📄 গাযওয়ায়ে কায়বা
দুর্গের ফটককে আলি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করলেন
ইবনে ইসহাক আবদুল্লাহ ইবনে হাসানের সূত্রে নবীজির আজাদকৃত দাস আবু রাফে (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'আমরা নবীজির সঙ্গে খাইবার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। খাইবারে ইহুদিদের অনেক দুর্গ ছিল। এর মধ্যে একটি দুর্গ তখনো বিজিত হয়নি। নবীজি তাঁর ঝান্ডা আলির (রা.) হাতে দিয়ে ওই দুর্গ অভিযানে প্রেরণ করেন। আমরা কয়েকজন আলির সঙ্গে এই অভিযানে অংশ নিই।
'দুর্গের কাছাকাছি পৌঁছার পর দুর্গের অধিবাসীরা আলির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। আলিও লড়াই চালিয়ে যেতে থাকেন। একপর্যায়ে এক ইহুদি আলিকে লক্ষ্য করে আক্রমণ করলে তাঁর ঢাল হাত থেকে পড়ে যায়। এরপর তাঁর ঢাল হারিয়ে যায়। এদিক-ওদিক খোঁজ করেও পাচ্ছিলেন না। হঠাৎ দেখতে পান, দুর্গের একটি ফটক মাটিতে পড়ে আছে। তৎক্ষণাৎ তিনি তা তুলে নিয়ে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। একাই ফটকটি হাতে নিয়ে তিনি শত্রুদের প্রতিহত করতে থাকেন। দীর্ঘক্ষণ লড়াইয়ের পর আলি ওই দুর্গ জয় করেন। এরপর ফটকটি তিনি নিক্ষেপ করে ছুড়ে ফেলেন। আমরা তখন দলে মোট আটজন ছিলাম। ফটকটি এত ভারী ছিল যে আমরা সবাই মিলেও সেই ফটক উত্তোলন করতে পারিনি।'
ইমাম জাহবি বলেন, 'বাক্কাঈ ওই ঘটনা ইবনে ইসহাকের সূত্রে আবু রাফে থেকে বিচ্ছিন্ন সনদে বর্ণনা করেছেন।'
আল্লামা ইবনে কাসির বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে বলেন, 'এ ঘটনার সনদে বিচ্ছিন্নতা সহজেই পরিলক্ষিত হয়। তবে ইমাম বায়হাকি ও হাকিম ওই ঘটনা মুত্তালিব ইবনে জিয়াদের সূত্রে সাহাবি জাবের (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আলি ওইদিন দুর্গের ফটক একাই বহন করে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তুমুল লড়াইয়ের পর মুসলিম বাহিনী ওই দুর্গের প্রাচীরে পৌঁছে যায়। মুসলিমদের হাতে বিজিত হয় দুর্গটি। পরে ৪০ জন মিলে দুর্গের ওই ফটক উত্তোলন করতে সক্ষম হননি, যা একাই আলি বহন করে নিয়ে এসেছিলেন।'
অতঃপর ইবনে কাসির বলেন, এ সনদেও দুর্বলতা রয়েছে। অপর দুর্বল বর্ণনায় জাবেরের সূত্রে এসেছে, দুর্গ বিজিত হওয়ার ওই ফটক ৭০ জন একসাথে উত্তোলন করতে চেয়েছিলেন; কিন্তু তাঁরা তা করতে সক্ষম হননি।'
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি এ ঘটনার সূত্রকে আবদুল্লাহ ইবনে আহমাদ ইবনে হাম্বলের দিকে সম্পৃক্ত করে তাঁর ইসাবাহ গ্রন্থে বলেন, এ বর্ণনার সনদে হারাম ইবনে উসমান রয়েছেন, যিনি বর্ণনার ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যাত।
ইমাম জাহবি মিজানুল ইতেদাল গ্রন্থে বলেন, আবু জাফরের সূত্রে সাহাবি জাবের থেকে যে সনদে ওই ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, তা অগ্রহণযোগ্য।
তবে হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি ইমাম জাহবির উপরিউক্ত বক্তব্যের পর বলেন, এ ঘটনার সমার্থক বর্ণনা অন্য সনদে এসেছে। যেমন ইমাম আহমাদ তাঁর মুসনাদ গ্রন্থে আবু রাফের সূত্রে ইবনে ইসহাকের সনদে বর্ণনা করেছেন। তবে সেখানে ৪০ জন ব্যক্তির কথা উল্লেখ নেই।
আল্লামা হাইসামি তাঁর মাজমাউজ জাওয়ায়েদ গ্রন্থে বলেন, ইমাম আহমাদ এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তাঁর সনদে অজ্ঞাত বর্ণনাকারী রয়েছেন।
ড. আকরাম উমরি বলেন, বেশ কয়েকটি বর্ণনায় আলির বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে, ইহুদি কর্তৃক আক্রমণের ফলে তাঁর হাত থেকে ঢাল পড়ে গেলে তিনি ভারী ফটক তুলে নিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছেন। এই সব কটি সনদ দুর্বল। আর এই দুর্বল বর্ণনা বাদ দিলেও আলির বীরত্ব ও সাহসিকতায় কোনো ঘাটতি আসবে না। কারণ অসংখ্য সহিহ বর্ণনায় তাঁর বীরত্বগাথা বর্ণিত হয়েছে।
ইমাম মুসলিম তাঁর সহিহ মুসলিম গ্রন্থে ১৫৩২ নং হাদিসে বলেন, হাকিম ইবনে হিজাম (রা.) কাবাঘরের ভেতরে জন্মগ্রহণ করেছেন। ১২০ বছর তিনি বেঁচে ছিলেন। ইমাম নববি বলেন, হাকিম ইবনে হিজাম কাবাঘরের ভেতরে জন্মগ্রহণ করেছেন। তিনি ছাড়া অন্য কারও ব্যাপারে এমন তথ্য পাওয়া যায় না। ইতিহাসে আলি সম্পর্কে কাবাঘরের ভেতর জন্মলাভ করার যে তথ্য পাওয়া যায়, অধিকাংশ আলেমের মতে এর সূত্র দুর্বল।
সর্বোপরি সহিহ বুখারি এবং সহিহ মুসলিম গ্রন্থের যৌথ বর্ণনায় সহিহ সনদে আলির মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে নবীজির বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ইমাম মুসলিম তাঁর সহিহ মুসলিম গ্রন্থে 'আনসার ও আলির প্রতি ভালোবাসা ইমানের অংশ' শীর্ষক অধ্যায় এনেছেন।
📄 মক্কা বিজয়
যুদ্ধবিরতি ও শান্তিচুক্তি নবায়নের লক্ষ্যে আবু সুফিয়ানের আগমন
ইবনে ইসহাক বলেন, 'মক্কা অভিযানের আগে কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান মদিনায় নবীজির দরবারে আগমন করেন। প্রথমে তিনি স্বীয় কন্যা নবীজির স্ত্রী উম্মে হাবিবার (রা.) ঘরে যান। মাদুরের বিছানায় বসতে গেলে উম্মে হাবিবা তা সরিয়ে নেন। কন্যার এ আচরণ দেখে আবু সুফিয়ান বললেন, “হে আমার প্রিয় কন্যা! আমি জানি না, কেন তুমি বিছানা সরিয়ে নিলে? তুমি আমার থেকে মাদুরটি সরিয়ে নিলে, নাকি মাদুরকে আমার থেকে সরিয়ে নিলে? অর্থাৎ আমি কি মাদুরের যোগ্য নই, নাকি মাদুরটি আমার বসার জন্য উপযুক্ত নয়?”
'উত্তরে উম্মে হাবিবা বললেন, “এটি আল্লাহর রাসুলের বিছানা। আপনি মুশরিক ও অপবিত্র। এ বিছানায় আপনি বসতে পারেন না। আপনি রাসুলের বিছানায় বসবেন, এটা আমার পছন্দ নয়।”
'কন্যার মুখে এমন শক্ত কথা শুনে আবু সুফিয়ান বললেন, “বুঝেছি, মুহাম্মদের কাছে আসার পর তুমি অকল্যাণের শিকার হয়েছ।” অতঃপর আবু সুফিয়ান ঘর থেকে বের হয়ে যান। নবীজির সঙ্গে তাঁর দরবারে গিয়ে কথা বলেন। কিন্তু নবীজি উত্তরে তাঁকে কিছুই বললেন না। এরপর আবু সুফিয়ান সাহাবি আবু বকরের কাছে যান। অতঃপর উমর, এরপর উসমান ও আলির কাছেও যান।'
শাইখ আলবানি বলেন, 'ইবনে ইসহাক এ ঘটনা সনদ ছাড়া উল্লেখ করেছেন। ওয়াকিদিও এটি বর্ণনা করেছেন। কিন্তু আগেই বলা হয়েছে, তিনি সবার নিকট প্রত্যাখ্যাত।'
সর্বোপরি আমার জানামতে, যুদ্ধবিরতি নবায়নের জন্য আবু সুফিয়ানের মদিনায় আগমনের ঘটনা কোনো ধারাবাহিক সহিহ সনদে প্রমাণিত নয়। বরং এ ব্যাপারে মুরসাল ধারায় ইকরিমার সূত্রে ইবনে আবু শাইবা থেকে এবং মুহাম্মদ ইবনে ইবাদ ইবনে জাফরের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। ইবনে আয়েজও উরওয়ার সূত্রে এমনটি বর্ণনা করেন।
প্রকৃতপক্ষে এ-সংক্রান্ত সঠিক ঘটনা সহিহ সনদে ইমাম বুখারি তাঁর সহিহ বুখারিতে উল্লেখ করেছেন। তিনি বর্ণনা করেন, 'নবীজি যখন মক্কা অভিযানের উদ্দেশ্যে বাহিনী নিয়ে মদিনা ত্যাগ করেন, তখন এ সংবাদ মক্কার কুরাইশদের কানে চলে যায়। মক্কার কাছাকাছি পৌছার পর কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান ইবনে হারব, হাকিম ইবনে হিজাম ও বুদাইল ইবনে ওয়ারাকা মুসলিম বাহিনীর গতিবিধি লক্ষ করার জন্য মক্কা নগরী থেকে বের হয়ে আসে। কিন্তু তারা নবীজির গোয়েন্দা বাহিনীর কাছে ধরা পড়ে যায়। গোয়েন্দারা তাদের গ্রেপ্তার করে নবীজির কাছে নিয়ে আসে। এরপর সেখানে আবু সুফিয়ান ইসলাম গ্রহণ করেন।'
ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেন, 'সাহাবি সালমান, সুহাইব এবং বিলালসহ আরও অনেকে এক জায়গায় বসে গল্প করছিলেন। এ অবস্থায় আবু সুফিয়ান তাঁদের কাছে আসেন। তখন তাঁরা তাঁর প্রতি হুংকার দেন। এ অবস্থা দেখে আবু বকর তাঁদের উদ্দেশে বললেন, “তোমরা কুরাইশের একজন বয়োবৃদ্ধ নেতাকে এভাবে বলছো!""
