📄 ই‘তিকাফ অবস্থায় মসজিদ থেকে বের হওয়ার বিধান
• ই'তিকাফকারী যদি বিনা প্রয়োজনে মসজিদ থেকে বের হয় তাহলে তার ই'তিকাফ ভঙ্গ হয়ে যাবে। আর যদি মানবীয় প্রয়োজন মিটানোর জন্য বের হয় তাহলে ই'তিকাফ ভঙ্গ হবে না।
• মসজিদে থেকে পবিত্রতা অর্জন করা সম্ভব না হলে বাইরে বের হতে পারবে।
• বাহক না থাকার কারণে ই'তিকাফকারী পানাহারের প্রয়োজনে বাইরে যেতে পারবে।
• যে মসজিদে ই'তিকাফ বসেছে সেখানে জুমু'আর সালাতের ব্যবস্থা না থাকলে জুমু'আর সালাত আদায়ের জন্য বাইরে যেতে পারবে।
• রোগী দেখতে যাওয়া, জানাযায় উপস্থিত হওয়া ইত্যাদি কাজ করার জন্য ই'তিকাফকারীর মসজিদ থকে বের হওয়া বৈধ নয়। হাদীসে এসেছে,
আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ই'তিকাফকারীর জন্য সুন্নাত হলো, সে রোগী দেখতে যাবে না, জানাযায় উপস্থিত হবে না, স্ত্রীকে স্পর্শ করবে না ও তার সাথে মিলন থেকে বিরত থাকবে এবং অতি প্রয়োজন ব্যতীত মসজিদ থেকে বের হবে না।
• ই'তিকাফের নিয়ম বহির্ভূত কোন কাজের জন্য ই'তিকাফকারীর মসজিদ থেকে বের হওয়া বৈধ নয়। যেমন ক্রয়-বিক্রয়, স্বামী-স্ত্রীর মিলন ইত্যাদি।
টিকাঃ
১১০. আবু দাউদ, হা/২৪৭৫; বায়হাকী, হা/৮৩৭৭; মিশকাত, হা/২১০৬।
📄 যেসব কারণে ই‘তিকাফ ভঙ্গ হয়ে যায়
ইচ্ছাকৃতভাবে বীর্যপাত ঘটালে : গোসল ফরয হয় এমন ধরনের অপবিত্রতা থেকে পবিত্র থাকতে হবে। অপবিত্রতা যদি যৌন স্পর্শ অথবা স্বামী স্ত্রীর মিলনের ফলে হয় তবে সকলের মতে ই'তিকাফ ভঙ্গ হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'আর তোমরা মসজিদে ই'তিকাফরত অবস্থায় স্ত্রীদের সাথে মিলিত হয়ো না।' (সূরা বাকারা- ১৮৭)
তবে যদি স্বপ্নদোষের কারণে বীর্যপাত ঘটে তাহলে ই'তিকাফ ভঙ্গ হবে না। আর যদি হস্তমৈথুনের কারণে হয় তাহলে সঠিক মতানুসারে ই'তিকাফ ভঙ্গ হয়ে যাবে।
মহিলাদের হায়েয অথবা নিফাস শুরু হলে:
ই'তিকাফ অবস্থায় মহিলাদের হায়েয-নিফাস থেকে পবিত্র থাকা জরুরি। কেননা এ অবস্থায় মসজিদে অবস্থান করা হারাম, অবশ্য ইস্তেহাযা অবস্থায় ই'তিকাফ করা বৈধ। আয়েশা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে ইস্তিহাযা অবস্থায় তাঁর স্ত্রীগণের মধ্য হতে কোন একজন ই'তিকাফ করেছিলেন। তিনি লাল ও হলুদ রঙের স্রাব দেখতে পাচ্ছিলেন। এমতাবস্থায় তিনি নিচে পাত্র রেখে সালাত আদায় করলেন।
বিনা প্রয়োজনে মসজিদ থেকে বের হলে :
ই'তিকাফ করার প্রধান শর্তই হচ্ছে ইবাদাতের উদ্দেশ্যে মসজিদে অবস্থান করা। সুতরাং কেউ যদি বিনা প্রয়োজনে ইচ্ছাকৃতভাবে মসজিদ থেকে বের হয়, তাহলে তার ই'তিকাফ ভঙ্গ হয়ে যাবে- যদিও তা অল্প সময়ের জন্য হয়।
পাগল বা মাতাল হয়ে গেলে:
ইসলামের যাবতীয় বিধান কেবল সুস্থ জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্যই প্রযোজ্য। ফলে পাগল ও মাতালকে ইসলামের বিধান পালন করা থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। সুতরাং যদি কেউ সুস্থ থাকা অবস্থায় ই'তিকাফে বসে এবং ই'তিকাফ শেষ হওয়ার পূর্বেই পাগল অথবা মাতাল হয়ে যায়, তাহলে তার ই'তিকাফ ভঙ্গ হয়ে যাবে।
টিকাঃ
১১১. সহীহ বুখারী, হা/৩১০; আবু দাউদ, হা/২৪৭৮; ইবনে মাজাহ, হা/১৭৮০; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৫০৪২; বায়হাকী, হা/৮৩৮৫।
📄 ই‘তিকাফের উদ্দেশ্য
১. আল্লাহর সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করা: ই'তিকাফ হলো এমন একটি ইবাদাত, যার মাধ্যমে বান্দা সমস্ত সৃষ্টি থেকে আলাদা হয়ে যথাসম্ভব আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে আসে। বান্দার কাজ হলো তাকে স্মরণ করা, তাকে ভালোবাসা ও তার ইবাদাত করা। সর্বদা তার সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের চেষ্টা করা, এরই মাধ্যমে আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক দৃঢ় ও মজবুত হয়।
২. পাশবিক প্রবণতা এবং অহেতুক কাজ থেকে দূরে থাকা: ই'তিকাফের মাধ্যমে একজন মানুষ সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করার সুযোগ পায়। সালাত আদায়, কুরআন তিলাওয়াত, যিকির ও দু'আ ইত্যাদির মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারে।
৩. লাইলাতুল কদর তালাশ করা: ই'তিকাফের মাধ্যমে লাইলাতুল কদর খোঁজ করা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মূল উদ্দেশ্য ছিল। আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীস সে কথারই প্রমাণ বহন করে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, 'আমি প্রথম দশকে ই'তিকাফ করেছি এই রজনী খোঁজ করার উদ্দেশ্যে। অতঃপর ই'তিকাফ করেছি মাঝের দশকে। অতঃপর মাঝ-দশক পেরিয়ে এলাম। তারপর আমাকে বলা হলো, এটা (কদর) তো শেষ দশকে। তোমাদের মধ্যে যদি কেউ ই'তিকাফ করতে চায়, তাহলে সে যেন ই'তিকাফ করে।'
৪. মসজিদে অবস্থানের অভ্যাস গড়ে তোলা : ই'তিকাফের মাধ্যমে বান্দার অন্তর মসজিদের সাথে জুড়ে যায়, মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার অভ্যাস গড়ে উঠে। হাদীস অনুযায়ী যে সাতজন ব্যক্তিকে আল্লাহ তা'আলা তার নিজের ছায়ার নিচে ছায়া দান করবেন, তার মধ্যে একজন হলেন ওই ব্যক্তি, যার হৃদয় মসজিদের সাথে বাধা ছিল।
টিকাঃ
১১২. সহীহ মুসলিম, হা/২৮২৮; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/২১৭১; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩৬৮৪; মুস্তাখরাজে আবু আওয়ানা, হা/২৪৫৯; বায়হাকী, হা/৮৩৫০।
