📄 স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে যাকাত দেয়ার বিধান
স্ত্রীর যাবতীয় ভরণ-পোষণের দায়িত্ব হচ্ছে স্বামীর। সুতরাং স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে দান করা কোনভাবেই বৈধ নয়। তবে স্ত্রী যদি যাকাতের নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয় এবং স্বামী যদি নিঃস্ব হয়, তাহলে স্ত্রী তার স্বামীকে যাকাতের মাল প্রদান করতে পারবে। যেমন- হাদীসে এসেছে,
আবদুল্লাহ (ইবনে মাস'উদ) এর স্ত্রী যায়নাব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি একবার মসজিদে নববীতে ছিলাম। তখন নবী ﷺ-কে দেখলাম যে, তিনি (মহিলাদেরকে লক্ষ্য করে) বললেন, তোমরা তোমাদের গহনা থেকে হলেও দান করো। আর যায়নাব (তার স্বামী) আবদুল্লাহ এবং যেসব ইয়াতীম তার পোষ্য ছিল তাদের জন্য খরচ করতেন (অর্থাৎ- তাদের ভরণ-পোষণ করতেন)। তিনি (যায়নাব) আবদুল্লাহ (ইবনে মাসউদ)-কে বললেন, আপনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে প্রশ্ন করুন, আমি যে আপনার এবং যে ইয়াতীমরা আমার পোষ্য আছে তাদের জন্য খরচ করছি তা কি দান হিসেবে আমার পক্ষে যথেষ্ট হবে? তিনি (আবদুল্লাহ) বলেন, তুমি নিজে গিয়েই রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে প্রশ্ন করো। তখন আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে উপস্থিত হলাম এবং দরজার কাছে জনৈকা আনসারী রমণীকে দেখতে পেলাম। তার প্রয়োজনটাও ছিল আমার প্রয়োজনের মতো। তখন বিলাল (রাঃ) আমাদের কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন। আমরা তাকে বললাম, আপনি নবী ﷺ-কে প্রশ্ন করুন, আমি যে আমার স্বামী ও যে ইয়াতীমরা আমার তত্ত্বাবধানে আছে তাদের জন্য সাদাকা (ব্যয়) করছি তা কি (দান হিসেবে) আমার পক্ষে যথেষ্ট হবে? আমরা (তাকে) আরো বললাম, নবী ﷺ এর কাছে আমাদের নাম বলবেন না। বিলাল (রাঃ) নবী ﷺ এর কাছে উপস্থিত হলেন এবং তাঁকে প্রশ্ন করলেন। তিনি বললেন, ঐ নারী দু'জন কে কে? বিলাল (রাঃ) বললেন, যাইনাব। তিনি (পুনরায়) প্রশ্ন করলেন, কোন্ যাইনাব? বিলাল (রাঃ) বললেন, আবদুল্লাহর (ইবনে মাস'উদ) স্ত্রী। তিনি বললেন, হ্যাঁ- তার দ্বিগুণ পুণ্য হবে- আত্মীয়তার (হক আদায় করার) নেকী এবং দানের নেকী।
টিকাঃ
২৫৬. সহীহ বুখারী, হা/১৪৬২; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৫৭৪৪; মা'রেফাতুস সুনান ওয়াল আছার, হা/৫৬০; শারহুস সুন্নাহ, হা/১৯।
📄 যাকাত প্রদানের ক্ষেত্রে যাদেরকে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত
যাকাত বণ্টনের ক্ষেত্রে যেসব খাত রয়েছে, সে অনুযায়ী আত্মীয়-অনাত্মীয়, নিকটবর্তী-দূরবর্তী অনেক মানুষই এর আওতাভুক্ত হয়। কিন্তু কারো জন্য সবার মাঝে যাকাত বিতরণ করা জরুরি নয়। সুতরাং এ ক্ষেত্রে যাদেরকে যাকাত প্রদান করলে অধিক উপকার লাভ করা যায়, তাদেরকে প্রাধান্য দেয়া উচিত। যেমন-
১। আত্মীয়-স্বজন:
যেসব আত্মীয়-স্বজনের ভরণ-পোষণ করা যাকাতদাতার জন্য ফরয নয়, সেসব আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে কেউ যদি যাকাতের হকদার হয়, তাহলে তাকে যাকাত দেয়াই সবচেয়ে উত্তম। যেমন- ভাই-বোন, চাচা-চাচী, মামা-মামী, ফুফা-ফুফু, খালা-খালু ইত্যাদি। কেননা এতে দ্বিগুণ সওয়াব পাওয়া যায়। যেমন- হাদীসে এসেছে,