ইমাম নববি বলেন, 'এ ঘটনা হুদাইবিয়ার সন্ধির পর ঘটেছিল। যখন নবীজি এবং তাঁর সাহাবিগণ মক্কার অদূরে হুদাইবিয়ায় ছাউনি ফেলেছিলেন। তখনো আবু সুফিয়ান মুসলিম হননি।'
শরহুল উব্বি গ্রন্থে এসেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই যে এ ঘটনা আবু সুফিয়ানের ইসলাম গ্রহণের আগে ঘটেছিল। অন্যথায় আবু বকর এ কথা বলতেন না। তা ছাড়া তখন আবু সুফিয়ান যদি মুসলিম থাকতেন, তাহলে নবীজির সাহাবিগণ তাঁকে এ কথা কেন বলতে যাবেন? তাই এটা নিশ্চিত, এটা ওই সময়ের ঘটনা, যখন আবু সুফিয়ান ইসলাম গ্রহণ করেননি। কিন্তু কথা হচ্ছে সময় নিয়ে। অর্থাৎ এ ঘটনা কবে ঘটেছিল?
প্রসিদ্ধ মত হচ্ছে, নবীজির গোয়েন্দারা আবু সুফিয়ানকে ধরে নবীজির কাছে নিয়ে এসেছিলেন। গ্রেপ্তারের পরপরই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি; বরং এর অনেক পরে তিনি মুসলিম হন। সহিহ বুখারি গ্রন্থে এমনই বর্ণিত হয়েছে।
তা ছাড়া আবু সুফিয়ানের ইসলাম গ্রহণের কিছু প্রেক্ষাপট বিভিন্ন জায়গায় একাধিক বর্ণনায় এসেছে। যথা যখন আবু সুফিয়ানকে বন্দী করা হলো একটি সংকীর্ণ গিরিপথে এবং তাঁর সামনে দিয়ে আল্লাহর সৈন্যরা (ফেরেশতারা নন, মুসলিম বাহিনী) দলে দলে যাচ্ছিলেন, তখন তাঁর কাছে মনে হচ্ছিল বিশাল ফৌজি সমাবেশ। সর্বশেষ ফৌজ যখন তাঁর সামনে দিয়ে চলে যায়, তখন তিনি নবীজির চাচা আব্বাসকে বললেন, 'এবার তোমার ভাতিজার রাজত্ব অনেক দূর পর্যন্ত সম্প্রসারিত হলো।'
উত্তরে আব্বাস বলেন, 'তোমার সর্বনাশ হোক, আবু সুফিয়ান! এটা রাজত্ব নয়; বরং বলো, এটা নবুওয়াতের ক্ষমতা।'
ইবনে ইসহাক আরও দীর্ঘ পরিসরে এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম এর কিছু অংশ তাঁদের হাদিসগ্রন্থে তুলে ধরেছেন। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি তাঁর মাতালিবুল আলিয়া গ্রন্থে এ ঘটনা বিস্তারিত উল্লেখ করার পর এর সূত্র ইসহাক ইবনে রাহুইয়ার দিকে সম্পৃক্ত করে লেখেন, 'এ হাদিস সহিহ।'
শাইখ আলবানি বলেন, 'মক্কা বিজয়ের এটিই হচ্ছে সর্বাধিক সহিহ ও সঠিক বর্ণনা।' শাইখ সালমান আওদাও একে সঠিক বলে সাব্যস্ত করেছেন।
আজ তোমরা সবাই মুক্ত
ইবনে ইসহাক কারও সূত্রে বর্ণনা করেন, নবীজি মক্কা বিজয়ের পর কাবাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে সবার উদ্দেশে বললেন, 'আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তিনি একক, তাঁর কোনো অংশীদার বা সমপর্যায়ের কেউ নেই। তিনি স্বীয় বান্দাকে বিজয় দান করে নিজের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন। অবিশ্বাসীদের দলকে তিনি একাই পরাজিত করেছেন। আজ যত অভিযোগ করা হবে এবং জাহেলি যুগের সমস্ত গৌরব, রক্তপণ, মুক্তিপণ সব আমার এই পায়ের নিচে দাফন করে দিলাম। তবে হাজিদের পানি পান করানো এবং কাবাঘরের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব যথারীতি বহাল থাকবে...।'
অতঃপর নবীজি সমবেত জনতাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আজ তোমাদের কী মনে হয়, আমি তোমাদের সঙ্গে কী করতে পারি?' সবাই উত্তর দিল, 'নিশ্চয় আপনি আজ সর্বোত্তম ফয়সালা করবেন। কারণ আপনি সর্বোত্তম ভাই এবং ভাইয়ের উত্তম সন্তান।' তখন নবীজি বললেন, 'যাও, আজ তোমরা সবাই মুক্ত।'
হাফেজ ইরাকি বলেন, 'ইবনে আবিদ দুনিয়া এ ঘটনা তাঁর কিতাবুল আফউ ওয়া ফি জাম্মিল গজব গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তাঁর সনদেই ইবনুল জাওযি তাঁর ওয়াফা গ্রন্থে এটি বর্ণনা করেন। তবে এই সনদে দুর্বলতা রয়েছে। ইবনে সুবকি এ ঘটনা ওইসব হাদিস বর্ণনার তালিকাভুক্ত করেছেন, যেগুলো ইমাম গাজালির ইহইয়াই উলুমুদ্দিন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু তিনি এর সনদ পাননি।
শাইখ আলবানি বলেন, 'এ ঘটনা মুরসাল ধারায় বর্ণিত হওয়ায় এর মধ্যে দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয়। কারণ ইবনে ইসহাকের শিক্ষক সরাসরি নবীজির সাহাবিদের থেকে বর্ণনা করেন না। বরং তিনি তাবেয়িন ও তাঁদের সমকালীন পরিচিতদের থেকে বর্ণনা করে থাকেন। অতএব, ইবনে ইসহাকের এ জাতীয় বর্ণনা মুরসাল ধারার পর্যায়ভুক্ত।'
শাইখ বুতির মত খণ্ডন করতে গিয়ে আলবানি বলেন, 'ওই ঘটনা সবার মুখে মুখে প্রসিদ্ধ হলেও এর সনদ প্রমাণিত নয়।'
মূলত এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে নবীজি মক্কা বিজয়ের পর নির্দিষ্ট কয়েকজন ছাড়া সবার প্রতি সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, 'আজ যে আবু সুফিয়ানের বাড়িতে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ। যে ব্যক্তি অস্ত্র সমর্পণ করবে, সে নিরাপদ। যে নিজের ঘরে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দেবে, সেও নিরাপদ।'
নিজ গোত্র ও মাতৃভূমির সন্তানদের কাছ থেকে দীর্ঘ দেড় যুগের অসহ্য নিপীড়ন ও অমানবিক অত্যাচারের পরও সবাইকে এভাবে ক্ষমা করে দেওয়া ইতিহাসে অভাবনীয় ঘটনা। নবুওয়াতের প্রাথমিক যুগ থেকেই কুরাইশের লোকেরা প্রিয় নবীজিকে কতই না কষ্ট দিয়েছে! আল্লাহর প্রতি দাওয়াত দিতে তাঁকে সরাসরি বাধা প্রদান করেছে। তাঁর পবিত্র দেহে থুতু ও মাটি নিক্ষেপ করেছে। মক্কার বাজারে সবার সামনে নবীজির আপন চাচা তাঁকেই কটাক্ষ করেছে। কুরাইশের নেতারা বখাটে ছেলেদেরকে তাঁর পেছনে লেলিয়ে দিত। কুরাইশের লোকেরা দিনরাত ঘরের ভেতরে ও বাইরে নবীজি ও তাঁর সাহাবিদের গালিগালাজ ও কটূক্তি করে বেড়াত।
নবীজির দাওয়াতে সাড়া দিয়ে যাঁরা ইসলাম গ্রহণ করতেন, তাঁদের ঘরে প্রবেশ করে ধরে বাইরে নিয়ে আসত। রাস্তায় ফেলে সূর্যের প্রখর তাপে তাঁদের পিটুনি দিত। সামাজিকভাবে তাঁদেরকে বয়কট করে দিনের পর দিন আবদ্ধ করে রেখেছিল। পিতা থেকে তার সন্তানকে এবং সন্তানকে তার মায়ের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। মক্কায় নও-মুসলিমদের ঘরবাড়ি ও সহায়-সম্পত্তি দখল করতেও এই জালেম সম্প্রদায় পিছু হটেনি।
নবীজি ও তাঁর সাহাবিগণ অত্যাচার ও নিপীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে মদিনায় হিজরত করেন। কুরাইশদের চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতের আঁধারে তাঁরা ছোট ছোট দলে মাতৃভূমি মক্কা ত্যাগ করতে থাকেন।
যখন তাঁরা মক্কা ত্যাগ করে মদিনার উদ্দেশে যাত্রা করছিলেন, তখন তাঁরা সবাই ছিলেন একেবারে নিঃস্ব। শুধু পরনের কাপড় ও বাহন ছাড়া সঙ্গে তেমন কিছুই ছিল না। মদিনায় যাওয়ার পর তাঁদের নতুন জীবনের সূচনা ঘটে। কিন্তু এর পরও বিপত্তি তাঁদের পিছু ছাড়ল না। শুরু হয় নয়া সংগ্রাম।
মদিনায় হিজরতের পরও কুরাইশের অত্যাচার থেমে থাকেনি। তারা নবীজিকে হত্যা করার জন্য একাধিকবার ফন্দি আঁটে। সশস্ত্র যুদ্ধে কয়েকবার তারা মদিনায় আক্রমণ করতে উদ্যত হয়। কিন্তু প্রতিবারই আল্লাহ তায়ালা নবীজি ও তাঁর সাহাবিদের বিজয় দান করেন। কুরাইশরা নবীজির প্রাণনাশের জন্য মদিনার ইহুদি ও মুনাফিকদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনও করে। কিন্তু প্রতিবারই তারা ব্যর্থ হয়।
অতঃপর যখন নবীজি অষ্টম হিজরিতে মক্কা জয় করলেন, তখন তিনি বিনয়চিত্তে ১০ হাজার সাহাবির বিশাল বাহিনী নিয়ে নগরীতে প্রবেশ করলেন। কোনো ধরনের প্রতিশোধ গ্রহণ কিংবা মক্কাবাসীকে শান্তি দেওয়ার ইচ্ছে তাঁর ছিল না। এদিকে মক্কার জনগণ তখন ভয়ে তটস্থ ছিল। না জানি আজ তাদের ওপর দিয়ে কেমন প্রতিশোধের ঝড় বয়ে যায়! কিন্তু এমন কিছুই ঘটেনি। দয়ার মূর্তপ্রতীক নবীজি কাবাঘরের সামনে গিয়ে মক্কাবাসীকে ক্ষমা করে দেন।
অথচ নবী মুসার (আ.) যুগে বনি ইসরাইলের আচরণ ছিল সম্পূর্ণ এর বিপরীত। একাধিকবার শাস্তিতে ভুগেও তাদের হঠকারিতা থেমে থাকেনি। আল্লাহ তায়ালা তাদের প্রতি ক্ষমা ঘোষণা করে যখন তাদেরকে বায়তুল মুকাদ্দাস নগরীর ফটক দিয়ে প্রবেশের সুযোগ দিলেন, তখন তাদের প্রতি নির্দেশ আসে, 'তোমরা আল্লাহর সামনে নতজানু অবস্থায় “হিত্তাতুন” (আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন) বলতে বলতে নগরীতে প্রবেশ করো।' কিন্তু তারা 'হিত্তাতুন' না বলে 'হিনতাতুন হিনতাতুন' (আমরা গমের চাষ করতে চাই) বলতে বলতে প্রবেশ করে।
