📘 সিরাতের প্রচলিত ভুল > 📄 গাযওয়ায়ে হুনাইন

📄 গাযওয়ায়ে হুনাইন


হুনাইন ও তায়েফের যুদ্ধের প্রচলিত কাহিনি

তার জবান বন্ধ করে দাও
ইমাম মুসলিম রাফে ইবনে খুদাইজের সূত্রে বর্ণনা করেন, হুনাইনের যুদ্ধের পর নবীজি গনিমতের সম্পত্তি বণ্টন করার সময় আবু সুফিয়ান ইবনে হারব, সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া, উয়াইনাহ ইবনে হিসন ও আকরা ইবনে হাবেস প্রমুখ ব্যক্তির প্রত্যেককে ১০০ করে উট প্রদান করেন। আর আব্বাস ইবনে মিরদাসকে ১০০ উটের চেয়ে কিছু কম প্রদান করেন।
নিজের ভাগে কম দেখে আব্বাস ইবনে মিরদাস নিচের কবিতা আবৃত্তি করেন:
ওই সম্পদ, যা লুট করেছি আমি এবং আমার ঘোড়া, যার নাম উবাইদ,
বণ্টন করে দিচ্ছেন উয়াইনিয়া এবং আকরার মাঝে?
অথচ বদর/হিসন (উয়াইনার পিতা) ও হাবিস (আকরার পিতা)
কখনোই কোনো যুদ্ধে তাদের কেউই মিরদাসের (কবির পিতা, মানে আব্বাসের পিতা) চেয়ে এগিয়ে নয়।
আমিও কম নেই তাদের চেয়ে কোনো অংশে,
ফিরে পাবে না সে নিজের মর্যাদা; আজকের দিনে নত হবে যে ॥
তাঁর আবৃত্তি শুনে নবীজি তাঁকেও ১০০ উট প্রদান করেন।
কিন্তু ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় উল্লেখিত হয়েছে, নবীজি নও-মুসলিমদের আস্থা বৃদ্ধির জন্য তাদেরকে অন্যদের চেয়ে একটু বেশি করে প্রদান করেছিলেন। এ ছাড়া তাঁর বর্ণনায় আব্বাস ইবনে মিরদাসের কবিতার আরও অতিরিক্ত চার লাইন বেশি উল্লেখিত হয়েছে।
এ ছাড়া এ ঘটনার শেষে ইবনে ইসহাক আরও বর্ণনা করেন, আব্বাস ইবনে মিরদাসের কবিতা শুনে নবীজি বললেন, 'তোমরা আমার ব্যাপারে তার জবান বন্ধ করে দাও।' অর্থাৎ তাকে এ পরিমাণ দাও, যাতে সে আমার ব্যাপারে আর কোনো অভিযোগ করতে না পারে। নবীজির নির্দেশ পেয়ে সাহাবিগণ তাঁকে আরও এত বিপুল সম্পত্তি প্রদান করেন, যা দেখে ইবনে মিরদাস খুশি হয়ে যান।
এ ঘটনা ওয়াকিদি ও ইবনে সা'আদ আরও দুই সনদে বর্ণনা করেন। প্রথম সনদ ওয়াকিদির সূত্রে এবং দ্বিতীয় সনদ আরেম ইবনে ফজলের সূত্রে হিশাম ইবনে উরওয়া ও তাঁর পিতা থেকে। তবে এ বর্ণনা মুরসাল ধারায় বর্ণিত।
হাফেজ ইরাকি বলেন, ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় যে অতিরিক্ত 'তার জবান বন্ধ করে দাও' উল্লেখিত হয়েছে, তা অন্য কোনো প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক গ্রন্থে পাওয়া যায় না। তিনি এটি সনদ ছাড়া উল্লেখ করেছেন।

শুধু নবীই এ রকম উপঢৌকন দিতে পারেন
ওয়াকিদি বর্ণনা করেন, হুনাইনের যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া নবীজির সঙ্গে ঘোরাফেরা করছিলেন। এ যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ উট, ছাগল ও ভেড়া গনিমত হিসেবে মুসলিম বাহিনী লাভ করে। সাফওয়ান নবীজির সঙ্গে ঘুরে ঘুরে এসব দেখছিলেন। সমস্ত সম্পদ ও পশুর পাল এক জায়গায় সমবেত করা হচ্ছিল। তখন সাফওয়ান বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে পশুর পালের দিকে বারবার দেখছিলেন। হঠাৎ সাফওয়ানের দৃষ্টি একটি গিরিপথের ওপর আটকে গেল। ওই গিরিপথ উট, ছাগল এবং এগুলোর রাখাল দিয়ে ভরপুর ছিল। ব্যাপারটি নবীজির দৃষ্টিতে আটকে গেল।
তিনি সাফওয়ানকে বললেন, 'কী হে সাফওয়ান! এত বিপুল সম্পদ দেখে আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছ?' উত্তরে সাফওয়ান বললেন, 'জি হ্যাঁ'।
তখন নবীজি গিরিপথে একটি পশুর পালের দিকে দেখিয়ে বললেন, 'সাফওয়ান! এখানে যা কিছু আছে, সব তোমাকে দিয়ে দিলাম।' হঠাৎ এত বিপুল পরিমাণ পশু উপঢৌকন হিসেবে পেয়ে সাফওয়ান আনন্দে আত্মহারা হয়ে যান। তিনি বলে ওঠেন, 'এ রকম উপঢৌকন কেবল নবীই দিতে পারেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর রাসুল।'
উল্লেখ্য, বর্ণনাকারী ওয়াকিদির ব্যাপারে আগে বলা হয়েছে, তিনি হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যাত বলে সবার কাছে পরিচিত।
অথচ সাফওয়ানের ঘটনা সহিহ মুসলিম গ্রন্থে ইবনে শিহাবের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের পর নবীজি স্বীয় সাহাবিদের বাহিনী ও মক্কার নও-মুসলিমদের একটি দল নিয়ে হুনাইন অভিযানের উদ্দেশে রওনা হন। তুমুল লড়াইয়ের পর হুনাইন যুদ্ধেও মুসলিমরা বিজয় লাভ করেন। এ যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ সম্পদ ও সম্পত্তি গনিমত হিসেবে মুসলিমরা লাভ করেন। নবীজি সেখান থেকে সাফওয়ানকে প্রথমে ১০০ উট প্রদান করেন। অতঃপর আরও ১০০ উট দেন। এরপর আরও ১০০ প্রদান করেন। এতে সাফওয়ান হতবাক হয়ে যান।
অতঃপর ইবনে শিহাব সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যেবের সূত্রে বলেন, নবীজির কাছ থেকে এত বিপুল সম্পদ উপঢৌকন হিসেবে পেয়ে সাফওয়ান বলেছিলেন, 'আল্লাহর কসম! নবীজি আমাকে এত পরিমাণ সম্পদ প্রদান করেছেন, যা আমি ভাবতেও পারিনি। এর আগে তিনি আমার কাছে সবচেয়ে বেশি ঘৃণার পাত্র ছিলেন। কিন্তু তাঁর পক্ষ থেকে এত কিছু উপঢৌকন পেয়ে তাঁকে না ভালোবেসে থাকতে পারিনি। তখন থেকেই তিনি আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষে পরিণত হন।'
এ বর্ণনার অপর অংশে এসেছে, রাফে ইবনে খাদিজ বলেন, 'নবীজি আবু সুফিয়ান ইবনে হারব, সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া, উয়াইনাহ ইবনে হিসন, আকরা ইবনে হাবেসসহ প্রত্যেককে ১০০ করে উট প্রদান করেছিলেন।' প্রিয় নবীজির দানশীলতা বর্ণনাতীত। এ জগতে আল্লাহ তায়ালার পরে তাঁর চেয়ে দানশীলতায় আর কেউ এগিয়ে নয়। সহিহ মুসলিম গ্রন্থে সাহাবি আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজির নিকট ইসলাম গ্রহণ করার পর কেউ কিছু চাইলে তিনি অবশ্যই তা দিয়ে দিতেন। আনাস বলেন, একবার এক ব্যক্তি নবীজির কাছে এল। তিনি তাকে এত বেশি ছাগল দিলেন, যাতে দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থান পূর্ণ হয়ে যাবে। তারপর সেই ব্যক্তি তার গোত্রের কাছে গিয়ে তাদের উদ্দেশ করে বলল, 'হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা ইসলাম গ্রহণ করো। কারণ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভাবের আশঙ্কা না করে দান করতেই থাকেন।'

মুআবিয়াকে নবীজির ১০০ উট প্রদান
ওয়াকিদি বর্ণনা করেন, নবীজি হুনাইনের গনিমত থেকে সাহাবি মুআবিয়াকেও (রা.) ১০০ উট ও ৪০ আউন্স মূল্যের সমপরিমাণ স্বর্ণ প্রদান করেন।
ইমাম জাহবি তাঁর সিয়ার গ্রন্থে এ ঘটনা প্রসঙ্গে লেখেন, 'আমার মনে হচ্ছে, ওয়াকিদি নিজেও জানেন না, কখন কী বলে ফেলেন! ওয়াকিদির নিজের বর্ণনায়ই হলো মুআবিয়া প্রথম দিকের মুসলমান। তাহলে তাঁর মন আকৃষ্ট করতে হুনাইনের যুদ্ধে প্রাপ্ত গনিমত থেকে নবীজি তাঁকে কেন বিপুল পরিমাণ সম্পদ দেবেন? যদি নবীজি তাঁকে এত বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি দিয়েই থাকেন, তাহলে মুআবিয়া কর্তৃক বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার পর ফাতেমা বিনতে কায়েস যখন নবীজির কাছে পরামর্শের জন্য এলেন, তখন তাঁকে নবীজি কেন বললেন যে “মুআবিয়া নিঃস্ব, তার কোনো সম্পদ নেই”।'

