📄 কাদের রোযা আল্লাহ কবুল করেন
রোযা আমরা অনেকেই রাখি; কিন্তু আমরা সবাই কি রোযার যাবতীয় নিয়ম রক্ষা করে চলি? রোযার উদ্দেশ্য কি আমাদের মাঝে প্রতিফলিত হয়? আমাদের রোযা কতটুকু আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করছে? এ বিষয়গুলো নিয়েও কিছুটা চিন্তা-ভাবনা করা দরকার। নতুবা সারাদিন শুধু উপবাস থেকে তেমন কোন ফলাফল আসবে না। নবী ﷺ বলেছেন, 'এমন অনেক রোযাদার আছে কেবল ক্ষুধা আর পিপাসা ছাড়া তাদের ভাগ্যে আর কিছু জোটে না। আবার রাত্রিতে ইবাদাতকারী অনেক রয়েছে, রাত্রি জাগরণের কষ্ট ছাড়া তারা আর কিছুই লাভ করতে পারে না।'
এ হাদীস থেকে এটা পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে যে, শুধু উপবাস থাকলেই রোযার পরিপূর্ণ হক আদায় হয়ে যায় না; বরং রোযাকে ফলপ্রসূ ও সার্থক করতে হলে রোযাকে ত্রুটিযুক্ত করে এমনসব কার্যাবলী থেকে দূরে থাকতে হবে। অনুরূপভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সালাতের নিয়ম-কানুন রক্ষা করে সালাত পড়তে হবে। এটা না করে অন্য কোন উদ্দেশ্যে সালাত পড়লে বা রাতে নফল পড়ার কারণে ফজরের জামা'আত ছেড়ে দিলে এই সালাত তেমন ফলপ্রসূ হবে না। আবার পরিবারের হক আদায় না করে শুধু রাত্রি জাগরণ করাও ঠিক নয়।
রোযার একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল হচ্ছে রোযা মানুষের জন্য ঢালের কাজ করে। নবী ﷺ বলেছেন : 'রোযা হচ্ছে ঢালস্বরূপ।' যুদ্ধের সময় বা যে কোন ক্ষেত্রে ঢাল শত্রুর আক্রমনকে প্রতিহত করে। অনুরূপভাবে রোযা মানুষকে শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচার ক্ষেত্রে, পাপ থেকে রক্ষা পাওয়ার ক্ষেত্রে এবং জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে ঢালের কাজ করে। এর মাধ্যমে বান্দা নিজেকে রক্ষা করতে পারে। তাই রোযাদারকে রোযা নামক ঢালটিকে কাজে লাগাতে হবে। এজন্য এ কথাটির পরেই নবী ﷺ উম্মতকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, 'তোমাদের মধ্যে কেউ যখন রোযা থাকবে তখন সে যেন অশ্লীল কাজ ও ঝগড়া-বিবাদ না করে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় অথবা তার সাথে মারামারিতে লিপ্ত হয় তবে সে যেন পরিষ্কার বলে দেয় যে, আমি রোযাদার।'
রোযাদার তো আগে বেড়ে কোন খারাপ কাজ করবেই না; তবুও কেউ যদি তাকে গালি দিয়ে বসে অথবা তার সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হয় তবে সে এসবের জবাব না দিয়ে স্পষ্টভাবে বলে দেবে যে, ভাই! তোমার গালির জবাব দেয়ার ক্ষমতা আমার থাকলেও আমি তা করব না। আমি রোযা রেখেছি, আমার রোযা এসব পছন্দ করে না, তাই তোমার মোকাবেলা করা আমার পক্ষে শোভনীয় নয়। সুতরাং রোযাদারকে কেউ গালি দিলে তার বিনিময়ে গালিদাতাকে আমি রোযা রেখেছি বলা সুন্নাত। এই জবাবে রয়েছে দু'টি উপকার; একটিতে রয়েছে নিজের জন্য সতর্কতা এবং অপরটিতে রয়েছে তার বিরোধী পক্ষের জন্য সতর্কতা।
সুতরাং আমরা যখন না খেয়ে রোযা রাখব, তখন আমাদের শরীরের অন্যান্য অঙ্গ যেমন: মুখ, চোখ, কান, হাত, পা ও অন্তর এগুলোকেও রোযা রাখাতে হবে। অর্থাৎ এগুলো আল্লাহর নাফরমানী ও গোনাহের কাজে ব্যবহার না করে তাঁর আনুগত্য ও সন্তুষ্টি অর্জনের কাজে ব্যবহার করতে হবে। তাহলেই আমাদের রোযা ফলপ্রসূ হবে।
টিকাঃ
১৭১. মুসনাদে আহমাদ, হা/৯৬৮৩; সুনানে দারেমী, হা/২৭২০; মিশকাত, হা/২০১৪।
১৭২. সহীহ বুখারী, হা/১৯০৪; সহীহ মুসলিম, হা/২৭৬২; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬১১১; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৯৭৮; বায়হাকী, হা/৮০৯৪; জামেউস সগীর, হা/৭৭৭৭; মিশকাত, হা/১৯৫৯।
