📘 সিয়াম ও যাকাত > 📄 উমর (রাঃ) কর্তৃক জামা‘আতের প্রচলন

📄 উমর (রাঃ) কর্তৃক জামা‘আতের প্রচলন


তারপর থেকে সাহাবীগণ বিচ্ছিন্নভাবে তারাবীর সালাত আদায় করতেন। পরবর্তীতে উমর (রাঃ) মনে করলেন যে, এখন তো আর ফরয হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। তাই তিনি একজন ইমামের পেছনে তারাবীর সালাত আদায় করার ব্যবস্থা করেন। যার বিস্তারিত বিবরণ নিম্নের হাদীসটিতে রয়েছে :
আবদুর রহমান ইবনে আবদুল ক্বারী (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আমি রমাযানের এক রাতে উমর ইবনে খাত্তাবের সাথে মসজিদের দিকে বের হলাম। তখন দেখতে পেলাম, বিভিন্নভাবে অনেক লোকের সমাগম হয়েছে। কেউ একা একা সালাত আদায় করছে। আবার কোথাও এক ব্যক্তি সালাত আদায় করছে এবং কিছু লোকও তার সঙ্গে সালাত আদায় করছে। তখন উমর (রাঃ) বললেন, আমার মনে হয়, এদের সবাইকে একজন ক্বারীর সাথে জামা'আতবন্দী করে দিলে সবচেয়ে ভালো হবে। এরপর এ ব্যাপারে তিনি দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হলেন এবং তাদেরকে উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) এর পেছনে জামা'আতবন্দী করে দিলেন। অতঃপর আমি আরেক রাতে আবার তাঁর সাথে বের হলাম। দেখলাম, লোকজন তাদের ইমামের সঙ্গে সালাত আদায় করছে। উমর (রাঃ) বললেন, এটি কতইনা উত্তম বিদআত বা সুন্দর ব্যবস্থা। লোকেরা রাতের যে অংশে সালাত আদায় না করে ঘুমায় তা যে অংশে তারা সালাত আদায় করে তার চেয়ে উত্তম। অর্থাৎ রাতের প্রথমাংশের চেয়ে শেষাংশের সালাতই বেশি উত্তম- এটাই তিনি বুঝাতে চেয়েছেন। আর লোকেরা রাতের প্রথমাংশেই সালাত আদায় করত।
এখানে বুঝা গেল, তারাবীর সালাত নিয়মিতভাবে জামা'আতের সাথে বর্তমানে যেটা চালু আছে এটা উমর (রাঃ) থেকে শুরু হয়েছে। উমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ) ছিলেন খোলাফায়ে রাশেদার অন্যতম একজন খলীফা। তাই তাঁদের আদর্শ অনুসরণ করাও আমাদের জন্য সুন্নাত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, 'তোমাদের উপর আবশ্যক হচ্ছে আমার ও হেদায়াতপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদার সুন্নাতকে গ্রহণ করা। তোমরা তা দাঁত দিয়ে শক্তভাবে কামড়ে ধরো। আর তোমাদের উপর আরো আবশ্যক হচ্ছে, তোমরা প্রত্যেক নতুন উদ্ভাবিত বিষয় হতে বেঁচে থাকবে। কেননা প্রত্যেক নতুন বিষয়ই বিদআত, আর প্রত্যেক বিদআতই গোমরাহী।'
উক্ত বর্ণনাসমূহ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, রমাযানে কয়েক রাত জামা'আত সহকারে তারাবীহ পড়া রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সুন্নাত এবং খোলাফায়ে রাশেদীন ও অধিকাংশ সাহাবায়ে কেরামের ঐক্যমতে পুরো রমাযান মাস জামা'আতে তারাবীহ পড়া সুন্নাত।

টিকাঃ
৮৫. মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হা/২৫০; সহীহ বুখারী, হা/২০১০; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/১১০০; বায়হাকী, হা/৪৩৭৯; মিশকাত, হা/১৩০১।
৮৬. আবু দাউদ, হা/৪৬০৯; ইবনে মাজাহ, হা/৪২; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭১৮৪; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৩২৯; সিলসিলা সহীহাহ, হা/২৭৩৫; মিশকাত, হা/১৬৫।

📘 সিয়াম ও যাকাত > 📄 তারাবীর সালাত কত রাক‘আত

📄 তারাবীর সালাত কত রাক‘আত


তারাবীর সালাতের রাক'আত নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। কেউ বলেছেন বিশ রাক'আত আবার কেউ বলেছেন আট রাক'আত। এ ছাড়াও আরো অনেক মতামত রয়েছে। তবে বর্তমানে ২০ রাক'আত ও ৮ রাকা'আতের আমলই চালু আছে।

