📄 পশুর প্রকারভেদ
যাকাত আদায়কে কেন্দ্র করে পশু কয়েক ধরনের হয়ে থাকে। যেমন-
১) সায়েমা তথা বছরের বেশিরভাগ সময় বৈধ ঘাসের মাঠে ও চারণভূমিতে স্বাধীনভাবে বিচরণ করে যে পশুগুলো জীবিকা নির্বাহ করে এবং সেগুলোকে বংশবৃদ্ধি ও দুগ্ধ আহরণের জন্য লালন-পালন করা হয়, সেগুলোকে সায়েমা বলে। এসব পশুর উপর যাকাত প্রদান করা ফরয।
২) যেসব পশু বংশবৃদ্ধি ও দুগ্ধ আহরণের জন্য লালন-পালন করা হয় ঠিকই, কিন্তু বছরের বেশির ভাগ সময় নিজেরা মাঠে বিচরণ করে ঘাস-পানি খায় না; বরং মালিককে খাদ্য ক্রয় করে বা কেটে এনে খাওয়াতে হয়। এসব পশুর উপর যাকাত প্রদান করা ফরয নয়।
৩) যেসব পশু বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়। যেমন- গাড়ি চালানো, পিঠে বোঝা বহন করা, সওয়ার হওয়া, কৃষি কাজে ব্যবহার করা, হালচাষ করা ও পানি উত্তোলন করা ইত্যাদি। অধিকাংশ আলেমের মতে এসব পশুর উপর যাকাত আদায় করা ফরয হবে না।
৪) যেসব পশু ব্যবসার জন্য প্রতিপালন করা হয়, সেগুলোকে ব্যবসায়িক পণ্য বলে গণ্য করা হবে এবং এর উপর যাকাত সংখ্যার ভিত্তিতে নয়, বরং মূল্যের ভিত্তিতে ধার্য হবে। এক্ষেত্রে পশুর মালিক পশুর নির্ধারিত মূল্যকে তার মালিকানাধীন নগদ অর্থ ও ব্যবসায়িক পণ্যের মূল্যের সাথে যোগ করে মোট মূল্যের ২.৫% হারে যাকাত প্রদান করবে。
📄 গৃহপালিত পশুর উপর যাকাত ফরয হওয়ার জন্য শর্তসমূহ
১. নিসাব পরিমাণ হওয়া: যাকাত আদায়ের প্রধান শর্তই হচ্ছে সম্পদ নিসাব পরিমাণ হওয়া। যদি নিসাব সংখ্যক পশু থেকে একটিও কম থাকে, তাহলে যাকাত ফরয হবে না। যেমন- হাদীসে এসেছে, আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, পাঁচের কম সংখ্যক উটের মধ্যে কোন যাকাত নেই।
২. পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হওয়া: এসব পশুর উপর যাকাত ফরয হওয়ার জন্য আরো একটি শর্ত হচ্ছে, পশু ব্যক্তির মালিকানায় আসার দিন থেকে নিয়ে পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত করতে হবে; নতুবা যাকাত ফরয হবে না। কেননা হাদীসে এসেছে, আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি যে, সম্পদের মালিকানা এক বছর অতিক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত এর উপর যাকাত আরোপিত হয় না।
৩. কাজে ব্যবহৃত পশু না হওয়া: যেসব গৃহপালিত পশু চাষাবাদের কাজে, পরিবহণের কাজে অথবা অন্য কোন কাজের জন্য ব্যবহৃত হয়, তাহলে সেসব পশুর উপর যাকাত আদায় করা ওয়াজিব হবে না। হাদীসে এসেছে, আলী ইবনে আবি তালেব (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেছেন, শাক-সবজিতে যাকাত নেই, আরিয়াতে যাকাত নেই, পাঁচ ওয়াসাকের কমে যাকাত নেই, কাজে নিয়োজিত পশুতে যাকাত নেই এবং যাবহাতেও যাকাত নেই। সাকার বলেন, জাবহা অর্থ হল, ঘোড়া, খচ্ছর এবং দাস-দাসী।