মক্কা বিজয়ের পর যাঁরা ইসলামে প্রবেশ করেছিলেন, ইতিহাসে তাঁরাই 'মুক্ত' নামে পরিচিত। মক্কা বিজয়ের পর হুনাইনের অভিযানে নবীজির বাহিনীর সঙ্গে মুক্ত লোকদের একটা দলও অংশগ্রহণ করেছিল। এ প্রসঙ্গে সহিহ বুখারি গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি সহিহ বুখারির এ বর্ণনার ব্যাখ্যায় বলেন, 'হুনাইনের অভিযানে এই মুক্তিপ্রাপ্ত দলের সংখ্যা এত বেশি ছিল না। সংখ্যায় তারা পুরো বাহিনীর দশ ভাগের এক ভাগেরও কম।
এ ছাড়া হাফেজ ইবনে হাজার তাঁর তাহজিব গ্রন্থে লেখেন, 'মক্কা বিজয়ের পর সেখানে আর কোনো বিধর্মী অবশিষ্ট ছিল না। সবাই ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়।'
ফুজালা ইবনে উমায়ের কর্তৃক নবীজিকে হত্যার পরিকল্পনা
ইবনে হিশাম বর্ণনা করেন, মক্কা বিজয়ের পর নবীজি কাবাঘর তাওয়াফ করছিলেন। মক্কার এক যুবক তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করে। সে ছিল ফুজাইল ইবনে উমায়ের। সে চুপিসারে নবীজিকে অনুসরণ করতে থাকে। কাছাকাছি এসে পড়লে নবীজি তার দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলেন, 'কী অবস্থা? কী মনে করে এখানে এলে?' এতে ফুজাইল হঠাৎ থতমত খেয়ে যায়। সে উত্তর দেয়, 'না, তেমন কিছু নয়। আমি আল্লাহর জিকির করছিলাম।'
কিন্তু নবীজি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে ফুজাইলের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত হন। তিনি স্বাভাবিক চিত্তে হেসে ফেলেন এবং বলেন, 'তুমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও।' তিনি তখন ফুজাইলের বুকে হাত রাখেন। এরপর ফুজাইল বলেন, 'আল্লাহর কসম! মুহাম্মদ আমার বুকে হাত রাখামাত্র তিনি আমার কাছে সর্বাধিক প্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়ে যান।'
ওই ঘটনা প্রসঙ্গে শাইখ আলবানি বলেন, 'ইবনে হিশাম এ ঘটনা মুরসাল সনদে বর্ণনা করেছেন। অতএব, এতে দুর্বলতা বিদ্যমান।' তা ছাড়া শাইখ বুতির মত খণ্ডন করে আলবানি আরও বলেন, 'হাদিসের সূত্রটি সহিহ নয়। কারণ ইবনে হিশাম এ ঘটনা ধারাবাহিক সনদ ছাড়া বর্ণনা করেছেন। যার ফলে সনদের বর্ণনাকারীদের পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়নি।'
কাবাঘরের চাবি কাকে প্রদান করা হয়েছিল?
ইবনে ইসহাক থেকে বর্ণিত মক্কা বিজয়ের আরেকটি ঘটনা সর্বত্র প্রসিদ্ধ। তিনি মুহাম্মদ ইবনে জাফরের সূত্রে সাফিয়া বিনতে শাইবা থেকে বর্ণনা করেন, 'নবীজি মক্কা বিজয়ের পর সবার প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। অতঃপর তিনি কাবাঘর তাওয়াফ করেন। নবীজির হাতে মাথাবাঁকা একটি লাঠি ছিল। প্রতিবার চক্কর শুরু করার সময় তিনি ওই লাঠি দ্বারা হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করে চুম্বন করতেন। তাওয়াফ শেষে নবীজি উসমান ইবনে তালহাকে (রা.) তলব করেন। উসমান আসার পর তিনি তাঁর কাছ থেকে কাবাঘরের চাবি নিয়ে কাবার দরজা খুলে তাতে প্রবেশ করেন।'
অতঃপর ইবনে ইসহাক আরও বর্ণনা করেন, 'এরপর সাহাবি আলি নবীজির দিকে এগিয়ে যান। চাবি তখন তাঁর হাতে ছিল। তিনি নবীজিকে বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল! আজ থেকে আপনি কাবাঘরের রক্ষক ও এর চাবির দায়িত্ব এবং হাজিদের পানি পান করানোর দায়িত্ব আমাদের প্রতি অর্পণ করুন।” উত্তরে নবীজি কিছু বললেন না। তিনি উসমান ইবনে তালহাকে ডেকে পাঠান। উসমান এলে নবীজি তাঁর হাতে কাবার চাবি প্রদান করে বললেন, “এখন থেকে চাবি তোমার কাছেই থাকবে। আজ পুণ্য অর্জন ও প্রতিশ্রুতি পূরণের দিন।”
হাদিসের প্রথম অংশ হাসান পর্যায়ের। যেমনটা ইবনে হাজার আসকালানি ফাতহুল বারি গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু পরের অংশ ইবনে ইসহাক সনদ ছাড়া উল্লেখ করেছেন। এর সূত্র সম্পর্কে আলোচনা অনেকটা পূর্বে আলোচিত 'তোমরা যাও, আজ মুক্ত' এর কাছাকাছি।
তবে ইমাম তাবারানি উপরিউক্ত ঘটনা সাহাবি ইবনে আব্বাসের সূত্রে এভাবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, নবীজি সাহাবি উসমান ইবনে তালহাকে ডেকে তাঁর হাতে কাবার চাবি প্রদান করে বললেন, “উসমান! এই চাবি গ্রহণ করো। তোমার ওপর চিরকাল এ দায়িত্ব থাকবে। একমাত্র জালেম ছাড়া অন্য কেউ তোমার থেকে কাবাঘরের রক্ষকের দায়িত্ব ছিনিয়ে নিতে পারবে না।'
আল্লামা হাইসামি তাঁর মাজমাউজ জাওয়ায়েদ গ্রন্থে লিখেছেন, 'ইমাম তাবারানি এ ঘটনা তাঁর মু'জামুল কাবির এবং মু'জামুল আওসাত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তবে তাঁর সনদে আবদুল্লাহ ইবনে মুআম্মাল নামের এক বর্ণনাকারী রয়েছেন। ইবনে হিব্বان একে নির্ভরযোগ্য বলে আখ্যায়িত করে বলেন, কখনো তিনি বর্ণনায় ভুল করে বসেন। ইবনে মাঈন তাঁকে কোনো এক বর্ণনায় নির্ভরযোগ্য বলে মন্তব্য করলেও অধিকাংশ হাদিসবিশারদ তাঁকে দুর্বল বলেছেন।'
ইবনে হাজার ফাতহুল বারি গ্রন্থে এ ঘটনা প্রসঙ্গে লেখেন, ইবনে আয়েদ আবদুর রহমান ইবনে সাবেত থেকে মুরসাল ধারায় বর্ণনা করেন, নবীজি উসমান ইবনে তালহার হাতে কাবাঘরের চাবি প্রদান করে বললেন, 'এই চাবি গ্রহণ করো। তোমার ওপর চিরকাল এ দায়িত্ব থাকবে। আমি নিজে এ দায়িত্ব তোমাকে দিইনি; বরং আল্লাহ তোমাকে এই দায়িত্ব দিয়েছেন। একমাত্র জালেম ছাড়া অন্য কেউ তোমার থেকে কাবাঘরের রক্ষকের দায়িত্ব ছিনিয়ে নিতে পারবে না।'
ইবনে জুরাইজের সনদে বর্ণিত, সাহাবি আলি নবীজিকে বললেন, 'আজ থেকে আপনি কাবাঘরের রক্ষক ও এর চাবির দায়িত্ব এবং হাজিদের পানি পান করানোর দায়িত্ব আমাদের প্রতি অর্পণ করুন।' এর উত্তরে কোরআনের এ আয়াত অবতীর্ণ হয়:
'নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেকে প্রাপ্য আমানতসমূহ প্রাপকদের নিকট যথারীতি পৌছে দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করছেন। আর যখন তোমরা মানুষের কোনো বিচার-মীমাংসা করো, তখন ন্যায়ভিত্তিক মীমাংসা করিয়ো। আল্লাহ তোমাদিগকে উপদেশ দান করেন। নিশ্চয় আল্লাহ শ্রবণকারী, দর্শনকারী।'
এরপর নবীজি উসমান ইবনে তালহাকে ডেকে পাঠান। উসমান এলে নবীজি তাঁর হাতে কাবার চাবি প্রদান করে বললেন, 'এখন থেকে চাবি তোমার কাছেই থাকবে। একমাত্র জালেম ছাড়া অন্য কেউ তোমার থেকে কাবাঘরের রক্ষকের দায়িত্ব ছিনিয়ে নিতে পারবে না।'
প্রথমত, এ ঘটনা মুরসাল ধারায় বর্ণিত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, ইবনে জুরাইজের সনদে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে। কারণ ইবনে জুরাইজ নবীজির সাহাবি আলির সাক্ষাৎ পাননি। ইমাম জাহবি তাঁর সিয়ার গ্রন্থে এ ঘটনা হাদিসের বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন। শু'আইব আরনাউত ইমাম জাহবির বর্ণনার বিশ্লেষণে লিখেছেন, ওই ঘটনার সনদ দুর্বল। কারণ এতে আবদুল্লাহ ইবনে মুআম্মাল রয়েছেন, যিনি দুর্বল বলে বিবেচিত।
তাহজিব গ্রন্থে সাহাবি উসমান ইবনে তালহার জীবনীতে এসেছে, মুসআব জুবাইরি বলেন, নবীজি শাইবা ইবনে উসমানকে কাবাঘরের চাবি দিয়ে বললেন, 'হে আবু তালহার সন্তান! এ চাবি গ্রহণ করো। তোমাদের কাছে সব সময় এ দায়িত্ব থাকবে।' শাইবা ইবনে উসমান ইবনে আবু তালহার জীবনীতেও এ রকম বর্ণিত হয়েছে।
মুহাজির আরোহীকে স্বাগত
ইমাম তিরমিজি তাঁর সুনানে তিরমিজি গ্রন্থে আবদু ইবনে হুমাইদের সূত্রে সাহাবি ইকরিমা ইবনে আবু জাহল (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'যেদিন আমি নবীজির দরবারে ইসলাম গ্রহণের জন্য আগমন করি, তখন আমি বাহনের ওপর ছিলাম। তিনি আমাকে অভ্যর্থনা জানাতে এসে বললেন, মুহাজির আরোহীকে স্বাগত।'
অতঃপর ইমাম তিরমিজি বলেন, 'এ বর্ণনার সনদ সহিহ নয়। শুধু এই সনদ ছাড়া অন্য কোনো সনদে আমি এই বর্ণনা পাইনি। এ সনদে মুসা ইবনে মাসউদ রয়েছেন, যিনি হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে দুর্বল বলে পরিচিত। আবদুর রহমান ইবনে মাহদি এ ঘটনা আবু সুফিয়ানের সূত্রে ইবনে ইসহাক থেকে মুরসাল ধারায় বর্ণনা করেছেন।'