২০ রাক'আতের দলীল :
আবুল খাসিব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সুওয়াইদ বিন গাফলাহ রমাযান মাসে পাঁচ বৈঠকে বিশ রাক'আত তারাবীহ পড়িয়েছেন।
আবু আবদুর রহমান আস সুলামী (রহ.) আলী (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি রমাযান মাসে কুররাদেরকে (হাফেযদেরকে) ডাকলেন এবং তাদের মধ্য থেকে একজনকে আদেশ দিলেন সে যেন লোকদেরকে নিয়ে ২০ রাক'আত সালাত আদায় করে। (বর্ণনাকারী বলেন) আলী (রাঃ) তাদের বেতরের ইমামতি করতেন।
আবদুল আযীয বিন রুফাই' (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) মদিনাতে রমাযান মাসে লোকদেরকে নিয়ে ২০ রাক'আত সালাত আদায় করতেন এবং বেতর পড়তেন তিন রাক'আত।
ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ রমাযান মাসে ২০ রাক'আত সালাত আদায় করতেন এবং বেতরের সালাতও আদায় করতেন।

৮ রাক'আতের দলীল :
আবু সালামা ইবনে আবদুর রহমান (রহ.) হতে বর্ণিত। একদা তিনি আয়েশা (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন, রমাযানের রাতে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সালাত কেমন ছিল? তিনি বললেন, রমাযান মাসে অথবা অন্য সময়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ ১১ রাক'আতের চেয়ে বেশি সালাত আদায় করতেন না। তিনি প্রথমে ৪ রাক'আত সালাত আদায় করতেন, যার সৌন্দর্য এবং দীর্ঘতা সম্পর্কে আমাকে প্রশ্ন করো না। তারপর এমন ৪ রাক'আত সালাত আদায় করতেন, যার সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে তুমি জিজ্ঞেস করো না। অতঃপর তিনি ৩ রাক'আত সালাত আদায় করতেন। আয়েশা (রাঃ) আরো বলেন, আমি একদিন বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি বিতর আদায়ের পূর্বে ঘুমান? তিনি বললেন, হে আয়েশা! আমার চক্ষু ঘুমালেও হৃদয় ঘুমায় না।
উক্ত হাদীসের আলোকে এটা প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ রমাযান মাসের রাতে বিতর সহ মোট ১১ রাক'আত সালাত আদায় করতেন।
জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, একদা রাসূলুল্লাহ ﷺ রমাযান মাসে আমাদেরকে নিয়ে ৮ রাক'আত সালাত আদায় করলেন এবং বিতরও আদায় করলেন। অতঃপর আমরা পরবর্তী দিন মসজিদে একত্রিত হলাম এবং আশা করলাম যে, তিনি ঘর থেকে বের হবেন; কিন্তু তিনি বের হলেন না। ফলে আমরা সুবহে সাদিক পর্যন্ত বসে থাকলাম। তারপর রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে গেলাম এবং বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা গত রাতে মসজিদে একত্রিত হয়েছিলাম এবং আশা করেছিলাম যে, আপনি আমাদেরকে নিয়ে সালাত আদায় করবেন। তখন তিনি বললেন, আমি তোমাদের উপর ফরয হয়ে যেতে পারে সেই ভয় করছিলাম।
এই হাদীসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমাধান উল্লেখ রয়েছে। কেননা তারাবীর সালাত সম্পর্কে সকলেই একমত যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ একরাত বা কয়েক রাত সাহাবায়ে কেরামদের নিয়ে জামা'আতে আদায় করেছেন। পরবর্তীতে ফরয হয়ে যাওয়ার ভয়ে তা আর করেননি। কিন্তু তিনি সাহাবায়ে কেরামদের নিয়ে কত রাক'আত আদায় করেছিলেন তার বর্ণনা ঐ হাদীসে পাওয়া যায় না। কিন্তু এই হাদীসে বলা হয়েছে, আমাদের নিয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ আট রাক'আত সালাত আদায় করেছেন এবং বিতর আদায় করেছেন।
সুতরাং যারা বিশ রাক'আত তারাবীর প্রবক্তা তাদের পক্ষে এই হাদীসের এই ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয় যে, এটি তাহাজ্জুদের সালাত ছিল আর তারাবীহ ভিন্ন সালাত। কেননা, তাহাজ্জুদের সালাত ফরয হয়ে যাওয়ার ভয়ে এক বা কয়েক রাত আদায় করে ত্যাগ করেছেন- একথা আজ পর্যন্ত কোন মুহাদ্দিস বা ফকীহ বলেননি। সুতরাং যে সালাতটি ফরয হয়ে যাওয়ার ভয়ে জামা'আতে আদায় করা বন্ধ করে দিয়েছিলেন সেটি অন্য কোন সালাত নয় বরং সেটি ছিল তারাবীর সালাত। আর তা ছিল ৮ রাক'আত।
অন্য হাদীসে এসেছে,
ইমাম মালিক (রাঃ) মুহাম্মাদ ইবনে ইউসুফের সূত্রে সায়েব ইবনে ইয়াযিদ (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, উমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ), উবাই ইবনে কাব এবং তামীম দারী (রাঃ) লোকদেরকে নিয়ে ১১ রাক'আত সালাত আদায় করার নির্দেশ দিলেন। সায়েব (রহ.) বলেন, অথচ কোন কোন সময় ক্বারী ২০০ আয়াত পর্যন্ত তিলাওয়াত করতেন। আর দীর্ঘক্ষণ দাঁড়ানোর ফলে আমরা লাঠির উপর ভর করতাম এবং আমরা ফজর উদিত না হওয়া পর্যন্ত সালাত থেকে প্রত্যাবর্তন করতাম না।
সুতরাং সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হলো, উমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ) ২০ রাক'আত তারাবীহ পড়ানোর নির্দেশ দেননি। বরং তিনিও ৮ রাক'আত তারাবীহ পড়ানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।

