📄 যাকাতের নিসাব
যে পরিমাণ মাল থাকলে যাকাত ফরয হয় তাকে ‘নিসাব’ বলে। আর যিনি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক, তাকে ‘সাহেবে নিসাব’ বলা হয়। কোন ব্যক্তির নিকট যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে, তাহলে তার উপর যাকাত প্রদান করা ফরয হবে। নিচে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন বস্তুর যাকাতের নিসাব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
📄 স্বর্ণ ও রৌপ্যের যাকাত
স্বর্ণের নিসাব : স্বর্ণের যাকাতের ক্ষেত্রে এর নিসাবের পরিমাণ হচ্ছে ২০ দিনার। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, 'আর যদি তোমার নিকট বিশ দিনারের কম স্বর্ণ মজুদ থাকে, তাহলে তোমার উপর যাকাত ফরয নয়। তবে যদি তোমার নিকট ২০ দিনার পরিমাণ স্বর্ণ মজুদ থাকে এবং সেটা এক বছর পর্যন্ত অতিবাহিত হয়, তাহলে তার জন্য অর্ধ দিনার যাকাত দিতে হবে। এরপরে যা বৃদ্ধি পাবে তার হিসাব ঐভাবেই হবে।'
উল্লেখ্যে যে, ১ দিনার সমান হচ্ছে ৪.২৫ গ্রাম। সুতরাং ২০ দিনার সমান হচ্ছে ২০ × ৪.২৫ = ৮৫ গ্রাম। অতএব ১১.৬৬ গ্রাম সমান যদি ১ ভরি হয়, তাহলে ৮৫ গ্রাম সমান হচ্ছে, ৮৫ ÷ ১১.৬৬ = ৭.২৯ ভরি। তবে স্বর্ণের নিসাব সাড়ে সাত ভরি ধরা হয়।
রৌপ্যের নিসাব : রৌপ্যের নিসাবের পরিমাণ হচ্ছে, ৫ উকিয়া বা ২০০ দিরহাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'পাঁচ উকিয়ার কম পরিমাণ রৌপ্যে যাকাত নেই।'
উল্লেখ্যে যে, ১ উকিয়া সমান হচ্ছে ৪০ দিরহাম। সুতরাং ৫ উকিয়া সমান হচ্ছে ২০০ দিরহাম। অপর হাদীসে এসেছে, 'যখন তোমার নিকট ২০০ দিরহাম মজুদ থাকবে এবং সেটা এক বছর পর্যন্ত অতিবাহিত হবে, তাহলে তা থেকে ৫ দিরহাম যাকাত দিতে হবে। এরপরে যা বৃদ্ধি পাবে তার হিসাব ঐভাবেই হবে।'
অপর হাদীসে এসেছে, 'তোমরা প্রতি ২০ দিরহামে ১ দিরহাম যাকাত আদায় করবে। আর ২০০ দিরহাম পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তোমাদের উপর কোন কিছুই ফরয নয়। অতঃপর ২০০ দিরহাম পূর্ণ হলে এর যাকাত হবে ৫ দিরহাম এবং এর অতিরিক্ত হলে তার যাকাত উপরোক্ত হিসাব অনুযায়ী প্রদান করতে হবে।'
উপরের হাদীস দুটিতে বর্ণিত ২০০ দিরহাম সমান হচ্ছে ৫৯৫ গ্রাম। অতএব ১১.৬৬ গ্রাম সমান যদি ১ ভরি হয়, তাহলে ৫৯৫ গ্রাম সমান হচ্ছে, ৫৯৫ ÷ ১১.৬৬ = ৫১.০২ ভরি। তবে রৌপ্যের নিসাব সাড়ে বায়ান্ন ভরি ধরা হয়।
টিকাঃ
২০৯. আবু দাউদ, হা/১৫৭৫; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/৭৭৮৩।
২১০. সহীহ বুখারী, হা/১৪৮৪; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/৭৭৬৫।
২১১. আবু দাউদ, হা/১৫৭৫; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/৭৭৮৩।
২১২. আবু দাউদ, হা/১৫৭৪; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/২২৯৭; সুনানে দুর কাতুনী, হা/১৮৯৮।
📄 যাকাত নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বর্ণের নিসাব প্রযোজ্য নাকি রৌপ্যের নিসাব
এ ব্যাপারে আলেমদের দু'টি মতামত রয়েছে:
এক: অনেক আলেমের মতে, স্বর্ণ ও রৌপ্যের মধ্য থেকে বাজারে যেটার মূল্য কম থাকবে সেটার নিসাবের সাথে মিলাতে হবে। এতে গরীবদের লাভের প্রতি লক্ষ্য রাখা হয়। কেননা বর্তমানে স্বর্ণের মূল্য হিসাব করলে অনেকের উপরই যাকাত ফরয হবে না; কিন্তু রৌপ্যের মূল্য হিসাব করলে যাকাত ফরয হয়।
দুই: অধিকাংশ মুহাদ্দিস ও মুহাক্কিক আলেমগণই নগদ অর্থ ও ব্যবসায়ের মালের যাকাত নির্ণয়ের ক্ষেত্রে স্বর্ণের নিসাবকে মূল নিসাব সাব্যস্ত করেছেন। উল্লেখ্য যে, স্বর্ণ খাঁটি না হলে মালিকানাধীন স্বর্ণ থেকে খাদ বাদ দিয়ে স্বর্ণের নিট ওজনকে ভিত্তি হিসেবে ধরে নিতে হবে। রৌপ্য যদি খাঁটি না হয় তাহলে রৌপ্যের ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য হবে।
📄 স্বর্ণ ও রৌপ্যের উপর যাকাত নগদ অর্থে রূপান্তরিত করার পদ্ধতি
মালিকানাধীন স্বর্ণ ও রৌপ্যের উপর যাকাতের পরিমাণ নগদে নির্ণয়ের জন্য যাকাত বাবদ নির্ধারিত পরিমাণকে গ্রাম প্রতি মূল্য দ্বারা গুণ করে নিতে হবে। উদাহরণ স্বরূপ, স্বর্ণের বাজার দর প্রতি গ্রাম ২,০০০/- টাকা হলে ৮৫ গ্রামের মূল্য = ১,৭০,০০০/- টাকা, যার উপর যাকাত হবে ২.৫% হারে (১,৭০,০০০ ÷ ৪০) = ৪,২৫০/- টাকা। আর রূপার বাজার দর প্রতি গ্রাম ৫০ টাকা হলে ৫৯৫ গ্রামের মূল্য = ২৯,৭৫০/- টাকা, যার উপর যাকাত হবে ২.৫% হারে (২৯৭৫০ ÷ ৪০) = ৭৪৩.৭৫ টাকা। যাকাত হিসাব করার সময় এসব স্বর্ণ ও রৌপ্যের বিক্রয় মূল্যের অর্থাৎ যাকাত হিসাব করার সময় বিক্রয় করতে চাইলে যে মূল্য পাওয়া যাবে এর ভিত্তিতে যাকাত হিসাব করতে হবে। উল্লেখ্য যে, কারো নিকট যদি স্বর্ণ অথবা রৌপ্য না থাকে; কিন্তু স্বর্ণের অথবা রৌপ্যের নিসাবের বাজার মূল্যের সমপরিমাণ অর্থ থাকে, তাহলে তাকে স্বর্ণ অথবা রৌপ্যের নিসাব অনুযায়ীই যাকাত দিতে হবে。