আল্লামা হাইসামি তাঁর মাজমাউজ জাওয়ায়েদ গ্রন্থে এ ঘটনার তিনটি সনদ উল্লেখ করেছেন এবং সব সনদের মূলসূত্র ইমাম তাবারানি এর দিকে সম্পৃক্ত করেছেন। প্রথম সনদের ব্যাপারে তিনি লেখেন, 'এ সনদ বিচ্ছিন্ন।' দ্বিতীয় সনদের ব্যাপারে বলেন, 'ইমাম তাবারানি এটি মুরসাল ধারায় বর্ণনা করেছেন। তবে তাঁর সনদের বর্ণনাকারীরা সহিহ হাদিসের বর্ণনাকারী হিসেবে পরিচিত।' তৃতীয় সনদের ব্যাপারে তিনি লেখেন, 'ইমাম তাবারানি এটি বর্ণনা করেছেন। তাঁর সনদের বর্ণনাকারীরা সহিহ হাদিসের বর্ণনাকারী হিসেবে পরিচিত। তবে মুসআব ইবনে সা'আদ নবীজির সাহাবি ইকরিমা থেকে কোনো কিছু শোনা প্রমাণিত নয়।'
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি ফাতহুল বারি গ্রন্থে এ বর্ণনা সঠিক হওয়ার প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে এ রকম অন্য ঘটনা উল্লেখ করেছেন। যথা তিনি লেখেন, আবদুল কায়েসের প্রতিনিধিদল ইসলাম গ্রহণের জন্য নবীজির দরবারে আগমন করার পর তিনি তাদেরকে 'এ জাতিকে স্বাগত' বলে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। নবীজি তাদের উদ্দেশে এ স্বাগত সম্বোধন কয়েকবার উচ্চারণ করেছিলেন। উম্মে হানি সম্পর্কে হাদিসে এসেছে, নবীজি তাঁকে 'উম্মে হানিকে স্বাগত' বলে স্বাগত জানান। তা ছাড়া ইকরিমাকে নবীজি 'মুহাজির আরোহীকে স্বাগত' বলে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। এমনকি নবীজি নিজ কন্যা ফাতিমাকেও (রা.) 'আমার কন্যাকে স্বাগত' বলে অভ্যর্থনা জানান। অতঃপর ইবনে হাজার বলেন, এ-সংক্রান্ত সব বর্ণনাই সহিহ।
কিন্তু তিনি তাঁর অপর ইসাবাহ নামক গ্রন্থে ইকরিমার জীবনীতে লিখেছেন, 'ইকরিমার একটি ঘটনা সুনানে তিরমিজি গ্রন্থে মুসআব ইবনে সা'আদের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। সুনানে তিরমিজি গ্রন্থের ওই সনদ বিচ্ছিন্ন। কারণ মুসআব ইবনে সা'আদ নবীজির সাহাবি ইকরিমার সাক্ষাৎ পাননি।' উল্লেখ্য, ইবনে হাজার ফাতহুল বারি গ্রন্থ রচনার পর ইসাবাহ গ্রন্থ রচনা করেন।
তাহজিব গ্রন্থে ইকরিমার জীবনীতে উল্লেখিত হয়েছে, হাদিসের প্রখ্যাত সনদ নিরীক্ষক আবু হাতেম বলেন, 'আমার ধারণামতে মুসআব ইবনে সা'আদ ইকরিমা থেকে সরাসরি কোনো কিছু শোনেননি।' ইমাম বুখারি এ প্রসঙ্গে বলেন, 'মুসআব সরাসরি ইকরিমা থেকে কিছু শোনেননি।'
ইমাম হাকিম মুসতাদরাক গ্রন্থে আবু ইসহাকের সূত্রে মুসআব ইবনে সা'আদ থেকে ইকরিমার ঘটনা বর্ণনা করার পর বলেন, 'এর সনদ সহিহ। তবে ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম এ সনদে উল্লেখ করেননি।' ইমাম জাহবি এরপর বলেন, 'এ বর্ণনা সহিহ হলেও এর সনদে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে। কারণ মুসআব ইকরিমার সাক্ষাৎ পাননি।' এদিকে ইমাম জাহবি তাঁর তারিখুল ইসলাম গ্রন্থে এ ঘটনা প্রসঙ্গে লেখেন, 'ওই ঘটনার সনদ দুর্বল।'
তা ছাড়া এক হাদিসের বর্ণনা অনেক জায়গায় পাওয়া যায়। নবীজি ইরশাদ করেন, 'আমি জান্নাতে আবু জাহলের মালিকানাধীন একটি খেজুরগাছ দেখেছি। গাছটিতে খেজুরের থোকা ঝুলছিল।' ইকরিমার ইসলাম গ্রহণের পর নবীজি উম্মুল মুমিনিন উম্মে সালমাকে (রা.) বলেছিলেন, 'হে উম্মে সালমা! ইকরিমা হলো আবু জাহলের সেই খেজুরগাছ।'
ইমাম হাকিম এ হাদিস বর্ণনা করার পর বলেন, 'এর সনদ সহিহ। তবে ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম তা উল্লেখ করেননি।' তবে ইমাম জাহবি তালখিস গ্রন্থে বলেন, 'এ কথা সঠিক নয়। এই সনদে দুজন দুর্বল বর্ণনাকারী রয়েছেন।' শাইখ আলবানিও একে দুর্বল বলেছেন।
ছাফওয়ান ইবনে উমাইয়াকে নবীজির ধর্ম বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা প্রদান
ইমাম মালিক তাঁর বিখ্যাত মুয়াত্তা গ্রন্থে ইবনে শিহাবের সূত্রে বর্ণনা করেন, নবীজির যুগে অনেক নারী নিজের মাতৃভূমিতে ইসলাম গ্রহণ করে বসবাস করতেন। তাঁদের স্বামী অমুসলিম হওয়ার কারণে তাঁরা হিজরত করতে পারেননি। তাঁদের অন্যতম ছিলেন বিনতে ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা। তিনি সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার স্ত্রী ছিলেন।
অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের পর বিনতে ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা ইসলাম গ্রহণ করেন। তখন তাঁর স্বামী সাফওয়ান মুসলিম বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার ভয়ে মক্কা থেকে পালিয়ে যায়। নবীজি সাফওয়ানের চাচাতো ভাই ওয়াহাব ইবনে উমায়েরকে নিরাপত্তার নিদর্শনস্বরূপ নিজের একটি চাদর প্রদান করে সাফওয়ানের কাছে ইসলামের দাওয়াত ও মক্কায় ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে প্রেরণ করেন। নবীজি ওয়াহাবকে বলে দেন, 'ছাফওয়ান এতে সম্মত হলে তাকে নিয়ে আসবে; অন্যথায় তাকে আমার পক্ষ থেকে দুই মাস ভেবে দেখার সময় দেবে।'
ওয়াহাব ইবনে উমায়ের যথারীতি নবীজির পক্ষ থেকে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে সাফওয়ানের কাছে গমন করেন। এরপর সাফওয়ান ওয়াহাবের সঙ্গে মক্কায় ফিরে আসে। সে মক্কায় প্রবেশ করে লোকদের সামনে ডেকে বলে, 'হে মুহাম্মদ! ওয়াহাব আপনার পক্ষ থেকে এ চাদর নিয়ে আমাকে আপনার কাছে ফিরে আসার জন্য বলেছে। সঙ্গে সে এটাও বলেছে, আপনি আমাকে ইসলামের দিকে দাওয়াত দিচ্ছেন। আমি তা গ্রহণ করলে আমার প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে এবং না মানলে আমাকে দুই মাসের সুযোগ দেওয়া হবে।' উত্তরে নবীজি বললেন, 'আবু ওয়াহাব! তুমি ফিরে এসো।' সাফওয়ান বলল, 'না, আল্লাহর কসম! যতক্ষণ না আপনি আপনার প্রস্তাবের ব্যাখ্যা দেন।' এবার নবীজি তাকে বললেন, 'ঠিক আছে, তোমাকে চার মাসের সময় দিলাম। তুমি ভেবে দেখো।'
অতঃপর নবীজি হাওয়াজেন ও হুনাইন অভিযানে রওনা হন। অভিযানে যাওয়ার সময় তিনি সাফওয়ানের অস্ত্র ও যুদ্ধসরঞ্জাম ধার হিসেবে দেওয়ার জন্য তাকে আহ্বান করেন। সাফওয়ান জিজ্ঞেস করল, 'স্বেচ্ছায় দেব, নাকি অনিচ্ছা সত্ত্বেও দিতে হবে?' নবীজি উত্তর দিলেন, 'স্বেচ্ছায় দাও।' তখন সাফওয়ান তার যাবতীয় যুদ্ধসরঞ্জাম ও অস্ত্র নবীজিকে দিয়ে তাঁর সঙ্গে হুনাইন ও তায়েফের অভিযানে অংশগ্রহণ করে। সে এই দুই অভিযানে নবীজির ব্যবহার ও মুসলিমদের চলাফেরা গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করে। অথচ তখনো সে কাফের ছিল। নবীজি সাফওয়ানকে তার মুসলিম স্ত্রীর থেকে বিচ্ছিন্ন না করে একসঙ্গে থাকতে বলেন। পরে একপর্যায়ে সাফওয়ানও ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়। নবীজি তাঁদের আগের বিয়ে বহাল রাখেন।
ইবনে আবদুল বার ওই ঘটনা সম্পর্কে বলেন, 'আমি এ বর্ণনার কোনো সহিহ সূত্র সম্পর্কে অবগত নই। তবে ঐতিহাসিক ও সিরাত গবেষকদের কাছে এ ঘটনা ব্যাপক প্রসিদ্ধ। ইবনে শিহাব হচ্ছেন সিরাত গবেষকদের ইমাম। আর এ বর্ণনার প্রসিদ্ধি এর সনদের চেয়েও শক্তিশালী।'
শাইখ আলবানি বলেন, 'এটি মুরসাল ধারায় বর্ণিত।'
ইবনে ইসহাক এ ঘটনা মুহাম্মদ ইবনে জাফরের সূত্রে উরওয়া ইবনে জুবায়েরের সূত্রে এভাবে বর্ণনা করেন। উরওয়া বলেন, নবীজির মক্কা বিজয়ের পর সাফওয়ান ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ইয়েমেনে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করে। তাই সে গোপনে জেদ্দা নগরীর উদ্দেশে মক্কা ত্যাগ করে। এদিকে সাফওয়ানের পলায়নের ব্যাপারটি কারও মাধ্যমে জানাজানি হয়ে যায়।
📄 গাযওয়ায়ে হুনাইন
হুনাইন ও তায়েফের যুদ্ধের প্রচলিত কাহিনি
তার জবান বন্ধ করে দাও
ইমাম মুসলিম রাফে ইবনে খুদাইজের সূত্রে বর্ণনা করেন, হুনাইনের যুদ্ধের পর নবীজি গনিমতের সম্পত্তি বণ্টন করার সময় আবু সুফিয়ান ইবনে হারব, সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া, উয়াইনাহ ইবনে হিসন ও আকরা ইবনে হাবেস প্রমুখ ব্যক্তির প্রত্যেককে ১০০ করে উট প্রদান করেন। আর আব্বাস ইবনে মিরদাসকে ১০০ উটের চেয়ে কিছু কম প্রদান করেন।
নিজের ভাগে কম দেখে আব্বাস ইবনে মিরদাস নিচের কবিতা আবৃত্তি করেন:
ওই সম্পদ, যা লুট করেছি আমি এবং আমার ঘোড়া, যার নাম উবাইদ,
বণ্টন করে দিচ্ছেন উয়াইনিয়া এবং আকরার মাঝে?
