📄 ফিদইয়া দেয়ার নিয়মাবলি
ফিদইয়া কী এবং কার উপর ফিদইয়া ওয়াজিব : ফিদইয়া হচ্ছে একজন মিসকীনের একদিনের খাবার। যারা বার্ধক্যজনিত কারণে অথবা স্থায়ীভাবে অসুস্থ হওয়ার কারণে সিয়াম পালনে একেবারে অক্ষম না হলেও কষ্ট হবে তারা ফিদইয়া আদায় করবে। সুতরাং একেবারে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা এবং যে অসুস্থ রোগীর সুস্থ হওয়ার কোন আশা নেই- তারা ফিদইয়া আদায় করবে। আর তা হলো প্রতি দিনের সাওমের বিনিময়ে একজন মিসকীনকে খাওয়ানো।
আত্বা (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) কে বলতে শুনেছেন যে, এ আয়াত- "যারা সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও রোযা রাখতে চায় না, তাদের জন্য এর বিনিময়ে ফিদইয়া দেয়ার সুযোগ থাকবে" পাঠ করার পর বলেন, এ আয়াত মানসুখ হয়ে যায়নি। বরং এটি বৃদ্ধ পুরুষ ও বৃদ্ধা মহিলাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কেননা তারা রোযা রাখতে সক্ষম নয়। সুতরাং তারা প্রতিদিনের পরিবর্তে একজন মিসকীনকে খাবার খাওয়াবে।
টিকাঃ
৩৯. সহীহ বুখারী, হা/৪৫০৫; আবু দাউদ, হা/২৩২০।
📄 রোযা ভঙ্গ হওয়ার কারণ
১. কিছু খাওয়া বা পান করা: যদি কেউ ইচ্ছা করে কোন কিছু খায় অথবা পান করে, তাহলে তার রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে। সুতরাং যে ব্যক্তি এরূপ করবে, তাকে অবশ্যই বিনীতভাবে তওবা করতে হবে এবং ঐ রোযার কাযা ও কাফফারা আদায় করতে হবে। তবে কেউ যদি ভুলবশত কিছু খেয়ে ফেলে তবে তার রোযা ভঙ্গ হবে না। কিন্তু রোযার কথা মনে পড়ার সাথে সাথে খাওয়া বন্ধ করে দেবে। আর যদি অন্য কেউ তাকে এ অবস্থায় দেখে ফেলে, তাহলে তাকে রোযার কথা স্মরণ করিয়ে দেবে। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, 'তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার বিষয়ে একে অপরকে সহযোগিতা করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের বিষয়ে একে অপরকে সহযোগিতা করো না। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো; নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদানে খুবই কঠোর।' (সূরা মায়েদা- ২)
২. ইচ্ছাকৃতভাবে বীর্যপাত ঘটানো : ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ যদি হস্তমৈথুন করে বা সহবাস ছাড়া অন্য কোন উপায়ে বীর্যপাত ঘটায় তবে তার রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে এবং তার উপর কাযা আদায় করা ওয়াজিব হবে। এটাই জমহুর উলামাদের মতামত। কেননা এভাবে বীর্যপাত ঘটানোও শাহাওয়াতের অন্তর্ভুক্ত। আর রোযাদারের জন্য এটা জায়েয নয়। আল্লাহ তা'আলা হাদীসে কুদসীতে বলেছেন, 'রোযাদার আমার জন্য তার শাহাওয়াত, খাদ্য ও পানীয় ত্যাগ করে।'
৩. ইঞ্জেকশন গ্রহণ করলে : রোযা অবস্থায় যদি কেউ এমন কোন ইঞ্জেকশন বা স্নাইন নেয়, যা পুষ্টি বা খাদ্যের কাজে ব্যবহৃত হয়, তাহলে রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে। তবে অন্যান্য ইঞ্জেকশন নিলে রোযা ভঙ্গ হবে না। কৃত্রিম উপায়ে শরীরে খাদ্য প্রবেশ করানো খাদ্য খাওয়ার শামিল। যেহেতু শক্তি অর্জনের জন্য মানুষ খাদ্য খায়, আর এরূপ ঔষধ দ্বারা সে শক্তিই অর্জন করা হয়। আর রোযার বিধান হলো বান্দা খাদ্যবস্তু ত্যাগ করবে। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'রোযাদার আমার জন্য তার শাহাওয়াত, খাদ্য ও পানীয় ত্যাগ করে।'
