📄 রমাযানের রোযার গুরুত্ব
আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদের উপর যে কয়টি ইবাদাত ফরয করেছেন তার মধ্যে রোযা অন্যতম। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরয করে দেয়া হয়েছে, যেরকমভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরয করে দেয়া হয়েছিল। আশা করা যায়, এর মাধ্যমে তোমরা তাক্বওয়া অর্জন করতে পারবে।' (সূরা বাকারা- ১৮৩)
রোযা ইসলামের মূল ভিত্তিসমূহের একটি :
আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ইসলাম পাঁচটি ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। তা হলো: ১. এ কথার সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই এবং মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। ২. সালাত কায়েম করা। ৩. যাকাত আদায় করা। ৪. বাইতুল্লায় হজ্জ পালন করা। ৫. রমাযান মাসে রোযা রাখা।
যে ব্যক্তি রমাযান মাস পেয়েও তার গোনাহ ক্ষমা করাতে পারল না তার ব্যাপারে নবী ﷺ এর হাদীস:
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ঐ ব্যক্তির নাক ধূলায় ধূসরিত হোক, যার নিকট আমার নাম উল্লেখ করা হয় অথচ আমার উপর দরূদ পাঠ করে না। আর ঐ ব্যক্তির নাকও ধূলায় ধূসরিত হোক, যে ব্যক্তি রমাযান মাস পেল অথচ তার গোনাহ ক্ষমা হওয়ার আগেই রমাযান মাস শেষ হয়ে গেল। আর ঐ ব্যক্তির নাকও ধূলায় ধূসরিত হোক, যে ব্যক্তি তার পিতামাতাকে বৃদ্ধাবস্থায় পেল অথচ তারা তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারল না (অর্থাৎ তাদের খেদমত করে সে জান্নাত লাভ করতে পারল না)।
টিকাঃ
১২. সহীহ বুখারী, হা/৮; সহীহ মুসলিম, হা/১২২; তিরমিযী, হা/২৬০৯; নাসাঈ, হা/৫০০১; মুসনাদে আহমাদ, হা/৬০১৫; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩০৯।
১৩. তিরমিযী, হা/৩৫৪৫; মুসনাদে আহমাদ, হা/৭৪৪৪; মুসনাদুল বাযযার, হা/৮৩৬৫; জামেউস সগীর, হা/৫৮২৩; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/১৬৮০; শারহুস সুন্নাহ, হা/৬৮৯; মিশকাত, হা/৯২৬।
📄 যারা রোযা রাখে না তাদের বিধান কী হবে
যদি কেউ রোযা ফরয হওয়াকে অস্বীকার করে ও বলে যে, রোযা শরীয়তে ফরয নয়, তাহলে সে কাফির ও মুরতাদ। কারণ সে ইসলামের সর্বসম্মত একটি রুকন অস্বীকার করেছে। তার এই মুরতাদ হওয়ার ফলে একজন মুরতাদের মাল ও পরিবারের ব্যাপারে যে বিধান আছে তা কার্যকর হবে। সরকারের কাছে সে হত্যাযোগ্য অপরাধী বলে গণ্য হবে। তার গোসল, কাফন ও জানাযা হবে না এবং মুসলিমদের গোরস্থানে তাকে দাফনও করা যাবে না। অবশ্য যদি কেউ নওমুসলিম হওয়ার ফলে অথবা ইসলামী পরিবেশ ও উলামা থেকে দূরে থাকার ফলে না জেনে এ ধরনের কথা বলে থাকে তাহলে তার কথা ভিন্ন।
আর যদি কেউ অলসতা করে রোযা না রাখে তাহলে সে কবিরা গোনাহ করল। সারা বছরের রোযাও রমাযান মাসের একটি রোযার সমতুল্য হয় না: আবু হুরায়রা (রাঃ) নবী ﷺ হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি অসুস্থতা অথবা অন্য কোন ছাড় ব্যতীত রমাযান মাসের একটি রোযা ভঙ্গ করবে, তাহলে সে যদি পূর্ণ বৎসরও রোযা রাখে তবুও এটা তার কাফফারা হবে না।
টিকাঃ
১৪. সহীহ বুখারী, তা'লীক সূত্রে "যখন রমযান মাসে স্ত্রীর সাথে সহবাস করবে" নামক অধ্যায়; সুনানুল কুবরা লিন নাসাঈ, হা/৩২৬৫; মুসন্নাফে আবদুর রাযযাক, হা/৭৪৭৫।
📄 রোযা না রাখার শাস্তি
যদি কেউ অলসতা করে রোযা না রাখে তাহলে সে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হবে। হাদীসে এসেছে,
