোঁটা দেয়াটা একটি মারাত্মক অন্যায়। যে ব্যক্তি এরূপ করে তার উক্ত দান সম্পূর্ণভাবে বরবাদ হয়ে যায়। এ কারণে আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'হে ঈমানদারগণ! খোঁটা এবং কষ্ট দিয়ে তোমরা তোমাদের দানকে বরবাদ করে দিও না।' (সূরা বাকারা- ২৬৪)
উপরন্তু যারা এসব কাজ করবে, আল্লাহ তা'আলা তাদের উপর খুবই রাগান্বিত হন। হাদীসে এসেছে, আবু যর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেন, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন তিন শ্রেণির লোকের সাথে কথা বলবেন না, তাদের দিকে তাকাবেন না এবং তাদেরকে পবিত্রও করবেন না; বরং তাদের জন্য রয়েছে ভয়ানক শাস্তি। বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ এ কথাটি তিনবার পাঠ করলেন। আবু যর (রাঃ) বলে উঠলেন, তারা তো ধ্বংস হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হে আল্লাহর রসূল! এরা কারা? তিনি বললেন, (১) যে ব্যক্তি পায়ের গোছার নিচে কাপড় ঝুলিয়ে চলে, (২) যে ব্যক্তি কোন কিছু দান করে খোঁটা দেয় এবং (৩) যে ব্যক্তি মিথ্যা শপথের মাধ্যমে পণ্যদ্রব্য বিক্রি করে।
অতএব, যাকাতদাতাকে অবশ্যই এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে যে, তার মুখ দিয়ে যেন এমন কোন কথা বের না হয়, যা যাকাত গ্রহণকারীর জন্য কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
নিজের প্রদানকৃত যাকাতের মাল পুনরায় ক্রয় করা যাবে না :
যাকাত আদায় করার পর উক্ত মাল পুনরায় ক্রয় করে নেয়া বৈধ নয়। হাদীসে এসেছে, উমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি আল্লাহর রাস্তায় একটি ঘোড়া দান করেছিলাম, কিন্তু যার নিকট ঘোড়াটি ছিল, সে সেটিকে অকর্মণ্য করে দিয়েছিল। আমি তা ক্রয় করতে সংকল্প করলাম। আমি ধারণা করলাম, সে তা কম মূল্যে বিক্রি করবে। তাই আমি নবী ﷺ-কে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করলে তিনি বললেন, তুমি ওটা ক্রয় করো না। তুমি যা সাদাকা করেছ তা পুনরায় গ্রহণ করো না- যদিও সে এক দিরহামের বিনিময়ে তোমাকে তা দেয়। কেননা সাদাকার মাল পুনরায় গ্রহণকারী বমি ভক্ষণকারীর মতো।
পবিত্র এবং উত্তম জিনিসের মাধ্যমে যাকাত আদায় করা:
যাকাত প্রদানের ক্ষেত্রে উত্তম জিনিস দ্বারাই যাকাত প্রদান করা উচিত। কেননা উত্তম জিনিস দান করা আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার নিদর্শন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'তোমরা কখনো যথার্থ নেকী অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমাদের প্রিয় জিনিস আল্লাহর পথে খরচ কর। আর তোমরা যা কিছুই দান কর আল্লাহ তা জানেন।' (সূরা আলে ইমরান- ৯২)
এ আয়াত নাযিল হওয়ার পর আবু তালহা (রাঃ) তার সবচেয়ে প্রিয় বাগানটি আল্লাহর রাস্তায় দান করে দেন। হাদীসে এসেছে, আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবু তালহা (রাঃ) ছিলেন মদিনায় আনসারদের মধ্যে সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। তার নিকট সবচেয়ে প্রিয় জিনিস ছিল 'বীরুহা' নামক একটি বাগান। বাগানটি মসজিদের সামনেই ছিল। রাসূলুল্লাহ ﷺ মাঝে মাঝে সেখানে যেতেন এবং তার পানি পান করতেন। যখন এই আয়াত নাযিল হলো, তোমরা কখনো কল্যাণ অর্জন করতে পারবে না যতক্ষণ না ব্যয় করবে