📄 হিজরতের পঞ্চম বছর
ইবনে হিশাম বলেন, 'রুবাইহ ইবনে আবদুর রহমান তাঁর পিতার সূত্রে সাহাবি আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, উহুদের যুদ্ধ চলাকালীন উতবা ইবনে আবু ওয়াক্কাস নবীজির দিকে তির ছুড়ে মারে। এতে নবীজির সামনের নিচের ডান দাঁত ভেঙে যায় এবং নিচের ঠোঁট ফেঁড়ে যায়। এরপর আবদুল্লাহ ইবনে শিহাব জুহরি নবীজির কপালে প্রচণ্ড আঘাত করে। আর ইবনে কুমাইয়া তাঁর গণ্ডদেশে বর্শা দিয়ে আঘাত করে। এতে নবীজির শিরস্ত্রাণের দুটি কড়া তাঁর মাথার দুই পাশে বিদ্ধ হয়। আকস্মিক আক্রমণের ভার সইতে না পেরে নবীজি একটি গর্তে পড়ে যান। আবু আমের নামক জনৈক কাফের এই গর্ত খুঁড়ে রেখেছিল; যাতে মুসলিমরা তাতে পড়ে যান। অথচ এ গর্তের ব্যাপারে তাঁদের কারও জানা ছিল না।
'তখনই সাহাবি আলি এগিয়ে এসে নবীজির হাত ধরে ফেলেন এবং তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রা.) তাঁকে গর্ত থেকে উঠিয়ে দাঁড় করান। অপর সাহাবি মালিক ইবনে সিনান (রা.) নবীজির রক্তাক্ত দেহ মুবারক থেকে গড়িয়ে পড়া রক্ত মুখে টেনে গিলে ফেলছিলেন। মালিক ইবনে সিনানের রক্তপান দেখে নবীজি বললেন, "যার দেহে আমার রক্ত প্রবেশ করেছে, সে কখনো জাহান্নামে প্রবেশ করবে না।"'
ইমাম আহমদ রুবাইহ ইবনে আবদুর রহমান সম্পর্কে বলেন, 'সে আমাদের কাছে অপরিচিত।' আবু জুর'আহ বলেন, 'তিনি একজন শাইখ।' ইবনে আদি তাঁর প্রসঙ্গে বলেন, 'আশা করি, এতে কোনো সমস্যা হবে না।' ইবনে হিব্বান তাঁকে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের তালিকাভুক্ত করেছেন। তবে ইমাম তিরমিজি ইমাম বুখারি এর সূত্রে বলেন, 'রুবাইহ হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যানযোগ্য।'
ইবনে হিশাম রুবাইহ ইবনে আবদুর রহমান থেকে সরাসরি শোনেননি। ইমাম জাহবি তাঁর মাগাজি গ্রন্থে এ হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, 'ইবনে ইসহাক সাহাবি আবু সাইদ খুদরির সূত্রে বর্ণনা করেন, উতবা নবীজির সামনের নিচের ডান দাঁত ভেঙে দিয়েছিল।' অতঃপর তিনি অবশিষ্ট ঘটনা উল্লেখ করেন এবং বলেন, 'এটি বিচ্ছিন্ন সনদে বর্ণিত হয়েছে।'
হাফেজ ইবনে হাজার ইসাবাহ গ্রন্থে বলেন, ইবনে আবু আসেম এবং বাগাবি মুসা ইবনে মুহাম্মদের সূত্রে বর্ণনা করেন, তাঁর মা উম্মে সা'আদ আবু সাঈদের কন্যার সূত্রে তাঁর পিতাকে বলতে শুনেছেন, 'উহুদের যুদ্ধে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রক্তাক্ত হয়ে পড়লে সাহাবি মালিক ইবনে সিনান এগিয়ে আসেন। এরপর নবীজির দেহ মুবারক থেকে রক্ত শুষে নিয়ে গিলতে থাকেন। তখন নবীজি বললেন, কেউ যদি এমন কাউকে দেখতে চায়, যার রক্তের সঙ্গে আমার রক্ত মিলে গেছে, সে যেন মালিক ইবনে সিনানকে দেখে।'
সাঈদ ইবনে মানসুর ইবনে ওয়াহাবের সূত্রে আমর ইবনে সায়েব থেকে এমনই বর্ণনা করেছেন।
ইবনে আবু হাতেম মুসা ইবনে মুহাম্মদ সম্পর্কে বলেন, 'আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি, মুসা হচ্ছেন মাদানি শাইখ। পরবর্তী সময়ে তিনি ইরাকের বাগদাদে গমন করেন এবং দারবুল আনসারে বসতি স্থাপন করেন। সা'আদ ইবনে মাসউদের মা এবং আবদুর রহমানের মা তথা আবু সাঈদের কন্যার ব্যাপারে আমি কিছু জানতে পারিনি।' এরপর তিনি বলেন, 'আমি আমার পিতাকে এ রকমই বলতে শুনেছি।'
সাঈদ ইবনে মানসুরের বর্ণনায়ও মুরসাল হয়েছে। তাঁর সূত্রে উল্লেখিত আমর ইবনে সায়েব সম্পর্কে হাফেজ ইবনে হাজার তাকরিব গ্রন্থে বলেন, 'আমর ইবনে সায়েব সত্যতার ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য। তিনি ষষ্ঠ স্তরের বর্ণনাকারী তাবেয়িদের অন্যতম। ১৩৪ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন।'
ষষ্ঠ পর্যায়ের বর্ণনাকারী বলতে কী বোঝায়, এ ব্যাপারে হাফেজ ইবনে হাজার ওই গ্রন্থের ভূমিকায় বিস্তারিত লিখেছেন। অর্থাৎ যাঁরা কোনো সাহাবির সাক্ষাৎ পাননি। তিনি তাঁর অপর গ্রন্থ তালখিসুল হাবির এর মধ্যে বলেন, 'আমর ইবনে সায়েবের সূত্রে বর্ণিত হাদিস মুরসাল।'
ইমাম হাকিম ওই ঘটনা আবদুর রহমানের মা তথা আবু সাঈদ খুদরির কন্যার সূত্রে তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন। তবে সনদের ব্যাপারে তিনি নীরব থেকেছেন। কিন্তু ইমাম জাহবি তাঁর এ সনদ সম্পর্কে বলেন, 'তাঁর সনদ অন্ধকারে আচ্ছন্ন।'
আল্লামা হাইসামি এ সনদকে ইমাম তাবারানির দিকে সংযুক্ত করেছেন। তবে এ ব্যাপারে কিছু বলেননি।
খন্দকের যুদ্ধের ব্যাপারে প্রচলিত ভিত্তিহীন কাহিনি
পরিখা খননের ব্যাপারে সাহাবি সালমান ফারেসির পরামর্শ
ইতিহাস ও সিরাতের গ্রন্থে প্রসিদ্ধ আছে, নবীজি যখন মদিনার দিকে কুরাইশ ও আরবের সম্মিলিত বাহিনীর আগমনের সংবাদ পান, তখন তিনি জরুরি পরামর্শের জন্য সাহাবিদের তলব করেন। তাঁদের মধ্যে সাহাবি সালমান ফারেসিও (রা.) ছিলেন। তিনি নিজের মত প্রকাশ করে বলেন, 'আমি পারস্যের অধিবাসী। পারস্যে আমি দেখেছি, শত্রু দ্বারা পরিবেষ্টিত হওয়ার আশঙ্কায় আমার জাতি নিজেদের বসতি অঞ্চলের চারদিকে পরিখা খনন করত। এতে শত্রু আমাদের এলাকায় প্রবেশের সুযোগ পেত না।'
নবীজির কাছে সালমান ফারেসির এ কৌশল খুব পছন্দ হলো। তিনি এ পরামর্শ গ্রহণ করে মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ প্রদান করেন।
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি তাঁর ফাতহুল বারি গ্রন্থে লেখেন, 'সিরাত গ্রন্থকারেরা খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের জন্য সালমানের পরামর্শ দেওয়ার যে কথা উল্লেখ করেছেন, তা সর্বপ্রথম যিনি বলেছেন, তিনি হলেন আবু মা'শার। আবু মা'শার পরিখা খননের জন্য সাহাবি সালমানের পরামর্শের কাহিনি উল্লেখ করেছেন।'
তবে তিনি এর সনদ সম্পর্কে কিছু বলেননি। আবু মা'শারের পুরো নাম নাজিহ ইবনে আবদুর রহমান সানাদি। ১৭১ হিজরিতে তিনি ইন্তেকাল করেন। ইমাম তিরমিজি, ইমাম আবু দাউদ, ইমাম নাসায়ি এবং ইমাম ইবনে মাজাহ প্রমুখ হাদিস গ্রন্থকারগণ আবু মা'শারের সূত্রে হাদিস বর্ণনা করেছেন। তবে অনেক মুহাদ্দিস তাঁকে দুর্বল বললেও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল তাঁর ব্যাপারে ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। তিনি বলতেন, 'আবু মা'শার নবীজির যুদ্ধ (মাগাজি) সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখেন।'
মূলত আবু মা'শারের দুর্বলতার ব্যাপারটি সনদের ত্রুটির জন্য দায়ী নয়; বরং দায়ী হলো তাঁর মুরসাল বর্ণনা। তিনি কোনো ধরনের সূত্র ছাড়াই ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন। তাই তাঁকে কেউ কেউ দুর্বল বলে আখ্যা দিয়েছেন।
এদিকে ইবনে ইসহাক খন্দকের যুদ্ধের ঘটনায় পরিখা খননের কথা বলেছেন ঠিকই; কিন্তু তিনি পরিখা খননের জন্য সালমান ফারেসির পরামর্শের কথা উল্লেখ করেননি। তিনি বর্ণনা করেন: 'নবীজি মদিনার দিকে কুরাইশ ও আরবের সম্মিলিত বাহিনীর অগ্রসর হওয়ার সংবাদ পেয়ে সাহাবিদের জরুরি পরামর্শ সভা ডাকেন। সবার কাছ থেকে মতামত নিয়ে অবশেষে নবীজি মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ প্রদান করেন। এরপর নবীজি অগণিত সাওয়াবের সুসংবাদ দিয়ে সাহাবিদের পরিখা খননে উদ্বুদ্ধ করেন।'
ইবনে হিশাম এ ঘটনা সনদ ছাড়া বর্ণনা করেছেন। তবে তিনি এভাবে বলেছেন, 'কারও কারও মতে নবীজিকে সালমান ফারেসি পরিখা খননের জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন।'
নবীজির মু'জিজার নিদর্শন প্রমাণিত নয়
ইবনে ইসহাক সাঈদ ইবনে মাইনার সূত্রে বর্ণনা করেন, সাহাবি নোমান ইবনে বাশিরের (রা.) বোন বিনতে বাশির (রা.) বলেন, 'আমাকে আমার মা আমরাহ বিনতে রাওয়াহা (রা.) ডাকলেন। এরপর তিনি আমার জামার মুঠির মধ্যে এক মুষ্টি খেজুর দিয়ে বললেন, “যাও! এগুলো তোমার পিতা ও মামা আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহাকে দিয়ে আসো। এগুলো তাদের জন্য দুপুরের খাবার।” তখন তারা খন্দকের যুদ্ধে ব্যস্ত ছিলেন।
'আমি খেজুরগুলো জামার মধ্যে ধরে খন্দকের প্রান্তরে রওনা হই। তখন দেখি, এক পাশে নবীজি দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, “কন্যা! জামার মুঠির মধ্যে কী এনেছ?” আমি উত্তর দিলাম, আমার পিতা ও মামার জন্য...। নবীজি বললেন, “এগুলো আমার হাতের মুঠোয় দাও।” আমি তখন খেজুরগুলো নবীজির হাতের মুঠোয় ঢেলে দিই। খেজুর এত অল্প পরিমাণ ছিল যে নবীজির হাতের মুঠোও খেজুর দ্বারা পুরো ভরেনি।
'তিনি একটি চাদর বিছিয়ে সেখানে খেজুরগুলো ছড়িয়ে রাখলেন। সঙ্গে সঙ্গে অনেক খেজুর দ্বারা চাদর ভরে গেল। এরপর নবীজি একজনকে নির্দেশ দিলেন, "পরিখা খননে ব্যস্ত সবাইকে জোরে ডাক দিয়ে বলো! তোমাদের জন্য খাবার উপস্থিত। চলে আসো।” নবীজির কথামতো একজন জোরে ঘোষণা দিয়ে সবাইকে খেজুরের চাদরের কাছে সমবেত করল। দীর্ঘক্ষণ মাটি খনন ও না খেয়ে থাকা ক্লান্ত সাহাবিগণ খেজুর খেতে শুরু করলেন। সবাই তৃপ্তিভরে খেলেন; কিন্তু এর পরও যেন খেজুর শেষ হচ্ছিল না।' বিনতে বাশির বলেন, 'সবার খাওয়া শেষে আমি দেখতে পাচ্ছিলাম, খেজুর চাদর থেকে বাইরে পড়ে যাচ্ছে।'
