📘 সিয়াম ও যাকাত > 📄 ওশর (ভূমি থেকে উৎপন্ন ফসলের যাকাত)

📄 ওশর (ভূমি থেকে উৎপন্ন ফসলের যাকাত)


মানুষের প্রতি আল্লাহ তা'আলার একটি বিশেষ নিয়ামত হচ্ছে, জমিন থেকে বিভিন্ন ধরনের ফসলের ব্যবস্থা করা, যা দ্বারা তারা জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'আল্লাহ ঐ সত্তা, যিনি নানা প্রকারের উদ্যান বানিয়েছেন, কিছু লতা-গুলা, যা কোন কাণ্ড ছাড়াই মাচানের উপর তুলে রাখা হয়েছে, (আবার কিছু গাছ), যা মাচানের উপর তুলে রাখা হয়নি (স্বীয় কাণ্ডের উপর তা এমনিই দাঁড়িয়ে আছে। তিনি আরো সৃষ্টি করেছেন), খেজুর গাছ এবং বিভিন্ন (স্বাদ ও) প্রকারবিশিষ্ট খাদ্যশস্য ও আনার। এগুলো (স্বাদে-গন্ধে) এক রকমও হতে পারে, আবার ভিন্ন ধরনেরও হতে পারে, যখন তা ফলবান হয় তোমরা তার ফল খাও, আর তোমরা ফসল তোলার দিন তার হক আদায় করো। আর তোমরা কখনো অপচয় করো না; নিশ্চয় আল্লাহ অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না।' (সূরা আন'আম- ১৪১)
আল্লাহ তা'আলা বান্দাদেরকে এসব নিয়ামত প্রদানের পর এর শুকরিয়া আদায়স্বরূপ এর থেকে নির্দিষ্ট একটি অংশ দান করতে বলেছেন। তিনি বলেন, 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা যা উপার্জন করেছ এবং আমি জমিন থেকে তোমাদের জন্য যা বের করেছি তার মধ্য হতে পবিত্র জিনিসসমূহ দান করো। আর তোমরা খারাপ জিনিস দান করার ইচ্ছা করো না। কেননা অন্ধ না হলে তোমরা নিজেরাই তো সেটা গ্রহণ করতে চাও না। জেনে রেখো, নিশ্চয় আল্লাহ সম্পদশালী ও প্রশংসিত।' (সূরা বাকারা- ২৬৭)

📘 সিয়াম ও যাকাত > 📄 যেসব ফসলের উপর যাকাত আদায় করা আবশ্যক

📄 যেসব ফসলের উপর যাকাত আদায় করা আবশ্যক


হাদীসে এসেছে,
উমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ গম, যব, কিসমিস এবং খেজুর এই চারটি শস্যের যাকাত প্রবর্তন করেছেন।
অপর হাদীসে এসেছে,
মূসা ইবনে তালহা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ কর্তৃক মু'আয (রাঃ) এর নিকট প্রেরিত পত্র আমাদের নিকট ছিল। যাতে তিনি গম, যব, কিসমিস ও খেজুরের যাকাত গ্রহণ করেছেন।
উল্লেখিত হাদীসদ্বয়ে বর্ণিত চারটি শস্যের যাকাতের কথা বলা হলেও এই চারটিকেই নির্দিষ্ট করা হয়নি। বরং ওজন ও গুদামজাত সম্ভব সকল শস্যই এর অন্তর্ভুক্ত। যেমন ধান, ভুট্টা ইত্যাদি।
ভূমি থেকে উৎপাদিত বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি ও ফল-মূলের মধ্যে ওশর দেয়া ওয়াজিব হবে কিনা- এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে। কতক উলামায়ে কেরামের মত হচ্ছে, শাক-সবজি ও ফল-মূল অর্থাৎ যেসব জিনিস গুদামজাত করা যায় না এবং স্থায়ী থাকে না, তাতে যাকাত আসবে না। কেননা রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন,
মূসা ইবনে তালহা (রহ.) তার পিতা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, শাক-সবজিতে কোন যাকাত (ওশর) নেই।
আবার কতক উলামায়ে কেরাম মনে করেন, শাক-সবজি ও ফল-মূলের মধ্যেও ওশর ওয়াজিব হবে। কেননা আল্লাহ তা'আলার বাণী হচ্ছে, 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা যা উপার্জন করেছ এবং আমি জমিন থেকে তোমাদের জন্য যা বের করেছি তার মধ্য হতে পবিত্র জিনিসসমূহ দান করো।' (সূরা বাকারা- ২৬৭) অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'আর তোমরা ফসল তোলার দিন তার হক আদায় করো এবং অপচয় করো না। নিশ্চয় আল্লাহ অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।' (সূরা আন'আম- ১৪১)
উক্ত আয়াতে ব্যাপকভাবে এ নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, জমি থেকে যা উৎপন্ন হয়, তার হক আদায় করতে হবে। এখানে কোন কিছুকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়নি। সহীহ ফিকহুস সুন্নাহ গ্রন্থকার এ মতটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

টিকাঃ
২২৮. সুনানে দার কুতনী, হা/১৯৩৬; জামেউস সগীর, হা/৫৮৯৭; সিলসিলা সহীহাহ, হা/৮৭৯।
২২৯. মুসনাদে আহমাদ, হা/২২০৪১; সুনানে দার কুতনী, হা/১৯১৪; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/৭৭২৩; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/১৪৫৭; মিশকাত, হা/১৮০৩।
২৩০. মুসনাদুল বাযযার, হা/৭৪০; জামেউস সগীর, হা/৯৫৪২।