৪. সহবাসে লিপ্ত হওয়া: রোযা অবস্থায় স্ত্রীর সাথে সহবাসে লিপ্ত হলে রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে। এমন ব্যক্তিকে খালিস নিয়তে তওবা করতে হবে এবং তাকে কাফফারা আদায় করতে হবে।
টিকাঃ
৪০. সহীহ ফিকহুস সুন্নাহ ২য় খণ্ড পৃ: ৯৫।
৪১. সহীহ বুখারী, হা/৭৪৯২; সহীহ মুসলিম, হা/২৭৬৩; নাসাঈ, হা/২২১৫; ইবনে মাজাহ, হা/১৬৩৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/৭৫৯৬; বায়হাকী, হা/৮১১৫; মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হা/৮৭৯৩; জামেউস সগীর, হা/৮৬৬৭; মিশকাত, হা/১৯৫৯।
৪২. সহীহ বুখারী, হা/৭৪৯২; সহীহ মুসলিম, হা/২৭৬৩; নাসাঈ, হা/২২১৫; ইবনে মাজাহ, হা/১৬৩৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/৭৫৯৬; বায়হাকী, হা/৮১১৫; মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হা/৮৭৯৩; জামেউস সগীর, হা/৮৬৬৭; মিশকাত, হা/১৯৫৯।
📄 রোযার কাফফারা
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট এসে বলতে লাগল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি ধ্বংস হয়ে গেছি। নবী ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, কোন্ জিনিস তোমাকে ধ্বংস করেছে? সে বলল, আমি রমাযান মাসে দিনের বেলায় রোযা অবস্থায় সহবাসে লিপ্ত হয়ে পড়েছি। তখন (কাফফারা আদায়ের জন্য) নবী ﷺ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কি গোলাম আযাদ করার মতো সামর্থ্য আছে? সে বলল, না। আবার তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এক নাগাড়ে দুই মাস রোযা রাখতে পারবে কি? সে বলল, না। এরপর তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি ৬০ জন মিসকীনকে খাবার দিতে পারবে? সে বলল, না। নবী ﷺ তাকে বললেন, তুমি বসো। অতঃপর নবী ﷺ এর নিকট একটি বড় খেজুর ভর্তি ঝুড়ি আনা হলো। নবী ﷺ বললেন, তুমি এগুলো সাদাকা করে দাও। তখন সে বলল, “মদিনার একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত আমার চেয়ে গরীব আর কেউ নেই।” নবী তার এ কথা শুনে হাসলেন, এমনকি তাঁর সামনের দাঁতগুলোও বের হয়ে গিয়েছিল। এবার নবী ﷺ বললেন, এগুলো তুমিই নাও এবং তোমার পরিবারকে খেতে দাও।
অতএব যদি কারো রোযার কাফফারা প্রদান করা ওয়াজিব হয়ে যায়, তাহলে একটি গোলাম আযাদ করতে হবে। কিন্তু যদি কোনভাবে এ কাজ করতে সম্ভব না হয়, তাহলে একাধারে ২ মাস তথা ৬০টি রোযা রাখতে হবে। কিন্তু যদি কোন ভাবে এটাতেও অক্ষম হয়, তাহলে ৬০টি মিসকীনকে মধ্যম মানের আহার করাতে হবে। এক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত প্রথম স্তরের মাধ্যমে কাফফারা আদায় করতে সক্ষম থাকাবস্থায় দ্বিতীয় স্তরের মাধ্যমে কাফফারা আদায় করা বৈধ হবে না।