ইবনে কাসির তাঁর বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে বলেন, 'ইবনে ইসহাক এভাবেই ওই ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তাঁর সনদে বিচ্ছিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। ইমাম বায়হাকিও ইবনে ইসহাকের সূত্রে হুবহু উল্লেখ করেছেন। অতিরিক্ত কিছু বলেননি।'
ইমাম বুখারি তাঁর সহিহ বুখারি গ্রন্থে সাহাবি জাবের ইবনে আবদুল্লাহর সূত্রে পরিখার যুদ্ধের কাহিনি এভাবে বর্ণনা করেন, জাবের বলেন, 'আমরা খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খনন করছিলাম। হঠাৎ এক জায়গায় শক্ত অমসৃণ পাথর মাটির নিচে প্রকাশ পায়। আমরা অনেক চেষ্টা করেও তা ভাঙতে সক্ষম হইনি। পরে আমরা নবীজির কাছে এসে এ ব্যাপারে জানালে তিনি বললেন, "আচ্ছা! আমি নিচে নামব। দেখি, কী করা যায়।” এরপর নবীজি নিচে নেমে ওই শক্ত পাথরে আঘাত করলেন। নবীজি যখন নিচে নামছিলেন, তখন আমরা দেখি, তাঁর পেটে পাথর বাঁধা। এদিকে আমরা তিন দিন যাবৎ অনাহারে ছিলাম।
'নবীজির হাতের আঘাতে পাথরটি ভেঙে টুকরো হয়ে বালুকারাশিতে পরিণত হয়। অতঃপর আমি নবীজির কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে বাড়িতে আসি। স্ত্রীকে বলি, আজ নবীজিকে এমন অবস্থায় দেখেছি, যা সহ্য করার মতো নয়। ঘরে কি কোনো খাবার আছে? থাকলে প্রস্তুত করে দাও।' উত্তরে আমার স্ত্রী বললেন, এখন ঘরে কিছু যব ও একটি ছাগলছানা আছে। আমি স্ত্রীকে যব পিষতে দিয়ে ছাগলছানা জবাই করতে যাই। ছাগলের গোশত চুলায় ডেগচিতে দিয়ে দ্রুত নবীজির কাছে চলে আসি। এ সময় আটা থেকে খামির হচ্ছিল এবং গোশতও প্রায় রান্না হয়ে আসছিল।
'আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমার ঘরে কিছু খাবার আছে। আপনি এক বা দুজনকে সঙ্গে নিয়ে চলুন। নবীজি জিজ্ঞেস করলেন, কী পরিমাণ খাবার আছে? আমি তাঁকে সব খুলে বললে তিনি বললেন, এ তো অনেক উত্তম। এরপর তিনি আমাকে বললেন, "তুমি তোমার স্ত্রীকে গিয়ে বলো! আমি না আসা পর্যন্ত যেন চুলা থেকে গোশতের ডেগচি ও রুটি না নামায়।”
'অতঃপর নবীজি পরিখা খননে অংশগ্রহণকারী সবাইকে বললেন, “তোমরা চলো! জাবের তোমাদেরকে খাওয়ার নিমন্ত্রণ জানিয়েছে।” মুহাজির ও আনসার সাহাবিগণ নবীজির সঙ্গে চলতে লাগলেন। এদিকে আমি বাড়িতে এসে স্ত্রীকে বললাম, “তোমার সর্বনাশ হোক (এখন কী অবস্থা হবে?)! নবীজি তো মুহাজির-আনসার ও তাঁদের অন্য সাথিদের নিয়ে আমাদের বাড়িতে চলে আসছেন।” স্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, “নবীজি কি আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করেছিলেন?” আমি বললাম, হ্যাঁ।
'এরপর নবীজি বাড়িতে এসে সবাইকে বললেন, “তোমরা জাবেরের বাড়িতে প্রবেশ করো; তবে ভিড় কোরো না।” এই বলে তিনি রুটি টুকরা করে এর ওপর গোশত দিয়ে সাহাবিদের মধ্যে বিতরণ করতে লাগলেন। রুটি- গোশত পরিবেশন করার সময় তিনি ডেগচি ও চুলা ঢেকে রাখছিলেন। এভাবে তিনি রুটি টুকরা করে হাতভরে সবার সামনে পরিবেশন করতে থাকেন। সবাই পেটভরে খাওয়ার পরও আরও কিছু খাবার রয়ে গেল। তখন নবীজি জাবেরের স্ত্রীকে বললেন, “এবার তুমি খাও এবং অন্যদের হাদিয়া দাও। কারণ লোকদের প্রচণ্ড ক্ষুধা পেয়েছে।”'
সহিহ বুখারি গ্রন্থে বর্ণিত উপরিউক্ত হাদিসে নবীজির মু'জিজা সরাসরি প্রমাণিত সাব্যস্ত হয়। তা ছাড়া নবীজির হাতের বদৌলতে খাবার ও পানীয় পরিমাণে বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি আরও অনেক সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। এ অবস্থায় দুর্বল সনদে এ জাতীয় বর্ণনার পেছনে পড়া কিংবা এসব বর্ণনা না থাকলেও কোনো সমস্যা নেই। ইমাম বুখারি তাঁর সহিহ বুখারি গ্রন্থের অন্য জায়গায় 'নবুওয়াতের নিদর্শন' শীর্ষক অধ্যায়ে এ জাতীয় আরও ঘটনা বর্ণনা করেছেন।
📄 গাযওয়ায়ে আহযাব (খন্দকের যুদ্ধ)
ইবনে হিশাম বলেন, আবদুল আজিজ দারাওয়ারদি উম্মুল মুমিনিন আয়েশার সূত্রে তাঁর পিতা আবু বকর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, নবীজির কপালে শিরস্ত্রাণের দুটি কড়া বিদ্ধ হয়ে যাওয়ার পর সাহাবি আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ (রা.) নিজের দাঁত দিয়ে টেনে একটি কড়া বের করেন। এতে তাঁর দাঁত ভেঙে যায়। এরপর অপর কড়াটিও আগের মতো দাঁত দিয়ে টেনে বের করেন। এতে তাঁর আরেকটি দাঁত ভেঙে যায়। এ কারণে তিনি দুটি দাঁত ভাঙা নামে পরিচিতি লাভ করেন।
শাইখ আলবানি বলেন, ইমাম তায়ালিসি এ ঘটনা ধারাবাহিক সনদে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, 'ইবনুল মুবারক ইসহাক থেকে এভাবেই বর্ণনা করেছেন।'
ইমাম হাকিমও এ ঘটনা ধারাবাহিক সনদে বর্ণনা করেন। কিন্তু তাঁর সনদে কিছুটা পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। তবে এ প্রসঙ্গে ইমাম জাহবি বলেন, 'ওই সনদে উল্লেখিত ইসহাক হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যানযোগ্য।' আল্লামা হাইসামিও এমনটি বলেছেন। কিন্তু তিনি এর বর্ণনাকে বাজ্জারের দিকে সংযুক্ত করেছেন।
ইবনে কাসির ইসহাক ইবনে আবদুল্লাহর পক্ষ থেকে এ হাদিসের ব্যাপারে আলি ইবনে মাদিনির দুর্বলতা বলে মন্তব্য করার কথা বর্ণনা করেছেন।
নবীজির কপালে শিরস্ত্রাণের কড়া বিদ্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা উল্লেখ করার পর ইমাম জাহবি বলেন, 'এর সনদে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে।' শাইখ সা'আদ হুমাইদও একে দুর্বল বলেছেন।
সহিহ বুখারি গ্রন্থে সাহাবি আনাস থেকে বর্ণিত আছে, নবীজি উহুদের যুদ্ধে মারাত্মক আহত হন। তখন তিনি দুঃখ করে বলেছিলেন, 'ওই জাতি কীভাবে সফল হবে, যারা তাদের নবীকেও আহত করে!' এই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন:
لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ أَوْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ أَوْ يُعَذِّبَهُمْ فَإِنَّهُمْ ظَالِمُونَ
'হয়তো আল্লাহ তাদের ক্ষমা করবেন কিংবা তাদেরকে শাস্তি দেবেন। এ ব্যাপারে আপনার কিছুই করার নেই। কারণ তারা জালেম।"*
অপর বর্ণনায় আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি বলেছিলেন, 'এই জাতির ওপর আল্লাহ তায়ালার ভয়ানক আজাব ধেয়ে আসছে।' এর দ্বারা নবীজি তাঁর সামনের নিচের দুটি দাঁত ভেঙে যাওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করেছিলেন। সহিহ মুসলিম গ্রন্থে আছে, শিরস্ত্রাণটি নবীজির মাথার ওপরই চূর্ণ করা হয়।
ইমাম নববি বলেন, 'এ ঘটনায় উম্মাহর জন্য অনেক শিক্ষা রয়েছে। হক প্রতিষ্ঠায় শুধু মানুষ নয়; বরং আল্লাহ তায়ালার নবীদের ওপরও নানা রকমের বিপদ-আপদ এসেছে। তাঁরাও আমাদের মতো আল্লাহ তায়ালার পথে দুঃখ-যন্ত্রণা ভোগ করেছেন, যাতে তাঁরা বিপুল প্রতিদানের অধিকারী হতে পারেন।'
কাজি ইয়াজ বলেন, 'যারা দাবি করে, আল্লাহ তায়ালার নবীগণ ভিন্ন জাতির আওতাভুক্ত; অর্থাৎ তাঁরা আমাদের মতো মানুষ নন, তাদের জন্য উপরিউক্ত ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। তাঁরা যদি আমাদের মতো মানুষ নাই-বা হতেন, তাহলে আমরা যেভাবে আক্রমণের শিকার হয়ে আহত হই এবং আমাদের দেহ থেকে রক্ত ঝরতে থাকে, নবীরা এভাবে রক্তাক্ত হতেন না। অথচ আমরা দেখতে পাচ্ছি, স্বয়ং শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও যুদ্ধে শত্রুদের তির-বর্শার আঘাতে জর্জরিত হয়েছেন। অন্যদের মতো তাঁর দেহ মুবারক থেকেও রক্তের বন্যা বইয়ে যায়।' এতে বোঝা গেল, তাঁরাও আমাদের মতো সৃষ্টি এবং তাঁরাও প্রতিপালিত হন। নবীদের কাছ থেকে যেসব অলৌকিক ঘটনা ঘটে, সেগুলোর দিকে তাকিয়ে এমন চিন্তাধারায় উপনীত হওয়া যাবে না যে তাঁরা মানুষ নন। ইবলিস মানুষকে এসব কুমন্ত্রণা দেয়, যেমনটা দিয়েছে খ্রিষ্টানদের।
টিকাঃ
* সুরা আলে ইমরান: ১২৮
সালমান আহলে বাইতের সদস্য
ঐতিহাসিক ইবনে সা'আদ, হাকিম ও আরও অন্যান্য সিরাত গ্রন্থকার কাসির ইবনে আবদুল্লাহর সূত্রে আমর ইবনে আওফের দাদা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের জন্য নবীজি কাজ ভাগ করে দিতে প্রতি ৪০ হাত জায়গা ১০ জন সাহাবির মধ্যে বণ্টন করে দিচ্ছিলেন। ইত্যবসরে সালমান ফারেসিকে দলে নিতে মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে কাড়াকাড়ি শুরু হয়। তখন নবীজি বললেন, 'সালমান আমার পরিবারভুক্ত।' যেহেতু সালমান মক্কারও ছিলেন না যে মুহাজির গণ্য হবেন, আবার মদিনারও ছিলেন না যে আনসার গণ্য হবেন। তাই নবীজির প্রিয় এই সাহাবিকে নিয়ে একপ্রকার কাড়াকাড়ি শুরু হয়ে যায়। তখন নবীজি কারও পক্ষে না গিয়ে নিজের পরিবারভুক্ত বলে সালমানকে বরণ করে নিলেন। তিনি পারস্যের অধিবাসী ছিলেন। তাই এমন হয়েছে।
ইমাম জাহবি তালখিস গ্রন্থে বলেন, 'এ বর্ণনার সনদ দুর্বল।' আল্লামা হাইসামি এর সূত্রকে ইমাম তাবারানির দিকে সম্পৃক্ত করে তাঁর মাজমাউজ জাওয়ায়েদ গ্রন্থে লিখেছেন, 'এ বর্ণনার সূত্রে যে কাসির ইবনে আবদুল্লাহর কথা উল্লিখিত হয়েছে, অধিকাংশ আলেম তাঁকে দুর্বল বলে আখ্যায়িত করেছেন। তবে ইমাম তিরমিজি কাছিরের সনদকে হাসান বলে অভিহিত করেছেন। অবশ্য এ সূত্রের অন্য বর্ণনাকারীরা নির্ভরযোগ্য।'
