📄 লাইলাতুল কদর কোন্টি
কদরের রাত কোন্ তারিখে- তা একেবারে নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। তবে কিছু দলীলের ভিত্তিতে এ রাতটি রমাযান মাসে হওয়ার ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত হতে পারি। যেমন সূরা কদরের প্রথম আয়াতে বলা হয়েছে, কুরআন কদরের রাতে নাযিল হয়েছে। আবার সূরা বাকারার ১৮৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে, রমাযান মাসে কুরআন নাযিল হয়েছে। সুতরাং এ আয়াতদ্বয়ের মাধ্যমে এটা নির্দিষ্ট হয়ে গেল যে, কদরের রাতটি রমাযান মাসেই রয়েছে। রমাযান মাসের কোন্ রাত? এ ব্যাপারে হাদীসে এসেছে,
আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, লাইলাতুল কদরকে তোমরা রমাযানের শেষ দশ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে খোঁজ করো। এ হাদীস দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, এ রাতটি রমাযানের ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ তারিখের রাতগুলোতে রয়েছে। আবার এ রাতটি পরিবর্তন হয়, অর্থাৎ এ বেজোড় তারিখগুলোর মধ্যে একেক বছর একেক তারিখে হতে পারে। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কদরের রাতের তারিখ জানানোর জন্য বের হলেন, তখন মুসলমানদের দু'ব্যক্তি বিতর্কে লিপ্ত হলো, ফলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে এ রাতটি ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে।
তবে এ রাতটি নির্দিষ্ট না করার মধ্যে বিরাট কল্যাণ ও হিকমত রয়েছে। এটি নির্দিষ্ট থাকলে কেবল ঐ তারিখেই মানুষ আল্লাহর ইবাদাত করত, এখন অনির্দিষ্ট থাকাতে শেষ দশকের বেজোড় পাঁচটি রাতেই আল্লাহর বান্দারা বেশি বেশি ইবাদাত করে আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুযোগ পাবে।
আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযানের শেষ দশকের রাতগুলোতে কোমর কষে বাঁধতেন। তিনি নিজে জাগতেন এবং পরিবারের লোকদেরকেও জাগাতেন।
লাইলাতুল কদরে পড়ার দু'আ:
আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদা তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলেন যে, আমি যদি লাইলাতুল কদর পাই তবে কী পড়ব? তিনি বলেন এ দু'আ পড়ো, 'আল্লাহুম্মা ইন্নাকা 'আফুউউন তুহিব্বুল 'আফওয়া ফা'ফু 'আন্নী।' অর্থ : হে আল্লাহ! তুমি বড়ই ক্ষমাশীল, ক্ষমাকে তুমি ভালোবাস। সুতরাং আমাকে ক্ষমা করে দাও।
টিকাঃ
১১৬. সহীহ বুখারী, হা/২০১৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৪৪৮৯; বায়হাকী, হা/৮৩১৪; শারহুস সুন্নাহ, হা/১৮৩৪; জামেউস সগীর, হা/৫২৩৩; সিলসিলা সহীহাহ, হা/৩৬১৬; মিশকাত, হা/২০৮৩।
১১৭. মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হা/৬৯৬; সহীহ বুখারী, হা/৪৯; সুনানুল কুবরা লিন নাসাঈ, হা/৩৩৮০; মা'রেফাতুস সুনান ওয়াল আছার, হা/২৭৫২; জামেউস সগীর, হা/৪২২৬; সিলসিলা সহীহাহ, হা/৩৫৯২।
