📄 গাযওয়ায়ে বানী কুরাইযা
কাসেম ইবনে আবদুর রহমানের সূত্রে ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, উহুদের রণাঙ্গনে যুদ্ধ প্রচণ্ড আকার ধারণ করার পর একটি সামান্য ভুলের জন্য মুসলিম বাহিনী বিক্ষিপ্ত হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। এর মধ্যে গুজব ছড়িয়ে পড়ে, নবীজি শহীদ হয়ে গেছেন।
এ খবর মুহূর্তের মধ্যে পুরো রণাঙ্গনে ছড়িয়ে পড়ে। সাহাবিগণের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। নবীজির শাহাদাতের খবরে থ হয়ে যান সবাই। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে পিছু হটতে চাইছিলেন। মনোবল হারিয়ে বুঝে উঠতে পারছিলেন না, কী করবেন।
আনাস ইবনে মালিকের চাচা আনাস ইবনে নজর উমর ও তালহার দিকে এগিয়ে যান। তিনি আনসার ও মুহাজিরদের এক জটলায় ছিলেন। সেখানে সবাই হাত গুটিয়ে বসে ছিলেন। তিনি সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমরা বসে আছ কেন?' তাঁরা উত্তর দিলেন, নবীজি শহীদ হয়ে গেছেন। আনাস ইবনে নজর বললেন, 'তাহলে তোমরা এখানে কী করছ? তাঁর পরে বেঁচে থাকব কার জন্য? তিনি যে পথে শহীদ হয়ে গেছেন, চলো! আমরা সেই পথেই শাহাদাতবরণ করি।' এরপর তিনি প্রবল বিক্রমে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। যুদ্ধ করতে করতে আনাস ইবনে নজর শাহাদাত লাভ করেন।
ইবনে ইসহাক বলেন, হুমাইদ সাহাবি আনাস ইবনে মালিক থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, 'আনাস ইবনে নজর শহীদ হয়ে যাওয়ার পর আমি তাঁর নিথর দেহের সন্ধানে বের হই। গিয়ে দেখি, তাঁর শরীরে ৭০টির বেশি আঘাতের চিহ্ন। তাঁর দেহ এমন ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল, আমরা কেউ চিনতে পারিনি। পরে তাঁর বোন এসে তাঁর আঙুলের অগ্রভাগ দেখে শনাক্ত করেন।
ইবনে আবু হাতেম এ বর্ণনার সূত্রে উল্লিখিত কাসেম ইবনে আবদুর রহমানের ব্যাপারে ভালো-মন্দ কিছুই বলেননি। তবে এ বর্ণনাটিও মুরসাল। অবশ্য উমরের মতো মহান ব্যক্তিত্বের ব্যাপারে এমন ভাবা যায় না যে নবীজির ইন্তেকালের সংবাদ শুনে তিনি রণাঙ্গনে অস্ত্র ছেড়ে দিয়ে বসে থাকবেন, যেমন উপরিউক্ত ঘটনায় উল্লিখিত হয়েছে। কারণ অন্য বর্ণনায় রয়েছে, নবীজি যখন স্বাভাবিকভাবে ইন্তেকাল করেন, তখন উমর (রা.) তা অস্বীকার করেন। তিনি মানতেই চাচ্ছিলেন না যে আমাদের নবীরও মৃত্যু হতে পারে।
নবীজির ইন্তেকালের সংবাদ মদিনায় ছড়িয়ে পড়লে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। তাঁর প্রিয় সাহাবিগণ হতোদ্যম হয়ে পড়েন। তাঁদের চোখের সামনে যেন পুরো জগতের অন্ধকার নেমে আসে। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে উমর হাতে তরবারি নিয়ে বের হন। তিনি চিৎকার করতে থাকেন, 'আল্লাহর নবীর মৃত্যু হতে পারে না। যে এ কথা বলবে, তার গর্দান উড়িয়ে দেব।'
নবীজির প্রধান সাহাবি আবু বকর (রা.) আর দেরি করলেন না। তিনি উমরকে রেখেই মসজিদে চলে এলেন। এর আগে তিনি উমরকে বলেছিলেন, 'হে উমর! তুমি শান্ত হও।' কিন্তু উমর তাঁর কথা মানলেন না। নিজের মতো বলতে যাচ্ছিলেন। তখন লোকেরা উমরকে নিজের অবস্থায় ছেড়ে দিয়ে আবু বকরের কথা শোনার দিকে মনোযোগী হলো। আবু বকর সবার উদ্দেশে ভাষণ দিলেন। কোরআনের আয়াত দ্বারা বোঝালেন, নবীদেরও মৃত্যু হতে পারে, এটা স্বাভাবিক ব্যাপার এবং এখন তা-ই ঘটেছে। এরপর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়।
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি বলেন, ইবনে আবু শাইবা সাহাবি ইবনে উমর থেকে বর্ণিত, আবু বকর যখন উমরকে অতিক্রম করছিলেন, তখন তিনি বলছিলেন, 'আল্লাহ তায়ালা সমস্ত মুনাফিককে হত্যা করার আগ পর্যন্ত তাঁর নবীর মৃত্যু হতে পারে না।'
উহুদের যুদ্ধে তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রা.) সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে। উহুদের দিন তো তালহারই ছিল। ইমাম বুখারি কায়েস ইবনে হাজেমের সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, 'আমি ওইদিন তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহর হাতের অবস্থা দেখেছি। তাঁর হাত প্রায় অবশ হয়ে আসছিল। এই হাত দ্বারা তিনি নবীজিকে শত্রুদের আঘাত থেকে রক্ষা করে যাচ্ছিলেন।'
ইমাম নাসায়ি সাহাবি জাবেরের সূত্রে তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহর বীরত্বের ঘটনা বর্ণনা করেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, 'একের পর এক আঘাতে তালহার হাতের আঙুল কেটে হাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তখন তিনি বললেন, “আহ! শেষ হয়ে গেল।” নবীজি তাঁর এ কথা শুনে বললেন, “তুমি যদি এ মুহূর্তে বিসমিল্লাহ বলতে, তাহলে ফেরেশতাগণ তোমাকে আসমানে উঠিয়ে নিয়ে যেতেন আর লোকেরা সরাসরি তা দেখতে পেত।”'
ইমাম তিরমিজি সাহাবি জুবায়েরের সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'আমি নবীজিকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছিলেন, তালহা নিজের জন্য জান্নাতকে অবধারিত করে নিল।'
ইমাম জাহবি এই সনদকে হাসান পর্যায়ের অভিহিত করেছেন।
ইমাম ইবনে মাজাহ এবং ইমাম তিরমিজি এর অপর এক সনদে সাহাবি মুআবিয়া (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 'একদিন নবীজি তালহাকে দেখে বললেন, তালহা তার দায়িত্ব পূরণ করেছে।'
ইমাম হাকিম সাহাবি আয়েশার সূত্রে এ ঘটনা বর্ণনা করার পর বলেন, 'এর সনদ ইমাম মুসলিমের নীতিমালা অনুযায়ী সহিহ। তবে শাইখাইন (ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম) এটি উল্লেখ করেননি।' ইমাম জাহবি তাঁর এ কথার প্রতি সমর্থন দিয়েছেন।
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি তাঁর ফাতহুল বারি গ্রন্থে ওই ঘটনার সনদ আয়েশার সূত্রে চিহ্নিত করার পর একে সহিহ বলে সাব্যস্ত করেন। অতঃপর বলেন, 'ইমাম ইবনে মাজাহ এবং ইমাম হাকিম এভাবেই বর্ণনা করেছেন।'
উল্লেখ্য, সাহাবি মুআবিয়া উহুদের যুদ্ধে কুরাইশ বাহিনীর পক্ষে লড়েছিলেন। কারণ তখনো তিনি ইসলামে প্রবেশ করেননি। এ জন্য তিনি এ কথা সম্ভবত শুনেছিলেন মুসলিম হওয়ার পর।
এ ছাড়া আনাস ইবনে নজরের নিহত হওয়ার কথা সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম গ্রন্থে এসেছে।
বনু কুরাইজার যুদ্ধে জাবির ইবনে বাতার ঘটনা
ইবনে ইসহাক বনু কুরাইজার হাদিসের শেষে ইবনে শিহাব জুহরির সূত্রে বর্ণনা করেন, কুরাইজা গোত্রের জাবির ইবনে বাতা জাহেলি যুগে ছাবেত ইবনে কায়েস ইবনে শাম্মাসকে অনেক সহযোগিতা করেছিলেন। তাঁর উপনাম ছিল আবু আবদুর রহমান। জুহরি বলেন, 'জাবিরের কোনো এক সন্তান বর্ণনা করেন, জাহেলি যুগে বুয়াস যুদ্ধের সময় জাবির ইবনে বাতা সাবিতের ওপর অনুগ্রহ করেছিলেন। অনুগ্রহটি হলো, সাবিত বন্দী হলেন। যখন তাঁকে হত্যা করে ফেলা হবে, তখন জাবির তাঁকে হত্যা হওয়া থেকে বাঁচিয়ে দেন লঘু শাস্তি নির্ধারণ করে। লঘু শাস্তি হলো, সামনের চুল কেটে ফেলা। সাবিতের সামনের চুল কেটে দিয়ে তাঁর পথ ছেড়ে দেন। জাবির তখন বার্ধক্যে উপনীত, তখন বনু কুরাইজার সঙ্গে মুসলিমদের যুদ্ধ চলাকালীন তিনি জাবির ইবনে বাতার কাছে এসে বললেন, 'হে আবু আবদুর রহমান! তুমি কি আমাকে চিনতে পেরেছ?' উত্তরে জাবির বলল, 'তোমার মতো মানুষকে আমি কীভাবে না চিনে থাকতে পারি?' ছাবেত তাকে বললেন, 'আমি তোমাকে নিজ হাতে বিনিময় দিতে চাই।'
অতঃপর তিনি বর্ণনা করেন, সাবিত নবীজির কাছে জাবিরের রক্তের নিরাপত্তা চাইলেন। অর্থাৎ নবীজির কাছে সাবিত সুপারিশ করলেন, যাতে জাবিরকে হত্যা না করা হয়। নবীজি জাবিরের রক্তপণ ছেড়ে দিলেন। অর্থাৎ তাঁকে প্রাণদণ্ড থেকে মুক্তি দিলেন এবং সাবিতের কথা রাখলেন। তিনি বললেন, 'ঠিক আছে, তার রক্ত তোমার হাতে ন্যস্ত করা হলো।' এরপর সাবিতের সন্তান জুবাইর ইবনে সাবিত নবীজির কাছে গিয়ে জাবিরের সন্তানাদি এবং পরিবারকে ন্যস্ত করার অনুরোধ জানালে নবীজি সেটাও মেনে নেন। ধনসম্পদ ন্যস্ত করার অনুরোধ করলে নবীজি সেটাও দিয়ে দেন।
এরপর জাবির ইহুদিদের বেশ কিছু নেতার ব্যাপারে জানতে চাইলেন, তাদের কী করা হয়েছে। তাঁকে জানানো হলো, তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে। তখন জাবির বলে উঠলেন, 'সাবিত! আমাকে তাদের সঙ্গে মিলিত হতে দাও। আমি নিজে তোমার কাছে এই প্রতিদানটুকু চাইছি। আল্লাহর কসম! এমন সব নেতার মৃত্যুর পর আমার বেঁচে থাকাতে আর কোনো কল্যাণ নেই।' অতঃপর সাবিত ইবনে কায়েস জাবিরকে সামনে এগিয়ে দিয়ে তাঁর গর্দান উড়িয়ে দেন।
