📄 গাযওয়ায়ে উহুদ
ইবনে ইসহাক উহুদের যুদ্ধের ঘটনা প্রসঙ্গে বনু নাজ্জারের মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবদুর রহমানের সূত্রে বর্ণনা করেন, উহুদের রণাঙ্গনে যুদ্ধ শেষে নবীজি ঘোষণা দিলেন, 'কে আছ যে আমাকে সা'আদ ইবনে রবির খোঁজ দেবে? আমি জানি না, তাঁর ভাগ্যে কী ঘটেছে। দেখো, তাঁকে জীবিত বা মৃতদের মধ্যে পাওয়া যায় কি না?'
তখন এক অনসারি সাহাবি উত্তরে বললেন, 'ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি তাঁর তথ্য আপনাকে দিচ্ছি।' এরপর তিনি সা'আদ ইবনে রবির খোঁজ করতে লাগলেন। অনেকক্ষণ পর দেখলেন, সা'আদ (রা.) রণাঙ্গনের এক পাশে আহত হয়ে কাতরাচ্ছেন। তখনো তাঁর প্রাণ বাকি ছিল। তিনি তাঁর কাছে গিয়ে বললেন, 'আমাকে নবীজি বলেছেন, তোমাকে খুঁজে তাঁর কাছে তোমার সংবাদ নিয়ে যেতে। আর বলেছেন, তুমি জীবিতদের মধ্যে আছ, নাকি মৃতদের মধ্যে।'
উত্তরে সা'আদ ওই আনসারি সাহাবিকে বললেন, 'আমার সময় ঘনিয়ে এসেছে। তুমি আমার পক্ষ থেকে প্রিয় নবীকে সালাম ও ধন্যবাদ দেবে। এর সঙ্গে তাঁর উম্মতকেও আমার সালাম বলবে। এরপর আমার পক্ষ থেকে সবাইকে বলবে, তোমাদের কেউ তোমাদের নবীর ব্যাপারে সামান্যতম অবহেলা করলেও আল্লাহ তায়ালা তোমাদের ছেড়ে দেবেন না। আর তোমাদের চোখের পাতা নড়তে থাকে। অর্থাৎ, তোমরা জীবিত থাকতে নবীজির যাতে কিছু না হয়।' এরপরই তিনি শহীদ হয়ে যান। অতঃপর আনসারি সাহাবি বলেন, 'আমি নবীজির কাছে গিয়ে তাঁর শাহাদাতের সংবাদ দিই।'
ইমাম বুখারি বলেন, 'এর সনদ মুরসাল।' শাইখ আলবানি এর সনদকে ত্রুটিযুক্ত বলে অভিহিত করেন। ইমাম মালিক ইবনে আনাস তাঁর মুয়াত্তা গ্রন্থে ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদের (মৃত্যু-১৪৪ হি.) সূত্রে মুরসাল সনদে উল্লেখ করেছেন।
ইবনে আবদুল বার বলেন, 'আমি এ ঘটনার কোনো উৎস সম্পর্কে অবগত নই। তবে ঐতিহাসিক ও সিরাত গ্রন্থের রচয়িতাদের কাছে শুনেছি।'
অন্যতম ঐতিহাসিক ইবনে সা'আদ এ ঘটনা ইমাম মালিকের সনদে বর্ণনা করেছেন। ইমাম হাকিম এ ঘটনা দুটি সনদে বর্ণনা করেন। প্রথম সনদে আবু বকর মুহাম্মদ ইবনে আহমদ থেকে খারেজা ইবনে জায়িদ ও তার পিতার সূত্রে উল্লেখ করেন। অতঃপর বলেন, 'এর সনদ সহিহ। তবে ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম এটি উল্লেখ করেননি।' ইমাম জাহবি তালখিস গ্রন্থে বলেন, 'এর সনদ সহিহ।' এরপর দ্বিতীয় সনদে ইবনে ইসহাকের সূত্রে উল্লেখ করেছেন। ইমাম জাহবি এই সনদকে মুরসাল বলে অভিহিত করেন।
শাইখ আলবানি বিখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে কাছিরের সূত্রে বলেন, 'ইমাম মালিক যেসব বর্ণনাকারীর পরিচয় জানেন না, ইচ্ছে করে তিনি বর্ণনার সূত্রে তাঁদের নাম বাদ দিয়ে দেন। এ জন্য তিনি অধিকাংশ বর্ণনায় মুরসাল কিংবা মুনকাতি (বিচ্ছিন্ন) পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকেন।'
সা'আদ ইবনে রবি সম্পর্কে ইমাম বুখারি সহিহ সনদে উল্লেখ করেছেন। তিনি লেখেন, নবীজি মদিনায় হিজরতের পর আনসারি সাহাবিদের মধ্যে একেকজন করে মুহাজির সাহাবিকে বণ্টন করে তাঁদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করে দিয়েছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় মদিনার অন্যতম ধনী সাহাবি সা'আদ ইবনে রবির সঙ্গে মক্কার মুহাজির সাহাবি আবদুর রহমান ইবনে আওফকে পরিচয় করিয়ে দেন।
সাহাবি সা'আদ ইবনে রবি তাঁর মুহাজির ভাই আবদুর রহমান ইবনে আওফকে বললেন, 'মদিনায় আমার বিপুল সম্পত্তি। আমি আমার সমস্ত সম্পত্তি দুই ভাগ করে এর এক ভাগ তোমাকে দিয়ে দিলাম। আর আমার দুজন স্ত্রী রয়েছে। তাদের মধ্য থেকে যাকে তোমার পছন্দ হয়, আমাকে বলো। আমি তাকে তালাক প্রদান করব। এরপর তার ইদ্দত শেষ হলে তুমি তাকে বিয়ে করবে।'
আবু দুজানাকে নবীজির তরবারি প্রদান
উহুদের যুদ্ধের ঘটনায় ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, নবীজি একটি তরবারি নিয়ে বললেন, 'কে আছ, এই তরবারি গ্রহণ করে এর পূর্ণ দায়িত্ব পূর্ণ করবে?' নবীজির কথা শুনে বেশ কয়েকজন দাঁড়িয়ে গেলেন, কিন্তু নবীজি তাঁদের কাউকে সেই তরবারি দিলেন না। কিন্তু বনু সায়েদার এক বীর এগিয়ে এলেন। তাঁর নাম আবু দুজানা সিমাক ইবনে খারাশা (রা.)। নবীজিকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'ইয়া রাসুলাল্লাহ! এই তরবারির দায়িত্ব বা পাওনা কী?'