৪. সায়েমা হওয়া: সায়েমা এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে বিচরণশীল। ইসলামী পরিভাষায় সায়েমা বলা হয় ঐসব পশুকে, যেগুলো বছরের অধিকাংশ সময় চারণভূমিতে স্বাধীনভাবে বিচরণ করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে এবং সেগুলোকে কেবল বংশবৃদ্ধি ও দুগ্ধ দোহনের জন্য লালন-পালন করা হয়।
সুতরাং কোন মালিক যদি বছরের অধিকাংশ সময় নিজে খাদ্য সংগ্রহ করে পশুকে খাওয়ায়, তাহলে ঐ পশুর উপর যাকাত ওয়াজিব হবে না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, 'বিচরণশীল ছাগলের যাকাত চল্লিশটি হতে একশত বিশটি পর্যন্ত একটি ছাগল।'
অন্য হাদীসে তিনি বলেন, 'বিচরণশীল প্রত্যেক ৪০টি উটে একটি বিনতু লাবুন।'
টিকাঃ
২১৮. সহীহ বুখারী, হা/১৪৪৭; মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হা/৫৭৭।
২১৯. ইবনে মাজাহ, হা/১৭৯২; মুসনাদুল বাযযার, হা/৩০৪; দার কুতনী, হা/১৮৮৯; জামেউস সগীর, হা/১৩৪৫৪।
২২০. সুনানে দার কুতনী, হা/১৯৩০; মিশকাত, হা/১৮১৩।
২২১. সহীহ বুখারী, হা/১৪৫৪; নাসাঈ, হা/২৪৪৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/৭২; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/২২৬১; মুসনাদে আবু ই'আলা, হা/১২৭; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/৭৪৯৯; মিশকাত, হা/১৭৯৬।
২২২. বিনতু লাবুন বলা হয় ঐ উটকে, যার বয়স দু'বছর অতিক্রম করে তৃতীয় বছরে পদার্পণ করেছে।
২২৩. নাসাঈ, হা/২৪৪৪; মুসনাদে আহমাদ, হা/২০০৩০; মুসনাদে দারেমী, হা/১৭১৯।
📄 গৃহপালিত পশুর যাকাতের নিসাব
হাদীসের আলোকে উট, গরু ও ছাগলের যাকাত ছকের মাধ্যমে দেখানো হল:
📄 উটের যাকাতের নিসাব
৫টি উট (এর কম হলে যাকাত ফরজ নয়) হলে তার যাকাত:
- ১ থেকে ৪ পর্যন্ত: কোন যাকাত দিতে হবে না
- ৫ থেকে ৯ পর্যন্ত: ১টি ছাগল
- ১০ থেকে ১৪ পর্যন্ত: ২টি ছাগল
- ১৫ থেকে ১৯ পর্যন্ত: ৩টি ছাগল
- ২০ থেকে ২৪ পর্যন্ত: ৪টি ছাগল
- ২৫ থেকে ৩৫ পর্যন্ত: দুই বছর বয়সের ১টি স্ত্রী উট
- ৩৬ থেকে ৪৫ পর্যন্ত: তিন বছর বয়সের ১টি স্ত্রী উট
- ৪৬ থেকে ৬০ পর্যন্ত: চার বছর বয়সের ১টি স্ত্রী উট
- ৬১ থেকে ৭৫ পর্যন্ত: পাঁচ বছর বয়সের ১টি স্ত্রী উট
- ৭৬ থেকে ৯০ পর্যন্ত: ২ থেকে ৩ বছর বয়সের ২টি স্ত্রী উট
- ৯১ থেকে ১২০ পর্যন্ত: ৩ থেকে ৪ বছর বয়সের ২টি স্ত্রী উট
যখন উটের সংখ্যা ১২০ এর বেশি হবে, তখন প্রতি ৪০টির জন্য ৩ বছর বয়সের ১টি স্ত্রী উট এবং প্রতি ৫০টি উটের জন্য ৪ বছর বয়সের ১টি স্ত্রী উট দিতে হবে।