ইবনে ইসহাকের সূত্রে এ ঘটনা ইমাম বায়হাকি তাঁর দালালয়েল গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তবে ইবনে শিহাবের সূত্রে যে ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, তা মুরসাল হওয়ায় এর ওপর আস্থা রাখা যায় না।
ইমাম বায়হাকি তাঁর সুনানে কুবরা নামক অপর গ্রন্থে উরওয়ার সূত্রে মুরসাল সনদে এ ঘটনা এনেছেন। ওই সনদে ইবনে লাহিয়া নামের এক দুর্বল বর্ণনাকারী রয়েছেন।
আল্লামা হাইসামি মাজমাউজ জাওয়ায়েদ গ্রন্থে এ ঘটনার সূত্র আল- মু'জামুল আওসাত গ্রন্থে ইমাম তাবারানির দিকে সম্পৃক্ত করেন। অতঃপর বলেন, 'এর সনদে মুসা ইবনে উবাইদা রয়েছেন, যিনি দুর্বল বর্ণনাকারী বলে পরিচিত।'
তবে সমকালীন পর্যায়ের কোনো কোনো ঐতিহাসিক উপরিউক্ত ঘটনার প্রামাণ্যতা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন, 'জাবির ইবনে বাতার ছেলে আবদুর রহমান সাহাবি ছিলেন। এ কারণেই ইবনে আবদুর বার তাঁর রচিত সাহাবিদের বিখ্যাত জীবনীগ্রন্থ আল ইসতি'আব গ্রন্থে তাঁর জীবনী উল্লেখ করেছেন। এ জাতীয় কথার দ্বারা ওই ঘটনার কোনো বিষয় প্রমাণিত হয় না। কারণ আবদুর রহমান ইবনে জাবির যে সাহাবি ছিলেন, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
তা ছাড়া রিফা'আহ কুরাজি তাঁর স্ত্রীকে তালাক প্রদানের পর জাবির ইবনে বাতার ছেলে আবদুর রহমান তাকে বিয়ে করেছিলেন। বিয়ের এ ঘটনা ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়টি প্রমাণিত যে, বনু কুরাইজার গোত্রে ইহুদি হয়ে যারা বেড়ে ওঠেনি, তাদেরকে হত্যা করা হয়নি। কারণ বনু কুরাইজার অনেকেই পরবর্তী সময়ে ইসলামে দীক্ষিত হয়। তাঁরা হলেন কাব কুরাজি, কাসির ইবনে ছায়েব, আতিয়া কুরাজি, আবদুর রহমান ইবনে জাবির ও আরও অনেকে।
তা ছাড়া ওই ঘটনা জাবিরের নিজ গোত্রের লোকদের সঙ্গে পরজগতে মিলিত হওয়ার আবেদন এবং ছাবেত কর্তৃক তাঁকে হত্যা করে ফেলার বিষয়টি কোরআনে একাধিক আয়াতের বিপরীত। যেখানে ইহুদিদের পার্থিব লোভ-লালসা ও মৃত্যু থেকে বেঁচে থাকার বাসনার কথা বলা হয়েছে। কোরআনে আল্লাহ তায়ালা তাদের এ স্বভাবের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে ইরশাদ করেন: 'আপনি তাদেরকে জীবনের প্রতি সবার চাইতে, এমনকি মুশরিকদের চাইতেও অধিক লোভী দেখবেন। তাদের প্রত্যেকে কামনা করে, যেন তারা হাজার বছর আয়ু পায়। অথচ এরূপ আয়ুপ্রাপ্তি তাদেরকে শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারবে না। আল্লাহ সব দেখেন, যা কিছু তারা করে।"*
জিলাল গ্রন্থের লেখক ওই আয়াতের তাফসির প্রসঙ্গে বলেন, 'এই ইহুদি জাতি কোনো দিনই বদলাবে না। অতীতে, বর্তমানে ও ভবিষ্যৎকালে তারা একই রকম থাকবে। যতক্ষণ না এরা মুগুরের পিটুনি খাবে, মাথা নত করবে না। ক্ষণস্থায়ী ইহজগতে চিরকাল বসবাসের জন্য তারা যেকোনো অপরাধই করতে পারে।'
টিকাঃ
* সুরা বাকারা: ৯৬
📄 হিজরতের ষষ্ঠ বছর
ইবনে ইসহাক সালেহ ইবনে কায়সানের সূত্রে বর্ণনা করেন, হিন্দার সঙ্গে অন্য যেসব নারী উহুদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল, তারা উহুদের যুদ্ধে নিহত কয়েকজন সাহাবির লাশের নাক-কান কেটে টুকরো করেছিল এবং লাশ বিকৃত করেছিল।
এদিকে হিন্দা নবীজির সাহাবিদের লাশ থেকে কান ও নাক কেটে বিচ্ছিন্ন করে। অতঃপর সেগুলো কুচি কুচি করে টুকরা করে পায়ের এবং গলার গহনা তৈরি করে। এরপর এগুলো সে জুবাইর ইবনে মুতইমের ভৃত্য ওয়াহশির কাছে দেয়। এরপর সে নবীজির চাচা হামজার (রা.) লাশকে বিদীর্ণ করে কলিজা বের করে চরম আক্রোশে দাঁত দিয়ে কামড়ায়। এমনকি তাঁর কলিজা গিলে ফেলারও চেষ্টা করে। কিন্তু গলা দিয়ে না যাওয়ার কারণে তা ছুড়ে মারে।
এ ঘটনার বর্ণনাকারী সালেহ ইবনে কায়সান হাদিসবিশারদদের কাছে নির্ভরযোগ্য বলে পরিচিত। তিনি বিপ্লবী খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজের সন্তানদের শিক্ষক ছিলেন। তবে ঘটনাটি মুরসাল সনদে বর্ণিত হয়েছে।
অতঃপর ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, 'যুদ্ধ শেষ হলে নবীজি হামজার লাশের সন্ধানে বের হন। বাতনে ওয়াদি নামক জায়গায় গিয়ে দেখেন, তাঁর চাচার নিথর দেহকে টুকরো করে ফেলা হয়েছে। নাক-কান কিছুই নেই। তাঁর পেট ফেঁড়ে কলিজা বের হয়ে গেছে।'
এরপর ইবনে ইসহাক বলেন, মুহাম্মদ ইবনে জাফর ইবনে জুবায়ের বলেন, এ দৃশ্য দেখে নবীজি দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে বলে ওঠেন, 'হায়! যদি হামজার বোন সাফিয়া বিনতে আবদুল মুত্তালিব এ কারণে কষ্ট না পেত! এখন তো এমন করলে আমার পরে এটা নিয়ম হয়ে যাবে, অন্যথায় আমি তাঁকে ছেড়ে চলে আসতাম। যাতে মরুভূমির হিংস্র প্রাণী ও পাখি তাঁকে খেয়ে ফেলত। আল্লাহ তায়ালা যদি আমাকে আবারও সুযোগ দিতেন, তাহলে আমি কুরাইশদের ৩০ জনকে ধরে এনে এভাবেই কেটে টুকরা করে ফেলতাম, যেভাবে তারা আমার চাচার নিথর দেহের সঙ্গে করেছে।'
সাহাবিগণ নবীজির কষ্ট দেখে স্থির থাকতে পারলেন না। তাঁরা বললেন, 'যদি আমাদেরকে আল্লাহ আবারও কুরাইশদের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ করে দেন, তাহলে আমরাও তাদেরকে এভাবে কেটে ফেলব, যে রকম আরব জাতি কখনো দেখেনি।' এ বর্ণনাও মুরসাল সনদে এসেছে।
ইবনে ইসহাক আরও বলেন, আমাকে মুহাম্মদ ইবনে কাব কুরাজির সূত্রে বুরাইদা ইবনে সুফিয়ান বর্ণনা করেন, তিনি ইবনে আব্বাস থেকে কারও মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন, হামজার নিথর দেহের পাশে যখন নবীজি শোকে কাতর হয়ে পড়ছিলেন, তখনই আল্লাহ তায়ালা নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন:
وَإِنْ عَاقَبْتُمْ فَعَاقِبُوا بِمِثْلِ مَا عُوقِبْتُم بِهِ وَلَئِن صَبَرْتُمْ لَهُوَ خَيْرٌ لِلصَّابِرِينَ وَاصْبِرْ وَمَا صَبْرُكَ إِلَّا بِاللَّهِ وَلَا تَحْزَنْ عَلَيْهِمْ وَلَا تَكُ فِي ضَيْقٍ مِّمَّا يَمْكُرُونَ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الَّذِينَ اتَّقُوا وَالَّذِينَ هُم يَحْسِنُونَ
'আর যদি তোমরা প্রতিশোধ গ্রহণ করো, তবে ওই পরিমাণ প্রতিশোধ গ্রহণ করবে, যে পরিমাণ তোমাদেরকে কষ্ট দিয়েছে। তবে যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, তবে তা ধৈর্যশীলদের জন্য উত্তম।
'আপনি ধৈর্য ধারণ করবেন। আপনার ধৈর্য শুধু আল্লাহর জন্য বিবেচিত হবে। তাদের জন্য দুঃখ করবেন না এবং তাদের চক্রান্তের কারণে মন ছোট করবেন না।
'নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সঙ্গে আছেন, যারা মুত্তাকি এবং যারা সৎকর্ম করে।"*
ওই আয়াত অবতীর্ণ হলে নবীজি শান্ত হন। তিনি কুরাইশদের লাশ বিকৃত করার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নেন এবং ধৈর্য ধারণ করে মদিনায় ফিরে আসেন।
তবে ইবনে কাসির ওই ঘটনা ইবনে ইসহাকের সনদে উল্লেখ করার পর বলেন, 'কোরআনের উপরিউক্ত আয়াত মক্কায় অবতীর্ণ হয়। আর উহুদের যুদ্ধ হিজরতের তৃতীয় বছরে সংঘটিত হয়। অতএব, এই আয়াত কী করে তখন অবতীর্ণ হলো, তা আমার বোধগম্য নয়।'
ইমাম জাহবি তাঁর মাগাজিতে (যুদ্ধ অধ্যায়) বলেন, 'ইয়াহইয়া হাম্মানি মিকসামের সূত্রে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন, নবীজি উহুদের যুদ্ধে হামজার লাশের বিকৃতি দেখে বলেন, 'কুরাইশদের সঙ্গে আবারও লড়াই হলে আমি তাদের ৭০ জনকে ধরে এভাবে টুকরো করে ফেলব।' এর পরিপ্রেক্ষিতে উপরিউক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়।
আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর তিনি বলে উঠলেন, 'বরং হে রব! আমরা ধৈর্য ধারণ করব।' তবে ওই সনদে দুর্বলতা রয়েছে।
হাজ্জাজ ইবনে মিনহাল ও আরও অনেকে আবু উসমান নাহদির সূত্রে সাহাবি আবু হুরায়রা থেকে এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তাঁদের বর্ণনায় আরও রয়েছে, 'হামজার নিথর দেহের কাছে গিয়ে মনে হচ্ছিল, নবীজি এ রকম বীভৎস দৃশ্য আগে কখনো দেখেননি। এতে তাঁর হৃদয় মুবারক যেন ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়।'
আল্লামা হাইসামি তাঁর মাজমাউজ জাওয়ায়েদ গ্রন্থে এ ঘটনা উল্লেখ করেছেন। সেখানে আরও রয়েছে, নবীজি হামজার ক্ষতবিক্ষত লাশ দেখে বলে ওঠেন, 'আপনার ওপর আল্লাহ তায়ালার অফুরন্ত রহমত অবতীর্ণ হোক। আমার দেখামতে আপনি ছিলেন আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষাকারী এবং কল্যাণের দিকে অধিক অগ্রগামী। আমার পরে আপনার জন্য অন্য কেউ দুঃখ করার মতো যদি না থাকত, তাহলে আমি আপনার নিথর দেহটাকে এখানেই রেখে দিতাম, যাতে মরুভূমির হিংস্র প্রাণী তা ভক্ষণ করে ফেলে এবং আল্লাহ তায়ালা আপনাকে হিংস্র পশুর পেট থেকে কিয়ামতের দিন পুনরুত্থান করেন। আরও দিন সামনে আছে। আপনার একার বিপরীতে আমি তাদের (কুরাইশ) ৭০ জনকে এভাবেই টুকরো করে ফেলব, যেভাবে তারা আপনার এ হাল করেছে।'
