📄 রমাযান মাসের গুরুত্ব ও ফযীলত
রমাযান মাস অন্যান্য মাস থেকে বিশেষ গুরুত্বের দাবীদার। কেননা রমাযান মাস সম্পর্কে কুরআন ও হাদীসে যত আলোচনা এসেছে অন্য কোন মাস সম্পর্কে ততটা আসেনি। রমাযান মাস নিয়ে যতবেশি চিন্তা-গবেষণা ও লেখা-লেখি করা হয় অন্য কোন মাস নিয়ে ততটা হয় না। প্রতি বছর রমাযান আসে- রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের বার্তা নিয়ে। রমাযান মাস যখন ঘনিয়ে আসে তখন মুমিনের হৃদয়ে বিরাজ করে চরম আনন্দ। রমাযানকে পাওয়ার আশায় সবাই থাকে অপেক্ষমান। কী টান! কী আকর্ষণ! এ মাসের জন্য। এর কারণ হচ্ছে রমাযান কুরআনের মাস, দু'আ কবুলের মাস, জীবনের গোনাহসমূহ থেকে মুক্তি পাওয়ার মাস, বেশি বেশি নেকী অর্জন করার মাস।
রমাযানের এত মর্যাদা কেন?
যেসব কারণে রমাযানের ফযীলত বেড়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হলো, এ মাসেই আল্লাহ তা'আলা কুরআন মাজীদ নাযিল করেছেন। বিশ্বের মানুষ যখন অজ্ঞতার অন্ধকারে দিশেহারা হয়ে গিয়েছিল, বর্বরতার ভয়াল থাবায় মানুষ যখন অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিল, ঠিক এমনই মুহূর্তে এসব ভ্রান্ত জাতিকে সত্যের মশাল দেখানোর জন্য আল্লাহ তা'আলা মানুষের প্রতি দয়া পরবশ হয়ে মহাগ্রন্থ আল-কুরআন নাযিল করেন, যা ছিল বিশ্বনবী মুহাম্মাদ ﷺ এর জন্য চিরস্থায়ী মু'জিযা। এর মাধ্যমে তিনি অসভ্য ও বর্বর জাতির মধ্য থেকে এমন একদল মর্দে মুজাহিদ তৈরি করেছিলেন, যাঁরা সত্য ও ন্যায়ের পথে নিজেদের জীবন পর্যন্ত বিলিয়ে দিতেও কুণ্ঠাবোধ করতেন না। এ কুরআন দিয়ে তিনি একটি ঐতিহাসিক বিপ্লব সাধন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। যে রাতে মহাগ্রন্থ আল-কুরআন নাযিল শুরু হলো সেই রাতটি হাজার মাস থেকেও উত্তম ও মর্যাদাপূর্ণ। আর সেই রাতটি রমাযান মাসে হওয়াতে পুরো মাসটাই ফযীলতপূর্ণ হলো। এদিকে ইঙ্গিত করেই আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, 'রমাযান তো সেই মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে।' (সূরা বাকারা- ১৮৫)
রমাযান মাসের বহুমুখী কল্যাণ :
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যখন রমাযান মাস আরম্ভ হয় তখন আকাশের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয়; আর শয়তানদেরকে শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে রাখা হয়।
অত্র হাদীসে মুমিনদেরকে তিনটি সুসংবাদ প্রদান করা হয়েছে। তা হলো-
১। রমাযান মাসের বিশেষ মর্যাদার কারণে আকাশের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়। অপর বর্ণনায় এসেছে, রহমতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়। এ মাসে যেহেতু অজস্রধারায় রহীম ও রহমান আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত নাযিল হতে থাকে এবং রহমতের ফেরেশতারা অবিরাম আসা-যাওয়া করে; মূলত এজন্যই এ ব্যবস্থা করা হয়েছে। হাদীসের অপর বর্ণনায় এসেছে, এ মাসে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়। কারণ মানুষ এ মাসে বেশি বেশি নেক আমল করে এবং প্রতিটি আমলের জন্য অতিরিক্ত সওয়াব অর্জন করতে সক্ষম হয়, যার ফলে সে জান্নাতের উপযুক্ত হয় এবং জান্নাতের কাছাকাছি চলে যায়।
