📘 সিয়াম ও যাকাত > 📄 বিশেষ বিশেষ আমলসমূহ

📄 বিশেষ বিশেষ আমলসমূহ


কুরআন ও হাদীস অনুযায়ী এ মাসে যেসকল আমল করা একান্ত জরুরি এখন আমরা তা জানব এবং সে অনুযায়ী আমল করার জন্য যথাসম্ভব চেষ্টা করব। তাহলেই রোযার মাস আমাদের জন্য সার্থক হবে।

📘 সিয়াম ও যাকাত > 📄 কিয়ামুল লাইল তথা রাতের সালাত আদায় করা

📄 কিয়ামুল লাইল তথা রাতের সালাত আদায় করা


কিয়ামুল লাইল শব্দের অর্থ রাতের সালাত। অর্থাৎ এশার সালাতের পর থেকে সুবহে সাদিক পর্যন্ত যেসব নফল সালাত আদায় করা হয় তাকে কিয়ামুল লাইল বলা হয়। আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রিয় বান্দাদের গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, 'আর যারা তাদের প্রভুর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে সিজদাবনত ও দণ্ডায়মান অবস্থায় রাত্রি যাপন করে।' (সূরা ফুরকান- ৬৪)
রমযান মাসে কিয়ামুল লাইলকে ফকীহগণের পরিভাষায় সালাতুত তারাবীহ বা তারাবীর সালাত বলা হয়। তারাবীহ শব্দের অর্থ হচ্ছে, বিশ্রাম লওয়া, আরাম করা ইত্যাদি। যেহেতু এ সালাতে প্রতি চার রাক'আত পর পর বিশ্রাম করতে হয় সে কারণে এ সালাতকে তারাবীর সালাত বলা হয়।

কিয়ামুল লাইল এর গুরুত্ব ও ফযীলত :
রমযান মাসে কিয়ামুল লাইল আদায় করার অনেক গুরুত্ব রয়েছে। কেননা এর মধ্যে অনেক সওয়াব নিহিত রয়েছে। এ সালাতের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা বান্দার পাপসমূহ ক্ষমা করে দেন। হাদীসে এসেছে, আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রমাযান মাসে কিয়ামুল লাইল করবে তার পেছনের সকল গোনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।

টিকাঃ
৮২. মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হা/২৪৯; সহীহ বুখারী, হা/২০০৯; সহীহ মুসলিম, হা/১৮৭৫; আবু দাউদ, হা/১৩৭৩; তিরমিযী, হা/৮০৮।

