📘 সিয়াম ও যাকাত > 📄 যেসব পশু দ্বারা যাকাত আদায় করা হবে সেসব পশুর বৈশিষ্ট্যসমূহ

📄 যেসব পশু দ্বারা যাকাত আদায় করা হবে সেসব পশুর বৈশিষ্ট্যসমূহ


গৃহপালিত পশুর যাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্যসমূহের প্রতি লক্ষ্য করা অত্যাবশ্যক। যেমন-
১। দোষত্রুটি মুক্ত হওয়া: যেসব পশু দ্বারা যাকাত আদায় করা হবে, সেসব পশুকে অবশ্যই এমন দোষ হতে মুক্ত হতে হবে, যা দ্বারা কুরবানী বৈধ নয়। যেমন- রোগাক্রান্ত হওয়া, অঙ্গহীন হওয়া, জীর্ণশীর্ণ হওয়া, লেংড়া হওয়া, কানা হওয়া ইত্যাদি। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা যা উপার্জন করেছ এবং আমি জমিন থেকে তোমাদের জন্য যা বের করেছি তার মধ্য হতে পবিত্র জিনিসসমূহ দান করো। আর তোমরা খারাপ জিনিস দান করার ইচ্ছা করো না। কেননা অন্ধ না হলে তোমরা নিজেরাই তো সেটা গ্রহণ করতে চাও না। জেনে রেখো, নিশ্চয় আল্লাহ সম্পদশালী ও প্রশংসিত।' (সূরা বাকারা- ২৬৭)
তাছাড়া হাদীসে এসেছে,
আবদুল্লাহ ইবনে মুয়াবিয়া আল-গাযিরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ বলেছেন, তিন ধরনের লোক যারা এরূপ করবে, তারা পরিপূর্ণ ঈমানের স্বাদ গ্রহণ করবে- (১) যে ব্যক্তি কেবলমাত্র আল্লাহরই ইবাদাত করে। (২) আর যে ব্যক্তি স্বীকার করে যে, আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই। (৩) যে ব্যক্তি প্রত্যেক বছর তার সম্পদের যাকাত হিসেবে উত্তম সম্পদ প্রদান করে এবং বৃদ্ধ বয়সের, রোগাক্রান্ত, ত্রুটিপূর্ণ, নিকৃষ্ট সম্পদ প্রদান করে না, বরং মধ্যম মানের সম্পদ প্রদান করে। আল্লাহ তোমাদের নিকট তোমাদের উত্তম মাল চান না এবং নিকৃষ্ট মাল প্রদান করতেও নির্দেশ দেননি।

২। পশু মধ্যম মানের হওয়া:
যেসব পশু দ্বারা যাকাত আদায় করা হবে, সেসব পশুকে অবশ্যই মধ্যম মানের হতে হবে। সুতরাং যেমনিভাবে বাছাই করে অতি উত্তম মানের পশুগুলো যাকাত হিসেবে গ্রহণ করা যাকাত আদায়কারীর জন্য বৈধ নয়, ঠিক তেমনিভাবে বাছাই করে কেবল দুর্বল ও নিকৃষ্ট পশুগুলো দ্বারা যাকাত আদায় করাও মালিকের জন্য বৈধ নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ মু'আয ইবনে জাবাল (রাঃ) কে ইয়ামানের শাসক নিয়োগ করে পাঠানোর সময় বলেছিলেন, 'যদি তারা তোমার এ কথা স্বীকার করে তবে তাদেরকে জানিয়ে দেবে, আল্লাহ তা'আলা তাদের উপর যাকাত ফরয করেছেন, যা তাদের ধনীদের নিকট থেকে সংগৃহীত হবে এবং তাদের দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করা হবে। যদি তারা তোমার এ কথাও স্বীকার করে, তবে তাদের ভালো ভালো সম্পদগুলো গ্রহণ থেকে বিরত থাকবে। আর তুমি মাযলুমদের অভিশাপকে ভয় করবে; কেননা মাযলুম ও আল্লাহর মাঝখানে কোন প্রতিবন্ধক নেই (তারা যা দু'আ করবে, আল্লাহ তা'আলা তা কবুল করবেন)।'
তবে মালিক যদি ইচ্ছা করে তাহলে সে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বাছাই করে কেবল উত্তম সম্পদ দ্বারা যাকাত আদায় করতে পারবে। যেমন- হাদীসে এসেছে,
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূলের প্রতি যাকাতের যে বিধান দিয়েছেন তা আবু বকর (রাঃ) আনাস (রাঃ) এর নিকট লিখে পাঠান। তাতে লিখা ছিল যে, অধিক বয়সের দাঁত পড়া বৃদ্ধ ও ত্রুটিযুক্ত বকরী এবং পাঁঠা যাকাত হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না। তবে যাকাত প্রদানকারী ইচ্ছা করলে (পাঁঠা) দিতে পারেন।