২। এ মাসে জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয়। কারণ এ সময় মানুষ অন্য মাসের চেয়ে কম খারাপ কাজ করে, যার ফলে জাহান্নাম থেকে সে দূরে থাকার সুযোগ পায়।
৩। এ মাসে দুষ্ট শয়তানকে বেঁধে রাখা হয়। এজন্য শয়তানী কার্যকলাপ কম হয়। তবে এ মাসে শয়তানকে বেঁধে রাখা হলেও অনেকেই গোনাহের কাজ করে থাকে। এর কারণ হচ্ছে,
• মানুষের নফসে আম্মারা তথা কুপ্রবৃত্তি তাকে পাপের দিকে আকৃষ্ট করে।
• শয়তান যাকে ১১ মাস কুমন্ত্রণা দিতে পারে তাকে একমাস কুমন্ত্রণা না দিলেও সে পাপকাজ করে যায়। কারণ সারা বছর শয়তানের কাজ করলে শয়তানী কাজ অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। এজন্য একমাস শয়তান শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকলেও পূর্বের অভ্যাসের কারণে মানুষ পাপকাজ করে থাকে।
রমাযান বরকতের মাস :
রমাযান মাস বরকতের মাস। এ মাসে আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রিয় বান্দাদের প্রতি অনেক বরকত নাযিল করে থাকেন। যেমন-
১। এ মাসে আল্লাহ তা'আলা মুমিনের রিযিক বৃদ্ধি করে দেন। ফলে অন্যান্য মাসের তুলনায় এ মাসে ব্যবসা-বাণিজ্য ও খাওয়া-দাওয়ায় তাদের মধ্যে অনেক স্বচ্ছলতা লক্ষ্য করা যায়।
২। এ মাসে আল্লাহ তা'আলা শারীরিক শক্তির ক্ষেত্রেও বরকত দান করে থাকেন। ফলে আমাদের পক্ষে অন্যান্য মাসের তুলনায় এ মাসে সারা দিন না খেয়ে থাকাটা অনেক সহজ মনে হয় এবং কষ্টও কম হয়। তাছাড়া অন্যান্য মাসের তুলনায় আমরা খুব কমই অসুস্থতা বোধ করে থাকি।
৩। এ মাসে আল্লাহ তা'আলা বান্দার ইবাদাতেও বরকত দান করে থাকেন। ফলে আমাদের জন্য অন্যান্য মাসের তুলনায় এ মাসে অধিক হারে ইবাদাত করার সুযোগ লাভ হয়।
৪। এ মাসে আল্লাহ তা'আলা বান্দাকে সওয়াব প্রদানের ক্ষেত্রেও প্রচুর বরকত দান করে থাকেন। অন্যান্য মাসে আল্লাহ তা'আলা বান্দাকে ইবাদাতের প্রতিদানস্বরূপ যদি একটি নেকী প্রদান করে থাকেন, তাহলে এই মাসে উক্ত ইবাদাতের কারণে অনেক বেশি নেকী প্রদান করে থাকেন। এরপরেও আরো বিশেষ কিছু ইবাদাতের জন্য বিশেষ সওয়াব তো রয়েছেই। যেমন- লাইলাতুল কদর, উমরা পালন করা ইত্যাদি।
রমাযান ধৈর্যের মাস :
রমাযান আমাদেরকে সবরের (ধৈর্যের) প্রশিক্ষণ দেয়। ভোর থেকে নিয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত সারাদিন খানা-পিনা ও মনের চাহিদা পূরণ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে মুমিন এক চরম ধৈর্য পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। আর ধৈর্য মুমিনের জন্য এমন একটি গুণ, যার প্রতিদান হলো জান্নাত। এ মর্মে আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'সবরকারীদেরকে অগণিত পুরস্কার প্রদান করা হবে।' (সূরা যুমার- ১০)
রমাযান সাম্য ও সমতার মাস :
