📄 রোযা ফরয হওয়ার শর্তাবলি
১. মুসলিম হওয়া। কেননা অমুসলিমের উপর রোযা ফরয নয়, সে রোযা রাখলেও তা আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। যেহেতু কোন ইবাদাত কবুল হওয়ার জন্য মূল শর্ত হলো ইসলাম গ্রহণ করা। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'তাদের দান গ্রহণে বাধা কেবল এই ছিল যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অস্বীকার করে।' (সূরা তওবা- ৫৪) যদি কোন কাফির রমাযান মাসে ইসলাম গ্রহণ করে, তবে তার পেছনের সিয়ামের কাযা আদায় করতে হবে না। কারণ আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, 'কাফিরদেরকে বলে দাও! যদি তারা কুফরী থেকে বিরত হয়, তাহলে তাদের অতীতের পাপ ক্ষমা করে দেয়া হবে।' (সূরা আনফাল- ৩৮)
২. জ্ঞানসম্পন্ন হওয়া।
৩. প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া।
উপরোক্ত উভয় শর্তের দলীল নিম্নোক্ত হাদীসটি,
আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, তিন ব্যক্তির থেকে কলম উঠিয়ে নেয়া হয়েছে (অর্থাৎ তাদের জন্য সওয়াব ও গোনাহ লেখা হয় না)। (১) ঘুমন্ত ব্যক্তি জাগ্রত হওয়া পর্যন্ত। (২) নাবালেগ বাচ্চা বালেগ হওয়া পর্যন্ত। (৩) পাগল ব্যক্তি জ্ঞান ফিরে পাওয়া পর্যন্ত।
৪. সুস্থ হওয়া।
৫. মুকীম হওয়া। কেননা অসুস্থ ও মুসাফিরের জন্য রমাযান মাসে সিয়াম না রাখার অনুমতি দেয়া হয়েছে। তবে সুস্থ ও মুকীম হওয়ার পর ছুটে যাওয়া সাওমের কাযা করে নেবে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, '(রোযা ফরয করা হয়েছে) নির্দিষ্ট কয়েকটি দিনের জন্য, তবে কেউ যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে কিংবা সফরে থাকে, তবে সমপরিমাণ দিনের রোযা (সুস্থ হয়ে অথবা সফর থেকে ফিরে এসে) কাযা আদায় করে নেবে।' (সূরা বাকারা- ১৮৩)
৬. মহিলারা হায়েয ও নেফাস থেকে মুক্ত হওয়া। উপরোক্ত শর্তাবলির অধিকারী ব্যক্তিকে অবশ্যই সিয়াম পালন করতে হবে।
অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য শিশুদেরকে রোযা রাখানো:
অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য শিশুদেরকে রোযা রাখার নির্দেশ দিতে হবে। শিশু রোযা রাখলে শুদ্ধ হবে এবং সওয়াবও পাবে। আর তার পিতা-মাতার জন্যও রয়েছে ভালো কাজের নির্দেশ দেয়ার সওয়াব। রুবাইয়্যি বিনতে মুআওয়াজ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা আমাদের বাচ্চাদেরকে রোযা রাখাতাম এবং তাদের জন্য খেলনা রাখতাম। তাদের মধ্যে কেউ যখন খাবারের জন্য কাঁদত তখন আমরা ঐ খেলনা দিতাম। এভাবে ইফতারের সময় হয়ে যেত।
টিকাঃ
২২. সুনানে নাসাঈ, হা/৩৪৩২; ইবনে মাজাহ, হা/২০৪১; আবু দাউদ, হা/৪৪০০; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৪৭৩৮; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/১৪২; মুসনাদুল বাযযার, হা/৯০৫৫; মুসনাদে আবু ই'আলা, হা/৪৪০০; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/২৩৫০।
২৩. সহীহ বুখারী, হা/১৯৬০; সহীহ মুসলিম, হা/২৭২৫; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/২০৮৮; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩৬২০; মু'জামুল কাবীর লিত তাবারানী, হা/২০১৬২।
📄 বালেগ হওয়ার লক্ষণসমূহ
১. স্বপ্নদোষ বা অন্য প্রকারে বীর্যপাত হওয়া।
২. নাভির নিচে মোটা লোম গজানো।
৩. ১৫ বছর বয়স হওয়া।