উল্লেখ যে, কাফফারা হিসেবে পূর্ণ দুই মাস রোযা রাখার ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে। তবে কেউ যদি একান্তই সক্ষম না হয়, তাহলে ভেঙ্গে ভেঙ্গে রোযা রাখলেও চলবে। অধিকাংশ আলেম এ মত পোষণ করেছেন।
একাধিকবার সহবাস করলে তার বিধান কী :
১. যে ব্যক্তি রমাযান মাসে একই দিনে একাধিকবার সহবাস করবে তাকে একবারই কাফফারা আদায় করতে হবে।
২. যে ব্যক্তি রমাযান মাসের কোন এক দিনে সহবাস করবে, তারপর তার জন্য কাফফারা আদায় করবে; অতঃপর সে ব্যক্তি যদি পুনরায় অন্য দিন সহবাস করে, তাহলে তাকে পুনরায় কাফফারা দিতে হবে।
৩. যে ব্যক্তি রমাযানের কোন এক দিনে সহবাস করল এবং কাফফারা আদায় করার পূর্বেই অন্য দিন আবার সহবাস করল, তার ক্ষেত্রে একটি মত হচ্ছে, তাকে প্রত্যেক দিনের পরিবর্তে আলাদা কাফফারা দিতে হবে। আর অপর মত হচ্ছে, তার জন্য একটি কাফফারাই যথেষ্ট হবে। আর এ মতটিই অধিক নির্ভরযোগ্য।
স্ত্রীর উপর কাফফারা আসবে কি:
স্বামী-স্ত্রী উভয়ে রাজী হয়ে সহবাস করলে উভয়ের উপর কাফফারা ওয়াজিব হবে কি না- এ ব্যাপারে দুটি মত আছে। একটি মত হলো, মহিলার উপর কাফফারা আসবে না। কেননা নবী ﷺ শুধু পুরুষকেই কাফফারা আদায় করার কথা বলেছেন, নারীকে বলেননি। অপর মত হলো মহিলার উপর কাফফারা ওয়াজিব হবে। যেহেতু সে এ কাজে স্বামীকে সহযোগিতা করেছে এবং রোযার মর্যাদা নষ্ট করেছে। এ ক্ষেত্রে উভয়ের উপর কাফফারা ওয়াজিব হবে- এটিই সঠিক মত।
যদি স্বামী স্ত্রীকে বাধ্য করে অথবা সে ভুলে সহবাসে লিপ্ত হয় তাহলে মহিলার উপর সঠিক মত অনুযায়ী কাযা ও কাফফারা ওয়াজিব হবে না। অনুরূপভাবে পুরুষও যদি ভুলে সহবাসে লিপ্ত হয় তবে তাকে কাযা ও কাফফারা আদায় করতে হবে না।
টিকাঃ
৪৩. সহীহ বুখারী, হা/১৯৩৬; মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হা/৬৫৭; আবু দাউদ, হা/২৩৯৪; মুসনাদে আহমাদ, হা/১০৬৯৮; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/১৯৪৪; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩৫২৯; মুসনাদুল বাযযার, হা/৮০৭৩; দার কুতনী, হা/২৩৯৭; মিশকাত, হা/২০০৪।
৪৪. সহীহ ফিকহুস সুন্নাহ ২য় খণ্ড পৃ: ৯৯।
৪৫. সহীহ ফিকুহুস সুন্নাহ ২য় খণ্ড পৃ: ৯৮।
৪৬. সহীহ ফিকুহুস সুন্নাহ ২য় খণ্ড পৃ: ৯৮।
📄 যেসব কারণে রোযা ভঙ্গ হয় না
স্বপ্নদোষ হলে : রোযা অবস্থায় স্বপ্নদোষ হলে রোযা ভঙ্গ হবে না, কারণ এটা বান্দার ইচ্ছাধীন নয়।
অনিচ্ছাকৃতভাবে বীর্যপাত ঘটলে : যদি কোন রোগজনিত কারণে এমনিতেই বীর্যপাত হয়ে যায় অথবা সাদা পানি বের হয় অথবা স্ত্রীর দিকে তাকানোর ফলে অথবা যৌন বিষয়ক কোন চিন্তা-ভাবনা করার ফলে বীর্যপাত হয়ে যায় তাতেও রোযা ভঙ্গ হবে না। হাদীসে এসেছে,
আবু হুরায়রা (রাঃ) সূত্রে নবী ﷺ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের সেসব ধারণা ও চিন্তা ক্ষমা করে দেন, যা তাদের মনে উদয় হয়, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তা কার্যে পরিণত করে বা অন্যের সাথে আলোচনা করে। কাতাদা (রাঃ) বলেন, যখন কেউ মনে মনে ত্বালাক্ব দেয়, তখন এর কোন মূল্য বা কার্যকারিতা নেই।
