📄 পাগলের রোযার বিধান
যার জ্ঞান-বুদ্ধি লোপ পেয়েছে তাকে পাগল বলা হয়। পাগলের উপর রোযা রাখা অথবা রোযার পরিবর্তে দরিদ্রকে আহার করানো ওয়াজিব নয়। কেননা সে ভালো-মন্দের মাঝে পার্থক্য করতে পারে না। কেউ যদি কোন রোগ বা আঘাত ইত্যাদির কারণে বেহুঁশ বা অজ্ঞান হয়ে যায় তাহলে তার রোযা নষ্ট হয় না, যতক্ষণ না সে রোযা ভঙ্গের কোন কাজ করে। যেহেতু সে জ্ঞান থাকা অবস্থায় রোযার নিয়ত করেছে। জিনে ধরা রোগীরও এই বিধান। তবে এ ধরনের ব্যক্তি যখনই সুস্থ হয়ে যাবে তখনই সে সিয়াম পালন শুরু করে দেবে। কিন্তু যদি এমন হয় যে, দিনের কিছু অংশ সে সুস্থ এবং কিছু অংশ অসুস্থ থাকে, তাহলে সে যখনই সুস্থ হবে তখনই পানাহার থেকে বিরত থাকবে এবং উক্ত দিনের সিয়াম পূর্ণ করবে。
📄 মাসিক চলাকালে রোযার বিধান
হায়েয (মাসিক বা ঋতুস্রাব) ও নেফাসগ্রস্ত (সন্তান প্রসবোত্তর রক্ত প্রবাহিত হওয়া) মহিলারা হায়েয ও নেফাস চলাকালে রোযা রাখবে না। তারা পরে তাদের ছুটে যাওয়া রোযার কাযা আদায় করবে।
মুআযা (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আয়েশা (রাঃ) কে প্রশ্ন করলাম, ঋতুবতী মহিলা সাওম কাযা করবে এবং সালাত কাযা করবে না এটা কেমন কথা? তিনি বললেন, তুমি কি হারূরিয়্যা? আমি বললাম, আমি হারূরিয়্যা নই; বরং আমি (জানার জন্যই) জিজ্ঞেস করছি। আয়েশা (রাঃ) বললেন, আমাদের এরূপ হতো। তখন আমাদেরকে কেবল সাওম কাযা করার নির্দেশ দেয়া হতো, কিন্তু সালাত কাযা করার নির্দেশ দেয়া হতো না।
আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা যখন হায়েযগ্রস্ত হও তখন সালাত আদায় কর না এবং রোযাও রাখ না- এটা ঠিক নয় কি? আর এটাই হচ্ছে দ্বীনের ব্যাপারে কমতি। ঋতুবতী মহিলা যদি দিনের কোন এক সময়ে মাসিক থেকে পাক হয়ে যায়, তাহলে দিনের পরবর্তী অংশে সে খাওয়া-দাওয়া করতে পারবে এবং তার স্বামী যদি সফর থেকে আসে তবে মেলামেশাও করতে পারবে। যদি ঋতুবতী মহিলার ফজরের পূর্বে মাসিক বন্ধ হয়, তাহলে পরের দিন তাকে রোযা রাখতে হবে, যদিও সে সুবহে সাদিকের পূর্বে গোসল না করতে পারে। এমতাবস্থায় সে পরে গোসল করে নেবে।
মাসিক বন্ধ করে রোযা রাখা:
হায়েয মহিলাদের উপর আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত একটি বিষয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সময় কোন মহিলা কৃত্রিম উপায়ে মাসিক বন্ধ করে পূর্ণ মাস রোযা রাখতেন না। সুতরাং এরূপ করাটা নিন্দনীয়। তবে যদি কোন মহিলা ঔষধ ব্যবহার করে মাসিক বন্ধ রাখে এবং পুরো মাস একসাথে রোযা রাখে তবে তার রোযা শুদ্ধ হবে এবং পবিত্র থাকাবস্থায় যেসব হুকুম তার উপর প্রযোজ্য হয়, এ অবস্থায় তার উপর তাই প্রযোজ্য হবে।
টিকাঃ
২৪. সহীহ মুসলিম, হা/৭৮৯; নাসাঈ, হা/২৩১৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৫৯৯৩; মুস্তাখরাজে আবু আওয়ানা, হা/২৩২০; বায়হাকী, হা/৭৯০১; মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হা/১২৭৭; মিশকাত, হা/২০৩২।
