📄 রমাযান মাসে উমরা করা
কাবা হলো ইবাদাতের উদ্দেশ্যে নির্মিত পৃথিবীর সর্বপ্রথম গৃহ। এর মধ্যে রয়েছে আল্লাহর অসংখ্য নিদর্শন। হজ্জ ও উমরার মাধ্যমে এসব নিদর্শন দেখা যায়। উমরার অগণিত ফযীলত রয়েছে। হাদীসে এসেছে, আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, একবার উমরা করার পর আবার উমরা করলে তা দুই উমরার মধ্যবর্তী গোনাহসমূহের কাফ্ফ্ফারা হয়ে যায়। আর হজ্জে মাবরুরের বিনিময় হচ্ছে জান্নাত।
রমযান মাসে উমরা করার ফযীলত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, 'যখন রমাযান মাস আসবে তখন উমরা করো। কেননা এ মাসে উমরা করার সওয়াব একটি হজ্জের সমান।'
অন্য বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, 'রমযান মাসে উমরা করা আমার সাথে হজ্জ করার সমান।'
নবী ﷺ এর ইন্তেকালের পরেও তাঁর সাথে হজ্জ করার সমান সওয়াব পাওয়া যায় এমন সুযোগ কে হারায়? এজন্য আল্লাহ তা'আলা যাদেরকে সামর্থ্য দিয়েছেন তাদের রমাযান মাসে উমরা করা উচিত।
টিকাঃ
১০২. মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হা/৭৬৭; সহীহ বুখারী, হা/১৭৭৩; সহীহ মুসলিম, হা/৩৩৫৫; তিরমিযী, হা/৯৩৩; নাসাঈ, হা/২৬২৯; ইবনে মাজাহ, হা/২৮৮৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/৯৯৪৯; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩৬৯৬; মু'জামুল কাবীর লিত তাবারানী, হা/৯৪; শারহুস সুন্নাহ, হা/১৮৪৩।
১০৩. সহীহ মুসলিম, হা/৩০৯৭; তিরমিযী, হা/৯৩৯; নাসাঈ, হা/২১১০; ইবনে মাজাহ, হা/২৯৯১-৯৫; মুসনাদে আহমাদ, হা/২০২৫; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩৭০০; মিশকাত, হা/২৫০৯।
১০৪. সহীহ বুখারী, হা/১৮৬৩; সহীহ মুসলিম, হা/৩০৯৮; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/৩০৭৭; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/১৭৭৯; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/১১১৮।
📄 রমাযান মাসে ই‘তিকাফ করা
* 'ই'তিকাফ' আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ হলো আবদ্ধ থাকা, কোন নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করা। ইসলামী পরিভাষায় ই'তিকাফ হলো, ইবাদাতের নিয়তে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পদ্ধতি অনুযায়ী কোন মসজিদে নিজেকে আবদ্ধ রাখা।
ই'তিকাফ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদাত। নবী করীম ﷺ নিজেই ই'তিকাফ করেছেন এবং তার স্ত্রীগণ ও সাহাবীরাও ই'তিকাফ করেছেন।
ই'তিকাফ আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের এক সুবর্ণ সুযোগ। কারণ এটি এমন এক নির্জনতা, যখন বান্দা দুনিয়ার বিভিন্ন ঝামেলা থেকে মুক্ত হয়ে একাগ্রচিত্তে আল্লাহর দরজায় হাজির হয় এবং আল্লাহর আনুগত্য ও যিকির করার মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখে। বান্দা তার দেহ ও মনকে স্বীয় প্রভুর উদ্দেশ্যে বেঁধে রাখে।
