📄 আরাফার রোযা
আরাফার দিন তথা যিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখের রোযার গুরুত্ব অপরিসীম। এ সম্পর্কে নবী ﷺ বলেন, 'আমি ধারণা করি যে, আরাফার দিনের রোযা গত বছর ও আগামী এক বছরের গোনাহের কাফফারা হয়ে যায়।'
টিকাঃ
১৬৯. সহীহ মুসলিম, হা/২৮০৩; তিরমিযী, হা/৭৪৯; ইবনে মাজাহ, হা/১৭৩০; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/২০৭৮; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩৬৩২; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/১০১০; শারহুস সুন্নাহ, হা/১৭৯০; মিশকাত, হা/২০৪৪।
📄 প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবারের রোযা
সপ্তাহে প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোযা রাখার অনেক ফযীলত হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। হাদীসে এসেছে, আয়েশা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ সোমবার ও বৃহস্পতিবারের রোযাকে খুবই গুরুত্ব দিতেন। তিনি বলতেন, 'সোমবার ও বৃহস্পতিবার মানুষের আমলসমূহ আল্লাহর নিকট পেশ করা হয়। তাই আমি এটা পছন্দ করি যে, রোযা অবস্থায় আমার আমল আল্লাহর কাছে পেশ করা হোক।'
টিকাঃ
১৭০. সহীহ মুসলিম, হা/৬৭১১; তিরমিযী, হা/৭৪৭; শারহুস সুন্নাহ, হা/১৭৯৯; জামেউস সগীর, হা/৫২৭০; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/১০৪১; মিশকাত, হা/২০৫৬।
📄 রোযার উদ্দেশ্য
প্রত্যেকটি কাজের পরিকল্পনা গ্রহণের মূলে একটি লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য থাকে। সেই উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়িত করার জন্য কাজটি সম্পাদন করা হয়। মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের উপর একমাস রোযা রাখা ফরয করেছেন তাদেরকে উপবাস রেখে অযথা কষ্ট দেয়ার জন্য নয়। রোযা ফরয করার পেছনে এক বিরাট উদ্দেশ্য রয়েছে। যে আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা রোযা ফরয করেছেন সে আয়াতেরই শেষাংশে সেই উদ্দেশ্যের কথা তিনি বলে দিয়েছেন। তাই আমাদের কর্তব্য হলো সে বিষয়টি জানা এবং তা অর্জন করার জন্য চেষ্টা করা। কারণ কোন কাজ যে উদ্দেশ্যে করা হয় সে উদ্দেশ্য যদি সফল না হয় তবে কাজটি বিফলে যায়। আল্লাহ তা'আলা রোযার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন, 'হে ঈমানদারগণ! পূর্ববর্তী উম্মতের মতো তোমাদের উপরও রোযা ফরয করে দেয়া হয়েছে, সম্ভবত এর মাধ্যমে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারবে।' (সূরা বাকারা- ১৮৩)
এখান থেকে স্পষ্ট জানা গেল যে, তাকওয়া অর্জন করাই রোযার মূল উদ্দেশ্য। তাকওয়া এত মূল্যবান জিনিস যে, এর ফলে যে কল্যাণ ও উপকার পাওয়া যায় অন্য কিছুর দ্বারা তা পাওয়া যায় না। যেমন কুরআন থেকে হেদায়াত লাভে ধন্য হয় মুত্তাকীরা। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, 'যাদের তাকওয়া আছে তারাই এর থেকে হেদায়াত বা পথের দিশা পায়।' (সূরা বাকারা- ২)
সবচেয়ে বড় ও চিরস্থায়ী সুখ ও শান্তির ঠিকানা জান্নাতে মুত্তাকীরাই যাবে। যত ভালো কাজ ও নেক আমল রয়েছে এর বাহ্যিক কাঠামো আল্লাহর কাছে পৌঁছে না; বরং তাকওয়াই তাঁর কাছে পৌঁছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'তোমাদের কুরবানীর পশুর রক্ত এবং গোশত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না; বরং তাকওয়াই আল্লাহর কাছে পৌঁছে।' (সূরা হাজ্জ- ৩৭)
এখন প্রশ্ন হলো, তাকওয়া এমন কোন জিনিসের নাম, যার এত মান-মর্যাদা, এত উপকারিতা, যা অর্জন করার জন্য দীর্ঘ একটি মাস সাধনা করতে হয়?