📘 সিয়াম ও যাকাত > 📄 তারাবীর সালাতের সূচনা

📄 তারাবীর সালাতের সূচনা


রাসূলুল্লাহ ﷺ অল্প কয়েক দিন এ সালাত আদায় করেছিলেন। প্রথম দিকে তিনি একা একা এ সালাত আদায় করতেন। তারপর এটা দেখে সাহাবায়ে কেরামও তাঁর সাথে সালাত আদায় করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। পরে ফরয হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রাসূলুল্লাহ ﷺ তা ত্যাগ করেন। যেমন- হাদীসে এসেছে,
আবু যর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা এক রমাযান মাসে আমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে রোযা রাখলাম। যখন উক্ত রমাযান মাসের ৭ দিন বাকি ছিল তখন তিনি আমাদেরকে নিয়ে রাত্রিজাগরণ করলেন। আর সেদিন তিনি রাত্রির এক তৃতীয়াংশ পর্যন্ত জাগরণ করেন। অতঃপর যখন রমাযান মাসের ৬ দিন বাকি ছিল সেদিন তিনি উঠলেন না। তবে যখন ৫ দিন বাকি ছিল তখন অর্ধরাত্রি পর্যন্ত জাগরণ করলেন। অতঃপর আমি তাঁকে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! যদি এ রাত্রিজাগরণটা আমাদের জন্য নফল হিসেবে নির্দিষ্ট করে দেয়া হতো! তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, যখন কোন ব্যক্তি ইমামের সাথে সালাম ফিরানোর পূর্ব পর্যন্ত সালাত আদায় করে তখন তার সেই সালাতকেই কিয়ামুল লাইল হিসেবে ধরে নেয়া হয়। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর যখন রমাযান মাসের ৪ দিন বাকি ছিল তখন রাত্রিজাগরণ করেননি। তবে যখন রমাযান মাসের ৩ দিন বাকি ছিল তখন তিনি তার পরিবার, স্ত্রী ও লোকদেরকে একত্রিত করলেন এবং আমাদেরকে নিয়ে সালাত আদায় করলেন। (আর তা এত দীর্ঘ করলেন) আমরা ভয় করলাম যে, ফালাহ হতে বঞ্চিত হয়ে যাব। বর্ণনাকারী বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, ফালাহ কী? তিনি বললেন, সাহারীর সময় শেষ হয়ে যাওয়া। এরপর রমাযান মাসের বাকি দিনগুলোতে তিনি আমাদেরকে নিয়ে রাত্রিজাগরণ করেননি।
অপর হাদীসে এসেছে,
আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন রাসূলুল্লাহ ﷺ রমাযানের রাতের মধ্যভাগে বের হলেন, অতঃপর মসজিদে সালাত আদায় করলেন এবং লোকজনও তাঁর পেছনে সালাত আদায় করল। পরে সকাল হলে লোকেরা এর চর্চা করল। দ্বিতীয় দিন এর চেয়ে বেশি মানুষ জামা'আতে উপস্থিত হলো। রাসূলুল্লাহ ﷺ সালাত আদায় করলেন। লোকেরাও রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে সালাত আদায় করল। অতঃপর সকাল হলে লোকেরা পরস্পর আলোচনা করল। এরপর রাসূলুল্লাহ ﷺ বের হলেন এবং তাঁর সাথে সালাত আদায় করা হলো। তারপর যখন চতুর্থ রাত হলো, তখন মসজিদ তার ধারণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলল। অতঃপর তিনি ফজরের সালাত আদায় করতে বের হলেন। সালাত শেষ করে তিনি লোকদের দিকে মুখ করে দাঁড়ালেন, তিনি তাশাহ্হুদ বা খুৎবা পড়লেন, তারপর বললেন, তোমাদের অবস্থা সম্পর্কে আমার নিকট কিছুই গোপন নেই। তবে আমি আশঙ্কা করছি, তোমাদের উপর (এ সালাত) ফরয হয়ে যায় কি না। আর তোমরা তা পালন করতে অপারগ হয়ে পড়বে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ ﷺ মৃত্যুবরণ করলেন আর ব্যাপারটি এমনই রয়ে গেল।

টিকাঃ
৮৩. তিরমিযী, হা/৮০৬; আবু দাউদ, হা/১৩৭৭; নাসাঈ, হা/১৩৬৮; ইবনে মাজাহ, হা/১৩২৭; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/২২০৬।
৮৪. সহীহ বুখারী, হা/৯২৪; সহীহ মুসলিম, হা/৭৬১; আবু দাউদ, হা/১৩৭৩; নাসাঈ, হা/১৩৬৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৩৬৭৫; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/১১৩৪; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/১৪৪; মুসনাদে আবু ই'আলা, হা/৪৪৯৭; মু'জামুল আওসাত, হা/৫৭৪; বায়হাকী, হা/৪৩৮৩; শারহুস সুন্নাহ, হা/৯৭৬; মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হা/৪৭২৪; মিশকাত, হা/১২৯৬।

