📘 সিয়াম ও যাকাত > 📄 রোযা না রাখার শাস্তি

📄 রোযা না রাখার শাস্তি


যদি কেউ অলসতা করে রোযা না রাখে তাহলে সে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হবে। হাদীসে এসেছে,
আবু উমামা বাহিলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আমি শুয়েছিলাম এমতাবস্থায় আমার নিকট দু'জন (ফেরেশতা) আসলেন। তারা আমার পার্শ্ব ধরে একটি পাহাড়ের নিকট নিয়ে গেলেন। তারা উভয়ে আমাকে বললেন, পাহাড়ে আরোহণ করুন। আমি বললাম, আমি এতে আরোহণ করতে পারব না। তারা বললেন, আমরা আপনার জন্য তা সহজ করে দেব। তখন আমি সেখানে আরোহণ করলাম, এমনকি আমি পাহাড়ের চূড়ায় পৌছে গেলাম। সেখানে আমি কঠিন চিৎকারের আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম এ আওয়াজ কিসের? তারা বললেন, এ হলো জাহান্নামীদের কান্নাকাটির আওয়াজ। অতঃপর তারা আমাকে নিয়ে সামনে চললেন, সেখানে আমি কিছু লোককে উল্টো ঝুলন্ত অবস্থায় দেখলাম, যাদের মুখ ফাঁটা এবং তা থেকে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা? তারা বললেন, এরা ঐ সব লোক, যারা রোযার দিন সময় হওয়ার আগেই ইফতার করে নিত। অর্থাৎ তারা যথা নিয়মে রোযা রাখত না। আশা করি নাফরমান বেরোযাদার মুসলিম সম্প্রদায় এই আযাবের কথা জেনে আল্লাহর নিকট তওবা করবে এবং আল্লাহর সেই আযাবকে ভয় করে যথা নিয়মে রোযা পালন করবে।

টিকাঃ
১৫. সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/১৯৮৬; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৭৪৯১; সুনানুল কুবরা লিন নাসাঈ, হা/৩২৭৩; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/১৫৬৮; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৩২৯৩।

📘 সিয়াম ও যাকাত > 📄 রোযার ফযীলত

📄 রোযার ফযীলত


রোযা রাখলে গোনাহ মাফ হয়:
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি রাসূল ﷺ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রমাযান মাসে রোযা রাখবে আল্লাহ তা'আলা তার পেছনের সকল গোনাহ ক্ষমা করে দেবেন।

রোযার বিনিময় আল্লাহ নিজ হাতে দিয়ে থাকেন:
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আদম সন্তানের প্রত্যেকটি নেক আমলের সওয়াব নিম্নে দশ গুণ হতে সাতশ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন, তবে রোযা ব্যতীত। কারণ রোযা আমার জন্যই হয়ে থাকে, তাই এর বদলা আমি নিজেই দেব। যেহেতু বান্দা আমার জন্যই তার কামনা-বাসনা ও খাওয়া-দাওয়া ত্যাগ করেছে। মূলত সকল ইবাদাতই আল্লাহর জন্য। তা সত্ত্বেও রোযাকে খাস করে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন "এটা আমার জন্য"। এর কারণ হলো, রোযা একটি গোপন ইবাদাত। অন্যান্য ইবাদাত পালনের সময় কিছু না কিছু বাহ্যিক কাঠামোর আশ্রয় নিতে হয়। যেমন- সালাত আদায় করার সময় ওঠা-বসা ও রুকু সিজদা করতে হয়। যাকাত আদায়ের সময় তা অপরকে দিতে হয়। হজ্জ করার সময় দীর্ঘ পথ সফর করতে হয়- এসব অন্য লোক দেখতে পায়; কিন্তু রোযার মধ্যে তা নেই। রোযা যদি কেউ রেখে থাকে তবে তা আল্লাহর জন্যই রাখবে। কারণ কেউ যদি রোযার সময় গোপনে কিছু খায় তবে কোন মানুষ তা দেখতে পায় না। এ কারণেই আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, রোযা আমার জন্যই হয়ে থাকে।
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেছেন “রোযার সওয়াব আমিই দেব”। বান্দা যেহেতু একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই রোযা রাখে, যার মধ্যে লোক দেখানো বা অহংকারের লেশমাত্র নেই, তাই আল্লাহ তা'আলা বান্দার প্রতি এতই সন্তুষ্ট হন যে, এ আমলের সওয়াব দেয়ার জন্য তিনি কোন মাধ্যম অবলম্বন করেন না, কোন পরিমাণের হিসাবও করেন না বরং তিনি নিজ হাতেই যত খুশি তত নেকী বান্দাকে দিয়ে থাকেন অথবা আল্লাহ তা'আলা নিজেই রোযার বদলা হয়ে যান। সুবহা-নাল্লাহ!