রমাযান মুসলিম মিল্লাতের মধ্যে সাম্যের হাওয়া বয়ে আনে। সাদা-কালো, ধনী-গরীব, রাজা-প্রজা, সকলকে এক ও একাকার করে দেয়। যারা সর্বদা ভোগ-বিলাসের মধ্যে থাকে তাদেরকেও ঐ সকল লোকদের সাথে শামিল হতে হয়, যারা সকালে খেলে দুপুরে খেতে পায় না। যত বড় রাজা-বাদশাহ-ই হোক না কেন এমনটি কখনো হয় না যে, তার জন্য সাহারীর সময় একটু পেছানোর সুযোগ থাকে অথবা নির্দিষ্ট সময়ের একটু আগে তাকে ইফতারের সুযোগ দেয়া হয়; বরং সকলকে একই সময়ে খাওয়া বন্ধ করতে হয় আবার একই সময়ে খাওয়া শুরু করতে হয়, আবার তারাবীর সালাতে গিয়ে সবাইকে একই কাতারে দাঁড়াতে হয়। এটা সাম্যের এক জ্বলন্ত উদাহরণ।
রমাযান রহমত ও মাগফিরাতের মাস :
আল্লাহ তা'আলার একটি নাম হচ্ছে 'রহমান' তথা অতি দয়ালু। আর আরেকটি নাম হচ্ছে, 'গাফুর' তথা ক্ষমাশীল। আল্লাহ তা'আলা রমাযান মাসে তার এ দুটি নামের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন ঘটান। একদিকে তিনি এ মাসে বান্দাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করে তাদের নেক আমলের সওয়াব বহু গুণে বাড়িয়ে দেন। আর অপরদিকে তিনি তাওবাকারী বান্দাদের গোনাহসমূহ ক্ষমা করে দিয়ে, তাদেরকে জাহান্নামের কঠিন শাস্তি থেকে মুক্তি দান করেন।
রমাযান দু'আ কবুলের মাস :
আল্লাহ তা'আলা সিয়াম পালনকারীর দু'আ কবুল করেন। সূরা বাকারায় রমাযান সংক্রান্ত আলোচনার মধ্যে আল্লাহ তা'আলা বলেন, '(হে নবী!) আমার বান্দারা যখন আমার সম্পর্কে তোমার কাছে জানতে চায় তখন তুমি জানিয়ে দাও যে, আমি একেবারেই নিকটে। কোন প্রার্থনাকারী যখন আমাকে ডাকে তখন আমি তার দু'আ কবুল করি। সুতরাং তারা যেন আমার কথা মেনে চলে এবং আমার প্রতি বিশ্বাস রাখে, যাতে তারা সৎপথ পেতে পারে।' (সূরা বাকারা- ১৮৬)
তাছাড়া হাদীসে এসেছে, আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তিন শ্রেণির লোকের দু'আ ফেরত দেয়া হয় না, ১. রোযাদারের দু'আ, ২. মাযলুম ব্যক্তির দু'আ এবং ৩. মুসাফিরের দু'আ।' এ থেকে বুঝা যায় যে, রমাযান মাসে দু'আ কবুলের বিশেষ সুযোগ রয়েছে।
টিকাঃ
২. সহীহ বুখারী, হা/১৮০০; সহীহ মুসলিম, হা/২৫৪৮; নাসাঈ, হা/২০৯৯; মুসনাদে আহমাদ, হা/৭৭৬৭; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩৪৩৪; মুস্তাখরাজে আবু আওয়ানা, হা/২১৭২; বায়হাকী, হা/৮২৮৩; মুসনাদুল বাযযার, হা/৯২৫২; মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হা/৮৩৮৪; মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হা/৮৯৬১; মিশকাত, হা/১৯৫২।
৩. দু'আউ লিত তাবারানী, হা/১৩১৩; জামেউস সগীর, হা/৫৩৪১; মুসনাদুল বাযযার, হা/৮১৪৮।
📄 রোযার সংজ্ঞা
রোযা ফারসী শব্দ। কুরআন ও হাদীসের ভাষায় রোযাকে সাওম বলে। সাওম বা সিয়াম উভয়টিই মাসদার তথা ক্রিয়ামূল। আভিধানিক অর্থে সাওম শব্দের অর্থ হলো, বিরত থাকা। আর ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায়- আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে সুবহে সাদিক হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খানা-পিনা, যৌন সম্ভোগ ও রোযা ভঙ্গকারী যাবতীয় কার্যাবলি হতে বিরত থাকাকে সাওম বা রোযা বলা হয়。
