📄 মুসাফির কখন রোযা ভাঙতে পারবে
১. মুসাফির যদি ফজরের পূর্বে সফরের নিয়ত করে, তাহলে এর পরের দিন রোযা রাখবে না।
২. মুসাফির যদি দিনের বেলায় সফর আরম্ভ করে তবে একটি মত হলো ঐ দিনের রোযা ভাঙ্গা তার জন্য বৈধ হবে না। অপর মতে সে ঐ দিনের রোযা ভাঙ্গতে পারবে এবং এ মতটিই সঠিক।
ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ (মক্কা) বিজয়ের বছর রমাযান মাসে সাওমরত অবস্থায় সফরে বের হলেন। অতঃপর কাদীদ নামক স্থানে পৌঁছার পর তিনি সাওম ভেঙ্গে ফেললেন। আর রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে যখনই কোন নতুন বিষয় প্রকাশ পেত, তাঁর সাহাবীগণ তা অনুসরণ করতেন।
মুহাম্মাদ ইবনে কাব (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি রমাযান মাসে আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) এর কাছে এলাম। তখন তিনি সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এমনকি এজন্য তার বাহনও প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল এবং তিনিও সফরের পোশাক পরিধান করে নিয়েছিলেন। তখন তিনি খাবার আনতে বললেন। তারপর তিনি খাবার খেলেন। অতঃপর আমি তাকে বললাম, এটা কি সুন্নাত? তিনি বললেন, হ্যাঁ- এটা সুন্নাত। তারপর তিনি আরোহণ করলেন।
টিকাঃ
৩৭. মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হা/৬৫০; সহীহ বুখারী, হা/১৯৪৪; মুসনাদে আহমাদ, হা/৩২৫৮; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/২০৩৫; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩৫৬৩; মা'রেফাতুস সুনান ওয়াল আছার, হা/২৫১০।
৩৮. তিরমিযী, হা/৭৯৯; বায়হাকী, হা/২৪৭; দার কুতনী, হা/১৮৭।
📄 ফিদইয়া দেয়ার নিয়মাবলি
ফিদইয়া কী এবং কার উপর ফিদইয়া ওয়াজিব : ফিদইয়া হচ্ছে একজন মিসকীনের একদিনের খাবার। যারা বার্ধক্যজনিত কারণে অথবা স্থায়ীভাবে অসুস্থ হওয়ার কারণে সিয়াম পালনে একেবারে অক্ষম না হলেও কষ্ট হবে তারা ফিদইয়া আদায় করবে। সুতরাং একেবারে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা এবং যে অসুস্থ রোগীর সুস্থ হওয়ার কোন আশা নেই- তারা ফিদইয়া আদায় করবে। আর তা হলো প্রতি দিনের সাওমের বিনিময়ে একজন মিসকীনকে খাওয়ানো।
আত্বা (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) কে বলতে শুনেছেন যে, এ আয়াত- "যারা সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও রোযা রাখতে চায় না, তাদের জন্য এর বিনিময়ে ফিদইয়া দেয়ার সুযোগ থাকবে" পাঠ করার পর বলেন, এ আয়াত মানসুখ হয়ে যায়নি। বরং এটি বৃদ্ধ পুরুষ ও বৃদ্ধা মহিলাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কেননা তারা রোযা রাখতে সক্ষম নয়। সুতরাং তারা প্রতিদিনের পরিবর্তে একজন মিসকীনকে খাবার খাওয়াবে।
টিকাঃ
৩৯. সহীহ বুখারী, হা/৪৫০৫; আবু দাউদ, হা/২৩২০।
📄 রোযা ভঙ্গ হওয়ার কারণ