অথচ বদর/হিসন (উয়াইনার পিতা) ও হাবিস (আকরার পিতা)
কখনোই কোনো যুদ্ধে তাদের কেউই মিরদাসের (কবির পিতা, মানে আব্বাসের পিতা) চেয়ে এগিয়ে নয়।
আমিও কম নেই তাদের চেয়ে কোনো অংশে,
ফিরে পাবে না সে নিজের মর্যাদা; আজকের দিনে নত হবে যে ॥
তাঁর আবৃত্তি শুনে নবীজি তাঁকেও ১০০ উট প্রদান করেন।
কিন্তু ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় উল্লেখিত হয়েছে, নবীজি নও-মুসলিমদের আস্থা বৃদ্ধির জন্য তাদেরকে অন্যদের চেয়ে একটু বেশি করে প্রদান করেছিলেন। এ ছাড়া তাঁর বর্ণনায় আব্বাস ইবনে মিরদাসের কবিতার আরও অতিরিক্ত চার লাইন বেশি উল্লেখিত হয়েছে।
এ ছাড়া এ ঘটনার শেষে ইবনে ইসহাক আরও বর্ণনা করেন, আব্বাস ইবনে মিরদাসের কবিতা শুনে নবীজি বললেন, 'তোমরা আমার ব্যাপারে তার জবান বন্ধ করে দাও।' অর্থাৎ তাকে এ পরিমাণ দাও, যাতে সে আমার ব্যাপারে আর কোনো অভিযোগ করতে না পারে। নবীজির নির্দেশ পেয়ে সাহাবিগণ তাঁকে আরও এত বিপুল সম্পত্তি প্রদান করেন, যা দেখে ইবনে মিরদাস খুশি হয়ে যান।
এ ঘটনা ওয়াকিদি ও ইবনে সা'আদ আরও দুই সনদে বর্ণনা করেন। প্রথম সনদ ওয়াকিদির সূত্রে এবং দ্বিতীয় সনদ আরেম ইবনে ফজলের সূত্রে হিশাম ইবনে উরওয়া ও তাঁর পিতা থেকে। তবে এ বর্ণনা মুরসাল ধারায় বর্ণিত।
হাফেজ ইরাকি বলেন, ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় যে অতিরিক্ত 'তার জবান বন্ধ করে দাও' উল্লেখিত হয়েছে, তা অন্য কোনো প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক গ্রন্থে পাওয়া যায় না। তিনি এটি সনদ ছাড়া উল্লেখ করেছেন।
শুধু নবীই এ রকম উপঢৌকন দিতে পারেন
ওয়াকিদি বর্ণনা করেন, হুনাইনের যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া নবীজির সঙ্গে ঘোরাফেরা করছিলেন। এ যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ উট, ছাগল ও ভেড়া গনিমত হিসেবে মুসলিম বাহিনী লাভ করে। সাফওয়ান নবীজির সঙ্গে ঘুরে ঘুরে এসব দেখছিলেন। সমস্ত সম্পদ ও পশুর পাল এক জায়গায় সমবেত করা হচ্ছিল। তখন সাফওয়ান বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে পশুর পালের দিকে বারবার দেখছিলেন। হঠাৎ সাফওয়ানের দৃষ্টি একটি গিরিপথের ওপর আটকে গেল। ওই গিরিপথ উট, ছাগল এবং এগুলোর রাখাল দিয়ে ভরপুর ছিল। ব্যাপারটি নবীজির দৃষ্টিতে আটকে গেল।
তিনি সাফওয়ানকে বললেন, 'কী হে সাফওয়ান! এত বিপুল সম্পদ দেখে আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছ?' উত্তরে সাফওয়ান বললেন, 'জি হ্যাঁ'।
তখন নবীজি গিরিপথে একটি পশুর পালের দিকে দেখিয়ে বললেন, 'সাফওয়ান! এখানে যা কিছু আছে, সব তোমাকে দিয়ে দিলাম।' হঠাৎ এত বিপুল পরিমাণ পশু উপঢৌকন হিসেবে পেয়ে সাফওয়ান আনন্দে আত্মহারা হয়ে যান। তিনি বলে ওঠেন, 'এ রকম উপঢৌকন কেবল নবীই দিতে পারেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর রাসুল।'
উল্লেখ্য, বর্ণনাকারী ওয়াকিদির ব্যাপারে আগে বলা হয়েছে, তিনি হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যাত বলে সবার কাছে পরিচিত।
অথচ সাফওয়ানের ঘটনা সহিহ মুসলিম গ্রন্থে ইবনে শিহাবের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের পর নবীজি স্বীয় সাহাবিদের বাহিনী ও মক্কার নও-মুসলিমদের একটি দল নিয়ে হুনাইন অভিযানের উদ্দেশে রওনা হন। তুমুল লড়াইয়ের পর হুনাইন যুদ্ধেও মুসলিমরা বিজয় লাভ করেন। এ যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ সম্পদ ও সম্পত্তি গনিমত হিসেবে মুসলিমরা লাভ করেন। নবীজি সেখান থেকে সাফওয়ানকে প্রথমে ১০০ উট প্রদান করেন। অতঃপর আরও ১০০ উট দেন। এরপর আরও ১০০ প্রদান করেন। এতে সাফওয়ান হতবাক হয়ে যান।
অতঃপর ইবনে শিহাব সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যেবের সূত্রে বলেন, নবীজির কাছ থেকে এত বিপুল সম্পদ উপঢৌকন হিসেবে পেয়ে সাফওয়ান বলেছিলেন, 'আল্লাহর কসম! নবীজি আমাকে এত পরিমাণ সম্পদ প্রদান করেছেন, যা আমি ভাবতেও পারিনি। এর আগে তিনি আমার কাছে সবচেয়ে বেশি ঘৃণার পাত্র ছিলেন। কিন্তু তাঁর পক্ষ থেকে এত কিছু উপঢৌকন পেয়ে তাঁকে না ভালোবেসে থাকতে পারিনি। তখন থেকেই তিনি আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষে পরিণত হন।'
এ বর্ণনার অপর অংশে এসেছে, রাফে ইবনে খাদিজ বলেন, 'নবীজি আবু সুফিয়ান ইবনে হারব, সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া, উয়াইনাহ ইবনে হিসন, আকরা ইবনে হাবেসসহ প্রত্যেককে ১০০ করে উট প্রদান করেছিলেন।' প্রিয় নবীজির দানশীলতা বর্ণনাতীত। এ জগতে আল্লাহ তায়ালার পরে তাঁর চেয়ে দানশীলতায় আর কেউ এগিয়ে নয়। সহিহ মুসলিম গ্রন্থে সাহাবি আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজির নিকট ইসলাম গ্রহণ করার পর কেউ কিছু চাইলে তিনি অবশ্যই তা দিয়ে দিতেন। আনাস বলেন, একবার এক ব্যক্তি নবীজির কাছে এল। তিনি তাকে এত বেশি ছাগল দিলেন, যাতে দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থান পূর্ণ হয়ে যাবে। তারপর সেই ব্যক্তি তার গোত্রের কাছে গিয়ে তাদের উদ্দেশ করে বলল, 'হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা ইসলাম গ্রহণ করো। কারণ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভাবের আশঙ্কা না করে দান করতেই থাকেন।'
মুআবিয়াকে নবীজির ১০০ উট প্রদান
ওয়াকিদি বর্ণনা করেন, নবীজি হুনাইনের গনিমত থেকে সাহাবি মুআবিয়াকেও (রা.) ১০০ উট ও ৪০ আউন্স মূল্যের সমপরিমাণ স্বর্ণ প্রদান করেন।
ইমাম জাহবি তাঁর সিয়ার গ্রন্থে এ ঘটনা প্রসঙ্গে লেখেন, 'আমার মনে হচ্ছে, ওয়াকিদি নিজেও জানেন না, কখন কী বলে ফেলেন! ওয়াকিদির নিজের বর্ণনায়ই হলো মুআবিয়া প্রথম দিকের মুসলমান। তাহলে তাঁর মন আকৃষ্ট করতে হুনাইনের যুদ্ধে প্রাপ্ত গনিমত থেকে নবীজি তাঁকে কেন বিপুল পরিমাণ সম্পদ দেবেন? যদি নবীজি তাঁকে এত বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি দিয়েই থাকেন, তাহলে মুআবিয়া কর্তৃক বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার পর ফাতেমা বিনতে কায়েস যখন নবীজির কাছে পরামর্শের জন্য এলেন, তখন তাঁকে নবীজি কেন বললেন যে “মুআবিয়া নিঃস্ব, তার কোনো সম্পদ নেই”।'
শাইবা ইবনে উসমান কর্তৃক নবীজিকে হত্যার প্রচেষ্টা
ইবনে ইসহাক বলেন, 'শাইবা ইবনে উসমানের পিতা মুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে উহুদের প্রান্তরে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারায়। এ জন্য শাইবা কঠিন প্রতিশোধের সুযোগ খুঁজছিল। হুনাইনের যুদ্ধে সেই সুযোগ তার হাতে এসে যায়। এ প্রসঙ্গে শাইবা নিজেই বলে, 'হুনাইনের যুদ্ধের পর আমি ভাবতে থাকি, এবার সে সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। মুহাম্মদকে শেষ করে দেব।
'এ লক্ষ্যে আমি তাঁকে হত্যা করার জন্য তাঁর পিছু নেই। কিন্তু যখনই আমি মুহাম্মদের কাছাকাছি এসে তাঁকে হত্যা করতে উদ্যত হই, তখনই আমি অচেতন হয়ে যেতাম। মনে হতো, কে যেন আমার আত্মার ওপর আবরণ ফেলে দিয়েছে। পরক্ষণেই চেতনা ফিরে পাই। বুঝতে পারি, তাঁকে হত্যা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। অদৃশ্য শক্তি তাঁকে রক্ষা করে যাচ্ছে।'
ইমাম বায়হাকি তাঁর দালায়েল গ্রন্থে ওয়ালিদ ইবনে মুসলিমের সূত্রে শাইবা ইবনে উসমান থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'আমি যখন হুনাইন যুদ্ধের দিন দেখলাম, নবীজি উন্মুক্তভাবে নিরাপত্তা প্রহরা ছাড়াই ঘোরাফেরা করছেন, তখন আমার পিতা ও চাচার মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের কথা মনে পড়ে যায়। উহুদের যুদ্ধে আলি ও হামজা (রা.) তাদেরকে হত্যা করেছিলেন।