এ কথা বলতেই জিবরাইল (আ.) অবতীর্ণ হন। তিনি নবীজিকে সুরা নাহলের আয়াত পড়ে শোনান। আয়াত শুনে নবীজি তাঁর এ সিদ্ধান্ত বাতিল করেন।
হাইসামি এরপর বলেন, 'বাজ্জার ও ইমাম তাবারানি এ ঘটনা বর্ণনা করেন। তাঁদের সূত্রে সালেহ ইবনে বাশির রয়েছেন, যাঁকে দুর্বল বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।'
ইমাম হাকিম তাঁর মুসতাদরাক গ্রন্থে সাহাবি উবাই ইবনে কাবের সূত্রে বর্ণনা করেন, উহুদের যুদ্ধে আনসারদের ৬৪ জন এবং মুহাজিরদের মাত্র ছয়জন শহীদ হন। কাফেররা তাঁদের লাশ বিকৃত করে ফেলে। যাদের মধ্যে হামজাও ছিলেন। তখন আনসাররা বলে ওঠেন, 'আবার যেদিন কুরাইশদের সঙ্গে আমাদের লড়াই হবে, তাদেরকে এভাবেই উচিত শিক্ষা দেব।'
অতঃপর অষ্টম হিজরিতে মক্কা অভিযানে নবীজি যখন তাঁদের নিয়ে মক্কাভিমুখে অগ্রসর হন, তখন আল্লাহ তায়ালা মক্কা বিজয়ের দিনে এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। তখন একজন ঘোষণা দেন, আজকের পর কুরাইশদের অস্তিত্ব থাকবে না। এর উত্তরে নবীজি বললেন, 'কুরাইশদের চারজন ছাড়া অন্য সবাইকে তোমরা ছেড়ে দাও।'
অতঃপর হাকিম বলেন, 'এর সনদ সহিহ। কিন্তু শাইখাইন (ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম) এ ঘটনা উল্লেখ করেননি।' ইমাম জাহবি তাঁর এ মতকে সমর্থন দিয়েছেন।
ইবনে হিশাম বর্ণনা করেন, নবীজি তাঁর চাচা হামজার লাশ দেখে বলে উঠলেন, 'আপনার পর আর কাউকেই এমন পরিণতি ভোগ করতে হবে না। আমি এর চেয়ে বীভৎস দৃশ্য আগে কখনো দেখিনি।'
শাইখ আলবানি বলেন, 'ইবনে হিশামের এ বর্ণনা সহিহ নয়। তিনি এটি সনদবিহীন উল্লেখ করেছেন। ইবনে কাসির এবং ইবনে হাজার আসকালানি ফাতহুল বারি গ্রন্থে তাঁর থেকে এটি বর্ণনা করেছেন। তবে তাঁরা সনদের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেননি।'
ইমাম আহমদ আফফানের সূত্রে সাহাবি ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'নবীজি যখন হামজার লাশের কাছে পৌঁছান, তখন দেখেন, তাঁর পেট ফেঁড়ে ফেলা হয়েছে। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ টুকরো হয়ে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পড়ে আছে। কাফেরদের মধ্যে হিন্দা হামজার কলিজা চিবিয়ে খাওয়ার চেষ্টা করেছিল। নবীজি জিজ্ঞেস করলেন, হিন্দা কি হামজার কলিজা গিলে ফেলেছে? উত্তরে সাহাবিগণ বললেন, না, গিলতে সক্ষম হয়নি। তখন নবীজি বললেন, হামজার দেহের কোনো অংশ আল্লাহ তায়ালা জাহান্নামে দেবেন না।'
অতঃপর ইমাম আহমদ আরও বর্ণনা করেন, নবীজি তাঁর চাচা হামজার জানাজা ৭০ বার আদায় করেন। অর্থাৎ, প্রথমে তো আলাদাভাবে তাঁর জানাজা পড়ানই। এরপর আরও উনসত্তরটি লাশ জানাজার জন্য হামজার লাশের পাশেই রাখা হয়। এবং নবীজি প্রতিবারই হামজার লাশসহ জানাজা পড়ান। এভাবে ৭০ বার জানাজা হয়।
ইবনে কাসির এ প্রসঙ্গে বলেন, 'এ বর্ণনাটি শুধু ইমাম আহমদ উল্লেখ করেছেন। অন্য কারও বর্ণনায় এ কথা পাওয়া যায় না। তাঁর সূত্রে আতা ইবনে সায়েব দুর্বল বর্ণনাকারী বলে চিহ্নিত। এ জন্য এতে দুর্বলতা রয়েছে।'
শাইখ আলবানি ইবনে কাসিরের মতকে সমর্থন করে বলেন, 'এটিই সঠিক কথা। তবে শাইख আহমদ শাকের এর বিপরীত বলেছেন। তাঁর মতে এই বর্ণনা সহিh।'
তবে ইমাম আহমদ এর ওই বর্ণনায় হাদিসবিশারদগণ আপত্তি করেছেন। তাঁরা এ ক্ষেত্রে বিশ্লেষণ করে বলেন, 'হামজার জাহান্নামে প্রবেশ না করা সম্পর্কে নবীজি যে ঘোষণা দিয়েছেন, তা অযৌক্তিক। কারণ যে হিন্দা উহুদে যুদ্ধে সাহাবিদের লাশ টুকরো করেছিল এবং হামজার কলিজা চিবিয়েছিল, সে পরবর্তী সময়ে ইসলামে দীক্ষিত হয়। আর ইসলামে প্রবেশ করলে আগেকার সমস্ত অপরাধ ও পাপ মোচন হয়ে যায়।'
অতঃপর তাঁরা সনদ বিশ্লেষণ করে বলেন, 'ইমাম আহমদ এর এ বর্ণনার সনদে সাহাবি ইবনে মাসউদ থেকে যিনি বর্ণনা করেছেন, তিনি হচ্ছেন আমের ইবনে শারাহিল শা'বি। অথচ ইবনে মাসউদের সঙ্গে তাঁর সরাসরি শোনা প্রমাণিত নয়।' ইমাম হাকিম, ইমাম দারা কুতনি এবং ইবনে আবু হাতেম প্রমুখ হাদিসবিশারদ এ মত দিয়েছেন।
ইবনে কাসির সুরা নাহলের শেষের এই আয়াতগুলোর তাফসির প্রসঙ্গে বলেন, মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক তাঁর কয়েক বন্ধুর সূত্রে আতা ইবনে ইয়াসার থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, 'সুরা নাহল মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। তবে শেষের ৩ আয়াত উহুদের রণাঙ্গনে অবতীর্ণ হয়। এর প্রেক্ষাপট হলো, যখন নবীজি হামজার বিকৃত লাশ দেখে বলেছিলেন, আল্লাহ তায়ালা যদি আমায় আবারও সুযোগ দিতেন, তাহলে আমি কুরাইশদের ৩০ জনকে ধরে এভাবেই কেটে টুকরা করে ফেলতাম, যেভাবে তারা আমার চাচার নিথর দেহের সঙ্গে করেছে।'
নবীজির উত্তরে সাহাবিগণও বললেন, 'যদি আমাদেরকে আল্লাহ আবার কুরাইশদের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ করে দেন, তাহলে আমরাও তাদেরকে এভাবে কেটে ফেলব, যে রকম আরব জাতি কখনো দেখেনি।' তাঁদের প্রতিজ্ঞার উত্তরে আল্লাহ তায়ালা সুরা নাহলের শেষ ৩ আয়াত অবতীর্ণ করেন।
উল্লেখ্য, ইবনে কাছিরের এ বর্ণনার সূত্রে একজন বর্ণনাকারী অজ্ঞাত থাকায় এটি মুরসাল পর্যায়ভুক্ত। তবে অপর এক সূত্রে এটি ধারাবাহিকরূপে বর্ণিত হয়েছে। হাফেজ আবু বকর বাজ্জার সালেহের সূত্রে সাহাবি আবু হুরায়রা থেকে এ ঘটনা আল্লামা হাইসামি অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।
অতঃপর ইবনে কাসির বলেন, 'ওই সনদ দুর্বল। কারণ এর সূত্রে সালেহের কথা এসেছে, তাঁর পুরো নাম সালেহ ইবনে বাশির আল মারি। হাদিসের ইমামগণ তাঁকে দুর্বল বলে অভিহিত করেছেন। ইমাম বুখারি তাঁকে হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যানযোগ্য বলেছেন।'
শাইখ আলবানি এ সূত্রকে দুর্বল বলে চিহ্নিত করার পর বলেন, এ ঘটনার কিছু অংশ সংক্ষেপে অন্য সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম হাকিম তাঁর মুসতাদরাক গ্রন্থে এবং খতিব তাঁর তালখিস গ্রন্থে সাহাবি আনাস থেকে বর্ণনা করেন। অতঃপর ইমাম হাকিম বলেন, 'এই সনদ ইমাম মুসলিমের নীতিমালার আলোকে সহিh। তবে শাইখাইন একে উল্লেখ করেননি।' ইমাম জাহবি এ মতকে সমর্থন করেছেন।
এরপর আলবানি আরও বলেন, 'সাহাবি উবাই ইবনে কাবে (রা.) সূত্রে সুরা নাহলের শেষের ৩ আয়াতের যে প্রেক্ষাপট বর্ণনা করা হয়েছে, তা সহিh।' উল্লিখিত হাদিস প্রসঙ্গে ইমাম নববি খুলাসা গ্রন্থে বলেন, ইমাম আবু দাউদ ও ইমাম তিরমিজি একে হাসান পর্যায়ের সনদে বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিজি নিজে একে হাসান সনদ বলে অভিহিত করেন। ইমাম আহমদও তাঁর মুসনাদ গ্রন্থে এ হাদিস নিজ সনদে বর্ণনা করেছেন। কুরাইশ বাহিনী কর্তৃক উহুদের যুদ্ধে মুসলিম সেনাদের লাশ বিকৃত করার ঘটনা সহিh সনদে প্রমাণিত। সহিh বুখারি গ্রন্থে এ প্রসঙ্গে আবু সুফিয়ানের উক্তি বর্ণিত হয়েছে।
ইবনে আবদুল বার বলেন, এ ঘটনা প্রসঙ্গে সাহাবি ও তাবেয়িগণের সূত্রে অসংখ্য বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে। অনেকে বর্ণনা করেন, নবীজি তাঁর চাচা হামজার জানাজা ৭০ বার আদায় করেন। তবে এগুলোর অধিকাংশই মুরসাল সনদে বর্ণিত।
এ বিষয়ে হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি বলেন, এ বর্ণনার সূত্রে সমস্যা রয়েছে। তবে শাইখ আলবানি নবীজির ৭০ বার জানাজা আদায় সম্পর্কিত বর্ণনার সনদকে হাসান পর্যায়ের অভিহিত করেছেন।
টিকাঃ
* সুরা নাহল: ১২৬-১২৮
হুদাইবিয়ায় নবীজির সঙ্গে কুরাইশের চুক্তিনামা
বাই'আতে রিদওয়ান কী কারণে ঘটেছিল
ষষ্ঠ হিজরির জিলকদ মাসে নবীজি প্রায় ১০ হাজার সাহাবি নিয়ে উমরা আদায় করার জন্য মক্কার উদ্দেশে মদিনা ত্যাগ করেন। সঙ্গে তাঁদের হাদির (উমরার কোরবানি) পশু ছিল। এদিকে মক্কার কুরাইশরা নবীজির আগমনের সংবাদ পেয়ে তাঁকে প্রতিহত করার ঘোষণা দেয়। তারা নবীজি ও তাঁর সাহাবিদের কোনোভাবেই মক্কায় প্রবেশ করতে দেবে না, এ মর্মে প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করে। মদিনা থেকে রওনা হয়ে নবীজি ও তাঁর সাহাবিগণ মক্কার অদূরে হুদাইবিয়ার প্রান্তরে (বর্তমান নাম শুমাইসি) যাত্রাবিরতি করেন।