১. কিছু খাওয়া বা পান করা: যদি কেউ ইচ্ছা করে কোন কিছু খায় অথবা পান করে, তাহলে তার রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে। সুতরাং যে ব্যক্তি এরূপ করবে, তাকে অবশ্যই বিনীতভাবে তওবা করতে হবে এবং ঐ রোযার কাযা ও কাফফারা আদায় করতে হবে। তবে কেউ যদি ভুলবশত কিছু খেয়ে ফেলে তবে তার রোযা ভঙ্গ হবে না। কিন্তু রোযার কথা মনে পড়ার সাথে সাথে খাওয়া বন্ধ করে দেবে। আর যদি অন্য কেউ তাকে এ অবস্থায় দেখে ফেলে, তাহলে তাকে রোযার কথা স্মরণ করিয়ে দেবে। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, 'তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার বিষয়ে একে অপরকে সহযোগিতা করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের বিষয়ে একে অপরকে সহযোগিতা করো না। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো; নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদানে খুবই কঠোর।' (সূরা মায়েদা- ২)
২. ইচ্ছাকৃতভাবে বীর্যপাত ঘটানো : ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ যদি হস্তমৈথুন করে বা সহবাস ছাড়া অন্য কোন উপায়ে বীর্যপাত ঘটায় তবে তার রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে এবং তার উপর কাযা আদায় করা ওয়াজিব হবে। এটাই জমহুর উলামাদের মতামত। কেননা এভাবে বীর্যপাত ঘটানোও শাহাওয়াতের অন্তর্ভুক্ত। আর রোযাদারের জন্য এটা জায়েয নয়। আল্লাহ তা'আলা হাদীসে কুদসীতে বলেছেন, 'রোযাদার আমার জন্য তার শাহাওয়াত, খাদ্য ও পানীয় ত্যাগ করে।'
৩. ইঞ্জেকশন গ্রহণ করলে : রোযা অবস্থায় যদি কেউ এমন কোন ইঞ্জেকশন বা স্নাইন নেয়, যা পুষ্টি বা খাদ্যের কাজে ব্যবহৃত হয়, তাহলে রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে। তবে অন্যান্য ইঞ্জেকশন নিলে রোযা ভঙ্গ হবে না। কৃত্রিম উপায়ে শরীরে খাদ্য প্রবেশ করানো খাদ্য খাওয়ার শামিল। যেহেতু শক্তি অর্জনের জন্য মানুষ খাদ্য খায়, আর এরূপ ঔষধ দ্বারা সে শক্তিই অর্জন করা হয়। আর রোযার বিধান হলো বান্দা খাদ্যবস্তু ত্যাগ করবে। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'রোযাদার আমার জন্য তার শাহাওয়াত, খাদ্য ও পানীয় ত্যাগ করে।'
৪. সহবাসে লিপ্ত হওয়া: রোযা অবস্থায় স্ত্রীর সাথে সহবাসে লিপ্ত হলে রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে। এমন ব্যক্তিকে খালিস নিয়তে তওবা করতে হবে এবং তাকে কাফফারা আদায় করতে হবে।
টিকাঃ
৪০. সহীহ ফিকহুস সুন্নাহ ২য় খণ্ড পৃ: ৯৫।
৪১. সহীহ বুখারী, হা/৭৪৯২; সহীহ মুসলিম, হা/২৭৬৩; নাসাঈ, হা/২২১৫; ইবনে মাজাহ, হা/১৬৩৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/৭৫৯৬; বায়হাকী, হা/৮১১৫; মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হা/৮৭৯৩; জামেউস সগীর, হা/৮৬৬৭; মিশকাত, হা/১৯৫৯।
৪২. সহীহ বুখারী, হা/৭৪৯২; সহীহ মুসলিম, হা/২৭৬৩; নাসাঈ, হা/২২১৫; ইবনে মাজাহ, হা/১৬৩৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/৭৫৯৬; বায়হাকী, হা/৮১১৫; মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হা/৮৭৯৩; জামেউস সগীর, হা/৮৬৬৭; মিশকাত, হা/১৯৫৯।
📄 রোযার কাফফারা
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট এসে বলতে লাগল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি ধ্বংস হয়ে গেছি। নবী ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, কোন্ জিনিস তোমাকে ধ্বংস করেছে? সে বলল, আমি রমাযান মাসে দিনের বেলায় রোযা অবস্থায় সহবাসে লিপ্ত হয়ে পড়েছি। তখন (কাফফারা আদায়ের জন্য) নবী ﷺ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কি গোলাম আযাদ করার মতো সামর্থ্য আছে? সে বলল, না। আবার তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এক নাগাড়ে দুই মাস রোযা রাখতে পারবে কি? সে