📘 সিয়াম ও যাকাত > 📄 রোগীর অবস্থা ও তার রোযার বিধান

📄 রোগীর অবস্থা ও তার রোযার বিধান


রোগীর তিনটি অবস্থা হতে পারে:
১. তার রোগটি এমন স্বাভাবিক হবে যে, রোযা রাখাতে তার কোন সমস্যা হবে না। এমন রোগীর জন্য রোযা ভঙ্গ করা জায়েয হবে না।
২. রোগীর অবস্থা এমন হবে যে, রোযা রাখলে তার রোগ বৃদ্ধি পাবে অথবা সুস্থ হতে দেরি হবে। এমনকি রোযা রাখা তার জন্য কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এমন রোগীর জন্য রোযা ভেঙ্গে ফেলা উত্তম। যদি কোন রোগীর সিয়াম পালনের কারণে রোগ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তবে তার জন্য রোযা ভঙ্গ করা ওয়াজিব। কিন্তু সুস্থ হওয়ার পর রোযা কাযা আদায় করে নেবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'যদি তোমাদের মধ্যে কেউ রোযার মাসে অসুস্থ হয়ে পড়ে অথবা সফরে থাকে তাহলে পরে গুণে গুণে সেই দিনগুলো পূর্ণ করে নেবে।' (সূরা বাকারা- ১৮৪)
৩. রোগীর এমন অবস্থা হবে যে, রোযা রাখলে তার প্রাণনাশের আশঙ্কা হতে পারে। এমতাবস্থায় তার জন্য রোযা রাখা হারাম। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংস করো না।' (সূরা নিসা- ২৯)
স্থায়ী কারণে রোযা রাখতে অক্ষম যেমন, অতি বৃদ্ধ এবং এমন রোগী যার রোগ ভালো হওয়ার আশা করা যায় না তাদেরকে রোযা রাখতে হবে না। কারণ সে এ কাজের সামর্থ্য রাখে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'আল্লাহ তা'আলা কাউকে তার সামর্থ্যের বাইরে বোঝা চাপিয়ে দেন না।' (সূরা বাকারা- ২৮৬) তবে এ ধরনের ব্যক্তির উপর রোযার ফিদইয়া প্রদান করা ওয়াজিব।