'তাই ভাবতে থাকি, এবারই এর উপযুক্ত বদলা নেওয়ার সময়। এরপর আমি তাঁর ডান দিকে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু দেখি, সেখানে আব্বাস নবীজিকে প্রহরা দিচ্ছেন। তিনি নবীজির সম্মানিত চাচা। কখনোই তিনি মুহাম্মদকে (সা.) অপদস্থ হতে দেবেন না। এরপর আমি বাম দিকে যাওয়ার চেষ্টা করি। দেখি, সেখানে নবীজির চাচাতো ভাই আবু সুফিয়ান ইবনে হারিস পাহারায় নিযুক্ত। ভাবলাম, নিশ্চয় তাঁর চাচাতো ভাই আল্লাহর নবীকে কখনো অপমানিত হতে দেবেন না। অবশেষে আমি নবীজির পেছনে অবস্থান গ্রহণ করি এবং তরবারি তাঁর দিকে তাক করি। হঠাৎ দেখতে পাই, আমার ও নবীজির মধ্যে একটি অগ্নির স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠছে। মনে হচ্ছিল, আমাকে দগ্ধ করে ফেলবে এই অগ্নিশিখা। লজ্জায়, ভয়ে আমি হাত দিয়ে চোখ ঢেকে ফেলি এবং পেছনের দিকে চলতে শুরু করি।
'কিন্তু সেই মুহূর্তে নবীজি আমার দিকে তাকিয়ে ডাক দিলেন— শাইবা! শাইবা!! আমার কাছে এসো।” অতঃপর দোয়া করলেন, "শাইবার কাছ থেকে শয়তানকে তাড়িয়ে দিন।” নবীজির ডাক শুনে চোখ তুলে তাঁর দিকে তাকাই। আশ্চর্য অনুভূত হচ্ছিল আমার। নবীজির দিকে তাকাতেই তিনি আমার চোখ-কান থেকেও যেন আমার সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। অতঃপর নবীজি বললেন, “শাইবা! কাফেরদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ো।"'
ইমাম জাহবি এ ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, ওই ঘটনা খুবই অপরিচিত। অর্থাৎ তেমন প্রসিদ্ধ নয়।
আল্লামা হাইসামি এ ঘটনা মাজমাউজ জাওয়ায়েদ গ্রন্থে ইমাম তাবারানির দিকে সম্পৃক্ত করার পর বলেন, এ বর্ণনার সনদে আবু বকর হাজলি রয়েছেন, তিনি দুর্বল।
তবে এ প্রসঙ্গে মূল গ্রন্থকার বলেন, 'আবু বকর হাজলিকে শুধু দুর্বল বলাই যথেষ্ট নয়।' হাফেজ ইবনে হাজার ও ইমাম জাহাবি তাঁকে পরিত্যক্ত বলেছেন।
ইমাম বায়হাকি আইয়ুব ইবনে জাবেরের সূত্রে মুসআব ইবনে শাইবার পিতা শাইবা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, 'আমি হুনাইনের অভিযানে নবীজির সঙ্গে বের হই। আল্লাহর কসম! ইসলামের প্রতি আমার কোনো আগ্রহই ছিল না। ইসলামের আকর্ষণে আমি তাঁর সঙ্গে রণাঙ্গনে যাইনি। কিন্তু কুরাইশদের ওপর হাওয়াজেন গোত্রের বিজয় অর্জনকে আমি গর্বভরে প্রত্যাখ্যান করছিলাম। ভাবছিলাম, এমন হতেই পারে না।'
এরপর শাইবা বলেন, 'রণাঙ্গনে আমি নবীজির সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ দেখি, অনেকগুলো সাদা-কালো ঘোড়ায় আরোহী সৈন্যরা যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে যাচ্ছে। আমি নবীজিকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, “শাইবা! শুধু কাফেররা এ ঘোড়াগুলো দেখতে পায়।” এরা মুসলিমদের পক্ষ হয়ে লড়ছিল। অতঃপর নবীজি আমার বুকের ওপর হাত রেখে তিনবার দোয়া করলেন, “আল্লাহ! আপনি শাইবাকে সরল পথের দিশা দিন।" নবীজির দোয়া শেষ হতেই তিনি আমার কাছে জগতের সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।'
ইমাম বায়হাকি এর উপরিউক্ত বর্ণনার সনদে আইয়ুব ইবনে জাবের দুর্বল বলে বিবেচিত। অপর বর্ণনাকারী সাদকা ইবনে সাঈদ হানাফির ব্যাপারে হাফেজ ইবনে হাজার বলেন, 'তাঁর বর্ণিত হাদিস দুর্বল। তবে সমার্থক বর্ণনা পাওয়া গেলে তা গ্রহণ করা যাবে। আমি মুসআব নামে শাইবার কোনো সন্তানের কোনো সন্ধান পাইনি। বিভিন্ন বর্ণনায় মুসআব ইবনে শাইবা নামে যে বর্ণনাকারী উল্লেখিত হয়েছে, তিনি হচ্ছেন ঘটনার মূল নায়কের নাতির পুত্র। তার নাম হচ্ছে মুসআব ইবনে শাইবা ইবনে জুবায়ের ইবনে শাইবা ইবনে উসমান ইবনে আবু তালহা।'
ইমাম আহমাদ তাঁর ব্যাপারে বলেন, 'তিনি মুনকার হাদিস বর্ণনা করে থাকেন।' ইমাম নাসায়িও এমন বলেছেন। ইমাম দারা কুতনি বলেন, 'তিনি হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে শক্তিশালী নন; আবার তিনি হাদিসের হাফেজও নন।' ইমাম আবু দাউদ তাঁকে দুর্বল বলেছেন। তবে ইবনে মাঈন ও শাইখ আজলি তাঁকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন। আর এ কারণে ইবনে হাজার তাঁর তাকরিব গ্রন্থে শাইবাকে 'হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে দুর্বল প্রকৃতির' বলে আখ্যায়িত করেছেন।
ইবনে কাসির তাঁর বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে এ ঘটনা ওয়াকিদির সনদে উল্লেখ করেন। উল্লেখ্য, ওয়াকিদির ব্যাপারে আগেই বলা হয়েছে, তিনি প্রত্যাখ্যাত বলে পরিচিত।
এ ছাড়া ইবনে হাজার আসকালানি তাঁর ইসাবা গ্রন্থে এ ঘটনা ইবনে আবু খাইছামার সূত্রে মুসআব নুমাইরি থেকে বর্ণনা করেছেন। অতঃপর তিনি বলেন, 'ইবনে সাকানের মতে, শাইবার ইসলাম গ্রহণের ঘটনার সনদে সমস্যা রয়েছে।'
উল্লেখ্য, ইবনে সাকান হাদিসশাস্ত্রের বিখ্যাত পণ্ডিত ছিলেন। তাঁর পুরো নাম হচ্ছে আবু আলি সাঈদ ইবনে উসমান ইবনে সাঈদ ইবনে সাকান। একাধিক বিষয়ে তাঁর গবেষণা ও রচিত গ্রন্থ রয়েছে। হাদিসের সনদের দক্ষ নিরীক্ষক ছিলেন তিনি। ৩৫৩ হিজরিতে তাঁর ইন্তেকাল হয়। ইবনে হাজার আসকালানি তাঁকে বিচক্ষণ আলেম ও মর্যাদাবান ব্যক্তিত্ব বলে আখ্যায়িত করেছেন।
📄 হিজরতের নবম বছর
নবীজি কর্তৃক তায়েফবাসীর প্রতি মিনজানিক দিয়ে গোলা নিক্ষেপ
ইবনে হিশাম তায়েফের যুদ্ধ সম্পর্কে নবীজির সিরাতের বিখ্যাত রচয়িতা ইবনে ইসহাকের বর্ণিত ঘটনা থেকে অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, 'আমি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জেনেছি, নবীজি তায়েফের যুদ্ধে তায়েফবাসীর প্রতি মিনজানিক দিয়ে গোলা নিক্ষেপ করেছিলেন। ইতিহাসে নবীজিই সর্বপ্রথম যুদ্ধে মিনজানিক ব্যবহার করেন।'
ইমাম জাইলাঈ বলেন, 'ইমাম তিরমিজি এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তবে তাঁর সনদে ধারাবাহিকতা রক্ষা হয়নি।'
হাফেজ ইবনে হাজার বলেন, ইমাম আবু দাউদ মারাসিল গ্রন্থে ছাওরের সূত্রে মাকহুল থেকে বর্ণনা করেন, নবীজি তায়েফের যুদ্ধে তায়েফবাসীর দুর্গের দিকে তাক করে মিনজানিক স্থাপন করেছিলেন। ইমাম তিরমিজি এ ঘটনা বর্ণনা করলেও সনদে মাকহুলের নাম উল্লেখ করেননি। তাই ওই সনদে ছাওরের আগে মাকহুল থেকে বিচ্ছিন্নতা দেখা দিয়েছে। ইমাম আবু দাউদ ইয়াহইয়া ইবনে আবু কাসির থেকে মুরসাল ধারায় বর্ণনা করেন, নবীজি তায়েফবাসীকে এক মাস যাবৎ অবরোধ করে রাখেন। ইমাম আওজায়ি বলেন, 'আমি ইয়াহইয়াকে নবীজি কর্তৃক মিনজানিক নিক্ষেপের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি তা অস্বীকার করে বলেন, আমি এ ব্যাপারে জানি না।'
অতঃপর ইবনে হাজার বলেন, 'ইবনে সা'আদ এ ঘটনা কুবাইসার সূত্রে ছাওর মারফত মাকহুল থেকে বর্ণনা করেন। ইমাম আবু দাউদ এভাবেই বর্ণনা করেছেন। তবে উকাইলি অন্য সনদে আলির সূত্রে ধারাবাহিক সনদে এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন।'
ইমাম বায়হাকিও তাঁর সুনানে কুবরা গ্রন্থে নবীজি কর্তৃক তায়েফবাসীর প্রতি মিনজানিক নিক্ষেপের ঘটনা বর্ণনা করেছেন এবং সেটা যে আবু কিলাবা অস্বীকার করেছেন, সেটাও বলেছেন।
সহিহ মুসলিম গ্রন্থে সাহাবি আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমরা নবীজির সঙ্গে তায়েফের অভিযানে বের হই। ৪০ দিন যাবৎ তাদেরকে অবরোধ করে রাখি। এরপর মক্কায় ফিরে আসি।' উল্লেখ্য, আনাসে বর্ণনায় মিনজানিক নিক্ষেপের কথা উল্লেখ নেই।
তায়েফ অভিযানে নওফেল ইবনে মুআবিয়ার পরামর্শ
ওয়াকিদি তাঁর সনদে সাহাবি আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, তায়েফ অবরোধ করার পর যখন ১৫ দিন অতিবাহিত হয়ে গেল, তখন নবীজি সাহাবি নওফেল ইবনে মুআবিয়াকে (রা.) ডেকে পরামর্শ চাইলেন। নবীজি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, 'নওফেল! তোমার কী মনে হয়? এখন কী করা যেতে পারে?'
