📄 চোখের রোযা
মুমিনের চোখও রোযা রাখে আল্লাহর হারামকৃত জিনিস দেখা হতে বিরত থাকার মাধ্যমে। হারাম কিছু চোখে পড়লে সে তার চক্ষুকে অবনত করে নেয়, অশ্লীল কিছু দেখা হতে দৃষ্টিকে ফিরিয়ে রাখে। যেমন: নোংরা ফিল্ম, শ্লীলতাহীন টিভি সিরিজ এবং পরনারী ইত্যাদি দেখা হতে বিরত থাকে। মহান আল্লাহ মুমিন পুরুষদেরকে সম্বোধন করে বলেন, 'মুমিন পুরুষদেরকে বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নিম্নগামী করে এবং নিজ নিজ যৌনাঙ্গের হেফাযত করে; এটিই তাদের জন্য উত্তম।' (সূরা নূর- ৩০)
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা মুমিন নারীদেরকেও সম্বোধন করে বলেন, 'আর মুমিন নারীদেরকে বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নিম্নগামী করে এবং নিজ নিজ যৌনাঙ্গের হেফাযত করে।' (সূরা নূর- ৩১)
📄 হাত ও পায়ের রোযা
মুমিনের হাত রোযা রাখে হারাম কিছু ধরা ও স্পর্শ করা থেকে। সুতরাং যে মহিলাকে স্পর্শ করা তার জন্য হালাল নয়, তাকে যেন স্পর্শ না করে। তার হাত যেন রোযা রাখে মানুষের উপর অত্যাচার করা থেকে, কাউকে অন্যায়ভাবে মারা থেকে। সুদ, ঘুষ, চুরি ও অন্যান্য হারাম পন্থায় অর্থ উপার্জন করা থেকেও মুমিনের হাত রোযা রাখে।
মুমিনের পা-ও রোযা রাখে। আর তার রোযা হলো- যে পথে গমন করলে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন সে পথে যাবে না। সকল প্রকার পাপাচারের পথে চলা হতে সে বিরত থাকবে। কারণ হাত-পা দিয়ে পাপ করলে কিয়ামতের ময়দানে এগুলো বান্দার বিরুদ্ধে সাক্ষী হয়ে দাঁড়াবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'আজ আমি তাদের মুখে মোহর মেরে দেব, তাদের হাত আমার সাথে কথা বলবে এবং তারা যা করত সে সম্পর্কে তাদের পা সাক্ষ্য দেবে।' (সূরা ইয়াসীন- ৬৫)
📄 পেটের রোযা
মুমিনের পেটও রোযা রাখে। পেট রোযা রাখে হারাম খাদ্য খাওয়া থেকে। সুতরাং সে হারাম খাবার সাহারীতে খায় না এবং ইফতারীতেও খায় না। সুদ, ঘুষ এবং অন্যান্য হারাম উপায়ে উপার্জিত সম্পদ কখনো সে তার পেটে প্রবেশ করায় না। কেননা যে ব্যক্তি নিজ উদরে হারাম মাল প্রবেশ করায়; অর্থাৎ যার খাদ্য ও পানীয় হারাম হয় তার দু'আ কবুল হয় না। হাদীসে এসেছে,
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, হে লোক সকল! নিশ্চয় আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র ছাড়া কোন কিছু গ্রহণ করেন না। আর আল্লাহ তা'আলা রাসূলদেরকে যে নির্দেশ দিয়েছিলেন মুমিনদেরকেও সেই নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, হে রাসূলগণ! তোমরা পবিত্র জিনিস খাও এবং নেক আমল করো। নিশ্চয় তোমরা যা কর সে বিষয়ে আমি অবগত আছি। (সূরা মু'মিনূন- ৫১) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন, হে ঈমানদারগণ! আমি তোমাদেরকে যে রিযিক দান করেছি তা থেকে পবিত্র জিনিস খাও। (সূরা বাকারা- ১৭২)
অতঃপর নবী ﷺ এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, যে দীর্ঘ সফর করে, এলোমেলো কেশবিশিষ্ট, ধূলোয় মলিন শরীর, সে আকাশের দিকে হাত তুলে বলে, হে আমার রব! হে আমার রব! অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং হারামের দ্বারা সে প্রতিপালিত হয়েছে, সুতরাং কীভাবে তার দু'আ কবুল হবে?
