📘 সিয়াম ও যাকাত > 📄 যেসব কারণে রোযা ভঙ্গ হয় না

📄 যেসব কারণে রোযা ভঙ্গ হয় না


স্বপ্নদোষ হলে : রোযা অবস্থায় স্বপ্নদোষ হলে রোযা ভঙ্গ হবে না, কারণ এটা বান্দার ইচ্ছাধীন নয়।

অনিচ্ছাকৃতভাবে বীর্যপাত ঘটলে : যদি কোন রোগজনিত কারণে এমনিতেই বীর্যপাত হয়ে যায় অথবা সাদা পানি বের হয় অথবা স্ত্রীর দিকে তাকানোর ফলে অথবা যৌন বিষয়ক কোন চিন্তা-ভাবনা করার ফলে বীর্যপাত হয়ে যায় তাতেও রোযা ভঙ্গ হবে না। হাদীসে এসেছে,
আবু হুরায়রা (রাঃ) সূত্রে নবী ﷺ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের সেসব ধারণা ও চিন্তা ক্ষমা করে দেন, যা তাদের মনে উদয় হয়, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তা কার্যে পরিণত করে বা অন্যের সাথে আলোচনা করে। কাতাদা (রাঃ) বলেন, যখন কেউ মনে মনে ত্বালাক্ব দেয়, তখন এর কোন মূল্য বা কার্যকারিতা নেই।

গোসল ফরয থাকাবস্থায় রোযা শুরু করলে: রাতে গোসল ফরয হয়েছে; কিন্তু ঘুম থেকে উঠে দেখা গেল যে, গোসল করতে গেলে সাহারী খাওয়ার সময় থাকবে না, এ অবস্থায় আগে খেয়ে নেবে এবং পরে গোসল করে ফজরের সালাত পড়বে। এমতাবস্থায় আযানের পরে গোসল করলেও রোযার কোন ক্ষতি হবে না। হাদীসে এসেছে,
আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর স্ত্রীদের সাথে সহবাসজনিত নাপাকী অবস্থাতেই ফজরের সালাতের সময়ে উপনীত হতেন। অতঃপর তিনি গোসল করতেন এবং রোযার নিয়ত করে রোযা রাখতেন।

অনিচ্ছাকৃতভাবে বমি করলে : ইচ্ছা করে বমি করলে রোযা নষ্ট হয়ে যাবে এবং পরে কাযা করতে হবে। কিন্তু অনিচ্ছায় যদি কারো বমি আসে তবে রোযা ভঙ্গ হবে না। হাদীসে এসেছে,
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেন, যে ব্যক্তি অনিচ্ছায় বমি করে তাকে রোযা কাযা আদায় করতে হবে না। কিন্তু যে ব্যক্তি ইচ্ছা করে বমি করে, তাকে রোযা কাযা আদায় করতে হবে।

ভুলে কোন কিছু খেয়ে ফেললে : যদি কেউ ভুলে কোন কিছু আহার করে ফেলে অথবা পানাহার করে, তাহলে তার সিয়াম ভঙ্গ হবে না এবং তার উপর কাযা কাফফারা কোনটাই ওয়াজিব হবে না। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি সিয়াম অবস্থায় ভুলে কিছু খেয়ে ফেলে বা পান করে ফেলে, সে যেন তার সিয়াম পূর্ণ করে। কেননা আল্লাহই তাকে খাইয়েছেন ও পান করিয়েছেন।

শিঙ্গা লাগালে : শিঙ্গা লাগানোর দ্বারা সাওম ভঙ্গ হবে না। হাদীসে এসেছে,
সাবিত আল-বুনানী (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) কে প্রশ্ন করা হলো (রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সময়) আপনারা কি রোযাদার ব্যক্তির শিঙ্গা লাগানো খারাপ মনে করতেন? তিনি বললেন, না; কিন্তু শিঙ্গা লাগানোর জন্য দুর্বলতা দেখা দেয়ার কারণে তা অপছন্দ করতাম। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেও রোযা অবস্থায় শিঙ্গা লাগিয়েছেন। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,
ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ ইহ্রাম এবং রোযা অবস্থায়ও শিঙ্গা লাগিয়েছেন।
শিঙ্গা লাগানোর দ্বারা যদি দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে অধিকাংশ সালাফী ফকীহগণের মতে রোযা ভেঙ্গে যাবে। হাদীসে এসেছে,
সাওবান (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি শিঙ্গা লাগাবে এবং যাকে শিঙ্গা লাগানো হবে তাদের উভয়ের রোযাই ভঙ্গ হয়ে যাবে।

