📄 রমাযানের চাঁদ
মহান আল্লাহ চাঁদকে মানুষের জন্য সময় নির্দেশক হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। এর দ্বারা মানুষ নিজেদের ইবাদাত ও অন্যান্য বিষয়ের সময় ও তারিখ নির্ধারণ করে থাকে। সুতরাং বান্দার প্রতি আল্লাহর খাস রহমত এই যে, তিনি ফরয রোযা শুরু হওয়ার বিষয়টি এমন একটি স্পষ্ট চিহ্নের উপর নির্ভরশীল করেছেন, যা সবার সামনে প্রকাশ পায়। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'লোকেরা আপনাকে নতুন চাঁদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আপনি বলুন! তা হলো মানুষ ও হজ্জের জন্য সময় নির্দেশক।' (সূরা বাকারা- ১৮৯)
• চাঁদ দেখে রোযা রাখতে হবে :
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ বলেছেন, তোমরা চাঁদ দেখে সাওম শুরু করো আবার চাঁদ দেখে ইফতার (ঈদুল ফেতর) করো। যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয় তাহলে শা'বান মাস ত্রিশ দিন পূর্ণ করো। তারপর সিয়াম শুরু করো।
• চাঁদ দেখা না গেলে রমাযান প্রবেশ হওয়া প্রমাণ করার উপায় হলো, শা'বান মাসকে ৩০ দিন পূর্ণ করে নেয়া। অবশ্য এ জন্য শা'বান মাসের শুরুর হিসাব রাখতে হবে।
• পূর্ব সতর্কতামূলকভাবে রমাযানের এক দিন আগে থেকে রোযা রাখা বৈধ নয়। আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেছেন, তোমাদের কেউ যেন রমাযানের আগে একটি বা দু'টি রোযা না করে। তবে তার কথা ভিন্ন, যে সেদিনে রোযা রাখায় অভ্যস্ত। যেমন- কেউ প্রতি সোমবার রোযা রাখে, এখন রমাযানের আগের দিন সোমবার হলে সে রোযা রাখতে পারে।
টিকাঃ
৮. সহীহ বুখারী, হা/১৯০৮; সহীহ মুসলিম, হা/২৫৬৮; তিরমিযী, হা/৬৮৪; নাসাঈ, হা/২১১৭; ইবনে মাজাহ, হা/১৬৫৪; মুসনাদে আহমাদ, হা/৯৪৫৩; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩৪৫৯; মুসনাদে দারেমী, হা/১৭২৭; মিশকাত, হা/১৯৭০।
৯. সহীহ বুখারী, হা/১৭১৪; সহীহ মুসলিম, হা/২৫৭০; মুসনাদে আহমাদ, হা/৯২৭২; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩৫৯২; মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হা/৭৩১৫; মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হা/৯১২৯; শারহুস সুন্নাহ, হা/১৭১৮; বায়হাকী, হা/৭৭৩১; মিশকাত, হা/১৯৭৩।
📄 মাসের উপস্থিতি কীভাবে প্রমাণিত হবে
মাস প্রমাণিত হবে নতুন চাঁদ দেখা বা তার সংবাদ শোনার মাধ্যমে। তাফসীরে রুহুল মা'আনীতে আল্লামা আলুসী (রহ.) লিখেছেন যে, 'যে এই মাসে উপস্থিত হলো এবং সে মুসাফির নয় তাহলে তাকে সাওম রাখতে হবে। অথবা যে ব্যক্তি পবিত্র রমাযান মাসের নতুন চাঁদ উদয়ের সংবাদ পেল এবং সংবাদটি তার কাছে বিশ্বাসযোগ্য হলো তার উপরেই সাওম রাখা ফরয।'
রোযা ওয়াজিব হওয়ার জন্য প্রত্যেক মুসলিমকে চাঁদ দেখা শর্ত নয়; কিছু সংখ্যক লোক চাঁদ দেখলে, বরং সঠিক মতে নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত একজন ব্যক্তি দেখলেই তার দেখা মতে সকলের জন্য রোযা রাখা জরুরি হয়ে যাবে। হাদীসে এসেছে, আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, কিছু সংখ্যক মানুষ (রমাযানের) নতুন চাঁদ দেখল। আমি রাসূল ﷺ -কে সংবাদ দিলাম যে, আমিও উক্ত চাঁদ দেখেছি। ফলে রাসূল ﷺ নিজে সাওম রাখলেন এবং মানুষকেও সাওম রাখতে নির্দেশ দিলেন।
চাঁদ দিয়ে যেই মাস হিসেব করা হয় তাকে বলা হয় চন্দ্রমাস। চন্দ্রমাস ২৯/৩০ দিনে হয়ে থাকে। তাই ৩৫৪ দিনে এক চন্দ্রবৎসর হয়। এজন্য রমাযান মাস ৩৩ বৎসরে সকল মৌসুমে একবার ঘুরে আসে। পৃথিবীর কোথাও নতুন চাঁদ দেখা গেলে অথবা নতুন চাঁদ উদিত হওয়ার সংবাদ পেলে অথবা শা'বান মাসের ৩০ দিন পূর্ণ হয়ে গেলে সিয়াম পালন আরম্ভ করবে। আবার যখন শাওয়াল মাসের নতুন চাঁদ দেখবে অথবা নতুন চাঁদ উদিত হওয়ার সংবাদ পাবে অথবা রমাযান মাসের ৩০ দিন পূর্ণ হয়ে যাবে তখন সিয়াম পালন থেকে বিরত থাকবে।