তা থেকে যা তোমরা ভালোবাস। তখন আবু তালহা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট গেলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তা'আলা তাঁর কিতাবে বলেছেন, তোমরা কখনো সওয়াব অর্জন করতে পারবে না যতক্ষণ না ব্যয় করবে তা থেকে, যা তোমরা ভালোবাস। আমার নিকটে সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ হলো এই 'বীরুহা' নামক বাগানটি। আমি এখন এটা আল্লাহর রাস্তায় সাদাকা করে দিলাম। আমি আল্লাহর কাছে এর উত্তম বিনিময় চাই। আপনি এটা যেখানে ইচ্ছা খরচ করুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, ওহ! এটাতো খুবই উত্তম সম্পদ! এটা তো খুবই উত্তম সম্পদ। এর ব্যাপারে তুমি যা বলেছ আমি শুনেছি। আমি চাই এটা তুমি তোমার আত্মীয়স্বজনের মাঝে বণ্টন করে দাও। আবু তালহা বললেন, আল্লাহর রাসূল! আমি এমনটাই করব। এরপর আবু তালহা (রাঃ) বাগানটি তার আত্মীয়স্বজন এবং তার চাচাতো ভাইয়ের মাঝে বণ্টন করে দিলেন।
যাকাতের নির্দিষ্ট অংশের চেয়ে বেশি দান করা যাবে :
যাকাত আদায়ের জন্য নির্দিষ্ট অংশ পাওয়া না গেলে, তা হতে বেশি পরিমাণ পাওয়া গেলে তাই আদায় করবে। এতে অতিরিক্ত দান করার কারণে অতিরিক্ত নেকী অর্জিত হবে। হাদীসে এসেছে, উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ আমাকে যাকাত আদায় করার জন্য প্রেরণ করলেন। আমি এক ব্যক্তির নিকট পৌছলাম, সে আমার সামনে তার সম্পদ উপস্থিত করল। তার যে সম্পদ ছিল তাতে তার উপর একটি এক বছর বয়সের উট যাকাত ফরয ছিল। আমি বললাম, এক বছর বয়সের একটি উষ্ট্রী দিয়ে দাও। সে বলল, সে তো দুধও দেবে না এবং তার পিঠে আরোহণও করা যাবে না। কাজেই আমার এই যৌবনে পদার্পণকারী মোটা তাজা উষ্ট্রীটিই গ্রহণ করুন। তখন আমি বললাম, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর অনুমতি ছাড়া এটি গ্রহণ করতে পারব না। তবে রাসূলুল্লাহ ﷺ তোমার থেকে নিকটবর্তী স্থানে অবস্থান করছেন। তুমি যদি চাও তাহলে তুমি তোমার যে উষ্ট্রীটি আমার নিকট পেশ করেছিলে তা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট পেশ করতে পার। যদি তিনি তা গ্রহণ করেন, তাহলে আমিও তা গ্রহণ করব। আর যদি তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন, তাহলে আমিও তা প্রত্যাখ্যান করব। সে বলল, আমি তা (রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট) পেশ করব। অতঃপর যে উষ্ট্রীটি সে আমার নিকট পেশ করেছিল সেটি নিয়ে আমার সাথে রওনা দিল। এমনকি আমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট পৌঁছে গেলাম। তখন সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার নিয়োজিত যাকাত আদায়কারী আমার কাছে যাকাত আদায়ের উদ্দেশ্যে এসেছিল। আর আল্লাহর শপথ! ইতিপূর্বে আপনার পক্ষ থেকে কেউ আমার নিকট যাকাত আদায়ের জন্য আসেনি। আমি তার সামনে আমার সম্পদ পেশ করলাম। তখন সে বলল, আমার উপর একটি এক বছরের উষ্ট্রী যাকাত ফরয। অথচ সেটি দুধও দেবে না এবং তার পিঠে আরোহণও করা যাবে না। ফলে আমি তার নিকট যৌবনে পদার্পণকারী মোটা তাজা উষ্ট্রী গ্রহণ করার জন্য পেশ করলাম। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালেন। আর এই হচ্ছে সেই উষ্ট্রী, যা আমি আপনার নিকট নিয়ে এসেছি, আপনি তা গ্রহণ করুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, তোমার উপর ফরয ছিল তাই যা সে বলেছে। কিন্তু যদি তুমি নিজের খুশিতে ভালো কাজ করতে চাও, তাহলে আল্লাহ তা'আলা তোমাকে উত্তম প্রতিদান দেবেন। আর আমরাও তা গ্রহণ করব। সে বলল, এই হচ্ছে সেই উষ্ট্রী যা আপনার নিকট নিয়ে এসেছি। অতএব আপনি তা গ্রহণ করুন। । অতঃপর রাসূলুল্লাহ ﷺ তা গ্রহণ করার নির্দেশ দিলেন এবং তার সম্পদের বরকতের জন্য দু'আ করলেন।