স্ত্রীকে চুম্বন করলে : যে নিজেকে সংযত রাখতে পারে তার জন্য স্ত্রীকে স্পর্শ করা, চুম্বন করা ও আলিঙ্গন করা জায়েয আছে। হাদীসে এসেছে,
আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ সাওম অবস্থায় আমাকে চুমু দিতেন। তোমাদের মধ্যে কে এমন আছে যে, নিজের কামোদ্দীপনাকে আয়ত্বে রাখতে পারে, যেমন আয়ত্বে রাখতে সক্ষম ছিলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর কামোদ্দীপনাকে।
আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাকে চুমু খেতেন। আর তখন তিনিও রোযা অবস্থায় ছিলেন এবং আমিও রোযা অবস্থায় ছিলাম।
তবে যে অল্পতেই উত্তেজিত হয়ে যায় তার জন্য এসব থেকে বিরত থাকা উচিত; নতুবা জায়েযের পথ ধরে রোযা ভঙ্গ হওয়ার মত কিছু ঘটে যেতে পারে।
উমর ইবনে আবু সালামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। একদা তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে জিজ্ঞেস করলেন, সাওম পালনকারী ব্যক্তি চুম্বন করতে পারে কি? তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে বললেন, কথাটি উম্মে সালামাকে জিজ্ঞেস করো। (তাঁকে জিজ্ঞেস করার পর) তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ এরূপ করেন। এরপর তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তো আপনার পূর্বাপর সমুদয় গোনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে বললেন, শোনো, আল্লাহর শপথ! আমি আল্লাহ তা'আলাকে তোমাদের সকলের চেয়ে অধিক ভয় করি।
রোযা অবস্থায় স্ত্রীর সাথে সহবাস ছাড়া অন্যান্য কাজ বৈধ। যদি চুম্বনের ফলে মযী তথা সাদা পানি বের হয় তবে তাতে কোন ক্ষতি নেই। তবে রোযাদার ব্যক্তি যদি এ ধারণা করে যে, স্ত্রীর সাথে মাখামাখি করতে গেলে তার বীর্যপাত হওয়ার সম্ভাবনা আছে, তবে তার জন্য এসব করা জায়েয হবে না। যদি সে এসব করে এবং বীর্যপাত ঘটে, তবে তার রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে এবং তার জন্য কাযা ও কাফফারা দুটিই ওয়াজিব হবে।