ইমাম জাহবি তাঁর সিয়ারু আলামিন নুবালা গ্রন্থে সালমানের জীবনীতে এ প্রসঙ্গ টেনে বলেন, 'কাসির ইবনে আবদুল্লাহ মারাত্মক পর্যায়ের দুর্বল।'
অতঃপর তিনি আ'মাশের সূত্রে আবুল বাখতারি থেকে বর্ণনা করেন, লোকেরা সাহাবি আলিকে নবীজির আহলে বাইতের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'আহলে বাইতের কার ব্যাপারে জানতে চাইছ?' তারা উত্তর দিল, 'সালমানের ব্যাপারে।' আলি বললেন, 'সালমান! তিনি তো পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সকলের জ্ঞান পেয়েছেন। তিনি এমন জ্ঞানসমুদ্র, যার তলদেশের নাগাল পাওয়া সম্ভব নয়। তিনি আমাদেরই পরিবারভুক্ত।' (আহলে বাইত)
শাইখ শু'আইব আরনাউত সিয়ার গ্রন্থের টীকায় বলেন, 'এ বর্ণনার সনদের সবাই নির্ভরযোগ্য। ফাসাবি তাঁর মা'রিফাহ ওয়াত তারিখ গ্রন্থে আরও দীর্ঘ পরিসরে এ বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। তাঁর সূত্রের বর্ণনাকারীরাও নির্ভরযোগ্য। ইমাম তাবারানি ও আবু নু'আইম তাঁর হিলইয়া গ্রন্থে এ ঘটনা উল্লেখ করেছেন।'
শাইখ আলবানি ওই ঘটনার মূল সূত্র আলির দিকে হওয়ার বিষয়টিকে সহিহ বলে সাব্যস্ত করেছেন।
হাসসান ইবনে ছাবিতের প্রতি ভীরুতার অপবাদ
ইবনে ইসহাক ইয়াহইয়া ইবনে আব্বাদের সূত্রে তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, সাফিয়া বিনতে আবদুল মুত্তালিব একবার হাসসান ইবনে ছাবিতের দুর্গে একটি উঁচু স্থানে অবস্থান করছিলেন। তিনি বলেন, 'আমরা নারী-শিশুরা দুর্গে অবস্থান করছিলাম। তখন হাসসান ইবনে সাবিতও আমাদের সঙ্গে সেখানে ছিলেন। বনু কুরাইজের সঙ্গে মুসলিমদের যুদ্ধ চলছিল। তারা নবীজির সঙ্গে কৃত চুক্তি ভঙ্গ করে।'
অতঃপর সাফিয়া আরও বলেন, 'আমি দেখলাম, এক ইহুদি দুর্গের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে। তাকে প্রতিহত করার মতো আমাদের মধ্যে কেউ ছিল না। ওদিকে নবীজি ও তাঁর সাহাবিগণ যুদ্ধে ব্যস্ত ছিলেন। যার কারণে আমাদের কাছে তাঁদের কারও ফিরে আসার সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছিল না। তখন আমি হাসসানের দিকে এগিয়ে যাই। তাঁকে বলি, হাসসান! এক ইহুদি কুমতলব নিয়ে এখানে ঘোরাফেরা করছে। এখানে আমাদের নারী ও শিশু ছাড়া অন্য কেউ নেই। তাকে আমার সুবিধাজনক বলে মনে হচ্ছে না। সে আমাদের এমন অবস্থা অপরাপর ইহুদিদের কাছে বলে দেবে। তুমি গিয়ে ওই ইহুদির পশ্চাদ্ধাবন করো এবং তাকে হত্যা করো।'
উত্তরে হাসসান অপারগতা প্রকাশ করে বললেন, 'হে সাফিয়া! আল্লাহ তোমায় ক্ষমা করুন। তুমি তো জানোই, এসব হত্যাকাণ্ড আমার পক্ষে সম্ভব নয়।' এরপর সাফিয়া বলেন, 'হাসসান অপারগতা জানানোর পর আমি এদিক-ওদিক দেখতে থাকি। হঠাৎ এক স্থানে একটি বড় খুঁটির মতো কিছু দেখতে পেয়ে গিয়ে তা তুলে নিই।
'সেটা নিয়ে আমি কেল্লার নিচে তাকে লক্ষ্য করে নেমে আসি এবং তার মাথায় সে খুঁটি দিয়ে সজোরে আঘাত করি। এতে ইহুদি লোকটি ঘটনাস্থলেই নিহত হয়।'
সাফিয়া বলেন, 'এরপর আমি দুর্গে ফিরে আসি। হাসসানকে ডেকে বলি, তুমি নিচে নেমে এর অস্ত্র ও অন্যান্য জিনিসপত্র নিয়ে নাও। আমি নারী হওয়ার কারণে তা করতে পারছি না।' কিন্তু হাসসান এতেও অস্বীকৃতি জানান। বলেন, 'আমার এর কোনো প্রয়োজন নেই।'
ওই ঘটনার বর্ণনাসূত্রে ইয়াহইয়া ও তাঁর পিতা আব্বাদ উভয়েই নির্ভরযোগ্য। তবে ইয়াহইয়ার পিতা তাবেয়ি হওয়ায় এ বর্ণনাটি মুরসাল পর্যায়ভুক্ত।
ইবনে সা'আদ এ ঘটনা সংক্ষেপে এবং হাকিম এটি হিশাম ইবনে উরওয়ার পিতার সূত্রে সাফিয়া থেকে বর্ণনা করেছেন। উরওয়া বলেন, 'আমি সাফিয়াকে বলতে শুনেছি।' হাকিম এ প্রসঙ্গে বলেন, 'এ ঘটনার সনদ ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহিহ; তবে তাঁরা এ ঘটনা উল্লেখ করেননি।'
এরপর ইমাম জাহবি ওই কথার বিরোধিতা করে বলেন, 'উরওয়া সাফিয়া বিনতে আবদুল মুত্তালিবের সাক্ষাৎ পাননি।' তবে হাকিম এ ঘটনাটি অন্য সনদে ইসহাক ইবনে ইবরাহিম ফারবি থেকে উম্মে ফারওয়া বিনতে জাফর ইবনে জুবায়েরের সূত্রে তাঁর দাদা জুবায়ের থেকে বর্ণনা করেছেন। জুবায়ের সরাসরি সাফিয়া থেকে এটি বর্ণনা করেছেন।
অতঃপর তিনি বলেন, 'এ ঘটনা আরও দীর্ঘ পরিসরে উল্লেখিত হয়েছে। ওই সনদটি দুর্লভ। তবে অবশ্যই তা সহিহ সনদে বর্ণিত হয়েছে।' ইমাম জাহবি তালখিস গ্রন্থে বলেন, 'এই সনদটি দুর্লভ হলেও সহিহ।' তবে আমি (মূল গ্রন্থকার) উম্মে ফারওয়ার জীবনী কোথাও পাইনি।
তবে ইমাম জাহবি তাঁর সিয়ারু আ'লামিন নুবালা গ্রন্থে উম্মে ফারওয়ার জীবনীতে তাঁর নাম 'উম্মে উরওয়াহ বিনতে জাফর' লিখেছেন।
শু'আইব আরনাউত বলেন, 'উম্মে ফারওয়া সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। তবে তাঁর পিতা জাফরের কথা ইবনে আবু হাতিম তাঁর জারহ ওয়া তা'দিল গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তবে ভালো-মন্দ কোনো মন্তব্য করেননি। অর্থাৎ, জরাহও করেননি, তাদিলও করেননি।
আল্লামা হাইসামি এ ঘটনা মাজমাউজ জাওয়ায়েদ গ্রন্থে উল্লেখ করার পর জুবায়ের থেকে বর্ণিত ঘটনা প্রসঙ্গে বলেন, 'ইমাম বাজ্জার ও আবু ইয়ালা এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তবে তাঁদের দুজনেরই সনদ দুর্বল।' অতঃপর তিনি উরওয়ার সূত্রে বর্ণিত ঘটনায় বলেন, 'এ ঘটনা ইমাম তাবারানি উল্লেখ করেছেন। তাঁর বর্ণনাসূত্রে উরওয়া পর্যন্ত সবাই সহিহ হাদিস বর্ণনাকারীদের অন্তর্ভুক্ত। তবে ওই ঘটনাটি মুরসাল ধারায় বর্ণিত।'
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি তাঁর ফাতহুল বারি গ্রন্থে এ ঘটনার সূত্র ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের সনদে আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর থেকে বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন, 'এর সনদ শক্তিশালী।' (মূল গ্রন্থকার বলছেন) তবে ইবনে হাজারের কথার পরিপ্রেক্ষিতে এর সম্ভাব্য স্থান অনুমান করে আমি মুসনাদে আহমাদ গ্রন্থের যে বিন্যাস ইমাম সাআতি করেছেন এবং যেটার নাম হলো আল ফাতহুর রব্বানি, সেখানে খুঁজে পাইনি। ওই কিতাবের খন্দক এবং গনিমতের এক-পঞ্চমাংশ আবশ্যক হওয়া সংক্রান্ত অধ্যায়ে আমি তালাশ করেছি।'
ইবনে আবদুল বার ইসতি'আব গ্রন্থে হাসসান ইবনে ছাবিতের জীবনীতে লিখেছেন, অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও সিরাত গ্রন্থকারের মতে হাসসান খুবই ভীরু প্রকৃতির লোক ছিলেন। তাঁরা ইবনে জুবায়েরের সূত্রে এ কথা বলেছেন।
ইবনে জুবায়েরের সূত্রে বর্ণনাকারীরা তাঁর ভীরুতার বেশ কিছু দৃষ্টান্তও উল্লেখ করেছেন। কিন্তু কথাগুলো খুব খারাপ শোনা যায় বলে সেগুলো আমি (ইবনে আবদুল বার) উল্লেখ করলাম না। যাঁরা তাঁর ব্যাপারে উল্লেখ করেছেন, তাঁদের কেউ কেউ বলেন, 'হাসসান অতিরিক্ত ভীরু হওয়ায় নবীজির সঙ্গে কোনো অভিযানে অংশগ্রহণ করেননি।'
এসব কথার পরিপ্রেক্ষিতে আলেমগণ বলেন, যদি আসলেই হাসসান ভীরু হতেন, তাহলে ব্যাপকভাবে তাঁর নিন্দা এবং কুৎসা রটানো হতো। কারণ, তিনি নিজে কাফের, মুশরিক ও ইহুদি সম্প্রদায়ের ভীরুতা এবং অপরাপর অমুসলিম কবিদের বিরুদ্ধে নিন্দা কবিতার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলে প্রবল নিন্দা করতেন। অথচ তাঁদের পক্ষ থেকে হাসসানের ব্যাপারে এ জাতীয় কোনো নিন্দাবাদ করা হয়নি। সুতরাং তিনি যদি এমন ভীরু প্রকৃতির হতেন, তাহলে তাঁরও এমন কুৎসা রটানো হতো।
ইমাম সুহাইলি তাঁর রওজুল উনুফ গ্রন্থে বলেন, উপরিউক্ত ঘটনায় হাসসান ইবনে ছাবিতের ভীরুতার প্রসঙ্গ হচ্ছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। অর্থাৎ তিনি কি মূলত ভীরু প্রকৃতির ছিলেন? অনেক আলেম তা প্রত্যাখ্যান করে একে হাসসানের প্রতি ঠাট্টা-বিদ্রূপ বলে অভিহিত করেছেন। কারণ এ ঘটনার বর্ণনাসূত্রে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে।
যদিও-বা এ বর্ণনা পুরোপুরি সঠিক হয়, তাহলে মনে রাখুন, এটি তাঁর প্রতি বিধর্মী কবিদের বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য। কারণ হাসসান ইবনে সাবিত নিজেই দারার, ইবনে জাব'আরি ও আরও অনেক অবিশ্বাসী কবি-সাহিত্যিককে বিদ্রূপ করতেন। তাদের অশ্লীল রচনা ও ইসলামের বিরুদ্ধে করা কটূক্তির কড়া উত্তর তিনি প্রদান করতেন। তাই তারা ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে এমন অপবাদ আরোপ করে। অথচ কটাক্ষ করলেও এসব জাহেলি কবির কেউই তাঁকে এর পরও ভীরু বলে অপবাদ দেয়নি। আর এটিই ইবনে ইসহাকের বর্ণনাসূত্রের দুর্বলতার সপক্ষে প্রমাণ।
এমন হওয়াও অসম্ভব কিছু নয় যে, ওইদিন দুর্গে হাসসান ইবনে সাবিত নিশ্চয় কোনো কারণে অপারগ ছিলেন, যার ফলে তিনি নবীজির সঙ্গে অভিযানে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। বর্ণনার এমন ব্যাখ্যাই অধিক যুক্তিসংগত। আর যাঁরা এমন বর্ণনাগুলোকে সহিহ মানতে চান না, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন আবু আমর ইবনে আবদুল বার। তিনি তাঁর দুরার নামক কিতাবে বিষয়টি মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