২০ রাক'আতের হাদীসগুলোর অবস্থান :
২০ রাক'আতের হাদীসগুলো সহীহ সনদে বর্ণিত হয়নি যদিও হাদীসের সংখ্যা অনেক বেশি। দেওবন্দের উস্তাদ এবং ভারত বিখ্যাত মণীষী আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহ.) বলেন, ২০ রাক'আত সম্পর্কে যতগুলো হাদীস আছে সবগুলোর সনদই যঈফ। ঐগুলোর যঈফ হওয়া সম্পর্কে মুহাদ্দিসগণ একমত।
হেদায়া কিতাবে বর্ণিত হাদীসসমূহের ভুল-ত্রুটি যাচাইকারী পণ্ডিত আল্লামা যায়লায়ী (রহ.) বলেন ২০ রাক'আতের হাদীস যঈফ হওয়ার সাথে সাথে আয়েশা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত সহীহ হাদীসের বিরোধী। নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহ.) তার প্রসিদ্ধ 'তামামূল মিন্নাহ' নামক কিতাবে বলেন, উসমান (রাঃ) এর থেকে ২০ রাক'আত তারাবীহ সম্পর্কে দুর্বল সনদেও কোন হাদীস বর্ণিত হয়েছে বলে আমার জানা নেই। আর উমর ও আলী (রাঃ) থেকে যে হাদীসগুলো বর্ণনা করা হয়েছে তার সবগুলোই দুর্বল।
তাছাড়া জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীসটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবায়ে কেরামদেরকে নিয়ে আট রাক'আত তারাবীর সালাত আদায় করেছিলেন। তারপর বিতর আদায় করেছিলেন।

মতবিরোধের মূল কারণ :
এখানে মতবিরোধের মূল কারণ হলো, তারাবীহ ও কিয়ামুল লাইল কি একই সালাতের দুটি নাম? নাকি উভয়টি ভিন্ন ভিন্ন সালাত? যারা ২০ রাক'আত তারাবীর প্রবক্তা তারা তারাবীর সালাত ও কিয়ামুল লাইলকে ভিন্ন ভিন্ন সালাত হিসেব করে আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীসকে তাহাজ্জুদের সালাত সম্পর্কে ধরে নিয়েছেন। আর যারা তারাবীহ ও কিয়ামুল লাইলকে এক ও অভিন্ন মনে করেন, তারা আয়েশা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসের মাধ্যমে ৮ রাক'আতের দলীল পেশ করেন। আর ২০ রাক'আতের হাদীসগুলোকে দুর্বল সনদের কারণে গ্রহণযোগ্য নয় বলে বাতিল করে দেন।

