📄 যাকাত ফরয হওয়ার শর্তসমূহ
১. মুসলিম হওয়া: ইসলামের ইবাদাতসমূহ কেবল মুসলিমদের জন্যই প্রযোজ্য। সুতরাং কোন অমুসলিমের উপর যাকাত আদায় করা ফরয নয়। ঈমান ব্যতীত কোন ইবাদাত গ্রহণযোগ্যও নয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন- 'তাদের দান গ্রহণে বাধা কেবল এই ছিল যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অস্বীকার করত।' (সূরা তওবা- ৫৪)
২. স্বাধীন হওয়া :
যাকাত আদায়ের জন্য স্বাধীন হওয়া পূর্বশর্ত। সুতরাং কৃতদাস ও দাসীর উপর যাকাত আদায় করা ফরয নয়। কেননা তারা নিজেরাই অন্যের সম্পত্তির অংশ বিশেষ এবং তারা কোন সম্পদের মালিক হতে পারে না। হাদীসে এসেছে, আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে বর্ণনা করে বলেন, সাদাকাতুল ফিতর ব্যতীত ক্রীতদাসের উপর কোন সাদাকা নেই।
৩. নিসাব পরিমাণ সম্পদ হওয়া:
যাকাত ফরয হওয়ার জন্য নিসাব পরিমাণ মাল বিদ্যমান থাকা আবশ্যক। সুতরাং যদি কারো নিকট নিসাব পরিমাণ সম্পদের চেয়ে সামান্য পরিমাণ কম সম্পদ বিদ্যমান থাকে, তার উপর যাকাত আদায় করা আবশ্যক নয়। যেমন- হাদীসে এসেছে, আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, পাঁচ ওয়াসাকের কম উৎপন্ন দ্রব্যের উপর যাকাত নেই, পাঁচটির কম উটের উপর যাকাত নেই এবং পাঁচ উকিয়ার কম পরিমাণ রৌপ্যের উপরও যাকাত নেই।
৪. সম্পদের পূর্ণ দখল (হস্তগত) থাকা :
যাকাত ফরয হওয়ার জন্য যাকাতের মালের পূর্ণ দখল থাকা আবশ্যক। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'তাদের সম্পদ হতে যাকাত গ্রহণ করো।' (সূরা তওবা- ১০৩) সুতরাং যেসব সম্পদ এখনও পূর্ণ হস্তগত হয়নি, সেসব সম্পদের উপর যাকাত আদায় করা আবশ্যক নয়। বরং যখন হস্তগত হবে তখন তার উপর যাকাত আবশ্যক হবে।
৫. এক বছর অতিবাহিত হওয়া:
যাকাত প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট সময় প্রদান করতে হয় এবং উক্ত মাল ব্যক্তির নিকট এক বছর যাবৎ হস্তগত থাকতে হয়। তারপর যদি দেখা যায় যে, তার মাল নিসাব পরিমাণ হয়েছে, তাহলে তার উক্ত মালের যাকাত প্রদান করা আবশ্যক; নতুবা আবশ্যক হবে না। হাদীসে এসেছে, আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ -কে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেন, এক বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত সম্পদের কোন যাকাত নেই। সুতরাং কারো নিকট যদি ৫টি উট অথবা ৩০টি গরু অথবা ৪০টি ছাগল অথবা ৭.৫ ভরি স্বর্ণ থাকে এবং বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই তার থেকে কিছু অংশ হাত ছাড়া হয়ে যায়, তাহলে তার উপর যাকাত আদায় করা আবশ্যক হবে না। তবে জমি হতে উৎপন্ন ফসল কাটার সময়ই যাকাত দিয়ে দিতে হবে। এক্ষেত্রে এক বছর অতিবাহিত হওয়ার শর্তটি প্রযোজ্য হবে না। তাছাড়া গবাদি পশুর বাচ্চা এবং ব্যবসায়িক সম্পদের লভ্যাংশের ক্ষেত্রেও পূর্ণ এক বছর হওয়া শর্ত নয়। বরং এগুলো তাদের মূলের দিকে ফিরে যাবে। অর্থাৎ গবাদি পশুর বাচ্চার হিসাব তার মায়ের হিসাবের সাথে যোগ করা হবে এবং ব্যবসায়িক সম্পদের লভ্যাংশ তার মূলধনের সাথে যোগ করা হবে।
বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বে যাকাত আদায়ের বিধান:
যাকাত ফরয হওয়ার জন্য একটি শর্ত হচ্ছে, নিসাব পরিমাণ সম্পদ পূর্ণ এক বছর হস্তগত থাকা। তবে কেউ যদি এক বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই যাকাত আদায় করতে চায়, তাহলে তার জন্য তা বৈধ আছে। হাদীসে এসেছে, আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নিশ্চয় আব্বাস (রাঃ) রাসূলুল্লাহ ﷺ কে এক বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই যাকাত আদায় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাকে অনুমতি দিলেন।
টিকাঃ
২০৫. সহীহ মুসলিম, হা/২৩২৩; মুসনাদে আহমাদ, হা/৯৪৩৬; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/২২৮৯; সুনানে দার কুতনী, হা/২০২৪; জামেউস সগীর, হা/৯৫৪৪।
২০৬. সহীহ বুখারী, হা/১৪৮৪; সহীহ মুসলিম, হা/২৩১০; আবু দাউদ, হা/১৫৬০; তিরমিযী, হা/৬২৬; নাসাঈ, হা/২৪৪৫; মুসনাদে আহমাদ, হা/৯২১০।
২০৭. ইবনে মাজাহ, হা/১৭৯২; মুসনাদুল বাযযার, হা/৩০৪; সুনানে দার কুতনী, হা/১৮৮৯; জামেউস সগীর, হা/১৩৪৫৪।
২০৮. আবু দাউদ, হা/১৬২৬; তিরমিযী, হা/৬৭৮; ইবনে মাজাহ, হা/১৭৯৫; মুসনাদে আহমাদ, হা/৮২২; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৫৪৩১; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/১৯৭৫১; মিশকাত, হা/১৭৮৮।
📄 যেসব সম্পদের উপর যাকাত আদায় করা ফরয
যেসব সম্পদের উপর যাকাত আদায় করা ফরয হয়- সেগুলা মূলত ৫ প্রকার। যথা-
১. স্বর্ণ ও রৌপ্য : স্বর্ণ ও রৌপ্য হচ্ছে অনেক মূল্যবান খনিজ পদার্থ। আল্লাহ তা'আলা এগুলোর উপর পৃথকভাবে যাকাত নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সুতরাং যার নিকট নিসাব পরিমাণ স্বর্ণ অথবা রৌপ্য পূর্ণ এক বছর পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে, তাকে অবশ্যই যাকাত দিতে হবে।
২. ব্যবসায়িক পণ্য : ব্যবসার উদ্দেশ্যে যেসব পণ্য উৎপাদন ও ক্রয়-বিক্রয় করা হয়, সেগুলোকেই ব্যবসায়িক পণ্য বলা হয়। আল্লাহ তা'আলা এসব পণ্যের ক্ষেত্রেও যাকাত নির্ধারণ করেছেন। সুতরাং প্রতি বৎসরের নির্দিষ্ট সময়ে ব্যবসায়িক পণ্যগুলো হিসাব করে তার উপর নির্ধারিত হারে যাকাত প্রদান করা আবশ্যক।
৩. গৃহপালিত পশু : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেসব গৃহপালিত পশুর উপর যাকাত ফরয করেছেন সেগুলো হলো- উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা। সুতরাং যার নিকট এসব সম্পদ নিসাব পরিমাণ পূর্ণ এক বছর পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে, তাকে অবশ্যই যাকাত প্রদান করতে হবে।
৪. ভূমি থেকে উৎপন্ন ফসল : যেসব ফসল ভূমি থেকে উৎপন্ন হয়, সেসব ফসল থেকেও যাকাত প্রদান করা আবশ্যক। যেমন- গম, যব, খেজুর, কিসমিস, ধান ইত্যাদি।
৫. খনিজ সম্পদ ও মাটির নিচে সঞ্চিত সম্পদ বা গুপ্তধন:
মাটির নিচে সাধারণত দুই ধরনের সম্পদ পাওয়া যায়। একটি হচ্ছে- খনিজ সম্পদ, যা আল্লাহ তা'আলা মানুষের জন্য সৃষ্টি করে মাটির নিচে রেখেছেন। যেমন- স্বর্ণ, রৌপ্য, তামা, ইউরেনিয়াম, কয়লা, গ্যাস ইত্যাদি। আর আরেকটি হচ্ছে, পূর্ববর্তী যুগের মানুষ কর্তৃক লুকিয়ে রাখা সম্পদ। যা আল্লাহ তা'আলা তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী যে কারো নিকট হস্তগত করার ব্যবস্থা করে দেন। আল্লাহ তা'আলা উভয় প্রকার সম্পদের উপর যাকাত আদায় করা আবশ্যক করে দিয়েছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি এ ধরনের কোন সম্পদ প্রাপ্ত হবে, তার উপর নির্দিষ্ট পরিমাণ যাকাত প্রদান করা আবশ্যক হয়ে যাবে।