উত্তরে নওফেল বললেন, 'ইয়া রাসুলাল্লাহ! শেয়াল গর্তে ঢুকে গেছে। চেষ্টা অব্যাহত থাকলে ধরা পড়বে। ছেড়ে দিলেও আশঙ্কার কোনো কারণ নেই।' অর্থাৎ তায়েফবাসী কেল্লায় এক বছরের রসদ নিয়ে ঢুকে গেছে। তা ছাড়া তারা আর আক্রমণ করতে সাহস পাবে না। আর নবীজির উদ্দেশ্যও ছিল কেবল প্রতিরোধ করা। তাই নওফেলের পরামর্শে তিনি অবরোধ উঠিয়ে নিলেন।
উল্লেখ্য, আগে একাধিকবার বলা হয়েছে, বর্ণনার ক্ষেত্রে ওয়াকিদি পরিত্যক্ত। তা ছাড়া শাইখ আলবানি এ বর্ণনাকে দুর্বল সাব্যস্ত করে ওয়াকিদির ব্যাপারে বলেন, 'তিনি মিথ্যাবাদী হিসেবে অভিযুক্ত।'
নবীজির দুধমাতার আগমন
ইমাম বুখারি তাঁর আদাবুল মুফরাদ গ্রন্থে এবং ইমাম আবু দাউদ এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। ইমাম বায়হাকিও তাঁর দালালয়েল গ্রন্থে জাফর ইবনে ইয়াহইয়ার সূত্রে আবু তোফায়েল (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 'হুনাইনের যুদ্ধ শেষে ফেরার পথে আমি দেখলাম, জু'উররানা পল্লিতে নবীজি গনিমতের সম্পদ থেকে গোশত সবার মধ্যে বণ্টন করছেন। আমি তখন সবেমাত্র বালক। জবাইকৃত উট ও ভেড়ার হাড় বহন করে নিয়ে যাচ্ছিলাম। একটু পর দেখি, এক বৃদ্ধ মহিলা নবীজির কাছে আগমন করলেন। নবীজি তাঁকে দেখামাত্র নিজের চাদর বিছিয়ে ওই মহিলাকে বসতে দেন। আমি একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, মহিলাটি কে? সে উত্তর দিল, তিনি নবীজির দুধমাতা।'
ইমাম হাকিম এ ঘটনা বর্ণনা করার পর এর সনদ সম্পর্কে কিছু বলেননি। ইমাম জাহবিও এ ব্যাপারে নীরব থেকেছেন। তবে অন্য জায়গায় ইমাম হাকিম নিজ সনদে এ ঘটনা বর্ণনা করার পর বলেন, 'এর সনদ সহিহ; তবে ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম তা উল্লেখ করেননি।' আর ইমাম জাহবি এ প্রসঙ্গে কিছু না বললেও তিনি তাঁর তালখিস গ্রন্থে ওই ঘটনা উল্লেখ করেননি।
ইবনে কাসির তাঁর তারিখ গ্রন্থে এ ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, 'উপরিউক্ত ঘটনা খুবই অপরিচিত। সম্ভবত বর্ণনাকারী বলতে চাইছেন, জু'উররানা পল্লিতে নবীজির কাছে আগন্তুক ওই মহিলা নবীজির দুধবোন ছিলেন। যিনি নবীজির দুধমাতা হালিমা সাদিয়ার কন্যা ছিলেন এবং বাল্যকালে তিনি নবীজিকে কোলে রাখতেন এবং মায়ের সঙ্গে তিনিও দুধ পান করিয়েছেন। আর যদি বর্ণনাটি সহিহ হয়, তাহলে উদ্দেশ্য হবে, হালিমা সাদিয়া দীর্ঘদিন বেঁচে ছিলেন।
নবীজির বোন শাইমার আগমন
অতঃপর ইবনে ইসহাক বলেন, 'আমার কাছে ইয়াজিদ ইবনে উবাইদ সাদি বর্ণনা করেন, অতঃপর নবীজির কাছে আসার পর শাইমা বিনতে হারিস নবীজিকে বললেন, "মুহাম্মদ। আমি তোমার দুধবোন।" নবীজি প্রথমে তাঁকে চিনতে পারছিলেন না। তাই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "তোমার কাছে এর কোনো প্রমাণ অথবা নিদর্শন রয়েছে কি?" শাইমা বললেন, "ছোটবেলায় তুমি আমার পিঠে চড়ে বসেছিলে। তখন আমার পিঠে তুমি দাঁত দিয়ে কামড় বসিয়ে দিয়েছিলে। সেই চিহ্ন এখনো আমার পিঠে রয়ে গেছে।" এ কথা শুনে নবীজি তাঁকে চিনতে পারেন। সঙ্গে সঙ্গে নিজের চাদর বিছিয়ে দিয়ে তাঁকে বসতে দেন।
'অতঃপর নবীজি দুধবোনকে বললেন, "আপনি ইচ্ছে করলে আমার কাছে স্বেচ্ছায় সম্মানের সঙ্গে থেকে যেতে পারেন অথবা চাইলে আপনার জিনিসপত্র নিয়ে বাড়িও যেতে পারেন।" কিন্তু শাইমা বিনতে হারিস বাড়িতে চলে যেতে চাইলেন।'
ওই বর্ণনায় ইবনে ইসহাকের শিক্ষক ইয়াজিদ ইবনে উবাইদ নির্ভরযোগ্য বটে, কিন্তু তিনি তাবেয়ি ছিলেন। ঘটনার সময় সেখানে তিনি উপস্থিত ছিলেন না। অতএব, এটি মুরসাল পর্যায়ের বর্ণনার আওতাভুক্ত।
ইমাম বায়হাকি তাঁর দালায়েল গ্রন্থে হাকাম ইবনে আবদুল মালেকের সূত্রে কাতাদাহ থেকে এ ঘটনা এভাবেই বর্ণনা করেছেন।
ইমাম জাহবি তাঁর মাগাজি গ্রন্থে ওই ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, 'হাকামকে ইবনে মাঈন দুর্বল বলেছেন।' আর কাতাদার জন্ম ৬০ হিজরিতে। অতএব, ঘটনাটি মুরসাল সনদে বর্ণিত।
কাব ইবনে জুহাইরের কবিতা
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, তায়েফের অবরোধ তুলে নেওয়ার পর নবীজি যখন মক্কায় ফিরে যান, তখন বুজাইর ইবনে জুহাইর স্বীয় আপন ভাই কাৰ ইবনে জুহাইরকে চিঠি লিখে দূত প্রেরণ করে। কাব ইবনে জুহাইর ছিল মক্কার বিখ্যাত কবি। চিঠিতে লেখা ছিল:
'কাব! নবীজির বিরুদ্ধে কুরাইশদের যে কবিরা কটূক্তি করত এবং কাব্যের ছন্দে নিন্দা করে বেড়াত, তিনি তাদের একজনকে হত্যা করেছেন। এখন মক্কার অন্যান্য কবি-সাহিত্যিক, যথা ইবনে জাব'আরি ও হুবাইরা ইবনে আবু ওয়াহাব মক্কা থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। তারাও যেকোনো সময় গ্রেপ্তার হতে পারে। তোমার জন্য এখনো সুযোগ আছে। বাঁচতে চাইলে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গিয়ে আত্মসমর্পণ করো। তিনি অনুতপ্ত হয়ে কেউ ফিরে এলে তাকে ছেড়ে দেন। অন্যথায় আমাদের খুশিতে ভুলে গিয়ে নিজের বাঁচার পথ খুঁজে নাও।
ইতি তোমার ভাই বুজাইর ইবনে জুহাইর।
এদিকে কাব ইবনে জুহাইর স্বীয় ভাই বুজাইরের ইসলাম গ্রহণের খবর পেয়ে তাকে উদ্দেশ করে এই কবিতা আবৃত্তি করেছিল।
আমার পক্ষ থেকে কি এ চিঠি পৌঁছাবে না বুজাইরের কাছে?
তোমার জন্য সর্বনাশ ও ধ্বংসের কামনা ছাড়া আর কীই-বা করার আছে!!
যদি এমনটি নাই-বা করে থাকো, আমাকে তুমি বলো, কিসের লোভ তোমাকে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধ্য করল??