📘 সিয়াম ও যাকাত > 📄 উমর (রাঃ) কর্তৃক জামা‘আতের প্রচলন

📄 উমর (রাঃ) কর্তৃক জামা‘আতের প্রচলন


তারপর থেকে সাহাবীগণ বিচ্ছিন্নভাবে তারাবীর সালাত আদায় করতেন। পরবর্তীতে উমর (রাঃ) মনে করলেন যে, এখন তো আর ফরয হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। তাই তিনি একজন ইমামের পেছনে তারাবীর সালাত আদায় করার ব্যবস্থা করেন। যার বিস্তারিত বিবরণ নিম্নের হাদীসটিতে রয়েছে :
আবদুর রহমান ইবনে আবদুল ক্বারী (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আমি রমাযানের এক রাতে উমর ইবনে খাত্তাবের সাথে মসজিদের দিকে বের হলাম। তখন দেখতে পেলাম, বিভিন্নভাবে অনেক লোকের সমাগম হয়েছে। কেউ একা একা সালাত আদায় করছে। আবার কোথাও এক ব্যক্তি সালাত আদায় করছে এবং কিছু লোকও তার সঙ্গে সালাত আদায় করছে। তখন উমর (রাঃ) বললেন, আমার মনে হয়, এদের সবাইকে একজন ক্বারীর সাথে জামা'আতবন্দী করে দিলে সবচেয়ে ভালো হবে। এরপর এ ব্যাপারে তিনি দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হলেন এবং তাদেরকে উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) এর পেছনে জামা'আতবন্দী করে দিলেন। অতঃপর আমি আরেক রাতে আবার তাঁর সাথে বের হলাম। দেখলাম, লোকজন তাদের ইমামের সঙ্গে সালাত আদায় করছে। উমর (রাঃ) বললেন, এটি কতইনা উত্তম বিদআত বা সুন্দর ব্যবস্থা। লোকেরা রাতের যে অংশে সালাত আদায় না করে ঘুমায় তা যে অংশে তারা সালাত আদায় করে তার চেয়ে উত্তম। অর্থাৎ রাতের প্রথমাংশের চেয়ে শেষাংশের সালাতই বেশি উত্তম- এটাই তিনি বুঝাতে চেয়েছেন। আর লোকেরা রাতের প্রথমাংশেই সালাত আদায় করত।
এখানে বুঝা গেল, তারাবীর সালাত নিয়মিতভাবে জামা'আতের সাথে বর্তমানে যেটা চালু আছে এটা উমর (রাঃ) থেকে শুরু হয়েছে। উমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ) ছিলেন খোলাফায়ে রাশেদার অন্যতম একজন খলীফা। তাই তাঁদের আদর্শ অনুসরণ করাও আমাদের জন্য সুন্নাত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, 'তোমাদের উপর আবশ্যক হচ্ছে আমার ও হেদায়াতপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদার সুন্নাতকে গ্রহণ করা। তোমরা তা দাঁত দিয়ে শক্তভাবে কামড়ে ধরো। আর তোমাদের উপর আরো আবশ্যক হচ্ছে, তোমরা প্রত্যেক নতুন উদ্ভাবিত বিষয় হতে বেঁচে থাকবে। কেননা প্রত্যেক নতুন বিষয়ই বিদআত, আর প্রত্যেক বিদআতই গোমরাহী।'
উক্ত বর্ণনাসমূহ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, রমাযানে কয়েক রাত জামা'আত সহকারে তারাবীহ পড়া রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সুন্নাত এবং খোলাফায়ে রাশেদীন ও অধিকাংশ সাহাবায়ে কেরামের ঐক্যমতে পুরো রমাযান মাস জামা'আতে তারাবীহ পড়া সুন্নাত।

টিকাঃ
৮৫. মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হা/২৫০; সহীহ বুখারী, হা/২০১০; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/১১০০; বায়হাকী, হা/৪৩৭৯; মিশকাত, হা/১৩০১।
৮৬. আবু দাউদ, হা/৪৬০৯; ইবনে মাজাহ, হা/৪২; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭১৮৪; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৩২৯; সিলসিলা সহীহাহ, হা/২৭৩৫; মিশকাত, হা/১৬৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00