উত্তরে নবীজি বললেন, 'এটা দিয়ে শত্রুকে আঘাত করে আমার কাছ থেকে তাদের সরিয়ে দেবে।' আবু দুজানা বললেন, 'আমি এর দায়িত্ব যথাযথ আদায় করতে পারব। আপনি আমাকে দিন।' নবীজি তাঁকে তরবারিটি দিয়ে বললেন, 'যাও! আক্রমণ করো।'
আবু দুজানা একজন মহাবীর ছিলেন। যুদ্ধের সময় তিনি সদর্পে এগিয়ে চলতেন। সমগ্র আরবে তাঁর খ্যাতি লোকমুখে প্রসিদ্ধ ছিল। যুদ্ধের ময়দানে তিনি অসম্ভব কৌশলী ছিলেন। তাঁর একটি লাল রঙের মস্তকবন্ধনী ছিল। তিনি যখন লাল মস্তকবন্ধনী তাঁর মাথায় বাঁধতেন, তখন সৈন্যরা বুঝতে পারত, তিনি এখন চূড়ান্ত আক্রমণ শুরু করতে যাচ্ছেন।
আবু দুজানা নবীজির হাত থেকে তরবারি গ্রহণ করে নিজের মাথায় মস্তকবন্ধনী শক্ত করে বেঁধে নেন। অতঃপর প্রবল বিক্রমে আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে সারিবদ্ধ শত্রুসৈন্যদের মাঝখান দিয়ে সদর্পে এগোতে শুরু করলেন এবং নর্দনকুর্দন করতে লাগলেন।
ইবনে ইসহাক সাহাবি উমরের আজাদকৃত দাস জাফর ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আসলামের সূত্রে বনু সালামার এক আনসারি থেকে বর্ণনা করেন, নবীজি যখন দেখলেন, আবু দুজানা শত্রুদের সারির ভেতর নর্দনকুর্দন করে সদর্পে এগোতে শুরু করছেন, তখন তিনি বললেন, 'এভাবে হাঁটাকে আল্লাহ তায়ালা শুধু রণাঙ্গনে পছন্দ করেন।' এভাবে হাঁটলে আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত রাগান্বিত হন। তবে রণাঙ্গনের ব্যাপার আলাদা।
ওই ঘটনার প্রথম অংশ সহিহ মুসলিম গ্রন্থে সাহাবি আনাসের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, নবীজি উহুদের রণাঙ্গনে একটি তরবারি নিয়ে বললেন, 'কে আছ, এই তরবারি দিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বে?' লোকেরা বলতে লাগল, আমি পারব, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমাকে দিন। তখন নবীজি বললেন, এই তরবারির যথাযথ দায়িত্ব কে পূর্ণ করতে পারবে? এ কথা শুনে কেউই তরবারি নিতে সাহস করল না। কিন্তু বনু সায়েদার বীর আবু দুজানা সিমাক ইবনে খারাশা বললেন, 'আমি এর দায়িত্ব যথাযথ আদায় করতে পারব। আপনি আমাকে দিন।' নবীজি তাঁকে তরবারিটি দিলেন। তিনি তা নিয়ে মুশরিকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন।
ইবনে কাসির বলেন, 'ইবনে ইসহাক এ ঘটনা সনদ ছাড়া উল্লেখ করেছেন।'
উপরিউক্ত ঘটনার দ্বিতীয় অংশ ইবনে ইসহাক জাফর ইবনে আবদুল্লাহ সূত্রে বর্ণনা করেন। জাফরের ব্যাপারে হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি বলেন, 'জাফরের বর্ণনার সমার্থক অন্য বর্ণনা পাওয়া গেলে তাঁর বর্ণিত হাদিস গ্রহণ করা যাবে। অন্যথায় তাঁর হাদিসের মান দুর্বল বলে বিবেচিত হবে।'
তা ছাড়া ইবনে ইসহাকের ওই সনদে যে আনসারির কথা বলা হয়েছে তিনি অজ্ঞাত। কারণ তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়নি। আর হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানির প্রণীত বর্ণনাকারীদের তালিকার বিন্যাসের নীতিমালার আলোকে জাফর ইবনে আবদুল্লাহর অবস্থান সপ্তম পর্যায়ে। এ পর্যায়ের বর্ণনাকারী তাঁরাই হয়ে থাকেন, যাঁরা কোনো সাহাবি থেকে বর্ণনা করেন না।
আল্লামা হাইসামি ওই বর্ণনার সনদকে ইমাম তাবারানির দিকে সংযুক্ত করার পর বলেন, 'এই সনদে একজন বর্ণনাকারী রয়েছেন, যাঁর পরিচিতি আমি পাইনি।'