টিকাঃ
২৬২. সহীহ বুখারী, হা/১; আবু দাউদ, হা/২২০৩; ইবনে মাজাহ, হা/৪২২৭; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩৮৮; বায়হাকী, হা/১৮১; জামেউস সগীর, হা/৪০৭৪; মিশকাত, হা/১।
২৬৩. সহীহ মুসলিম, হা/৩০৬; আবু দাউদ, হা/৪০৮৯; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৪৯০৭; সুনানে দারেমী, হা/২৬০৫।
২৬৪. সহীহ বুখারী, হা/১৪৯০; সহীহ মুসলিম, হা/৪২৫০; নাসাঈ, হা/২৬১৫; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/২৬১১; মিশকাত, হা/১৯৫৪।
২৬৫. সহীহ বুখারী, হা/২৩১৮, সহীহ মুসলিম, হা/২৩৬২; মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হা/১৮০৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/১২৪৬১; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩৩৪০; বায়হাকী, হা/১১৭০০; সুনানে দারেমী, হা/১৬৫৫; শারহুস সুন্নাহ, হা/১৬৮৩; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৮৭৫।
২৬৬. আবু দাউদ, হা/১৫৮৫; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/২২৭৭।
📄 যাকাত গ্রহণকারীর করণীয়
যিনি যাকাতের মাল গ্রহণ করবেন, তাকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে:
১. যাকাত গ্রহণকারীকে যাকাতের হকদার হতে হবে।
২. যা পায় তাতেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। দানকে তুচ্ছ ও ছোট মনে না করে সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করতে হবে।
৩. প্রয়োজনের বেশি চাইবে না।
৪. দাতার কৃতজ্ঞতা আদায় করবে। কারণ যে মানুষের শুকরিয়া আদায় করে না, সে আসলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে না।
৫. যাকাতদাতার জন্য দু'আ করবে, বলবে, (সাল্লাল্লাহু আলাইকা) অর্থাৎ আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ বর্ষণ করুন। অথবা (আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা আ-লি ফুলান) অর্থাৎ হে আল্লাহ! অমুকের পরিবারবর্গের প্রতি অনুগ্রহ বর্ষণ করুন। (ফুলান এর স্থলে দাতার নাম নেবে।) আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'তাদের সম্পদ হতে যাকাত গ্রহণ করো। এর দ্বারা তুমি তাদেরকে পবিত্র করবে এবং পরিশুদ্ধ করবে। আর তুমি তাদের জন্য দু'আ করো। নিশ্চয় তোমার দু'আ তাদের জন্য প্রশান্তিদায়ক; আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।' (সূরা তওবা- ১০৩)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, 'যে ব্যক্তি তোমাদের কোন উপকার করে তোমরা তার প্রতিদান দাও। যদি প্রতিদান দেয়ার মত কিছু না পাও, তাহলে তার জন্য দু'আ কর। যাতে তোমরা মনে করতে পার যে, তার প্রতিদান দিয়েছ।'
টিকাঃ
২৬৭. আবু দাউদ, হা/১৬৭২; নাসাঈ, হা/২৫৬৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/৫৩৬৫; সিলসিলা সহীহাহ, হা/২৫৩; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৮৫২।