শাইবা ইবনে উসমান কর্তৃক নবীজিকে হত্যার প্রচেষ্টা
ইবনে ইসহাক বলেন, 'শাইবা ইবনে উসমানের পিতা মুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে উহুদের প্রান্তরে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারায়। এ জন্য শাইবা কঠিন প্রতিশোধের সুযোগ খুঁজছিল। হুনাইনের যুদ্ধে সেই সুযোগ তার হাতে এসে যায়। এ প্রসঙ্গে শাইবা নিজেই বলে, 'হুনাইনের যুদ্ধের পর আমি ভাবতে থাকি, এবার সে সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। মুহাম্মদকে শেষ করে দেব।
'এ লক্ষ্যে আমি তাঁকে হত্যা করার জন্য তাঁর পিছু নেই। কিন্তু যখনই আমি মুহাম্মদের কাছাকাছি এসে তাঁকে হত্যা করতে উদ্যত হই, তখনই আমি অচেতন হয়ে যেতাম। মনে হতো, কে যেন আমার আত্মার ওপর আবরণ ফেলে দিয়েছে। পরক্ষণেই চেতনা ফিরে পাই। বুঝতে পারি, তাঁকে হত্যা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। অদৃশ্য শক্তি তাঁকে রক্ষা করে যাচ্ছে।'
ইমাম বায়হাকি তাঁর দালায়েল গ্রন্থে ওয়ালিদ ইবনে মুসলিমের সূত্রে শাইবা ইবনে উসমান থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'আমি যখন হুনাইন যুদ্ধের দিন দেখলাম, নবীজি উন্মুক্তভাবে নিরাপত্তা প্রহরা ছাড়াই ঘোরাফেরা করছেন, তখন আমার পিতা ও চাচার মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের কথা মনে পড়ে যায়। উহুদের যুদ্ধে আলি ও হামজা (রা.) তাদেরকে হত্যা করেছিলেন।
'তাই ভাবতে থাকি, এবারই এর উপযুক্ত বদলা নেওয়ার সময়। এরপর আমি তাঁর ডান দিকে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু দেখি, সেখানে আব্বাস নবীজিকে প্রহরা দিচ্ছেন। তিনি নবীজির সম্মানিত চাচা। কখনোই তিনি মুহাম্মদকে (সা.) অপদস্থ হতে দেবেন না। এরপর আমি বাম দিকে যাওয়ার চেষ্টা করি। দেখি, সেখানে নবীজির চাচাতো ভাই আবু সুফিয়ান ইবনে হারিস পাহারায় নিযুক্ত। ভাবলাম, নিশ্চয় তাঁর চাচাতো ভাই আল্লাহর নবীকে কখনো অপমানিত হতে দেবেন না। অবশেষে আমি নবীজির পেছনে অবস্থান গ্রহণ করি এবং তরবারি তাঁর দিকে তাক করি। হঠাৎ দেখতে পাই, আমার ও নবীজির মধ্যে একটি অগ্নির স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠছে। মনে হচ্ছিল, আমাকে দগ্ধ করে ফেলবে এই অগ্নিশিখা। লজ্জায়, ভয়ে আমি হাত দিয়ে চোখ ঢেকে ফেলি এবং পেছনের দিকে চলতে শুরু করি।
'কিন্তু সেই মুহূর্তে নবীজি আমার দিকে তাকিয়ে ডাক দিলেন— শাইবা! শাইবা!! আমার কাছে এসো।” অতঃপর দোয়া করলেন, "শাইবার কাছ থেকে শয়তানকে তাড়িয়ে দিন।” নবীজির ডাক শুনে চোখ তুলে তাঁর দিকে তাকাই। আশ্চর্য অনুভূত হচ্ছিল আমার। নবীজির দিকে তাকাতেই তিনি আমার চোখ-কান থেকেও যেন আমার সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। অতঃপর নবীজি বললেন, “শাইবা! কাফেরদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ো।"'
ইমাম জাহবি এ ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, ওই ঘটনা খুবই অপরিচিত। অর্থাৎ তেমন প্রসিদ্ধ নয়।
আল্লামা হাইসামি এ ঘটনা মাজমাউজ জাওয়ায়েদ গ্রন্থে ইমাম তাবারানির দিকে সম্পৃক্ত করার পর বলেন, এ বর্ণনার সনদে আবু বকর হাজলি রয়েছেন, তিনি দুর্বল।
তবে এ প্রসঙ্গে মূল গ্রন্থকার বলেন, 'আবু বকর হাজলিকে শুধু দুর্বল বলাই যথেষ্ট নয়।' হাফেজ ইবনে হাজার ও ইমাম জাহাবি তাঁকে পরিত্যক্ত বলেছেন।
ইমাম বায়হাকি আইয়ুব ইবনে জাবেরের সূত্রে মুসআব ইবনে শাইবার পিতা শাইবা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, 'আমি হুনাইনের অভিযানে নবীজির সঙ্গে বের হই। আল্লাহর কসম! ইসলামের প্রতি আমার কোনো আগ্রহই ছিল না। ইসলামের আকর্ষণে আমি তাঁর সঙ্গে রণাঙ্গনে যাইনি। কিন্তু কুরাইশদের ওপর হাওয়াজেন গোত্রের বিজয় অর্জনকে আমি গর্বভরে প্রত্যাখ্যান করছিলাম। ভাবছিলাম, এমন হতেই পারে না।'
এরপর শাইবা বলেন, 'রণাঙ্গনে আমি নবীজির সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ দেখি, অনেকগুলো সাদা-কালো ঘোড়ায় আরোহী সৈন্যরা যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে যাচ্ছে। আমি নবীজিকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, “শাইবা! শুধু কাফেররা এ ঘোড়াগুলো দেখতে পায়।” এরা মুসলিমদের পক্ষ হয়ে লড়ছিল। অতঃপর নবীজি আমার বুকের ওপর হাত রেখে তিনবার দোয়া করলেন, “আল্লাহ! আপনি শাইবাকে সরল পথের দিশা দিন।" নবীজির দোয়া শেষ হতেই তিনি আমার কাছে জগতের সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।'
ইমাম বায়হাকি এর উপরিউক্ত বর্ণনার সনদে আইয়ুব ইবনে জাবের দুর্বল বলে বিবেচিত। অপর বর্ণনাকারী সাদকা ইবনে সাঈদ হানাফির ব্যাপারে হাফেজ ইবনে হাজার বলেন, 'তাঁর বর্ণিত হাদিস দুর্বল। তবে সমার্থক বর্ণনা পাওয়া গেলে তা গ্রহণ করা যাবে। আমি মুসআব নামে শাইবার কোনো সন্তানের কোনো সন্ধান পাইনি। বিভিন্ন বর্ণনায় মুসআব ইবনে শাইবা নামে যে বর্ণনাকারী উল্লেখিত হয়েছে, তিনি হচ্ছেন ঘটনার মূল নায়কের নাতির পুত্র। তার নাম হচ্ছে মুসআব ইবনে শাইবা ইবনে জুবায়ের ইবনে শাইবা ইবনে উসমান ইবনে আবু তালহা।'
ইমাম আহমাদ তাঁর ব্যাপারে বলেন, 'তিনি মুনকার হাদিস বর্ণনা করে থাকেন।' ইমাম নাসায়িও এমন বলেছেন। ইমাম দারা কুতনি বলেন, 'তিনি হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে শক্তিশালী নন; আবার তিনি হাদিসের হাফেজও নন।' ইমাম আবু দাউদ তাঁকে দুর্বল বলেছেন। তবে ইবনে মাঈন ও শাইখ আজলি তাঁকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন। আর এ কারণে ইবনে হাজার তাঁর তাকরিব গ্রন্থে শাইবাকে 'হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে দুর্বল প্রকৃতির' বলে আখ্যায়িত করেছেন।
ইবনে কাসির তাঁর বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে এ ঘটনা ওয়াকিদির সনদে উল্লেখ করেন। উল্লেখ্য, ওয়াকিদির ব্যাপারে আগেই বলা হয়েছে, তিনি প্রত্যাখ্যাত বলে পরিচিত।
এ ছাড়া ইবনে হাজার আসকালানি তাঁর ইসাবা গ্রন্থে এ ঘটনা ইবনে আবু খাইছামার সূত্রে মুসআব নুমাইরি থেকে বর্ণনা করেছেন। অতঃপর তিনি বলেন, 'ইবনে সাকানের মতে, শাইবার ইসলাম গ্রহণের ঘটনার সনদে সমস্যা রয়েছে।'
উল্লেখ্য, ইবনে সাকান হাদিসশাস্ত্রের বিখ্যাত পণ্ডিত ছিলেন। তাঁর পুরো নাম হচ্ছে আবু আলি সাঈদ ইবনে উসমান ইবনে সাঈদ ইবনে সাকান। একাধিক বিষয়ে তাঁর গবেষণা ও রচিত গ্রন্থ রয়েছে। হাদিসের সনদের দক্ষ নিরীক্ষক ছিলেন তিনি। ৩৫৩ হিজরিতে তাঁর ইন্তেকাল হয়। ইবনে হাজার আসকালানি তাঁকে বিচক্ষণ আলেম ও মর্যাদাবান ব্যক্তিত্ব বলে আখ্যায়িত করেছেন।