রোযাদারের জন্য দু'টি আনন্দ রয়েছে:
আবু হুরায়রা ও আবু সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তারা উভয়ে বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা বলেন, "সিয়াম আমারই জন্য এবং আমিই এর প্রতিফল দান করব।" সিয়াম পালনকারীর জন্য দু'টি আনন্দ রয়েছে। একটি হলো যখন সে ইফতার করে তখন আনন্দিত হয়, অপরটি হলো যখন সে মহান আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে তখন সে আনন্দিত হবে।
ইফতারের সময় আনন্দের কারণ হচ্ছে, বান্দা সারাদিন রোযা রাখার পর যখন ইফতার সামনে নিয়ে বসে আর দেখে যে, এখনই তার রোযা পূর্ণ হয়ে যাবে তখন সে নিজেকে ধন্য মনে করে এবং রোযার পুরস্কার পাওয়ার আশা করে। প্রতিটি ঘরে ইফতারীর আয়োজন হয়। একে অপরকে ইফতারী আদান-প্রদান করে। সবার মাঝে যেন আনন্দের হিল্লোল প্রবাহিত হতে থাকে। আবার সারাটি মাস রোযা রাখার পর যখন ঈদের দিনটি আসে তখন ঘরে-বাইরে সমগ্র মুসলিম জাতির মধ্যে এক আনন্দের স্রোত বইতে থাকে। নারী-পুরুষ, ধনী-গরীব, ছোট-বড় সকলের মুখে হাসির ঢেউ খেলতে থাকে। দ্বিতীয় আনন্দ হবে আখিরাতে। এটা পূর্ণাঙ্গ ও আসল আনন্দ। বান্দা যখন আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হবে এবং আল্লাহ তা'আলা বান্দাকে অগণিত পুরস্কার এবং বিশেষ মর্যাদা দেবেন তখনই সেই চরম আনন্দ লাভ হবে।

রোযাদারের মুখের গন্ধ মিল্কে আম্বরের সুগন্ধ :
আবু হুরায়রা ও আবু সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তারা উভয়ে বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, সে মহান সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের জীবন! নিশ্চয় সিয়াম পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহ তা'আলার কাছে মিল্কের সুগন্ধের চেয়েও তীব্র।
সারাদিন রোযা রাখার ফলে উপবাসজনিত কারণে রোযাদারের মুখে যে গন্ধ সৃষ্টি হয় সেটা আল্লাহর কাছে খুবই পবিত্র জিনিস। সুগন্ধকে মানুষ যেভাবে ভালোবাসে এবং কাছে টানে, রোযাদারকেও আল্লাহ তা'আলা সেভাবে ভালোবাসেন এবং রহমতের ছায়াতলে টেনে নেন।

রোযাদারদের জন্য জান্নাতের বিশেষ দরজা রয়েছে :
সাহল (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেছেন, জান্নাতের একটি বিশেষ দরজা রয়েছে যার নাম হলো রাইয়ান। কিয়ামতের দিন কেবল রোযাদাররাই এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে, তাদের ছাড়া অন্য কেউ সেখান দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না।
জান্নাতের বিভিন্ন স্তর ও দরজা রয়েছে এবং এগুলোর বিভিন্ন নাম রয়েছে, এর মধ্যে একটি দরজার নাম রাইয়ান। রাইয়ান অর্থ- পিপাসামুক্ত, রোযাদাররা দুনিয়াতে ক্ষুধা ও পিপাসা সহ্য করে রোযা রেখেছিল। আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে তাদেরকে পরিতৃপ্ত করবেন। তাই যেখানে তাদেরকে রাখা হবে তার নাম দেয়া হয়েছে রাইয়ান বা পিপাসামুক্ত। আল্লাহ তা'আলা জান্নাতবাসীদেরকে বলবেন, 'অতীতের দিনগুলোতে তোমরা যা প্রেরণ করেছিলে তার বিনিময়ে এখন তৃপ্তিসহকারে খাও এবং পান করো।' (সূরা হাক্কাহ- ২৪)