৪. বালিকাদের ক্ষেত্রে একটি লক্ষণ হলো মাসিক শুরু হওয়া। বালিকার মাসিকের রক্ত আসতে শুরু হলেই সে সাবালিকা; যদিও তার বয়স ১০ বছর হয়। যেসব ছেলেমেয়ের মধ্যে উপরোক্ত আলামতসমূহ দেখা দেবে, তাদেরকে অবশ্যই রোযা রাখতে হবে। কেননা ঐ সময় থেকে তাদের উপর শরীয়তের সকল আদেশ-নিষেধ পালন করা আবশ্যক হয়ে যায়। সুতরাং কোন কিশোর বা কিশোরী যদি রমাযান মাসে দিনের বেলায় প্রাপ্তবয়স্ক হয়, তাহলে তাকে দিনের অবশিষ্ট অংশ পানাহার থেকে বিরত থাকতে হবে। এ দিনের সাওম তার কাযা করতে হবে না। পিতা-মাতার কর্তব্য হলো, এ বিষয়ে সতর্ক থাকা ও সন্তানকে সচেতন করা। সাথে সাথে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তার উপর যেসকল ধর্মীয় দায়িত্ব-কর্তব্য আছে তা পালনে দিক-নির্দেশনা দেয়া এবং পাক-পবিত্রতা অর্জনের নিয়ম-নীতিগুলো সে জানে কি না বা মনে রাখতে পেরেছে কি না- সে বিষয়ে খেয়াল রাখা。
📄 পাগলের রোযার বিধান
যার জ্ঞান-বুদ্ধি লোপ পেয়েছে তাকে পাগল বলা হয়। পাগলের উপর রোযা রাখা অথবা রোযার পরিবর্তে দরিদ্রকে আহার করানো ওয়াজিব নয়। কেননা সে ভালো-মন্দের মাঝে পার্থক্য করতে পারে না। কেউ যদি কোন রোগ বা আঘাত ইত্যাদির কারণে বেহুঁশ বা অজ্ঞান হয়ে যায় তাহলে তার রোযা নষ্ট হয় না, যতক্ষণ না সে রোযা ভঙ্গের কোন কাজ করে। যেহেতু সে জ্ঞান থাকা অবস্থায় রোযার নিয়ত করেছে। জিনে ধরা রোগীরও এই বিধান। তবে এ ধরনের ব্যক্তি যখনই সুস্থ হয়ে যাবে তখনই সে সিয়াম পালন শুরু করে দেবে। কিন্তু যদি এমন হয় যে, দিনের কিছু অংশ সে সুস্থ এবং কিছু অংশ অসুস্থ থাকে, তাহলে সে যখনই সুস্থ হবে তখনই পানাহার থেকে বিরত থাকবে এবং উক্ত দিনের সিয়াম পূর্ণ করবে。
📄 মাসিক চলাকালে রোযার বিধান
হায়েয (মাসিক বা ঋতুস্রাব) ও নেফাসগ্রস্ত (সন্তান প্রসবোত্তর রক্ত প্রবাহিত হওয়া) মহিলারা হায়েয ও নেফাস চলাকালে রোযা রাখবে না। তারা পরে তাদের ছুটে যাওয়া রোযার কাযা আদায় করবে।
মুআযা (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আয়েশা (রাঃ) কে প্রশ্ন করলাম, ঋতুবতী মহিলা সাওম কাযা করবে এবং সালাত কাযা করবে না এটা কেমন কথা? তিনি বললেন, তুমি কি হারূরিয়্যা? আমি বললাম, আমি হারূরিয়্যা নই; বরং আমি (জানার জন্যই) জিজ্ঞেস করছি। আয়েশা (রাঃ) বললেন, আমাদের এরূপ হতো। তখন আমাদেরকে কেবল সাওম কাযা করার নির্দেশ দেয়া হতো, কিন্তু সালাত কাযা করার নির্দেশ দেয়া হতো না।
আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা যখন হায়েযগ্রস্ত হও তখন সালাত আদায় কর না এবং রোযাও রাখ না- এটা ঠিক নয় কি? আর এটাই হচ্ছে দ্বীনের ব্যাপারে কমতি। ঋতুবতী মহিলা যদি দিনের কোন এক সময়ে মাসিক থেকে পাক হয়ে যায়, তাহলে দিনের পরবর্তী অংশে সে খাওয়া-দাওয়া করতে পারবে এবং তার স্বামী যদি সফর থেকে আসে তবে মেলামেশাও করতে পারবে। যদি ঋতুবতী মহিলার ফজরের পূর্বে মাসিক বন্ধ হয়, তাহলে পরের দিন তাকে রোযা রাখতে হবে, যদিও সে সুবহে সাদিকের পূর্বে গোসল না করতে পারে। এমতাবস্থায় সে পরে গোসল করে নেবে।
মাসিক বন্ধ করে রোযা রাখা:
হায়েয মহিলাদের উপর আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত একটি বিষয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সময় কোন মহিলা কৃত্রিম উপায়ে মাসিক বন্ধ করে পূর্ণ মাস রোযা রাখতেন না। সুতরাং এরূপ করাটা নিন্দনীয়। তবে যদি কোন মহিলা ঔষধ ব্যবহার করে মাসিক বন্ধ রাখে এবং পুরো মাস একসাথে রোযা রাখে তবে তার রোযা শুদ্ধ হবে এবং পবিত্র থাকাবস্থায় যেসব হুকুম তার উপর প্রযোজ্য হয়, এ অবস্থায় তার উপর তাই প্রযোজ্য হবে।
টিকাঃ
২৪. সহীহ মুসলিম, হা/৭৮৯; নাসাঈ, হা/২৩১৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৫৯৯৩; মুস্তাখরাজে আবু আওয়ানা, হা/২৩২০; বায়হাকী, হা/৭৯০১; মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হা/১২৭৭; মিশকাত, হা/২০৩২।
২৫. সহীহ বুখারী, হা/১৯৫১; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/২০৪৫; মিশকাত, হা/১৯।
২৬. সহীহ ফিকহুস সুন্নাহ, ২ খণ্ড, পৃঃ ১১৫।