📘 সিরাতের প্রচলিত ভুল > 📄 হিজরতের নবম বছর

📄 হিজরতের নবম বছর


নবীজি কর্তৃক তায়েফবাসীর প্রতি মিনজানিক দিয়ে গোলা নিক্ষেপ
ইবনে হিশাম তায়েফের যুদ্ধ সম্পর্কে নবীজির সিরাতের বিখ্যাত রচয়িতা ইবনে ইসহাকের বর্ণিত ঘটনা থেকে অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, 'আমি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জেনেছি, নবীজি তায়েফের যুদ্ধে তায়েফবাসীর প্রতি মিনজানিক দিয়ে গোলা নিক্ষেপ করেছিলেন। ইতিহাসে নবীজিই সর্বপ্রথম যুদ্ধে মিনজানিক ব্যবহার করেন।'
ইমাম জাইলাঈ বলেন, 'ইমাম তিরমিজি এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তবে তাঁর সনদে ধারাবাহিকতা রক্ষা হয়নি।'
হাফেজ ইবনে হাজার বলেন, ইমাম আবু দাউদ মারাসিল গ্রন্থে ছাওরের সূত্রে মাকহুল থেকে বর্ণনা করেন, নবীজি তায়েফের যুদ্ধে তায়েফবাসীর দুর্গের দিকে তাক করে মিনজানিক স্থাপন করেছিলেন। ইমাম তিরমিজি এ ঘটনা বর্ণনা করলেও সনদে মাকহুলের নাম উল্লেখ করেননি। তাই ওই সনদে ছাওরের আগে মাকহুল থেকে বিচ্ছিন্নতা দেখা দিয়েছে। ইমাম আবু দাউদ ইয়াহইয়া ইবনে আবু কাসির থেকে মুরসাল ধারায় বর্ণনা করেন, নবীজি তায়েফবাসীকে এক মাস যাবৎ অবরোধ করে রাখেন। ইমাম আওজায়ি বলেন, 'আমি ইয়াহইয়াকে নবীজি কর্তৃক মিনজানিক নিক্ষেপের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি তা অস্বীকার করে বলেন, আমি এ ব্যাপারে জানি না।'
অতঃপর ইবনে হাজার বলেন, 'ইবনে সা'আদ এ ঘটনা কুবাইসার সূত্রে ছাওর মারফত মাকহুল থেকে বর্ণনা করেন। ইমাম আবু দাউদ এভাবেই বর্ণনা করেছেন। তবে উকাইলি অন্য সনদে আলির সূত্রে ধারাবাহিক সনদে এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন।'
ইমাম বায়হাকিও তাঁর সুনানে কুবরা গ্রন্থে নবীজি কর্তৃক তায়েফবাসীর প্রতি মিনজানিক নিক্ষেপের ঘটনা বর্ণনা করেছেন এবং সেটা যে আবু কিলাবা অস্বীকার করেছেন, সেটাও বলেছেন।
সহিহ মুসলিম গ্রন্থে সাহাবি আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমরা নবীজির সঙ্গে তায়েফের অভিযানে বের হই। ৪০ দিন যাবৎ তাদেরকে অবরোধ করে রাখি। এরপর মক্কায় ফিরে আসি।' উল্লেখ্য, আনাসে বর্ণনায় মিনজানিক নিক্ষেপের কথা উল্লেখ নেই।

তায়েফ অভিযানে নওফেল ইবনে মুআবিয়ার পরামর্শ
ওয়াকিদি তাঁর সনদে সাহাবি আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, তায়েফ অবরোধ করার পর যখন ১৫ দিন অতিবাহিত হয়ে গেল, তখন নবীজি সাহাবি নওফেল ইবনে মুআবিয়াকে (রা.) ডেকে পরামর্শ চাইলেন। নবীজি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, 'নওফেল! তোমার কী মনে হয়? এখন কী করা যেতে পারে?'
উত্তরে নওফেল বললেন, 'ইয়া রাসুলাল্লাহ! শেয়াল গর্তে ঢুকে গেছে। চেষ্টা অব্যাহত থাকলে ধরা পড়বে। ছেড়ে দিলেও আশঙ্কার কোনো কারণ নেই।' অর্থাৎ তায়েফবাসী কেল্লায় এক বছরের রসদ নিয়ে ঢুকে গেছে। তা ছাড়া তারা আর আক্রমণ করতে সাহস পাবে না। আর নবীজির উদ্দেশ্যও ছিল কেবল প্রতিরোধ করা। তাই নওফেলের পরামর্শে তিনি অবরোধ উঠিয়ে নিলেন।
উল্লেখ্য, আগে একাধিকবার বলা হয়েছে, বর্ণনার ক্ষেত্রে ওয়াকিদি পরিত্যক্ত। তা ছাড়া শাইখ আলবানি এ বর্ণনাকে দুর্বল সাব্যস্ত করে ওয়াকিদির ব্যাপারে বলেন, 'তিনি মিথ্যাবাদী হিসেবে অভিযুক্ত।'

নবীজির দুধমাতার আগমন
ইমাম বুখারি তাঁর আদাবুল মুফরাদ গ্রন্থে এবং ইমাম আবু দাউদ এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। ইমাম বায়হাকিও তাঁর দালালয়েল গ্রন্থে জাফর ইবনে ইয়াহইয়ার সূত্রে আবু তোফায়েল (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 'হুনাইনের যুদ্ধ শেষে ফেরার পথে আমি দেখলাম, জু'উররানা পল্লিতে নবীজি গনিমতের সম্পদ থেকে গোশত সবার মধ্যে বণ্টন করছেন। আমি তখন সবেমাত্র বালক। জবাইকৃত উট ও ভেড়ার হাড় বহন করে নিয়ে যাচ্ছিলাম। একটু পর দেখি, এক বৃদ্ধ মহিলা নবীজির কাছে আগমন করলেন। নবীজি তাঁকে দেখামাত্র নিজের চাদর বিছিয়ে ওই মহিলাকে বসতে দেন। আমি একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, মহিলাটি কে? সে উত্তর দিল, তিনি নবীজির দুধমাতা।'
ইমাম হাকিম এ ঘটনা বর্ণনা করার পর এর সনদ সম্পর্কে কিছু বলেননি। ইমাম জাহবিও এ ব্যাপারে নীরব থেকেছেন। তবে অন্য জায়গায় ইমাম হাকিম নিজ সনদে এ ঘটনা বর্ণনা করার পর বলেন, 'এর সনদ সহিহ; তবে ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম তা উল্লেখ করেননি।' আর ইমাম জাহবি এ প্রসঙ্গে কিছু না বললেও তিনি তাঁর তালখিস গ্রন্থে ওই ঘটনা উল্লেখ করেননি।
ইবনে কাসির তাঁর তারিখ গ্রন্থে এ ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, 'উপরিউক্ত ঘটনা খুবই অপরিচিত। সম্ভবত বর্ণনাকারী বলতে চাইছেন, জু'উররানা পল্লিতে নবীজির কাছে আগন্তুক ওই মহিলা নবীজির দুধবোন ছিলেন। যিনি নবীজির দুধমাতা হালিমা সাদিয়ার কন্যা ছিলেন এবং বাল্যকালে তিনি নবীজিকে কোলে রাখতেন এবং মায়ের সঙ্গে তিনিও দুধ পান করিয়েছেন। আর যদি বর্ণনাটি সহিহ হয়, তাহলে উদ্দেশ্য হবে, হালিমা সাদিয়া দীর্ঘদিন বেঁচে ছিলেন।

নবীজির বোন শাইমার আগমন
অতঃপর ইবনে ইসহাক বলেন, 'আমার কাছে ইয়াজিদ ইবনে উবাইদ সাদি বর্ণনা করেন, অতঃপর নবীজির কাছে আসার পর শাইমা বিনতে হারিস নবীজিকে বললেন, "মুহাম্মদ। আমি তোমার দুধবোন।" নবীজি প্রথমে তাঁকে চিনতে পারছিলেন না। তাই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "তোমার কাছে এর কোনো প্রমাণ অথবা নিদর্শন রয়েছে কি?" শাইমা বললেন, "ছোটবেলায় তুমি আমার পিঠে চড়ে বসেছিলে। তখন আমার পিঠে তুমি দাঁত দিয়ে কামড় বসিয়ে দিয়েছিলে। সেই চিহ্ন এখনো আমার পিঠে রয়ে গেছে।" এ কথা শুনে নবীজি তাঁকে চিনতে পারেন। সঙ্গে সঙ্গে নিজের চাদর বিছিয়ে দিয়ে তাঁকে বসতে দেন।
'অতঃপর নবীজি দুধবোনকে বললেন, "আপনি ইচ্ছে করলে আমার কাছে স্বেচ্ছায় সম্মানের সঙ্গে থেকে যেতে পারেন অথবা চাইলে আপনার জিনিসপত্র নিয়ে বাড়িও যেতে পারেন।" কিন্তু শাইমা বিনতে হারিস বাড়িতে চলে যেতে চাইলেন।'
ওই বর্ণনায় ইবনে ইসহাকের শিক্ষক ইয়াজিদ ইবনে উবাইদ নির্ভরযোগ্য বটে, কিন্তু তিনি তাবেয়ি ছিলেন। ঘটনার সময় সেখানে তিনি উপস্থিত ছিলেন না। অতএব, এটি মুরসাল পর্যায়ের বর্ণনার আওতাভুক্ত।
ইমাম বায়হাকি তাঁর দালায়েল গ্রন্থে হাকাম ইবনে আবদুল মালেকের সূত্রে কাতাদাহ থেকে এ ঘটনা এভাবেই বর্ণনা করেছেন।
ইমাম জাহবি তাঁর মাগাজি গ্রন্থে ওই ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, 'হাকামকে ইবনে মাঈন দুর্বল বলেছেন।' আর কাতাদার জন্ম ৬০ হিজরিতে। অতএব, ঘটনাটি মুরসাল সনদে বর্ণিত।