এরপর মক্কায় আগমন ও উমরা আদায় নিয়ে কুরাইশ ও মুসলিমদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়। কুরাইש গোত্র নবীজির কাছে প্রতিনিধিদল প্রেরণ করে। এদিকে নবীজি মুসলিমদের পক্ষ থেকে বিখ্যাত সাহাবি উসমান ইবনে আফফানকে (রা.) কুরাইশের কাছে প্রেরণ করেন। তিনি স্বীয় প্রতিনিধির মাধ্যমে কুরাইשদের উদ্দেশে বার্তা দেন, তিনি ও মুসলিমদের কেউই মক্কায় তাদের সঙ্গে লড়াই করার জন্য আসেননি। তাঁরা শুধু উমরা আদায় করতে চাচ্ছেন। উমরা শেষে আবারও মদিনায় ফিরে যাবেন।
আলোচনা চলার একপর্যায়ে নবীজি তাঁর সাহাবিগণকে বাই'আত গ্রহণ করার জন্য আহ্বান জানান। সকল সাহাবি হুদাইবিয়ার একটি গাছের নিচে নবীজির হাতে বাই'আত নেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে নিচের আয়াত অবতীর্ণ হয়।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন: 'আল্লাহ মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন, যখন তারা বৃক্ষের নিচে আপনার কাছে শপথ করল। আল্লাহ অবগত ছিলেন ওই বিষয়ে, যা তাদের অন্তরে ছিল। অতঃপর তিনি তাদের প্রতি প্রশান্তি অবতীর্ণ করলেন এবং তাদেরকে পুরস্কারস্বরূপ আসন্ন বিজয় দান করেন।"*
বাই'আত গ্রহণের পর নবীজি জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করে বলেন, 'যারা আজ গাছের নিচে বাই'আত গ্রহণ করেছে, আল্লাহর ইচ্ছায় তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে না।'
হুদাইবিয়ার প্রান্তরে মুসলিমদের সঙ্গে কুরাইশদের কী কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল এবং পরে কী ঘটেছিল, এ সম্পর্কে সহিহ হাদিস ও ঐতিহাসিক গ্রন্থে বিস্তারিত এসেছে। কিন্তু সাহাবিদের থেকে নবীজি মূলত কী কারণে বাই'আত গ্রহণ করেছিলেন, তার উল্লেখ পাওয়া যায় না। কিন্তু এ সত্ত্বেও সিরাতের গ্রন্থগুলোতে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি তাঁর প্রতিনিধি উসমানকে মক্কায় প্রেরণ করার পর যখন তাঁর ফিরে আসতে দেরি হচ্ছিল, তখন কে যেন গুজব ছড়িয়ে দেয়, মক্কার কাফেররা উসমানকে হত্যা করেছে। তখনই এর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য নবীজি তাঁর সকল সাহাবির থেকে বাই'আত গ্রহণ করেন।
ইবনে ইসহাক নবীজির প্রখ্যাত সাহাবি ইবনে আব্বাসের আজাদকৃত দাস ইকরিমার সূত্রে কোনো একজন থেকে বর্ণনা করেন, নবীজি যখন উসমানকে আলোচনার জন্য মক্কায় প্রেরণ করেন, তখন কুরাইশ গোত্রের কাফেররা তাঁকে আটক করে। এদিকে নবীজি ও তাঁর সাহাবিগণ জানতে পারেন, কে যেন উসমানকে হত্যা করে ফেলেছে।
অতঃপর ইবনে ইসহাক আবু বকর সিদ্দিকের (রা.) পুত্র আবদুর রহমানের সূত্রে বলেন, 'নবীজির কাছে উসমানের হত্যাকাণ্ডের সংবাদ পৌঁছালে তিনি বললেন, “আমি যতক্ষণ না বিজয়ী হতে পারব, ততক্ষণ কুরাইশদের সঙ্গে সংগ্রাম করে উসমানের হত্যার বদলা নেব।” অতঃপর তিনি সাহাবিদের থেকে বাই'আত গ্রহণ করেন।'
ইবনে ইসহাকের প্রথম বর্ণনার সনদে তাঁর শাইখ অজ্ঞাত। তিনি তাঁর নাম উল্লেখ করেননি। পরের বর্ণনায় সরাসরি সাহাবির সূত্র না থাকায় এটি মুরসাল পর্যায়ে গণ্য।
আল্লামা বায়হাকি ইবনে ইসহাকের মুরসাল বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন, 'ইবনে ইসহাকের মতো ব্যক্তিত্ব যখন মুরসাল ধারায় বর্ণনা করেন, তখন আমাদের মন বিষণ্ণ হয়ে যায়।'
হুদাইবিয়ার প্রান্তরে সাহাবিদের থেকে নবীজি কর্তৃক বাই'আত গ্রহণের যে কারণ সিরাতের গ্রন্থে উল্লেখিত হয়েছে, শাইখ আলবানি তাকে দুর্বল আখ্যা দিয়ে বলেন, 'ইবনে ইসহাক এ ঘটনা মুরসাল ধারায় বর্ণনা করেছেন। ইবনে হিশামও ইবনে ইসহাক থেকে এটি বর্ণনা করেছেন।'
ইমাম আহমদ তাঁর মুসনাদ গ্রন্থে এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি ইয়াজিদ ইবনে হারুনের সূত্রে মিসওয়ার ইবনে মাখরামা এবং মারওয়ান ইবনে হাকাম থেকে বর্ণনা করেন, নবীজি যখন উসমানকে প্রতিনিধি করে কুরাইশদের কাছে প্রেরণ করেন, তখন তিনি আবু সুফিয়ানসহ কুরাইশদের অন্যান্য নেতার কাছে নবীজির বার্তা পৌঁছে দেন। তখন কুরাইশের লোকেরা তাঁকে আটক করে। এদিকে নবীজি জানতে পারেন, উসমানকে হত্যা করা হয়েছে।
অতঃপর ইমাম আহমদ বলেন, মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক জুহরির সূত্রে বলেন, কুরাইশ নেতারা বনু আমের ইবনে লুআইয়ের সুহাইল ইবনে আমরকে ডেকে বলে, 'তুমি মুহাম্মদের কাছে গিয়ে তাঁর সঙ্গে সমঝোতায় আসার চেষ্টা করবে। তাঁকে বলবে, তাঁরা যেন এ বছর মদিনায় ফিরে যান। এ বছর কোনোভাবেই মক্কায় প্রবেশ করা যাবে না।'
উল্লেখ্য, ইবনে ইসহাক কখনো কখনো সরাসরি বর্ণনাকারীর নাম উল্লেখ না করে বর্ণনা করেন। এখানেও তা-ই করেছেন। অতঃপর যখন তিনি বর্ণনাকারীর সূত্র উল্লেখ করে কুরাইশ কর্তৃক সুহাইল ইবনে আমরকে নবীজির কাছে প্রেরণের ঘটনা উল্লেখ করলেন, তখন নিশ্চিতভাবে বোঝা যায়, ঘটনার প্রথম অংশ তিনি জুহরি থেকে সরাসরি শোনেননি।
হুদাইবিয়ার প্রান্তরে সাহাবিদের থেকে নবীজির বাই'আত গ্রহণের অন্য আরেকটি কারণ ইমাম বায়হাকি তাঁর দালায়েন গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তিনি নিজ সনদে আমর ইবনে খালেদের সূত্রে উরওয়া ইবনে জুবায়ের থেকে বর্ণনা করেন, কুরাইש গোত্র আলোচনার লক্ষ্যে সুহাইল ইবনে আমর, হুওয়াইতিব আবদুল উজ্জা এবং মিকরাজ ইবনে হাফসকে নবীজির কাছে প্রেরণ করে। তারা হুদাইবিয়ায় মুসলিমদের ছাউনিতে এসে নবীজির সঙ্গে আলোচনায় বসে।
আলোচনার একপর্যায়ে উভয় পক্ষ একে অপরের প্রতি আস্থা স্থাপন করে এবং সবাই নিশ্চিত হয়, আসলেই এখানে যুদ্ধ করার সংকল্প কোনো পক্ষেরই নেই। মুসলিমদের ছাউনিতে কাফেররা আসা-যাওয়া করতে থাকে। ওদিকে মুসলিমরাও তাদের সঙ্গে স্বাভাবিক চলাফেরা ও পারস্পরিক যোগাযোগ বজায় রাখেন। অবশেষে উভয় পক্ষই একটা চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়।
কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিত একটি ঘটনা সবকিছুকে লন্ডভন্ড করে দেয়। উভয় শিবিরে যখন মোটামুটি স্থিতিশীলতা বজায় আসছিল, তখন হঠাৎ কোনো এক পক্ষ থেকে কারা যেন প্রতিপক্ষের শিবিরে তির নিক্ষেপ করে। এরপর কিছু বুঝে ওঠার আগেই সহিংস পরিস্থিতিতে রূপ নেয়। উভয় শিবিরে ব্যাপক তির, পাথর ও বর্শা নিক্ষেপ হতে থাকে। এ অবস্থায় উভয় পক্ষই চিৎকার দিয়ে নিজেদের লোককে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে বন্ধকের কথা ঘোষণা করে।
সুহাইল ইবনে আমরের সঙ্গে কুরাইশদের পক্ষ থেকে আরও যারা মুসলিম ছাউনিতে এসেছিল, তাদেরকে মুসলিমরা বন্ধক হিসেবে রাখেন এবং কুরাইশ গোত্র উসমানকে বন্ধক হিসেবে নিজেদের কাছে রেখে দেয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে নবীজি গাছের নিচে বাই'আতের ডাক দেন।
ইমাম বায়হাকির ওই সনদে দুটি ত্রুটি লক্ষণীয়। প্রথমত, এই সনদে ইবনে লাহিয়া রয়েছেন, যিনি সবার কাছে দুর্বল বলে পরিচিত। দ্বিতীয়ত, এটি মুরসাল ধারায় বর্ণিত। কারণ উরওয়া তাবেয়ি ছিলেন। তাই ওই ঘটনার সময় সেখানে তাঁর থাকার প্রশ্নই আসে না।
ইমাম বুখারি উরওয়ার সূত্রে মিসওয়ার ইবনে মাখরামা এবং মারওয়ান ইবনে হাকাম থেকে সহিহ সনদে গাজওয়ার ঘটনা এবং হুদাইবিয়াতে কুরাইশ গোত্র ও নবীজির মধ্যে সংঘটিত সংলাপের বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন। আর ইমাম বায়হাকির বর্ণনায় উসমানের হত্যাকাণ্ডের গুজবের কথা নেই; বরং সেখানে উভয় পক্ষ থেকে প্রতিপক্ষের প্রতি তির ছোড়াছুড়ি ও পাথর নিক্ষেপের কথা এসেছে।
অতএব, উসমানের হত্যাকাণ্ডের গুজবের কথা সহিহ সনদে প্রমাণিত নয়। তবে বাই'আত করার যে কারণই হোক না কেন, সাহাবি সালামা ইবনে আকওয়া (রা.) কর্তৃক বর্ণিত হাদিসে আছে, তিনি বলেন, 'লোকেরা সাহাবি আলিকে বাই'আতের কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, আমরা নবীজির হাতে মৃত্যুর জন্য বাই'আত করেছিলাম।' সহিহ মুসলিম এর অপর বর্ণনায় সাহাবি জাবেরের (রা.) সূত্রে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, 'আমরা নবীজির হাতে এই মর্মে বাই'আত করেছি, আমরা তাঁকে ছেড়ে পলায়ন করব না। মৃত্যুর জন্য কোনো শপথ নিইনি।' সহিহ মুসলিম এর অপর বর্ণনায় মা'কাল ইবনে ইয়াসারের সূত্রে এমনই বর্ণিত হয়েছে। সহিহ বুখারির বর্ণনায় এসেছে, ইবনে উমরের আজাদকৃত দাস নাফে'কে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, 'সাহাবিগণ নবীজির হাতে যেকোনো পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণ করার ওপর বাই'আত করেছিলেন।'
