📄 ই‘তিকাফের সময়
ই'তিকাফের সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো রমাযানের শেষ দশ দিন। হাদীসে এসেছে, আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ রমাযানের শেষ দশকে ই'তিকাফ করতেন। এক বছর তিনি ই'তিকাফ করতে পারেননি, তাই পরের বছর তিনি বিশ দিন ই'তিকাফ করেছেন।
এটা হলো সুন্নাত ই'তিকাফ। আর ই'তিকাফ করার জন্য মান্নত করলে এটা ওয়াজিব হবে। উল্লেখ্য যে, বছরের যেকোন সময় অল্প সময় হলেও ই'তিকাফের নিয়তে মসজিদে অবস্থান করা যাবে।
ই'তিকাফের স্থান :
ই'তিকাফ অবশ্যই মসজিদে করতে হবে। আর এটা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সুন্নত। কেননা রাসূলুল্লাহ ﷺ সবসময় মসজিদেই ই'তেকাফ করতেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'আর তোমরা মসজিদে ই'তিকাফরত অবস্থায় স্ত্রীদের সাথে মেলামেশা করো না।' (সূরা বাকারা- ১৮৭)
উল্লেখ যে, পাঞ্জেগানা মসজিদে ই'তিকাফ চলে, তবে জামে মসজিদে হলে ভালো হয়।
ই'তিকাফের নিয়ম :
ই'তিকাফকারী মসজিদের কোন এক জায়গায় কিছুটা আড়াল করে সেখানে অবস্থান করবে, সেখানেই খাওয়া-দাওয়া করবে। মানবীয় প্রয়োজন যেমন প্রস্রাব-পায়খানা ইত্যাদি ছাড়া মসজিদের বাইরে যাবে না। ই'তিকাফের সময় বেশি বেশি নফল ইবাদাত করা উচিত। নফল সালাত, কুরআন তিলাওয়াত, তাসবীহ, তওবা-ইস্তিগফার, দরূদ পাঠ ও মুনাজাত ইত্যাদি কাজে মগ্ন থাকবে। তাছাড়া ধর্মীয় বই-পুস্তক পড়ে এবং কুরআন-হাদীস চর্চা করে ইসলামী জ্ঞান অর্জন করবে এবং একে অপরের সাথে ইসলামী কথা আলোচনা করবে- এটাও বড় ধরনের ইবাদাত।
টিকাঃ
১০৭. সহীহ বুখারী, হা/২০৪৪; আবু দাউদ, হা/২৪৬৮; ইবনে মাজাহ, হা/১৭৬৯; মুসনাদে আহমাদ, হা/৮৪১৬; মুসনাদুল বাযযার, হা/৯০১০; মুসনাদে দারেমী, হা/১৮২০; বায়হাকী, হা/৮৩৪৬; মিশকাত, হা/২১০২।
📄 ই‘তিকাফ অবস্থায় যেসব কাজ করা যাবে
নিজেকে পরিপাটি রাখা: ই'তিকাফকারী ব্যক্তি নিজেকে পরিপাটি রাখার জন্য স্বাভাবিকভাবে যেকোন ধরনের কাজ করতে পারবে। যেমন- গোসল করা, চুল আঁচড়ানো, তেল ও সুগন্ধি ব্যবহার, ভালো পোশাক পরিধান করা। হাদীসে এসেছে,
আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি মাসিক অবস্থায় রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মাথার কেশ বিন্যাস করে দিতেন, যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ মসজিদে ই'তিকাফরত অবস্থায় থাকতেন। আয়েশা (রাঃ) তার কক্ষে থাকাবস্থায় রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মাথার নাগাল পেতেন।
পরিবারের লোকদের সাথে সাক্ষাৎ করা:
ই'তিকাফকারীর পরিবার তার সাথে সাক্ষাৎ করতে পারবে, কথা বলতে পারবে। কেননা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর স্ত্রীগণ ই'তিকাফকালীন তার সাথে সাক্ষাৎ করতেন। কিন্তু সাক্ষাৎ দীর্ঘ না হওয়া বাঞ্ছনীয়। হাদীসে এসেছে,
নবী ﷺ এর সহধর্মিণী সাফিয়্যা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি (একবার) রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে দেখা করার জন্য মসজিদে গেলেন। তিনি তখন রমাযানের শেষ দশ দিনে ই'তিকাফে ছিলেন। সাফিয়্যা (রাঃ) তাঁর কাছে (বসে) কিছু সময় কথাবার্তা বললেন। অতঃপর (ঘরে) ফেরার জন্য উঠে দাঁড়ালেন। নবী ﷺ-ও সঙ্গে সঙ্গে উঠলেন এবং তাঁকে এগিয়ে দেবার জন্য উম্মু সালামা (রাঃ) এর দরজার কাছে মসজিদের দরজা পর্যন্ত গেলেন। তখন দু'জন আনসারী সাহাবী সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁরা রাসূলুল্লাহ ﷺ কে সালাম দিলেন। তখন নবী ﷺ তাদেরকে বললেন, তোমরা একটু অপেক্ষা করো। এ মহিলা হলো হুয়াই-এর কন্যা সাফিয়্যা। তাঁরা বললেন, সুবহানাল্লাহ, হে আল্লাহর রাসূল! তখন নবী ﷺ বললেন, শয়তান মানুষের শিরায় পৌঁছতে ক্ষমতা রাখে। তাই আমার ভয় হলো, সে তোমাদের মনে কোন খারাপ ধারণার সৃষ্টি করে দেয় কি না।