টিকাঃ
২২৪. আবু দাউদ, হা/১৫৮৪; সিলসিলা সহীহাহ, হা/১০৪৬; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৭৫০।
২২৫. সহীহ বুখারী, হা/১৪৯৬; সহীহ মুসলিম, হা/১৩০; আবু দাউদ, হা/১৫৮৬; তিরমিযী, হা/৬২৫; নাসাঈ, হা/২৫২২; মুসনাদে আহমাদ, হা/২০৭১; সুনানে দার কুতনী, হা/২০৫৮; সুনানে দারেমী, হা/১৬১৪; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/৭৫২৬; মিশকাত, হা/১৭৭২।
২২৬. সহীহ বুখারী, হা/১৪৫৫; সুনানে দার কুতনী, হা/১৯৮৩; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/৭৫০২; মিশকাত, হা/১৭৯৬।

📘 সিয়াম ও যাকাত > 📄 যাকাত আদায় করার জন্য নির্ধারিত পশু পাওয়া না গেলে করণীয়

📄 যাকাত আদায় করার জন্য নির্ধারিত পশু পাওয়া না গেলে করণীয়


যদি মালিকের কাছে নির্দিষ্ট বয়সের পশু পাওয়া না যায়, তাহলে এর করণীয় সম্পর্কে হাদীসে এসেছে,
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূলকে সাদাকার (যাকাতের) পরিমাণ নির্ধারণের ব্যাপারে যে আদেশ করেছিলেন আবু বকর (রাঃ) তা তাকে (আনাসকে) লিখে পাঠিয়েছিলেন। (তার মাঝে এটাও ছিল যে) যার উটের সংখ্যা এত হয়েছে যে, (তার উপর) একটি পাঁচ বছর বয়সের উষ্ট্রী যাকাত বাবদ ওয়াজিব হয় অথচ তার কাছে সেটা নেই, বরং তার কাছে আছে চার বছর বয়সের উষ্ট্রী, তবে চার বছর বয়সের উষ্ট্রীই তার নিকট হতে নেয়া হবে এবং তাকে এর সঙ্গে (অতিরিক্ত) দুটি বকরী দিতে হবে- যদি এটা তার কাছে সহজসাধ্য হয়, অথবা বিশ দিরহাম (দিতে হবে)। আর যার উটের সংখ্যা এত হয়েছে যে, যাকাত বাবদ তার উপর একটি চার বছর বয়সের উষ্ট্রী ওয়াজিব, অথচ তার কাছে চার বছর বয়সের উষ্ট্রী নেই, বরং তার কাছে রয়েছে পাঁচ বছর বয়সের উষ্ট্রী, তবে পাঁচ বছর বয়সের উষ্ট্রীই তার নিকট হতে নেয়া হবে এবং যাকাত আদায়কারী তাকে বিশ দিরহাম অথবা দুটি বকরী দিয়ে দেবে। আর যার উটের সংখ্যা এত হয়েছে যে, যাকাত বাবদ তার উপর একটি চার বছর বয়সের উষ্ট্রী ওয়াজিব, অথচ তার কাছে তিন বছর বয়সের উষ্ট্রী ব্যতীত আর কিছু নেই, তবে তার নিকট হতে তিন বছর বয়সের উষ্ট্রীই নেয়া হবে এবং এর সঙ্গে দুটি বকরী অথবা বিশ দিরহাম নিতে হবে। অনুরূপভাবে যার উপর যাকাত বাবদ একটি তিন বছর বয়সের উষ্ট্রী ওয়াজিব হয়, অথচ তার কাছে চার বছর বয়সের উষ্ট্রী থাকে, তাহলে তার কাছ থেকে চার বছর বয়সের উষ্ট্রীই নেয়া হবে এবং যাকাত আদায়কারী তাকে বিশ দিরহাম অথবা দুটি বকরী দেবে। আর যার উপর যাকাত বাবদ একটি তিন বছর বয়সের উষ্ট্রী ওয়াজিব হয়, অথচ তা তার কাছে নেই, বরং তার কাছে দুই বছর বয়সের উষ্ট্রী থাকে, তাহলে তার কাছ থেকে দুই বছর বয়সের উষ্ট্রীই নেয়া হবে এবং এর সাথে বিশ দিরহাম অথবা দুটি বকরী (অতিরিক্ত) নিতে হবে।

টিকাঃ
২২৭. সহীহ বুখারী, হা/১৪৫৩; আবু দাউদ, হা/১৫৬৯; নাসাঈ, হা/২৪৪৭; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/২২৮১; মিশকাত, হা/১৭৯৬।

📘 সিয়াম ও যাকাত > 📄 ওশর (ভূমি থেকে উৎপন্ন ফসলের যাকাত)

📄 ওশর (ভূমি থেকে উৎপন্ন ফসলের যাকাত)