রণাঙ্গনে সদর্পে এগিয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে ইমাম আহমদ, ইমাম আবু দাউদ, ইমাম তিরমিজি এবং ইমাম নাসায়ি প্রমুখ মুহাদ্দিস সাহাবি জাবের ইবনে আতিকের সূত্রে বর্ণনা করেন, নবীজি বলেছেন:
'সন্দেহ বা অবিশ্বাসের ক্ষেত্রে আত্মসম্মানবোধকে আল্লাহ তায়ালা পছন্দ করেন এবং যে ক্ষেত্রে সন্দেহের অবকাশ নেই, সেখানে আত্মসম্মানবোধ বা আবেগকে তিনি ঘৃণা করেন। আবার দান করার সময় আবেগে উজ্জীবিত হওয়া এবং যুদ্ধের সময় রণাঙ্গনে অহমিকা প্রদর্শন করাকে আল্লাহ তায়ালা পছন্দ করেন। কিন্তু অন্যায় ও গর্বের বেলায় অহমিকা তিনি ঘৃণা করেন।'
ইবনুল কায়্যিম এবং হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি এর সনদকে সহিহ বলেছেন। শাইখ শু'আইব আরনাউতও এর সনদকে উত্তম বলে অভিহিত করেন।
এক বর্ণনায় এসেছে, একবার সাহাবি আবু দুজানা এক নারীকে হত্যার জন্য ওই তরবারি কোষমুক্ত করেন; কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নারীটিকে ছেড়ে দেন। লোকেরা তাঁকে জিজ্ঞেস করল, আপনি কেন এমন করলেন? তিনি উত্তর দিলেন, 'নবীজির তরবারির সম্মান রক্ষার্থে তাকে ছেড়ে দিয়েছি।'
আল্লামা হাইসামি মাজমাউজ জাওয়ায়েদ গ্রন্থে বলেন, 'ইমাম বাজ্জার তাঁর সনদে এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তাঁর সনদের বর্ণনাকারীরা নির্ভরযোগ্য।'
ইমাম বায়হাকি দালায়েলুন নবুওয়াহ গ্রন্থে এটি বর্ণনা করেন। তবে তাঁদের দুজনের সনদে আবদুল্লাহ ইবনে ওয়াজে নামের এক বর্ণনাকারী রয়েছেন, হাফেজ ইবনে হাজার তাঁর তাকরিব গ্রন্থে তাঁকে অজ্ঞাত বলে উল্লেখ করেছেন।
মুশরিক বাহিনীর পদচিহ্ন অনুসরণে আলির গোয়েন্দাগিরি
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, নবীজি সাহাবি আলিকে নির্দেশ দিলেন, 'তুমি কুরাইশদের বাহিনীর গতিবিধি লক্ষ করে আমাকে সংবাদ দাও। দেখো, তারা কোন দিকে যাত্রা করেছে। যদি দেখো, তারা উটে আরোহণ করেছে এবং ঘোড়াগুলোকে বিশ্রামে রেখেছে, তাহলে বুঝবে, তারা মক্কার দিকে যাত্রা করছে। অন্যদিকে যদি দেখো, তারা উটগুলোকে পানি পান করিয়ে হাঁকিয়ে আনছে এবং তারা ঘোড়ায় চড়ে বসেছে, তাহলে বুঝবে, তাদের লক্ষ্য মদিনা। যদি তারা মদিনার দিকে অগ্রসর হয়, তাহলে আল্লাহ তায়ালার কসম! আমি নিজেই তাদের দিকে অগ্রসর হয়ে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করব।'
আলি (রা.) বলেন, 'নবীজির নির্দেশ পেয়ে আমি কুরাইশদের গতিবিধি অনুসরণ করে এগোতে থাকি। দেখি, তারা ঘোড়াগুলোকে বিশ্রামে রেখে উটে আরোহণ করছে। অতঃপর তারা মক্কার উদ্দেশে রওনা হয়।'
শাইখ আলবানি বলেন, 'ইবনে হিশাম এ ঘটনা ইবনে ইসহাকের সূত্রে সনদ ছাড়া বর্ণনা করেছেন।'
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি তাঁর ফাতহুল বারি গ্রন্থে লেখেন, 'কুরাইশদের গতিবিধি দেখতে সা'আদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস গিয়েছিলেন, আলি নন। ঐতিহাসিক ওয়াকিদি এমনই উল্লেখ করেছেন।'
ইমাম বুখারি তাঁর সহিহ বুখারি গ্রন্থে আয়েশার সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি সুরা আলে ইমরানের ১৭২ নং আয়াত প্রসঙ্গে স্বীয় ভাগিনা উরওয়া ইবনে জুবায়েরকে বলেন, 'হে আমার বোনের পুত্র! যখন উহুদের যুদ্ধে নবীজি আহত হন এবং প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে কুরাইশ বাহিনী পিছু হটতে শুরু করে, তখন তিনি সাহাবিদের উদ্দেশে বললেন, “কে আছ, কুরাইশদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে আমাকে সংবাদ দেবে?"