📘 সিয়াম ও যাকাত > 📄 উৎপাদিত ফসলের নিসাব

📄 উৎপাদিত ফসলের নিসাব


ফসলের যাকাত আদায়ের জন্য সর্বনিম্ন পরিমাণ হচ্ছে পাঁচ ওয়াসাক। পাঁচ ওয়াসাকের কম পরিমাণ কোন ফসলের উপর যাকাত ফরয নয়। হাদীসে এসেছে,
আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, পাঁচ ওয়াসাকের কম পরিমাণ (শস্য ও ফল) যাকাতের জন্য গণনা করা হয় না।
উল্লেখ্ম যে, ১ ওয়াসাক = ৬০ সা'। অতএব ৫ ওয়াসাক = ৬০ × ৫ = ৩০০ সা'। সুতরাং ১ সা' = ২ কেজি ৫০০ গ্রাম হলে, ৩০০ সা' = ৩০০ × ২.৫ = ৭৫০ কেজি অর্থাৎ ১৮ মণ ৩০ কেজি। অতএব কেউ যদি উপরোক্ত পরিমাণ ফসল পায়, তাহলে নিম্নে বর্ণিত হাদীস অনুযায়ী যাকাত বের করতে হবে :
আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূল ﷺ বলেছেন, বৃষ্টি বা ঝর্ণার পানির সাহায্যে পরিচালিত সেঁচ কার্য কিংবা ভূ-গর্ভস্থ পানি দ্বারা চালিত চাষাবাদের ক্ষেত্রে যাকাতের পরিমাণ হবে এক দশমাংশ এবং যন্ত্রপাতির সাহায্যে পরিচালিত সেঁচকার্যের ক্ষেত্রে যাকাতের পরিমাণ হবে এক-দশমাংশের অর্ধেক।
অতএব, ব্যয়হীন তথা বৃষ্টির পানি, নদী বা খালের পানি ইত্যাদির মাধ্যমে উৎপাদিত ফসলের যাকাতের পরিমাণ হবে ওশর তথা ১০ ভাগের ১ ভাগ বা ১০%।
আর ব্যয়বহুল তথা কূপ খনন করে পানি সংগ্রহ করা বা সেঁচ ব্যবস্থার মাধ্যমে উৎপাদিত ফসলের যাকাতের পরিমাণ হবে নিষ্ফল ওশর তথা ২০ ভাগের ১ ভাগ বা ৫%।

টিকাঃ
২৩১. মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হা/৫৭৭; সহীহ বুখারী, হা/১৪৪৭, সহীহ মুসলিম, হা/২৩১০, আবু দাউদ, হা/১৫৬০, নাসাঈ, হা/২৪৪৫, ইবনে মাজাহ, হা/১৭৯৪; তিরমিযী, হা/৬২৬; মুসনাদে আহমাদ, হা/১১০৪৪; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/২২৯৪; মুসনাদে আবু ই'আলা, হা/৯৭৯; মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হা/৭২৪৯: মুসনাদে দারেমী, হা/১৬৭৪।
২৩২. সহীহ বুখারী, হা/১৪৮৩; তিরমিযী, হা/৬৩৯; ইবনে মাজাহ, হা/১৮১৬; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/২৩০৮; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩২৮৫; দার কুতনী, হা/২০০০; মু'জামুল কাবীর লিত তাবারানী, হা/১২৯৩৩; বায়হাকী, হা/৭২৭৬; শারহুস সুন্নাহ, হা/১৫৮০; জামেউস সগীর, হা/৭৭২১; মিশকাত, হা/১৭৯৭।

📘 সিয়াম ও যাকাত > 📄 বৃষ্টির পানি ও কৃত্রিম সেঁচ উভয়ের সমন্বয়ে উৎপাদিত ফসলের যাকাত

📄 বৃষ্টির পানি ও কৃত্রিম সেঁচ উভয়ের সমন্বয়ে উৎপাদিত ফসলের যাকাত


যেসব ফসল কেবল বৃষ্টির পানি অথবা কেবল কৃত্রিম সেঁচের মাধ্যমে উৎপন্ন হয় না; বরং কিছু অংশ বৃষ্টির পানিতে এবং কিছু অংশ কৃত্রিম সেঁচের মাধ্যমে উৎপন্ন হয়, সেসব ফসলের যাকাত বের করার নিয়ম হল, যদি বৃষ্টির পানির পরিমাণ বেশি হয় তাহলে ১০ ভাগের ১ ভাগ তথা ১০% যাকাত দিতে হবে। আর যদি কৃত্রিম সেঁচের পরিমাণ বেশি হয়, তাহলে ২০ ভাগের ১ ভাগ তথা ৫% যাকাত দিতে হবে। আর যদি ফসলের অর্ধেক অংশ বৃষ্টির পানিতে এবং অর্ধেক অংশ কৃত্রিম সেঁচের মাধ্যমে উৎপন্ন হয়, তাহলে ৭.৫০% যাকাত দিতে হবে।

টিকাঃ
২৩৩. ফিকহুস সুন্নাহ ১/৩৫৪ পৃঃ; নায়লুল আওতার ৪/২০১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00