এ ছাড়া আরও একাধিক কারণে নবীজির বরেণ্য এ সাহাবির ব্যাপারে এ জাতীয় অপবাদ কখনো সঠিক হতে পারে না। সার্বিক বিবেচনায় উপরিউক্ত বর্ণনার সনদ ও মূলপাঠ কোনোটিই সঠিক নয়। আর তা হচ্ছে:
এক. ওই ঘটনা ধারাবাহিক ও সহিহ সনদে বর্ণিত হয়নি; বরং এর মধ্যে বিচ্ছিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। যেমন আগে এ সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুই. মূলত হাসসান ইবনে সাবিত কাব্যছন্দে বিধর্মী ও অবিশ্বাসী ইসলামের বিরুদ্ধে কবি-সাহিত্যিকদের কটূক্তির প্রতিবাদ করতেন। তাই তারা ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁকে ভীরু বলে অপবাদ দেয়। তাই তাঁর ভীরুতার ব্যাপার যদি আসলেই সত্য হতো, তাহলে এসব কাফের মুশরিক কবিরা ব্যাপকভাবে তাঁর নিন্দা ছড়াত। অথচ তারাও এমন কোনো কুৎসা রটায়নি। এ ব্যাপারে হাদিসশাস্ত্রের বিখ্যাত দুই জ্ঞানতাপস ইবনে আবদুল বার এবং সুহাইলির আলোচনা আগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তিন. ইসলামে সংঘটিত মুখোমুখি কোনো সংগ্রামেই হাসসান ইবনে ছাবিতের পিছু হটার কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। বদর, উহুদ, খন্দক ও হুনাইনের মতো রক্তক্ষয়ী সব যুদ্ধেই তিনি নবীজির সঙ্গে অংশগ্রহণ করেন।
চার. খন্দকের অভিযানে মদিনা শহরের চারপাশে পরিখা খননের কারণে সেখানে বিধর্মী বাহিনীর সঙ্গে মুসলিমদের সরাসরি যুদ্ধ হয়নি। কুরাইশ ও আরবের সম্মিলিত বাহিনী ছিল পরিখার অপর পাশে এবং মুসলিমগণ ছিলেন মদিনার দিকে। উভয় পক্ষ থেকে শুধু তির নিক্ষেপ হয়েছে মাত্র। এতে মুসলিমদের পক্ষে সা'আদ ইবনে মু'আজ (রা.) আহত হয়েছিলেন। তাই এ যুদ্ধে কারও পক্ষেই পিছু হটার প্রশ্ন আসতে পারে না।
পাঁচ. এটি ছিল খন্দকের যুদ্ধের সময়ের ঘটনা। এ সময় সাহাবি হাসসান ইবনে ছাবিতের বয়স ৭১ মতান্তরে ৮৫ ছিল। অতএব, বার্ধক্যের এ বয়সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করাটাই স্বাভাবিক। কারণ তখন তা অপারগতা বলে গণ্য হবে। তাই তাঁর ব্যাপারে ভীরুতার যে অপবাদ দেওয়া হয়েছে, এর কোনো ভিত্তি নেই。
নু'আইম ইবনে মাসউদ গাতফানি কর্তৃক সম্মিলিত বাহিনীর সঙ্গে প্রতারণা
আরবের সম্মিলিত বাহিনী কর্তৃক মদিনায় আক্রমণের (খন্দকের যুদ্ধে) এ ঘটনায় আরেকটি প্রসিদ্ধ বর্ণনা পাওয়া যায়, যা ইবনে ইসহাক উল্লেখ করেছেন। তিনি বর্ণনা করেন, গাতফান গোত্রের নু'আইম ইবনে মাসউদ যুদ্ধ চলাকালেই নিজ পরিবারের কাউকে না জানিয়ে নবীজির কাছে ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণ করার পর তিনি নবীজির সঙ্গে খন্দকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এরপর তিনি নবীজিকে বললেন, 'ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি আমাকে যা ইচ্ছে আদেশ করুন। আমি তা পালন করতে প্রস্তুত।'
উত্তরে নবীজি বললেন, 'তুমি আমাদের মধ্যে একমাত্র ব্যক্তি, যে এই কাজটি করতে সক্ষম হবে। তুমি কুরাইশদের নেতৃত্বে সম্মিলিত বাহিনীর ভেতরে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে তাদের বিভ্রান্ত করে দাও। মনে রেখো, যুদ্ধের অর্থ হচ্ছে প্রতিপক্ষকে কূটকৌশলে আটকে ফেলা।'
নবীজির নির্দেশ পেয়ে নু'আইম ইবনে মাসউদ ইহুদি গোত্র বনু কুরাইজার কাছে যান। তিনি তাদের উদ্দেশে বলেন, 'কুরাইশ বাহিনী ও গাতফান গোত্র তোমাদের পরিত্যাগ করেছে। তারা তোমাদের সঙ্গে এ যুদ্ধে জড়াতে ইচ্ছুক নয়। তোমরা এক কাজ করো। কুরাইশদের যেসব লোক তোমাদের কাছে রয়েছে, তাদের বিনিময়ে তোমরা কুরাইশদের থেকে পণ আদায় করো। এতে তোমাদেরই লাভ হবে।' গাতফান গোত্রের সন্তান হওয়ায় কুরাইজার ইহুদিরা সহজেই নু'আইম ইবনে মাসউদের কথা বিশ্বাস করে ফেলে। তারা তাঁকে এ বলে উত্তর দেয়, 'তুমি আমাদের অনেক ভালো পরামর্শ দিলে।'
এরপর তিনি কুরাইশদের ছাউনিতে যান। তাদের উদ্দেশে বলেন, 'কুরাইজা গোত্রের ইহুদিরা মুহাম্মদের সঙ্গে যে শান্তিচুক্তি করেছিল, তা ভঙ্গ করার ফলে তারা খুবই লজ্জিত। তাই তারা এ যুদ্ধে মুসলিমদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।' নু'আইম কুরাইশ নেতাদের আরও বললেন, 'মুহাম্মদের সন্তুষ্টি আর ইঙ্গিত পেলে ইহুদিরা তোমাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গকে ধরে নিয়ে মুহাম্মদের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, যাতে সে তাদেরকে হত্যা করে। কাজেই তোমরা পণস্বরূপ তোমাদের কাউকে তাদের হাতে ছেড়ে দিয়ো না।'
অতঃপর নু'আইম কুরাইশদের মতো স্বীয় গোত্র গাতফানের লোকদেরও এভাবেই বনু কুরাইজার বিরুদ্ধে উসকে দেন। ফলে আরবের সম্মিলিত বাহিনীর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। তাদের জোটে ভাঙনের সম্ভাবনা দেখা দেয়।
ওই ঘটনা প্রসঙ্গে শাইখ আলবানি বলেন, ইবনে ইসহাক এ ঘটনা সনদ ছাড়া বর্ণনা করেছেন। তাঁর সূত্রে ইবনে হিশামও উল্লেখ করেছেন। তবে নবীজির উক্তি 'নিশ্চয় যুদ্ধ প্রতারণার অংশ' অবশ্যই সহিহ সনদে বর্ণিত হয়েছে, যা শাইখাইন (ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম) সাহাবি জাবের এবং আবু হুরায়রার সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
এ প্রসঙ্গে ড. আকরাম উমরি বলেন, ওই ঘটনা হাদিসের ধারাবাহিক বর্ণনায় পাওয়া না গেলেও সিরাতের গ্রন্থগুলোতে তা অনেক প্রসিদ্ধ।
অবশ্য আল্লাহ তায়ালা দুই শক্তির সাহায্যে আরবের সম্মিলিত বাহিনীর মধ্যে ফাটল ধরিয়ে দিয়েছিলেন, যা তিনি কোরআনের সুরা আহজাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন:
'হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্মরণ করো, যখন শত্রুবাহিনী তোমাদের নিকটবর্তী হয়েছিল। অতঃপর আমি তাদের বিরুদ্ধে ঝঞ্ঝাবায়ু এবং এমন সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেছিলাম, যাদেরকে তোমরা দেখতে না। তোমরা যা করো, আল্লাহ তা দেখেন।"*
ওই আয়াতে দুটি শক্তির কথা বলা হয়েছে। প্রথমটি প্রবল ঝঞ্ঝাবায়ু এবং দ্বিতীয়টি অদৃশ্য সৈন্যবাহিনী তথা ফেরেশতা। এ বাতাস প্রসঙ্গে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম সাহাবি আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন, নবীজি ইরশাদ করেছেন, 'আমি প্রবাহিত বাতাস দ্বারা সাহায্যপ্রাপ্ত হয়েছি। আর আদ জাতিকে পশ্চিমা লু হাওয়া দ্বারা ধ্বংস করা হয়েছে।'
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি ফাতহুল বারি গ্রন্থে লিখেছেন, ইমাম আহমদ সাহাবি আবু সাঈদের (রা.) সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'আমরা খন্দকের যুদ্ধে নবীজিকে বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমরা কি আল্লাহ তায়ালাকে কিছু বলতে পারি? পিপাসা ও ক্ষুধায় আমাদের প্রাণ যেন ওষ্ঠাগত হয়ে যাচ্ছে।' উত্তরে নবীজি বললেন, 'হ্যাঁ, অবশ্যই। কেন নয়?' এরপর তিনি দোয়া করলেন, 'হে আল্লাহ! আপনি আমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি গোপন রাখুন এবং আমাদের ভীতি-শঙ্কা দূর করে দিন।' নবীজির দোয়া শেষ হতেই আল্লাহ তায়ালা প্রবল বেগে বাতাস প্রেরণ করেন। তীব্র তুফানে বিধর্মী বাহিনীর ছাউনি লন্ডভন্ড হয়ে যায়। তারা এদিক-ওদিক বিক্ষিপ্ত হয়ে ছুটতে শুরু করে।
অতঃপর হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি বলেন, 'এখানে গ্রন্থকার কী উদ্দেশ্যে উপরিউক্ত হাদিস বর্ননা করেছেন, তা হাদিসের বাক্য দেখে সহজেই বোঝা যাচ্ছে। আল্লাহ তায়ালা প্রবল বাতাস ও তুফানের মাধ্যমে মুসলিম বাহিনীকে সাহায্য করেছিলেন।'
তবে হাফেজ ইবনে হাজার যে সূত্রে ওই হাদিস উল্লেখ করেছেন, তাতে রুবাইহ ইবনে আবদুর রহমান ইবনে আবু সাঈদ নামের একজন দুর্বল বর্ণনাকারী রয়েছেন।
শাইখ আলবানি এ ঘটনায় উল্লেখিত নবীজির দোয়াকে সহিহ বলে সাব্যস্ত করেছেন। ঘটনার ব্যাপারে সত্যায়ন করেননি।
এ ছাড়া কোরআনের আয়াতে যে অদৃশ্য সৈন্যবাহিনীর কথা বলা হয়েছে, তাফসিরকারদের ভাষায় তাঁরা ছিলেন ফেরেশতা। যাদের ব্যাপারে কোরআনের তিন জায়গায় আল্লাহ তায়ালা বলেছেন। এর মধ্যে সুরা তওবায় দুই জায়গার কথা বলেছেন। প্রথমটি হুনাইন যুদ্ধের সময় এবং দ্বিতীয়টি হিজরতের সময়। ইরশাদ হচ্ছে:
'তারপর আল্লাহ অবতারণা করলেন নিজের পক্ষ থেকে তাঁর রাসুল ও মুমিনদের প্রতি সান্ত্বনা এবং অবতীর্ণ করেন এমন সেনাবাহিনী, যাদের তোমরা দেখতে পাওনি। আর তিনি শাস্তি প্রদান করেন কাফেরদের এবং এটি হলো কাফেরদের কর্মফল।"*
আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীকে সাহায্য করেছিলেন মদিনায় হিজরতের সময়। যখন নবীজি (সা.) ও আবু বকর (রা.) ছাওর গুহায় আত্মগোপন করেন, তখন আল্লাহ তায়ালা তাঁদেরকে মাকড়সার জাল বিস্তৃত করার মাধ্যমে সাহায্য করেছিলেন। এ ব্যাপারে ইরশাদ হচ্ছে:
'যদি তোমরা তাকে (রাসুলকে) সাহায্য না করো, তবে মনে রেখো, আল্লাহ তাঁর সাহায্য করেছিলেন, যখন তাঁকে কাফেররা বহিষ্কার করেছিল। তিনি ছিলেন দুজনের একজন, যখন তাঁরা গুহার মধ্যে ছিলেন। তখন তিনি আপন সঙ্গীকে (আবু বকরকে) বললেন, বিষণ্ণ হয়ো না, আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।