হাদিসের বরেণ্য মনীষী হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি ফাতহুল বারি গ্রন্থে হুদাইবিয়ার প্রান্তরে উপরিউক্ত বাই'আতের কারণ সম্পর্কে বর্ণিত একাধিক বক্তব্যের মধ্যে সমন্বয় করতে গিয়ে বলেন, 'প্রকৃতপক্ষে উপরিউক্ত বক্তব্যগুলোর মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। সবার উত্তরের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, যাতে কেউই সেখান থেকে পলায়ন না করেন। সকল সাহাবি যেন এ অবস্থায় ধৈর্যসহকারে পরিস্থিতি সামলে নেন; এমনকি কেউ মৃত্যুর সম্মুখীন হলেও কোনো অবস্থাতেই যাতে পলায়ন না করেন।'
অন্য জায়গায় তিনি আরও বলেন, 'এমন শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে যেকোনো সময় মৃত্যুর আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অতএব, বর্ণনাকারী সাধারণভাবে বাই'আতের কারণ হিসেবে মৃত্যুর ওপর বাই'আতের কথা উল্লেখ করেছেন।'
টিকাঃ
* সুরা ফাতাহ : ১৮
📄 গাযওয়ায়ে কায়বা
দুর্গের ফটককে আলি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করলেন
ইবনে ইসহাক আবদুল্লাহ ইবনে হাসানের সূত্রে নবীজির আজাদকৃত দাস আবু রাফে (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'আমরা নবীজির সঙ্গে খাইবার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। খাইবারে ইহুদিদের অনেক দুর্গ ছিল। এর মধ্যে একটি দুর্গ তখনো বিজিত হয়নি। নবীজি তাঁর ঝান্ডা আলির (রা.) হাতে দিয়ে ওই দুর্গ অভিযানে প্রেরণ করেন। আমরা কয়েকজন আলির সঙ্গে এই অভিযানে অংশ নিই।
'দুর্গের কাছাকাছি পৌঁছার পর দুর্গের অধিবাসীরা আলির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। আলিও লড়াই চালিয়ে যেতে থাকেন। একপর্যায়ে এক ইহুদি আলিকে লক্ষ্য করে আক্রমণ করলে তাঁর ঢাল হাত থেকে পড়ে যায়। এরপর তাঁর ঢাল হারিয়ে যায়। এদিক-ওদিক খোঁজ করেও পাচ্ছিলেন না। হঠাৎ দেখতে পান, দুর্গের একটি ফটক মাটিতে পড়ে আছে। তৎক্ষণাৎ তিনি তা তুলে নিয়ে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। একাই ফটকটি হাতে নিয়ে তিনি শত্রুদের প্রতিহত করতে থাকেন। দীর্ঘক্ষণ লড়াইয়ের পর আলি ওই দুর্গ জয় করেন। এরপর ফটকটি তিনি নিক্ষেপ করে ছুড়ে ফেলেন। আমরা তখন দলে মোট আটজন ছিলাম। ফটকটি এত ভারী ছিল যে আমরা সবাই মিলেও সেই ফটক উত্তোলন করতে পারিনি।'
ইমাম জাহবি বলেন, 'বাক্কাঈ ওই ঘটনা ইবনে ইসহাকের সূত্রে আবু রাফে থেকে বিচ্ছিন্ন সনদে বর্ণনা করেছেন।'
আল্লামা ইবনে কাসির বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে বলেন, 'এ ঘটনার সনদে বিচ্ছিন্নতা সহজেই পরিলক্ষিত হয়। তবে ইমাম বায়হাকি ও হাকিম ওই ঘটনা মুত্তালিব ইবনে জিয়াদের সূত্রে সাহাবি জাবের (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আলি ওইদিন দুর্গের ফটক একাই বহন করে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তুমুল লড়াইয়ের পর মুসলিম বাহিনী ওই দুর্গের প্রাচীরে পৌঁছে যায়। মুসলিমদের হাতে বিজিত হয় দুর্গটি। পরে ৪০ জন মিলে দুর্গের ওই ফটক উত্তোলন করতে সক্ষম হননি, যা একাই আলি বহন করে নিয়ে এসেছিলেন।'
অতঃপর ইবনে কাসির বলেন, এ সনদেও দুর্বলতা রয়েছে। অপর দুর্বল বর্ণনায় জাবেরের সূত্রে এসেছে, দুর্গ বিজিত হওয়ার ওই ফটক ৭০ জন একসাথে উত্তোলন করতে চেয়েছিলেন; কিন্তু তাঁরা তা করতে সক্ষম হননি।'
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি এ ঘটনার সূত্রকে আবদুল্লাহ ইবনে আহমাদ ইবনে হাম্বলের দিকে সম্পৃক্ত করে তাঁর ইসাবাহ গ্রন্থে বলেন, এ বর্ণনার সনদে হারাম ইবনে উসমান রয়েছেন, যিনি বর্ণনার ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যাত।
ইমাম জাহবি মিজানুল ইতেদাল গ্রন্থে বলেন, আবু জাফরের সূত্রে সাহাবি জাবের থেকে যে সনদে ওই ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, তা অগ্রহণযোগ্য।
তবে হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি ইমাম জাহবির উপরিউক্ত বক্তব্যের পর বলেন, এ ঘটনার সমার্থক বর্ণনা অন্য সনদে এসেছে। যেমন ইমাম আহমাদ তাঁর মুসনাদ গ্রন্থে আবু রাফের সূত্রে ইবনে ইসহাকের সনদে বর্ণনা করেছেন। তবে সেখানে ৪০ জন ব্যক্তির কথা উল্লেখ নেই।
আল্লামা হাইসামি তাঁর মাজমাউজ জাওয়ায়েদ গ্রন্থে বলেন, ইমাম আহমাদ এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তাঁর সনদে অজ্ঞাত বর্ণনাকারী রয়েছেন।
ড. আকরাম উমরি বলেন, বেশ কয়েকটি বর্ণনায় আলির বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে, ইহুদি কর্তৃক আক্রমণের ফলে তাঁর হাত থেকে ঢাল পড়ে গেলে তিনি ভারী ফটক তুলে নিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছেন। এই সব কটি সনদ দুর্বল। আর এই দুর্বল বর্ণনা বাদ দিলেও আলির বীরত্ব ও সাহসিকতায় কোনো ঘাটতি আসবে না। কারণ অসংখ্য সহিহ বর্ণনায় তাঁর বীরত্বগাথা বর্ণিত হয়েছে।
ইমাম মুসলিম তাঁর সহিহ মুসলিম গ্রন্থে ১৫৩২ নং হাদিসে বলেন, হাকিম ইবনে হিজাম (রা.) কাবাঘরের ভেতরে জন্মগ্রহণ করেছেন। ১২০ বছর তিনি বেঁচে ছিলেন। ইমাম নববি বলেন, হাকিম ইবনে হিজাম কাবাঘরের ভেতরে জন্মগ্রহণ করেছেন। তিনি ছাড়া অন্য কারও ব্যাপারে এমন তথ্য পাওয়া যায় না। ইতিহাসে আলি সম্পর্কে কাবাঘরের ভেতর জন্মলাভ করার যে তথ্য পাওয়া যায়, অধিকাংশ আলেমের মতে এর সূত্র দুর্বল।
সর্বোপরি সহিহ বুখারি এবং সহিহ মুসলিম গ্রন্থের যৌথ বর্ণনায় সহিহ সনদে আলির মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে নবীজির বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ইমাম মুসলিম তাঁর সহিহ মুসলিম গ্রন্থে 'আনসার ও আলির প্রতি ভালোবাসা ইমানের অংশ' শীর্ষক অধ্যায় এনেছেন।
📄 মক্কা বিজয়
যুদ্ধবিরতি ও শান্তিচুক্তি নবায়নের লক্ষ্যে আবু সুফিয়ানের আগমন
ইবনে ইসহাক বলেন, 'মক্কা অভিযানের আগে কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান মদিনায় নবীজির দরবারে আগমন করেন। প্রথমে তিনি স্বীয় কন্যা নবীজির স্ত্রী উম্মে হাবিবার (রা.) ঘরে যান। মাদুরের বিছানায় বসতে গেলে উম্মে হাবিবা তা সরিয়ে নেন। কন্যার এ আচরণ দেখে আবু সুফিয়ান বললেন, “হে আমার প্রিয় কন্যা! আমি জানি না, কেন তুমি বিছানা সরিয়ে নিলে? তুমি আমার থেকে মাদুরটি সরিয়ে নিলে, নাকি মাদুরকে আমার থেকে সরিয়ে নিলে? অর্থাৎ আমি কি মাদুরের যোগ্য নই, নাকি মাদুরটি আমার বসার জন্য উপযুক্ত নয়?”
'উত্তরে উম্মে হাবিবা বললেন, “এটি আল্লাহর রাসুলের বিছানা। আপনি মুশরিক ও অপবিত্র। এ বিছানায় আপনি বসতে পারেন না। আপনি রাসুলের বিছানায় বসবেন, এটা আমার পছন্দ নয়।”
'কন্যার মুখে এমন শক্ত কথা শুনে আবু সুফিয়ান বললেন, “বুঝেছি, মুহাম্মদের কাছে আসার পর তুমি অকল্যাণের শিকার হয়েছ।” অতঃপর আবু সুফিয়ান ঘর থেকে বের হয়ে যান। নবীজির সঙ্গে তাঁর দরবারে গিয়ে কথা বলেন। কিন্তু নবীজি উত্তরে তাঁকে কিছুই বললেন না। এরপর আবু সুফিয়ান সাহাবি আবু বকরের কাছে যান। অতঃপর উমর, এরপর উসমান ও আলির কাছেও যান।'
শাইখ আলবানি বলেন, 'ইবনে ইসহাক এ ঘটনা সনদ ছাড়া উল্লেখ করেছেন। ওয়াকিদিও এটি বর্ণনা করেছেন। কিন্তু আগেই বলা হয়েছে, তিনি সবার নিকট প্রত্যাখ্যাত।'
সর্বোপরি আমার জানামতে, যুদ্ধবিরতি নবায়নের জন্য আবু সুফিয়ানের মদিনায় আগমনের ঘটনা কোনো ধারাবাহিক সহিহ সনদে প্রমাণিত নয়। বরং এ ব্যাপারে মুরসাল ধারায় ইকরিমার সূত্রে ইবনে আবু শাইবা থেকে এবং মুহাম্মদ ইবনে ইবাদ ইবনে জাফরের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। ইবনে আয়েজও উরওয়ার সূত্রে এমনটি বর্ণনা করেন।
প্রকৃতপক্ষে এ-সংক্রান্ত সঠিক ঘটনা সহিহ সনদে ইমাম বুখারি তাঁর সহিহ বুখারিতে উল্লেখ করেছেন। তিনি বর্ণনা করেন, 'নবীজি যখন মক্কা অভিযানের উদ্দেশ্যে বাহিনী নিয়ে মদিনা ত্যাগ করেন, তখন এ সংবাদ মক্কার কুরাইশদের কানে চলে যায়। মক্কার কাছাকাছি পৌছার পর কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান ইবনে হারব, হাকিম ইবনে হিজাম ও বুদাইল ইবনে ওয়ারাকা মুসলিম বাহিনীর গতিবিধি লক্ষ করার জন্য মক্কা নগরী থেকে বের হয়ে আসে। কিন্তু তারা নবীজির গোয়েন্দা বাহিনীর কাছে ধরা পড়ে যায়। গোয়েন্দারা তাদের গ্রেপ্তার করে নবীজির কাছে নিয়ে আসে। এরপর সেখানে আবু সুফিয়ান ইসলাম গ্রহণ করেন।'
ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেন, 'সাহাবি সালমান, সুহাইব এবং বিলালসহ আরও অনেকে এক জায়গায় বসে গল্প করছিলেন। এ অবস্থায় আবু সুফিয়ান তাঁদের কাছে আসেন। তখন তাঁরা তাঁর প্রতি হুংকার দেন। এ অবস্থা দেখে আবু বকর তাঁদের উদ্দেশে বললেন, “তোমরা কুরাইশের একজন বয়োবৃদ্ধ নেতাকে এভাবে বলছো!""