মানুষের প্রতি আল্লাহ তা'আলার একটি বিশেষ নিয়ামত হচ্ছে, জমিন থেকে বিভিন্ন ধরনের ফসলের ব্যবস্থা করা, যা দ্বারা তারা জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'আল্লাহ ঐ সত্তা, যিনি নানা প্রকারের উদ্যান বানিয়েছেন, কিছু লতা-গুলা, যা কোন কাণ্ড ছাড়াই মাচানের উপর তুলে রাখা হয়েছে, (আবার কিছু গাছ), যা মাচানের উপর তুলে রাখা হয়নি (স্বীয় কাণ্ডের উপর তা এমনিই দাঁড়িয়ে আছে। তিনি আরো সৃষ্টি করেছেন), খেজুর গাছ এবং বিভিন্ন (স্বাদ ও) প্রকারবিশিষ্ট খাদ্যশস্য ও আনার। এগুলো (স্বাদে-গন্ধে) এক রকমও হতে পারে, আবার ভিন্ন ধরনেরও হতে পারে, যখন তা ফলবান হয় তোমরা তার ফল খাও, আর তোমরা ফসল তোলার দিন তার হক আদায় করো। আর তোমরা কখনো অপচয় করো না; নিশ্চয় আল্লাহ অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না।' (সূরা আন'আম- ১৪১)
আল্লাহ তা'আলা বান্দাদেরকে এসব নিয়ামত প্রদানের পর এর শুকরিয়া আদায়স্বরূপ এর থেকে নির্দিষ্ট একটি অংশ দান করতে বলেছেন। তিনি বলেন, 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা যা উপার্জন করেছ এবং আমি জমিন থেকে তোমাদের জন্য যা বের করেছি তার মধ্য হতে পবিত্র জিনিসসমূহ দান করো। আর তোমরা খারাপ জিনিস দান করার ইচ্ছা করো না। কেননা অন্ধ না হলে তোমরা নিজেরাই তো সেটা গ্রহণ করতে চাও না। জেনে রেখো, নিশ্চয় আল্লাহ সম্পদশালী ও প্রশংসিত।' (সূরা বাকারা- ২৬৭)

📘 সিয়াম ও যাকাত > 📄 যেসব ফসলের উপর যাকাত আদায় করা আবশ্যক

📄 যেসব ফসলের উপর যাকাত আদায় করা আবশ্যক


হাদীসে এসেছে,
উমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ গম, যব, কিসমিস এবং খেজুর এই চারটি শস্যের যাকাত প্রবর্তন করেছেন।
অপর হাদীসে এসেছে,
মূসা ইবনে তালহা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ কর্তৃক মু'আয (রাঃ) এর নিকট প্রেরিত পত্র আমাদের নিকট ছিল। যাতে তিনি গম, যব, কিসমিস ও খেজুরের যাকাত গ্রহণ করেছেন।
উল্লেখিত হাদীসদ্বয়ে বর্ণিত চারটি শস্যের যাকাতের কথা বলা হলেও এই চারটিকেই নির্দিষ্ট করা হয়নি। বরং ওজন ও গুদামজাত সম্ভব সকল শস্যই এর অন্তর্ভুক্ত। যেমন ধান, ভুট্টা ইত্যাদি।
ভূমি থেকে উৎপাদিত বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি ও ফল-মূলের মধ্যে ওশর দেয়া ওয়াজিব হবে কিনা- এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে। কতক উলামায়ে কেরামের মত হচ্ছে, শাক-সবজি ও ফল-মূল অর্থাৎ যেসব জিনিস গুদামজাত করা যায় না এবং স্থায়ী থাকে না, তাতে যাকাত আসবে না। কেননা রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন,
মূসা ইবনে তালহা (রহ.) তার পিতা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, শাক-সবজিতে কোন যাকাত (ওশর) নেই।
আবার কতক উলামায়ে কেরাম মনে করেন, শাক-সবজি ও ফল-মূলের মধ্যেও ওশর ওয়াজিব হবে। কেননা আল্লাহ তা'আলার বাণী হচ্ছে, 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা যা উপার্জন করেছ এবং আমি জমিন থেকে তোমাদের জন্য যা বের করেছি তার মধ্য হতে পবিত্র জিনিসসমূহ দান করো।' (সূরা বাকারা- ২৬৭) অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'আর তোমরা ফসল তোলার দিন তার হক আদায় করো এবং অপচয় করো না। নিশ্চয় আল্লাহ অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।' (সূরা আন'আম- ১৪১)
উক্ত আয়াতে ব্যাপকভাবে এ নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, জমি থেকে যা উৎপন্ন হয়, তার হক আদায় করতে হবে। এখানে কোন কিছুকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়নি। সহীহ ফিকহুস সুন্নাহ গ্রন্থকার এ মতটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

টিকাঃ
২২৮. সুনানে দার কুতনী, হা/১৯৩৬; জামেউস সগীর, হা/৫৮৯৭; সিলসিলা সহীহাহ, হা/৮৭৯।
২২৯. মুসনাদে আহমাদ, হা/২২০৪১; সুনানে দার কুতনী, হা/১৯১৪; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/৭৭২৩; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/১৪৫৭; মিশকাত, হা/১৮০৩।
২৩০. মুসনাদুল বাযযার, হা/৭৪০; জামেউস সগীর, হা/৯৫৪২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00