📘 সিয়াম ও যাকাত > 📄 মুসাফিরের অবস্থা ও তার রোযার বিধান

📄 মুসাফিরের অবস্থা ও তার রোযার বিধান


মুসাফিরের তিনটি অবস্থা হতে পারে :
১. রোযা রাখা তার জন্য কষ্টকর হলে তার জন্য রোযা না রাখাই উত্তম। হাদীসে এসেছে, জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ কোন এক সফরে থাকা অবস্থায় এক জায়গায় জটলা দেখতে পেলেন। তার মধ্যে একজন লোককে দেখলেন- যাকে ছায়া দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে? লোকেরা বলল, লোকটি রোযা রেখেছে। এসব শুনে তিনি বললেন, সফরে রোযা রাখা সওয়াবের কাজ নয়।
২. সফরে রোযা রাখা তার জন্য কষ্টকর হবে না এবং রোযা রাখার কারণে তাকে অন্যান্য নেক কাজ হতেও বিরত থাকতে হবে না। এমতাবস্থায় তার জন্য রোযা রাখাই উত্তম। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'আর যদি তোমরা রোযা রাখ, তবে সেটা তোমাদের জন্য উত্তম- যদি তোমরা বুঝতে পার।' (সূরা বাকারা- ১৮৪)
আবুদ্-দারদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, প্রচণ্ড গরমের দিনে কোন সফরে আমরা নবী ﷺ এর সাথে বের হলাম। অবস্থা এমন ছিল যে, প্রচণ্ড গরমের কারণে প্রত্যেকেই তার হাত মাথার উপর রেখেছিল (সূর্যের তাপ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য)। আর তখন নবী ﷺ ও ইবনে রাওয়াহা (রাঃ) ছাড়া আমাদের মধ্যে আর কেউ রোযাদার ছিল না।
নবী ﷺ এর স্ত্রী আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। হামযা ইবনে আমর আসলামী (রাঃ) অধিক পরিমাণে রোযা পালনে অভ্যস্ত ছিলেন। তিনি নবী ﷺ কে বললেন, আমি কি সফরেও রোযা রাখব? নবী ﷺ বললেন, তুমি যদি ইচ্ছা করো রোযা রাখো। আর যদি ইচ্ছা করো তবে ছেড়ে দাও।
৩. রোযা রাখা মুসাফিরের জন্য মারাত্মক কষ্টকর হবে, এমনকি এতে তার প্রাণনাশেরও আশঙ্কা থাকবে। এমতাবস্থায় রোযা রাখা তার জন্য হারাম হবে।
জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। মক্কা বিজয়ের বছর রমাযান মাসে সাওমরত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ ﷺ মক্কার উদ্দেশ্যে বের হলেন। এরপর যখন তিনি "কুরা'উল গামীম” নামক স্থানে পৌঁছলেন, তখন লোকেরাও সাওমরত ছিল। এরপর তিনি একটি পানির পাত্র চাইলেন। এমনকি লোকেরা তাঁর দিকে তাকাতে লাগল। এরপর তিনি পানি পান করলেন। তখন তাঁকে বলা হলো, কতিপয় লোক সাওমরত রয়েছে। তিনি বললেন, তারা অবাধ্য, তারা অবাধ্য।
যে ব্যক্তি সফরে থাকবে, সে ইচ্ছা করলে রোযা ভঙ্গ করতে পারবে, আবার ইচ্ছা করলে রোযা রাখতেও পারে। এমতাবস্থায় রোযা ভঙ্গ করলে সফর শেষে তা পূর্ণ করে নিতে হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'রমাযান মাস (এমন একটি মাস) যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে, আর এই কুরআন হচ্ছে মানবজাতির জন্য পথপ্রদর্শক, সৎপথের সুস্পষ্ট নিদর্শন এবং (হক ও বাতিলের) পার্থক্যকারী। অতএব তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাসটি পাবে, সে যেন রোযা রাখে, তবে যদি কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে কিংবা সফরে থাকে তবে সে পরবর্তী দিনগুলোতে গুণে গুণে সেই পরিমাণ কাযা করে নেবে। (এ সুযোগ দিয়ে) আল্লাহ তা'আলা তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, কখনোই তোমাদের (জীবন) কঠিন করতে চান না। আল্লাহর উদ্দেশ্য হচ্ছে, তোমরা যেন গুণে গুণে (রোযার) সংখ্যাগুলো পূর্ণ করতে পার, আর আল্লাহ তোমাদেরকে (জীবন যাপনের) যে পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন সেজন্য তাঁর মাহাত্ম্য বর্ণনা করতে পার এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা আদায় করতে পার।' (সূরা বাকারা- ১৮৫)
আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, রমাযানের ষোল দিন গত হওয়ার পর আমরা নবী ﷺ এর সাথে জিহাদ করেছিলাম, তখন আমাদের মধ্যে কেউ কেউ রোযা রেখেছিলেন আবার কেউ কেউ রাখেননি; কিন্তু এ কারণে কেউ কাউকে দোষারোপ করেননি।
আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে রমাযান মাসের ১২ দিন বাকি থাকতে বের হলাম। আর আমরা হুনাইনের উদ্দেশ্যে বের হলাম। তখন লোকেদের একদল রোযা রেখেছিল এবং অন্য দল রোযা ভঙ্গ করেছিল। কিন্তু রোযাদারগণ রোযা ভঙ্গকারীদেরকে কোনরূপ দোষারূপ করে নাই এবং রোযাভঙ্গকারীগণও রোযাদারদেরকে কোনরূপ দোষারূপ করে নাই।
অতএব সফরে যদি রোযা রাখার পরিবেশ ভালো থাকে এবং কষ্ট না হয় তাহলে রোযা রাখাই উত্তম, আর কষ্ট হলে না রাখা উত্তম। কিন্তু অতিরিক্ত কষ্ট সত্ত্বেও রোযা রাখা মাকরূহ।
সফরে কেউ রোযা রাখা শুরু করলে অনেক কষ্ট দেখা দিলে রোযা ভঙ্গ করে ফেলবে।

টিকাঃ
৩১. সহীহ বুখারী, হা/১৯৪৬; সহীহ মুসলিম, হা/১৩৩৭; মুসনাদে দারেমী, হা/১৭৫০; বায়হাকী, হা/৭৯৪৩; মিশকাত, হা/২০২১।
৩২. সহীহ বুখারী, হা/১৯৪৫; সহীহ মুসলিম, হা/২৬৭৬; মুস্তাখরাজে আবু আওয়ানা, হা/২২৫৫; আবু দাউদ, হা/২৪১১; ইবনে মাজাহ, হা/১৬৬৩; মুসনাদে আহমাদ, হা/২১৭৪৩; মু'জামুল কাবীর লিত তাবারানী, হা/১৭৭১; বায়হাকী, হা/৭৯৫৬; শারহুস সুন্নাহ, হা/১৭৬৫; সিলসিলা সহীহাহ, হা/৪।
৩৩. মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হা/৬৫৩; সহীহ বুখারী, হা/১৯৪৩; সহীহ মুসলিম, হা/২৬৭১; তিরমিযী, হা/৭১১; নাসাঈ, হা/২৩০৬; ইবনে মাজাহ, হা/১৬৬২; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৪২৪২; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/২০২৮; মুসনাদে আবু ই'আলা, হা/৪৬৫৪; মু'জামুল কাবীর লিত তাবারানী, হা/২৭৯২; বায়হাকী, হা/৭৯৪৫; সুনানে দারেমী, হা/১৭০৭; মিশকাত, হা/২০১৯।
৩৪. সহীহ বুখারী, হা/১৯৪৪; সহীহ মুসলিম, হা/২৬৬৬; নাসাঈ, হা/২২৬৩; তিরমিযী, হা/৭১০; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/২০১৯; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/১০৫৩; মুসনাদে আবু ই'আলা, হা/১৮৮০; মিশকাত, হা/২০২৭।
৩৫. সহীহ মুসলিম, হা/২৬৭১; মুসনাদে আহমাদ, হা/১১৭২৩; মুসনাদে আবু ই'আলা, হা/১০৩৫; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/১০৬২; মিশকাত, হা/২০২০।
৩৬. মুসনাদে আহমাদ, হা/১১৪৩১; মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হা/৩৮০৩৫।