গোসল ফরয থাকাবস্থায় রোযা শুরু করলে: রাতে গোসল ফরয হয়েছে; কিন্তু ঘুম থেকে উঠে দেখা গেল যে, গোসল করতে গেলে সাহারী খাওয়ার সময় থাকবে না, এ অবস্থায় আগে খেয়ে নেবে এবং পরে গোসল করে ফজরের সালাত পড়বে। এমতাবস্থায় আযানের পরে গোসল করলেও রোযার কোন ক্ষতি হবে না। হাদীসে এসেছে,
আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর স্ত্রীদের সাথে সহবাসজনিত নাপাকী অবস্থাতেই ফজরের সালাতের সময়ে উপনীত হতেন। অতঃপর তিনি গোসল করতেন এবং রোযার নিয়ত করে রোযা রাখতেন।
অনিচ্ছাকৃতভাবে বমি করলে : ইচ্ছা করে বমি করলে রোযা নষ্ট হয়ে যাবে এবং পরে কাযা করতে হবে। কিন্তু অনিচ্ছায় যদি কারো বমি আসে তবে রোযা ভঙ্গ হবে না। হাদীসে এসেছে,
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেন, যে ব্যক্তি অনিচ্ছায় বমি করে তাকে রোযা কাযা আদায় করতে হবে না। কিন্তু যে ব্যক্তি ইচ্ছা করে বমি করে, তাকে রোযা কাযা আদায় করতে হবে।
ভুলে কোন কিছু খেয়ে ফেললে : যদি কেউ ভুলে কোন কিছু আহার করে ফেলে অথবা পানাহার করে, তাহলে তার সিয়াম ভঙ্গ হবে না এবং তার উপর কাযা কাফফারা কোনটাই ওয়াজিব হবে না। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি সিয়াম অবস্থায় ভুলে কিছু খেয়ে ফেলে বা পান করে ফেলে, সে যেন তার সিয়াম পূর্ণ করে। কেননা আল্লাহই তাকে খাইয়েছেন ও পান করিয়েছেন।
শিঙ্গা লাগালে : শিঙ্গা লাগানোর দ্বারা সাওম ভঙ্গ হবে না। হাদীসে এসেছে,
সাবিত আল-বুনানী (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) কে প্রশ্ন করা হলো (রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সময়) আপনারা কি রোযাদার ব্যক্তির শিঙ্গা লাগানো খারাপ মনে করতেন? তিনি বললেন, না; কিন্তু শিঙ্গা লাগানোর জন্য দুর্বলতা দেখা দেয়ার কারণে তা অপছন্দ করতাম। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেও রোযা অবস্থায় শিঙ্গা লাগিয়েছেন। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,
ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ ইহ্রাম এবং রোযা অবস্থায়ও শিঙ্গা লাগিয়েছেন।
শিঙ্গা লাগানোর দ্বারা যদি দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে অধিকাংশ সালাফী ফকীহগণের মতে রোযা ভেঙ্গে যাবে। হাদীসে এসেছে,
সাওবান (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি শিঙ্গা লাগাবে এবং যাকে শিঙ্গা লাগানো হবে তাদের উভয়ের রোযাই ভঙ্গ হয়ে যাবে।
স্ত্রীকে চুম্বন করলে : যে নিজেকে সংযত রাখতে পারে তার জন্য স্ত্রীকে স্পর্শ করা, চুম্বন করা ও আলিঙ্গন করা জায়েয আছে। হাদীসে এসেছে,
আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ সাওম অবস্থায় আমাকে চুমু দিতেন। তোমাদের মধ্যে কে এমন আছে যে, নিজের কামোদ্দীপনাকে আয়ত্বে রাখতে পারে, যেমন আয়ত্বে রাখতে সক্ষম ছিলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর কামোদ্দীপনাকে।
আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাকে চুমু খেতেন। আর তখন তিনিও রোযা অবস্থায় ছিলেন এবং আমিও রোযা অবস্থায় ছিলাম।
