📄 পেটের রোযা
মুমিনের পেটও রোযা রাখে। পেট রোযা রাখে হারাম খাদ্য খাওয়া থেকে। সুতরাং সে হারাম খাবার সাহারীতে খায় না এবং ইফতারীতেও খায় না। সুদ, ঘুষ এবং অন্যান্য হারাম উপায়ে উপার্জিত সম্পদ কখনো সে তার পেটে প্রবেশ করায় না। কেননা যে ব্যক্তি নিজ উদরে হারাম মাল প্রবেশ করায়; অর্থাৎ যার খাদ্য ও পানীয় হারাম হয় তার দু'আ কবুল হয় না। হাদীসে এসেছে,
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, হে লোক সকল! নিশ্চয় আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র ছাড়া কোন কিছু গ্রহণ করেন না। আর আল্লাহ তা'আলা রাসূলদেরকে যে নির্দেশ দিয়েছিলেন মুমিনদেরকেও সেই নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, হে রাসূলগণ! তোমরা পবিত্র জিনিস খাও এবং নেক আমল করো। নিশ্চয় তোমরা যা কর সে বিষয়ে আমি অবগত আছি। (সূরা মু'মিনূন- ৫১) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন, হে ঈমানদারগণ! আমি তোমাদেরকে যে রিযিক দান করেছি তা থেকে পবিত্র জিনিস খাও। (সূরা বাকারা- ১৭২)
অতঃপর নবী ﷺ এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, যে দীর্ঘ সফর করে, এলোমেলো কেশবিশিষ্ট, ধূলোয় মলিন শরীর, সে আকাশের দিকে হাত তুলে বলে, হে আমার রব! হে আমার রব! অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং হারামের দ্বারা সে প্রতিপালিত হয়েছে, সুতরাং কীভাবে তার দু'আ কবুল হবে?
উপরের হাদীস থেকে আমরা জানতে পারলাম যে, ইবাদাত কবুল হওয়ার জন্য হালাল রিযিক খাওয়া পূর্বশর্ত। অন্যথায় ইবাদাত কবুল না হওয়ার কারণে জাহান্নামে যেতে হবে। হাদীসে এসেছে,
আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) নবী ﷺ হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, যে শরীর হারাম দ্বারা প্রতিপালিত তার জন্য জাহান্নামের আগুনই উপযুক্ত।
টিকাঃ
১৭৬. সহীহ মুসলিম, হা/২৩৯৩; তিরমিযী, হা/২৯৮৯; মুসনাদে আহমাদ, হা/৮৩৩০; বায়হাকী, হা/৬১৮৭; সুনানে দারেমী, হা/২৭১৭; শারহুস সুন্নাহ, হা/২০২৮; জামেউস সগীর, হা/৪৫১০; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/১৭১৭; মিশকাত, হা/২৭৬০।
১৭৭. মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৭১৬৪; জামেউস সগীর, হা/৮৬৪৮; মিশকাত, হা/২৮২৫।
📄 অন্তরের রোযা
নবী ﷺ বলেছেন, জেনে রাখো! দেহের মধ্যে এমন এক মাংসপিণ্ড আছে, যা ভালো হলে সারা দেহ ভালো হবে এবং খারাপ হলে সারা দেহ খারাপ হবে। শোনো! তা হলো অন্তর। দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের রাজা হলো অন্তর। এই অন্তর যখনই রোযা রাখবে, তখনই সকল অঙ্গে তা কার্যকর হবে।
• মুমিনের অন্তর রমাযান মাসে এবং অন্য মাসেও রোযা রাখে। আর তার রোযা হবে তাকে শিরক, বাতিল বিশ্বাস, নোংরা চিন্তা-ভাবনা, হীন পরিকল্পনা এবং খারাপ কল্পনা- এসব থেকে মুক্ত রাখা।
• মুমিনের অন্তর রোযা রাখে গর্ব করা থেকে। কারণ যে ব্যক্তি গর্ব করে এবং চাল-চলনে অহংকার প্রদর্শন করে, সে ব্যক্তি যখন আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে তখন তিনি তার প্রতি ক্রোধান্বিত থাকবেন।
• মুমিনের অন্তর রোযা রাখে অপরের প্রতি হিংসা করা থেকে। কারণ কোন বান্দার হৃদয়ে ঈমান ও হিংসা এক সাথে থাকতে পারে না।
• মুমিনের অন্তর রোযা রাখে কারো প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা থেকে। কারণ বিদ্বেষ হলো মুণ্ডনকারী, তা দ্বীন মুণ্ডন (ধ্বংস) করে ফেলে।
• মুমিনের অন্তর রোযা রাখে কৃপণতা থেকে। কারণ কোন বান্দার হৃদয়ে ঈমান ও কৃপণতা একত্রে জমা হতে পারে না।
• এভাবে যদি আমরা রোযা রাখি এবং রোযার দাবি ও শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে তা বাস্তবে প্রয়োগ করি তাহলেই আমাদের রোযা সার্থক ও গ্রহণযোগ্য হবে। তা না হলে দীর্ঘ একটি মাস কষ্ট করে রোযা রেখে যদি এর কোন প্রভাব আমাদের উপর না পড়ে, একটুখানি তাকওয়া বা আল্লাহর ভয় আমাদের মধ্যে যদি না জাগে, তাহলে এর চেয়ে দুঃখজনক এবং পরিতাপের বিষয় আর কী হতে পারে?