📄 যাকাতের নিসাব
যে পরিমাণ মাল থাকলে যাকাত ফরয হয় তাকে ‘নিসাব’ বলে। আর যিনি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক, তাকে ‘সাহেবে নিসাব’ বলা হয়। কোন ব্যক্তির নিকট যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে, তাহলে তার উপর যাকাত প্রদান করা ফরয হবে। নিচে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন বস্তুর যাকাতের নিসাব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
📄 স্বর্ণ ও রৌপ্যের যাকাত
স্বর্ণের নিসাব : স্বর্ণের যাকাতের ক্ষেত্রে এর নিসাবের পরিমাণ হচ্ছে ২০ দিনার। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, 'আর যদি তোমার নিকট বিশ দিনারের কম স্বর্ণ মজুদ থাকে, তাহলে তোমার উপর যাকাত ফরয নয়। তবে যদি তোমার নিকট ২০ দিনার পরিমাণ স্বর্ণ মজুদ থাকে এবং সেটা এক বছর পর্যন্ত অতিবাহিত হয়, তাহলে তার জন্য অর্ধ দিনার যাকাত দিতে হবে। এরপরে যা বৃদ্ধি পাবে তার হিসাব ঐভাবেই হবে।'
উল্লেখ্যে যে, ১ দিনার সমান হচ্ছে ৪.২৫ গ্রাম। সুতরাং ২০ দিনার সমান হচ্ছে ২০ × ৪.২৫ = ৮৫ গ্রাম। অতএব ১১.৬৬ গ্রাম সমান যদি ১ ভরি হয়, তাহলে ৮৫ গ্রাম সমান হচ্ছে, ৮৫ ÷ ১১.৬৬ = ৭.২৯ ভরি। তবে স্বর্ণের নিসাব সাড়ে সাত ভরি ধরা হয়।
রৌপ্যের নিসাব : রৌপ্যের নিসাবের পরিমাণ হচ্ছে, ৫ উকিয়া বা ২০০ দিরহাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'পাঁচ উকিয়ার কম পরিমাণ রৌপ্যে যাকাত নেই।'
উল্লেখ্যে যে, ১ উকিয়া সমান হচ্ছে ৪০ দিরহাম। সুতরাং ৫ উকিয়া সমান হচ্ছে ২০০ দিরহাম। অপর হাদীসে এসেছে, 'যখন তোমার নিকট ২০০ দিরহাম মজুদ থাকবে এবং সেটা এক বছর পর্যন্ত অতিবাহিত হবে, তাহলে তা থেকে ৫ দিরহাম যাকাত দিতে হবে। এরপরে যা বৃদ্ধি পাবে তার হিসাব ঐভাবেই হবে।'
অপর হাদীসে এসেছে, 'তোমরা প্রতি ২০ দিরহামে ১ দিরহাম যাকাত আদায় করবে। আর ২০০ দিরহাম পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তোমাদের উপর কোন কিছুই ফরয নয়। অতঃপর ২০০ দিরহাম পূর্ণ হলে এর যাকাত হবে ৫ দিরহাম এবং এর অতিরিক্ত হলে তার যাকাত উপরোক্ত হিসাব অনুযায়ী প্রদান করতে হবে।'
উপরের হাদীস দুটিতে বর্ণিত ২০০ দিরহাম সমান হচ্ছে ৫৯৫ গ্রাম। অতএব ১১.৬৬ গ্রাম সমান যদি ১ ভরি হয়, তাহলে ৫৯৫ গ্রাম সমান হচ্ছে, ৫৯৫ ÷ ১১.৬৬ = ৫১.০২ ভরি। তবে রৌপ্যের নিসাব সাড়ে বায়ান্ন ভরি ধরা হয়।
টিকাঃ
২০৯. আবু দাউদ, হা/১৫৭৫; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/৭৭৮৩।
২১০. সহীহ বুখারী, হা/১৪৮৪; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/৭৭৬৫।
২১১. আবু দাউদ, হা/১৫৭৫; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/৭৭৮৩।
২১২. আবু দাউদ, হা/১৫৭৪; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/২২৯৭; সুনানে দুর কাতুনী, হা/১৮৯৮।