📄 যাকাত নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বর্ণের নিসাব প্রযোজ্য নাকি রৌপ্যের নিসাব
এ ব্যাপারে আলেমদের দু'টি মতামত রয়েছে:
এক: অনেক আলেমের মতে, স্বর্ণ ও রৌপ্যের মধ্য থেকে বাজারে যেটার মূল্য কম থাকবে সেটার নিসাবের সাথে মিলাতে হবে। এতে গরীবদের লাভের প্রতি লক্ষ্য রাখা হয়। কেননা বর্তমানে স্বর্ণের মূল্য হিসাব করলে অনেকের উপরই যাকাত ফরয হবে না; কিন্তু রৌপ্যের মূল্য হিসাব করলে যাকাত ফরয হয়।
দুই: অধিকাংশ মুহাদ্দিস ও মুহাক্কিক আলেমগণই নগদ অর্থ ও ব্যবসায়ের মালের যাকাত নির্ণয়ের ক্ষেত্রে স্বর্ণের নিসাবকে মূল নিসাব সাব্যস্ত করেছেন। উল্লেখ্য যে, স্বর্ণ খাঁটি না হলে মালিকানাধীন স্বর্ণ থেকে খাদ বাদ দিয়ে স্বর্ণের নিট ওজনকে ভিত্তি হিসেবে ধরে নিতে হবে। রৌপ্য যদি খাঁটি না হয় তাহলে রৌপ্যের ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য হবে।
📄 স্বর্ণ ও রৌপ্যের উপর যাকাত নগদ অর্থে রূপান্তরিত করার পদ্ধতি
মালিকানাধীন স্বর্ণ ও রৌপ্যের উপর যাকাতের পরিমাণ নগদে নির্ণয়ের জন্য যাকাত বাবদ নির্ধারিত পরিমাণকে গ্রাম প্রতি মূল্য দ্বারা গুণ করে নিতে হবে। উদাহরণ স্বরূপ, স্বর্ণের বাজার দর প্রতি গ্রাম ২,০০০/- টাকা হলে ৮৫ গ্রামের মূল্য = ১,৭০,০০০/- টাকা, যার উপর যাকাত হবে ২.৫% হারে (১,৭০,০০০ ÷ ৪০) = ৪,২৫০/- টাকা। আর রূপার বাজার দর প্রতি গ্রাম ৫০ টাকা হলে ৫৯৫ গ্রামের মূল্য = ২৯,৭৫০/- টাকা, যার উপর যাকাত হবে ২.৫% হারে (২৯৭৫০ ÷ ৪০) = ৭৪৩.৭৫ টাকা। যাকাত হিসাব করার সময় এসব স্বর্ণ ও রৌপ্যের বিক্রয় মূল্যের অর্থাৎ যাকাত হিসাব করার সময় বিক্রয় করতে চাইলে যে মূল্য পাওয়া যাবে এর ভিত্তিতে যাকাত হিসাব করতে হবে। উল্লেখ্য যে, কারো নিকট যদি স্বর্ণ অথবা রৌপ্য না থাকে; কিন্তু স্বর্ণের অথবা রৌপ্যের নিসাবের বাজার মূল্যের সমপরিমাণ অর্থ থাকে, তাহলে তাকে স্বর্ণ অথবা রৌপ্যের নিসাব অনুযায়ীই যাকাত দিতে হবে。
📄 ব্যবহারী অলংকারের উপর যাকাত
স্বর্ণ ও রৌপ্য যে অবস্থাতেই থাকুক না কেন, সর্বাবস্থায় এর উপর যাকাত প্রদান করা ফরয। হাদীসে এসেছে,
আমর ইবনে শু'আইব (রাঃ) তার পিতা, তিনি তার দাদা হতে বর্ণনা করেন, জনৈক মহিলা তার মেয়েকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট আসলেন। সে সময় তার মেয়ের হাতে দুটি স্বর্ণের বালা পরা ছিল। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে বললেন, তুমি এর যাকাত আদায় করেছ? মেয়েটি উত্তরে বলল, না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, তোমার কাছে কি এটা পছন্দনীয় যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা এগুলোকে আগুনের চুড়ি বানিয়ে তোমার হাতে পরিয়ে দিন? (বর্ণনাকারী) বলেন, এরপর মেয়েটি সেগুলো খুলে ফেলল এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট দিয়ে দিল। তারপর বলল, এগুলো আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের জন্য।
অপর হাদীসে এসেছে,
রাসূলুল্লাহ ﷺ এর স্ত্রী আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ ﷺ আমার নিকটে এসে দেখেন যে, আমি রূপার আংটি পরে আছি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এটা কী- হে আয়েশা? উত্তরে আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনার জন্যই নিজেকে সজ্জিত করতে এগুলো তৈরি করেছি। তিনি বললেন, তুমি কি এগুলোর যাকাত আদায় করেছ? আমি বললাম, না অথবা মাশাআল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহ যেমনটা চেয়েছেন তেমনটাই হয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, তোমার জাহান্নামে যাওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা এক মহিলা তাকে জিজ্ঞেস করলেন যে, অলংকারের যাকাত দিতে হবে কি? তিনি বললেন, যদি তা ২০০ দিরহামে পৌঁছে, তাহলে তার যাকাত দিতে হবে।
সুতরাং ব্যবহারী অলংকার যদি নিসাব পর্যন্ত পৌঁছে, তাহলে উক্ত অলংকারের উপরও যাকাত প্রদান করা ফরয।
টিকাঃ
২১৩. আবু দাউদ, হা/১৫৬৫; নাসাঈ, হা/২৪৭৯; দার কুতনী, হা/১৯৮২; বায়হাকী, হা/৭৩৪০।
২১৪. আবু দাউদ, হা/১৫৬৭; দার কুতনী, হা/১৯৫১; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/১৪৩৭; বায়হাকী, হা/৭৩৩৮।
২১৫. মু'জামুল কাবীর লিত তাবারানী, হা/৯৪৭৮; সনদটি হাসান।
📄 একাধিক মালিকানায় স্বর্ণ ও রৌপ্য নিসাব পরিমাণ হলে যাকাত ফরয হবে কি
যাকাত ফরয হওয়ার জন্য অন্যতম একটি শর্ত হচ্ছে, ব্যক্তিকে এককভাবে নিসাব পরিমাণ সম্পদের পূর্ণ মালিকানা অর্জন করতে হবে। সুতরাং একাধিক মালিকানাভুক্ত স্বর্ণ ও রৌপ্য যদি নিসাব পরিমাণ হয়ে যায়, তাহলে উক্ত সম্পদের উপর যাকাত আদায় করা আবশ্যক হবে না।
অনুরূপভাবে যদি একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তির নিকট পৃথক পৃথকভাবে এত পরিমাণ সম্পদ থাকে, যা যাকাতের নিসাবের সমতুল্য, তাহলে তাদের উপর যাকাত ফরয হবে না। বরং যখন পরিবারের কোন সদস্য এককভাবে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে, তখন তাকে যাকাত দিতে হবে। তবে যদি একজনের মালিকানাভুক্ত বস্তু কয়েকজনে ব্যবহার করে এবং উক্ত সম্পদ নিসাব পরিমাণ হয়, তাহলে উক্ত সম্পদের যাকাত দিতে হবে。