'অতঃপর আল্লাহ তাঁর প্রতি স্বীয় সান্ত্বনা অবতীর্ণ করলেন এবং তাঁর সাহায্যে এমন বাহিনী পাঠালেন, যা তোমরা দেখোনি। বস্তুত আল্লাহ কাফেরদের মাথা নিচু করে দিলেন এবং আল্লাহর কথাই সদা সমুন্নত এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।"*
আরেকবার ফেরেশতাগণ মুসলিম বাহিনীর পক্ষে লড়েছিলেন খন্দকের যুদ্ধে। যার বর্ণনা আল্লাহ তায়ালা সুরা আহজাবে ইরশাদ করেছেন। এ প্রসঙ্গে আগেই বলা হয়েছে।
সর্বমোট এই তিন জায়গায় অদৃশ্য বাহিনীর ব্যাখ্যায় ফেরেশতাদের কথা বলা হয়েছে।
ইমাম বায়হাকি তাঁর দালায়েলুন নুবুওয়াহ গ্রন্থে এ ঘটনা আহমাদ ইবনে আবদুল জাব্বারের সূত্রে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি আহমাদ ইবনে আবদুল জাব্বার সম্পর্কে বলেন, 'আহমাদ দুর্বল বলে বিবেচিত। তবে তাঁর সূত্রে বর্ণিত সিরাতের ঘটনা সহিহ।'
ইবনে কাসির এ ঘটনা ইমাম বায়হাকির সূত্রে সামান্য পরিবর্তন সাপেক্ষে বর্ণনা করেছেন। এসব বর্ণনার আলোকে বোঝা যায়, আল্লাহ তায়ালা সাহায্য করার পর নবীজি আরব ও কুরাইশদের সম্মিলিত বাহিনীর মধ্যে গুজব ছড়িয়ে তাদের বিভ্রান্ত করে দেন। যার ফলে তাদের জোটে ভাঙন দেখা দিয়েছিল। আর নু'আইম ছিলেন শুধু নবীজির পক্ষ থেকে বার্তাবাহক মাত্র。
টিকাঃ
* সুরা আহজাব : ৯
* সুরা তওবা: ২৬
*সুরা তওবা: ৪০
📄 গাযওয়ায়ে বানী কুরাইযা
কাসেম ইবনে আবদুর রহমানের সূত্রে ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, উহুদের রণাঙ্গনে যুদ্ধ প্রচণ্ড আকার ধারণ করার পর একটি সামান্য ভুলের জন্য মুসলিম বাহিনী বিক্ষিপ্ত হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। এর মধ্যে গুজব ছড়িয়ে পড়ে, নবীজি শহীদ হয়ে গেছেন।
এ খবর মুহূর্তের মধ্যে পুরো রণাঙ্গনে ছড়িয়ে পড়ে। সাহাবিগণের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। নবীজির শাহাদাতের খবরে থ হয়ে যান সবাই। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে পিছু হটতে চাইছিলেন। মনোবল হারিয়ে বুঝে উঠতে পারছিলেন না, কী করবেন।
আনাস ইবনে মালিকের চাচা আনাস ইবনে নজর উমর ও তালহার দিকে এগিয়ে যান। তিনি আনসার ও মুহাজিরদের এক জটলায় ছিলেন। সেখানে সবাই হাত গুটিয়ে বসে ছিলেন। তিনি সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমরা বসে আছ কেন?' তাঁরা উত্তর দিলেন, নবীজি শহীদ হয়ে গেছেন। আনাস ইবনে নজর বললেন, 'তাহলে তোমরা এখানে কী করছ? তাঁর পরে বেঁচে থাকব কার জন্য? তিনি যে পথে শহীদ হয়ে গেছেন, চলো! আমরা সেই পথেই শাহাদাতবরণ করি।' এরপর তিনি প্রবল বিক্রমে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। যুদ্ধ করতে করতে আনাস ইবনে নজর শাহাদাত লাভ করেন।
ইবনে ইসহাক বলেন, হুমাইদ সাহাবি আনাস ইবনে মালিক থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, 'আনাস ইবনে নজর শহীদ হয়ে যাওয়ার পর আমি তাঁর নিথর দেহের সন্ধানে বের হই। গিয়ে দেখি, তাঁর শরীরে ৭০টির বেশি আঘাতের চিহ্ন। তাঁর দেহ এমন ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল, আমরা কেউ চিনতে পারিনি। পরে তাঁর বোন এসে তাঁর আঙুলের অগ্রভাগ দেখে শনাক্ত করেন।
ইবনে আবু হাতেম এ বর্ণনার সূত্রে উল্লিখিত কাসেম ইবনে আবদুর রহমানের ব্যাপারে ভালো-মন্দ কিছুই বলেননি। তবে এ বর্ণনাটিও মুরসাল। অবশ্য উমরের মতো মহান ব্যক্তিত্বের ব্যাপারে এমন ভাবা যায় না যে নবীজির ইন্তেকালের সংবাদ শুনে তিনি রণাঙ্গনে অস্ত্র ছেড়ে দিয়ে বসে থাকবেন, যেমন উপরিউক্ত ঘটনায় উল্লিখিত হয়েছে। কারণ অন্য বর্ণনায় রয়েছে, নবীজি যখন স্বাভাবিকভাবে ইন্তেকাল করেন, তখন উমর (রা.) তা অস্বীকার করেন। তিনি মানতেই চাচ্ছিলেন না যে আমাদের নবীরও মৃত্যু হতে পারে।
নবীজির ইন্তেকালের সংবাদ মদিনায় ছড়িয়ে পড়লে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। তাঁর প্রিয় সাহাবিগণ হতোদ্যম হয়ে পড়েন। তাঁদের চোখের সামনে যেন পুরো জগতের অন্ধকার নেমে আসে। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে উমর হাতে তরবারি নিয়ে বের হন। তিনি চিৎকার করতে থাকেন, 'আল্লাহর নবীর মৃত্যু হতে পারে না। যে এ কথা বলবে, তার গর্দান উড়িয়ে দেব।'
নবীজির প্রধান সাহাবি আবু বকর (রা.) আর দেরি করলেন না। তিনি উমরকে রেখেই মসজিদে চলে এলেন। এর আগে তিনি উমরকে বলেছিলেন, 'হে উমর! তুমি শান্ত হও।' কিন্তু উমর তাঁর কথা মানলেন না। নিজের মতো বলতে যাচ্ছিলেন। তখন লোকেরা উমরকে নিজের অবস্থায় ছেড়ে দিয়ে আবু বকরের কথা শোনার দিকে মনোযোগী হলো। আবু বকর সবার উদ্দেশে ভাষণ দিলেন। কোরআনের আয়াত দ্বারা বোঝালেন, নবীদেরও মৃত্যু হতে পারে, এটা স্বাভাবিক ব্যাপার এবং এখন তা-ই ঘটেছে। এরপর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়।
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি বলেন, ইবনে আবু শাইবা সাহাবি ইবনে উমর থেকে বর্ণিত, আবু বকর যখন উমরকে অতিক্রম করছিলেন, তখন তিনি বলছিলেন, 'আল্লাহ তায়ালা সমস্ত মুনাফিককে হত্যা করার আগ পর্যন্ত তাঁর নবীর মৃত্যু হতে পারে না।'
উহুদের যুদ্ধে তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রা.) সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে। উহুদের দিন তো তালহারই ছিল। ইমাম বুখারি কায়েস ইবনে হাজেমের সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, 'আমি ওইদিন তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহর হাতের অবস্থা দেখেছি। তাঁর হাত প্রায় অবশ হয়ে আসছিল। এই হাত দ্বারা তিনি নবীজিকে শত্রুদের আঘাত থেকে রক্ষা করে যাচ্ছিলেন।'
ইমাম নাসায়ি সাহাবি জাবেরের সূত্রে তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহর বীরত্বের ঘটনা বর্ণনা করেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, 'একের পর এক আঘাতে তালহার হাতের আঙুল কেটে হাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তখন তিনি বললেন, “আহ! শেষ হয়ে গেল।” নবীজি তাঁর এ কথা শুনে বললেন, “তুমি যদি এ মুহূর্তে বিসমিল্লাহ বলতে, তাহলে ফেরেশতাগণ তোমাকে আসমানে উঠিয়ে নিয়ে যেতেন আর লোকেরা সরাসরি তা দেখতে পেত।”'
ইমাম তিরমিজি সাহাবি জুবায়েরের সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'আমি নবীজিকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছিলেন, তালহা নিজের জন্য জান্নাতকে অবধারিত করে নিল।'
ইমাম জাহবি এই সনদকে হাসান পর্যায়ের অভিহিত করেছেন।
ইমাম ইবনে মাজাহ এবং ইমাম তিরমিজি এর অপর এক সনদে সাহাবি মুআবিয়া (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 'একদিন নবীজি তালহাকে দেখে বললেন, তালহা তার দায়িত্ব পূরণ করেছে।'
ইমাম হাকিম সাহাবি আয়েশার সূত্রে এ ঘটনা বর্ণনা করার পর বলেন, 'এর সনদ ইমাম মুসলিমের নীতিমালা অনুযায়ী সহিহ। তবে শাইখাইন (ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম) এটি উল্লেখ করেননি।' ইমাম জাহবি তাঁর এ কথার প্রতি সমর্থন দিয়েছেন।
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি তাঁর ফাতহুল বারি গ্রন্থে ওই ঘটনার সনদ আয়েশার সূত্রে চিহ্নিত করার পর একে সহিহ বলে সাব্যস্ত করেন। অতঃপর বলেন, 'ইমাম ইবনে মাজাহ এবং ইমাম হাকিম এভাবেই বর্ণনা করেছেন।'
উল্লেখ্য, সাহাবি মুআবিয়া উহুদের যুদ্ধে কুরাইশ বাহিনীর পক্ষে লড়েছিলেন। কারণ তখনো তিনি ইসলামে প্রবেশ করেননি। এ জন্য তিনি এ কথা সম্ভবত শুনেছিলেন মুসলিম হওয়ার পর।
এ ছাড়া আনাস ইবনে নজরের নিহত হওয়ার কথা সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম গ্রন্থে এসেছে।
বনু কুরাইজার যুদ্ধে জাবির ইবনে বাতার ঘটনা
ইবনে ইসহাক বনু কুরাইজার হাদিসের শেষে ইবনে শিহাব জুহরির সূত্রে বর্ণনা করেন, কুরাইজা গোত্রের জাবির ইবনে বাতা জাহেলি যুগে ছাবেত ইবনে কায়েস ইবনে শাম্মাসকে অনেক সহযোগিতা করেছিলেন। তাঁর উপনাম ছিল আবু আবদুর রহমান। জুহরি বলেন, 'জাবিরের কোনো এক সন্তান বর্ণনা করেন, জাহেলি যুগে বুয়াস যুদ্ধের সময় জাবির ইবনে বাতা সাবিতের ওপর অনুগ্রহ করেছিলেন। অনুগ্রহটি হলো, সাবিত বন্দী হলেন। যখন তাঁকে হত্যা করে ফেলা হবে, তখন জাবির তাঁকে হত্যা হওয়া থেকে বাঁচিয়ে দেন লঘু শাস্তি নির্ধারণ করে। লঘু শাস্তি হলো, সামনের চুল কেটে ফেলা। সাবিতের সামনের চুল কেটে দিয়ে তাঁর পথ ছেড়ে দেন। জাবির তখন বার্ধক্যে উপনীত, তখন বনু কুরাইজার সঙ্গে মুসলিমদের যুদ্ধ চলাকালীন তিনি জাবির ইবনে বাতার কাছে এসে বললেন, 'হে আবু আবদুর রহমান! তুমি কি আমাকে চিনতে পেরেছ?' উত্তরে জাবির বলল, 'তোমার মতো মানুষকে আমি কীভাবে না চিনে থাকতে পারি?' ছাবেত তাকে বললেন, 'আমি তোমাকে নিজ হাতে বিনিময় দিতে চাই।'
অতঃপর তিনি বর্ণনা করেন, সাবিত নবীজির কাছে জাবিরের রক্তের নিরাপত্তা চাইলেন। অর্থাৎ নবীজির কাছে সাবিত সুপারিশ করলেন, যাতে জাবিরকে হত্যা না করা হয়। নবীজি জাবিরের রক্তপণ ছেড়ে দিলেন। অর্থাৎ তাঁকে প্রাণদণ্ড থেকে মুক্তি দিলেন এবং সাবিতের কথা রাখলেন। তিনি বললেন, 'ঠিক আছে, তার রক্ত তোমার হাতে ন্যস্ত করা হলো।' এরপর সাবিতের সন্তান জুবাইর ইবনে সাবিত নবীজির কাছে গিয়ে জাবিরের সন্তানাদি এবং পরিবারকে ন্যস্ত করার অনুরোধ জানালে নবীজি সেটাও মেনে নেন। ধনসম্পদ ন্যস্ত করার অনুরোধ করলে নবীজি সেটাও দিয়ে দেন।