📄 যবানের রোযা
মুমিনের যবানও রোযা রাখবে। অর্থাৎ প্রত্যেক নোংরা কথা, পরচর্চা বা গীবত, চুগলখোরী, গান-বাজনা, অশ্লীল ও মিথ্যা কথা থেকে সে বিরত থাকবে। যবানকে হেফাযত করার গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে মহানবী ﷺ বলেন:
'যে আল্লাহ এবং পরকালকে বিশ্বাস করে সে যেন উত্তম কথা বলে অথবা নিরবতা পালন করে।'
অন্য হাদীসে বলেন,
'যে ব্যক্তি আমার জন্য তার যবান ও লজ্জাস্থানের হেফাযত করার জামিন হবে, আমি (মুহাম্মাদ) তার জন্য জান্নাতের জামিন হব।'
অপর হাদীসে বলেন,
'যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও কাজ ছাড়তে পারল না, তার শুধু খানা-পিনা পরিত্যাগ করাতে আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই।'
এ হাদীসে খুব কঠিন ভাষায় এ কথাই বুঝানো হয়েছে যে, রোযাদার ব্যক্তি কখনো মিথ্যা বলতে পারে না। সে একদিকে রোযা রাখবে অপরদিকে মিথ্যা কথা ও অশ্লীল কার্যকলাপ করবে- এটা তার পক্ষে শোভা পায় না; বরং তার আল্লাহকে ভয় করা উচিত এবং এসব পাপকাজ থেকে বিরত থাকা উচিত।
টিকাঃ
১৭৩. মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হা/১৬৬০; সহীহ বুখারী, হা/৬১৩৬; সহীহ মুসলিম, হা/১৮২; আবু দাউদ, হা/৫১৫৬; তিরমিযী, হা/২৫০০; মুসনাদে আহমাদ, হা/৬৬২১; মিশকাত, হা/৪২৪৩।
১৭৪. সহীহ বুখারী, হা/৬৪৭৪; বায়হাকী, হা/১৬৪৪৮; শারহুস সুন্নাহ, হা/৪১২২; জামেউস সগীর, হা/১১৫৬৩; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/২৮৫৬; মিশকাত, হা/৪৮১২।
১৭৫. সহীহ বুখারী, হা/৬০৫৭; আবু দাউদ, হা/২৩৬৪; তিরমিযী, হা/৭০৭; ইবনে মাজাহ, হা/১৬৮৯; মুসনাদে আহমাদ, হা/৯৮৩৮; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/১৯৯৫; মুসনাদুল বাযযার, হা/৮৪২৮; বায়হাকী, হা/৮০৯৫; জামেউস সগীর, হা/১১৪৮৫; শারহুস সুন্নাহ, হা/১৭৪৬; মিশকাত, হা/১৯৯৯।
📄 কানের রোযা
মুমিনের কানও রোযা রাখে। কান রোযা রাখে নোংরা ও অশ্লীল কথা শোনা থেকে, অবৈধ প্রেম ও ব্যভিচারের দিকে আহ্বানকারী গান-বাজনা শোনা থেকে। রোযা রাখে আল্লাহর হারামকৃত যেসব কথা তাঁকে ক্রোধান্বিত ও অসন্তুষ্ট করে সেসব কথা শোনা থেকে। মু'মিনের কান রোযা রাখে শয়তানের সুর শোনা থেকে। কেননা আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন বান্দার কান সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। মহান আল্লাহ বলেন, 'কর্ণ, চক্ষু ও অন্তর এদের প্রত্যেকটির বিষয়ে অবশ্যই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।' (সূরা বনী ইসরাঈল- ৩৬)
📄 চোখের রোযা
মুমিনের চোখও রোযা রাখে আল্লাহর হারামকৃত জিনিস দেখা হতে বিরত থাকার মাধ্যমে। হারাম কিছু চোখে পড়লে সে তার চক্ষুকে অবনত করে নেয়, অশ্লীল কিছু দেখা হতে দৃষ্টিকে ফিরিয়ে রাখে। যেমন: নোংরা ফিল্ম, শ্লীলতাহীন টিভি সিরিজ এবং পরনারী ইত্যাদি দেখা হতে বিরত থাকে। মহান আল্লাহ মুমিন পুরুষদেরকে সম্বোধন করে বলেন, 'মুমিন পুরুষদেরকে বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নিম্নগামী করে এবং নিজ নিজ যৌনাঙ্গের হেফাযত করে; এটিই তাদের জন্য উত্তম।' (সূরা নূর- ৩০)
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা মুমিন নারীদেরকেও সম্বোধন করে বলেন, 'আর মুমিন নারীদেরকে বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নিম্নগামী করে এবং নিজ নিজ যৌনাঙ্গের হেফাযত করে।' (সূরা নূর- ৩১)