নিম্নবর্ণিত কারণে রোযার কোন ক্ষতি হয় না :
• রোযা অবস্থায় মেসওয়াক করাতে কোন দোষ নেই। চাই মেসওয়াক তাজা হোক অথবা শুকনো হোক। আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আমার উম্মতের অথবা লোকদের জন্য যদি কষ্ট মনে না করতাম, তাহলে প্রত্যেক সালাতের সাথে তাদেরকে আমি মেসওয়াক করার জন্য আদেশ করতাম।
• মেসওয়াকের সময় দাঁতের মাড়ি থেকে রক্ত বের হলে রোযার কোন ক্ষতি হবে না। তবে রক্ত গলাধঃকরণ করা যাবে না।
• দাঁতের মাজন বা পেস্ট রোযা ভঙ্গকারী নয়, বরং তা মেসওয়াকের মতোই, তবে পেটে যেন না যায় সেজন্য সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। যদি অনিচ্ছায় পেটে যায়, তবে সমস্যা নেই। তবে মাজন দ্বারা রাতে দাঁত মাজাই উত্তম।
• মুখের থুথু গিলে ফেললে অথবা দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা খাদ্যের কণা থুথুর সাথে পেটে চলে গেলে অথবা দাঁতের মাড়ি থেকে সামান্য রক্ত বের হলে রোযা ভঙ্গ হবে না।
• সাওম পালনকারী গোসল ও শীতলতা অর্জন করলে সাওম ভাঙ্গবে না।
• অক্সিজেন গ্রহণ পানাহার নয়, পানাহারের বিকল্পও নয়। অতএব তা সিয়াম ভঙ্গকারী নয়।
• গোসল করা, শরীরে তেল মালিশ করা, সুগন্ধি ব্যবহার করা, নাকে, কানে ও চোখে ঔষধ দেয়া, চোখে সুরমা ব্যবহার করা সিয়াম ভঙ্গকারী নয়।
• বাবুর্চি বা রান্নার কাজে নিয়োজিত মহিলা প্রয়োজনে তরকারীর স্বাদ পরীক্ষা করতে পারে। তবে প্রয়োজন না হলে স্বাদ না নেয়াই উত্তম। কোন খাদ্যদ্রব্য চিবিয়ে শিশুর মুখে দেয়াতে রোযা ভঙ্গ হবে না। কারণ এসব কাজ সাধারণত খাদ্য গ্রহণের জন্য কেউ করে না, বরং প্রয়োজনের তাগিদে তাকে করতে হয়। কেননা আল্লাহ তা'আলা দ্বীনের মধ্যে কোন সংকীর্ণতা রাখেননি। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'তিনি দ্বীনের মধ্যে কোন সংকীর্ণতা রাখেননি।' (সূরা হাজ্জ- ৭৮)
• এমন কিছু কাজ আছে যা করলে রোযা একেবারে ভঙ্গ হয়ে যায় না; তবে রোযা ত্রুটিযুক্ত হয় এবং রোযার সওয়াব কমে যায়। যেমন- গীবত ও চোগলখোরী করা, পরস্পরে গালা-গালি করা, মারা-মারি করা, মিথ্যা কথা বলা, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া, মুসলমানের মান-ইজ্জত নষ্ট করা, রাগান্বিত হওয়া, মূল্যবান সময়কে অনর্থক কাজে নষ্ট করা, অশ্লীল গান অথবা মিউজিক সম্বলিত যে কোন গান শ্রবণ করা, টেলিভিশনের পর্দায় অশ্লীল ছবি দেখা, নারীদের বেপর্দা হয়ে চলাফেরা করা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ও আড্ডা দেয়া ইত্যাদি। এ সকল কাজ সব সময়ের জন্য হারাম ও নিষিদ্ধ; তাই রমাযানে তো বটেই; রমাযান ছাড়া অন্যান্য সময়েও এ সকল কাজ থেকে দূরে থাকা মুসলিম নর-নারীর উপর একান্ত কর্তব্য।

টিকাঃ
৪৯. সহীহ বুখারী, হা/৫২৬৯; সহীহ মুসলিম, হা/৩৪৬; তিরমিযী, হা/১১৭৩; নাসাঈ, হা/৩৪৩৩; শারহুস সুন্নাহ, হা/৫৭; মিশকাত, হা/৬৩।
৫০. সহীহ বুখারী, হা/১৯২৬; সহীহ মুসলিম, হা/২৬৪৬; তিরমিযী, হা/৭৭৯; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬৭০৬; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩৪৯৮; মুস্তাখরাজে আবু আওয়ানা, হা/২২৮৫; মু'জামুল কাবীর লিত তাবারানী, হা/১৯০৯৩; জামেউস সগীর, হা/৯০৬৯; মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হা/৭৩৯৭; মিশকাত, হা/২০০১।
৪৯. তিরমিযী, হা/৭২৪; ইবনে মাজাহ, হা/১৬৭৬; মুসনাদে আহমাদ, হা/১০৪৬৮; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩৫১৮; শারহুস সুন্নাহ, হা/১৭৫৫; মিশকাত, হা/২০০৭।
৫০. সহীহ মুসলিম, হা/২৭৭২; মুসনাদে আহমাদ, হা/৯৪৮৫; সুনানে দারেমী, হা/১৭২৬; মিশকাত, হা/২০০৩।
৫১. সহীহ বুখারী, হা/১৯৪০; মুসনাদে ইবনে জাদ, হা/১৪৬৬; মিশকাত, হা/২০১৬।
৫২. সহীহ বুখারী, হা/১৯৩৮; তিরমিযী, হা/৭৭৫; সুনানুল কুবরা লিন নাসাঈ, হা/৩২০৬; শারহুস সুন্নাহ, হা/১৭৫৮; মিশকাত, হা/২০০২।
৫৩. আবু দাউদ, হা/২৩৬৯; ইবনে মাজাহ, হা/১৬৭৯; মুসনাদে আহমাদ, হা/২২৫০৩; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩৫৩২; মুসনাদুল বাযযার, হা/৪১৫৬।
৫৪. মুসলিম, হা/২৬৩০; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৪২২০; ইবনে মাজাহ, হা/১৬৮৪।
৫৫. আবু দাউদ, হা/২৩৮৬; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৫৪৯৫।
৫৬. সহীহ মুসলিম, হা/২৬৪৪; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩৫৩৮; মুস্তাখরাজে আবু আওয়ানা, হা/২৩১২; মু'জামুল কাবীর লিত তাবারানী, হা/৮২১৫; বায়হাকী, হা/৭৮৯৪।
৫৭. আল মাজমু' ২য় খণ্ড পৃঃ ২২৩।
৫৮. সহীহ বুখারী, হা/৮৮৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৩৫৩৩; মুসনাদুল বাযযার, হা/৮০৭০; মুসনাদে আবু ই'আলা, হা/৬৬১৭; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/২০৫।
৫৯. সহীহ ফিক্বহুস সুন্নাহ ২য় খণ্ড, পৃঃ ১০৬।