এরপর জাবির ইহুদিদের বেশ কিছু নেতার ব্যাপারে জানতে চাইলেন, তাদের কী করা হয়েছে। তাঁকে জানানো হলো, তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে। তখন জাবির বলে উঠলেন, 'সাবিত! আমাকে তাদের সঙ্গে মিলিত হতে দাও। আমি নিজে তোমার কাছে এই প্রতিদানটুকু চাইছি। আল্লাহর কসম! এমন সব নেতার মৃত্যুর পর আমার বেঁচে থাকাতে আর কোনো কল্যাণ নেই।' অতঃপর সাবিত ইবনে কায়েস জাবিরকে সামনে এগিয়ে দিয়ে তাঁর গর্দান উড়িয়ে দেন।
ইবনে ইসহাকের সূত্রে এ ঘটনা ইমাম বায়হাকি তাঁর দালালয়েল গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তবে ইবনে শিহাবের সূত্রে যে ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, তা মুরসাল হওয়ায় এর ওপর আস্থা রাখা যায় না।
ইমাম বায়হাকি তাঁর সুনানে কুবরা নামক অপর গ্রন্থে উরওয়ার সূত্রে মুরসাল সনদে এ ঘটনা এনেছেন। ওই সনদে ইবনে লাহিয়া নামের এক দুর্বল বর্ণনাকারী রয়েছেন।
আল্লামা হাইসামি মাজমাউজ জাওয়ায়েদ গ্রন্থে এ ঘটনার সূত্র আল- মু'জামুল আওসাত গ্রন্থে ইমাম তাবারানির দিকে সম্পৃক্ত করেন। অতঃপর বলেন, 'এর সনদে মুসা ইবনে উবাইদা রয়েছেন, যিনি দুর্বল বর্ণনাকারী বলে পরিচিত।'
তবে সমকালীন পর্যায়ের কোনো কোনো ঐতিহাসিক উপরিউক্ত ঘটনার প্রামাণ্যতা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন, 'জাবির ইবনে বাতার ছেলে আবদুর রহমান সাহাবি ছিলেন। এ কারণেই ইবনে আবদুর বার তাঁর রচিত সাহাবিদের বিখ্যাত জীবনীগ্রন্থ আল ইসতি'আব গ্রন্থে তাঁর জীবনী উল্লেখ করেছেন। এ জাতীয় কথার দ্বারা ওই ঘটনার কোনো বিষয় প্রমাণিত হয় না। কারণ আবদুর রহমান ইবনে জাবির যে সাহাবি ছিলেন, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
তা ছাড়া রিফা'আহ কুরাজি তাঁর স্ত্রীকে তালাক প্রদানের পর জাবির ইবনে বাতার ছেলে আবদুর রহমান তাকে বিয়ে করেছিলেন। বিয়ের এ ঘটনা ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়টি প্রমাণিত যে, বনু কুরাইজার গোত্রে ইহুদি হয়ে যারা বেড়ে ওঠেনি, তাদেরকে হত্যা করা হয়নি। কারণ বনু কুরাইজার অনেকেই পরবর্তী সময়ে ইসলামে দীক্ষিত হয়। তাঁরা হলেন কাব কুরাজি, কাসির ইবনে ছায়েব, আতিয়া কুরাজি, আবদুর রহমান ইবনে জাবির ও আরও অনেকে।
তা ছাড়া ওই ঘটনা জাবিরের নিজ গোত্রের লোকদের সঙ্গে পরজগতে মিলিত হওয়ার আবেদন এবং ছাবেত কর্তৃক তাঁকে হত্যা করে ফেলার বিষয়টি কোরআনে একাধিক আয়াতের বিপরীত। যেখানে ইহুদিদের পার্থিব লোভ-লালসা ও মৃত্যু থেকে বেঁচে থাকার বাসনার কথা বলা হয়েছে। কোরআনে আল্লাহ তায়ালা তাদের এ স্বভাবের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে ইরশাদ করেন: 'আপনি তাদেরকে জীবনের প্রতি সবার চাইতে, এমনকি মুশরিকদের চাইতেও অধিক লোভী দেখবেন। তাদের প্রত্যেকে কামনা করে, যেন তারা হাজার বছর আয়ু পায়। অথচ এরূপ আয়ুপ্রাপ্তি তাদেরকে শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারবে না। আল্লাহ সব দেখেন, যা কিছু তারা করে।"*
জিলাল গ্রন্থের লেখক ওই আয়াতের তাফসির প্রসঙ্গে বলেন, 'এই ইহুদি জাতি কোনো দিনই বদলাবে না। অতীতে, বর্তমানে ও ভবিষ্যৎকালে তারা একই রকম থাকবে। যতক্ষণ না এরা মুগুরের পিটুনি খাবে, মাথা নত করবে না। ক্ষণস্থায়ী ইহজগতে চিরকাল বসবাসের জন্য তারা যেকোনো অপরাধই করতে পারে।'
টিকাঃ
* সুরা বাকারা: ৯৬
📄 হিজরতের ষষ্ঠ বছর
ইবনে ইসহাক সালেহ ইবনে কায়সানের সূত্রে বর্ণনা করেন, হিন্দার সঙ্গে অন্য যেসব নারী উহুদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল, তারা উহুদের যুদ্ধে নিহত কয়েকজন সাহাবির লাশের নাক-কান কেটে টুকরো করেছিল এবং লাশ বিকৃত করেছিল।
এদিকে হিন্দা নবীজির সাহাবিদের লাশ থেকে কান ও নাক কেটে বিচ্ছিন্ন করে। অতঃপর সেগুলো কুচি কুচি করে টুকরা করে পায়ের এবং গলার গহনা তৈরি করে। এরপর এগুলো সে জুবাইর ইবনে মুতইমের ভৃত্য ওয়াহশির কাছে দেয়। এরপর সে নবীজির চাচা হামজার (রা.) লাশকে বিদীর্ণ করে কলিজা বের করে চরম আক্রোশে দাঁত দিয়ে কামড়ায়। এমনকি তাঁর কলিজা গিলে ফেলারও চেষ্টা করে। কিন্তু গলা দিয়ে না যাওয়ার কারণে তা ছুড়ে মারে।
এ ঘটনার বর্ণনাকারী সালেহ ইবনে কায়সান হাদিসবিশারদদের কাছে নির্ভরযোগ্য বলে পরিচিত। তিনি বিপ্লবী খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজের সন্তানদের শিক্ষক ছিলেন। তবে ঘটনাটি মুরসাল সনদে বর্ণিত হয়েছে।
অতঃপর ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, 'যুদ্ধ শেষ হলে নবীজি হামজার লাশের সন্ধানে বের হন। বাতনে ওয়াদি নামক জায়গায় গিয়ে দেখেন, তাঁর চাচার নিথর দেহকে টুকরো করে ফেলা হয়েছে। নাক-কান কিছুই নেই। তাঁর পেট ফেঁড়ে কলিজা বের হয়ে গেছে।'
এরপর ইবনে ইসহাক বলেন, মুহাম্মদ ইবনে জাফর ইবনে জুবায়ের বলেন, এ দৃশ্য দেখে নবীজি দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে বলে ওঠেন, 'হায়! যদি হামজার বোন সাফিয়া বিনতে আবদুল মুত্তালিব এ কারণে কষ্ট না পেত! এখন তো এমন করলে আমার পরে এটা নিয়ম হয়ে যাবে, অন্যথায় আমি তাঁকে ছেড়ে চলে আসতাম। যাতে মরুভূমির হিংস্র প্রাণী ও পাখি তাঁকে খেয়ে ফেলত। আল্লাহ তায়ালা যদি আমাকে আবারও সুযোগ দিতেন, তাহলে আমি কুরাইশদের ৩০ জনকে ধরে এনে এভাবেই কেটে টুকরা করে ফেলতাম, যেভাবে তারা আমার চাচার নিথর দেহের সঙ্গে করেছে।'
সাহাবিগণ নবীজির কষ্ট দেখে স্থির থাকতে পারলেন না। তাঁরা বললেন, 'যদি আমাদেরকে আল্লাহ আবারও কুরাইশদের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ করে দেন, তাহলে আমরাও তাদেরকে এভাবে কেটে ফেলব, যে রকম আরব জাতি কখনো দেখেনি।' এ বর্ণনাও মুরসাল সনদে এসেছে।
ইবনে ইসহাক আরও বলেন, আমাকে মুহাম্মদ ইবনে কাব কুরাজির সূত্রে বুরাইদা ইবনে সুফিয়ান বর্ণনা করেন, তিনি ইবনে আব্বাস থেকে কারও মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন, হামজার নিথর দেহের পাশে যখন নবীজি শোকে কাতর হয়ে পড়ছিলেন, তখনই আল্লাহ তায়ালা নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন:
وَإِنْ عَاقَبْتُمْ فَعَاقِبُوا بِمِثْلِ مَا عُوقِبْتُم بِهِ وَلَئِن صَبَرْتُمْ لَهُوَ خَيْرٌ لِلصَّابِرِينَ وَاصْبِرْ وَمَا صَبْرُكَ إِلَّا بِاللَّهِ وَلَا تَحْزَنْ عَلَيْهِمْ وَلَا تَكُ فِي ضَيْقٍ مِّمَّا يَمْكُرُونَ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الَّذِينَ اتَّقُوا وَالَّذِينَ هُم يَحْسِنُونَ
'আর যদি তোমরা প্রতিশোধ গ্রহণ করো, তবে ওই পরিমাণ প্রতিশোধ গ্রহণ করবে, যে পরিমাণ তোমাদেরকে কষ্ট দিয়েছে। তবে যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, তবে তা ধৈর্যশীলদের জন্য উত্তম।
'আপনি ধৈর্য ধারণ করবেন। আপনার ধৈর্য শুধু আল্লাহর জন্য বিবেচিত হবে। তাদের জন্য দুঃখ করবেন না এবং তাদের চক্রান্তের কারণে মন ছোট করবেন না।
'নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সঙ্গে আছেন, যারা মুত্তাকি এবং যারা সৎকর্ম করে।"*
ওই আয়াত অবতীর্ণ হলে নবীজি শান্ত হন। তিনি কুরাইশদের লাশ বিকৃত করার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নেন এবং ধৈর্য ধারণ করে মদিনায় ফিরে আসেন।
তবে ইবনে কাসির ওই ঘটনা ইবনে ইসহাকের সনদে উল্লেখ করার পর বলেন, 'কোরআনের উপরিউক্ত আয়াত মক্কায় অবতীর্ণ হয়। আর উহুদের যুদ্ধ হিজরতের তৃতীয় বছরে সংঘটিত হয়। অতএব, এই আয়াত কী করে তখন অবতীর্ণ হলো, তা আমার বোধগম্য নয়।'
ইমাম জাহবি তাঁর মাগাজিতে (যুদ্ধ অধ্যায়) বলেন, 'ইয়াহইয়া হাম্মানি মিকসামের সূত্রে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন, নবীজি উহুদের যুদ্ধে হামজার লাশের বিকৃতি দেখে বলেন, 'কুরাইশদের সঙ্গে আবারও লড়াই হলে আমি তাদের ৭০ জনকে ধরে এভাবে টুকরো করে ফেলব।' এর পরিপ্রেক্ষিতে উপরিউক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়।
আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর তিনি বলে উঠলেন, 'বরং হে রব! আমরা ধৈর্য ধারণ করব।' তবে ওই সনদে দুর্বলতা রয়েছে।
হাজ্জাজ ইবনে মিনহাল ও আরও অনেকে আবু উসমান নাহদির সূত্রে সাহাবি আবু হুরায়রা থেকে এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তাঁদের বর্ণনায় আরও রয়েছে, 'হামজার নিথর দেহের কাছে গিয়ে মনে হচ্ছিল, নবীজি এ রকম বীভৎস দৃশ্য আগে কখনো দেখেননি। এতে তাঁর হৃদয় মুবারক যেন ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়।'