উপরের হাদীস থেকে আমরা জানতে পারলাম যে, ইবাদাত কবুল হওয়ার জন্য হালাল রিযিক খাওয়া পূর্বশর্ত। অন্যথায় ইবাদাত কবুল না হওয়ার কারণে জাহান্নামে যেতে হবে। হাদীসে এসেছে,
আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) নবী ﷺ হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, যে শরীর হারাম দ্বারা প্রতিপালিত তার জন্য জাহান্নামের আগুনই উপযুক্ত।
টিকাঃ
১৭৬. সহীহ মুসলিম, হা/২৩৯৩; তিরমিযী, হা/২৯৮৯; মুসনাদে আহমাদ, হা/৮৩৩০; বায়হাকী, হা/৬১৮৭; সুনানে দারেমী, হা/২৭১৭; শারহুস সুন্নাহ, হা/২০২৮; জামেউস সগীর, হা/৪৫১০; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/১৭১৭; মিশকাত, হা/২৭৬০।
১৭৭. মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৭১৬৪; জামেউস সগীর, হা/৮৬৪৮; মিশকাত, হা/২৮২৫।
📄 অন্তরের রোযা
নবী ﷺ বলেছেন, জেনে রাখো! দেহের মধ্যে এমন এক মাংসপিণ্ড আছে, যা ভালো হলে সারা দেহ ভালো হবে এবং খারাপ হলে সারা দেহ খারাপ হবে। শোনো! তা হলো অন্তর। দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের রাজা হলো অন্তর। এই অন্তর যখনই রোযা রাখবে, তখনই সকল অঙ্গে তা কার্যকর হবে।
• মুমিনের অন্তর রমাযান মাসে এবং অন্য মাসেও রোযা রাখে। আর তার রোযা হবে তাকে শিরক, বাতিল বিশ্বাস, নোংরা চিন্তা-ভাবনা, হীন পরিকল্পনা এবং খারাপ কল্পনা- এসব থেকে মুক্ত রাখা।
• মুমিনের অন্তর রোযা রাখে গর্ব করা থেকে। কারণ যে ব্যক্তি গর্ব করে এবং চাল-চলনে অহংকার প্রদর্শন করে, সে ব্যক্তি যখন আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে তখন তিনি তার প্রতি ক্রোধান্বিত থাকবেন।
• মুমিনের অন্তর রোযা রাখে অপরের প্রতি হিংসা করা থেকে। কারণ কোন বান্দার হৃদয়ে ঈমান ও হিংসা এক সাথে থাকতে পারে না।
• মুমিনের অন্তর রোযা রাখে কারো প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা থেকে। কারণ বিদ্বেষ হলো মুণ্ডনকারী, তা দ্বীন মুণ্ডন (ধ্বংস) করে ফেলে।
• মুমিনের অন্তর রোযা রাখে কৃপণতা থেকে। কারণ কোন বান্দার হৃদয়ে ঈমান ও কৃপণতা একত্রে জমা হতে পারে না।
• এভাবে যদি আমরা রোযা রাখি এবং রোযার দাবি ও শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে তা বাস্তবে প্রয়োগ করি তাহলেই আমাদের রোযা সার্থক ও গ্রহণযোগ্য হবে। তা না হলে দীর্ঘ একটি মাস কষ্ট করে রোযা রেখে যদি এর কোন প্রভাব আমাদের উপর না পড়ে, একটুখানি তাকওয়া বা আল্লাহর ভয় আমাদের মধ্যে যদি না জাগে, তাহলে এর চেয়ে দুঃখজনক এবং পরিতাপের বিষয় আর কী হতে পারে?
টিকাঃ
১৭৮. সহীহ বুখারী, হা/৫২; সহীহ মুসলিম, হা/৪১৭৮; ইবনে মাজাহ, হা/৩৯৮৪; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৮৩৯৮; মুসনাদুল বাযযার, হা/৩২৭৬; মুস্তাখরাজে আবু আওয়ানা, হা/৪৪৩৬; বায়হাকী, হা/১০১৮০; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/১৭৩১; সিলসিলা সহীহাহ, হা/২৭০৮; জামেউস সগীর, হা/৫৫০৪; মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হা/২২৪৩৫; মুসনাদে দারেমী, হা/২৫৭৩; মিশকাত, হা/২৭৬২।
১৭৯. মুসনাদে আহমাদ, হা/৫৯৯৫; আদাবুল মুফরাদ, হা/৫৪৯; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/২৯১৮।
১৮০. নাসাঈ, হা/৩১০৯; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩৬০৬; মু'জামুল কাবীর লিত তাবারানী, হা/১৪৪; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/২৮৮৬।
১৮১. তিরমিযী, হা/২৫১০; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৪৩০; মুসনাদুত তায়ালুসী, হা/১৯০; মিশকাত, হা/৫০৩৯।
১৮২. নাসাঈ, হা/৩১১০; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩২৫১; মুসনাদে সাদ ইবনে মানসূর, হা/২৪০১; আদাবুল মুফরাদ, হা/২৮১; বায়হাকী, হা/১৮২৮৯; শারহুস সুন্নাহ, হা/২৬১৯; মিশকাত, হা/৩৮২৮।