১১৮. সহীহ বুখারী, হা/২০২৪; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৪৪২২; শারহুস সুন্নাহ, হা/১৮২৯; জামেউস সগীর, হা/৮৮৪২; মিশকাত, হা/২০৯০।
১১৯. তিরমিযী, হা/৩৫১৩; ইবনে মাজাহ, হা/৩৮৫০; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৫৪২৩; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/১৯৪২; সিলসিলা সহীহাহ, হা/৩৩৩৭; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৩৩৯১; মিশকাত, হা/২০৯১।
📄 ফিতরা আদায় করা
ইসলাম সম্পদের আবর্তন চায়। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'সম্পদ শুধুমাত্র তোমাদের ধনীদের মধ্যে যেন কেন্দ্রীভূত না থাকে।' (সূরা হাশর- ৭)
'আর তাদের সম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতদের হক রয়েছে।' (সূরা যারিয়াত- ১৯)
এজন্যই ইসলাম এমন কিছু বিধান ফরয করেছে, যাতে করে গরীবরা ধনীদের সম্পদের কিছু অংশ ভোগ করতে পারে। এরই একটি অংশ হচ্ছে সাদাকাতুল ফিতর।
দুটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে এ সাদাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একটি হলো রোযাকে ত্রুটিমুক্ত করা, অপরটি হলো গরীবদেরকে ঈদের আনন্দে শরীক করা।
মানুষের মধ্যে নানাবিধ দুর্বলতা রয়েছে, আল্লাহর হুকুম পালন করতে কতইনা ভুল-ত্রুটি হয়ে যায়। বান্দা দীর্ঘ একটি মাস রোযা পালন করেছে। এর মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকতে পারে। বান্দার এ ঘাটতি যাতে পূর্ণ হয়ে যায়, তাই ইসলাম বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে কিছু দান-সাদাকা করার নির্দেশ দিয়েছে।
অপরদিকে ঈদের দিনটি হচ্ছে মুসলিম জাতির এক চরম আনন্দের দিন। কিন্তু যারা অর্ধাহারে অনাহারে কালযাপন করছে, আর্থিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে, তারা তাদের ছেলে-মেয়েদেরকে নিয়ে কী করে ঈদের আনন্দ উপভোগ করবে? মুসলিম সমাজের এই বৈষম্য দূর করার জন্য বিশেষ করে ঈদের দিনে গরীবদেরকে সাহায্য করে ঈদের আনন্দে তাদেরকে শরীক করার জন্য ইসলাম এই সুন্দর ব্যবস্থা দিয়েছে。
📄 কী দিয়ে ফিতরা আদায় করতে হবে
ফিতরা মূলত গরীবদের হক। এটি সাধারণত নিজ নিজ অঞ্চলের প্রধান খাদ্য দ্বারা আদায় করা উচিত। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামগণ তাদের প্রধান খাদ্য দ্বারা ফিতরা আদায় করতেন। যেমন- ভুট্টা, খেজুর, পনীর ইত্যাদি। হাদীসে এসেছে,
আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা ফিতরার যাকাত এক সা' খাদ্য অথবা এক সা' ভুট্টা অথবা এক সা' খেজুর অথবা এক সা' পনীর অথবা এক সা' কিসমিস দ্বারা আদায় করতাম।
অতএব, বাংলাদেশে যেহেতু প্রধান খাদ্য হিসেবে চাল ব্যাপকভাবে প্রচলিত আছে, সুতরাং এখানকার মানুষের জন্য চাল দ্বারা ফিতরা আদায় করাই উত্তম। যিনি যে মানের খাদ্যদ্রব্য বছরের বেশিরভাগ সময় আহার করেন, তিনি সে মানের খাদ্যদ্রব্য থেকেই সাদকাতুল ফিতর প্রদান করবেন। আমাদের দেশের প্রধান খাদ্য চাল। সুতরাং তা দিয়েই ফিতরা প্রদান করা উচিত।
টিকাঃ