তুমি পাওনি তোমার পিতাকে ধ্বংসের কবলে; এমনকি তোমার মাকেও, তোমার ভাইও পড়েনি কখনো অধঃপতনের অতল গহ্বরে।
আর যদি এমনটি না করে থাকো তুমি মোটেই বাস্তবে,
দুঃখিত হব না, কিছু বলবও না; তোমার সন্ধান পেলে।
অতঃপর ইবনে ইসহাক বলেন, 'ভাইয়ের কাছ থেকে চিঠি পেয়ে কাব ইবনে জুহাইর ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে যায়। আরবের প্রশস্ত মরুও যেন তার সামনে সংকীর্ণ হয়ে আসতে থাকে। চারদিকের যেদিকে তাকায়, সবাইকেই তার শত্রু বলে মনে হতে থাকে। এদিকে মক্কা ও তায়েফের রাস্তাঘাটে লোকেরা বলতে থাকে, কাব ইবনে জুহাইরও মুসলিম বাহিনীর হাতে নিহত হবে। এ কথা কাব ইবনে জুহাইরের কানে পৌঁছালে সে আরও দিশেহারা হয়ে পড়ে। এরপর কাব উপায় না দেখে নবীজির প্রশংসায় কবিতা পাঠ করে। সেখানে কাব তার ভীতির কথা এবং শত্রুদের কাছ থেকে নিন্দাবাদের আশঙ্কার কথা তুলে ধরে। কোনো উপায় না পেয়ে অবশেষে সে নবীজির দরবারে রওনা হয়। ততক্ষণে নবীজি মদিনায় ফিরে চলে গেছেন। কাব ইবনে জুহাইর মদিনার মসজিদে নববিতে নামাজের সময় প্রবেশ করে।'
ইবনে ইসহাক আরও বলেন, 'নবীজির পেছনে নামাজ পড়ার পর সে নবীজির দিকে এগিয়ে যায়। নিজের দুই হাত নবীজির হাত মুবারকের ওপর রাখে। নবীজি তখনো তাকে চিনতে পারেননি। কাব নিজের পরিচয় গোপন করে নবীজিকে জিজ্ঞেস করে, "ইয়া রাসুলাল্লাহ। কাব ইবনে জুহাইর অনুতপ্ত হয়ে আপনার কাছে নিরাপত্তা চাইছে। আমি যদি তাকে আপনার কাছে নিয়ে আসি, তাহলে আপনি কি তাকে গ্রহণ করে নেবেন?” উত্তরে নবীজি সম্মতি দিলে সে বলে, "আমিই কাব ইবনে জুহাইর।"'
অতঃপর ইবনে ইসহাক আসেম ইবনে উমর ইবনে কাতাদার সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, কাব ইবনে জুহাইরের নাম শুনে এক আনসারি সাহাবি তার দিকে ধেয়ে আসেন আক্রমণ করার জন্য। ওই সাহাবি বলতে থাকেন, 'ইয়া রাসুলাল্লাহ! এ হচ্ছে আল্লাহর শত্রু। ওকে আমার হাতে ছেড়ে দিন। এর গর্দান উড়িয়ে দিই।' উত্তরে নবীজি বললেন, 'তাকে ছেড়ে দাও। নিশ্চয় সে অনুতপ্ত হয়ে ফিরে এসেছে।'
ইবনে ইসহাক আরও বলেন, 'আনসারি সাহাবির এহেন আচরণে কাব খুবই মনঃক্ষুণ্ণ হয়। কারণ অন্যদিকে মুহাজির সাহাবিদের কেউই তাকে তিরস্কার বা কটূক্তি করেননি। নবীজির কাছে আগমনের সময় কাব একটি কবিতা আবৃত্তি করে। এ কবিতাটি মূলত কাব স্বীয় প্রিয়তমা স্ত্রী সুয়াদের দীর্ঘ বিচ্ছেদের যন্ত্রণায় আবৃত্তি করেছে। কারণ কাব অনেক দিন ধরে নবীজির ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল।' কবিতাটির অর্থ হলো:
প্রিয়তমা সুয়াদ থেকে দীর্ঘ বিচ্ছেদ হতে চলল, তার প্রেমে আমার হৃদয় আজ অসুস্থ। তার টানে আমার হৃদয় আবদ্ধ। তার ভালোবাসা থেকে মুক্তি পাওয়ার মতো কোনো উপায়ও হলো না।
ইবনে ইসহাক কবিতার শেষ পর্যন্ত উল্লেখ করেন।
ইবনে কাসির লিখেছেন, ইবনে হিশাম বলেন, 'মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক পুরো ঘটনা এভাবে বর্ণনা করেছেন বটে, কিন্তু তিনি এর সনদ উল্লেখ করেননি।' তবে ইমাম হাকিম বিস্তারিত সনদে উপরিউক্ত ঘটনা বর্ণনা করেছেন। আবুল কাসেম আবদুর রহমান ইবনে হোসাইনের সূত্রে তিনি কাব ইবনে জুহাইরের পুত্র আবদুর রহমান থেকে বর্ণনা করেন, আবদুর রহমান তাঁর পিতা ও দাদা থেকে বর্ণনা করে বলেন:
জুহাইরের দুই পুত্র বুজাইর ও কাব একসঙ্গে কোথাও রওনা হয়। পথিমধ্যে এক জায়গায় এসে বুজাইর নিজ ভাই কাবকে বলেন, 'তুমি এখানে অবস্থান করো। আমি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গিয়ে দেখে আসি তিনি কী বলেন।' এরপর বুজাইর নবীজির উদ্দেশে গমন করেন এবং কাব সেখানেই অপেক্ষা করতে থাকে। বুজাইর নবীজির কাছে এসে ইসলামে দীক্ষিত হন। এদিকে কাব নিজ ভাইয়ের ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি জানতে পারে। তখন সে এই আবৃত্তি করে:
আমার পক্ষ থেকে কি এ চিঠি পৌঁছাবে না বুজাইরের কাছে?
তোমার জন্য সর্বনাশ ও ধ্বংসের কামনা ছাড়া আর কীই-বা করার আছে!!
যদি এমনটি নাই-বা করে থাকো, আমাকে তুমি বলো, কিসের লোভ তোমাকে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধ্য করল??
তুমি পাওনি তোমার পিতাকে ধ্বংসের কবলে; এমনকি তোমার মাকেও, তোমার ভাইও পড়েনি কখনো অধঃপতনের অতল গহ্বরে।
আর যদি এমনটি না করে থাকো তুমি মোটেই বাস্তবে,
দুঃখিত হব না, কিছু বলবও না; তোমার সন্ধান পেলে।
কাবের এই কবিতার সংবাদ মদিনায় নবীজির কাছে পৌঁছে যায়। নবীজি কাবের বিরুদ্ধে হত্যা পরোয়ানা জারি করেন। তিনি নির্দেশ দেন, 'যে কাবকে কোথাও পাবে, সেখানেই যেন তাকে হত্যা করে।' পরোয়ানা জারির আদেশ শুনে বুজাইর তখনই চিঠি লিখে কাব ইবনে জুহাইরকে নবীজির কাছে আত্মসমর্পণ করতে বলেন। বুজাইর চিঠিতে এও লেখেন:
'আমার মনে হচ্ছে না, তুমি ছাড়া পাবে। তবে আমি জানি, কেউ আল্লাহ তায়ালার তাওহিদবাদের সাক্ষ্য দিয়ে নবীজির দরবারে এলে তিনি তাকে গ্রহণ করে নেন। তুমি দ্রুত ইসলাম গ্রহণ করে চলে এসো।'
নিজ ভাই বুজাইরের চিঠি পেয়ে কাব মদিনায় নবীজির দরবারে এসে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়। অতঃপর সে নবীজির প্রশংসায় উপরিউক্ত পঙ্ক্তিটি আবৃত্তি করে।
ইমাম বায়হাকি তাঁর দালায়লে গ্রন্থে হাকিম, হাজ্জাজ ইবনে জির রুকাইবা এবং তার পিতা ও দাদার সনদে এ ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তবে আমি তাদের কারও জীবনী সম্পর্কে জানতে পারিনি।
ইমাম হাকিম সংক্ষেপে হুজামির সূত্রে ইবনে জুদ'আন থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'কাব ইবনে জুহাইর মসজিদে নববিতে নবীজির প্রশংসায় কবিতা আবৃত্তি করেন।
ওই ঘটনার সনদে তিনটি সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, এটি মুরসাল সনদে বর্ণিত। দ্বিতীয়ত, সনদে উল্লেখিত আলি ইবনে জায়েদের দুর্বলতা। তৃতীয়ত, তাঁর থেকে বর্ণনাকারী মুহাম্মদ ইবনে আবদুর রহমান আওকাছের ব্যাপারে আপত্তি। কারণ তাঁর সম্পর্কে উকাইলি বলেন, 'তিনি প্রায় সময় বিপরীত হাদিস বর্ণনা করেন।' ইবনে আসাকির বলেন, 'তিনি দুর্বল বলে বিবেচিত।' তবে শুধু ইবনে হিব্বান তাঁকে নির্ভরযোগ্য বলে আখ্যায়িত করেছেন।
ইমাম হাকিম অপর সনদে মুহাম্মদ ইবনে ফুলাইহের সূত্রে মুসা ইবনে উকবা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'কাব ইবনে জুহাইর নবীজির প্রশংসায় মসজিদে নববিতে কবিতা আবৃত্তি করেছেন।' তবে এ সনদটি মুরসাল।
এ সত্ত্বেও ইমাম হাকিম বলেন, 'এ ঘটনার একাধিক সনদ রয়েছে। ইবরাহিম ইবনে মুনজির হুজামি সব সনদকে একত্রিত করেছেন। এর মধ্যে মুহাম্মদ ইবনে ফুলাইহের সূত্রে মুসা ইবনে উকবার সনদ এবং হাজ্জাজ ইবনে জির রুকাইবার সনদ দুটি সহিহ। ইবনে ইসহাক তাঁর মাগাজি গ্রন্থে এ বিষয়ে সংক্ষেপে উল্লেখ করেছেন।'
তবে হাফেজ ইরাকি বলেন, 'এ ঘটনা আমরা যতগুলো সনদে বর্ণনা করছি, এগুলোর কোনোটিই সহিহ নয়। ইবনে ইসহাক এটি বিচ্ছিন্ন সনদে উল্লেখ করেছেন।'
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি নাতায়েজুল আফকার গ্রন্থে নিজ সনদে উপরিল্লিখিত ইবরাহিম হুজামির সূত্রে এ ঘটনা বর্ণনা করার পর লেখেন, 'এ হাদিসটি শুধু ইবরাহিম হুজামি এ সনদে বর্ণনা করেছেন। তবে অন্য সনদে আরও বিস্তারিত পরিসরে কাব ইবনে জুহাইরের ইসলাম গ্রহণ ও তাঁর কবিতা আবৃত্তির ঘটনা উল্লেখিত হয়েছে।'
ইবনে কাসির বলেন, 'কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, কাব ইবনে জুহাইরের কবিতা শুনে নবীজি তাঁকে নিজের একটি ডোরাকাটা পোশাক উপঢৌকন হিসেবে প্রদান করেন।' অতঃপর তিনি আরও বলেন, 'কাব ইবনে জুহাইরের এ ঘটনা অনেক প্রসিদ্ধ। কিন্তু আমি এর সন্তোষজনক কোনো সনদের সন্ধান পাইনি।'