আল্লামা হাইসামি তাঁর মাজমাউজ জাওয়ায়েদ গ্রন্থে এ ঘটনা উল্লেখ করেছেন। সেখানে আরও রয়েছে, নবীজি হামজার ক্ষতবিক্ষত লাশ দেখে বলে ওঠেন, 'আপনার ওপর আল্লাহ তায়ালার অফুরন্ত রহমত অবতীর্ণ হোক। আমার দেখামতে আপনি ছিলেন আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষাকারী এবং কল্যাণের দিকে অধিক অগ্রগামী। আমার পরে আপনার জন্য অন্য কেউ দুঃখ করার মতো যদি না থাকত, তাহলে আমি আপনার নিথর দেহটাকে এখানেই রেখে দিতাম, যাতে মরুভূমির হিংস্র প্রাণী তা ভক্ষণ করে ফেলে এবং আল্লাহ তায়ালা আপনাকে হিংস্র পশুর পেট থেকে কিয়ামতের দিন পুনরুত্থান করেন। আরও দিন সামনে আছে। আপনার একার বিপরীতে আমি তাদের (কুরাইশ) ৭০ জনকে এভাবেই টুকরো করে ফেলব, যেভাবে তারা আপনার এ হাল করেছে।'
এ কথা বলতেই জিবরাইল (আ.) অবতীর্ণ হন। তিনি নবীজিকে সুরা নাহলের আয়াত পড়ে শোনান। আয়াত শুনে নবীজি তাঁর এ সিদ্ধান্ত বাতিল করেন।
হাইসামি এরপর বলেন, 'বাজ্জার ও ইমাম তাবারানি এ ঘটনা বর্ণনা করেন। তাঁদের সূত্রে সালেহ ইবনে বাশির রয়েছেন, যাঁকে দুর্বল বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।'
ইমাম হাকিম তাঁর মুসতাদরাক গ্রন্থে সাহাবি উবাই ইবনে কাবের সূত্রে বর্ণনা করেন, উহুদের যুদ্ধে আনসারদের ৬৪ জন এবং মুহাজিরদের মাত্র ছয়জন শহীদ হন। কাফেররা তাঁদের লাশ বিকৃত করে ফেলে। যাদের মধ্যে হামজাও ছিলেন। তখন আনসাররা বলে ওঠেন, 'আবার যেদিন কুরাইশদের সঙ্গে আমাদের লড়াই হবে, তাদেরকে এভাবেই উচিত শিক্ষা দেব।'
অতঃপর অষ্টম হিজরিতে মক্কা অভিযানে নবীজি যখন তাঁদের নিয়ে মক্কাভিমুখে অগ্রসর হন, তখন আল্লাহ তায়ালা মক্কা বিজয়ের দিনে এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। তখন একজন ঘোষণা দেন, আজকের পর কুরাইশদের অস্তিত্ব থাকবে না। এর উত্তরে নবীজি বললেন, 'কুরাইশদের চারজন ছাড়া অন্য সবাইকে তোমরা ছেড়ে দাও।'
অতঃপর হাকিম বলেন, 'এর সনদ সহিহ। কিন্তু শাইখাইন (ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম) এ ঘটনা উল্লেখ করেননি।' ইমাম জাহবি তাঁর এ মতকে সমর্থন দিয়েছেন।
ইবনে হিশাম বর্ণনা করেন, নবীজি তাঁর চাচা হামজার লাশ দেখে বলে উঠলেন, 'আপনার পর আর কাউকেই এমন পরিণতি ভোগ করতে হবে না। আমি এর চেয়ে বীভৎস দৃশ্য আগে কখনো দেখিনি।'
শাইখ আলবানি বলেন, 'ইবনে হিশামের এ বর্ণনা সহিহ নয়। তিনি এটি সনদবিহীন উল্লেখ করেছেন। ইবনে কাসির এবং ইবনে হাজার আসকালানি ফাতহুল বারি গ্রন্থে তাঁর থেকে এটি বর্ণনা করেছেন। তবে তাঁরা সনদের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেননি।'
ইমাম আহমদ আফফানের সূত্রে সাহাবি ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'নবীজি যখন হামজার লাশের কাছে পৌঁছান, তখন দেখেন, তাঁর পেট ফেঁড়ে ফেলা হয়েছে। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ টুকরো হয়ে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পড়ে আছে। কাফেরদের মধ্যে হিন্দা হামজার কলিজা চিবিয়ে খাওয়ার চেষ্টা করেছিল। নবীজি জিজ্ঞেস করলেন, হিন্দা কি হামজার কলিজা গিলে ফেলেছে? উত্তরে সাহাবিগণ বললেন, না, গিলতে সক্ষম হয়নি। তখন নবীজি বললেন, হামজার দেহের কোনো অংশ আল্লাহ তায়ালা জাহান্নামে দেবেন না।'
অতঃপর ইমাম আহমদ আরও বর্ণনা করেন, নবীজি তাঁর চাচা হামজার জানাজা ৭০ বার আদায় করেন। অর্থাৎ, প্রথমে তো আলাদাভাবে তাঁর জানাজা পড়ানই। এরপর আরও উনসত্তরটি লাশ জানাজার জন্য হামজার লাশের পাশেই রাখা হয়। এবং নবীজি প্রতিবারই হামজার লাশসহ জানাজা পড়ান। এভাবে ৭০ বার জানাজা হয়।
ইবনে কাসির এ প্রসঙ্গে বলেন, 'এ বর্ণনাটি শুধু ইমাম আহমদ উল্লেখ করেছেন। অন্য কারও বর্ণনায় এ কথা পাওয়া যায় না। তাঁর সূত্রে আতা ইবনে সায়েব দুর্বল বর্ণনাকারী বলে চিহ্নিত। এ জন্য এতে দুর্বলতা রয়েছে।'
শাইখ আলবানি ইবনে কাসিরের মতকে সমর্থন করে বলেন, 'এটিই সঠিক কথা। তবে শাইख আহমদ শাকের এর বিপরীত বলেছেন। তাঁর মতে এই বর্ণনা সহিh।'
তবে ইমাম আহমদ এর ওই বর্ণনায় হাদিসবিশারদগণ আপত্তি করেছেন। তাঁরা এ ক্ষেত্রে বিশ্লেষণ করে বলেন, 'হামজার জাহান্নামে প্রবেশ না করা সম্পর্কে নবীজি যে ঘোষণা দিয়েছেন, তা অযৌক্তিক। কারণ যে হিন্দা উহুদে যুদ্ধে সাহাবিদের লাশ টুকরো করেছিল এবং হামজার কলিজা চিবিয়েছিল, সে পরবর্তী সময়ে ইসলামে দীক্ষিত হয়। আর ইসলামে প্রবেশ করলে আগেকার সমস্ত অপরাধ ও পাপ মোচন হয়ে যায়।'
অতঃপর তাঁরা সনদ বিশ্লেষণ করে বলেন, 'ইমাম আহমদ এর এ বর্ণনার সনদে সাহাবি ইবনে মাসউদ থেকে যিনি বর্ণনা করেছেন, তিনি হচ্ছেন আমের ইবনে শারাহিল শা'বি। অথচ ইবনে মাসউদের সঙ্গে তাঁর সরাসরি শোনা প্রমাণিত নয়।' ইমাম হাকিম, ইমাম দারা কুতনি এবং ইবনে আবু হাতেম প্রমুখ হাদিসবিশারদ এ মত দিয়েছেন।
ইবনে কাসির সুরা নাহলের শেষের এই আয়াতগুলোর তাফসির প্রসঙ্গে বলেন, মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক তাঁর কয়েক বন্ধুর সূত্রে আতা ইবনে ইয়াসার থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, 'সুরা নাহল মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। তবে শেষের ৩ আয়াত উহুদের রণাঙ্গনে অবতীর্ণ হয়। এর প্রেক্ষাপট হলো, যখন নবীজি হামজার বিকৃত লাশ দেখে বলেছিলেন, আল্লাহ তায়ালা যদি আমায় আবারও সুযোগ দিতেন, তাহলে আমি কুরাইশদের ৩০ জনকে ধরে এভাবেই কেটে টুকরা করে ফেলতাম, যেভাবে তারা আমার চাচার নিথর দেহের সঙ্গে করেছে।'
নবীজির উত্তরে সাহাবিগণও বললেন, 'যদি আমাদেরকে আল্লাহ আবার কুরাইশদের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ করে দেন, তাহলে আমরাও তাদেরকে এভাবে কেটে ফেলব, যে রকম আরব জাতি কখনো দেখেনি।' তাঁদের প্রতিজ্ঞার উত্তরে আল্লাহ তায়ালা সুরা নাহলের শেষ ৩ আয়াত অবতীর্ণ করেন।
উল্লেখ্য, ইবনে কাছিরের এ বর্ণনার সূত্রে একজন বর্ণনাকারী অজ্ঞাত থাকায় এটি মুরসাল পর্যায়ভুক্ত। তবে অপর এক সূত্রে এটি ধারাবাহিকরূপে বর্ণিত হয়েছে। হাফেজ আবু বকর বাজ্জার সালেহের সূত্রে সাহাবি আবু হুরায়রা থেকে এ ঘটনা আল্লামা হাইসামি অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।
অতঃপর ইবনে কাসির বলেন, 'ওই সনদ দুর্বল। কারণ এর সূত্রে সালেহের কথা এসেছে, তাঁর পুরো নাম সালেহ ইবনে বাশির আল মারি। হাদিসের ইমামগণ তাঁকে দুর্বল বলে অভিহিত করেছেন। ইমাম বুখারি তাঁকে হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যানযোগ্য বলেছেন।'
শাইখ আলবানি এ সূত্রকে দুর্বল বলে চিহ্নিত করার পর বলেন, এ ঘটনার কিছু অংশ সংক্ষেপে অন্য সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম হাকিম তাঁর মুসতাদরাক গ্রন্থে এবং খতিব তাঁর তালখিস গ্রন্থে সাহাবি আনাস থেকে বর্ণনা করেন। অতঃপর ইমাম হাকিম বলেন, 'এই সনদ ইমাম মুসলিমের নীতিমালার আলোকে সহিh। তবে শাইখাইন একে উল্লেখ করেননি।' ইমাম জাহবি এ মতকে সমর্থন করেছেন।
এরপর আলবানি আরও বলেন, 'সাহাবি উবাই ইবনে কাবে (রা.) সূত্রে সুরা নাহলের শেষের ৩ আয়াতের যে প্রেক্ষাপট বর্ণনা করা হয়েছে, তা সহিh।' উল্লিখিত হাদিস প্রসঙ্গে ইমাম নববি খুলাসা গ্রন্থে বলেন, ইমাম আবু দাউদ ও ইমাম তিরমিজি একে হাসান পর্যায়ের সনদে বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিজি নিজে একে হাসান সনদ বলে অভিহিত করেন। ইমাম আহমদও তাঁর মুসনাদ গ্রন্থে এ হাদিস নিজ সনদে বর্ণনা করেছেন। কুরাইশ বাহিনী কর্তৃক উহুদের যুদ্ধে মুসলিম সেনাদের লাশ বিকৃত করার ঘটনা সহিh সনদে প্রমাণিত। সহিh বুখারি গ্রন্থে এ প্রসঙ্গে আবু সুফিয়ানের উক্তি বর্ণিত হয়েছে।
ইবনে আবদুল বার বলেন, এ ঘটনা প্রসঙ্গে সাহাবি ও তাবেয়িগণের সূত্রে অসংখ্য বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে। অনেকে বর্ণনা করেন, নবীজি তাঁর চাচা হামজার জানাজা ৭০ বার আদায় করেন। তবে এগুলোর অধিকাংশই মুরসাল সনদে বর্ণিত।
এ বিষয়ে হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি বলেন, এ বর্ণনার সূত্রে সমস্যা রয়েছে। তবে শাইখ আলবানি নবীজির ৭০ বার জানাজা আদায় সম্পর্কিত বর্ণনার সনদকে হাসান পর্যায়ের অভিহিত করেছেন।
টিকাঃ
* সুরা নাহল: ১২৬-১২৮
হুদাইবিয়ায় নবীজির সঙ্গে কুরাইশের চুক্তিনামা
বাই'আতে রিদওয়ান কী কারণে ঘটেছিল
ষষ্ঠ হিজরির জিলকদ মাসে নবীজি প্রায় ১০ হাজার সাহাবি নিয়ে উমরা আদায় করার জন্য মক্কার উদ্দেশে মদিনা ত্যাগ করেন। সঙ্গে তাঁদের হাদির (উমরার কোরবানি) পশু ছিল। এদিকে মক্কার কুরাইশরা নবীজির আগমনের সংবাদ পেয়ে তাঁকে প্রতিহত করার ঘোষণা দেয়। তারা নবীজি ও তাঁর সাহাবিদের কোনোভাবেই মক্কায় প্রবেশ করতে দেবে না, এ মর্মে প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করে। মদিনা থেকে রওনা হয়ে নবীজি ও তাঁর সাহাবিগণ মক্কার অদূরে হুদাইবিয়ার প্রান্তরে (বর্তমান নাম শুমাইসি) যাত্রাবিরতি করেন।
এরপর মক্কায় আগমন ও উমরা আদায় নিয়ে কুরাইশ ও মুসলিমদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়। কুরাইש গোত্র নবীজির কাছে প্রতিনিধিদল প্রেরণ করে। এদিকে নবীজি মুসলিমদের পক্ষ থেকে বিখ্যাত সাহাবি উসমান ইবনে আফফানকে (রা.) কুরাইশের কাছে প্রেরণ করেন। তিনি স্বীয় প্রতিনিধির মাধ্যমে কুরাইשদের উদ্দেশে বার্তা দেন, তিনি ও মুসলিমদের কেউই মক্কায় তাদের সঙ্গে লড়াই করার জন্য আসেননি। তাঁরা শুধু উমরা আদায় করতে চাচ্ছেন। উমরা শেষে আবারও মদিনায় ফিরে যাবেন।