সালমান ইবনে আমের আয-যাবী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, মিসকীনকে সাদাকা দেয়া হলে শুধুমাত্র সাদাকার সওয়াব পাওয়া যাবে। আর আত্মীয়-স্বজনদের সাদাকা প্রদান করলে দুইটি সওয়াব পাওয়া যাবে- তার মধ্যে একটি হলো সাদাকার সওয়াব; আর অপরটি হলো আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করার সওয়াব।
২। আহলুল ইলম :
আহলুল ইলম বলতে ঐসব লোকদেরকে বুঝানো হয়, যারা সর্বদা দ্বীনি জ্ঞান চর্চায় ব্যস্ত থাকে। যার কারণে তারা উপার্জন করার মতো যথেষ্ট সময় ও সুযোগ পান না। আল্লাহ তা'আলা তাদের সম্পর্কে বলেন, '(দান করতে হবে) ঐ সকল গরীবদের জন্য, যারা আল্লাহর পথে অবরুদ্ধ থাকার কারণে (রোজগারের জন্য) জমিনে বিচরণ করতে সক্ষম হয় না। ভিক্ষা করা থেকে দূরে থাকার কারণে মূর্য্য লোকেরা তাদেরকে ধনী বলে মনে করে। তুমি লক্ষণ দ্বারা তাদেরকে চিনতে পারবে। তারা কাকুতি-মিনতি করে মানুষের কাছে চায় না। আর তোমরা উত্তম সম্পদ হতে যা কিছু দান কর, নিশ্চয় আল্লাহ সে সম্পর্কে খবর রাখেন।' (সূরা বাকারা- ২৭৩)
অত্র আয়াতে যেসব লোকের কথা বলা হয়েছে, তারা হচ্ছে এমন লোক যারা আল্লাহর দ্বীনের খেদমতে নিজেদেরকে উৎসর্গ করে দেয়। তাদের সমস্ত সময় এ দ্বীনী খেদমতে ব্যয় করার কারণে নিজেদের ক্ষুধা নিবারণের জন্য কোন কাজকর্ম করার সুযোগ পায় না। নবী ﷺ এর যুগে এ ধরনের একটি দল ছিল। ইতিহাসে তারা 'আসহাবে সুফফা' নামে পরিচিত। যেহেতু তারা ছিলেন সার্বক্ষণিক কর্মী এবং নিজেদের প্রয়োজন পূর্ণ করার মতো উপকরণও তাদের ছিল না, তাই তাদের সাহায্য করাকে আল্লাহর পথে ব্যয়ের সর্বোত্তম খাত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অতএব বর্তমান যুগেও যারা দুনিয়ার কোন স্বার্থ ছাড়াই দ্বীনের জন্য কাজ করে যাবে এবং নিজের জীবিকার জন্য কাজ করার কোন সুযোগ না পাবে তাদের পেছনে খরচ করাও আল্লাহর পথে ব্যয়ের খাত হিসেবে বিবেচিত হবে। কেননা এদেরকে দান করলে একদিকে যেমন যাকাত আদায়ের হক আদায় হয়ে যাবে, অপরদিকে দ্বীনের কাজে সহযোগিতা করারও সওয়াব পাওয়া যাবে।
৩। মুত্তাকী ও পরহেজগার লোক:
যেসব লোক সর্বদা আল্লাহকে ভয় করে, তাঁর আনুগত্য করে এবং তাঁরই ইবাদাতে ব্যস্ত থাকে, সেসব লোক যদি যাকাতের হকদার হয়, তাহলে তারাই এর জন্য বেশি হকদার।
টিকাঃ
২৫৭. ইবনে মাজাহ হা/১৮৪৪; তিরমিযী হা/৬৫৮, নাসাঈ, হা/২৫৮২; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৬২৭২; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/২০৬৭; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/১৪৭৬; মু'জামুল কাবীর লিত তাবারানী, হা/৬০৮৭; বায়হাকী, হা/৭৫২৪; সুনানে দারেমী, হা/১৬৮০; মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হা/৮৪৯; মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হা/১৯৬২৭; জামেউস সগীর, হা/৭৩০৫; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৮৯২; মিশকাত, হা/১৯৩৯।
📄 সরকারি ফান্ডে যাকাত দেয়া
ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্বই হলো যাকাত আদায় করা। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'আমি এদেরকে (মুমিনদেরকে) পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা দান করি, যাতে করে তারা সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং সৎকাজের নির্দেশ দেয় ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে। আর সকল কর্মের পরিণাম তো আল্লাহর ইচ্ছাধীন।' (সূরা হাজ্জ-৪১)
অতএব, যাকাতের সম্পদ থেকে ব্যক্তিগতভাবে কিছু অংশ আদায় করার পর অবশিষ্ট যা কিছু থাকবে, সেগুলো সরকারি ফান্ডে জমা দেয়াই উত্তম। এতে করে সরকার নিজ দায়িত্বে যাকাতের মাল সুষ্ঠভাবে বণ্টন করে মুসলিম জনগণের অধিক কল্যাণ সাধন করবে।
তবে যেসব সরকার কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করে না, আল্লাহর আইন দিয়ে বিচার-ফায়সালা করে না; বরং তারা আল্লাহর ইবাদাতের পরিবর্তে জনগণের সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী, সেসব সরকারের ফান্ডে যাকাতের সম্পদ জমা দেয়া যাবে না।
যাকাতের মাল মসজিদ ও গোরস্থানের কাজে ব্যবহার করা যাবে না :
যাকাতের টাকা দিয়ে মসজিদ ও গোরস্থান তৈরি করা বৈধ নয়। কেননা আল্লাহ তা'আলা যাকাত বণ্টনের জন্য যেসব খাত নির্ধারণ করে দিয়েছেন, মসজিদ ও গোরস্থান তার অন্তর্ভুক্ত নয়।
📄 ভুলবশত ৮টি খাতের বাইরে যাকাত দিলে আদায় হবে কি
যদি কখনো ভুলক্রমে নির্দিষ্ট ৮টি খাতের বাইরে যাকাত প্রদান করা হয়, তাহলে তা আদায় হয়ে যাবে এবং তা পুনরায় আদায় করতে হবে না। হাদীসে এসেছে,
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ বলেছেন, এক ব্যক্তি বলল, আমি আজ রাতে কিছু দান-খয়রাত করব। অতঃপর সে সাদাকা নিয়ে বের হয়ে এক যিনাকারীকে তা অর্পণ করল। ভোরে লোকেরা বলাবলি করতে লাগল যে, আজ রাতে এক ব্যক্তি যিনাকারীকে দান-খয়রাত করেছে। অতঃপর সে ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহ! সকল প্রশংসা তোমার জন্য। আমার প্রদত্ত সাদাকা তো যিনাকারীর হাতে গিয়ে পড়েছে। এরপর সে (আবার) বলল, আজ আমি আরো কিছু সাদাকা করব। অতঃপর সে তা নিয়ে বের হয়ে এক ধনী লোকের হাতে অর্পণ করল। লোকজন ভোরে আলাপ করতে লাগল যে, আজ রাতে কে যেন এক ধনী লোককে সাদাকা দিয়ে গেছে। সে বলল, হে আল্লাহ! সকল প্রশংসা তোমার জন্য। আমার সাদাকা তো ধনীর হাতে গিয়ে পড়েছে। তারপর সে পুনরায় বলল, আমি আজ রাতে কিছু সাদাকা দেব। সাদাকা নিয়ে বের হয়ে সে এক চোরের হাতে অর্পণ করল। অতঃপর সকালে লোকজন বলাবলি করতে লাগল, আজ রাতে কে যেন চোরকে সাদাকা দিয়েছে। সে বলল, হে আল্লাহ! সকল প্রশংসা তোমারই। আমার প্রদত্ত সাদাকা যিনাকারী, ধনী ও চোরের হাতে পড়ে গেছে। অতঃপর এক ব্যক্তি (মালাক বা সে যুগের কোন নবী) এসে তাকে বলল, তোমার প্রদত্ত সকল সাদাকাই কবুল হয়েছে। যিনাকারীকে দেয়া সাদাকা কবুল হওয়ার কারণ হলো- সম্ভবত সে ঐ রাতে যিনা থেকে বিরত ছিল। (কেননা সে পেটের জ্বালায় এ কাজ করত) ধনী ব্যক্তিকে যে সাদাকা দেয়া হয়েছিল তা কবুল হওয়ার কারণ হলো ধনী ব্যক্তি এতে লজ্জিত হয়ে হয়ত উপদেশ গ্রহণ করেছে এবং আল্লাহর দেয়া সম্পদ থেকে সেও দান করবে বলে সঙ্কল্প করেছে। আর চোরকে দেয়া সাদাকা কবুল হওয়ার কারণ হলো সম্ভবত সে ঐ রাতে চুরি থেকে বিরত ছিল। কেননা সেও পেটের তাগিদে চুরি করত।
টিকাঃ
২৫৮. সহীহ মুসলিম, হা/২৬০৯; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/৮০৯৮।