ইমাম নববি বলেন, 'এ ঘটনা হুদাইবিয়ার সন্ধির পর ঘটেছিল। যখন নবীজি এবং তাঁর সাহাবিগণ মক্কার অদূরে হুদাইবিয়ায় ছাউনি ফেলেছিলেন। তখনো আবু সুফিয়ান মুসলিম হননি।'
শরহুল উব্বি গ্রন্থে এসেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই যে এ ঘটনা আবু সুফিয়ানের ইসলাম গ্রহণের আগে ঘটেছিল। অন্যথায় আবু বকর এ কথা বলতেন না। তা ছাড়া তখন আবু সুফিয়ান যদি মুসলিম থাকতেন, তাহলে নবীজির সাহাবিগণ তাঁকে এ কথা কেন বলতে যাবেন? তাই এটা নিশ্চিত, এটা ওই সময়ের ঘটনা, যখন আবু সুফিয়ান ইসলাম গ্রহণ করেননি। কিন্তু কথা হচ্ছে সময় নিয়ে। অর্থাৎ এ ঘটনা কবে ঘটেছিল?
প্রসিদ্ধ মত হচ্ছে, নবীজির গোয়েন্দারা আবু সুফিয়ানকে ধরে নবীজির কাছে নিয়ে এসেছিলেন। গ্রেপ্তারের পরপরই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি; বরং এর অনেক পরে তিনি মুসলিম হন। সহিহ বুখারি গ্রন্থে এমনই বর্ণিত হয়েছে।
তা ছাড়া আবু সুফিয়ানের ইসলাম গ্রহণের কিছু প্রেক্ষাপট বিভিন্ন জায়গায় একাধিক বর্ণনায় এসেছে। যথা যখন আবু সুফিয়ানকে বন্দী করা হলো একটি সংকীর্ণ গিরিপথে এবং তাঁর সামনে দিয়ে আল্লাহর সৈন্যরা (ফেরেশতারা নন, মুসলিম বাহিনী) দলে দলে যাচ্ছিলেন, তখন তাঁর কাছে মনে হচ্ছিল বিশাল ফৌজি সমাবেশ। সর্বশেষ ফৌজ যখন তাঁর সামনে দিয়ে চলে যায়, তখন তিনি নবীজির চাচা আব্বাসকে বললেন, 'এবার তোমার ভাতিজার রাজত্ব অনেক দূর পর্যন্ত সম্প্রসারিত হলো।'
উত্তরে আব্বাস বলেন, 'তোমার সর্বনাশ হোক, আবু সুফিয়ান! এটা রাজত্ব নয়; বরং বলো, এটা নবুওয়াতের ক্ষমতা।'
ইবনে ইসহাক আরও দীর্ঘ পরিসরে এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম এর কিছু অংশ তাঁদের হাদিসগ্রন্থে তুলে ধরেছেন। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি তাঁর মাতালিবুল আলিয়া গ্রন্থে এ ঘটনা বিস্তারিত উল্লেখ করার পর এর সূত্র ইসহাক ইবনে রাহুইয়ার দিকে সম্পৃক্ত করে লেখেন, 'এ হাদিস সহিহ।'
শাইখ আলবানি বলেন, 'মক্কা বিজয়ের এটিই হচ্ছে সর্বাধিক সহিহ ও সঠিক বর্ণনা।' শাইখ সালমান আওদাও একে সঠিক বলে সাব্যস্ত করেছেন।
আজ তোমরা সবাই মুক্ত
ইবনে ইসহাক কারও সূত্রে বর্ণনা করেন, নবীজি মক্কা বিজয়ের পর কাবাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে সবার উদ্দেশে বললেন, 'আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তিনি একক, তাঁর কোনো অংশীদার বা সমপর্যায়ের কেউ নেই। তিনি স্বীয় বান্দাকে বিজয় দান করে নিজের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন। অবিশ্বাসীদের দলকে তিনি একাই পরাজিত করেছেন। আজ যত অভিযোগ করা হবে এবং জাহেলি যুগের সমস্ত গৌরব, রক্তপণ, মুক্তিপণ সব আমার এই পায়ের নিচে দাফন করে দিলাম। তবে হাজিদের পানি পান করানো এবং কাবাঘরের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব যথারীতি বহাল থাকবে...।'
অতঃপর নবীজি সমবেত জনতাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আজ তোমাদের কী মনে হয়, আমি তোমাদের সঙ্গে কী করতে পারি?' সবাই উত্তর দিল, 'নিশ্চয় আপনি আজ সর্বোত্তম ফয়সালা করবেন। কারণ আপনি সর্বোত্তম ভাই এবং ভাইয়ের উত্তম সন্তান।' তখন নবীজি বললেন, 'যাও, আজ তোমরা সবাই মুক্ত।'
হাফেজ ইরাকি বলেন, 'ইবনে আবিদ দুনিয়া এ ঘটনা তাঁর কিতাবুল আফউ ওয়া ফি জাম্মিল গজব গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তাঁর সনদেই ইবনুল জাওযি তাঁর ওয়াফা গ্রন্থে এটি বর্ণনা করেন। তবে এই সনদে দুর্বলতা রয়েছে। ইবনে সুবকি এ ঘটনা ওইসব হাদিস বর্ণনার তালিকাভুক্ত করেছেন, যেগুলো ইমাম গাজালির ইহইয়াই উলুমুদ্দিন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু তিনি এর সনদ পাননি।
শাইখ আলবানি বলেন, 'এ ঘটনা মুরসাল ধারায় বর্ণিত হওয়ায় এর মধ্যে দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয়। কারণ ইবনে ইসহাকের শিক্ষক সরাসরি নবীজির সাহাবিদের থেকে বর্ণনা করেন না। বরং তিনি তাবেয়িন ও তাঁদের সমকালীন পরিচিতদের থেকে বর্ণনা করে থাকেন। অতএব, ইবনে ইসহাকের এ জাতীয় বর্ণনা মুরসাল ধারার পর্যায়ভুক্ত।'
শাইখ বুতির মত খণ্ডন করতে গিয়ে আলবানি বলেন, 'ওই ঘটনা সবার মুখে মুখে প্রসিদ্ধ হলেও এর সনদ প্রমাণিত নয়।'
মূলত এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে নবীজি মক্কা বিজয়ের পর নির্দিষ্ট কয়েকজন ছাড়া সবার প্রতি সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, 'আজ যে আবু সুফিয়ানের বাড়িতে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ। যে ব্যক্তি অস্ত্র সমর্পণ করবে, সে নিরাপদ। যে নিজের ঘরে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দেবে, সেও নিরাপদ।'
নিজ গোত্র ও মাতৃভূমির সন্তানদের কাছ থেকে দীর্ঘ দেড় যুগের অসহ্য নিপীড়ন ও অমানবিক অত্যাচারের পরও সবাইকে এভাবে ক্ষমা করে দেওয়া ইতিহাসে অভাবনীয় ঘটনা। নবুওয়াতের প্রাথমিক যুগ থেকেই কুরাইশের লোকেরা প্রিয় নবীজিকে কতই না কষ্ট দিয়েছে! আল্লাহর প্রতি দাওয়াত দিতে তাঁকে সরাসরি বাধা প্রদান করেছে। তাঁর পবিত্র দেহে থুতু ও মাটি নিক্ষেপ করেছে। মক্কার বাজারে সবার সামনে নবীজির আপন চাচা তাঁকেই কটাক্ষ করেছে। কুরাইশের নেতারা বখাটে ছেলেদেরকে তাঁর পেছনে লেলিয়ে দিত। কুরাইশের লোকেরা দিনরাত ঘরের ভেতরে ও বাইরে নবীজি ও তাঁর সাহাবিদের গালিগালাজ ও কটূক্তি করে বেড়াত।
নবীজির দাওয়াতে সাড়া দিয়ে যাঁরা ইসলাম গ্রহণ করতেন, তাঁদের ঘরে প্রবেশ করে ধরে বাইরে নিয়ে আসত। রাস্তায় ফেলে সূর্যের প্রখর তাপে তাঁদের পিটুনি দিত। সামাজিকভাবে তাঁদেরকে বয়কট করে দিনের পর দিন আবদ্ধ করে রেখেছিল। পিতা থেকে তার সন্তানকে এবং সন্তানকে তার মায়ের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। মক্কায় নও-মুসলিমদের ঘরবাড়ি ও সহায়-সম্পত্তি দখল করতেও এই জালেম সম্প্রদায় পিছু হটেনি।
নবীজি ও তাঁর সাহাবিগণ অত্যাচার ও নিপীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে মদিনায় হিজরত করেন। কুরাইশদের চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতের আঁধারে তাঁরা ছোট ছোট দলে মাতৃভূমি মক্কা ত্যাগ করতে থাকেন।
যখন তাঁরা মক্কা ত্যাগ করে মদিনার উদ্দেশে যাত্রা করছিলেন, তখন তাঁরা সবাই ছিলেন একেবারে নিঃস্ব। শুধু পরনের কাপড় ও বাহন ছাড়া সঙ্গে তেমন কিছুই ছিল না। মদিনায় যাওয়ার পর তাঁদের নতুন জীবনের সূচনা ঘটে। কিন্তু এর পরও বিপত্তি তাঁদের পিছু ছাড়ল না। শুরু হয় নয়া সংগ্রাম।
মদিনায় হিজরতের পরও কুরাইশের অত্যাচার থেমে থাকেনি। তারা নবীজিকে হত্যা করার জন্য একাধিকবার ফন্দি আঁটে। সশস্ত্র যুদ্ধে কয়েকবার তারা মদিনায় আক্রমণ করতে উদ্যত হয়। কিন্তু প্রতিবারই আল্লাহ তায়ালা নবীজি ও তাঁর সাহাবিদের বিজয় দান করেন। কুরাইশরা নবীজির প্রাণনাশের জন্য মদিনার ইহুদি ও মুনাফিকদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনও করে। কিন্তু প্রতিবারই তারা ব্যর্থ হয়।
অতঃপর যখন নবীজি অষ্টম হিজরিতে মক্কা জয় করলেন, তখন তিনি বিনয়চিত্তে ১০ হাজার সাহাবির বিশাল বাহিনী নিয়ে নগরীতে প্রবেশ করলেন। কোনো ধরনের প্রতিশোধ গ্রহণ কিংবা মক্কাবাসীকে শান্তি দেওয়ার ইচ্ছে তাঁর ছিল না। এদিকে মক্কার জনগণ তখন ভয়ে তটস্থ ছিল। না জানি আজ তাদের ওপর দিয়ে কেমন প্রতিশোধের ঝড় বয়ে যায়! কিন্তু এমন কিছুই ঘটেনি। দয়ার মূর্তপ্রতীক নবীজি কাবাঘরের সামনে গিয়ে মক্কাবাসীকে ক্ষমা করে দেন।