* ই'তিকাফের বাস্তবরূপটা এমন- যেন কোন ব্যক্তি কারো কাছ থেকে তার দাবি-দাওয়া পূরণের জন্য তার দরজায় ধর্ণা দেয় এবং দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ঐ দরজায় পড়ে থাকে। ঠিক তেমনিভাবে যারা ই'তিকাফ করেন তারা মায়ার সংসারকে ভুলে একাধারে কয়েকদিন যাবৎ আল্লাহর দরজায় নিজেদেরকে আটক রাখেন, ফলে আল্লাহ তাদেরকে যথেষ্ট পুরস্কার দান করেন।
এক হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
'যে ব্যক্তি অর্ধ হাত আমার নিকটবর্তী হয় আমি এক হাত তার নিকটবর্তী হই। আর যে ব্যক্তি এক হাত আমার নিকটবর্তী হয় আমি তার দিকে এক গজ নিকটবর্তী হই। আর যে ব্যক্তি আমার দিকে হেঁটে আসে, আমি তার দিকে দৌড়ে আসি। আর যে ব্যক্তি জমিন ভর্তি পাপ নিয়ে আমার সাথে সাক্ষাৎ করে এবং সে আমার সাথে কাউকে শরীক না করে, তাহলে আমিও ঐ পরিমাণ ক্ষমা নিয়ে তার সাথে সাক্ষাৎ করি।'
অপর এক হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
'আমি আমার বান্দার সাথে তার ধারণা অনুযায়ী ব্যবহার করে থাকি। আর সে যখন আমাকে স্মরণ করে তখন আমি তার সাথেই থাকি; সে যখন আমাকে একা একা স্মরণ করে তখন আমিও এককভাবে তাকে স্মরণ করি। আর সে যখন আমাকে জনসমক্ষে স্মরণ করে, তখন আমি এর থেকে উত্তম মজলিসে তাকে স্মরণ করি।'
টিকাঃ
১০৫. সহীহ মুসলিম, হা/৭০০৯; ইবনে মাজাহ, হা/৩৮২১; মিশকাত, হা/২২৬৫।
১০৬. সহীহ বুখারী, হা/৭৩০৫; সহীহ মুসলিম, হা/৬৯৮১; তিরমিযী, হা/৩৬০৩; ইবনে মাজাহ, হা/৩৮২২; মুসনাদে আহমাদ, হা/৯৩৪০; মুসনাদুল বাযযার, হা/৯১৪২; জামেউস সগীর, হা/১৪০৯৭; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/১৪৮৭; মিশকাত, হা/২২৬৪।
📄 ই‘তিকাফের সময়
ই'তিকাফের সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো রমাযানের শেষ দশ দিন। হাদীসে এসেছে, আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ রমাযানের শেষ দশকে ই'তিকাফ করতেন। এক বছর তিনি ই'তিকাফ করতে পারেননি, তাই পরের বছর তিনি বিশ দিন ই'তিকাফ করেছেন।
এটা হলো সুন্নাত ই'তিকাফ। আর ই'তিকাফ করার জন্য মান্নত করলে এটা ওয়াজিব হবে। উল্লেখ্য যে, বছরের যেকোন সময় অল্প সময় হলেও ই'তিকাফের নিয়তে মসজিদে অবস্থান করা যাবে।
ই'তিকাফের স্থান :
ই'তিকাফ অবশ্যই মসজিদে করতে হবে। আর এটা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সুন্নত। কেননা রাসূলুল্লাহ ﷺ সবসময় মসজিদেই ই'তেকাফ করতেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'আর তোমরা মসজিদে ই'তিকাফরত অবস্থায় স্ত্রীদের সাথে মেলামেশা করো না।' (সূরা বাকারা- ১৮৭)
উল্লেখ যে, পাঞ্জেগানা মসজিদে ই'তিকাফ চলে, তবে জামে মসজিদে হলে ভালো হয়।
ই'তিকাফের নিয়ম :