২৫. সহীহ বুখারী, হা/১৯৫১; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/২০৪৫; মিশকাত, হা/১৯।
২৬. সহীহ ফিকহুস সুন্নাহ, ২ খণ্ড, পৃঃ ১১৫।
📄 মাসিক সংক্রান্ত কতিপয় মাসআলা
১. যে মহিলার ইস্তেহাযা হয় সে রোযা ভাঙবে না এবং সালাতও কাযা করবে না। ইস্তেহাযা হলো, মাসিকের নির্ধারিত সময়ের পরে অথবা সন্তান প্রসবের ৪০ দিনের পরে যে রক্ত আসে।
২. কোন মহিলা রোযা থাকা অবস্থায় যদি তার ঋতুর রক্ত আসে, তাহলে তার রোযা নষ্ট হয়ে যাবে।
৩. ফজরের পরপরই কোন মহিলা ঋতুস্রাবমুক্ত হলে ঐ দিনের খানাপিনা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকতে হবে না। কেননা সে ঐ দিনের শুরুতে ঋতুবতী থাকার কারণে সেদিনের রোযা তার জন্য শুদ্ধ নয়। আর রোযা যেহেতু শুদ্ধ নয়, সেহেতু খানাপিনা থেকে বিরত থাকারও কোন অর্থ নেই। ঐ দিনের বাকি অংশে সে খানাপিনা থেকে বিরত থাক বা না থাক তাকে পরবর্তীতে ঐ দিনের রোযার কাযা আদায় করতে হবে।
৪. ঋতুবতী মহিলা যদি ফজরের এক মিনিট আগে হলেও নিশ্চিতভাবে ঋতুস্রাব থেকে মুক্ত হয়, তাহলে রমাযান মাস হলে তাকে ঐ দিনের রোযা আদায় করতে হবে এবং তার ঐ দিনের রোযা শুদ্ধ রোযা হিসেবে পরিগণিত হবে এবং তাকে কাযা করতে হবে না। তার ফজরের পূর্বে গোসল করার সুযোগ না পেলেও সমস্যা নেই। যেমনিভাবে কোন পুরুষ সহবাসজনিত কারণে অথবা স্বপ্নদোষের কারণে যদি অপবিত্র থাকে এবং ঐ অবস্থায় সাহারী করে নেয়, তাহলে ফজরের আগে গোসল না করলেও তার রোযা শুদ্ধ হবে। আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ সহবাসজনিত কারণে ফজরের সময় আরম্ভ হওয়ার পর গোসল করতেন এবং রোযা রাখতেন।
৫. কোন মহিলার ইফতারের পর অথবা সূর্যাস্তের পরপরই ঋতুস্রাব আসলে তার সেদিনের রোযা শুদ্ধ হবে।
৬. কোন মহিলা যদি রোযা অবস্থায় ঋতুস্রাব আসার চিহ্ন অনুভব করতে পারে এবং সূর্যাস্তের পর রক্ত বের হয়, তাহলেও তার ঐ দিনের রোযা শুদ্ধ হয়ে যাবে।
৭. সদ্য সন্তান প্রসবকারিণী নারী ৪০ দিনের আগে যখনই পবিত্র হবে তখনই তার উপর রোযা রাখা অপরিহার্য হয়ে যাবে- যদি তখন রমাযান মাস চলে। অনুরূপভাবে তার উপর সালাত আদায়ও ফরয হবে এবং তার স্বামীর জন্য তার সাথে সহবাস করাও বৈধ হবে। কেননা সে একজন পবিত্র নারী হিসেবে বিবেচিত হবে। যার মধ্যে সালাত, সিয়াম ও সহবাসের বৈধতায় বাধাদানকারী কোন কিছু অবশিষ্ট নেই।
৮. যদি রমাযান মাসে দিনের বেলায় কোন মহিলার সামান্য রক্তের ফোটা পড়ে এবং সারা রমাযান এই রক্ত চালু থাকা অবস্থায় সে রোযা রাখে, তাহলে তার রোযা শুদ্ধ হবে। আর এই রক্ত তেমন কোন বিষয় না। কারণ, এটা শিরা থেকে আসে।
৯. কোন মহিলা যদি রক্ত দেখতে পায় কিন্তু সে নিশ্চিত নয় যে, সেটা ঋতুস্রাবের রক্ত। তাহলে ঐ দিনের রোযা শুদ্ধ হবে। তবে ঋতুর বিষয়টা স্পষ্ট হলে রোযা শুদ্ধ হবে না।
১০. ঋতুবতী এবং ইস্তেহাযাগ্রস্ত মহিলা রমাযানে দিনের বেলায় খানাপিনা করবে। তবে উত্তম হলো, খানাপিনা গোপনে করা।