তবে যে অল্পতেই উত্তেজিত হয়ে যায় তার জন্য এসব থেকে বিরত থাকা উচিত; নতুবা জায়েযের পথ ধরে রোযা ভঙ্গ হওয়ার মত কিছু ঘটে যেতে পারে।
উমর ইবনে আবু সালামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। একদা তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে জিজ্ঞেস করলেন, সাওম পালনকারী ব্যক্তি চুম্বন করতে পারে কি? তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে বললেন, কথাটি উম্মে সালামাকে জিজ্ঞেস করো। (তাঁকে জিজ্ঞেস করার পর) তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ এরূপ করেন। এরপর তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তো আপনার পূর্বাপর সমুদয় গোনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে বললেন, শোনো, আল্লাহর শপথ! আমি আল্লাহ তা'আলাকে তোমাদের সকলের চেয়ে অধিক ভয় করি।
রোযা অবস্থায় স্ত্রীর সাথে সহবাস ছাড়া অন্যান্য কাজ বৈধ। যদি চুম্বনের ফলে মযী তথা সাদা পানি বের হয় তবে তাতে কোন ক্ষতি নেই। তবে রোযাদার ব্যক্তি যদি এ ধারণা করে যে, স্ত্রীর সাথে মাখামাখি করতে গেলে তার বীর্যপাত হওয়ার সম্ভাবনা আছে, তবে তার জন্য এসব করা জায়েয হবে না। যদি সে এসব করে এবং বীর্যপাত ঘটে, তবে তার রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে এবং তার জন্য কাযা ও কাফফারা দুটিই ওয়াজিব হবে।
নিম্নবর্ণিত কারণে রোযার কোন ক্ষতি হয় না :
• রোযা অবস্থায় মেসওয়াক করাতে কোন দোষ নেই। চাই মেসওয়াক তাজা হোক অথবা শুকনো হোক। আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আমার উম্মতের অথবা লোকদের জন্য যদি কষ্ট মনে না করতাম, তাহলে প্রত্যেক সালাতের সাথে তাদেরকে আমি মেসওয়াক করার জন্য আদেশ করতাম।
• মেসওয়াকের সময় দাঁতের মাড়ি থেকে রক্ত বের হলে রোযার কোন ক্ষতি হবে না। তবে রক্ত গলাধঃকরণ করা যাবে না।
• দাঁতের মাজন বা পেস্ট রোযা ভঙ্গকারী নয়, বরং তা মেসওয়াকের মতোই, তবে পেটে যেন না যায় সেজন্য সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। যদি অনিচ্ছায় পেটে যায়, তবে সমস্যা নেই। তবে মাজন দ্বারা রাতে দাঁত মাজাই উত্তম।
• মুখের থুথু গিলে ফেললে অথবা দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা খাদ্যের কণা থুথুর সাথে পেটে চলে গেলে অথবা দাঁতের মাড়ি থেকে সামান্য রক্ত বের হলে রোযা ভঙ্গ হবে না।
• সাওম পালনকারী গোসল ও শীতলতা অর্জন করলে সাওম ভাঙ্গবে না।
• অক্সিজেন গ্রহণ পানাহার নয়, পানাহারের বিকল্পও নয়। অতএব তা সিয়াম ভঙ্গকারী নয়।
• গোসল করা, শরীরে তেল মালিশ করা, সুগন্ধি ব্যবহার করা, নাকে, কানে ও চোখে ঔষধ দেয়া, চোখে সুরমা ব্যবহার করা সিয়াম ভঙ্গকারী নয়।
• বাবুর্চি বা রান্নার কাজে নিয়োজিত মহিলা প্রয়োজনে তরকারীর স্বাদ পরীক্ষা করতে পারে। তবে প্রয়োজন না হলে স্বাদ না নেয়াই উত্তম। কোন খাদ্যদ্রব্য চিবিয়ে শিশুর মুখে দেয়াতে রোযা ভঙ্গ হবে না। কারণ এসব কাজ সাধারণত খাদ্য গ্রহণের জন্য কেউ করে না, বরং প্রয়োজনের তাগিদে তাকে করতে হয়। কেননা আল্লাহ তা'আলা দ্বীনের মধ্যে কোন সংকীর্ণতা রাখেননি। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'তিনি দ্বীনের মধ্যে কোন সংকীর্ণতা রাখেননি।' (সূরা হাজ্জ- ৭৮)
