📄 হিসাব ব্যতীত যাকাত আদায়ের বিধান
যাকাত একটি বাধ্যতামূলক ইবাদাত এবং এর আদায়ের পরিমাণও নির্দিষ্ট। সুতরাং এ ধরনের ইবাদাতের ক্ষেত্রে হিসাব-নিকাশ বাদ দিয়ে অনুমান করাটা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যদি কেউ অনুমানের ভিত্তিতে যাকাত প্রদান করে, তাহলে তা ফরয যাকাত হিসেবে গণ্য হবে না; বরং তা সাধারণ দান হিসেবেই গণ্য হবে।
অপরদিকে যাকাত হচ্ছে গরীবের হক। অনুমানের ভিত্তিতে এর পরিমাণ নির্ধারণ করা হলে, গরীবদের নির্দিষ্ট হক বিনষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সুতরাং হিসাব ব্যতীত যাকাত আদায় করা বৈধ নয়।
তবে কেউ যদি যাকাতের নিয়তে কিছু সম্পদ দান করে এবং পরে হিসাব-নিকাশ করে সমন্বয় করে নেয়, তাহলে তা বৈধ হবে。
📄 এক এলাকার যাকাত অন্য এলাকায় স্থানান্তর করা
যাকাত বণ্টনের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী যাকাতের সম্পদ যে এলাকা থেকে গ্রহণ করা হয়, সে এলাকার গরীবদের মধ্যেই প্রাথমিকভাবে বিতরণ করতে হবে। তারপর অবশিষ্ট যা কিছু থাকবে, সেগুলো প্রয়োজনের ভিত্তিতে অন্যান্য শহরেও স্থানান্তর করা যাবে। তবে এ ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত খাতগুলোকে প্রাধান্য দেয়া উচিত। যেমন-
১. জিহাদ অর্থাৎ আল্লাহর পথে যুদ্ধরত মুজাহিদদের এলাকায় যাকাত স্থানান্তর করা।
২. ইসলাম প্রচার ও ইসলামী শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে যাকাত স্থানান্তর করা।
৩. দুর্ভিক্ষ এবং দুর্যোগ কবলিত মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় যাকাত স্থানান্তর করা।
৪. যাকাতদাতার আত্মীয়কে দেয়ার জন্য যাকাত স্থানান্তর করা。
📄 যাকাত উত্তোলণকারীর করণীয়
যাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করা যাবে না: যাকাত আদায় করতে গিয়ে কোন উপহার গ্রহণ করা, জোর-যুলুম করে আদায় করা, খেয়ানত করা ইত্যাদি হারাম। রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন উবাদা (রাঃ)-কে সাদাকা আদায় করার জন্য প্রেরণ করলেন, তখন বললেন, হে আবু অলীদ! তুমি আল্লাহকে ভয় করো। তুমি যেন কিয়ামতের দিন (নিজ ঘাড়ে) কোন 'চিহি' রববিশিষ্ট উট, অথবা 'হাম্বা' রববিশিষ্ট গাভী অথবা 'মে-মে' রববিশিষ্ট ছাগল বহন করা অবস্থায় উপস্থিত না হও। উবাদা (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! ব্যাপারটি কি সত্যই এরূপ? তিনি বললেন, হ্যাঁ- এরূপ। সেই সত্তার কসম! যিনি আপনাকে সত্যের সাথে প্রেরণ করেছেন, আমি আপনার (বাইতুল মালের) কোন ব্যাপারে কখনো চাকুরী করব না।