'তখন নবীজির আহ্বানে সাড়া দিয়ে ৭০ জন সাহাবি কুরাইশ বাহিনীর পেছন দিক থেকে তাদের গতিবিধি ও পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু জানার জন্য অগ্রসর হন। তাঁদের মধ্যে তোমার পিতা জুবায়ের ও আবু বকরও ছিলেন।'
ইবনে কাসির বলেন, 'এই ঘটনা হামরাউল আসাদ যুদ্ধের সময়ের। অতঃপর তিনি বলেন, ইবনে আবু হাতেম মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে ইয়াজিদের সূত্রে ইকরিমা থেকে বর্ণনা করেন, উহুদের যুদ্ধে পরাজয়বরণ করার পর ফিরে যাওয়ার সময় কুরাইশ বাহিনী যখন পিছু হটতে শুরু করে, তখন তাদের কেউ চিৎকার করে বলছিল, 'তোমরা কিছুই করতে পারলে না। মুহাম্মদকে হত্যা করতে পারোনি; আর সাহায্যকারী সেনাদলও তোমরা আনতে হওনি। তাদের উন্নতবক্ষা তরুণীদের ওপর চড়াও হতে পারোনি। তাই নতুন যুদ্ধের জন্য ফিরে চলো সবাই।'
নবীজি তাদের এ কথা শুনতে পেয়ে মুসলিম সেনাদলকে তাদের পশ্চাদ্ধাবন করার নির্দেশ দেন। কুরাইশ বাহিনীর পিছু নিয়ে নবীজির জানবাজ সাহাবিগণ হামরাউল আসাদ অথবা উয়াইনা অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হন। এরপর যখন দেখলেন, কুরাইশ বাহিনী মক্কার দিকে যাত্রা করেছে, তখন তাঁরা মদিনার পথ ধরেন। আর মুশরিকরা হুমকি দিয়ে বলে গেল, আগামী বছর আমরা আসছি।
ঐতিহাসিক গ্রন্থে হামরাউল আসাদ পর্যন্ত অগ্রসর হওয়ার ঘটনাকে স্বতন্ত্র আরেকটি গাজওয়া হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তখন আল্লাহ তায়ালা নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন:
الَّذِينَ اسْتَجَابُوا لِلَّهِ وَالرَّسُولِ مِن بَعْدِ مَا أَصَابَهُمُ الْقَرْحُ لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا مِنْهُمْ وَاتَّقَوْا أَجْرٌ عَظِيمٌ
'যারা আহত হয়ে পড়ার পরও আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের নির্দেশ মান্য করেছে, তাদের মধ্যে যারা সৎ ও মুত্তাকি, তাদের জন্য রয়েছে বিশাল সাওয়াব।"*
ইবনে মারদুইয়া এ ঘটনা মুহাম্মদ ইবনে মানসুর কর্তৃক বর্ণিত হাদিসের আলোকে ইকরিমার সূত্রে সাহাবি ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন।
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি এ প্রসঙ্গে বলেন, 'এই সনদের বর্ণনাকারীরা সহিহ হাদিসের বর্ণনাকারীদের আওতাভুক্ত। তবে ওই সনদে ইকরিমার আগে সাহাবি ইবনে আব্বাসের নাম উল্লেখ নেই। তাই এটি মুরসাল সনদের পর্যায়ভুক্ত। ইবনে আবু হাতেম ও আরও অনেকে ওই ঘটনা এভাবে মুরসাল সনদে বর্ণনা করেছেন।'
আবু উজ্জাহ জুমাহিকে হত্যা
ইবনে হিশাম আবু উবাইদার সূত্রে বর্ণনা করেন, উহুদের যুদ্ধে পরাজিত হয়ে কুরাইশ বাহিনী যখন পিছু হটছিল, তখন কুরাইশ বাহিনীর অন্যতম কমান্ডার আবু সুফিয়ান ইবনে হারব পুনরায় মদিনা অভিমুখে অগ্রসর হতে চেয়েছিল। নবীজি তা বুঝতে পেরে মুসলিম বাহিনীর একটি দল নিয়ে তাদের পিছু ধাওয়া করেন। তখন তিনি মুআবিয়া ইবনে মুগিরা ইবনে আস এবং আবু উজ্জা জুমাহিকে গ্রেপ্তার করেন।