আবু উমামা বাহিলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আমি শুয়েছিলাম এমতাবস্থায় আমার নিকট দু'জন (ফেরেশতা) আসলেন। তারা আমার পার্শ্ব ধরে একটি পাহাড়ের নিকট নিয়ে গেলেন। তারা উভয়ে আমাকে বললেন, পাহাড়ে আরোহণ করুন। আমি বললাম, আমি এতে আরোহণ করতে পারব না। তারা বললেন, আমরা আপনার জন্য তা সহজ করে দেব। তখন আমি সেখানে আরোহণ করলাম, এমনকি আমি পাহাড়ের চূড়ায় পৌছে গেলাম। সেখানে আমি কঠিন চিৎকারের আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম এ আওয়াজ কিসের? তারা বললেন, এ হলো জাহান্নামীদের কান্নাকাটির আওয়াজ। অতঃপর তারা আমাকে নিয়ে সামনে চললেন, সেখানে আমি কিছু লোককে উল্টো ঝুলন্ত অবস্থায় দেখলাম, যাদের মুখ ফাঁটা এবং তা থেকে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা? তারা বললেন, এরা ঐ সব লোক, যারা রোযার দিন সময় হওয়ার আগেই ইফতার করে নিত। অর্থাৎ তারা যথা নিয়মে রোযা রাখত না। আশা করি নাফরমান বেরোযাদার মুসলিম সম্প্রদায় এই আযাবের কথা জেনে আল্লাহর নিকট তওবা করবে এবং আল্লাহর সেই আযাবকে ভয় করে যথা নিয়মে রোযা পালন করবে।
টিকাঃ
১৫. সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/১৯৮৬; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৭৪৯১; সুনানুল কুবরা লিন নাসাঈ, হা/৩২৭৩; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/১৫৬৮; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৩২৯৩।
📄 রোযার ফযীলত
রোযা রাখলে গোনাহ মাফ হয়:
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি রাসূল ﷺ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রমাযান মাসে রোযা রাখবে আল্লাহ তা'আলা তার পেছনের সকল গোনাহ ক্ষমা করে দেবেন।
রোযার বিনিময় আল্লাহ নিজ হাতে দিয়ে থাকেন:
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আদম সন্তানের প্রত্যেকটি নেক আমলের সওয়াব নিম্নে দশ গুণ হতে সাতশ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন, তবে রোযা ব্যতীত। কারণ রোযা আমার জন্যই হয়ে থাকে, তাই এর বদলা আমি নিজেই দেব। যেহেতু বান্দা আমার জন্যই তার কামনা-বাসনা ও খাওয়া-দাওয়া ত্যাগ করেছে। মূলত সকল ইবাদাতই আল্লাহর জন্য। তা সত্ত্বেও রোযাকে খাস করে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন "এটা আমার জন্য"। এর কারণ হলো, রোযা একটি গোপন ইবাদাত। অন্যান্য ইবাদাত পালনের সময় কিছু না কিছু বাহ্যিক কাঠামোর আশ্রয় নিতে হয়। যেমন- সালাত আদায় করার সময় ওঠা-বসা ও রুকু সিজদা করতে হয়। যাকাত আদায়ের সময় তা অপরকে দিতে হয়। হজ্জ করার সময় দীর্ঘ পথ সফর করতে হয়- এসব অন্য লোক দেখতে পায়; কিন্তু রোযার মধ্যে তা নেই। রোযা যদি কেউ রেখে থাকে তবে তা আল্লাহর জন্যই রাখবে। কারণ কেউ যদি রোযার সময় গোপনে কিছু খায় তবে কোন মানুষ তা দেখতে পায় না। এ কারণেই আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, রোযা আমার জন্যই হয়ে থাকে।
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেছেন “রোযার সওয়াব আমিই দেব”। বান্দা যেহেতু একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই রোযা রাখে, যার মধ্যে লোক দেখানো বা অহংকারের লেশমাত্র নেই, তাই আল্লাহ তা'আলা বান্দার প্রতি এতই সন্তুষ্ট হন যে, এ আমলের সওয়াব দেয়ার জন্য তিনি কোন মাধ্যম অবলম্বন করেন না, কোন পরিমাণের হিসাবও করেন না বরং তিনি নিজ হাতেই যত খুশি তত নেকী বান্দাকে দিয়ে থাকেন অথবা আল্লাহ তা'আলা নিজেই রোযার বদলা হয়ে যান। সুবহা-নাল্লাহ!