📄 রোযার অতীত ও বর্তমান ইতিহাস
★ প্রাচীন যুগ থেকে নিয়ে মুহাম্মাদ ﷺ পর্যন্ত সকল নবীদের শরীয়তে রোযার বিধান ছিল। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে, যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, এর মাধ্যমে হয়ত তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারবে।' (সূরা বাকারা- ১৮৩) অবশ্য রোযার হুকুম-আহকাম, রোযার সংখ্যা ইত্যাদি বিভিন্ন নবীর শরীয়তে বিভিন্ন রকম ছিল।
★ মূসা (আঃ) ও তাঁর উম্মতরা আশুরার দিন রোযা রাখতেন:
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ যখন হিজরত করে মদিনায় আগমন করেন, তখন তিনি ইয়াহুদিদেরকে আশুরার রোযা রাখা অবস্থায় পেলেন। তখন তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, এটা কিসের রোযা? তারা বলল, এটি একটি মহান দিন। এ দিন আল্লাহ তা'আলা মূসা (আঃ) ও বনী ইসরাঈলকে ফিরাউনের উপর বিজয় দান করেছিলেন। ফলে আমরা এর সম্মানস্বরূপ এ দিনে রোযা রেখে থাকি। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, মূসা (আঃ) এর বিষয়ে তোমাদের থেকে আমরাই বেশি প্রাধান্য পাওয়ার যোগ্য। তারপর তিনি এ দিনে রোযা রাখার জন্য নির্দেশ প্রদান করেন।
• দাউদ (আঃ) অর্ধেক বছর রোযা রাখতেন :
আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ বলেছেন, আল্লাহর নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় রোযা হলো দাউদ (আঃ) এর রোযা। তিনি একদিন রোযা রাখতেন এবং একদিন ইফতার করতেন। অর্থাৎ তিনি বছরের অর্ধেক দিন রোযা রাখতেন।
টিকাঃ
৪. সহীহ বুখারী, হা/৩৯৪৩; আবু দাউদ, হা/২৪৪৭; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/২০৮৪; মুস্তাখরাজে আবু আওয়ানা, হা/২৩৭৭; বায়হাকী, হা/৭১৯৮; শারহুস সুন্নাহ, হা/১৭৮২।
৫. সহীহ বুখারী, হা/৩৪২০; সহীহ মুসলিম, হা/২৭৯৬; আবু দাউদ, হা/২৪৫০; নাসাঈ, হা/১৬৩০; ইবনে মাজাহ, হা/১৭১২; মুসনাদে আহমাদ, হা/৬৪৯১; মুসনাদুল বাযযার, হা/২৩৬৪; বায়হাকী, হা/৪৪৩২; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/১০৫১; জামেউস সগীর, হা/১৭০; মুসনাদে হুমাইদী, হা/৬১৭।
📄 মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর উম্মতের রোযা
• রমাযানের রোযা ফরয হওয়ার আগে নবী ﷺ মুসলমানদেরকে প্রতি মাসে তিনদিন (আইয়ামে বীজের) রোযা রাখার নির্দেশ দিতেন এবং আশুরার দিনে রোযা রাখতে উৎসাহিত করতেন। হাদীসে এসেছে, জাবির ইবনে সামুরা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদেরকে আশুরার দিন রোযা রাখার নির্দেশ দিতেন এবং এ ব্যাপারে খুবই উৎসাহ দিতেন। আমরা রোযা রাখছি কি না- এরও খোঁজ-খবর নিতেন। পরে যখন রমাযানের রোযা ফরয হয়ে গেল তখন এ ব্যাপারে কোন আদেশ করতেন না, নিষেধও করতেন না এবং কোন খোঁজ-খবরও নিতেন না।
আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, জাহেলী যুগে কুরাইশরা আশুরার দিন রোযা পালন করত। জাহেলী যুগে রাসূলুল্লাহ ﷺ -ও এ দিন রোযা রাখতেন। তিনি যখন মদিনায় আসেন, তখনও (প্রথমদিকে) তিনি এ রোযা রেখেছেন এবং তা রাখার হুকুমও দিয়েছেন। কিন্তু যখন রমাযানের রোযা ফরয হয় তখন তিনি আশুরার রোযা ছেড়ে দেন। অতঃপর যার ইচ্ছা সে তা রাখত আর যার ইচ্ছা সে তা ছেড়ে দিত।'
• দ্বিতীয় হিজরীর শা'বান মাসে সর্বপ্রথম রমাযান মাসে রোযা রাখার বিধান নাযিল হয়। তবে এতে লোকদেরকে এতটুকু পর্যন্ত সুযোগ দেয়া হয়েছিল যে, যারা রোযা রাখতে চায় না, তারা প্রতি রোযার পরিবর্তে একজন মিসকীনকে খাওয়ালেও চলবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে, যেভাবে ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যেন তোমরা (এর মাধ্যমে আল্লাহকে) ভয় করতে পার। (রোযা ফরয করা হয়েছে) নির্দিষ্ট কয়েকটি দিনের জন্য, তবে কেউ যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে কিংবা সফরে থাকে, তবে সমপরিমাণ দিনের রোযা (সুস্থ হয়ে অথবা সফর থেকে ফিরে এসে) কাযা আদায় করে নেবে; আর যারা সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও রোযা রাখতে চায় না তাদের জন্য এর বিনিময়ে ফিদইয়া দেয়ার সুযোগ থাকবে। আর তা হচ্ছে একজন গরীব ব্যক্তিকে (পেট ভরে) খাবার দেয়া। অবশ্য যদি কোন ব্যক্তি (এর চেয়ে বেশী দিয়ে) ভালো কাজ করতে চায়, তাহলে এ কাজ তার জন্য একান্ত কল্যাণকর হবে। তবে (এ সময়) রোযা রাখা তোমাদের জন্য খুবই ভালো; যদি তোমরা (রোযার উপকারিতা সম্পর্কে) জানতে পার।' (সূরা বাকারা- ১৮৩, ১৮৪)
• উপরোক্ত বিধান নাযিল হওয়ার এক বছর পর সুস্থদের ব্যাপারে যে ছাড় বা সুযোগ দেয়া হয়েছিল তা রহিত করে পুরো মাস রোযা রাখা বাধ্যতামূলক করে দেয়া হয় এবং রোগী ও মুসাফিরদের ব্যাপারে কাযার বিধান বহাল রাখা হয়। তবে যারা রোযা রাখতে অক্ষম তারা ফিদইয়া দিতে পারবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'রমাযান মাস (এমন একটি মাস) যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে, আর এই কুরআন হচ্ছে মানবজাতির জন্য পথপ্রদর্শক, সৎপথের সুস্পষ্ট নিদর্শন এবং (হক ও বাতিলের) পার্থক্যকারী। অতএব তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাসটি পাবে, সে যেন রোযা রাখে, তবে যদি কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে কিংবা সফরে থাকে তবে সে পরবর্তী দিনগুলোতে গুণে গুণে সেই পরিমাণ কাযা করে নেবে। (এ সুযোগ দিয়ে) আল্লাহ তা'আলা তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, কখনই তোমাদের (জীবন) কঠিন করতে চান না। আল্লাহর উদ্দেশ্য হচ্ছে, তোমরা যেন গুণে গুণে (রোযার) সংখ্যাগুলো পূর্ণ করতে পার, আর আল্লাহ তোমাদেরকে (জীবন যাপনের) যে পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন সেজন্য তাঁর মাহাত্ম্য বর্ণনা করতে পার এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা আদায় করতে পার।' (সূরা বাকারা- ১৮৫)