টিকাঃ
১৭৮. সহীহ বুখারী, হা/৫২; সহীহ মুসলিম, হা/৪১৭৮; ইবনে মাজাহ, হা/৩৯৮৪; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৮৩৯৮; মুসনাদুল বাযযার, হা/৩২৭৬; মুস্তাখরাজে আবু আওয়ানা, হা/৪৪৩৬; বায়হাকী, হা/১০১৮০; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/১৭৩১; সিলসিলা সহীহাহ, হা/২৭০৮; জামেউস সগীর, হা/৫৫০৪; মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হা/২২৪৩৫; মুসনাদে দারেমী, হা/২৫৭৩; মিশকাত, হা/২৭৬২।
১৭৯. মুসনাদে আহমাদ, হা/৫৯৯৫; আদাবুল মুফরাদ, হা/৫৪৯; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/২৯১৮।
১৮০. নাসাঈ, হা/৩১০৯; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩৬০৬; মু'জামুল কাবীর লিত তাবারানী, হা/১৪৪; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/২৮৮৬।
১৮১. তিরমিযী, হা/২৫১০; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৪৩০; মুসনাদুত তায়ালুসী, হা/১৯০; মিশকাত, হা/৫০৩৯।
১৮২. নাসাঈ, হা/৩১১০; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩২৫১; মুসনাদে সাদ ইবনে মানসূর, হা/২৪০১; আদাবুল মুফরাদ, হা/২৮১; বায়হাকী, হা/১৮২৮৯; শারহুস সুন্নাহ, হা/২৬১৯; মিশকাত, হা/৩৮২৮।
📄 একটু ভাবুন!
* রমাযান কুরআন নাযিলের মাস; অথচ আমি এই কুরআনকে ভালো করে পড়লাম না, বুঝলাম না, আমলও করলাম না, তাহলে এই কুরআন কি আমার জন্য শাফায়াত করবে?
* আমি রোযা রাখলাম; কিন্তু মিথ্যা বলতে ও পরের দোষচর্চা করতে আমার ভয় হলো না, অশ্লীল গান-বাজনা শোনা থেকে, টেলিভিশনের কুদৃশ্য দেখা থেকে বিরত থাকলাম না, তাহলে এই রোযা কীভাবে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে এবং কীভাবে আমার নাজাতের অসীলা হবে?
* রোযার কারণে আমি দিনের বেলায় বিড়ি-সিগারেট থেকে দূরে থাকলাম; কিন্তু ইফতারের পরেই ধূমপান শুরু করে দিলাম- যা শরীয়তের দিক থেকে নিষিদ্ধ এবং স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকেও ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত। তাহলে এই রোযার সার্থকতা কী থাকল? আমার নাফসকে তো নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না।
* রোযা রাখলাম ঠিকই; কিন্তু হারাম উপার্জন ছাড়লাম না, ব্যবসায় মিথ্যা ও ধোঁকাবাজি ত্যাগ করলাম না, অন্যায় থেকে বিরত হতে পারলাম না, জাহান্নামের আগুনকে একটু ভয় করলাম না, তাহলে রোযা রেখে আমি কতটুকু তাকওয়া অর্জন করতে পারলাম?