টিকাঃ
১৬. বুখারী, হা/২০১৪; মুসলিম, হা/১৮১৭।
১৭. সহীহ মুসলিম, হা/২৭৬৩; ইবনে মাজাহ, হা/১৬৩৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/৯৭১২: বায়হাকী, হা/৮১১৬; শারহুস সুন্নাহ, হা/১৭১০; মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হা/৮৯৮৭; জামেউস সগীর, হা/৮৬৬৭; মিশকাত, হা/১৯৫৯।
১৮. সহীহ মুসলিম, হা/২৭৬৪; নাসাঈ, হা/২২১৩; মুসনাদে আহমাদ, হা/৭১৭৪; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/১৯০০; মুসনাদে আবু ই'আলা, হা/১০০৫; জামেউস সগীর, হা/২৭৮৮; মুসনাদুল বাযযার, হা/৭৭২৩।
১৯. সহীহ মুসলিম, হা/২৭৬৪; নাসাঈ, হা/২২১৩; মুসনাদে আহমাদ, হা/৭১৭৪; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/১৯০০; মুসনাদে আবু ই'আলা, হা/১০০৫; জামেউস সগীর, হা/২৭৮৮; মুসনাদুল বাযযার, হা/৭৭২৩।
২০. সহীহ বুখারী, হা/১৮৯৬; সহীহ মুসলিম, হা/২৭৬৬; নাসাঈ, হা/২২৩৬; ইবনে মাজাহ, হা/১৬৪০; মুসনাদে আহমাদ, হা/২২৮৯৩; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/১৯০২; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩৪২০; মুসনাদে আবু ই'আলা, হা/৭৫২৯; মুস্তাখরাজে আবু আওয়ানা, হা/২১৬৬; মু'জামুল কাবীর লিত তাবারানী, হা/৫৬৮৭; বায়হাকী, হা/৭২৯৪; শারহুস সুন্নাহ, হা/১৭০৯; জামেউস সগীর, হা/৩৮৮৪।

📘 সিয়াম ও যাকাত > 📄 রোযার বিভিন্ন উপকারিতা

📄 রোযার বিভিন্ন উপকারিতা


• রোযার দ্বারা প্রবৃত্তির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।
• জৈবিক ও পাশবিক নেশা নিস্তেজ হয়।
• পশুস্বভাব দূরীভূত হয়।
• মনুষ্যত্ব জাগ্রত হয় এবং আল্লাহ তা'আলার প্রতি কৃতজ্ঞতায় অন্তর বিগলিত হয়।
• রোযা মানুষের জন্য ঢালস্বরূপ।
• রোযা মানুষকে শয়তানের আক্রমণ থেকে হেফাযত করে।
• রোযার দ্বারা শারীরিক সুস্থতা অর্জিত হয়।
• রোযার দ্বারা মানুষের অন্তরে তাকওয়ার গুণ সৃষ্টি হয়।
• মানুষের স্বভাবে বিনয় ও নম্রতা সৃষ্টি হয়।
• মানব মনে আল্লাহর মহত্ত্বের ধারণা জাগ্রত হয়।
• অন্তর্দৃষ্টি উন্মোচিত হয়।
• দূরদর্শিতা প্রখর হয়।
• মানুষের মধ্যে এক প্রকার রূহানী শক্তি সৃষ্টি হয়।
• মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও মমত্ববোধ এবং পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়।
• রোযা রাখা আল্লাহর প্রতি গভীর প্রেমের অন্যতম নিদর্শন। কেননা কারো প্রতি ভালোবাসা জন্মালে তাকে পাওয়ার জন্য প্রয়োজনে প্রেমিক পানাহার বর্জন করে এবং দুনিয়ার সবকিছুকে ভুলে যায়। ঠিক তেমনিভাবে রোযাদার ব্যক্তিও আল্লাহর প্রেমে সবকিছু ছেড়ে দেয়, এমনকি পানাহার পর্যন্ত ভুলে যায়। তাই রোযা আল্লাহ প্রেমের অন্যতম নিদর্শন।
• রোযা মানুষের জন্য রূহানী খাদ্যতুল্য। যারা দুনিয়াতে রোযা রাখবে না তারা পরকালে ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত থাকবে।
• রোযার দ্বারা আত্মার পরিশুদ্ধি এবং হৃদয়ের সজীবতা অর্জিত হয়। সর্বোপরি এর দ্বারা অন্তরাত্মায় হাসিল হয় প্রচুর প্রশান্তি এবং দূরীভূত হয় অস্থিরতা। পক্ষান্তরে পানাহারের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি ও অযথা গল্প-গুজব মানুষকে আল্লাহ তা'আলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে গোমরাহীতে লিপ্ত করে দেয়。

📘 সিয়াম ও যাকাত > 📄 বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে রোযার উপকারিতা

