📄 কী দিয়ে ফিতরা আদায় করতে হবে
ফিতরা মূলত গরীবদের হক। এটি সাধারণত নিজ নিজ অঞ্চলের প্রধান খাদ্য দ্বারা আদায় করা উচিত। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামগণ তাদের প্রধান খাদ্য দ্বারা ফিতরা আদায় করতেন। যেমন- ভুট্টা, খেজুর, পনীর ইত্যাদি। হাদীসে এসেছে,
আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা ফিতরার যাকাত এক সা' খাদ্য অথবা এক সা' ভুট্টা অথবা এক সা' খেজুর অথবা এক সা' পনীর অথবা এক সা' কিসমিস দ্বারা আদায় করতাম।
অতএব, বাংলাদেশে যেহেতু প্রধান খাদ্য হিসেবে চাল ব্যাপকভাবে প্রচলিত আছে, সুতরাং এখানকার মানুষের জন্য চাল দ্বারা ফিতরা আদায় করাই উত্তম। যিনি যে মানের খাদ্যদ্রব্য বছরের বেশিরভাগ সময় আহার করেন, তিনি সে মানের খাদ্যদ্রব্য থেকেই সাদকাতুল ফিতর প্রদান করবেন। আমাদের দেশের প্রধান খাদ্য চাল। সুতরাং তা দিয়েই ফিতরা প্রদান করা উচিত।
টিকাঃ
১২০. মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হা/৬২৭; সহীহ বুখারী, হা/১৫০৬; সহীহ মুসলিম, হা/২৩৩০; তিরমিযী, হা/৬৭৩; নাসাঈ, হা/২৫১২; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/২৪০৮; মুস্তাখরাজে আবু আওয়ানা, হা/২১৩৩; শারহুস সুন্নাহ, হা/১৫৯৫; সুনানে দারেমী, হা/১৬৬৩; মিশকাত, হা/১৮১৬।
📄 ফিতরার পরিমাণ
ফিতরা আদায়ের পরিমাণ হচ্ছে এক 'সা'। ঈদুল ফিতরের দিন প্রত্যেক মুসলিমের পক্ষ হতে এ পরিমাণ খাদ্য প্রদান করা ওয়াজিব। হাদীসে এসেছে,
আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ মুসলমানদের প্রত্যেক স্বাধীন-পরাধীন, নারী-পুরুষ, ছোট-বড়, সকলের উপর এক সা' পরিমাণ যব দিয়ে ফিতরা আদায় করা আবশ্যক করে দিয়েছেন এবং ঈদের সালাতে যাওয়ার আগে তা আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন।
সা' এর পরিমাণ:
তৎকালীন মদিনায় (হিজায অঞ্চলে) প্রচলিত এক সা' এর সমপরিমাণ বর্তমানকালের মেট্রিক পদ্ধতির ওজন নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে আলেমদের মাঝে সামান্য মতপার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। কেউ কেউ দুই কিলো পাঁচশত বিশ গ্রাম (২.৫২০ কিলোগ্রাম) চাল অথবা দুই কিলো একশত ছিয়াাত্তর গ্রাম (২.১৭৬ কিলোগ্রাম) গম সাব্যস্ত করেছেন। আবার কেউ কেউ দুই কিলো চল্লিশ গ্রাম (২.৪০ কিলোগ্রাম) বলে মতামত ব্যক্ত করেছেন। মনে রাখতে হবে যে, খাদ্য বা শস্যদানার ঘনত্ব ও হালকা বা ভারী ধরনের হওয়ার কারণে একই পাত্রের মাপে বিভিন্ন খাদ্য ও শস্যদানার ওজনে কম-বেশি হতে পারে।
এ কারণে সতর্কতার জন্য যে অঞ্চলের লোকদের প্রধান খাদ্য যেটা ঐ অঞ্চলের লোকেরা ঐ অঞ্চলের প্রধান খাদ্য পূর্ণ আড়াই কিলো হিসেবে আদায় করবে। তাহলে নিশ্চিতভাবে সাদাকাতুল ফিতর আদায় হয়ে যাবে- ইনশাআল্লাহ।
নিসফে সা' গম এর প্রচলন:
দুই মুদ বা অর্ধ সা' পরিমাণকে নিসফে সা' বলা হয়। নবী ﷺ প্রত্যেক পুরুষ, মহিলা, আযাদ ও গোলামের পক্ষ থেকে সাদাকাতুল ফিতর হিসেবে এক সা' খেজুর বা এক সা' যব আদায় করা ফরয করেছেন। তারপর লোকেরা অর্ধ সা' গমকে এক সা' খেজুরের সমমান দিতে লাগল। মদিনায় এক সা' খেজুরের সাথে সিরিয়ার উন্নত মানের দুই মুদ গম বিনিময় হতো। তাই খেজুরের মূল্যের পার্থক্যের কারণে নিসফে সা' গম প্রদানের বিধান ঐ সময়কার জন্য সঠিক হলেও পরবর্তীকালে গমের মূল্য কমে যাওয়ার কারণে তা অকার্যকর হয়ে গেছে।
বর্তমানকালে নিসফে সা' গমের মূল্য এক সা' খেজুরের মূল্যের বিকল্প নয়। কিসমিস ও পনীরের মূল্য গমের চেয়ে অনেক বেশি। এসব কারণে মুহাক্কিক আলেমগণ মনে করেন নিসফে সা' গম প্রদানের প্রয়োজনীয়তা ও কার্যকারিতা নেই। গমের ক্ষেত্রেও ফিতরার পরিমাণ হবে এক সা'।