📘 সিয়াম ও যাকাত > 📄 মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে রোযা রাখা

📄 মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে রোযা রাখা


ইবাদাতের ক্ষেত্রে ইসলামের একটি মূলনীতি হচ্ছে, শারীরিক ইবাদাতসমূহে কোন ধরনের প্রতিনিধিত্ব বৈধ নয়। তবে সিয়াম ও হজ্জ এ নীতির অন্তর্ভুক্ত নয়। হাফেয ইবনে আবদুল বার (রহ.) বলেছেন, সালাতের ব্যাপারে সবাই একমত যে, কেউ কারো পক্ষ থেকে সালাত আদায় করবে না, না ফরয, না সুন্নাত, না নফল, না জীবিত ব্যক্তির পক্ষ থেকে, না মৃত ব্যক্তির। অনুরূপ জীবিত ব্যক্তির পক্ষ থেকে সিয়াম। তাই জীবিতাবস্থায় একের সাওম অপরের পক্ষ থেকে আদায় হবে না। এতে কারো দ্বিমত নেই। কিন্তু যে মারা যায়, তার জিম্মায় যদি সিয়াম থাকে, তার ব্যাপারে দ্বিমত রয়েছে। কেউ বলেছেন, উত্তরাধিকারগণ আদায় করবে, আবার কেউ বলেছেন, উত্তরাধিকারগণ আদায় করবে না।
মৃত ব্যক্তির জিম্মায় যদি সিয়াম থাকে তবে তার দুই অবস্থা :
১. কাযার সুযোগ না পেয়ে মারা যাওয়া। সময়ের সংকীর্ণতা অথবা অসুস্থতা অথবা সফর অথবা সাওমের অক্ষমতার দরুণ কাযার সুযোগ পায়নি। অধিকাংশ আলেমদের মতে তার উপর কিছুই আদায় করতে হবে না।
২. মারা যাওয়ার পূর্বে কাযা আদায় করার সুযোগ ছিল অথচ আদায় করেনি, এ ক্ষেত্রে সুন্নাত হচ্ছে তার অভিভাবক তার পক্ষ থেকে সাওম রাখবে। মৃতের জিম্মায় যদি অনেক সিয়াম থাকে, আর সে সংখ্যানুসারে তার পক্ষ থেকে কতক লোক যদি একদিন সিয়াম পালন করে, তাহলে শুদ্ধ হবে।
আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে মারা গেল, অথচ তার উপর কাযা সিয়াম রয়েছে; তার অভিভাবক তার পক্ষ থেকে সাওম রাখবে।
ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা এক ব্যক্তি নবী ﷺ এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! নিশ্চয় আমার মাতা মৃত্যু বরণ করেছেন। কিন্তু তার উপর রমাযান মাসের রোযা ফরয ছিল। সুতরাং আমি কি তার পক্ষ হতে কাযা আদায় করব? তখন তিনি বললেন, যদি তোমার মায়ের কোন ঋণ থাকত, তাহলে তুমি কি তা আদায় করতে না? সে বলল, হ্যাঁ। তখন তিনি বললেন, তাহলে আল্লাহর হক তো আরো অধিক আদায়যোগ্য।