১১৩. মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হা/১৭০৯; সহীহ বুখারী, হা/৬৬০; সহীহ মুসলিম, হা/২৪২৭; তিরমিযী, হা/২৩৯১; নাসাঈ, হা/৫৩৮০; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৩৩২০; জামেউস সগীর, হা/৬৯৮৩; মিশকাত, হা/৭০১।
📄 লাইলাতুল কদর
আরবি ভাষায় ক্বাফ- এ যবর ও দাল বর্ণে সাকিন দিয়ে 'কদরুন' শব্দের অর্থ হলো- সম্মান ও মর্যাদা। এদিক থেকে শবে কদর বা লাইলাতুল কদর এর অর্থ হলো সম্মানিত ও মহিমান্বিত রজনী।
অন্যদিকে দাল বর্ণে যবর দিয়ে 'ক্বাদারুন' শব্দের অর্থ হলো পরিমাপ করা, নির্ধারণ করা। এ হিসেবে লাইলাতুল কদর অর্থ হলো, ভাগ্য রজনী, তাকদীরের ফয়সালা করার রাত ইত্যাদি।
কদরের রাত আল্লাহ তা'আলার এক বিশেষ নিয়ামত। এ রাতের রয়েছে বিশেষ সম্মান, বিশেষ মাহাত্ম্য ও বিশেষ ফযীলত। এ রাতের নামে পবিত্র কুরআনে একটি সূরা রয়েছে। এ রাতের ব্যাপারে নবী ﷺ এর অনেক হাদীস রয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো এ রাতের কেন এত মর্যাদা? কেন এত ফযীলত? উত্তর একটাই, আর তা হলো এ রাতেই আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে মর্যাদাপূর্ণ মহাগ্রন্থ আল-কুরআন মর্যাদাবান ফেরেশতা জিবরাঈল (আঃ) এর মাধ্যমে মর্যাদাশীল নবী মুহাম্মাদ ﷺ এর উপর তাঁর মর্যাদাবান উম্মতের পথপ্রদর্শক হিসেবে নাযিল হয়েছে। সুতরাং যেখানে এতগুলো মর্যাদাপূর্ণ বিষয় একত্র হলো সেখানে যে রাতে এগুলোর সমাবেশ ঘটেছে সে রাতটি কি মর্যাদাপূর্ণ না হয়ে পারে?
আল্লাহ তা'আলা নিজেই বলেছেন, 'নিশ্চয় আমি এটাকে (আল-কুরআনকে) কদরের রাত্রিতে নাযিল করেছি।' (সূরা কদর- ১)
এ রাতে কুরআন নাযিল করার অর্থ হলো- লাওহে মাহফুজ থেকে দুনিয়ার আকাশে এটি নাযিল হয়, পরে প্রয়োজন অনুপাতে পর্যায়ক্রমে তা নবী ﷺ এর উপর নাযিল হতে থাকে। এর অপর অর্থ হচ্ছে- এ রাতে কুরআন নাযিলের সিলসিলা শুরু হয়েছে এবং দীর্ঘ তেইশ বছরে তা পূর্ণতা লাভ করেছে। এ রাতের মর্যাদার দিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'তুমি কি জান কদরের রাত কী? কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।' (সূরা কদর- ২, ৩)
এখানে হাজার মাস বলতে কোন নির্দিষ্ট সংখ্যা বুঝানো উদ্দেশ্য নয়; বরং বেশি বুঝানোর উদ্দেশ্যে এটা বলা হয়েছে, তার মানে এ রাতটি হাজার হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।
উত্তম কথাটির দু'টি ব্যাখ্যা আছে এবং উভয়টিই সঠিক। ১. কদরের রাতটি এমন ফযীলতপূর্ণ যে, এ রাতের ইবাদাত-বন্দেগী হাজার মাসের ইবাদাত-বন্দেগীর চেয়ে উত্তম। নবী ﷺ বলেছেন, 'যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিদান লাভের আশায় কদরের রাতে জাগরণ করবে, তার পিছনের সমস্ত গোনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।'