আবু উজ্জা জুমাহিকে নবীজি বদর যুদ্ধেও গ্রেপ্তার করেছিলেন। কিন্তু তখন তাকে ছেড়ে দেন। এবার তিনি তাকে আর ছাড়লেন না। তিনি বললেন, 'জুমাহি! তুমি মনে করছ, এবারও তুমি ছাড়া পাবে আর মক্কায় গিয়ে সবাইকে বলবে, মুহাম্মদকে দ্বিতীয়বার ধোঁকা দিয়ে চলে আসছি। আল্লাহর কসম! এবার থেকে মক্কায় কেউই তোমার মুখ দেখতে পাবে না।' অতঃপর নবীজি বললেন, 'হে জুবায়ের! তার গর্দান উড়িয়ে দাও।' নির্দেশ শোনামাত্র জুবায়ের তাকে হত্যা করেন।
ইবনে হিশাম এরপর সাঈদ ইবনে মুসাইয়েবের সূত্রে বর্ণনা করেন যে, নবীজি জুমাহিকে গ্রেপ্তার করার পর বলেন, 'নিশ্চয় মুমিন কখনো একই গর্তে দুবার পড়ে যায় না। হে আসেম! তাকে হত্যা করো।' এরপর আসেম ইবনে সাবেত তাকে হত্যা করেন।
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি ফাতহুল বারি গ্রন্থে এ সম্পর্কে লেখেন, ইবনে ইসহাক আবু উজ্জাকে হত্যার ঘটনা সনদসহ উল্লেখ করেছেন। তিনি তাঁর অপর গ্রন্থ তালখিসুল হাবির এর মধ্যে বলেন যে, বদর যুদ্ধের সময় আবু উজ্জাকে গ্রেপ্তার করার পর তিনি তাকে এই শর্তে ছেড়ে দিয়েছিলেন, যেন সে পুনরায় মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করে। কিন্তু উহুদের যুদ্ধে সে শর্ত ভঙ্গ করে কুরাইশ বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিয়ে মদিনায় আক্রমণ করতে আসে। তাই নবীজি তাকে আবারও হত্যার নির্দেশ দেন।'
ইমাম বায়হাকি ওই ঘটনা দীর্ঘ পরিসরে সাঈদ ইবনে মুসাইয়েব থেকে উল্লেখ করেছেন। সেখানে বর্ণিত হয়েছে, দ্বিতীয়বার আবু উজ্জাকে গ্রেপ্তার করার পর নবীজি তাকে বলেন, 'কোথায় তোমার প্রতিজ্ঞা? শর্ত ভঙ্গ করলে কেন? তুমি মনে করছ, এবারও তুমি ছাড়া পেয়ে মক্কায় গিয়ে লোকদের বলবে, মুহাম্মদকে দ্বিতীয়বার ধোঁকা দিয়ে চলে আসছি। আল্লাহর কসম! এবার থেকে কেউই তোমার মুখ দেখতে পাবে না।'
ইমাম শু'বা বলেন, এরপর নবীজি বললেন, 'নিশ্চয় মুমিন কখনো একই গর্তে দুবার পড়ে যায় না।' উল্লেখ্য, ইমাম বায়হাকির সনদে ওয়াকিদির নাম রয়েছে।'
শাইখ আলবানি এ ঘটনাকে দুর্বল বলে চিহ্নিত করেন। অতঃপর বলেন, 'ইবনে ইসহাক সনদ ছাড়া এ ঘটনা উল্লেখ করেছেন এবং ইবনে হিশামও তা-ই করেছেন। তবে ইবনে হিশাম সাঈদ ইবনে মুসাইয়েবের ব্যাপারে বলেন যে, “তার থেকে আমি জানতে পেরেছি।” এর দ্বারা এই সনদের দুর্বলতা সহজেই বোঝা যায়।'
কিন্তু ইমাম বায়হাকি মুহাম্মদ ইবনে উমরের সূত্রে সাঈদ ইবনে মুসাইয়েব থেকে বিচ্ছিন্নতা ছাড়া দীর্ঘ পরিসরে এ ঘটনা বর্ণনা করেন। এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলবানি বলেন, 'ইমাম বায়হাকির সনদেও মারাত্মক ত্রুটি রয়েছে। কারণ এই সনদে যে মুহাম্মদ ইবনে উমরের কথা এসেছে, তিনি মূলত ঐতিহাসিক ওয়াকিদি। আর ওয়াকিদি প্রত্যাখ্যানযোগ্য বলে সবার কাছে পরিচিত।'
অতঃপর আলবানি আরও বলেন, তবে মুমিন ব্যক্তির দুবার একই গর্তে পড়ে না যাওয়ার ব্যাপারে যে হাদিস বর্ণিত হয়েছে, তা সহিহ। শাইখাইন (ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম) এই হাদিসের সূত্র সম্পর্কে একমত পোষণ করেছেন। কিন্তু ওই হাদিসের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে উপরিউক্ত ঐতিহাসিক বর্ণনায় যা উল্লেখিত হয়েছে, তা সঠিক নয়।