টিকাঃ
১২১. সহীহ বুখারী, হা/১৫০৩; নাসাঈ, হা/২৫০৪; মুসনাদে আহমাদ, হা/৫৭৮১; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/২৪০৪; সুনানে দার কুতনী, হা/২০৭২; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/১৪৯৪; বায়হাকী, হা/৭৪৭৭; মিশকাত, হা/১৮১৫।
📄 টাকা দিয়ে যাকাতুল ফিতর আদায় করার হুকুম
টাকা দ্বারা ফিতরা আদায়ের রীতি ইসলামের সোনালী যুগে ছিল না। রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবায়ে কেরাম টাকা দ্বারা ফিতরা আদায় করেছেন মর্মে কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর যুগে স্বর্ণ ও রৌপ্যের মুদ্রা বাজারে চালু থাকা সত্ত্বেও তিনি খাদ্যবস্তু দ্বারা ফিতরা আদায় করেছেন এবং আদায় করতে বলেছেন। খাদ্য শস্যের কথা বিভিন্ন হাদীসে উল্লেখ রয়েছে। অতএব খাদ্যশস্য দ্বারা যাকাতুল ফিতর আদায় করাই ইসলামী শরীয়তের বিধান। টাকা-পয়সা দ্বারা ফিতরা আদায় করা এর পরিপন্থী। যে ব্যক্তি ২০ টাকা কেজি দরের চাল খান তিনি উক্ত মানের চাল এক সা' ফিতরা দিবেন। আর যে ব্যক্তি ৫০ টাকা কেজি দরের চাল খান তিনি উক্ত মানের চাল এক সা' ফিতরা দিবেন।
যাকাতুল ফিতর বণ্টনের খাত: যাকাত বণ্টনের ৮টি খাতই হচ্ছে যাকাতুল ফিতর বণ্টনের খাত। এ সংক্রান্ত আলোচনা এ বইয়ের কিতাবুয যাকাত অংশে রয়েছে।
📄 যাকাতুল ফিতর কাদের উপর ওয়াজিব
কতক আলেমের মতে, যে ব্যক্তি যাকাতের নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে, তার উপর ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব হবে। তবে অধিকাংশ মুহাক্কিক উলামায়ে কেরামের মতে, যাকাতুল ফিতর ফরয হওয়ার জন্য নিসাব পরমাণ সম্পদের মালিক হওয়া শর্ত নয়।
কোন ব্যক্তির নিকট ঈদের দিনে তার ও তার পরিবারের একদিন ও একরাত ভরণ-পোষণের খরচ ছাড়া অতিরিক্ত যাকাতুল ফিতর আদায় করার পরিমাণ অর্থাৎ এক সা' পরিমাণ খাদ্য থাকলেই তার উপর যাকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব হবে।
বিভিন্ন হাদীসের ভাষা থেকে বুঝা যায় যে, কারো নিকট একদিন ও একরাতের খাবার থাকলে তার জন্য ভিক্ষা করা বা হাত পাতা ঠিক নয়। সাহল ইবনে রাবী হানযালী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, যে ব্যক্তি অমুখাপেক্ষী হওয়া সত্ত্বেও সম্পদ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে অন্যের নিকট কিছু চায়- সে জাহান্নামের আগুন বাড়িয়ে নিল। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল! ধনী বা অমুখাপেক্ষী হওয়ার সীমা কী, যার কারণে অন্যের নিকট কিছু চাওয়া অনুচিত হয়? তিনি বললেন, কারো নিকট এমন কিছু সম্পদ থাকা, যা তার সকাল ও সন্ধ্যার প্রয়োজনের জন্য যথেষ্ট।
ফিতরা ছোট বড় সকলের পক্ষ থেকে আদায় করতে হবে:
আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ মুসলমানদের প্রত্যেক স্বাধীন-পরাধীন, নারী-পুরুষ, ছোট-বড়, সকলের উপর এক 'সা' পরিমাণ যব দিয়ে ফিতরা আদায় করা ফরয করেছেন এবং ঈদের সালাতে যাওয়ার আগে তা আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন।
টিকাঃ
১২২. সহীহ ফিকহুস সুন্নাহ, ২য় খণ্ড ৭২ পৃঃ।
১২৩. আবু দাউদ, হা/১৬৩১; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭৬৬২; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৮০৫; মিশকাত, হা/১৮৪৮।
১২৪. সহীহ বুখারী, হা/১৫০৩; নাসাঈ, হা/২৫০৪; মুসনাদে আহমাদ, হা/৫৭৮১; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/২৪০৪; সুনানে দার কুতনী, হা/২০৭২; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/১৪৯৪; বায়হাকী, হা/৭৪৭৭; মিশকাত, হা/১৮১৫।