আলোচনা চলার একপর্যায়ে নবীজি তাঁর সাহাবিগণকে বাই'আত গ্রহণ করার জন্য আহ্বান জানান। সকল সাহাবি হুদাইবিয়ার একটি গাছের নিচে নবীজির হাতে বাই'আত নেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে নিচের আয়াত অবতীর্ণ হয়।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন: 'আল্লাহ মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন, যখন তারা বৃক্ষের নিচে আপনার কাছে শপথ করল। আল্লাহ অবগত ছিলেন ওই বিষয়ে, যা তাদের অন্তরে ছিল। অতঃপর তিনি তাদের প্রতি প্রশান্তি অবতীর্ণ করলেন এবং তাদেরকে পুরস্কারস্বরূপ আসন্ন বিজয় দান করেন।"*
বাই'আত গ্রহণের পর নবীজি জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করে বলেন, 'যারা আজ গাছের নিচে বাই'আত গ্রহণ করেছে, আল্লাহর ইচ্ছায় তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে না।'
হুদাইবিয়ার প্রান্তরে মুসলিমদের সঙ্গে কুরাইশদের কী কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল এবং পরে কী ঘটেছিল, এ সম্পর্কে সহিহ হাদিস ও ঐতিহাসিক গ্রন্থে বিস্তারিত এসেছে। কিন্তু সাহাবিদের থেকে নবীজি মূলত কী কারণে বাই'আত গ্রহণ করেছিলেন, তার উল্লেখ পাওয়া যায় না। কিন্তু এ সত্ত্বেও সিরাতের গ্রন্থগুলোতে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি তাঁর প্রতিনিধি উসমানকে মক্কায় প্রেরণ করার পর যখন তাঁর ফিরে আসতে দেরি হচ্ছিল, তখন কে যেন গুজব ছড়িয়ে দেয়, মক্কার কাফেররা উসমানকে হত্যা করেছে। তখনই এর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য নবীজি তাঁর সকল সাহাবির থেকে বাই'আত গ্রহণ করেন।
ইবনে ইসহাক নবীজির প্রখ্যাত সাহাবি ইবনে আব্বাসের আজাদকৃত দাস ইকরিমার সূত্রে কোনো একজন থেকে বর্ণনা করেন, নবীজি যখন উসমানকে আলোচনার জন্য মক্কায় প্রেরণ করেন, তখন কুরাইশ গোত্রের কাফেররা তাঁকে আটক করে। এদিকে নবীজি ও তাঁর সাহাবিগণ জানতে পারেন, কে যেন উসমানকে হত্যা করে ফেলেছে।
অতঃপর ইবনে ইসহাক আবু বকর সিদ্দিকের (রা.) পুত্র আবদুর রহমানের সূত্রে বলেন, 'নবীজির কাছে উসমানের হত্যাকাণ্ডের সংবাদ পৌঁছালে তিনি বললেন, “আমি যতক্ষণ না বিজয়ী হতে পারব, ততক্ষণ কুরাইশদের সঙ্গে সংগ্রাম করে উসমানের হত্যার বদলা নেব।” অতঃপর তিনি সাহাবিদের থেকে বাই'আত গ্রহণ করেন।'
ইবনে ইসহাকের প্রথম বর্ণনার সনদে তাঁর শাইখ অজ্ঞাত। তিনি তাঁর নাম উল্লেখ করেননি। পরের বর্ণনায় সরাসরি সাহাবির সূত্র না থাকায় এটি মুরসাল পর্যায়ে গণ্য।
আল্লামা বায়হাকি ইবনে ইসহাকের মুরসাল বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন, 'ইবনে ইসহাকের মতো ব্যক্তিত্ব যখন মুরসাল ধারায় বর্ণনা করেন, তখন আমাদের মন বিষণ্ণ হয়ে যায়।'
হুদাইবিয়ার প্রান্তরে সাহাবিদের থেকে নবীজি কর্তৃক বাই'আত গ্রহণের যে কারণ সিরাতের গ্রন্থে উল্লেখিত হয়েছে, শাইখ আলবানি তাকে দুর্বল আখ্যা দিয়ে বলেন, 'ইবনে ইসহাক এ ঘটনা মুরসাল ধারায় বর্ণনা করেছেন। ইবনে হিশামও ইবনে ইসহাক থেকে এটি বর্ণনা করেছেন।'
ইমাম আহমদ তাঁর মুসনাদ গ্রন্থে এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি ইয়াজিদ ইবনে হারুনের সূত্রে মিসওয়ার ইবনে মাখরামা এবং মারওয়ান ইবনে হাকাম থেকে বর্ণনা করেন, নবীজি যখন উসমানকে প্রতিনিধি করে কুরাইশদের কাছে প্রেরণ করেন, তখন তিনি আবু সুফিয়ানসহ কুরাইশদের অন্যান্য নেতার কাছে নবীজির বার্তা পৌঁছে দেন। তখন কুরাইশের লোকেরা তাঁকে আটক করে। এদিকে নবীজি জানতে পারেন, উসমানকে হত্যা করা হয়েছে।
অতঃপর ইমাম আহমদ বলেন, মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক জুহরির সূত্রে বলেন, কুরাইশ নেতারা বনু আমের ইবনে লুআইয়ের সুহাইল ইবনে আমরকে ডেকে বলে, 'তুমি মুহাম্মদের কাছে গিয়ে তাঁর সঙ্গে সমঝোতায় আসার চেষ্টা করবে। তাঁকে বলবে, তাঁরা যেন এ বছর মদিনায় ফিরে যান। এ বছর কোনোভাবেই মক্কায় প্রবেশ করা যাবে না।'
উল্লেখ্য, ইবনে ইসহাক কখনো কখনো সরাসরি বর্ণনাকারীর নাম উল্লেখ না করে বর্ণনা করেন। এখানেও তা-ই করেছেন। অতঃপর যখন তিনি বর্ণনাকারীর সূত্র উল্লেখ করে কুরাইশ কর্তৃক সুহাইল ইবনে আমরকে নবীজির কাছে প্রেরণের ঘটনা উল্লেখ করলেন, তখন নিশ্চিতভাবে বোঝা যায়, ঘটনার প্রথম অংশ তিনি জুহরি থেকে সরাসরি শোনেননি।
হুদাইবিয়ার প্রান্তরে সাহাবিদের থেকে নবীজির বাই'আত গ্রহণের অন্য আরেকটি কারণ ইমাম বায়হাকি তাঁর দালায়েন গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তিনি নিজ সনদে আমর ইবনে খালেদের সূত্রে উরওয়া ইবনে জুবায়ের থেকে বর্ণনা করেন, কুরাইש গোত্র আলোচনার লক্ষ্যে সুহাইল ইবনে আমর, হুওয়াইতিব আবদুল উজ্জা এবং মিকরাজ ইবনে হাফসকে নবীজির কাছে প্রেরণ করে। তারা হুদাইবিয়ায় মুসলিমদের ছাউনিতে এসে নবীজির সঙ্গে আলোচনায় বসে।
আলোচনার একপর্যায়ে উভয় পক্ষ একে অপরের প্রতি আস্থা স্থাপন করে এবং সবাই নিশ্চিত হয়, আসলেই এখানে যুদ্ধ করার সংকল্প কোনো পক্ষেরই নেই। মুসলিমদের ছাউনিতে কাফেররা আসা-যাওয়া করতে থাকে। ওদিকে মুসলিমরাও তাদের সঙ্গে স্বাভাবিক চলাফেরা ও পারস্পরিক যোগাযোগ বজায় রাখেন। অবশেষে উভয় পক্ষই একটা চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়।
কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিত একটি ঘটনা সবকিছুকে লন্ডভন্ড করে দেয়। উভয় শিবিরে যখন মোটামুটি স্থিতিশীলতা বজায় আসছিল, তখন হঠাৎ কোনো এক পক্ষ থেকে কারা যেন প্রতিপক্ষের শিবিরে তির নিক্ষেপ করে। এরপর কিছু বুঝে ওঠার আগেই সহিংস পরিস্থিতিতে রূপ নেয়। উভয় শিবিরে ব্যাপক তির, পাথর ও বর্শা নিক্ষেপ হতে থাকে। এ অবস্থায় উভয় পক্ষই চিৎকার দিয়ে নিজেদের লোককে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে বন্ধকের কথা ঘোষণা করে।
সুহাইল ইবনে আমরের সঙ্গে কুরাইশদের পক্ষ থেকে আরও যারা মুসলিম ছাউনিতে এসেছিল, তাদেরকে মুসলিমরা বন্ধক হিসেবে রাখেন এবং কুরাইশ গোত্র উসমানকে বন্ধক হিসেবে নিজেদের কাছে রেখে দেয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে নবীজি গাছের নিচে বাই'আতের ডাক দেন।
ইমাম বায়হাকির ওই সনদে দুটি ত্রুটি লক্ষণীয়। প্রথমত, এই সনদে ইবনে লাহিয়া রয়েছেন, যিনি সবার কাছে দুর্বল বলে পরিচিত। দ্বিতীয়ত, এটি মুরসাল ধারায় বর্ণিত। কারণ উরওয়া তাবেয়ি ছিলেন। তাই ওই ঘটনার সময় সেখানে তাঁর থাকার প্রশ্নই আসে না।
ইমাম বুখারি উরওয়ার সূত্রে মিসওয়ার ইবনে মাখরামা এবং মারওয়ান ইবনে হাকাম থেকে সহিহ সনদে গাজওয়ার ঘটনা এবং হুদাইবিয়াতে কুরাইশ গোত্র ও নবীজির মধ্যে সংঘটিত সংলাপের বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন। আর ইমাম বায়হাকির বর্ণনায় উসমানের হত্যাকাণ্ডের গুজবের কথা নেই; বরং সেখানে উভয় পক্ষ থেকে প্রতিপক্ষের প্রতি তির ছোড়াছুড়ি ও পাথর নিক্ষেপের কথা এসেছে।
অতএব, উসমানের হত্যাকাণ্ডের গুজবের কথা সহিহ সনদে প্রমাণিত নয়। তবে বাই'আত করার যে কারণই হোক না কেন, সাহাবি সালামা ইবনে আকওয়া (রা.) কর্তৃক বর্ণিত হাদিসে আছে, তিনি বলেন, 'লোকেরা সাহাবি আলিকে বাই'আতের কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, আমরা নবীজির হাতে মৃত্যুর জন্য বাই'আত করেছিলাম।' সহিহ মুসলিম এর অপর বর্ণনায় সাহাবি জাবেরের (রা.) সূত্রে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, 'আমরা নবীজির হাতে এই মর্মে বাই'আত করেছি, আমরা তাঁকে ছেড়ে পলায়ন করব না। মৃত্যুর জন্য কোনো শপথ নিইনি।' সহিহ মুসলিম এর অপর বর্ণনায় মা'কাল ইবনে ইয়াসারের সূত্রে এমনই বর্ণিত হয়েছে। সহিহ বুখারির বর্ণনায় এসেছে, ইবনে উমরের আজাদকৃত দাস নাফে'কে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, 'সাহাবিগণ নবীজির হাতে যেকোনো পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণ করার ওপর বাই'আত করেছিলেন।'
হাদিসের বরেণ্য মনীষী হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি ফাতহুল বারি গ্রন্থে হুদাইবিয়ার প্রান্তরে উপরিউক্ত বাই'আতের কারণ সম্পর্কে বর্ণিত একাধিক বক্তব্যের মধ্যে সমন্বয় করতে গিয়ে বলেন, 'প্রকৃতপক্ষে উপরিউক্ত বক্তব্যগুলোর মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। সবার উত্তরের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, যাতে কেউই সেখান থেকে পলায়ন না করেন। সকল সাহাবি যেন এ অবস্থায় ধৈর্যসহকারে পরিস্থিতি সামলে নেন; এমনকি কেউ মৃত্যুর সম্মুখীন হলেও কোনো অবস্থাতেই যাতে পলায়ন না করেন।'
অন্য জায়গায় তিনি আরও বলেন, 'এমন শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে যেকোনো সময় মৃত্যুর আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অতএব, বর্ণনাকারী সাধারণভাবে বাই'আতের কারণ হিসেবে মৃত্যুর ওপর বাই'আতের কথা উল্লেখ করেছেন।'
টিকাঃ
* সুরা ফাতাহ : ১৮