টিকাঃ
১০. তাফসীরে রুহুল মা'আনী সূরা বাকারার ১৮৫ নং আয়াতের তাফসীর দ্রষ্টব্যঃ।
১১. আবু দাউদ, হা/২৩৪৪; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩৪৪৭; মু'জামুল কাবীর লিত তাবারানী, হা/৪৮১; বায়হাকী, হা/৭৭৬৭; মিশকাত, হা/১৯৭৯।
📄 রমাযানের রোযার গুরুত্ব
আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদের উপর যে কয়টি ইবাদাত ফরয করেছেন তার মধ্যে রোযা অন্যতম। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরয করে দেয়া হয়েছে, যেরকমভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরয করে দেয়া হয়েছিল। আশা করা যায়, এর মাধ্যমে তোমরা তাক্বওয়া অর্জন করতে পারবে।' (সূরা বাকারা- ১৮৩)
রোযা ইসলামের মূল ভিত্তিসমূহের একটি :
আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ইসলাম পাঁচটি ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। তা হলো: ১. এ কথার সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই এবং মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। ২. সালাত কায়েম করা। ৩. যাকাত আদায় করা। ৪. বাইতুল্লায় হজ্জ পালন করা। ৫. রমাযান মাসে রোযা রাখা।
যে ব্যক্তি রমাযান মাস পেয়েও তার গোনাহ ক্ষমা করাতে পারল না তার ব্যাপারে নবী ﷺ এর হাদীস:
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ঐ ব্যক্তির নাক ধূলায় ধূসরিত হোক, যার নিকট আমার নাম উল্লেখ করা হয় অথচ আমার উপর দরূদ পাঠ করে না। আর ঐ ব্যক্তির নাকও ধূলায় ধূসরিত হোক, যে ব্যক্তি রমাযান মাস পেল অথচ তার গোনাহ ক্ষমা হওয়ার আগেই রমাযান মাস শেষ হয়ে গেল। আর ঐ ব্যক্তির নাকও ধূলায় ধূসরিত হোক, যে ব্যক্তি তার পিতামাতাকে বৃদ্ধাবস্থায় পেল অথচ তারা তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারল না (অর্থাৎ তাদের খেদমত করে সে জান্নাত লাভ করতে পারল না)।
টিকাঃ
১২. সহীহ বুখারী, হা/৮; সহীহ মুসলিম, হা/১২২; তিরমিযী, হা/২৬০৯; নাসাঈ, হা/৫০০১; মুসনাদে আহমাদ, হা/৬০১৫; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩০৯।
১৩. তিরমিযী, হা/৩৫৪৫; মুসনাদে আহমাদ, হা/৭৪৪৪; মুসনাদুল বাযযার, হা/৮৩৬৫; জামেউস সগীর, হা/৫৮২৩; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/১৬৮০; শারহুস সুন্নাহ, হা/৬৮৯; মিশকাত, হা/৯২৬।
📄 যারা রোযা রাখে না তাদের বিধান কী হবে
যদি কেউ রোযা ফরয হওয়াকে অস্বীকার করে ও বলে যে, রোযা শরীয়তে ফরয নয়, তাহলে সে কাফির ও মুরতাদ। কারণ সে ইসলামের সর্বসম্মত একটি রুকন অস্বীকার করেছে। তার এই মুরতাদ হওয়ার ফলে একজন মুরতাদের মাল ও পরিবারের ব্যাপারে যে বিধান আছে তা কার্যকর হবে। সরকারের কাছে সে হত্যাযোগ্য অপরাধী বলে গণ্য হবে। তার গোসল, কাফন ও জানাযা হবে না এবং মুসলিমদের গোরস্থানে তাকে দাফনও করা যাবে না। অবশ্য যদি কেউ নওমুসলিম হওয়ার ফলে অথবা ইসলামী পরিবেশ ও উলামা থেকে দূরে থাকার ফলে না জেনে এ ধরনের কথা বলে থাকে তাহলে তার কথা ভিন্ন।
আর যদি কেউ অলসতা করে রোযা না রাখে তাহলে সে কবিরা গোনাহ করল। সারা বছরের রোযাও রমাযান মাসের একটি রোযার সমতুল্য হয় না: আবু হুরায়রা (রাঃ) নবী ﷺ হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি অসুস্থতা অথবা অন্য কোন ছাড় ব্যতীত রমাযান মাসের একটি রোযা ভঙ্গ করবে, তাহলে সে যদি পূর্ণ বৎসরও রোযা রাখে তবুও এটা তার কাফফারা হবে না।
টিকাঃ
১৪. সহীহ বুখারী, তা'লীক সূত্রে "যখন রমযান মাসে স্ত্রীর সাথে সহবাস করবে" নামক অধ্যায়; সুনানুল কুবরা লিন নাসাঈ, হা/৩২৬৫; মুসন্নাফে আবদুর রাযযাক, হা/৭৪৭৫।