রোযাদারের জন্য দু'টি আনন্দ রয়েছে:
আবু হুরায়রা ও আবু সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তারা উভয়ে বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা বলেন, "সিয়াম আমারই জন্য এবং আমিই এর প্রতিফল দান করব।" সিয়াম পালনকারীর জন্য দু'টি আনন্দ রয়েছে। একটি হলো যখন সে ইফতার করে তখন আনন্দিত হয়, অপরটি হলো যখন সে মহান আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে তখন সে আনন্দিত হবে।
ইফতারের সময় আনন্দের কারণ হচ্ছে, বান্দা সারাদিন রোযা রাখার পর যখন ইফতার সামনে নিয়ে বসে আর দেখে যে, এখনই তার রোযা পূর্ণ হয়ে যাবে তখন সে নিজেকে ধন্য মনে করে এবং রোযার পুরস্কার পাওয়ার আশা করে। প্রতিটি ঘরে ইফতারীর আয়োজন হয়। একে অপরকে ইফতারী আদান-প্রদান করে। সবার মাঝে যেন আনন্দের হিল্লোল প্রবাহিত হতে থাকে। আবার সারাটি মাস রোযা রাখার পর যখন ঈদের দিনটি আসে তখন ঘরে-বাইরে সমগ্র মুসলিম জাতির মধ্যে এক আনন্দের স্রোত বইতে থাকে। নারী-পুরুষ, ধনী-গরীব, ছোট-বড় সকলের মুখে হাসির ঢেউ খেলতে থাকে। দ্বিতীয় আনন্দ হবে আখিরাতে। এটা পূর্ণাঙ্গ ও আসল আনন্দ। বান্দা যখন আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হবে এবং আল্লাহ তা'আলা বান্দাকে অগণিত পুরস্কার এবং বিশেষ মর্যাদা দেবেন তখনই সেই চরম আনন্দ লাভ হবে।
রোযাদারের মুখের গন্ধ মিল্কে আম্বরের সুগন্ধ :
আবু হুরায়রা ও আবু সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তারা উভয়ে বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, সে মহান সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের জীবন! নিশ্চয় সিয়াম পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহ তা'আলার কাছে মিল্কের সুগন্ধের চেয়েও তীব্র।
সারাদিন রোযা রাখার ফলে উপবাসজনিত কারণে রোযাদারের মুখে যে গন্ধ সৃষ্টি হয় সেটা আল্লাহর কাছে খুবই পবিত্র জিনিস। সুগন্ধকে মানুষ যেভাবে ভালোবাসে এবং কাছে টানে, রোযাদারকেও আল্লাহ তা'আলা সেভাবে ভালোবাসেন এবং রহমতের ছায়াতলে টেনে নেন।
রোযাদারদের জন্য জান্নাতের বিশেষ দরজা রয়েছে :
সাহল (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেছেন, জান্নাতের একটি বিশেষ দরজা রয়েছে যার নাম হলো রাইয়ান। কিয়ামতের দিন কেবল রোযাদাররাই এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে, তাদের ছাড়া অন্য কেউ সেখান দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না।
জান্নাতের বিভিন্ন স্তর ও দরজা রয়েছে এবং এগুলোর বিভিন্ন নাম রয়েছে, এর মধ্যে একটি দরজার নাম রাইয়ান। রাইয়ান অর্থ- পিপাসামুক্ত, রোযাদাররা দুনিয়াতে ক্ষুধা ও পিপাসা সহ্য করে রোযা রেখেছিল। আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে তাদেরকে পরিতৃপ্ত করবেন। তাই যেখানে তাদেরকে রাখা হবে তার নাম দেয়া হয়েছে রাইয়ান বা পিপাসামুক্ত। আল্লাহ তা'আলা জান্নাতবাসীদেরকে বলবেন, 'অতীতের দিনগুলোতে তোমরা যা প্রেরণ করেছিলে তার বিনিময়ে এখন তৃপ্তিসহকারে খাও এবং পান করো।' (সূরা হাক্কাহ- ২৪)
টিকাঃ
১৬. বুখারী, হা/২০১৪; মুসলিম, হা/১৮১৭।
১৭. সহীহ মুসলিম, হা/২৭৬৩; ইবনে মাজাহ, হা/১৬৩৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/৯৭১২: বায়হাকী, হা/৮১১৬; শারহুস সুন্নাহ, হা/১৭১০; মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হা/৮৯৮৭; জামেউস সগীর, হা/৮৬৬৭; মিশকাত, হা/১৯৫৯।
১৮. সহীহ মুসলিম, হা/২৭৬৪; নাসাঈ, হা/২২১৩; মুসনাদে আহমাদ, হা/৭১৭৪; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/১৯০০; মুসনাদে আবু ই'আলা, হা/১০০৫; জামেউস সগীর, হা/২৭৮৮; মুসনাদুল বাযযার, হা/৭৭২৩।
১৯. সহীহ মুসলিম, হা/২৭৬৪; নাসাঈ, হা/২২১৩; মুসনাদে আহমাদ, হা/৭১৭৪; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/১৯০০; মুসনাদে আবু ই'আলা, হা/১০০৫; জামেউস সগীর, হা/২৭৮৮; মুসনাদুল বাযযার, হা/৭৭২৩।
২০. সহীহ বুখারী, হা/১৮৯৬; সহীহ মুসলিম, হা/২৭৬৬; নাসাঈ, হা/২২৩৬; ইবনে মাজাহ, হা/১৬৪০; মুসনাদে আহমাদ, হা/২২৮৯৩; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/১৯০২; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩৪২০; মুসনাদে আবু ই'আলা, হা/৭৫২৯; মুস্তাখরাজে আবু আওয়ানা, হা/২১৬৬; মু'জামুল কাবীর লিত তাবারানী, হা/৫৬৮৭; বায়হাকী, হা/৭২৯৪; শারহুস সুন্নাহ, হা/১৭০৯; জামেউস সগীর, হা/৩৮৮৪।