অথচ নবী মুসার (আ.) যুগে বনি ইসরাইলের আচরণ ছিল সম্পূর্ণ এর বিপরীত। একাধিকবার শাস্তিতে ভুগেও তাদের হঠকারিতা থেমে থাকেনি। আল্লাহ তায়ালা তাদের প্রতি ক্ষমা ঘোষণা করে যখন তাদেরকে বায়তুল মুকাদ্দাস নগরীর ফটক দিয়ে প্রবেশের সুযোগ দিলেন, তখন তাদের প্রতি নির্দেশ আসে, 'তোমরা আল্লাহর সামনে নতজানু অবস্থায় “হিত্তাতুন” (আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন) বলতে বলতে নগরীতে প্রবেশ করো।' কিন্তু তারা 'হিত্তাতুন' না বলে 'হিনতাতুন হিনতাতুন' (আমরা গমের চাষ করতে চাই) বলতে বলতে প্রবেশ করে।
মক্কা বিজয়ের পর যাঁরা ইসলামে প্রবেশ করেছিলেন, ইতিহাসে তাঁরাই 'মুক্ত' নামে পরিচিত। মক্কা বিজয়ের পর হুনাইনের অভিযানে নবীজির বাহিনীর সঙ্গে মুক্ত লোকদের একটা দলও অংশগ্রহণ করেছিল। এ প্রসঙ্গে সহিহ বুখারি গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি সহিহ বুখারির এ বর্ণনার ব্যাখ্যায় বলেন, 'হুনাইনের অভিযানে এই মুক্তিপ্রাপ্ত দলের সংখ্যা এত বেশি ছিল না। সংখ্যায় তারা পুরো বাহিনীর দশ ভাগের এক ভাগেরও কম।
এ ছাড়া হাফেজ ইবনে হাজার তাঁর তাহজিব গ্রন্থে লেখেন, 'মক্কা বিজয়ের পর সেখানে আর কোনো বিধর্মী অবশিষ্ট ছিল না। সবাই ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়।'
ফুজালা ইবনে উমায়ের কর্তৃক নবীজিকে হত্যার পরিকল্পনা
ইবনে হিশাম বর্ণনা করেন, মক্কা বিজয়ের পর নবীজি কাবাঘর তাওয়াফ করছিলেন। মক্কার এক যুবক তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করে। সে ছিল ফুজাইল ইবনে উমায়ের। সে চুপিসারে নবীজিকে অনুসরণ করতে থাকে। কাছাকাছি এসে পড়লে নবীজি তার দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলেন, 'কী অবস্থা? কী মনে করে এখানে এলে?' এতে ফুজাইল হঠাৎ থতমত খেয়ে যায়। সে উত্তর দেয়, 'না, তেমন কিছু নয়। আমি আল্লাহর জিকির করছিলাম।'
কিন্তু নবীজি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে ফুজাইলের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত হন। তিনি স্বাভাবিক চিত্তে হেসে ফেলেন এবং বলেন, 'তুমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও।' তিনি তখন ফুজাইলের বুকে হাত রাখেন। এরপর ফুজাইল বলেন, 'আল্লাহর কসম! মুহাম্মদ আমার বুকে হাত রাখামাত্র তিনি আমার কাছে সর্বাধিক প্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়ে যান।'
ওই ঘটনা প্রসঙ্গে শাইখ আলবানি বলেন, 'ইবনে হিশাম এ ঘটনা মুরসাল সনদে বর্ণনা করেছেন। অতএব, এতে দুর্বলতা বিদ্যমান।' তা ছাড়া শাইখ বুতির মত খণ্ডন করে আলবানি আরও বলেন, 'হাদিসের সূত্রটি সহিহ নয়। কারণ ইবনে হিশাম এ ঘটনা ধারাবাহিক সনদ ছাড়া বর্ণনা করেছেন। যার ফলে সনদের বর্ণনাকারীদের পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়নি।'
কাবাঘরের চাবি কাকে প্রদান করা হয়েছিল?
ইবনে ইসহাক থেকে বর্ণিত মক্কা বিজয়ের আরেকটি ঘটনা সর্বত্র প্রসিদ্ধ। তিনি মুহাম্মদ ইবনে জাফরের সূত্রে সাফিয়া বিনতে শাইবা থেকে বর্ণনা করেন, 'নবীজি মক্কা বিজয়ের পর সবার প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। অতঃপর তিনি কাবাঘর তাওয়াফ করেন। নবীজির হাতে মাথাবাঁকা একটি লাঠি ছিল। প্রতিবার চক্কর শুরু করার সময় তিনি ওই লাঠি দ্বারা হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করে চুম্বন করতেন। তাওয়াফ শেষে নবীজি উসমান ইবনে তালহাকে (রা.) তলব করেন। উসমান আসার পর তিনি তাঁর কাছ থেকে কাবাঘরের চাবি নিয়ে কাবার দরজা খুলে তাতে প্রবেশ করেন।'
অতঃপর ইবনে ইসহাক আরও বর্ণনা করেন, 'এরপর সাহাবি আলি নবীজির দিকে এগিয়ে যান। চাবি তখন তাঁর হাতে ছিল। তিনি নবীজিকে বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল! আজ থেকে আপনি কাবাঘরের রক্ষক ও এর চাবির দায়িত্ব এবং হাজিদের পানি পান করানোর দায়িত্ব আমাদের প্রতি অর্পণ করুন।” উত্তরে নবীজি কিছু বললেন না। তিনি উসমান ইবনে তালহাকে ডেকে পাঠান। উসমান এলে নবীজি তাঁর হাতে কাবার চাবি প্রদান করে বললেন, “এখন থেকে চাবি তোমার কাছেই থাকবে। আজ পুণ্য অর্জন ও প্রতিশ্রুতি পূরণের দিন।”
হাদিসের প্রথম অংশ হাসান পর্যায়ের। যেমনটা ইবনে হাজার আসকালানি ফাতহুল বারি গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু পরের অংশ ইবনে ইসহাক সনদ ছাড়া উল্লেখ করেছেন। এর সূত্র সম্পর্কে আলোচনা অনেকটা পূর্বে আলোচিত 'তোমরা যাও, আজ মুক্ত' এর কাছাকাছি।
তবে ইমাম তাবারানি উপরিউক্ত ঘটনা সাহাবি ইবনে আব্বাসের সূত্রে এভাবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, নবীজি সাহাবি উসমান ইবনে তালহাকে ডেকে তাঁর হাতে কাবার চাবি প্রদান করে বললেন, “উসমান! এই চাবি গ্রহণ করো। তোমার ওপর চিরকাল এ দায়িত্ব থাকবে। একমাত্র জালেম ছাড়া অন্য কেউ তোমার থেকে কাবাঘরের রক্ষকের দায়িত্ব ছিনিয়ে নিতে পারবে না।'
আল্লামা হাইসামি তাঁর মাজমাউজ জাওয়ায়েদ গ্রন্থে লিখেছেন, 'ইমাম তাবারানি এ ঘটনা তাঁর মু'জামুল কাবির এবং মু'জামুল আওসাত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তবে তাঁর সনদে আবদুল্লাহ ইবনে মুআম্মাল নামের এক বর্ণনাকারী রয়েছেন। ইবনে হিব্বان একে নির্ভরযোগ্য বলে আখ্যায়িত করে বলেন, কখনো তিনি বর্ণনায় ভুল করে বসেন। ইবনে মাঈন তাঁকে কোনো এক বর্ণনায় নির্ভরযোগ্য বলে মন্তব্য করলেও অধিকাংশ হাদিসবিশারদ তাঁকে দুর্বল বলেছেন।'
ইবনে হাজার ফাতহুল বারি গ্রন্থে এ ঘটনা প্রসঙ্গে লেখেন, ইবনে আয়েদ আবদুর রহমান ইবনে সাবেত থেকে মুরসাল ধারায় বর্ণনা করেন, নবীজি উসমান ইবনে তালহার হাতে কাবাঘরের চাবি প্রদান করে বললেন, 'এই চাবি গ্রহণ করো। তোমার ওপর চিরকাল এ দায়িত্ব থাকবে। আমি নিজে এ দায়িত্ব তোমাকে দিইনি; বরং আল্লাহ তোমাকে এই দায়িত্ব দিয়েছেন। একমাত্র জালেম ছাড়া অন্য কেউ তোমার থেকে কাবাঘরের রক্ষকের দায়িত্ব ছিনিয়ে নিতে পারবে না।'
ইবনে জুরাইজের সনদে বর্ণিত, সাহাবি আলি নবীজিকে বললেন, 'আজ থেকে আপনি কাবাঘরের রক্ষক ও এর চাবির দায়িত্ব এবং হাজিদের পানি পান করানোর দায়িত্ব আমাদের প্রতি অর্পণ করুন।' এর উত্তরে কোরআনের এ আয়াত অবতীর্ণ হয়:
'নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেকে প্রাপ্য আমানতসমূহ প্রাপকদের নিকট যথারীতি পৌছে দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করছেন। আর যখন তোমরা মানুষের কোনো বিচার-মীমাংসা করো, তখন ন্যায়ভিত্তিক মীমাংসা করিয়ো। আল্লাহ তোমাদিগকে উপদেশ দান করেন। নিশ্চয় আল্লাহ শ্রবণকারী, দর্শনকারী।'
এরপর নবীজি উসমান ইবনে তালহাকে ডেকে পাঠান। উসমান এলে নবীজি তাঁর হাতে কাবার চাবি প্রদান করে বললেন, 'এখন থেকে চাবি তোমার কাছেই থাকবে। একমাত্র জালেম ছাড়া অন্য কেউ তোমার থেকে কাবাঘরের রক্ষকের দায়িত্ব ছিনিয়ে নিতে পারবে না।'
প্রথমত, এ ঘটনা মুরসাল ধারায় বর্ণিত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, ইবনে জুরাইজের সনদে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে। কারণ ইবনে জুরাইজ নবীজির সাহাবি আলির সাক্ষাৎ পাননি। ইমাম জাহবি তাঁর সিয়ার গ্রন্থে এ ঘটনা হাদিসের বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন। শু'আইব আরনাউত ইমাম জাহবির বর্ণনার বিশ্লেষণে লিখেছেন, ওই ঘটনার সনদ দুর্বল। কারণ এতে আবদুল্লাহ ইবনে মুআম্মাল রয়েছেন, যিনি দুর্বল বলে বিবেচিত।
তাহজিব গ্রন্থে সাহাবি উসমান ইবনে তালহার জীবনীতে এসেছে, মুসআব জুবাইরি বলেন, নবীজি শাইবা ইবনে উসমানকে কাবাঘরের চাবি দিয়ে বললেন, 'হে আবু তালহার সন্তান! এ চাবি গ্রহণ করো। তোমাদের কাছে সব সময় এ দায়িত্ব থাকবে।' শাইবা ইবনে উসমান ইবনে আবু তালহার জীবনীতেও এ রকম বর্ণিত হয়েছে।
মুহাজির আরোহীকে স্বাগত
ইমাম তিরমিজি তাঁর সুনানে তিরমিজি গ্রন্থে আবদু ইবনে হুমাইদের সূত্রে সাহাবি ইকরিমা ইবনে আবু জাহল (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'যেদিন আমি নবীজির দরবারে ইসলাম গ্রহণের জন্য আগমন করি, তখন আমি বাহনের ওপর ছিলাম। তিনি আমাকে অভ্যর্থনা জানাতে এসে বললেন, মুহাজির আরোহীকে স্বাগত।'