বলল, না। এরপর তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি ৬০ জন মিসকীনকে খাবার দিতে পারবে? সে বলল, না। নবী ﷺ তাকে বললেন, তুমি বসো। অতঃপর নবী ﷺ এর নিকট একটি বড় খেজুর ভর্তি ঝুড়ি আনা হলো। নবী ﷺ বললেন, তুমি এগুলো সাদাকা করে দাও। তখন সে বলল, “মদিনার একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত আমার চেয়ে গরীব আর কেউ নেই।” নবী তার এ কথা শুনে হাসলেন, এমনকি তাঁর সামনের দাঁতগুলোও বের হয়ে গিয়েছিল। এবার নবী ﷺ বললেন, এগুলো তুমিই নাও এবং তোমার পরিবারকে খেতে দাও।
অতএব যদি কারো রোযার কাফফারা প্রদান করা ওয়াজিব হয়ে যায়, তাহলে একটি গোলাম আযাদ করতে হবে। কিন্তু যদি কোনভাবে এ কাজ করতে সম্ভব না হয়, তাহলে একাধারে ২ মাস তথা ৬০টি রোযা রাখতে হবে। কিন্তু যদি কোন ভাবে এটাতেও অক্ষম হয়, তাহলে ৬০টি মিসকীনকে মধ্যম মানের আহার করাতে হবে। এক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত প্রথম স্তরের মাধ্যমে কাফফারা আদায় করতে সক্ষম থাকাবস্থায় দ্বিতীয় স্তরের মাধ্যমে কাফফারা আদায় করা বৈধ হবে না।
উল্লেখ যে, কাফফারা হিসেবে পূর্ণ দুই মাস রোযা রাখার ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে। তবে কেউ যদি একান্তই সক্ষম না হয়, তাহলে ভেঙ্গে ভেঙ্গে রোযা রাখলেও চলবে। অধিকাংশ আলেম এ মত পোষণ করেছেন।
একাধিকবার সহবাস করলে তার বিধান কী :
১. যে ব্যক্তি রমাযান মাসে একই দিনে একাধিকবার সহবাস করবে তাকে একবারই কাফফারা আদায় করতে হবে।
২. যে ব্যক্তি রমাযান মাসের কোন এক দিনে সহবাস করবে, তারপর তার জন্য কাফফারা আদায় করবে; অতঃপর সে ব্যক্তি যদি পুনরায় অন্য দিন সহবাস করে, তাহলে তাকে পুনরায় কাফফারা দিতে হবে।
৩. যে ব্যক্তি রমাযানের কোন এক দিনে সহবাস করল এবং কাফফারা আদায় করার পূর্বেই অন্য দিন আবার সহবাস করল, তার ক্ষেত্রে একটি মত হচ্ছে, তাকে প্রত্যেক দিনের পরিবর্তে আলাদা কাফফারা দিতে হবে। আর অপর মত হচ্ছে, তার জন্য একটি কাফফারাই যথেষ্ট হবে। আর এ মতটিই অধিক নির্ভরযোগ্য।
স্ত্রীর উপর কাফফারা আসবে কি:
স্বামী-স্ত্রী উভয়ে রাজী হয়ে সহবাস করলে উভয়ের উপর কাফফারা ওয়াজিব হবে কি না- এ ব্যাপারে দুটি মত আছে। একটি মত হলো, মহিলার উপর কাফফারা আসবে না। কেননা নবী ﷺ শুধু পুরুষকেই কাফফারা আদায় করার কথা বলেছেন, নারীকে বলেননি। অপর মত হলো মহিলার উপর কাফফারা ওয়াজিব হবে। যেহেতু সে এ কাজে স্বামীকে সহযোগিতা করেছে এবং রোযার মর্যাদা নষ্ট করেছে। এ ক্ষেত্রে উভয়ের উপর কাফফারা ওয়াজিব হবে- এটিই সঠিক মত।
যদি স্বামী স্ত্রীকে বাধ্য করে অথবা সে ভুলে সহবাসে লিপ্ত হয় তাহলে মহিলার উপর সঠিক মত অনুযায়ী কাযা ও কাফফারা ওয়াজিব হবে না। অনুরূপভাবে পুরুষও যদি ভুলে সহবাসে লিপ্ত হয় তবে তাকে কাযা ও কাফফারা আদায় করতে হবে না।
টিকাঃ
৪৩. সহীহ বুখারী, হা/১৯৩৬; মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হা/৬৫৭; আবু দাউদ, হা/২৩৯৪; মুসনাদে আহমাদ, হা/১০৬৯৮; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/১৯৪৪; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩৫২৯; মুসনাদুল বাযযার, হা/৮০৭৩; দার কুতনী, হা/২৩৯৭; মিশকাত, হা/২০০৪।
৪৪. সহীহ ফিকহুস সুন্নাহ ২য় খণ্ড পৃ: ৯৯।
৪৫. সহীহ ফিকুহুস সুন্নাহ ২য় খণ্ড পৃ: ৯৮।
৪৬. সহীহ ফিকুহুস সুন্নাহ ২য় খণ্ড পৃ: ৯৮।