📘 সিয়াম ও যাকাত > 📄 মুসাফির কখন রোযা ভাঙতে পারবে

📄 মুসাফির কখন রোযা ভাঙতে পারবে


১. মুসাফির যদি ফজরের পূর্বে সফরের নিয়ত করে, তাহলে এর পরের দিন রোযা রাখবে না।
২. মুসাফির যদি দিনের বেলায় সফর আরম্ভ করে তবে একটি মত হলো ঐ দিনের রোযা ভাঙ্গা তার জন্য বৈধ হবে না। অপর মতে সে ঐ দিনের রোযা ভাঙ্গতে পারবে এবং এ মতটিই সঠিক।
ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ (মক্কা) বিজয়ের বছর রমাযান মাসে সাওমরত অবস্থায় সফরে বের হলেন। অতঃপর কাদীদ নামক স্থানে পৌঁছার পর তিনি সাওম ভেঙ্গে ফেললেন। আর রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে যখনই কোন নতুন বিষয় প্রকাশ পেত, তাঁর সাহাবীগণ তা অনুসরণ করতেন।
মুহাম্মাদ ইবনে কাব (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি রমাযান মাসে আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) এর কাছে এলাম। তখন তিনি সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এমনকি এজন্য তার বাহনও প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল এবং তিনিও সফরের পোশাক পরিধান করে নিয়েছিলেন। তখন তিনি খাবার আনতে বললেন। তারপর তিনি খাবার খেলেন। অতঃপর আমি তাকে বললাম, এটা কি সুন্নাত? তিনি বললেন, হ্যাঁ- এটা সুন্নাত। তারপর তিনি আরোহণ করলেন।

টিকাঃ
৩৭. মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হা/৬৫০; সহীহ বুখারী, হা/১৯৪৪; মুসনাদে আহমাদ, হা/৩২৫৮; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/২০৩৫; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩৫৬৩; মা'রেফাতুস সুনান ওয়াল আছার, হা/২৫১০।
৩৮. তিরমিযী, হা/৭৯৯; বায়হাকী, হা/২৪৭; দার কুতনী, হা/১৮৭।

📘 সিয়াম ও যাকাত > 📄 ফিদইয়া দেয়ার নিয়মাবলি

📄 ফিদইয়া দেয়ার নিয়মাবলি


ফিদইয়া কী এবং কার উপর ফিদইয়া ওয়াজিব : ফিদইয়া হচ্ছে একজন মিসকীনের একদিনের খাবার। যারা বার্ধক্যজনিত কারণে অথবা স্থায়ীভাবে অসুস্থ হওয়ার কারণে সিয়াম পালনে একেবারে অক্ষম না হলেও কষ্ট হবে তারা ফিদইয়া আদায় করবে। সুতরাং একেবারে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা এবং যে অসুস্থ রোগীর সুস্থ হওয়ার কোন আশা নেই- তারা ফিদইয়া আদায় করবে। আর তা হলো প্রতি দিনের সাওমের বিনিময়ে একজন মিসকীনকে খাওয়ানো।
আত্বা (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) কে বলতে শুনেছেন যে, এ আয়াত- "যারা সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও রোযা রাখতে চায় না, তাদের জন্য এর বিনিময়ে ফিদইয়া দেয়ার সুযোগ থাকবে" পাঠ করার পর বলেন, এ আয়াত মানসুখ হয়ে যায়নি। বরং এটি বৃদ্ধ পুরুষ ও বৃদ্ধা মহিলাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কেননা তারা রোযা রাখতে সক্ষম নয়। সুতরাং তারা প্রতিদিনের পরিবর্তে একজন মিসকীনকে খাবার খাওয়াবে।

টিকাঃ
৩৯. সহীহ বুখারী, হা/৪৫০৫; আবু দাউদ, হা/২৩২০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00