টিকাঃ
৮৭. সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/৪৮০৩।
৮৮. সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/৪৮০৪।
৮৯. মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হা/৭৭৬৬।
৯০. মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হা/৭৭৭৪।
৯১. মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হা/২৬০; সহীহ বুখারী, হা/২০১৩; সহীহ মুসলিম, হা/১৭৫৭; আবু দাউদ, হা/১৩৪৩; তিরমিযী, হা/৪৩৯; নাসাঈ, হা/১৬৯৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৪১১৯।
৯২. জামেউস সগীর, হা/৫২৫; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/২৪০৯; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/১০৭০।
৯৩. মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হা/২৫১; সুনানুল কুবরা বায়হাকী, হা/৪৮০০; মিশকাত, হা/১৩০২।
৯৪. আল আরফুশ শাযী ৩০৯ পৃঃ
৯৫. নাসবুর রায়হ ২/১৫।
৯৬. তামামুল মিল্লাহ ২/২৬৫।

📘 সিয়াম ও যাকাত > 📄 রমাযান মাসে বেশি বেশি কুরআন পাঠ করা

📄 রমাযান মাসে বেশি বেশি কুরআন পাঠ করা


কুরআন তিলাওয়াত একটি উত্তম ইবাদাত। কুরআন ও হাদীসে কুরআন তিলাওয়াতের প্রতি খুবই উৎসাহ দেয়া হয়েছে এবং এর যথেষ্ট ফযীলতও বর্ণনা করা হয়েছে। কুরআনে কারীমে বলা হয়েছে, 'নিশ্চয় যারা কুরআন তিলাওয়াত করে, সালাত কায়েম করে এবং আমার দেয়া রিযিক হতে কিছু অংশ গোপনে ও প্রকাশ্যে দান করে তারা এমন ব্যবসার আশা করে যাতে কখনো লোকসান হবে না।' (সূরা ফাতির- ২৯) এ আয়াতে কুরআন পড়াকে একটি লাভজনক ব্যবসা বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, 'যে ব্যক্তি কুরআনের একটি অক্ষর পড়বে সে একটি নেকী পাবে আর একটি নেকী হবে দশটি নেকীর সমান। আমি বলছি না আলিফ, লাম, মীম সব মিলিয়ে একটি হরফ; বরং আলিফ একটি অক্ষর, লাম একটি অক্ষর, মীম একটি অক্ষর।'
কুরআন তিলাওয়াতের এসকল ফযীলত সবসময়ের জন্য; কিন্তু রমাযান মাসে কুরআন তিলাওয়াতের বিশেষ গুরুত্ব ও ফযীলত রয়েছে। কারণ রমাযানের সাথে কুরআনের সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কুরআন নাযিল শুরু হয়েছে রমাযান মাসে। এ মাসের প্রতিটি রাত্রে জিবরাঈল (আঃ) আসতেন এবং কুরআনের যতটুকু নাযিল হয়েছে তা নবী ﷺ কে পড়ে শোনাতেন এবং পুনরাবৃত্তি করতেন। নবী ﷺ এর ইন্তেকালের বছর তিনি ও জিবরাঈল (আঃ) একে অপরকে সম্পূর্ণ কুরআন দু'বার পড়ে শুনিয়েছেন।
অপর একটি হাদীসে রয়েছে,
আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, কিয়ামতের দিন কুরআন ও রোযা বান্দার জন্য শাফা'আত করবে। রোযা বলবে, হে প্রভু! আমি এ বান্দাকে দিনের বেলায় খানাপিনা ও যৌন চাহিদা মিটানো থেকে বিরত রেখেছি, তাই আমার শাফা'আত কবুল করুন। আর কুরআন বলবে, হে প্রভু! আমি এ বান্দাকে রাতের বেলায় ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তাই আমার শাফা'আত কবুল করুন। অতঃপর উভয়ের সুপারিশ কবুল করা হবে।