১২০. মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হা/৬২৭; সহীহ বুখারী, হা/১৫০৬; সহীহ মুসলিম, হা/২৩৩০; তিরমিযী, হা/৬৭৩; নাসাঈ, হা/২৫১২; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/২৪০৮; মুস্তাখরাজে আবু আওয়ানা, হা/২১৩৩; শারহুস সুন্নাহ, হা/১৫৯৫; সুনানে দারেমী, হা/১৬৬৩; মিশকাত, হা/১৮১৬।
📄 ফিতরার পরিমাণ
ফিতরা আদায়ের পরিমাণ হচ্ছে এক 'সা'। ঈদুল ফিতরের দিন প্রত্যেক মুসলিমের পক্ষ হতে এ পরিমাণ খাদ্য প্রদান করা ওয়াজিব। হাদীসে এসেছে,
আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ মুসলমানদের প্রত্যেক স্বাধীন-পরাধীন, নারী-পুরুষ, ছোট-বড়, সকলের উপর এক সা' পরিমাণ যব দিয়ে ফিতরা আদায় করা আবশ্যক করে দিয়েছেন এবং ঈদের সালাতে যাওয়ার আগে তা আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন।
সা' এর পরিমাণ:
তৎকালীন মদিনায় (হিজায অঞ্চলে) প্রচলিত এক সা' এর সমপরিমাণ বর্তমানকালের মেট্রিক পদ্ধতির ওজন নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে আলেমদের মাঝে সামান্য মতপার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। কেউ কেউ দুই কিলো পাঁচশত বিশ গ্রাম (২.৫২০ কিলোগ্রাম) চাল অথবা দুই কিলো একশত ছিয়াাত্তর গ্রাম (২.১৭৬ কিলোগ্রাম) গম সাব্যস্ত করেছেন। আবার কেউ কেউ দুই কিলো চল্লিশ গ্রাম (২.৪০ কিলোগ্রাম) বলে মতামত ব্যক্ত করেছেন। মনে রাখতে হবে যে, খাদ্য বা শস্যদানার ঘনত্ব ও হালকা বা ভারী ধরনের হওয়ার কারণে একই পাত্রের মাপে বিভিন্ন খাদ্য ও শস্যদানার ওজনে কম-বেশি হতে পারে।
এ কারণে সতর্কতার জন্য যে অঞ্চলের লোকদের প্রধান খাদ্য যেটা ঐ অঞ্চলের লোকেরা ঐ অঞ্চলের প্রধান খাদ্য পূর্ণ আড়াই কিলো হিসেবে আদায় করবে। তাহলে নিশ্চিতভাবে সাদাকাতুল ফিতর আদায় হয়ে যাবে- ইনশাআল্লাহ।
নিসফে সা' গম এর প্রচলন:
দুই মুদ বা অর্ধ সা' পরিমাণকে নিসফে সা' বলা হয়। নবী ﷺ প্রত্যেক পুরুষ, মহিলা, আযাদ ও গোলামের পক্ষ থেকে সাদাকাতুল ফিতর হিসেবে এক সা' খেজুর বা এক সা' যব আদায় করা ফরয করেছেন। তারপর লোকেরা অর্ধ সা' গমকে এক সা' খেজুরের সমমান দিতে লাগল। মদিনায় এক সা' খেজুরের সাথে সিরিয়ার উন্নত মানের দুই মুদ গম বিনিময় হতো। তাই খেজুরের মূল্যের পার্থক্যের কারণে নিসফে সা' গম প্রদানের বিধান ঐ সময়কার জন্য সঠিক হলেও পরবর্তীকালে গমের মূল্য কমে যাওয়ার কারণে তা অকার্যকর হয়ে গেছে।
বর্তমানকালে নিসফে সা' গমের মূল্য এক সা' খেজুরের মূল্যের বিকল্প নয়। কিসমিস ও পনীরের মূল্য গমের চেয়ে অনেক বেশি। এসব কারণে মুহাক্কিক আলেমগণ মনে করেন নিসফে সা' গম প্রদানের প্রয়োজনীয়তা ও কার্যকারিতা নেই। গমের ক্ষেত্রেও ফিতরার পরিমাণ হবে এক সা'।
টিকাঃ
১২১. সহীহ বুখারী, হা/১৫০৩; নাসাঈ, হা/২৫০৪; মুসনাদে আহমাদ, হা/৫৭৮১; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/২৪০৪; সুনানে দার কুতনী, হা/২০৭২; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/১৪৯৪; বায়হাকী, হা/৭৪৭৭; মিশকাত, হা/১৮১৫।