অতঃপর ইমাম তিরমিজি বলেন, 'এ বর্ণনার সনদ সহিহ নয়। শুধু এই সনদ ছাড়া অন্য কোনো সনদে আমি এই বর্ণনা পাইনি। এ সনদে মুসা ইবনে মাসউদ রয়েছেন, যিনি হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে দুর্বল বলে পরিচিত। আবদুর রহমান ইবনে মাহদি এ ঘটনা আবু সুফিয়ানের সূত্রে ইবনে ইসহাক থেকে মুরসাল ধারায় বর্ণনা করেছেন।'
আল্লামা হাইসামি তাঁর মাজমাউজ জাওয়ায়েদ গ্রন্থে এ ঘটনার তিনটি সনদ উল্লেখ করেছেন এবং সব সনদের মূলসূত্র ইমাম তাবারানি এর দিকে সম্পৃক্ত করেছেন। প্রথম সনদের ব্যাপারে তিনি লেখেন, 'এ সনদ বিচ্ছিন্ন।' দ্বিতীয় সনদের ব্যাপারে বলেন, 'ইমাম তাবারানি এটি মুরসাল ধারায় বর্ণনা করেছেন। তবে তাঁর সনদের বর্ণনাকারীরা সহিহ হাদিসের বর্ণনাকারী হিসেবে পরিচিত।' তৃতীয় সনদের ব্যাপারে তিনি লেখেন, 'ইমাম তাবারানি এটি বর্ণনা করেছেন। তাঁর সনদের বর্ণনাকারীরা সহিহ হাদিসের বর্ণনাকারী হিসেবে পরিচিত। তবে মুসআব ইবনে সা'আদ নবীজির সাহাবি ইকরিমা থেকে কোনো কিছু শোনা প্রমাণিত নয়।'
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি ফাতহুল বারি গ্রন্থে এ বর্ণনা সঠিক হওয়ার প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে এ রকম অন্য ঘটনা উল্লেখ করেছেন। যথা তিনি লেখেন, আবদুল কায়েসের প্রতিনিধিদল ইসলাম গ্রহণের জন্য নবীজির দরবারে আগমন করার পর তিনি তাদেরকে 'এ জাতিকে স্বাগত' বলে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। নবীজি তাদের উদ্দেশে এ স্বাগত সম্বোধন কয়েকবার উচ্চারণ করেছিলেন। উম্মে হানি সম্পর্কে হাদিসে এসেছে, নবীজি তাঁকে 'উম্মে হানিকে স্বাগত' বলে স্বাগত জানান। তা ছাড়া ইকরিমাকে নবীজি 'মুহাজির আরোহীকে স্বাগত' বলে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। এমনকি নবীজি নিজ কন্যা ফাতিমাকেও (রা.) 'আমার কন্যাকে স্বাগত' বলে অভ্যর্থনা জানান। অতঃপর ইবনে হাজার বলেন, এ-সংক্রান্ত সব বর্ণনাই সহিহ।
কিন্তু তিনি তাঁর অপর ইসাবাহ নামক গ্রন্থে ইকরিমার জীবনীতে লিখেছেন, 'ইকরিমার একটি ঘটনা সুনানে তিরমিজি গ্রন্থে মুসআব ইবনে সা'আদের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। সুনানে তিরমিজি গ্রন্থের ওই সনদ বিচ্ছিন্ন। কারণ মুসআব ইবনে সা'আদ নবীজির সাহাবি ইকরিমার সাক্ষাৎ পাননি।' উল্লেখ্য, ইবনে হাজার ফাতহুল বারি গ্রন্থ রচনার পর ইসাবাহ গ্রন্থ রচনা করেন।
তাহজিব গ্রন্থে ইকরিমার জীবনীতে উল্লেখিত হয়েছে, হাদিসের প্রখ্যাত সনদ নিরীক্ষক আবু হাতেম বলেন, 'আমার ধারণামতে মুসআব ইবনে সা'আদ ইকরিমা থেকে সরাসরি কোনো কিছু শোনেননি।' ইমাম বুখারি এ প্রসঙ্গে বলেন, 'মুসআব সরাসরি ইকরিমা থেকে কিছু শোনেননি।'
ইমাম হাকিম মুসতাদরাক গ্রন্থে আবু ইসহাকের সূত্রে মুসআব ইবনে সা'আদ থেকে ইকরিমার ঘটনা বর্ণনা করার পর বলেন, 'এর সনদ সহিহ। তবে ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম এ সনদে উল্লেখ করেননি।' ইমাম জাহবি এরপর বলেন, 'এ বর্ণনা সহিহ হলেও এর সনদে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে। কারণ মুসআব ইকরিমার সাক্ষাৎ পাননি।' এদিকে ইমাম জাহবি তাঁর তারিখুল ইসলাম গ্রন্থে এ ঘটনা প্রসঙ্গে লেখেন, 'ওই ঘটনার সনদ দুর্বল।'
তা ছাড়া এক হাদিসের বর্ণনা অনেক জায়গায় পাওয়া যায়। নবীজি ইরশাদ করেন, 'আমি জান্নাতে আবু জাহলের মালিকানাধীন একটি খেজুরগাছ দেখেছি। গাছটিতে খেজুরের থোকা ঝুলছিল।' ইকরিমার ইসলাম গ্রহণের পর নবীজি উম্মুল মুমিনিন উম্মে সালমাকে (রা.) বলেছিলেন, 'হে উম্মে সালমা! ইকরিমা হলো আবু জাহলের সেই খেজুরগাছ।'
ইমাম হাকিম এ হাদিস বর্ণনা করার পর বলেন, 'এর সনদ সহিহ। তবে ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম তা উল্লেখ করেননি।' তবে ইমাম জাহবি তালখিস গ্রন্থে বলেন, 'এ কথা সঠিক নয়। এই সনদে দুজন দুর্বল বর্ণনাকারী রয়েছেন।' শাইখ আলবানিও একে দুর্বল বলেছেন।
ছাফওয়ান ইবনে উমাইয়াকে নবীজির ধর্ম বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা প্রদান
ইমাম মালিক তাঁর বিখ্যাত মুয়াত্তা গ্রন্থে ইবনে শিহাবের সূত্রে বর্ণনা করেন, নবীজির যুগে অনেক নারী নিজের মাতৃভূমিতে ইসলাম গ্রহণ করে বসবাস করতেন। তাঁদের স্বামী অমুসলিম হওয়ার কারণে তাঁরা হিজরত করতে পারেননি। তাঁদের অন্যতম ছিলেন বিনতে ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা। তিনি সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার স্ত্রী ছিলেন।
অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের পর বিনতে ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা ইসলাম গ্রহণ করেন। তখন তাঁর স্বামী সাফওয়ান মুসলিম বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার ভয়ে মক্কা থেকে পালিয়ে যায়। নবীজি সাফওয়ানের চাচাতো ভাই ওয়াহাব ইবনে উমায়েরকে নিরাপত্তার নিদর্শনস্বরূপ নিজের একটি চাদর প্রদান করে সাফওয়ানের কাছে ইসলামের দাওয়াত ও মক্কায় ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে প্রেরণ করেন। নবীজি ওয়াহাবকে বলে দেন, 'ছাফওয়ান এতে সম্মত হলে তাকে নিয়ে আসবে; অন্যথায় তাকে আমার পক্ষ থেকে দুই মাস ভেবে দেখার সময় দেবে।'
ওয়াহাব ইবনে উমায়ের যথারীতি নবীজির পক্ষ থেকে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে সাফওয়ানের কাছে গমন করেন। এরপর সাফওয়ান ওয়াহাবের সঙ্গে মক্কায় ফিরে আসে। সে মক্কায় প্রবেশ করে লোকদের সামনে ডেকে বলে, 'হে মুহাম্মদ! ওয়াহাব আপনার পক্ষ থেকে এ চাদর নিয়ে আমাকে আপনার কাছে ফিরে আসার জন্য বলেছে। সঙ্গে সে এটাও বলেছে, আপনি আমাকে ইসলামের দিকে দাওয়াত দিচ্ছেন। আমি তা গ্রহণ করলে আমার প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে এবং না মানলে আমাকে দুই মাসের সুযোগ দেওয়া হবে।' উত্তরে নবীজি বললেন, 'আবু ওয়াহাব! তুমি ফিরে এসো।' সাফওয়ান বলল, 'না, আল্লাহর কসম! যতক্ষণ না আপনি আপনার প্রস্তাবের ব্যাখ্যা দেন।' এবার নবীজি তাকে বললেন, 'ঠিক আছে, তোমাকে চার মাসের সময় দিলাম। তুমি ভেবে দেখো।'
অতঃপর নবীজি হাওয়াজেন ও হুনাইন অভিযানে রওনা হন। অভিযানে যাওয়ার সময় তিনি সাফওয়ানের অস্ত্র ও যুদ্ধসরঞ্জাম ধার হিসেবে দেওয়ার জন্য তাকে আহ্বান করেন। সাফওয়ান জিজ্ঞেস করল, 'স্বেচ্ছায় দেব, নাকি অনিচ্ছা সত্ত্বেও দিতে হবে?' নবীজি উত্তর দিলেন, 'স্বেচ্ছায় দাও।' তখন সাফওয়ান তার যাবতীয় যুদ্ধসরঞ্জাম ও অস্ত্র নবীজিকে দিয়ে তাঁর সঙ্গে হুনাইন ও তায়েফের অভিযানে অংশগ্রহণ করে। সে এই দুই অভিযানে নবীজির ব্যবহার ও মুসলিমদের চলাফেরা গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করে। অথচ তখনো সে কাফের ছিল। নবীজি সাফওয়ানকে তার মুসলিম স্ত্রীর থেকে বিচ্ছিন্ন না করে একসঙ্গে থাকতে বলেন। পরে একপর্যায়ে সাফওয়ানও ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়। নবীজি তাঁদের আগের বিয়ে বহাল রাখেন।
ইবনে আবদুল বার ওই ঘটনা সম্পর্কে বলেন, 'আমি এ বর্ণনার কোনো সহিহ সূত্র সম্পর্কে অবগত নই। তবে ঐতিহাসিক ও সিরাত গবেষকদের কাছে এ ঘটনা ব্যাপক প্রসিদ্ধ। ইবনে শিহাব হচ্ছেন সিরাত গবেষকদের ইমাম। আর এ বর্ণনার প্রসিদ্ধি এর সনদের চেয়েও শক্তিশালী।'
শাইখ আলবানি বলেন, 'এটি মুরসাল ধারায় বর্ণিত।'
ইবনে ইসহাক এ ঘটনা মুহাম্মদ ইবনে জাফরের সূত্রে উরওয়া ইবনে জুবায়েরের সূত্রে এভাবে বর্ণনা করেন। উরওয়া বলেন, নবীজির মক্কা বিজয়ের পর সাফওয়ান ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ইয়েমেনে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করে। তাই সে গোপনে জেদ্দা নগরীর উদ্দেশে মক্কা ত্যাগ করে। এদিকে সাফওয়ানের পলায়নের ব্যাপারটি কারও মাধ্যমে জানাজানি হয়ে যায়।