এজন্য সালাফুস সালেহীন (পূর্ব যুগের নেককার বান্দারা) বিশেষ করে রমাযান মাসে কুরআন পাঠে খুবই মনোযোগ দিতেন। এ মাসে কুরআন পড়ার জন্য তারা সময়ের একটা বড় অংশ নির্ধারণ করে রাখতেন।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, এসকল মহান মণীষীগণ না বুঝে কুরআন পড়তেন না। তারা আল্লাহর কালাম বুঝে বুঝে পড়তেন এবং এর উপর আমল করতেন। কিন্তু অতি পরিতাপের বিষয় যে, বর্তমানে অধিকাংশ মুসলমান এমন আছেন যারা কুরআনের শুধু শব্দগুলো পড়ে প্রতি হরফে দশটি করে নেকী অর্জনের চিন্তা করেন এবং কে কত খতম দিতে পারে- এ নিয়ে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন। কুরআন না বুঝে পড়লে এর দ্বারা কুরআন নাযিলের আসল উদ্দেশ্য সফল হয় না। মানুষ যাতে কুরআন পড়ে, বুঝে এবং কুরআন অনুযায়ী তাদের জীবন পরিচালনা করে- এটাই হলো কুরআন নাযিলের মূল উদ্দেশ্য। কুরআন তিলাওয়াতের ফযীলত সংক্রান্ত হাদীসগুলোর উদ্দেশ্য হচ্ছে কুরআন পড়ার প্রতি মানুষকে উৎসাহিত করা।
না বুঝে পড়লে পড়ার হক আদায় হয় না। না বুঝে ১০০ খতম দেয়ার চেয়ে কেউ যদি দু'চারটি আয়াত অর্থ ও ব্যাখ্যাসহ বুঝে পড়ে এবং এর উপর আমল করতে পারে তবে এটা তার জন্য হাজার গুণ বেশি উত্তম হবে; যেহেতু সে কুরআন নাযিলের উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়িত করেছে।
একজন মুসলমানের সর্বপ্রথম এবং সবচেয়ে বড় কাজ ও ইবাদাত হলো ইসলামের সঠিক জ্ঞান লাভ করা। এজন্য যে শব্দটি দিয়ে কুরআন নাযিল শুরু হয়েছে তা হলো ‘ইক্বরা’ তার মানে সবকিছুর আগে তোমাকে পড়তে হবে, জানতে হবে। মুসলিম হতে হলে কি কি কাজ করতে হবে, কোন্ কোন্ কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে এবং কোন্ ধরনের আকীদা-বিশ্বাস পোষণ করতে হবে তা না জানা পর্যন্ত কেউ যদি হাজার বারও বলে ‘আমি মুসলিম’ তবে সে আল্লাহর কাছে মুসলিম হতে পারবে না।
তাই ইসলামের সঠিক ও নির্ভুল জ্ঞান অর্জনের জন্য আল্লাহর কালাম বুঝে পড়তে হবে। কুরআনে এসেছে- 'আল্লাহর কথার চেয়ে সঠিক কথা আর কার হতে পারে?' 'এটা এমন কিতাব যার কথার মধ্যে কোন সন্দেহ-সংশয় নেই।'
কুরআন যেহেতু আরবি ভাষায় নাযিল হয়েছে, তাই একে ভালোভাবে বুঝার জন্য আরবি ভাষা শিক্ষা করা সকলের কর্তব্য। কুরআন-হাদীস বুঝার জন্য যদি কেউ আরবি ভাষা শিখে তবে এটা ইবাদাত হিসেবে গণ্য হবে। তাছাড়া কুরআনের বিধিবিধান জানার জন্য মাতৃভাষার সহযোগিতা নেয়া যায়, বর্তমানে পৃথিবীর মধ্যে প্রচলিত যত ভাষা আছে প্রায় সকল ভাষাতেই কুরআনের অনুবাদ ও তাফসীর প্রকাশিত হয়েছে এবং হচ্ছে। আল্লাহর রহমতে বাংলাদেশেও বাংলা ভাষায় কুরআন বুঝার যথেষ্ট উপকরণ বের হয়েছে। কুরআনের শাব্দিক অনুবাদ, ব্যাখ্যামূলক অনুবাদ, কুরআনের শব্দের অভিধানসহ বেশ কিছু ভালো ভালো তাফসীর গ্রন্থও বাংলা ভাষায় অনূদিত ও প্রকাশিত হয়েছে এবং সর্বত্রই এসব পাওয়া যাচ্ছে।
আমাদের ‘ইমাম পাবলিকেশন্স’ থেকে প্রকাশিত একটি বিষয়ভিত্তিক তাফসীর রয়েছে যার নাম ‘তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন’। এতে একেকটি বিষয় সম্পর্কিত কুরআনের আয়াতগুলো একত্র করে বিভিন্ন পয়েন্টে সাজানো হয়েছে। কুরআনে আলোচিত মৌলিক বিষয়গুলোকে হাদীসের কিতাবের মতো করে বিভিন্ন অধ্যায়ে বিন্যস্ত করা হয়েছে। এ গ্রন্থের মাধ্যমে একেকটি বিষয় সম্পর্কে কুরআনের বক্তব্য কী তা একই জায়গায় ধারাবাহিকভাবে জানা যাবে।