কাব ইবনে জুহাইরের কবিতা
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, তায়েফের অবরোধ তুলে নেওয়ার পর নবীজি যখন মক্কায় ফিরে যান, তখন বুজাইর ইবনে জুহাইর স্বীয় আপন ভাই কাৰ ইবনে জুহাইরকে চিঠি লিখে দূত প্রেরণ করে। কাব ইবনে জুহাইর ছিল মক্কার বিখ্যাত কবি। চিঠিতে লেখা ছিল:
'কাব! নবীজির বিরুদ্ধে কুরাইশদের যে কবিরা কটূক্তি করত এবং কাব্যের ছন্দে নিন্দা করে বেড়াত, তিনি তাদের একজনকে হত্যা করেছেন। এখন মক্কার অন্যান্য কবি-সাহিত্যিক, যথা ইবনে জাব'আরি ও হুবাইরা ইবনে আবু ওয়াহাব মক্কা থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। তারাও যেকোনো সময় গ্রেপ্তার হতে পারে। তোমার জন্য এখনো সুযোগ আছে। বাঁচতে চাইলে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গিয়ে আত্মসমর্পণ করো। তিনি অনুতপ্ত হয়ে কেউ ফিরে এলে তাকে ছেড়ে দেন। অন্যথায় আমাদের খুশিতে ভুলে গিয়ে নিজের বাঁচার পথ খুঁজে নাও।
ইতি তোমার ভাই বুজাইর ইবনে জুহাইর।
এদিকে কাব ইবনে জুহাইর স্বীয় ভাই বুজাইরের ইসলাম গ্রহণের খবর পেয়ে তাকে উদ্দেশ করে এই কবিতা আবৃত্তি করেছিল।
আমার পক্ষ থেকে কি এ চিঠি পৌঁছাবে না বুজাইরের কাছে?
তোমার জন্য সর্বনাশ ও ধ্বংসের কামনা ছাড়া আর কীই-বা করার আছে!!
যদি এমনটি নাই-বা করে থাকো, আমাকে তুমি বলো, কিসের লোভ তোমাকে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধ্য করল??
তুমি পাওনি তোমার পিতাকে ধ্বংসের কবলে; এমনকি তোমার মাকেও, তোমার ভাইও পড়েনি কখনো অধঃপতনের অতল গহ্বরে।
আর যদি এমনটি না করে থাকো তুমি মোটেই বাস্তবে,
দুঃখিত হব না, কিছু বলবও না; তোমার সন্ধান পেলে।
অতঃপর ইবনে ইসহাক বলেন, 'ভাইয়ের কাছ থেকে চিঠি পেয়ে কাব ইবনে জুহাইর ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে যায়। আরবের প্রশস্ত মরুও যেন তার সামনে সংকীর্ণ হয়ে আসতে থাকে। চারদিকের যেদিকে তাকায়, সবাইকেই তার শত্রু বলে মনে হতে থাকে। এদিকে মক্কা ও তায়েফের রাস্তাঘাটে লোকেরা বলতে থাকে, কাব ইবনে জুহাইরও মুসলিম বাহিনীর হাতে নিহত হবে। এ কথা কাব ইবনে জুহাইরের কানে পৌঁছালে সে আরও দিশেহারা হয়ে পড়ে। এরপর কাব উপায় না দেখে নবীজির প্রশংসায় কবিতা পাঠ করে। সেখানে কাব তার ভীতির কথা এবং শত্রুদের কাছ থেকে নিন্দাবাদের আশঙ্কার কথা তুলে ধরে। কোনো উপায় না পেয়ে অবশেষে সে নবীজির দরবারে রওনা হয়। ততক্ষণে নবীজি মদিনায় ফিরে চলে গেছেন। কাব ইবনে জুহাইর মদিনার মসজিদে নববিতে নামাজের সময় প্রবেশ করে।'
ইবনে ইসহাক আরও বলেন, 'নবীজির পেছনে নামাজ পড়ার পর সে নবীজির দিকে এগিয়ে যায়। নিজের দুই হাত নবীজির হাত মুবারকের ওপর রাখে। নবীজি তখনো তাকে চিনতে পারেননি। কাব নিজের পরিচয় গোপন করে নবীজিকে জিজ্ঞেস করে, "ইয়া রাসুলাল্লাহ। কাব ইবনে জুহাইর অনুতপ্ত হয়ে আপনার কাছে নিরাপত্তা চাইছে। আমি যদি তাকে আপনার কাছে নিয়ে আসি, তাহলে আপনি কি তাকে গ্রহণ করে নেবেন?” উত্তরে নবীজি সম্মতি দিলে সে বলে, "আমিই কাব ইবনে জুহাইর।"'
অতঃপর ইবনে ইসহাক আসেম ইবনে উমর ইবনে কাতাদার সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, কাব ইবনে জুহাইরের নাম শুনে এক আনসারি সাহাবি তার দিকে ধেয়ে আসেন আক্রমণ করার জন্য। ওই সাহাবি বলতে থাকেন, 'ইয়া রাসুলাল্লাহ! এ হচ্ছে আল্লাহর শত্রু। ওকে আমার হাতে ছেড়ে দিন। এর গর্দান উড়িয়ে দিই।' উত্তরে নবীজি বললেন, 'তাকে ছেড়ে দাও। নিশ্চয় সে অনুতপ্ত হয়ে ফিরে এসেছে।'
ইবনে ইসহাক আরও বলেন, 'আনসারি সাহাবির এহেন আচরণে কাব খুবই মনঃক্ষুণ্ণ হয়। কারণ অন্যদিকে মুহাজির সাহাবিদের কেউই তাকে তিরস্কার বা কটূক্তি করেননি। নবীজির কাছে আগমনের সময় কাব একটি কবিতা আবৃত্তি করে। এ কবিতাটি মূলত কাব স্বীয় প্রিয়তমা স্ত্রী সুয়াদের দীর্ঘ বিচ্ছেদের যন্ত্রণায় আবৃত্তি করেছে। কারণ কাব অনেক দিন ধরে নবীজির ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল।' কবিতাটির অর্থ হলো:
প্রিয়তমা সুয়াদ থেকে দীর্ঘ বিচ্ছেদ হতে চলল, তার প্রেমে আমার হৃদয় আজ অসুস্থ। তার টানে আমার হৃদয় আবদ্ধ। তার ভালোবাসা থেকে মুক্তি পাওয়ার মতো কোনো উপায়ও হলো না।
ইবনে ইসহাক কবিতার শেষ পর্যন্ত উল্লেখ করেন।
ইবনে কাসির লিখেছেন, ইবনে হিশাম বলেন, 'মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক পুরো ঘটনা এভাবে বর্ণনা করেছেন বটে, কিন্তু তিনি এর সনদ উল্লেখ করেননি।' তবে ইমাম হাকিম বিস্তারিত সনদে উপরিউক্ত ঘটনা বর্ণনা করেছেন। আবুল কাসেম আবদুর রহমান ইবনে হোসাইনের সূত্রে তিনি কাব ইবনে জুহাইরের পুত্র আবদুর রহমান থেকে বর্ণনা করেন, আবদুর রহমান তাঁর পিতা ও দাদা থেকে বর্ণনা করে বলেন:
জুহাইরের দুই পুত্র বুজাইর ও কাব একসঙ্গে কোথাও রওনা হয়। পথিমধ্যে এক জায়গায় এসে বুজাইর নিজ ভাই কাবকে বলেন, 'তুমি এখানে অবস্থান করো। আমি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গিয়ে দেখে আসি তিনি কী বলেন।' এরপর বুজাইর নবীজির উদ্দেশে গমন করেন এবং কাব সেখানেই অপেক্ষা করতে থাকে। বুজাইর নবীজির কাছে এসে ইসলামে দীক্ষিত হন। এদিকে কাব নিজ ভাইয়ের ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি জানতে পারে। তখন সে এই আবৃত্তি করে:
আমার পক্ষ থেকে কি এ চিঠি পৌঁছাবে না বুজাইরের কাছে?
তোমার জন্য সর্বনাশ ও ধ্বংসের কামনা ছাড়া আর কীই-বা করার আছে!!
যদি এমনটি নাই-বা করে থাকো, আমাকে তুমি বলো, কিসের লোভ তোমাকে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধ্য করল??
তুমি পাওনি তোমার পিতাকে ধ্বংসের কবলে; এমনকি তোমার মাকেও, তোমার ভাইও পড়েনি কখনো অধঃপতনের অতল গহ্বরে।
আর যদি এমনটি না করে থাকো তুমি মোটেই বাস্তবে,
দুঃখিত হব না, কিছু বলবও না; তোমার সন্ধান পেলে।
কাবের এই কবিতার সংবাদ মদিনায় নবীজির কাছে পৌঁছে যায়। নবীজি কাবের বিরুদ্ধে হত্যা পরোয়ানা জারি করেন। তিনি নির্দেশ দেন, 'যে কাবকে কোথাও পাবে, সেখানেই যেন তাকে হত্যা করে।' পরোয়ানা জারির আদেশ শুনে বুজাইর তখনই চিঠি লিখে কাব ইবনে জুহাইরকে নবীজির কাছে আত্মসমর্পণ করতে বলেন। বুজাইর চিঠিতে এও লেখেন:
'আমার মনে হচ্ছে না, তুমি ছাড়া পাবে। তবে আমি জানি, কেউ আল্লাহ তায়ালার তাওহিদবাদের সাক্ষ্য দিয়ে নবীজির দরবারে এলে তিনি তাকে গ্রহণ করে নেন। তুমি দ্রুত ইসলাম গ্রহণ করে চলে এসো।'
নিজ ভাই বুজাইরের চিঠি পেয়ে কাব মদিনায় নবীজির দরবারে এসে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়। অতঃপর সে নবীজির প্রশংসায় উপরিউক্ত পঙ্ক্তিটি আবৃত্তি করে।
ইমাম বায়হাকি তাঁর দালায়লে গ্রন্থে হাকিম, হাজ্জাজ ইবনে জির রুকাইবা এবং তার পিতা ও দাদার সনদে এ ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তবে আমি তাদের কারও জীবনী সম্পর্কে জানতে পারিনি।
ইমাম হাকিম সংক্ষেপে হুজামির সূত্রে ইবনে জুদ'আন থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'কাব ইবনে জুহাইর মসজিদে নববিতে নবীজির প্রশংসায় কবিতা আবৃত্তি করেন।
ওই ঘটনার সনদে তিনটি সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, এটি মুরসাল সনদে বর্ণিত। দ্বিতীয়ত, সনদে উল্লেখিত আলি ইবনে জায়েদের দুর্বলতা। তৃতীয়ত, তাঁর থেকে বর্ণনাকারী মুহাম্মদ ইবনে আবদুর রহমান আওকাছের ব্যাপারে আপত্তি। কারণ তাঁর সম্পর্কে উকাইলি বলেন, 'তিনি প্রায় সময় বিপরীত হাদিস বর্ণনা করেন।' ইবনে আসাকির বলেন, 'তিনি দুর্বল বলে বিবেচিত।' তবে শুধু ইবনে হিব্বান তাঁকে নির্ভরযোগ্য বলে আখ্যায়িত করেছেন।
ইমাম হাকিম অপর সনদে মুহাম্মদ ইবনে ফুলাইহের সূত্রে মুসা ইবনে উকবা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'কাব ইবনে জুহাইর নবীজির প্রশংসায় মসজিদে নববিতে কবিতা আবৃত্তি করেছেন।' তবে এ সনদটি মুরসাল।
এ সত্ত্বেও ইমাম হাকিম বলেন, 'এ ঘটনার একাধিক সনদ রয়েছে। ইবরাহিম ইবনে মুনজির হুজামি সব সনদকে একত্রিত করেছেন। এর মধ্যে মুহাম্মদ ইবনে ফুলাইহের সূত্রে মুসা ইবনে উকবার সনদ এবং হাজ্জাজ ইবনে জির রুকাইবার সনদ দুটি সহিহ। ইবনে ইসহাক তাঁর মাগাজি গ্রন্থে এ বিষয়ে সংক্ষেপে উল্লেখ করেছেন।'
তবে হাফেজ ইরাকি বলেন, 'এ ঘটনা আমরা যতগুলো সনদে বর্ণনা করছি, এগুলোর কোনোটিই সহিহ নয়। ইবনে ইসহাক এটি বিচ্ছিন্ন সনদে উল্লেখ করেছেন।'
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি নাতায়েজুল আফকার গ্রন্থে নিজ সনদে উপরিল্লিখিত ইবরাহিম হুজামির সূত্রে এ ঘটনা বর্ণনা করার পর লেখেন, 'এ হাদিসটি শুধু ইবরাহিম হুজামি এ সনদে বর্ণনা করেছেন। তবে অন্য সনদে আরও বিস্তারিত পরিসরে কাব ইবনে জুহাইরের ইসলাম গ্রহণ ও তাঁর কবিতা আবৃত্তির ঘটনা উল্লেখিত হয়েছে।'
ইবনে কাসির বলেন, 'কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, কাব ইবনে জুহাইরের কবিতা শুনে নবীজি তাঁকে নিজের একটি ডোরাকাটা পোশাক উপঢৌকন হিসেবে প্রদান করেন।' অতঃপর তিনি আরও বলেন, 'কাব ইবনে জুহাইরের এ ঘটনা অনেক প্রসিদ্ধ। কিন্তু আমি এর সন্তোষজনক কোনো সনদের সন্ধান পাইনি।'