ই'তিকাফকারী মসজিদের কোন এক জায়গায় কিছুটা আড়াল করে সেখানে অবস্থান করবে, সেখানেই খাওয়া-দাওয়া করবে। মানবীয় প্রয়োজন যেমন প্রস্রাব-পায়খানা ইত্যাদি ছাড়া মসজিদের বাইরে যাবে না। ই'তিকাফের সময় বেশি বেশি নফল ইবাদাত করা উচিত। নফল সালাত, কুরআন তিলাওয়াত, তাসবীহ, তওবা-ইস্তিগফার, দরূদ পাঠ ও মুনাজাত ইত্যাদি কাজে মগ্ন থাকবে। তাছাড়া ধর্মীয় বই-পুস্তক পড়ে এবং কুরআন-হাদীস চর্চা করে ইসলামী জ্ঞান অর্জন করবে এবং একে অপরের সাথে ইসলামী কথা আলোচনা করবে- এটাও বড় ধরনের ইবাদাত।
টিকাঃ
১০৭. সহীহ বুখারী, হা/২০৪৪; আবু দাউদ, হা/২৪৬৮; ইবনে মাজাহ, হা/১৭৬৯; মুসনাদে আহমাদ, হা/৮৪১৬; মুসনাদুল বাযযার, হা/৯০১০; মুসনাদে দারেমী, হা/১৮২০; বায়হাকী, হা/৮৩৪৬; মিশকাত, হা/২১০২।
📄 ই‘তিকাফ অবস্থায় যেসব কাজ করা যাবে
নিজেকে পরিপাটি রাখা: ই'তিকাফকারী ব্যক্তি নিজেকে পরিপাটি রাখার জন্য স্বাভাবিকভাবে যেকোন ধরনের কাজ করতে পারবে। যেমন- গোসল করা, চুল আঁচড়ানো, তেল ও সুগন্ধি ব্যবহার, ভালো পোশাক পরিধান করা। হাদীসে এসেছে,
আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি মাসিক অবস্থায় রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মাথার কেশ বিন্যাস করে দিতেন, যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ মসজিদে ই'তিকাফরত অবস্থায় থাকতেন। আয়েশা (রাঃ) তার কক্ষে থাকাবস্থায় রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মাথার নাগাল পেতেন।
পরিবারের লোকদের সাথে সাক্ষাৎ করা:
ই'তিকাফকারীর পরিবার তার সাথে সাক্ষাৎ করতে পারবে, কথা বলতে পারবে। কেননা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর স্ত্রীগণ ই'তিকাফকালীন তার সাথে সাক্ষাৎ করতেন। কিন্তু সাক্ষাৎ দীর্ঘ না হওয়া বাঞ্ছনীয়। হাদীসে এসেছে,
নবী ﷺ এর সহধর্মিণী সাফিয়্যা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি (একবার) রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে দেখা করার জন্য মসজিদে গেলেন। তিনি তখন রমাযানের শেষ দশ দিনে ই'তিকাফে ছিলেন। সাফিয়্যা (রাঃ) তাঁর কাছে (বসে) কিছু সময় কথাবার্তা বললেন। অতঃপর (ঘরে) ফেরার জন্য উঠে দাঁড়ালেন। নবী ﷺ-ও সঙ্গে সঙ্গে উঠলেন এবং তাঁকে এগিয়ে দেবার জন্য উম্মু সালামা (রাঃ) এর দরজার কাছে মসজিদের দরজা পর্যন্ত গেলেন। তখন দু'জন আনসারী সাহাবী সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁরা রাসূলুল্লাহ ﷺ কে সালাম দিলেন। তখন নবী ﷺ তাদেরকে বললেন, তোমরা একটু অপেক্ষা করো। এ মহিলা হলো হুয়াই-এর কন্যা সাফিয়্যা। তাঁরা বললেন, সুবহানাল্লাহ, হে আল্লাহর রাসূল! তখন নবী ﷺ বললেন, শয়তান মানুষের শিরায় পৌঁছতে ক্ষমতা রাখে। তাই আমার ভয় হলো, সে তোমাদের মনে কোন খারাপ ধারণার সৃষ্টি করে দেয় কি না।
টিকাঃ
১০৮. সহীহ বুখারী, হা/২০৪৩; নাসাঈ, হা/৩৮৬; ইবনে মাজাহ, হা/১৭৭৯; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬০১৫।
১০৯. সহীহ বুখারী, হা/২০৩৫।