• এমন কিছু কাজ আছে যা করলে রোযা একেবারে ভঙ্গ হয়ে যায় না; তবে রোযা ত্রুটিযুক্ত হয় এবং রোযার সওয়াব কমে যায়। যেমন- গীবত ও চোগলখোরী করা, পরস্পরে গালা-গালি করা, মারা-মারি করা, মিথ্যা কথা বলা, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া, মুসলমানের মান-ইজ্জত নষ্ট করা, রাগান্বিত হওয়া, মূল্যবান সময়কে অনর্থক কাজে নষ্ট করা, অশ্লীল গান অথবা মিউজিক সম্বলিত যে কোন গান শ্রবণ করা, টেলিভিশনের পর্দায় অশ্লীল ছবি দেখা, নারীদের বেপর্দা হয়ে চলাফেরা করা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ও আড্ডা দেয়া ইত্যাদি। এ সকল কাজ সব সময়ের জন্য হারাম ও নিষিদ্ধ; তাই রমাযানে তো বটেই; রমাযান ছাড়া অন্যান্য সময়েও এ সকল কাজ থেকে দূরে থাকা মুসলিম নর-নারীর উপর একান্ত কর্তব্য।
টিকাঃ
৪৯. সহীহ বুখারী, হা/৫২৬৯; সহীহ মুসলিম, হা/৩৪৬; তিরমিযী, হা/১১৭৩; নাসাঈ, হা/৩৪৩৩; শারহুস সুন্নাহ, হা/৫৭; মিশকাত, হা/৬৩।
৫০. সহীহ বুখারী, হা/১৯২৬; সহীহ মুসলিম, হা/২৬৪৬; তিরমিযী, হা/৭৭৯; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬৭০৬; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩৪৯৮; মুস্তাখরাজে আবু আওয়ানা, হা/২২৮৫; মু'জামুল কাবীর লিত তাবারানী, হা/১৯০৯৩; জামেউস সগীর, হা/৯০৬৯; মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হা/৭৩৯৭; মিশকাত, হা/২০০১।
৪৯. তিরমিযী, হা/৭২৪; ইবনে মাজাহ, হা/১৬৭৬; মুসনাদে আহমাদ, হা/১০৪৬৮; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩৫১৮; শারহুস সুন্নাহ, হা/১৭৫৫; মিশকাত, হা/২০০৭।
৫০. সহীহ মুসলিম, হা/২৭৭২; মুসনাদে আহমাদ, হা/৯৪৮৫; সুনানে দারেমী, হা/১৭২৬; মিশকাত, হা/২০০৩।
৫১. সহীহ বুখারী, হা/১৯৪০; মুসনাদে ইবনে জাদ, হা/১৪৬৬; মিশকাত, হা/২০১৬।
৫২. সহীহ বুখারী, হা/১৯৩৮; তিরমিযী, হা/৭৭৫; সুনানুল কুবরা লিন নাসাঈ, হা/৩২০৬; শারহুস সুন্নাহ, হা/১৭৫৮; মিশকাত, হা/২০০২।
৫৩. আবু দাউদ, হা/২৩৬৯; ইবনে মাজাহ, হা/১৬৭৯; মুসনাদে আহমাদ, হা/২২৫০৩; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩৫৩২; মুসনাদুল বাযযার, হা/৪১৫৬।
৫৪. মুসলিম, হা/২৬৩০; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৪২২০; ইবনে মাজাহ, হা/১৬৮৪।
৫৫. আবু দাউদ, হা/২৩৮৬; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৫৪৯৫।
৫৬. সহীহ মুসলিম, হা/২৬৪৪; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩৫৩৮; মুস্তাখরাজে আবু আওয়ানা, হা/২৩১২; মু'জামুল কাবীর লিত তাবারানী, হা/৮২১৫; বায়হাকী, হা/৭৮৯৪।
৫৭. আল মাজমু' ২য় খণ্ড পৃঃ ২২৩।
৫৮. সহীহ বুখারী, হা/৮৮৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৩৫৩৩; মুসনাদুল বাযযার, হা/৮০৭০; মুসনাদে আবু ই'আলা, হা/৬৬১৭; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/২০৫।
৫৯. সহীহ ফিক্বহুস সুন্নাহ ২য় খণ্ড, পৃঃ ১০৬।