📘 সিরাতের প্রচলিত ভুল > 📄 ঐ বছরের অন্যান্য ঘটনাবলী

📄 ঐ বছরের অন্যান্য ঘটনাবলী


তাবুক অভিযানের প্রচলিত কাহিনি
তাবুক অভিযান সম্পর্কে কোরআনের আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট।
তাবুক অভিযান নবম হিজরিতে সংঘটিত হয়। তবে এই অভিযানে যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি। আল্লাহ তায়ালা তাবুক অভিযানের প্রেক্ষাপট কোরআনের আয়াতে তুলে ধরেছেন। তিনি ইরশাদ করেন:
‘(হে নবী!) তাদের কেউ আপনাকে বলে, আমাকে অব্যাহতি দিন এবং পথভ্রষ্ট করবেন না। শুনে রাখো, তারা তো আগে থেকেই পথভ্রষ্ট এবং নিঃসন্দেহে জাহান্নাম এই কাফেরদের পরিবেষ্টন করে রয়েছে।"*
ইবনে ইসহাক তাবুক অভিযান সম্পর্কে বলেন, নবীজি যখন তাবুক অভিযানের জন্য যাবতীয় প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন তিনি বনু সালামার জাদ্দ ইবনে কায়েসকে অভিযানে যাওয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন। উত্তরে জাদ্দ ইবনে কায়েস বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল! আপনি আমাকে এ অভিযান থেকে অব্যাহতি প্রদান করুন। আমাকে পথভ্রষ্ট করবেন না। কারণ তাবুকে বনু আসফারের মেয়েদের দেখে আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারব না। আমার কওমের লোকেরা জানে, আমার চেয়ে নারীদের প্রতি কঠিন আসক্ত অন্য কেউ নেই। তাই আমি এ অভিযানে যেতে চাইছি না।' নবীজি তাকে অব্যাহতি প্রদান করেন। অতঃপর এই পরিপ্রেক্ষিতে ওই আয়াত অবতীর্ণ হয়।
ইবনে ইসহাক ঘটনার শুরুতে সনদ উল্লেখ করে বলেন, 'তাবুক অভিযান সম্পর্কে আমাদের শাইখদের যাঁরা যা কিছু শুনেছেন, তাঁরা তা-ই বর্ণনা করেছেন। আবার অনেকে এমন কিছু বর্ণনা করেছেন, যা অন্যরা করেননি।'
শাইখ আলবানি বলেন, 'এ বর্ণনাটি দুর্বল। ইবনে হিশাম ইবনে ইসহাকের সূত্রে মুরসাল সনদে এটি উল্লেখ করেছেন।' অনুরূপভাবে অপর ঐতিহাসিক ইবনে জারির তাবারি তাঁর তারিখে তাবারি গ্রন্থে এ ঘটনা বর্ণনা করেন।
ইবনে জারির তাবারি তাঁর তাফসির গ্রন্থে মুহাম্মদ ইবনে আমরের সূত্রে প্রখ্যাত তাবেয়ি মুজাহিদ থেকে ওই আয়াতের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, নবীজি সকলকে তাবুক যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ করে ইরশাদ করেন:
'তোমরা তাবুক যুদ্ধের প্রস্তুতি নাও। এর ফলে গনিমত হিসেবে বনু আসফারের কন্যা এবং রোমীয় সুন্দরী নারী তোমরা লাভ করবে।' তখন জাদ্দ ইবনে কায়েস বলল, 'ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমাকে এ অভিযান থেকে অব্যাহতি প্রদান করুন এবং রোমীয় নারীদের কথা বলে আমাকে বিভ্রান্ত করবেন না।' তখন উপরিউক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়।
উল্লেখ্য, ওই বর্ণনার সনদে উল্লিখিত মুজাহিদ তাবেয়ি হওয়ার কারণে এটি মুরসাল পর্যায়ে গণ্য। ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ বলেন, 'ইবনে নুজাইহ তাবেয়ি মুজাহিদ থেকে সরাসরি কোরআনের তাফসির শোনেননি।' ইমাম জাহবি বলেন, 'ইবনে নুজাইহ তাবেয়ি মুজাহিদের ঘনিষ্ঠদের একজন।'
ইমাম বায়হাকি এ ঘটনা ইবনে লাহিয়ার সূত্রে উরওয়া থেকে বর্ণনা করেন। কিন্তু ইবনে লাহিয়ার দুর্বলতা সবার কাছে পরিচিত এবং উরওয়া থেকে বর্ণিত হওয়ায় এটিও মুরসাল সনদের পর্যায়ভুক্ত।
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি বলেন, 'বর্ণিত আছে, জাদ্দ ইবনে কায়েস মুনাফিক ছিল। আবু নু'আইম এবং ইবনে মারদুইয়া উভয়ে দাহহাকের সূত্রে সাহাবি ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, 'জাদ্দ ইবনে কায়েসের উপরিউক্ত কথার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা সুরা তওবার উপরিউক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন।'
এ ছাড়া ইবনে মারদুইয়া আয়েশা ও জাবেরের হাদিসের সনদের সূত্রে এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তবে ওই সনদেও দুর্বলতা রয়েছে।
ইবনে আবদুল বার বলেন, 'বর্ণিত আছে, জাদ্দ ইবনে কায়েস পরবর্তী সময়ে তওবা করে খাঁটি মুসলিমে পরিণত হয়েছিলেন। তবে এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা সবচেয়ে ভালো অবগত।'
আল্লামা হাইসামি মাজমাউজ জাওয়ায়েদ গ্রন্থে লেখেন, 'ইমাম তাবারানি তাঁর মু'জামুল কাবির ও মু'জামুল আওসাত গ্রন্থে এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তবে তাঁর সনদে ইয়াহইয়া হুম্মানি নামের এক বর্ণনাকারী রয়েছেন, যিনি হাদিস বর্ণনায় দুর্বল।'
ইমাম জাহবি তাঁকে হাদিসের হাফেজ বললেও তাঁর বর্ণিত হাদিসকে প্রত্যাখ্যানযোগ্য বলে উল্লেখ করেছেন। তবে ইবনে মাঈন এবং আরও অনেকে তাঁকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন।
ইমাম আহমাদ বলেন, 'তিনি প্রকাশ্যে মিথ্যা বলতেন।' ইমাম নাসায়ি তাঁকে দুর্বল বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাহজিব গ্রন্থে তাঁর জীবনী সম্পর্কে বিস্তারিত এসেছে।
সর্বোপরি এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই যে তাবুক অভিযানে যেসব মুনাফিক যেতে ইচ্ছুক ছিল না, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা সুরা তওবার উপরিউক্ত আয়াতের আগের আয়াতগুলোতে সতর্কবাণী ঘোষণা করলেও এ আয়াতটি শুধু জাদ্দ ইবনে কায়েসকে কেন্দ্র করে অবতীর্ণ হওয়ার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া জটিল। তা ছাড়া যদিও মেনে নেওয়া হয়, এই আয়াত জাদ্দ ইবনে কায়েসের কথার পরিপ্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয়েছে, তা সত্ত্বেও এসব বর্ণনার সনদের দুর্বলতা উল্লেখ করা ছাড়া এ কথা বলা যাবে না।
কারণ হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি তাঁর ইসাবাহ গ্রন্থে জাদ্দ ইবনে কায়েসের জীবনীতে বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন। সেখানে এসেছে, 'জাদ্দ ইবনে কায়েস দ্বিতীয় আকাবার বাই'আত গ্রহণে অংশ নিয়েছিলেন।'