তবে ঐতিহাসিক আসাকির ওই প্রেক্ষাপট সঠিক বলে দাবি করেছেন এবং শাইখ মুনাবি তাঁর ফায়জুল কাদির গ্রন্থে আসাকেরের অনুকরণে তা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এর কারণ হিসেবে কিছুই বলেননি। ইবনে বাত্তাল, তুরবিস্তি ও অন্যান্য ঐতিহাসিক এ ক্ষেত্রে আসাকেরের অনুসরণ করেছেন।
মুখাইরিক ইহুদিদের মধ্যে সর্বোত্তম
বনু ছালাবা গোত্রে এক ইহুদি ছিল। তার নাম মুখাইরিক। উহুদের যুদ্ধে মুসলিমদের পক্ষে লড়ে সে নিহত হয়। ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, উহুদের যুদ্ধ ঘনিয়ে এলে মুখাইরিক তার গোত্র ও ইহুদি সম্প্রদায়ের উদ্দেশে বলল, 'হে ইহুদি সম্প্রদায়! তোমরা ভালো করে জানো, এখন এ যুদ্ধে মুহাম্মদকে সাহায্য করা তোমাদের কর্তব্য। কারণ তাঁর সঙ্গে আমাদের এ ব্যাপারে চুক্তি কার্যকর আছে।' উত্তরে ইহুদিরা বলল, আজ শনিবার। আর শনিবারে যুদ্ধবিগ্রহ নিষিদ্ধ। মুখাইরিক বলল, 'না, এখন শনিবার বলে কিছু নেই।'
এরপর সে তরবারি কোষমুক্ত করে বলে, 'আমি এ যুদ্ধে নিহত হলে মুহাম্মদের জন্য আমার কিছু করার থাকবে না। তিনি যা ভালো মনে করেন, তা-ই করবেন। অতঃপর সে নবীজির বাহিনীর সঙ্গে উহুদ প্রান্তরের দিকে রওনা হয়। মুসলিমদের পক্ষে লড়তে লড়তে অবশেষে সে নিহত হয়। তার মৃত্যুসংবাদ শুনে নবীজি বললেন, 'মুখাইরিক ইহুদিদের মধ্যে সর্বোত্তম।'
ইবনে ইসহাক এভাবেই সনদ ছাড়া ওই ঘটনা বর্ণনা করেন। ঐতিহাসিক ওয়াকিদিও এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তবে তিনি প্রত্যাখ্যানযোগ্য। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি তাঁর ইসাবাহ গ্রন্থে এর সনদকে জুহরির সূত্রে উমর ইবনে শাব্বাহর দিকে মুরসাল ধারায় সংযুক্ত করেছেন।
এ ছাড়া ওই বর্ণনার সনদে আবদুল আজিজ ইবনে ইমরান নামের এক বর্ণনাকারী রয়েছেন, যিনি অধিকাংশ হাদিসের পণ্ডিতদের কাছে প্রত্যাখ্যানযোগ্য।
জুবায়ের ইবনে বাক্কারের সূত্রে মুহাম্মদ ইবনে হাসান ইবনে জাবালা থেকেও এ বর্ণনার সনদ পাওয়া যায়। তবে এই সনদে জুবায়ের ইবনে বাক্কারও হাদিস বর্ণনায় প্রত্যাখ্যানযোগ্য। হাফেজ ইবনে হাজার তাঁর সম্পর্কে বলেন, 'মুহাদ্দিসগণ তাঁকে মিথ্যাবাদী বলেছেন।'
সর্বোপরি যদি এ ঘটনাকে সহিহ বলে মেনে নিতেই হয়, তাহলে এর ব্যাখ্যা হলো, এখানে নবীজি মুখাইরিককে উহুদের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ইহুদিদের মধ্যে সর্বোত্তম বলেছেন। অপরদিকে ইহুদিদের মধ্যে সর্বোত্তম বিবেচিত হচ্ছেন সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে সালাম, যিনি ইহুদি ধর্ম ত্যাগ করে ইসলামে দীক্ষিত হয়েছিলেন।
সহিহ বুখারি গ্রন্থে সাহাবি সা'আদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, 'এই ভূপৃষ্ঠে জীবিতদের মধ্যে আমি শুধু আবদুল্লাহ ইবনে সালামের ব্যাপারে নবীজিকে বলতে শুনেছি, সে নিশ্চিত জান্নাতি।'
গাজওয়ায়ে উহুদের ব্যাপারে প্রচলিত ভিত্তিহীন কাহিনি
এক.