তাকওয়ার শাব্দিক অর্থ রক্ষা করা, বেঁচে চলা, ভয় করা। পূর্ণাঙ্গ অর্থে তাকওয়া হচ্ছে মানুষের ভেতরে লুকায়িত এমন কিছু গুণের নাম, যা আল্লাহর খাওফ ও মুহাব্বত (ভয় ও ভালোবাসা) থেকে জন্ম নেয়, যা ভালো কাজের প্রেরণা দেয় এবং খারাপ কাজ থেকে দূরে রাখে। এজন্য যার মধ্যে তাকওয়ার গুণ অর্জিত হয়ে যায় সে জাহান্নাম ও আল্লাহর শাস্তির ভয়ে গোনাহের কাজ করতে পারে না। আর জান্নাত ও আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের আশায় নেক আমল ছাড়তে পারে না। রোযার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে এ গুণটি অর্জিত হয়。
📄 রোযা ও আত্মসংযম
• রোযার নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অন্যতম সুফল হলো রোযা মানুষের মধ্যে আত্মসংযমতা তৈরি করে। মানুষের নফস বা প্রবৃত্তি তিন প্রকার :
১. নাফসে আম্মারা : এটি সর্বদা মানুষকে মন্দ কাজের দিকে প্রেরণা দেয়। সূরা ইউসুফের ৫৩ নং আয়াতে এ বিষয়ে উল্লেখ আছে।
২. নাফসে লাওয়ামা : এ নাফসের অধিকারী মানুষ খারাপ কাজ করে ফেলে; কিন্তু পরে যখন তার বিবেক সজাগ হয় তখন সে নিজেকে তিরস্কার করে। সূরা কিয়ামার ২ নং আয়াতে এ বিষয়ে উল্লেখ আছে ।
৩. নাফসে মুতমাইন্না : প্রশান্ত আত্মা, নাফসের উপর চেষ্টা সাধনা করতে করতে যখন এমন স্তরে পৌঁছে যায় যে, তার মধ্যে মন্দ কাজের কোন স্পৃহা থাকে না, গোনাহের কাজে ভয় পায় আর ভালো কাজে খুশি হয় তখন তাকে নাফসে মুতমাইন্না বলা হয়। এ আত্মাকে বলা হবে, 'হে প্রশান্ত আত্মা! তুমি সন্তুষ্ট এবং সন্তোষভাজন হয়ে তোমার প্রভুর দিকে চলো। অতঃপর আমার (নেক) বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও এবং প্রবেশ করো আমার জান্নাতে।' (সূরা ফাজর, ২৭-৩০)
• মানুষের নাফস বা আত্মাকে পর্যায়ক্রমে উন্নত করতে হলে এর উপর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা অর্জন করতে হয় এবং একে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী চালাতে হয়। এটাই হচ্ছে সংযমতা বা আত্মাকে সংযত করা।
• মানুষের মন হলো রাজা আর অঙ্গ-প্রতঙ্গ হলো প্রজা, মন যা পরিকল্পনা করে শরীরের অঙ্গগুলো তা বাস্তবায়ন করে। এই মনকে ভালো ও কল্যাণকর পরিকল্পনায় নিয়োজিত না করে যে একে লাগামহীনভাবে ছেড়ে দেয়, তার অবস্থা হয়ে যায় ঐ অশ্বারোহীর মতো যে তার অশ্বকে কাবু করতে পারে না, অশ্ব যেদিকে যেতে চায় তাকে নিয়ে সেদিকে চলে যায়।
• এ পৃথিবীতে মানুষের ইতিহাসে যাঁরা স্মরণীয় ও বরণীয় হয়েছেন তাঁরা তাঁদের আভ্যন্তরীণ শক্তিকে নিজেদের অধীন ও অনুগত করে নিয়েছিলেন। তাঁরা কোন দিনই নাফসের লোভ-লালসা এবং আবেগের গোলাম হননি। তাঁদের ইচ্ছা-বাসনা ছিল মযবুত, সংকল্প ছিল অটল।
• মানুষের প্রকৃতিতে পরস্পর বিরোধী দু'টি স্বভাব সমানভাবে রেখে দেয়া হয়েছে। এর একটি হচ্ছে পশুত্ব, আর অপরটি হচ্ছে মনুষ্যত্ব। যারা পশুত্ব তথা নাফসের দাবি-দাওয়াকে নিয়ন্ত্রণে রেখে আত্মার উন্নতি সাধন করতে পারেন তারাই সফলতা অর্জন করতে পারেন।
• ইসলাম নাফসের দাবিগুলোকে গলা টিপে হত্যা করার নির্দেশ দেয়নি। অথচ একদল লোক মানবদেহ হতে পশুত্বের উপাদানগুলোর বিলুপ্তি ঘটানোর কাজে লিপ্ত। তারা খাওয়া-দাওয়া, নিদ্রা ও যৌন চাহিদা- মানবপ্রকৃতির এ দাবিগুলোকে একেবারে শেষ করতে চান। তারা সাধু, সন্ন্যাসী ও দরবেশরূপে পৃথিবীবাসীর নিকট পরিচিত।