ইবনে হাজার লিখেছেন, 'ইমাম তাবারানি এবং ইবনে মানদাহ মুআবিয়া ইবনে আম্মারের সূত্রে জাবের (রা.) থেকে জাদ্দ ইবনে কায়েসের ঘটনা বর্ণনা করেন। ওই ঘটনায় জাদ্দ ইবনে কায়েসের দ্বিতীয় আকাবার বাই'আত গ্রহণ সম্পর্কে উল্লেখিত হয়েছে। ওই বর্ণনার সনদ শক্তিশালী।'
এই সনদে উল্লেখিত মুআবিয়া এবং আম্মার থেকে ইমাম মুসলিম হাদিস বর্ণনা করেছেন। আর মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ্ থেকে ইমাম বুখারি তাঁর আদাবুল মুফরাদ গ্রন্থে হাদিস বর্ণনা করেন। এ ছাড়া তাঁর থেকে ইমাম তিরমিজি স্বীয় রচিত সুনান গ্রন্থে হাদিস এনেছেন। তাকরিব গ্রন্থে ইবনে হাজার এসব বর্ণনাকারীর প্রত্যেককে বিশ্বস্ত বলে উল্লেখ করেছেন।
আল্লামা হাইসামি তাঁর মাজমাউজ জাওয়ায়েদ গ্রন্থে জাবের থেকে বর্ণিত হাদিস উল্লেখ করে বলেন, 'ইমাম তাবারানি এ ঘটনা তিন সনদে বর্ণনা করেছেন। তাঁর সনদের প্রত্যেকেই নির্ভরযোগ্য।' অন্য জায়গায় ভিন্ন শব্দে জাবেরের বর্ণনা উল্লেখ করার পর হাইসামি বলেন, 'ইমাম তাবারানি এটি বর্ণনা করেন এবং তাঁর সনদের সবাই সহিহ হাদিস গ্রন্থের বর্ণনাকারী।'
হাদিসের মূলপাঠ সহিহ বুখারি গ্রন্থে আমর ইবনে দিনারের সূত্রে সাহাবি জাবের থেকে বর্ণিত হয়েছে। ওই হাদিসে জাবের জাদ্দ ইবনে কায়েসের বাই'আত গ্রহণ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা উল্লেখ করেন। সহিহ বুখারি গ্রন্থের অন্য সনদে আতা থেকে বর্ণিত, জাবের বলেন, 'আমি, আমার পিতা এবং আমার দুই মামা যথাক্রমে জাদ্দ ইবনে কায়েস ও বারা ইবনে মা'রুর সবাই নবীজির কাছে বাই'আতে অংশ নিয়েছি।'
ইবনে হাজার আরও বলেন, আরব দেশে মায়ের নিকটাত্মীয়কে 'খালুন' বলে অভিহিত করা হয়। ইবনে আসাকির হাসান পর্যায়ের সনদে জাবের থেকে তাঁর মামার বাই'আতে অংশ নেওয়ার ঘটনা বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তাঁর বর্ণনায় জাবেরের মামার নাম হুর ইবনে কায়েস বলে উল্লেখিত হয়েছে।
অতঃপর ইবনে হাজার আরও বলেন, 'সিরাত গ্রন্থের কোনো রচয়িতা হুর ইবনে কায়েসের কথা উল্লেখ করেননি। সম্ভবত তিনি তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। যেমনটি ইবনে আসাকেরের বর্ণনায় এসেছে। এ বর্ণনায় হুর নাম এসেছে। হয়তো-বা এটি লেখনীতে জাদ্দ শব্দের বিকৃতির কারণে ঘটেছে। সর্বশেষে আল্লাহ তায়ালাই এ ব্যাপারে সর্বাধিক অবগত।'
অপর এক সহিহ সনদে বর্ণিত, বনু সালামার লোকেদের নবীজি জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমাদের নেতা কে হবেন?' তারা উত্তর দিল, 'জাদ্দ ইবনে কায়েস হতে পারেন। যদিও আমরা তাকে কৃপণ মনে করি।' নবীজি বললেন, 'কৃপণতার চেয়ে মারাত্মক ব্যাধি আর কী হতে পারে? না; বরং তোমাদের নেতা হবেন আমর ইবনে জামুহ।'
ইমাম বুখারি এটি আদাবুল মুফরাদ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। হাফেজ ইরাকি ও শাইখ মুনাবি একে ইমাম আহমাদ এর দিকে সম্পৃক্ত করে সহিহ সাব্যস্ত করেছেন। শাইখ আলবানিও অনুরূপ বলেছেন।
উল্লেখ্য, বনু সালামার লোকেরা জাদ্দ ইবনে কায়েসকে কৃপণ বলে আখ্যায়িত করেছেন; তবে মুনাফিক বলেননি। তাঁরা কখনোই কোনো মুনাফিককে নিজেদের নেতা মনোনীত করতেন না। কারণ নবীজি ইরশাদ করেন:
'তোমরা মুনাফিকদেরকে নিজেদের নেতা বলে সম্বোধন করিয়ো না। এমন করলে আল্লাহ তায়ালা তোমাদের ওপর অসন্তুষ্ট হন।' ইমাম আহমাদ তাঁর মুসনাদ গ্রন্থে এবং ইমাম বুখারি তাঁর আদাবুল মুফরাদ গ্রন্থে এ হাদিস বর্ণনা করেছেন। ইমাম আবু দাউদও এ হাদিস বর্ণনা করেন।
ইমাম নববি, হাফেজ ইরাকি, শাইখ আলবানি এবং শাইখ শু'আইব আরনাউত প্রমুখ হাদিসবিশারদ ওই হাদিসের সনদকে সহিহ সাব্যস্ত করেছেন।
এদিকে ইমাম মুসলিম সহিহ মুসলিম গ্রন্থে সাহাবি জাবের থেকে হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় নবীজির কাছে বাই'আত করার ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, 'হুদাইবিয়ার বাই'আত গ্রহণের দিন আমরা নবীজির সঙ্গে ১৪০০ জন ছিলাম। আমরা সবাই তাঁর হাতে বাই'আত করছিলাম। উমর (রা.) গাছের নিচে নবীজির হাত ধরে ছিলেন। জাদ্দ ইবনে কায়েস ছাড়া সবাই তাঁর হাতে বাই'আত করেন। তখন জাদ্দ ইবনে কায়েস তার খচ্চরের পেটের নিচে লুকিয়ে ছিল।'
নিঃসন্দেহে এটি ছিল নিজেকে মহাসৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত করা অথবা ইমানের দুর্বলতা। তবে ইবনে আবদুল বার এর আগের এক বর্ণনামতে, পরবর্তী সময়ে জাদ্দ ইবনে কায়েস খাঁটিমনে তওবা করেছিলেন। অতএব, বাস্তবে তওবা করে থাকলে তো আর কোনো কথা থাকে না। কারণ, তওবা আগের সমস্ত পাপকে মোচন করে দেয়। অপরদিকে তওবা না করে থাকলে এটা তার ইমানের দুর্বলতা অথবা মুনাফিকি ছাড়া আর কিছু নয়।
অন্য জায়গায় ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেন, জাবের বলেন, বাই'আত করার পর নবীজি বললেন, 'লাল উটের মালিক ছাড়া তোমরা সকলেই ক্ষমাপ্রাপ্ত।' জাবের বলেন, 'নবীজির মুখে এমন কথা শুনে আমরা লাল উটের কাছে এসে তার মালিককে বলি, আমাদের সঙ্গে চলো। নবীজি তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছেন। উত্তরে সে বলল, 'আল্লাহর কসম! তোমাদের সঙ্গীর ক্ষমা প্রার্থনার চেয়ে আমার হারিয়ে যাওয়া উট খোঁজা আমার কাছে বেশি পছন্দের।' এই ব্যক্তি তার উট হারিয়ে ফেলেছিল।
এ বর্ণনায় লাল উটের মালিকের নাম উল্লেখ নেই।
ইমাম তাবারানি সাহাবি ইবনে আব্বাসের সূত্রে বর্ণনা করেন, নবীজি সাহাবিদের উদ্দেশে বললেন, 'তোমরা তাবুক অভিযানের জন্য প্রস্তুত হও। আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে গনিমত হিসেবে বনু আসফারের মেয়ে দান করবেন।' এ ঘোষণা শুনে মুনাফিকদের কেউ বলল, তিনি তোমাদেরকে সুন্দরী মেয়েদের লোভ দেখিয়ে বিভ্রান্ত করতে চাইছেন। তখনই এর উত্তরে সুরা তওবার এই আয়াত অবতীর্ণ হয় :
'(হে নবী!) তাদের কেউ আপনাকে বলে, আমাকে অব্যাহতি দিন এবং পথভ্রষ্ট করবেন না। শুনে রাখো, তারা তো আগে থেকেই পথভ্রষ্ট এবং নিঃসন্দেহে জাহান্নাম এই কাফেরদের পরিবেষ্টন করে রয়েছে।"*
আল্লামা হাইসামি মাজমাউজ জাওয়ায়েদ গ্রন্থে বলেন, 'এ বর্ণনার সনদে আবু শাইবা ইবরাহিম ইবনে উসমান রয়েছেন। তিনি দুর্বল বলে পরিচিত।'