📄 বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে রোযার উপকারিতা


ইসলামের আদেশ-নিষেধ পালন করলে সওয়াব হয় এ কথা সবারই জানা; কিন্তু কেবল সওয়াবই নয়, ইসলামের প্রতিটি আদেশ-নিষেধ পালনের মধ্যে ব্যক্তি জীবন, সমাজ জীবন ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিহিত রয়েছে কল্যাণ ও উপকারিতা। এ বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞানের যুগে যুক্তি, তর্ক ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে দেখা গেছে যে, ইসলামের প্রতিটি বিধান নিঃসন্দেহে কল্যাণকর ও মঙ্গলজনক। রোযা তেমনি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী বিধান। পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, স্বাস্থ্য রক্ষার ক্ষেত্রে রোযা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। একটি যন্ত্র আবিষ্কারকারী জানেন যে, উক্ত যন্ত্র ঠিক রাখার জন্য ও ভালো সার্ভিস দেয়ার জন্য কোন্ সময় কী ব্যবস্থা নিতে হবে। একইভাবে মানব দেহের নির্মাতা স্বয়ং আল্লাহ তা'আলাই ভালো জানেন যে, শরীরকে সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম রাখার জন্য এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য কী ব্যবস্থা নিতে হবে। উক্ত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে তিনি বছরে একমাস রোযা রাখা ফরয করেছেন। বিভিন্ন প্রকার রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে রোযার যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। নিম্নে এ সংক্রান্ত কিছু আলোচনা তুলে ধরা হলো।