টিকাঃ
৬০. সহীহ বুখারী, হা/১৯৫২; সহীহ মুসলিম, হা/২৭৪৮; আবু দাউদ, হা/২৪০২।
৬১. সহীহ বুখারী, হা/১৯৫৩; সহীহ মুসলিম, হা/২৭৫০; আবু দাউদ, হা/৩৩১২; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৩৩৬; দার কুতনী, হা/২৩৪০; বায়হাকী, হা/৮০১৩।

📘 সিয়াম ও যাকাত > 📄 রমাযানের কাযা রোযা আদায়ের নিয়ম

📄 রমাযানের কাযা রোযা আদায়ের নিয়ম


যদি কারো জিম্মায় রমাযানের কাযা রোযা থেকে যায়, তাহলে কোন ওজর না থাকলে রমাযানের কাযা রোযা তাড়াতাড়ি আদায় করে নেয়াই উত্তম। কারণ মানুষের হায়াত কখন শেষ হয়ে যায় তা কেউ বলতে পারে না। আল্লাহ তা'আলা নেক বান্দাদের গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, 'তারাই কল্যাণকর কাজসমূহ দ্রুত সম্পাদন করে থাকে এবং তারা তাতে অগ্রগামী হয়।' (সূরা মুমিনূন- ৬১)
তবে যদি কোন ওজর থাকে তাহলে সুবিধা অনুযায়ী দেরি করে আদায় করা যাবে। এমনকি যদি দ্বিতীয় রমাযান চলে আসে, তবে দ্বিতীয় রমাযানের ফরয রোযা যথা নিয়মে আদায় করার পর পূর্বের কাযা রোযা আদায় করবে।
আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার উপর রমাযানের কাযা রোযা থাকত, কিন্তু শা'বান মাস আসার আগে আমি তা আদায় করতে সক্ষম হতাম না। রমাযানের কাযা রোযা আদায় করতে ধারাবাহিকতা শর্ত নয়। বান্দার সুবিধা অনুযায়ী একসাথেও রাখতে পারে আবার মধ্যখানে বিরতি দিয়েও রাখতে পারে।

টিকাঃ
৬২. সহীহ বুখারী, হা/১৯৫০; সহীহ মুসলিম, হা/২৭৪৩; তিরমিযী, হা/৭৮৩; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৪৯৭২; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/২০৪৯; মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হা/৯৮১৯; মিশকাত, হা/২০৩০।

📘 সিয়াম ও যাকাত > 📄 সাহরী খাওয়া

📄 সাহরী খাওয়া


রোযা রাখার নিয়তে ভোররাতে যে খাবার খাওয়া হয় তাকে সাহারী বলে। এখানে এ শব্দটির উচ্চারণ 'সেহ্রী' বা 'সাত্রী' সঠিক নয়। কারণ আরবি ভাষায় 'সেরুন' শব্দের অর্থ যাদু করা। যেমন: সূরা বাকারার ১২০ নং আয়াতে উল্লেখ আছে যে, 'তারা মানুষকে যাদু শিখাত।' আবার 'সাহার' শব্দ ব্যবহৃত হয় রাতের শেষ ভাগ বুঝাতে। যেমন 'আমি তাদেরকে (নৃতের পরিবারকে) রাতের শেষ ভাগে মুক্তি দিয়েছি' (সুরা কামার- ৩৪)। তাই এর উচ্চারণে 'সেত্রী' বা 'সাত্রী' না বলে "সাহারী” বলাই শুদ্ধ।

সাহারী খাওয়ার গুরুত্ব:
আমর ইবনে আস (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আহলে কিতাব (ইয়াহুদি ও নাসারা) এর রোযা আর আমাদের রোযার মধ্যে পার্থক্য এই যে, আমরা সাহারী খেয়ে রোযা রাখি আর তারা সাহারী খায় না।

সাহারীতে বরকত রয়েছে:
আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমরা সাহারী খাও, কেননা সাহারী খাওয়ার মধ্যে বরকত রয়েছে।
আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমরা সাহারী খাও- এক ঢুক পানি দিয়ে হলেও।