* আল্লাহ যিনা-ব্যভিচার হারাম করেছেন এবং যিনাকারী ছেলে-মেয়েকে একশত বেত্রাঘাত করতে বলেছেন; অথচ বর্তমানে অহরহ যিনা হচ্ছে। আল্লাহ অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করতে নিষেধ করেছেন এবং এজন্য ক্বিসাসের বিধান দিয়েছেন; অথচ বর্তমানে পশু-পাখির মতো মানুষ মারা হচ্ছে। আল্লাহ চোর নারী-পুরুষের হাত কেটে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন; অথচ বরাবর চুরি হচ্ছে, কারো হাত কাটা হচ্ছে না। আমরা জানি যে, এ বিধানগুলো পালন করতে হলে সরকারী ক্ষমতার প্রয়োজন। কিন্তু আমরা সংঘবদ্ধ হয়ে আল্লাহর দ্বীন কায়েমের জন্য কোন চেষ্টা-ফিকির করলাম না। রোযা রেখে একটি ফরয পালন করলাম; কিন্তু এই মহান ফরযটি পালনের চিন্তাও করলাম না। এখন আমরা আল্লাহর কাছে গিয়ে কী জবাব দেব? অথচ এই দ্বীন কায়েমের জন্য নবী ﷺ সাহাবীদের নিয়ে এই রোযার মাসেই শত্রুদের মোকাবেলা করার জন্য বদর প্রান্তরে যুদ্ধ করেছেন এবং কয়েকজন সাহাবী শাহাদাত বরণ করেছেন।
* আমি একজন মহিলা, আল্লাহ তা'আলা আমার সতীত্বকে হেফাযত করতে বলেছেন; কিন্তু আমি পর্দা করলাম না, আমার শরীরের অঙ্গগুলো পরপুরুষের সামনে প্রকাশ করলাম অথবা রোযার মাসে পর্দা করলাম পরে আর করলাম না, আল্লাহকে ভয় করলাম না তাহলে যে গুণটি অর্জনের জন্য একমাস রোযা রাখলাম তা তো অর্জিত হলো না।
* বৎসরে বার মাসের মধ্যে পূর্ণ একমাস আল্লাহ আমাদেরকে রোযা রাখার হুকুম দিয়েছেন; যেন এই একমাস সিয়াম সাধনার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়ার গুণ এতটুকু অর্জিত হয়, যা পরবর্তী এগার মাসের জন্য যথেষ্ট হতে পারে; অথচ দেখা যায়, রোযার মাসটি শেষ হওয়ার পর শাওয়ালের প্রথম দিনেই ঈদকে কেন্দ্র করে শহরে-বন্দরে যেসব অশ্লীলতা, নগ্নতা, যুবক-যুবতীদের অবাধ আড্ডা শুরু হয় তা দেখে মনে হয় যে, একমাসের তাকওয়া পরহেযগারীকে তারা রমাযান মাস শেষ হওয়ার সাথে সাথেই বমি করে ফেলে দিয়েছে।
* আমাদের মধ্যে অনেক ভাই-বোন রয়েছেন, যারা রোযার মাসে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত পড়েন, মোটামুটি আল্লাহর হুকুম মেনে চলার চেষ্টা করেন; কিন্তু রোযার মাস শেষ হলে তারা আবার আগের মতো হয়ে যান। এতে মনে হয় যে, একমাসের রোযা তাদের উপর কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি। এর উদাহরণ হচ্ছে এরূপ যেমন: কোন লোক ভাত খেয়ে বমি করে ফেলে দিল। এখন যে উদ্দেশ্যে সে খেয়েছিল তা আর অর্জিত হলো না, যেহেতু হজম হওয়ার আগেই সে তা বের করে দিয়েছে। অনুরূপভাবে যারা রোযার মাসে সালাত পড়েন, আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলার চেষ্টা করেন; কিন্তু রোযার পরে তা ছেড়ে দেন তারাও যেন একমাসে যেটুকু আল্লাহর ভয় অর্জিত হয়েছিল রমাযান শেষ হওয়ার সাথে সাথে তা বমি করে বের করে দেন। এখন তারা রোযা রেখেছেন ঠিকই; কিন্তু রোযার উদ্দেশ্য অর্জিত হয়নি। যদি হতো তাহলে তারা সারা বছর আল্লাহর বিধান অনুযায়ী জীবনযাপন করত।