আল্লাহ আবু জরের ওপর রহম করুন, তিনি একা চলেন
তাবুক অভিযানের ঘটনা প্রসঙ্গে ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, তাবুক অভিযানে রওনা দিতে কোনো কারণে সাহাবি আবু জরের (রা.) বিলম্ব হয়ে গিয়েছিল। কারণ আবু জর উটের পিঠে করে আসায় দেরি হয়ে যাচ্ছিল। উটটি যখন আরও মন্থর হয়ে এল, তখন তিনি সেটার পিঠ থেকে সমস্ত আসবাব নিয়ে নিজের পিঠে নিলেন এবং পায়ে হেঁটেই নবীজি যে পথে গেছেন, সে পথ ধরলেন।
ওদিকে নবীজি ও সাহাবিদের দল আগেই রওনা হয়ে যায়। এর কিছুক্ষণ পর আবু জর একা নিজের সরঞ্জামাদি পিঠে বহন করে নবীজির অবস্থানস্থলের দিকে আসতে থাকেন। নবীজি পথিমধ্যে যাত্রাবিরতি দিলেন। তখন দূর থেকে এক মুসলিম সৈন্য তাঁকে দেখতে পেয়ে নবীজিকে সংবাদ দেয় এবং বলে, 'একাকী এক লোক হেঁটে আসছে। নবীজি বললেন, 'মনে হচ্ছে, আবু জর এদিকে আসছে।' সৈন্যরা কাছাকাছি গিয়ে তাঁকে চিনে ফেলে। তারা নবীজিকে আবু জরের আগমনের ব্যাপারে নিশ্চিত করে। তখন নবীজি বললেন, 'আল্লাহ আবু জরের ওপর রহম করুন। তিনি একাই পথ চলেন। একাকী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবেন এবং একাকী পুনরায় জীবিত হবেন।'
অতঃপর ইবনে ইসহাক বুরাইদা ইবনে সুফিয়ান আসলামির সূত্রে সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'পরবর্তী সময়ে মদিনা থেকে ইরাকের দিকে ১৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রাবাজা শহরে একাকী অবস্থায় সাহাবি আবু জরের ইন্তেকাল হয়।'
একদিন আবু জরের প্রতি লক্ষ করে সাহাবি ইবনে মাসউদ বলেছিলেন, 'আল্লাহর রাসুল সত্য বলেছিলেন। তুমি একা পথ চলেছো, একাকী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে এবং একাকী পুনরায় জীবিত হবে।'
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি তাঁর ইসাবাহ গ্রন্থে ইবনে ইসহাকের সূত্র উল্লেখ করে এ ঘটনাকে দুর্বল বলেছেন। তিনি তাঁর অপর গ্রন্থ মাতালিবুল আলিয়াতে লেখেন, 'ওই বর্ণনার সনদে উল্লেখিত ইবনে কাব কুরাজিকে আমি চিনি না। এখানে কুরাজি বলতে যদি মুহাম্মদ ইবনে কাব কুরাজি হয়ে থাকেন, তাহলে এই হাদিস বিচ্ছিন্ন সনদে বর্ণিত বলে গণ্য হবে।'
কিন্তু ইমাম হাকিম এ ঘটনা ইবনে ইসহাকের সনদে বর্ণনা করার পর বলেন, 'এর সনদ সহিহ; তবে ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম তা উল্লেখ করেননি।' তবে ইমাম হাকিম এর বক্তব্যের পর ইমাম জাহবি বলেন, 'এ বর্ণনার সনদ মুরসাল।' ইমাম জাহবি সম্ভবত এ কথা বলে বোঝাতে চাচ্ছেন, ইবনে কাব কুরাজি ও সাহাবি ইবনে মাসউদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে। যেমন ইবনে হাজার বলেছিলেন।
তবে মূলত এ হাদিসের সনদের বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে ইবনে ইসহাকের শিক্ষক বুরাইদা ইবনে সুফিয়ান আসলামিকে কেন্দ্র করে। ইমাম বুখারি বলেন, 'তাঁর ব্যাপারে অভিযোগ রয়েছে।' ইমাম দারা কুতনি তাঁকে পরিত্যক্ত বলে আখ্যা দিয়েছেন। উকাইলি বলেন, 'বুরাইদা থেকে বর্ণিত হাদিসের ব্যাপারে ইমাম আহমাদ কে জিজ্ঞেস করা হলে উত্তরে তিনি বলেছিলেন, 'তাঁর বর্ণিত হাদিস নড়বড়ে।'
ইমাম জাহবি রচিত সিয়ার গ্রন্থে উল্লেখিত এ হাদিসের সনদ বিশ্লেষণে শাইখ শু'আইব আরনাউত একে দুর্বল বলে চিহ্নিত করেছেন। শাইখ আলবানিও বুরাইদার বর্ণিত হাদিসকে দুর্বল বলেছেন। আর ইবনে মাসউদ থেকে ইবনে কাব কুরাজির বিচ্ছিন্নতা প্রমাণিত নয়। কারণ শক্তিশালী সনদে ইমাম বুখারি তাঁর তারিখ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ইবনে কাব কুরাজি সরাসরি ইবনে মাসউদ থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন।
অথচ বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, ইবনে কাসির তাঁর আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে হাদিস উল্লেখ করার পর লেখেন, 'এর সনদ হাসান পর্যায়ের হলেও অন্যান্য সিরাত গ্রন্থের রচয়িতারা তা উল্লেখ করেননি।' ইবনে কায়্যিম তাঁর জাদুল মা'আদ গ্রন্থে এ হাদিস উল্লেখ করে বলেন, 'ওই হাদিসের ঘটনায় সমস্যা রয়েছে।' অতঃপর তিনি ইবনে হিব্বান থেকে বর্ণিত হাদিস কিছুটা পরিবর্তনসহকারে উল্লেখ করেন। এর সনদকে শাইখ শু'আইব আরনাউত হাসান পর্যায়ভুক্ত করেন। কিন্তু আলবানি একেও সনদজনিত সমস্যা বলে দুর্বল আখ্যা দেন।