টিকাঃ
৯৭. তিরমিযী, হা/২৯১০; জামেউস সগীর, হা/১১৪১৫; সিলসিলা সহীহাহ, হা/৩৩২৭; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/১৪১৬; মিশকাত, হা/২১৩৭।
৯৮. সহীহ বুখারী, হা/৪৯৯৮; ইবনে মাজাহ, হা/১৭৬৯; মুসনাদে আহমাদ, হা/৯১৭৯; মুসনাদুল বাযযার, হা/৭০১০; মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হা/৩০৯২৪; শারহুস সুন্নাহ, হা/১৮৩৫; মিশকাত, হা/২০৯৯।
৯৯. মুস্তাদরাকে হাকেম, ২০৩৬; মুসনাদে আহমাদ, হা/৬৬২৬, মিশকাত, হা/১৯৬৩।

📘 সিয়াম ও যাকাত > 📄 রমাযান মাসে বেশি বেশি করে দান করা

📄 রমাযান মাসে বেশি বেশি করে দান করা


ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন সমস্ত লোকের চেয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ দাতা। বিশেষত তাঁর দানশীলতা অন্যান্য সময় হতে রমাযান মাসে বেশি বেশি দেখা যেত, যখন জিবরাঈল (আঃ) তাঁর সাক্ষাতে আসতেন। রমাযানের প্রতি রাতেই তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাক্ষাতে উপস্থিত হতেন এবং তাঁকে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করে শুনাতেন। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ ﷺ রমাযান মাসে দানশীলতায় প্রবাহিত বায়ুর চেয়েও বেশি গতিশীল হয়ে যেতেন (অর্থাৎ বেশি বেশি দান করতেন)।
দান করার অনেক দিক রয়েছে। যেমন:
• টাকা-পয়সা দান করা।
• কাপড় বা অন্য কোন প্রয়োজনীয় জিনিস দান করা।
• অপরকে খাদ্য খাওয়ানো।
• রোযাদারকে ইফতার করানো ইত্যাদি।
জান্নাতবাসী বান্দাদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'তারা আল্লাহর মহব্বতে মিসকীন, ইয়াতীম ও বন্দীদেরকে খাবার দেয় এবং বলে, আমরা তোমাদেরকে খাওয়াচ্ছি কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য; তোমাদের থেকে কোন প্রতিদান এবং কৃতজ্ঞতা আমরা চাই না।' (সূরা দাহর- ৮, ৯)
আল্লাহর নেক বান্দাদের মধ্যে এমন অনেক লোক ছিলেন, যারা অপরকে খাদ্য দানের ক্ষেত্রে খুবই উৎসাহী ছিলেন। এক্ষেত্রে তারা শুধু গরীবদেরকে বাছাই করতেন না। অনেকে এমনও ছিলেন, যারা মেহমান ছাড়া খাবার খেতেন না। অপরকে খাদ্য খাওয়ানোতে যথেষ্ট কল্যাণ রয়েছে, এর মধ্যে একটি হচ্ছে- যে খাওয়ায় এবং যাদেরকে খাওয়ানো হয় তাদের মধ্যে আন্ত রিকতা ও ভালোবাসা সৃষ্টি হয়, যা জান্নাত লাভের অন্যতম মাধ্যম। নবী ﷺ বলেন, 'তোমরা মুমিন না হওয়া পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না; আর তোমরা পরস্পরে ভালোবাসা ব্যতীত মুমিন হতে পারবে না।'

টিকাঃ
১০০. সহীহ বুখারী, হা/৬; সহীহ মুসলিম, হা/৬১৪৯; নাসাঈ, হা/২০৯৫; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬১৬; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/১৮৮৯; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩৪৪০; মুসনাদে আবু ই'আলা, হা/২৫৫২; আদাবুল মুফরাদ, হা/২৯২; শারহুস সুন্নাহ, হা/৩৬৮৭; মিশকাত, হা/২০৯৮।
১০১. সহীহ মুসলিম, হা/২০৩; আবু দাউদ, হা/৫১৯৫; তিরমিযী, হা/২৬৮৮; ইবনে মাজাহ, হা/৬৮, ৩৬৯২; মুসনাদে আহমাদ, হা/১০১৮০; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/২৩৬; মুসনাদুল বাযযার, হা/২২৩২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00