• রমাযান মাসে রোযা রাখা বাধ্যতামূলক হয়ে যাওয়ার পর এর বিস্তারিত বিধি-বিধান সম্পর্কে মুসলমানদেরকে ধারণা দেয়া হয় এবং রাতে ঘুমিয়ে পড়ার পর জেগে উঠে সহবাস করা ও খাওয়া-দাওয়া করাকে হালাল করে দেয়া হয়, যা ইতিপূর্বে হালাল ছিল না। ইবনে কাসীরের বর্ণনায় এসেছে, কায়েস ইবনে সুরমাহ আল-আনসারী রোযা রেখে সারাদিন পরিশ্রম করে বাড়ি ফিরে স্ত্রীকে বললেন, খাওয়ার কিছু আছে কি? স্ত্রী বললেন, না। এরপর স্ত্রী খাবারের খুঁজে বের হলেন। ফিরে এসে দেখেন স্বামী ঘুমিয়ে পড়েছেন। ফলে তিনি পরের দিন না খেয়ে রোযা রাখলেন। এক পর্যায়ে তিনি ক্ষুধার জ্বালায় বেঁহুশ হয়ে পড়েন। অতঃপর নবী ﷺ এর কাছে এ ব্যাপারে সংবাদ দেয়া হলো।
অপরদিকে উমর (রাঃ) রোযার রাতে ঘুমানোর পর জেগে উঠে স্ত্রীর সাথে সহবাস করে বসেন। পরে তিনি নিজেকে দোষী মনে করে আক্ষেপের সাথে নবী ﷺ এর কাছে গিয়ে নিজের ঘটনা বললেন। এসব পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা সূরা বাকারার ১৮৭ নং আয়াত নাযিল করে সুবহে সাদিক পর্যন্ত সহবাস করা ও খাওয়া-দাওয়াকে বৈধ করে দিলেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'রোযার মাসে রাতের বেলায় তোমাদের স্ত্রীদের সাথে মিলন করা তোমাদের জন্য হালাল করে দেয়া হয়েছে, তোমাদের স্ত্রীরা যেমনি তোমাদের জন্য পোশাকস্বরূপ, ঠিক তোমরাও তাদের জন্য পোশাক সমতুল্য। আল্লাহ এটা জানেন যে, তোমরা নিজেদের উপর খিয়ানত করে বসবে, তাই তিনি তোমাদের উপর দয়া করলেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন। এখন চাইলে তোমরা তাদের সাথে সহবাস করতে পার এবং (এ ব্যাপারে) আল্লাহ তা'আলা তোমাদের জন্য যা (বিধি-বিধান কিংবা সন্তান) লিখে রেখেছেন তা সন্ধান করো। আর তোমরা পানাহার অব্যাহত রাখতে পার যতক্ষণ পর্যন্ত রাতের অন্ধকার রেখার ভিতর থেকে ভোরের শুভ্র আলোকরেখা পরিষ্কার না হয়। অতঃপর তোমরা রাত আসা পর্যন্ত রোযা পূর্ণ করো। তবে মসজিদে যখন তোমরা ই'তিকাফ অবস্থায় থাকবে তখন নারী সম্ভোগ থেকে বিরত থাকবে। এ হচ্ছে আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা। সুতরাং তোমরা এসবের নিকটবর্তী হয়ো না। এভাবেই আল্লাহ তা'আলা তার যাবতীয় নিদর্শন মানুষের জন্য বলে দিয়েছেন, যেন তারা (এর আলোকে) আল্লাহকে ভয় করতে পারে।' (সূরা বাকারা- ১৮৭)
টিকাঃ
৬. সহীহ মুসলিম, হা/২৭০৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/২০৯৪৬; মুসনাদে তায়ালুসী, হা/৮২১; মুস্তাখরাজে আবু আওয়ানা, হা/২৪০৬; মু'জামুল কাবীর লিত তাবারানী, হা/১৮৩৬; মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হা/৯৪৪৯; মিশকাত, হা/২০৬৯।
৭. মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হা/৬৬২; সহীহ বুখারী, হা/২০০২; সহীহ মুসলিম, হা/২৬৯৬; আবু দাউদ, হা/২৪৪৪; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩৬২১; সুনানুল কুবরা লিন নাসাঈ, হা/২৮৫০; মুস্তাখরাজে আবু আওয়ানা, হা/২৩৯৪; বায়হাকী, হা/৮১৯২: শারহুস সুন্নাহ, হা/১৭০২; মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হা/৭৮৪৫।