বিশিষ্ট ঐতিহাসিক ইবনে সা'আد তাঁর তবাকাত গ্রন্থে ওয়াকিদির সূত্রে বর্ণনা করেন, উহুদের যুদ্ধে উম্মে উমারা নুসাইবা বিনতে কাব (রা.) প্রবল বিক্রমে শত্রুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। তার বীরত্ব দেখে নবীজি বলেছিলেন- 'আজকে তুমি যা করলে তা অন্য আর কে করতে পারল? আমি উহুদের যুদ্ধে ডানে-বামে যেদিকেই লক্ষ করেছি, উম্মে উমারাকে যুদ্ধ করতে দেখেছি।'
ইবনে হিশাম বলেন, উম্মে উমারা নুসাইবা বিনতে কাব উহুদের যুদ্ধে অনেক শত্রুদের হত্যা করেন। সাঈদ ইবনে আবু জায়িদ আনসারি বলেন, উম্মে সা'আদ বিনতে সা'আদ ইবনে রবি বলেছেন, 'আমি উম্মে উমারার কাছে গিয়েছিলাম। তিনি তখন উহুদের যুদ্ধের বর্ণনা দিচ্ছিলেন। তিনি বললেন- হঠাৎ মুসলিমদের পরাজয় দেখে আমি নবীজির দিকে ছুটলাম। দেখি কয়েকজন হতভাগা কাফের নবীজির দিকে তির ছুড়ে মারছে। কেউ তরবারি নিয়ে তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে। আমি নবীজিকে আড়াল করে উদ্যত শত্রুদের তরবারির আঘাত প্রতিহত করতে শুরু করি। তাঁকে রক্ষা করতে গিয়ে তাঁর দিকে ধেয়ে আসা শত্রুদের সঙ্গে আমি সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হই এবং অব্যাহতভাবে তির নিক্ষেপ করতে থাকি।'
শাইখ ড. আকরাম ওমরি বলেন, 'এ বর্ণনার সনদ বিচ্ছিন্ন।' তা ছাড়া এ সনদে যে সাঈদ ইবনে আবু জায়েদের নাম এসেছে, তিনি হচ্ছেন দ্বিতীয় শতাব্দীর প্রখ্যাত আরবি ব্যাকরণবিদ। তাঁর পুরো নাম সাঈদ ইবনে আওস ইবনে ছাবেত ইবনে বাশির ইবনে আবু জায়িদ আনসারি। তাঁর পূর্বপুরুষ আবু জায়িদ আনসারি নবীজির সাহাবি ছিলেন। সাঈদ ইবনে আওস ১২০ হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেন। এতে বোঝা যাচ্ছে, তাঁর ও উহুদের যুদ্ধের মধ্যে সময়ের বিস্তর ব্যবধান।
দুই.
ইমাম জাহবি তাঁর তারিখুল ইসলাম গ্রন্থের মাগাজি (যুদ্ধ) অধ্যায়ে মা'মারের সূত্রে সাঈদ ইবনে আবদুর রহমান জাহশি থেকে বর্ণনা করেন: 'উহুদের যুদ্ধে সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশের (রা.) তরবারি ভেঙে যায়। তখন তিনি নবীজির কাছে এসে এ ব্যাপারে জানালে তিনি তাঁকে খেজুরগাছের একটি ডাল দেন। আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ নবীজির হাত থেকে খেজুরের ডাল গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গে তা তরবারিতে রূপান্তর হয়ে যায়।' অতঃপর ইমাম জাহবি বলেন, 'এর সনদ মুরসাল।' আল্লামা সুহাইলি রওজুল আনফ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, জুবায়ের ইবনে বাক্কার বলেছেন, 'উহুদের যুদ্ধে সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশের তরবারি ভেঙে গিয়েছিল।' কিন্তু তিনি তাঁর সনদ উল্লেখ করেননি।
তিন.
ইবনে ইসহাক তাঁর উল্লেখিত গাজওয়ায়ে উহুদের হাদিসের শেষের দিকে বলেন, যুদ্ধের পর কুরাইশ বাহিনী যখন মক্কার দিকে যাত্রা করল, তখন আবু সুফিয়ান ইবনে হারব নবীজিকে উদ্দেশ করে উচ্চস্বরে বলল, 'আগামী বছর তোমাদের সঙ্গে বদর প্রান্তরে আবার দেখা হবে।' নবীজি তার এ কথা শুনে এক সাহাবিকে বললেন, 'তুমি বলে দাও, হ্যাঁ, নির্দিষ্ট সময়েই তাদের সঙ্গে আমাদের আবারও দেখা হবে।' ইবনে ইসহাক এটি সনদ ছাড়া বর্ণনা করেছেন। শাইখ আলবানি বলেন, 'ইবনে ইসহাক ছাড়া অন্য কারও সূত্রে আমি এ বর্ণনা পাইনি।' তবে ওয়াকিদি এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তিনি সকল হাদিসবিশারদের মতে প্রত্যাখ্যানযোগ্য।
টিকাঃ
* সুরা আলে ইমরান: ১৭২
📄 হিজরতের চতুর্থ বছর