• উচ্চ রক্তচাপ: রোযা শরীরের রক্ত প্রবাহকে পরিশোধন করে থাকে এবং সমগ্র প্রবাহ প্রণালীকে নবরূপ দান করে থাকে। রোযা উচ্চ রক্তচাপজনিত ব্যাধি এবং অন্যান্য মারাত্মক ব্যাধি কমাতে সাহায্য করে।
• ডায়াবেটিস : গবেষণায় দেখা গেছে যে, রোযা রাখাতে ডায়াবেটিস রোগীদের অবস্থার উন্নতি হয়েছে, তাদের সুগার নিয়ন্ত্রণ হয়েছে। হৃদরোগীদের অস্থিরতা ও শ্বাসকষ্ট হ্রাস পেয়েছে।
• পাকস্থলীর রোগ ও আলসার : রোযার মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয় পাকস্থলীর রোগীরা। রোযা পেপটিক আলসার এবং তজ্জনিত পাকস্থলীর দাহ্যতা ও এর প্রদাহ তাড়াতাড়ি উপশম করে। পাকস্থলী একটি বৃহদাকার পেশী বিশেষ। শরীরের অন্যান্য পেশীর মতো এরও বিশ্রামের প্রয়োজন হয়। এক মাস রোযা রাখার ফলে পাকস্থলী ও অস্ত্র বিশ্রাম নেয়ার সুযোগ পায় তখনই তা ক্ষতস্থান বা আলসার নিরাময়ে লেগে যায় এবং পূর্বাবস্থা পুনরুদ্ধারে নিয়োজিত হয়। যারা মনে করেন যে, রোযা রাখলে পেটের ব্যথা বৃদ্ধি পায়, তাদের এ ধারণা সঠিক নয়। সতের জন রোযাদারের পেটের রস পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, যাদের পাকস্থলীতে এসিড খুব বেশি বা কম, রোযা রাখার ফলে তাদের উভয় দোষই সেরে গেছে।
• ধূমপান ত্যাগ : উচ্চ রক্তচাপ, ফুসফুসে ক্যান্সার ও হৃদরোগ থেকে বাঁচার জন্য ধূমপান ত্যাগ করা একান্ত অপরিহার্য। রোযা ধূমপান থেকে বিরত থাকার একটি সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয়।
• কিডনী ও মূত্রথলি : একমাস রোযা রাখার ফলে লিভার, কিডনী, ও মূত্রথলি প্রভৃতি অঙ্গসমূহ বিশ্রাম পায়। এতে অঙ্গগুলো বেশ উপকারিতা লাভ করে। কিডনী ও মূত্রথলির নানা উপসর্গ রোযার ফলে নিরাময় হবার সম্ভাবনা রয়েছে।
• ওজন কমানো : যারা বেশি মোটা এবং যাদের শরীরে মেদ থাকে রোযা রাখলে তাদের শরীরের চর্বি শরীরে ব্যবহৃত হয়ে শরীরে শক্তি যোগায় এবং দেহকে অস্বাভাবিক মোটা হতে বাধা দেয়। এতে শরীর ভালো থাকে এবং হার্ট এ্যাটাকের সম্ভাবনা হ্রাস পায় এবং শরীরের ওজন স্বাভাবিক হয়ে আসে।
• প্রজনন অঙ্গ : জৈবিক চাহিদাকে সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে রোযার প্রতিক্রিয়া অত্যধিক। নবী ﷺ বিবাহে অসমর্থ যুবকদেরকে বিবাহের অনুমতি না দিয়ে রোযা রাখার পরামর্শ দিতেন। ইসলামের বিধান হলো দারিদ্রতার কারণে বিবাহ করতে না পারলে রোযা রেখে মনকে পবিত্র রাখা।
• মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্র : রোযা মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রকে সর্বাধিক উজ্জীবিত করে। রোযা মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহ সবল করে। স্নায়ুবিক দুর্বলতা এবং মস্তিষ্কের অবসাদ দূর করে। যার ফলে মস্তিষ্ক অধিক শক্তি অর্জন করতে পারে। এতে ধ্যান-ধারণা পরিষ্কার হয়। সুদীর্ঘ অনুশীলন এবং গভীর ধ্যান করা সম্ভব হয়। জ্ঞানীগণ যথার্থই বলেছেন, “ক্ষুধার্ত উদর জ্ঞানের উৎস”।
Dr. Alex Heig বলেছেন, “রোযা হতে মানুষের মানসিক শক্তি এবং বিশেষ বিশেষ অনুভূতিগুলো উপকৃত হয়, স্মরণশক্তি বাড়ে, মনোসংযোগ ও যুক্তিশক্তি বর্ধিত হয়, প্রীতি, ভালোবাসা, সহানুভূতি এবং আধ্যাত্মিক শক্তির উন্মেষ ঘটে। ঘ্রাণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তি প্রভৃতি বেড়ে যায়। খাদ্যে অরুচি দূর হয়।”
• মানসিক শক্তি ও শান্তি : শারীরিক কতগুলো ব্যাধির উৎস হচ্ছে মানসিক অশান্তি। এ রোগগুলোকে বলা হয় সাইকোসোম্যাটিক ব্যাধি। মানুষ যদি রোযা রাখে তবে এসব ব্যাধির উপসর্গ কম হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কেননা রোযার মাধ্যমে মানুষের মানসিক শক্তি বৃদ্ধি পায়।
• মুখ ও দাঁত : রমাযান মাসে খাদ্য গ্রহণের মধ্যে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয় বিধায় মুখ ও দাঁতের যত্নেরও কিছুটা পরিবর্তন লক্ষণীয়। সাহারীর পর, সালাতের পূর্বে এবং রাত্রে ঘুমানোর আগে ভালো করে মেসওয়াক বা ব্রাশ দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করতে হবে। নিম গাছের ডাল দিয়ে মেসওয়াক করা উত্তম। মেসওয়াক করার সময় হাতের আঙ্গুল দিয়ে মাড়ি ম্যাসেজ করলে রক্তসঞ্চালন বৃদ্ধি পায়, এতে মাড়ি সুস্থ থাকে। সাহারীর পর দু'দাঁতের মধ্যখানে যেসব খাদ্যের কণা আটকে থাকে তা খিলাল দিয়ে পরিষ্কার করে নিতে হবে।
• ঘুম: ঘুম মানুষের জন্য অতি প্রয়োজনীয় জৈব প্রক্রিয়া। সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য এর প্রয়োজন অপরিসীম। নিদ্রা মানুষের দুশ্চিন্তাগুলোকে কমিয়ে এনে মানসিক প্রশান্তি দান করে। সেজন্য কুরআনে কয়েক জায়গায় ঘুমকে শান্তি ও আরামের উপায় বলা হয়েছে। যেমন: সূরা নাবার ৯ ও ১০ নং আয়াতে বলা হয়েছে- তোমাদের জন্য নিদ্রাকে করেছি বিশ্রাম এবং রাতকে করেছি আবরণ স্বরূপ। তবে মাত্রাতিরিক্ত ঘুম ভালো নয়। একজন সুস্থ মানুষ প্রতিদিন ৫-৬ ঘন্টা ঘুমাতে পারে। যারা বেশি ঘুমায় তাদের চেয়ে যারা কম ঘুমায় তারা অধিক পরিশ্রমী এবং কর্তব্যনিষ্ঠ। তারাই জীবনে সফলকাম হয়। রমাযান মাসে কম ঘুমানোর ট্রেনিংটা জীবনে সাফল্য বয়ে আনতে সাহায্য করে।

টিকাঃ
২১. সহীহ বুখারী, হা/৫০৬৫; সহীহ মুসলিম, হা/৩৪৬৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00