সাহারী ভক্ষণকারীদের উপর রহমত বর্ষিত হয়:
আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, সাহারী সম্পূর্ণটাই বরকতময়। অতএব তোমরা এটা ছেড়ে দিও না, যদি তোমাদের কেউ এক ঢুক পানি পান করার সুযোগ পায়, তবে যেন তা পান করে। কেননা আল্লাহ তা'আলা সাহারী ভক্ষণকারীদের উপর রহমত বর্ষণ করেন এবং তাঁর ফেরেশতারা তাদের জন্য মাগফিরাতের দু'আ করতে থাকেন।

সাহারী দেরিতে খাওয়া উত্তম : সাহারী খাওয়ার সময় হলো মধ্যরাত থেকে শুরু করে সুবহে সাদিক এর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত। তবে বিলম্ব করে (সুবহে সাদিকের পূর্বে) খাওয়া মুস্তাহাব। হাদীসে বর্ণিত আছে,
সাহল ইবনে সা'দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আমার পরিবারের সাথে সাহারী সম্পন্ন করি। তারপর রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে জামা'আতে সালাত ধরার জন্য আমাকে তাড়াতাড়ি মসজিদে যেতে হতো। এ হাদীস দ্বারা বুঝা গেল, সাহল ইবনে সা'দ (রাঃ) সাহারীর একেবারে শেষ সময়ে খাবার গ্রহণ করতেন। অপর হাদীসে বলা হয়েছে,
আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ) হতে বর্ণনা করে বলেন, আমরা নবী ﷺ এর সাথে সাহারী খেয়েছি। তারপর তিনি সালাতে দাঁড়িয়েছেন। বর্ণনাকারী আনাস (রাঃ) বলেন, আমি যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করলাম, সাহারী ও আযানের মাঝখানে কত সময়ের ব্যবধান ছিল? তিনি বললেন, পঞ্চাশ আয়াত পাঠ করার মতো। এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর যুগে সাহারী খাওয়া ও ফজরের আযানের মধ্যখানে ৫০টি আয়াত পড়ার সমপরিমাণ সময় থাকত। ৫০টি আয়াত পড়তে প্রায় ১৫-২০ মিনিট সময় লাগতে পারে। এ থেকে বুঝা যায় যে, সাহাবীরা খুব আগে সাহারী খেতেন না। আযানের কিছু সময় আগে খাওয়া শেষ করতেন।

টিকাঃ
৬৩. সহীহ মুসলিম, হা/২৬০৪; আবু দাউদ, হা/২৩৪৫; তিরমিযী, হা/৮০৯; নাসাঈ, হা/২১৬৬; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/১৯৪০: সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৪৩৭৭: মু'জামুল কাবীর লিত তাবারানী, হা/১৭১০৯: মিশকাত, হা/১৯৮৩।
৬৪. সহীহ বুখারী, হা/১৯২২; সহীহ মুসলিম, হা/২৬০৩; তিরমিযী, হা/৭০৮; নাসাঈ, হা/২১৪৪; ইবনে মাজাহ, হা/১৬৯২; মুসনাদে আহমাদ, হা/৮৮৮৫; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/১৯৩৭; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩৪৬৬; জামেউস সগীর, হা/৫২৫৪; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/১০৬৩; মিশকাত, হা/১৯৮২।
৬৫. সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩৪৭৬; মুসনাদে আবু ই'আলা, হা/১০৩৩০; মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হা/৭৫৯৯; মারেফাতুস সাহাবা, হা/৩৭২২; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/১০৭১।
৬৬. মুসনাদে আহমাদ, হা/১১৪১৪; জামেউস সগীর, হা/৫৯৯৬।
৬৭. সহীহ বুখারী, হা/১৯২০; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/১৯৪২; বায়হাকী, হা/১৯৮১; মু'জামুল কাবীর লিত তাবারানী, হা/৫৭৭০।
৬৮. সহীহ বুখারী, হা/১৯২১; সহীহ মুসলিম, হা/২৬০৬; নাসাঈ, হা/২১৫৫; ইবনে মাজাহ, হা/১৬৯৪; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/১৯৪১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00