টিকাঃ
১০৮. সহীহ বুখারী, হা/২০৪৩; নাসাঈ, হা/৩৮৬; ইবনে মাজাহ, হা/১৭৭৯; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬০১৫।
১০৯. সহীহ বুখারী, হা/২০৩৫।
📄 ই‘তিকাফ অবস্থায় মসজিদ থেকে বের হওয়ার বিধান
• ই'তিকাফকারী যদি বিনা প্রয়োজনে মসজিদ থেকে বের হয় তাহলে তার ই'তিকাফ ভঙ্গ হয়ে যাবে। আর যদি মানবীয় প্রয়োজন মিটানোর জন্য বের হয় তাহলে ই'তিকাফ ভঙ্গ হবে না।
• মসজিদে থেকে পবিত্রতা অর্জন করা সম্ভব না হলে বাইরে বের হতে পারবে।
• বাহক না থাকার কারণে ই'তিকাফকারী পানাহারের প্রয়োজনে বাইরে যেতে পারবে।
• যে মসজিদে ই'তিকাফ বসেছে সেখানে জুমু'আর সালাতের ব্যবস্থা না থাকলে জুমু'আর সালাত আদায়ের জন্য বাইরে যেতে পারবে।
• রোগী দেখতে যাওয়া, জানাযায় উপস্থিত হওয়া ইত্যাদি কাজ করার জন্য ই'তিকাফকারীর মসজিদ থকে বের হওয়া বৈধ নয়। হাদীসে এসেছে,
আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ই'তিকাফকারীর জন্য সুন্নাত হলো, সে রোগী দেখতে যাবে না, জানাযায় উপস্থিত হবে না, স্ত্রীকে স্পর্শ করবে না ও তার সাথে মিলন থেকে বিরত থাকবে এবং অতি প্রয়োজন ব্যতীত মসজিদ থেকে বের হবে না।
• ই'তিকাফের নিয়ম বহির্ভূত কোন কাজের জন্য ই'তিকাফকারীর মসজিদ থেকে বের হওয়া বৈধ নয়। যেমন ক্রয়-বিক্রয়, স্বামী-স্ত্রীর মিলন ইত্যাদি।
টিকাঃ
১১০. আবু দাউদ, হা/২৪৭৫; বায়হাকী, হা/৮৩৭৭; মিশকাত, হা/২১০৬।
📄 যেসব কারণে ই‘তিকাফ ভঙ্গ হয়ে যায়
ইচ্ছাকৃতভাবে বীর্যপাত ঘটালে : গোসল ফরয হয় এমন ধরনের অপবিত্রতা থেকে পবিত্র থাকতে হবে। অপবিত্রতা যদি যৌন স্পর্শ অথবা স্বামী স্ত্রীর মিলনের ফলে হয় তবে সকলের মতে ই'তিকাফ ভঙ্গ হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'আর তোমরা মসজিদে ই'তিকাফরত অবস্থায় স্ত্রীদের সাথে মিলিত হয়ো না।' (সূরা বাকারা- ১৮৭)
তবে যদি স্বপ্নদোষের কারণে বীর্যপাত ঘটে তাহলে ই'তিকাফ ভঙ্গ হবে না। আর যদি হস্তমৈথুনের কারণে হয় তাহলে সঠিক মতানুসারে ই'তিকাফ ভঙ্গ হয়ে যাবে।
মহিলাদের হায়েয অথবা নিফাস শুরু হলে:
ই'তিকাফ অবস্থায় মহিলাদের হায়েয-নিফাস থেকে পবিত্র থাকা জরুরি। কেননা এ অবস্থায় মসজিদে অবস্থান করা হারাম, অবশ্য ইস্তেহাযা অবস্থায় ই'তিকাফ করা বৈধ। আয়েশা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে ইস্তিহাযা অবস্থায় তাঁর স্ত্রীগণের মধ্য হতে কোন একজন ই'তিকাফ করেছিলেন। তিনি লাল ও হলুদ রঙের স্রাব দেখতে পাচ্ছিলেন। এমতাবস্থায় তিনি নিচে পাত্র রেখে সালাত আদায় করলেন।
বিনা প্রয়োজনে মসজিদ থেকে বের হলে :
ই'তিকাফ করার প্রধান শর্তই হচ্ছে ইবাদাতের উদ্দেশ্যে মসজিদে অবস্থান করা। সুতরাং কেউ যদি বিনা প্রয়োজনে ইচ্ছাকৃতভাবে মসজিদ থেকে বের হয়, তাহলে তার ই'তিকাফ ভঙ্গ হয়ে যাবে- যদিও তা অল্প সময়ের জন্য হয়।
পাগল বা মাতাল হয়ে গেলে:
ইসলামের যাবতীয় বিধান কেবল সুস্থ জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্যই প্রযোজ্য। ফলে পাগল ও মাতালকে ইসলামের বিধান পালন করা থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। সুতরাং যদি কেউ সুস্থ থাকা অবস্থায় ই'তিকাফে বসে এবং ই'তিকাফ শেষ হওয়ার পূর্বেই পাগল অথবা মাতাল হয়ে যায়, তাহলে তার ই'তিকাফ ভঙ্গ হয়ে যাবে।
টিকাঃ
১১১. সহীহ বুখারী, হা/৩১০; আবু দাউদ, হা/২৪৭৮; ইবনে মাজাহ, হা/১৭৮০; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৫০৪২; বায়হাকী, হা/৮৩৮৫।