১১. কোন মহিলা অসুস্থ হয়ে থাকলে এবং রোযা কাযা আদায় করতে সক্ষম না হলে যখনই সক্ষম হবে তখনই কাযা আদায় করবে। এ ক্ষেত্রে পরবর্তী রমাযান এসে গেলেও সমস্যা নেই। কিন্তু যদি তার ওজর না থাকে এবং অজুহাত দেখায় এবং বিষয়টা তুচ্ছজ্ঞান করে তাহলে তার জন্য এক রমাযানের কাযা রোযা অন্য রমাযান পর্যন্ত বিলম্ব করা বৈধ নয়। আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার উপর রোযা কাযা থাকত এবং আমি তা শা'বান মাসে ছাড়া কাযা আদায় করতে পারতাম না।
এই হাদীস প্রমাণ করে যে, এক রমাযানের রোযা পরবর্তী রমাযানের পর পর্যন্ত বিলম্ব করা উচিত নয়। সুতরাং যে মহিলা পরবর্তী রমাযানে পদার্পণ করেছে অথচ বিগত রমাযানের কয়েক দিনের রোযা রাখেনি তাকে তার কৃতকর্মের দরুণ তওবা করতে হবে এবং দ্বিতীয় রমাযানের পর ছেড়ে দেয়া রোযাগুলোর কাযা আদায় করতে হবে।
১২. কোন মহিলা ইস্তেহাযাগ্রস্ত অবস্থা থেকে পবিত্র হওয়ার দু'মাস পর রক্তের ছোট ছোট কিছু বিন্দু দেখতে পেলে এ ক্ষেত্রে সাধারণ নিয়ম হচ্ছে, মহিলা যখন ঋতুস্রাব ও ইস্তেহাযা অবস্থা থেকে নিশ্চিতভাবে পবিত্র হয়ে যাবে এরপর ঘোলা বা হলুদ রঙের, যা বের হবে অথবা ২/১ ফোটা যে রক্ত আসবে অথবা সামান্য যে সিক্ততা অনুভূত হবে, সেগুলো আসলে ঋতুস্রাব নয়। সে কারণে এগুলো তাকে সালাত আদায় করা ও সিয়াম পালন করা থেকে বিরত রাখবে না এবং স্বামীকে সহবাস থেকেও বাধা দেবে না। উম্মে আত্বিয়া (রাঃ) বলেন, ঘোলা বা হলুদ রঙের যা বের হয় তাকে আমরা কিছুই গণ্য করতাম না।
কিন্তু পবিত্রতা অর্জনের পূর্বে বিষয়গুলো নিয়ে তাড়াহুড়া না করা আবশ্যক। কেননা কতিপয় মহিলা রক্ত শুকিয়ে গেলে নিশ্চিত পবিত্রতা অর্জনের আগেই তাড়াহুড়া করে গোসল করে নেয়।
টিকাঃ
২৭. সহীহ বুখারী, হা/১৯৩১; সহীহ মুসলিম, হা/৭৫, ১১০৯।
২৮. সহীহ বুখারী, হা/১৯৫০; সহীহ মুসলিম, হা/১১৪৬।
২৯. সহীহ বুখারী, হা/৩২০।
📄 গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারিণী মহিলাদের রোযার বিধান
• গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারিণী মহিলাদের যদি গর্ভাবস্থায় বা দুগ্ধদানের কারণে রোযা রাখতে কষ্ট হয় অথবা তাদের সন্তানদের প্রাণহানীর আশঙ্কা থাকে তাহলে তারা রোযা রাখবে না। পরে যখন সুবিধা হয় এবং আশঙ্কা দূর হয়ে যায় তখন কাযা করে নেবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, আল্লাহ তা'আলা মুসাফিরের অর্ধেক সালাত কমিয়ে দিয়েছেন এবং গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী নারীর সিয়াম না রেখে পরে আদায় করার অবকাশ দিয়েছেন।
টিকাঃ
৩০. তিরমিযী, হা/৭১৫; ইবনে মাজাহ, হা/১৬৬৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৯০৬৯; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/২০৪২; বায়হাকী, হা/৭৮৬৯; মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হা/৫৬৬; মিশকাত, হা/২০২৫।