* আসল ব্যাপার হচ্ছে, সালাত-রোযাকে আমরা ইবাদাতের অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে দিয়েছি। এর বাইরে এগুলোর কোন প্রভাব পড়ছে না। বিয়ে-শাদী, সমাজগঠন, ব্যবসা-বাণিজ্য, লেন-দেন ও রাষ্ট্র পরিচালনা এসব ক্ষেত্রে আমরা ইসলামের বিধান সঠিকভাবে পালন করি না। এটাই আমাদেরকে পিছিয়ে রেখেছে।
* রমাযান বিদায় নিল, তাই বলে কি মুমিনের আমল ভরা দিনগুলো শেষ হয়ে গেল? না, মুমিনের আমল তো কোন দিন শেষ হওয়ার নয়। মুমিনের কর্তব্য হলো, নিয়মিত আমল করে যাওয়া। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'মৃত্যু আসা পর্যন্ত তোমার প্রতিপালকের ইবাদাত করতে থাকো।' (সূরা হিজর- ৯৯) মহানবী ﷺ বলেছেন, আল্লাহর নিকট সেই আমল সবচেয়ে বেশি পছন্দনীয়, যা নিয়মিত পালন করা হয়; যদিও তা পরিমাণে কম হয়।
* রোযার মাস বিদায় নিয়েছে; কিন্তু রোযা বিদায় নেয়নি। যেহেতু রমাযানের রোযা ছাড়াও অন্যান্য সুন্নাত ও নফল রোযা রয়েছে।
* তারাবীর সালাতের মাস চলে গেল; কিন্তু নফল সালাত ও কিয়াম চলে যায়নি। কেননা তা কেবল রোযার মাসেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং মুমিন ব্যক্তি প্রত্যেক রাতে তাহাজ্জুদের সালাত আদায়ের অভ্যাস গড়ে তুলবে।
* কোন নেক আমল আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়ার অন্যতম লক্ষণ এই যে, আমলকারী পুনরায় অন্যান্য সৎকর্ম করে থাকে। সুতরাং রমাযানের পর অন্যান্য নেক আমল করতে থাকলে রোযা ও তারাবীহ মহান আল্লাহর দরবারে কবুল হয়েছে বলে বুঝা যাবে।
* তাই আসুন! আমরা জীবনের সর্বক্ষেত্রে সর্বদা ইসলামের বিধিবিধান মেনে চলি, সাহাবাদের ঈমানের মতো আমাদের ঈমানকেও মজবুত করি- এটাই হোক রমাযান মাসে আমাদের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা।
* অতএব হে মুসলিম ভাই-বোনেরা! আপনারা আরামের নিদ্রা থেকে জেগে উঠুন। সফরের জন্য কিছু পথের সম্বল সংগ্রহ করে নিন। আল্লাহর দিকে ফিরে আসুন, হয়তোবা তাঁর সাড়া পাবেন। তাঁর রহমত পেয়ে সৌভাগ্যবান হবেন। আল্লাহর ভয়ে, জাহান্নামের ভয়ে চোখের পানি ফেলে রমাযান মাসকে বিদায় জানান। কারণ আমরা জানি না আগামী বছর আবার সেই মাসের সাথে সাক্ষাৎ হবে কি না, আবার ফরয রোযা পালন করার ও তারাবীর সালাত আদায় করার সুযোগ হবে কি না। আল্লাহ সবাইকে তাওফীক দান করুন। আমীন!
টিকাঃ
১৮৩. সহীহ বুখারী, হা/৬৪৬৪; সহীহ মুসলিম, হা/১৮৬৬; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৫৩৫৬; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩৫৩; জামেউস সগীর, হা/১৩৮৪৫; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৩১৭৩; শারহুস সুন্নাহ, হা/৯৩৭; মিশকাত, হা/১২৪২।