আবু হুমাইদ সায়েদী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আযদ অঞ্চল এর ইবনে লুতবিয়া নামক এক ব্যক্তিকে যাকাত আদায় করার কাজে কর্মচারী নিয়োগ করলেন। সে ব্যক্তি (আদায়কৃত মাল সহ) ফিরে এসে বলল, এটা আপনাদের (বায়তুল মালের), আর এটা আমাকে উপহারস্বরূপ দেয়া হয়েছে। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ ﷺ উঠে দণ্ডায়মান হয়ে আল্লাহর প্রশংসা ও স্তুতি বর্ণনা করে বললেন, অতঃপর বলি যে, আল্লাহ আমাকে যে সকল কর্মের অধিকারী করেছেন তার মধ্য হতে কোন কর্মের জন্য তোমাদের কাউকে কর্মচারী নিয়োগ করলে সে ফিরে এসে বলে কি না, এটা আপনাদের। আর এটা উপহার স্বরূপ আমাকে দেয়া হয়েছে! যদি সে সত্যবাদী হয় তবে তার বাপ-মায়ের ঘরে বসে থেকে দেখে না কেন, তাকে কোন উপহার দেয়া হচ্ছে কি না? আল্লাহর কসম! তোমাদের মধ্যে যে কেউ কোন জিনিস অন্যায়ভাবে গ্রহণ করবে সে কিয়ামতের দিন তা তার নিজ ঘাড়ে বহন করা অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে। অতএব আমি যেন অবশ্যই চিনতে না পারি যে, তোমাদের মধ্য হতে কেউ নিজ ঘাড়ে 'চিহি' রববিশিষ্ট উট, অথবা 'হাম্বা' রববিশিষ্ট গাভী অথবা 'মে-মে' রব বিশিষ্ট ছাগল বহন করা অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করেছ।
আবু হুমাইদ (রাঃ) বলেন, অতঃপর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর ডানহাত এতটুকু উঁচু করলেন যে, তাঁর বগলের শুভ্রতা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল। তিনি বললেন, “হে আল্লাহ! আমি কি তোমার বাণী পৌঁছে দিয়েছি।” বর্ণনাকারী বলেন, আমার চোখ তাঁকে এ কথা বলতে দেখেছে এবং আমার কান তা শুনেছে।
টিকাঃ
২৫৯. সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/১৮০; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/৭৯১৩; সিলসিলা সহীহাহ, হা/৮৫৭।
২৬০. সহীহ বুখারী, হা/৬৯৭৯; সহীহ মুসলিম, হা/৪৮৪৫。
📄 যাকাতের মাল আত্মসাৎকারীর পরিণাম
যাকাত হচ্ছে একটি জনকল্যাণমূলক ইবাদাত। এতে গরীব, দুঃখী, ফকীর, মিসকীন অনেকেরই হক রয়েছে। সুতরাং এর থেকে কোন অংশ আত্মসাৎ করলে অনেকের হক আত্মসাৎ করা হয়। ফলে এর গোনাহের পরিমাণ স্বাভাবিক থেকে অনেক বেশি এবং কিয়ামতের দিন এদের পরিণতিও অনেক ভয়াবহ। কেননা হাদীসে এসেছে,
উবাদা ইবনে সামেত (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে যাকাত আদায় করার জন্য প্রেরণ করলেন। অতঃপর বললেন, হে আবুল ওয়ালীদ! (যাকাতের সম্পদের ব্যাপারে) আল্লাহকে ভয় করো। কিয়ামতের দিন এমন অবস্থা যেন না আসে যে, তুমি কাঁধের উপর উট বহন করবে, যা শব্দ করতে থাকবে অথবা গাভী বহন করবে, যা শব্দ করবে অথবা ছাগল বহন করবে, যা শব্দ করবে। উবাদা (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! যাকাতের মাল আত্মসাৎ করার জন্য কি এরূপ হবে? তিনি বললেন, সেই সত্তার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ, এটাই হবে পরিণতি। তখন উবাদা (রাঃ) বললেন, সেই সত্তার শপথ! যিনি আপনাকে সত্য সহ প্রেরণ করেছেন। আমি এরূপ যাকাত আদায়ের কাজ কখনো করব না।
টিকাঃ
২৬১. সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/১৮০; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/৭৯১৩; সিলসিলা সহীহাহ, হা/৮৫৭。