• আরেকদল পশুত্বকে জীবনের চরম সার্থকতা হিসেবে ধরে নিয়েছেন। আহার, নিদ্রা, যৌনসম্ভোগ ও আরাম-আয়েশ এগুলোকেই তারা জীবনের মূল লক্ষ্যে পরিণত করেছেন। কিন্তু আসল সত্য এ দুয়ের মাঝখানে রয়েছে। আর তা হলো- মনের চাহিদাগুলোকে সমূলে ধ্বংস করা যাবে না, আবার মন যা চায় তাই করা যাবে না; বরং মনের চাহিদাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শিখানো পন্থায় পূরণ করতে হবে। এটাই ইসলামের শিক্ষা।
• মানুষের প্রকৃতিতে যৌন চাহিদা রয়েছে। ইসলাম এটাকে মূলোৎপাটন করে ফেলতে বলেনি। আবার লাগামহীনভাবে যে যার সাথে ইচ্ছা মিলিত হবে এটাকেও সমর্থন করেনি। ইসলাম কিছু বিধিমালা নির্ধারণ করে দিয়েছে মাত্র। ছেলে বা মেয়ে যখন প্রাপ্তবয়স্ক হবে তখন একে অপরকে পছন্দ করে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে এ চাহিদা মিটাবে। এতে একদিকে যেমন মনের চাহিদা মিটবে, অন্যদিকে পরিবারের ভিত্তি স্থাপিত হবে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে স্থায়ী বন্ধনের ফলে ভালোবাসা গাঢ় হবে। সন্তান প্রজন্মের ধারা অব্যাহত থাকবে। মাতৃত্ব, পিতৃত্ব ও বংশের মর্যাদা রক্ষা হবে। এ বিধানকে উপেক্ষা করে যারা যিনা-ব্যভিচারকে লাইসেন্স দিয়ে অবাধে হালাল করে দিয়েছে তাদের চারিত্রিক, পারিবারিক ও সামাজিক পরিস্থিতির কী যে অবনতি ঘটেছে তা ব্যাখ্যা করে বলার প্রয়োজন নেই। বিভিন্ন দেশগুলোর দিকে নজর দিলেই সেই দৃশ্য ফুটে উঠবে।
• মানুষের প্রকৃতিতে পেটের ক্ষুধা রয়েছে, সময় হলে বাঁচার জন্য খেতেই হয়। এছাড়াও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা রয়েছে যা পূরণ করতে হলে টাকা- পয়সার দরকার হয়। তাই উপার্জন করতে হবে। এখন ইসলাম উপার্জনের সকল পথ বন্ধ করে ঘরে বসে থাকতে বলোন; বরং আরো উৎসাহ দিয়েছে। উপার্জনকারীকে আল্লাহর বন্ধু বলা হয়েছে। ইসলাম উপার্জনের কিছু অবৈধ পন্থাকে নিষিদ্ধ করেছে মাত্র। চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি এগুলো যদি হালাল হয়ে যায় তাহলে তো কারো জান-মালের কোন নিরাপত্তাই থাকবে না। সুদ, ঘুষ, ওজনে কম দেয়া, ব্যবসায় প্রতারণা, চাঁদাবাজী, দুর্নীতি, হাইজ্যাক ইত্যাদির কারণে সমাজে আজ কত অশান্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে তা সকলেই দেখতে পাচ্ছেন। মানুষ নাফস বা কুপ্রবৃত্তির অনুসারী হওয়ার কারণেই এমনটি হচ্ছে।
• রোযা মানুষের মনের চাহিদাগুলো মেটানোর ক্ষেত্রে খুবই সুন্দরভাবে আত্মসংযমের প্রশিক্ষণ দেয়। রোযা মানুষকে সম্বোধন করে বলে যে, দেখো! তুমি রোযা থাকার কারণে সারাটি দিন তোমার জন্য খাওয়া-দাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রোযা থাকার কারণে হালাল খাবার পর্যন্ত তোমার উপর হারাম হয়ে গেছে, তাহলে তুমি হারাম পন্থায় কামাই করার চিন্তা কীভাবে করতে পার? রোযা থাকার কারণে দিনের বেলায় তোমার স্ত্রীর সাথেও যৌনমিলন হারাম হয়ে গেছে, তাহলে তুমি যিনা করার চিন্তা কীভাবে করতে পার?
• রোযা আরো বলে যে, ফজরের আযানের সাথে সাথেই তোমাকে খানা-পিনা বন্ধ করে দিতে হবে, আবার সূর্য ডুবার সাথে সাথে খাবার খেতেই হবে, এখন খাওয়ার মধ্যেই কল্যাণ।
• রোযা আরো বলে যে, ইফতারের পরেই তুমি আরামে ঘুমাতে পারবে না; তারাবীর সালাত পড়তে হবে, তবে সারা রাত নয়; মাত্র দেড়-দু’ঘন্টা। তারাবীর পরে তুমি আরামে ঘুমাও, তবে সকাল পর্যন্ত নয়; ভোর রাতে উঠে তোমাকে সাহারী খেতে হবে এরপর আবার ফজরের সালাত পড়তে হবে। এভাবে রোযা মানুষকে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে এবং মানুষের জীবনকে উন্নত ও কল্যাণকর করতে সাহায্য করে。