মসজিদে জিরার পুড়িয়ে দেওয়ার জন্য নবীজির নির্দেশ
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, তাবুকের উদ্দেশে যখন নবীজি রওনা হন, তখন মসজিদে জিরারের কয়েক লোক নবীজির কাছে এসে বলে, 'ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমরা একটি মসজিদ বানিয়েছি অসহায়দের জন্য; যারা অন্ধকার রজনীতে এখানে আশ্রয় নেবে। আমরা চাচ্ছি, আপনি আমাদের মসজিদে এসে আমাদেরকে নামাজ পড়াবেন।' উত্তরে নবীজি বললেন, 'আমি এখন যুদ্ধাভিযানে ব্যস্ত আছি। ফেরার পথে ইনশা আল্লাহ তোমাদের মসজিদে এসে নামাজ পড়াব।'
অতঃপর তাবুক অভিযান শেষে ফেরার পথে নবীজি তাবুক ও মদিনার মাঝামাঝি জু-আউয়ান অঞ্চলে দিনের বেলায় কিছু সময়ের জন্য যাত্রাবিরতি করেন। তখন তিনি মসজিদে জিরার সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে ভয়ংকর সংবাদ পান। তখনই তিনি বনু সালেম ইবনে আওফের ভাই মালিক ইবনে দুখশুম (রা.) এবং বনু আজলানের ভাই মা'আন ইবনে আদি অথবা আসেম ইবনে আদিকে ডেকে মসজিদে জিরার পুড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন। নির্দেশ পাওয়ামাত্র তাঁরা দুজন দ্রুত বনু সালেম ইবনে আওফের বসতিতে গমন করেন। বনু সালেম ছিল মালিক ইবনে দুখশুমের গোত্র। বসতির কাছাকাছি পৌঁছে মালিক ইবনে দুখশুম মা'আনকে বললেন, 'তুমি এখানে দাঁড়াও, আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘর থেকে আগুন নিয়ে ফিরে আসছি।'
অতঃপর মালিক ইবনে দুখশুম খেজুরের অনেকগুলো পাতা সংগ্রহ করে তাতে আগুন ধরিয়ে মা'আনকে সঙ্গে নিয়ে মসজিদে জিরারের উদ্দেশে ছুটে চললেন। মসজিদের সামনে এসে তিনি জ্বলন্ত খেজুরের পাতাগুলো মসজিদের দিকে নিক্ষেপ করেন এবং আগুন লাগিয়ে দেন। ষড়যন্ত্রকারীরা তখন মসজিদে অবস্থান করছিল। তারা আগুন দেখতে পেয়ে এদিক-ওদিক পলায়ন করে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে পুরো মসজিদ পুড়ে ধ্বংস হয়ে যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন:
'যারা জিদের বশে এবং কুফরির তাড়নায় মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এবং ওই লোকদের জন্য ঘাঁটিস্বরূপ মসজিদ নির্মাণ করেছে, যারা আগ থেকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আসছে। অচিরেই তারা অবশ্যই শপথ করবে, আমরা কেবল কল্যাণই চেয়েছিলাম। পক্ষান্তরে আল্লাহ সাক্ষী আছেন তাদের ব্যাপারে, তারা সকলেই মিথ্যুক ছিল।"*
ইবনে ইসহাকের বর্ণিত ঘটনার শেষে এসেছে, এই মসজিদে জিরার ১২ জন মিলে নির্মাণ করেছিল।
শাইখ আলবানি এ ঘটনা প্রসঙ্গে বলেন, 'এর সনদ দুর্বল। ইবনে হিশাম এ ঘটনা ইবনে ইসহাকের সূত্রে সনদ ছাড়া উল্লেখ করেছেন। তবে ইবনে কাসির তাঁর তাফসির গ্রন্থে ইবনে ইসহাকের সূত্রে ইবনে শিহাব জুহরি, ইয়াজিদ ইবনে রুমান, আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর, আমর ইবনে আমর এবং আরও অনেকের কাছ থেকে মুরসাল সনদে ওই ঘটনা বর্ণনা করেন।'
তবে শাইখ আলবানি তাঁর ইরওয়াউল গালিল গ্রন্থে বলেন, 'এ ঘটনা সিরাতের গ্রন্থসমূহে প্রসিদ্ধ। আমার মতে, এর সনদ সহিহ।'
ইবনে কাসির তাঁর তাফসির গ্রন্থে উপরিউক্ত সনদের সূত্রে বর্ণনা করলেও ইবনে ইসহাক সনদ ছাড়া তা উল্লেখ করেছেন। আর ইবনে কাসির তাঁর বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে ইবনে ইসহাকের সনদ উল্লেখ করেননি।
ঐতিহাসিক ইবনে জারির তাবারি তাঁর তাফসিরে তাবারি গ্রন্থে মুছান্নার সূত্রে সাহাবি ইবনে আব্বাস থেকে উপরিউক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে লেখেন, মসজিদে জিরারের নির্মাণকারীরা আনসার গোত্রের ছিল। আবু আমের তাদেরকে বলে, 'তোমরা একটি মসজিদ নির্মাণ করে সেখানে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী যাবতীয় অস্ত্র ও যুদ্ধসরঞ্জাম একত্র করো। এদিকে আমি রোমের বাদশাহর দরবারে গিয়ে আমাদের পরিকল্পনা পেশ করব। অতঃপর তার কাছে সেনা সাহায্য চাইব। রোমীয় বাহিনী এসে পৌঁছালে আমরা সবাই মিলে মুহাম্মদকে মদিনা থেকে বিতাড়িত করব।'
ওদিকে মসজিদ নির্মাণ শেষ হলে তারা নবীজির দরবারে এসে নবনির্মিত মসজিদের সংবাদ দেয় এবং বলে, 'আমরা চাচ্ছি, আমরা ওই মসজিদে আপনার ইমামতিতে নামাজ আদায় করব। অতঃপর আমাদের জন্য আপনি বরকতের দোয়া করবেন।'
উল্লেখ্য, এ বর্ণনার সনদ হাসান পর্যায়ের। যদিও এই সনদের বর্ণনাকারী আবদুল্লাহ ইবনে সালেহ বর্ণনার ক্ষেত্রে প্রায়ই ভুল করে বসেন। তবে তিনি বিশ্বস্ত বটে। তাঁর থেকে বর্ণনাকারী মুআবিয়া ইবনে সালেহও কখনো কখনো হাদিস বর্ণনার সময় বিভ্রান্তির কবলে পড়েন। আর আলি ইবনে আবু তালহা সাহাবি ইবনে আব্বাসের সাক্ষাৎ পাননি।
আর ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় আবু আমেরের ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু উল্লেখ হয়নি। নবীজি মদিনায় হিজরত করার সময় সে মক্কায় চলে যায়। অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজিত হওয়ার পর সে তায়েফে গমন করে। অতঃপর তায়েফবাসী ইসলাম গ্রহণ করলে সে সিরিয়ায় পলায়ন করে। পরবর্তী সময়ে সেখানে নিঃসঙ্গ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে।
কিন্তু ইমাম হাকিম সাহাবি জাবের থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'মসজিদে জিরার বিধ্বস্ত হয়ে ভেঙে পড়ার সময় আমি সেখান থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখেছি।' ইমাম জাহবি এ বর্ণনার সনদকে সহিহ সাব্যস্ত করে এর প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন। সম্ভবত আগুনে পুড়ে ছাই হওয়ার আগেই সরাসরি আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে মসজিদে জিরার ধ্বংস হয়ে যায়।

নামাজ থেকে অব্যাহতি প্রদানের জন্য ছাকিফ গোত্রের শর্ত
ইমাম আহমাদ তাঁর মুসনাদ গ্রন্থে আফফানের সূত্রে উসমান ইবনে আবিল আস থেকে বর্ণনা করেন, ছাকিফ গোত্রের প্রতিনিধিদল নবীজির দরবারে আগমন করে। নবীজি তাদেরকে মসজিদে নববিতে আপ্যায়ন করেন, যাতে মুসলিমদের ইবাদতের পরিবেশ দেখে তাদের অন্তর বিগলিত হয়। তারা নবীজির কাছে ইসলাম গ্রহণের আগে কয়েকটি বিষয়ে শর্তারোপ করে। শর্তগুলো হচ্ছে নিম্নরূপ:
এক. তারা যুদ্ধ করার জন্য রণাঙ্গনে যেতে পারবে না এবং এর প্রস্তুতিও নেবে না।
দুই. তারা উৎপাদিত ফসলের দশ ভাগের এক ভাগ (ওশোর বাবদ) রাষ্ট্রের কোষাগারে জমা দিতে বাধ্য থাকবে না।
তিন, তাদেরকে যেন নামাজ থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়। কারণ তারা মাথাকে ঝুঁকিয়ে পশ্চাদ্দেশ উঁচু করতে লজ্জাবোধ করে।
চার. তাদের ওপর নিজেদের লোক ছাড়া অন্য কাউকে নেতা বানাতে পারবে না।
তখন উত্তরে নবীজি তাদের তিনটি শর্ত মেনে নেন; কিন্তু নামাজের ব্যাপারে বললেন, 'ওই ধর্মে কোনো কল্যাণ নেই, যে ধর্মে রুকু নেই।' ইমাম আবু দাউদ এ হাদিস বর্ণনা করেছেন। তাঁর সনদে ইমাম বায়হাকি তাঁর দালায়েল গ্রন্থে এটি বর্ণনা করেন। আল্লামা মুনজিরي বলেন, 'কথিত আছে, হাসান বসরি সরাসরি উসমান ইবনে আবিল আস থেকে হাদিস শোনেননি।' ইবনে ইসহাক এ ঘটনা সনদ ছাড়া উল্লেখ করার কারণে শাইখ আলবানি একে দুর্বল বলেছেন। তবে তিনি ইমাম আহমাদ ও ইমাম আবু দাউদ এর সনদের ব্যাপারে বলেন, ওই সনদের সবাই নির্ভরযোগ্য; কিন্তু হাসান প্রায়ই হাদিস বর্ণনায় 'তাদলিস' করে থাকেন। অর্থাৎ বর্ণনার সময় শিক্ষকের নাম সরাসরি উল্লেখ না করে 'অমুক থেকে' বলে বর্ণনা করেন।
শাইখ বুতির বক্তব্য খণ্ডন করে তিনি আরও বলেন, 'এর সনদে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে।' হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি তাহজিব গ্রন্থে লিখেছেন, 'হাসান বসরি সরাসরি উসমান ইবনে আবিল আস থেকে হাদিস শোনেননি।'
ছাকিফ গোত্র কর্তৃক ওশোর বাবদ সদকা আদায় করা থেকে এবং জিহাদ না করার ব্যাপারে অব্যাহতি চাওয়ার প্রসঙ্গ সহিহ সনদে অপর বর্ণনায় এসেছে। ইমাম আবু দাউদ হাসান ইবনে সাব্বাহর সূত্রে ওয়াহাব থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'আমি জাবেরকে ছাকিফ গোত্রের বাই'আত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলাম। উত্তরে তিনি বললেন, ছাকিফ গোত্র সদকা না দেওয়া ও যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার ওপর শর্তারোপ করেছিল। এ বিষয়ে আমি তাদের উদ্দেশে নবীজিকে বলতে শুনেছি, তিনি বললেন, অচিরেই ইসলাম গ্রহণের পর তারা সদকা আদায় করবে এবং যুদ্ধেও যাবে।'
আল্লামা মুনজিরি ওই হাদিসের সনদের ব্যাপারে কিছু বলেননি। শাইখ আলবানি এ বর্ণনার সনদকে ইবনে লাহিয়ার সূত্রে ইমাম আহমাদের দিকে সম্পৃক্ত করার পর সহিহ হাদিসের তালিকাভুক্ত করেন। এরপর তিনি বলেন, 'এর সনদ শক্তিশালী। যদিও এতে ইবনে লাহিয়া রয়েছেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে বর্ণনার ক্ষেত্রে শক্তিশালী। ইবনে লাহিয়া ছাড়া অন্য সূত্রে একই হাদিস বর্ণিত হলে আমরা তখন ইবনে লাহিয়ার হাদিসের সংরক্ষণে দুর্বলতার ব্যাপার থেকে নিরাপদ বোধ করি।'
অতঃপর এর আগের বর্ণিত হাদিস উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'এর সনদের সবাই সহিহ হাদিসের বর্ণনাকারী।' ইবনে কায়্যিমের জাদুল মা'আদ গ্রন্থের হাদিসের সনদ বিশ্লেষণ করার সময় শাইখ শু'আইব আরনাউতের সনদকে হাসান পর্যায়ের অভিহিত করেছেন।

টিকাঃ
* সুরা তওবা: ৪৯
* সুরা তওবা: ১০৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00