২. এ রাতটি এদিক দিয়ে হাজার মাসের চেয়ে উত্তম যে, এ রাতে বিশ্বমানবতার মুক্তির সনদ মহাগ্রন্থ আল-কুরআন নাযিল করে মানুষের এত কল্যাণ সাধন করা হয়েছে, যা মানব জাতির ইতিহাসে হাজার মাসেও করা হয়নি। কারণ এ কুরআন একটি অসভ্য, বর্বর জাতিকে সঠিক পথের সন্ধান দিয়ে তাদেরকে সভ্য, ভদ্র ও চরিত্রবান করে উন্নতি ও কল্যাণের চরম শিখরে পৌঁছে দিয়েছিল। কুরআনের বাণী শুনে পাথরের মতো কঠিন অন্তরগুলো পানির মতো নরম হয়ে গিয়েছিল, এর মুজিযা ও মাধুর্যের সামনে সারা বিশ্ব অবাক, হতভম্ব ও নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। সূরা দুখানে এ কথাটি এভাবে বলা হয়েছে, 'আমি একে এক বরকতময় রাত্রে অবতীর্ণ করেছি।' (সূরা দুখান- ৩)
এখানে কদরের রাতকে বরকতময় বলা হয়েছে। যেহেতু এ রাতে কল্যাণ ও বরকতের এমন ধারা শুরু হয়েছিল, যা সারা দুনিয়ায় এখন পর্যন্ত অব্যাহত আছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে।
কদরের রাতের বিশেষত্ব সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন, 'এ রাতে জিবরাঈল ও অন্যান্য ফেরেশতারা তাদের রবের অনুমতিক্রমে প্রত্যেকটি হুকুম নিয়ে নাযিল হয়।' (সূরা কদর- ৪)
এ রাত্রে অগণিত ফেরেশতা পৃথিবীতে অবতরণ করেন। হাদীসে এসেছে, 'কদরের রাতে ফেরেশতাদের সংখ্যা পৃথিবীর সমুদয় কংকরের চেয়েও বেশি হয়।' এই অসংখ্য ফেরেশতারা এ রাতে ইবাদাতকারীদের জন্য দু'আ করেন।
এ রাতে বিভিন্ন বিষয়ের ফায়সালা করা হয়। সূরা দুখানে বলা হয়েছে, 'এই রাতে সব ব্যাপারে জ্ঞানগর্ভ ফায়সালা হয়ে থাকে।' (সূরা দুখান- ৪)
'এ রাতটি ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত পুরোপুরি শান্তিময়।' (সূরা কদর- ৫) অর্থাৎ এ রাতে শুধু শান্তি আর শান্তি, মঙ্গল আর মঙ্গল। এতে অনিষ্টের নাম গন্ধও নেই। অনাবিল শান্তিপূর্ণ এ রজনীর অফুরন্ত শান্তি ফজর উদয় পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।
টিকাঃ
১১৪. সহীহ বুখারী, হা/৩৫; সহীহ মুসলিম, হা/১৮১৮; আবু দাউদ, হা/১৩৭৪; তিরমিযী, হা/৬৮৩; মুসনাদে আহমাদ, হা/৮৫৫৯; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/১৮৯৪; মুসনাদুল বাযযার, হা/৯৪৯৫; বায়হাকী, হা/৮৩০৬; মুসনাদে আবু ই'আলা, হা/২৬৩২; জামেউস সগীর, হা/১১৩৮৭; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৯৯২; মিশকাত, হা/১৯৫৮।
১১৫. সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/২১৯৪; মুসনাদে আহমাদ, হা/১০৭৪৫; মুসনাদুল বাযযার, হা/৯৪৪৭: জামেউস সগীর, হা/৯৬০৪; সিলসিলা সহীহাহ, হা/২২০৫।