ইমাম জাহবি বলেন, জুহরির সূত্রে মা'মার মিকসাম থেকে বর্ণনা করেন, 'উহুদের যুদ্ধে যখন নবীজির সামনের নিচের ডান ও বাম পাশের দুটি দাঁত ভেঙে যায়, তখন তিনি উতবা ইবনে আবু ওয়াক্কাসকে এই বলে বদ-দোয়া দেন, “হে আল্লাহ! বছর পুরো হওয়ার আগেই উতবা যেন কাফের হয়ে মরে যায়।” পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, বছর অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই উতবা কাফের হয়েই মৃত্যুবরণ করে।
'অতঃপর ইমাম জাহবি বলেন, এ ঘটনা মুরসাল সনদে বর্ণিত হয়েছে।' হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি বলেন, 'আবদুর রাজ্জাক তাঁর তাফসির গ্রন্থে বিচ্ছিন্ন সনদে এ ঘটনা উল্লেখ করেছেন।'
এদিকে ইমাম বুখারি সাহাবি আবু হুরায়রা ও ইবনে আব্বাসের সূত্রে বর্ণনা করেন, নবীজি বলেছিলেন, 'এই জাতির ওপর আল্লাহ তায়ালার ভয়ানক আজাব ধেয়ে আসছে।' এর দ্বারা নবীজি তাঁর সামনের নিচের দুটি দাঁত ভেঙে যাওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করেছিলেন।
ইবনে আব্বাসের অপর সূত্রে রয়েছে, নবীজি বলেন, 'এই জাতির ওপর আল্লাহ তায়ালার ভয়ানক আজাব ধেয়ে আসছে, যারা তাদের নবীর চেহারাকে রক্তাক্ত করেছে।'
আনাস ইবনে মালিকের সূত্রে আছে, উহুদের যুদ্ধে মারাত্মক আহত হওয়ার পর নবীজি বলেছিলেন, 'ওই জাতি কীভাবে সফল হবে, যারা তাদের নবীকে আহত করেছে!' এরই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা এই আয়াত অবতীর্ণ করেন:
لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ أَوْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ أَوْ يُعَذِّبَهُمْ فَإِنَّهُمْ ظَالِمُونَ
'হয়তো আল্লাহ তাদের ক্ষমা করবেন কিংবা তাদেরকে শাস্তি দেবেন। এ ব্যাপারে আপনার কিছুই করার নেই। কারণ তারা জালেম।"*
ইবনে উমরের অপর বর্ণনায় আছে, নবীজি উহুদে আহত হওয়ার পর সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া, সুহাইল ইবনে উমর এবং হারিস ইবনে হিশামের বিরুদ্ধে বদ-দোয়া করতেন। এ কারণে আল্লাহ তায়ালা ওই আয়াত অবতীর্ণ করেন।
টিকাঃ
* সুরা আলে ইমরান: ১২৮
📄 হিজরতের পঞ্চম বছর
ইবনে হিশাম বলেন, 'রুবাইহ ইবনে আবদুর রহমান তাঁর পিতার সূত্রে সাহাবি আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, উহুদের যুদ্ধ চলাকালীন উতবা ইবনে আবু ওয়াক্কাস নবীজির দিকে তির ছুড়ে মারে। এতে নবীজির সামনের নিচের ডান দাঁত ভেঙে যায় এবং নিচের ঠোঁট ফেঁড়ে যায়। এরপর আবদুল্লাহ ইবনে শিহাব জুহরি নবীজির কপালে প্রচণ্ড আঘাত করে। আর ইবনে কুমাইয়া তাঁর গণ্ডদেশে বর্শা দিয়ে আঘাত করে। এতে নবীজির শিরস্ত্রাণের দুটি কড়া তাঁর মাথার দুই পাশে বিদ্ধ হয়। আকস্মিক আক্রমণের ভার সইতে না পেরে নবীজি একটি গর্তে পড়ে যান। আবু আমের নামক জনৈক কাফের এই গর্ত খুঁড়ে রেখেছিল; যাতে মুসলিমরা তাতে পড়ে যান। অথচ এ গর্তের ব্যাপারে তাঁদের কারও জানা ছিল না।
'তখনই সাহাবি আলি এগিয়ে এসে নবীজির হাত ধরে ফেলেন এবং তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রা.) তাঁকে গর্ত থেকে উঠিয়ে দাঁড় করান। অপর সাহাবি মালিক ইবনে সিনান (রা.) নবীজির রক্তাক্ত দেহ মুবারক থেকে গড়িয়ে পড়া রক্ত মুখে টেনে গিলে ফেলছিলেন। মালিক ইবনে সিনানের রক্তপান দেখে নবীজি বললেন, "যার দেহে আমার রক্ত প্রবেশ করেছে, সে কখনো জাহান্নামে প্রবেশ করবে না।"'
ইমাম আহমদ রুবাইহ ইবনে আবদুর রহমান সম্পর্কে বলেন, 'সে আমাদের কাছে অপরিচিত।' আবু জুর'আহ বলেন, 'তিনি একজন শাইখ।' ইবনে আদি তাঁর প্রসঙ্গে বলেন, 'আশা করি, এতে কোনো সমস্যা হবে না।' ইবনে হিব্বান তাঁকে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের তালিকাভুক্ত করেছেন। তবে ইমাম তিরমিজি ইমাম বুখারি এর সূত্রে বলেন, 'রুবাইহ হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যানযোগ্য।'
ইবনে হিশাম রুবাইহ ইবনে আবদুর রহমান থেকে সরাসরি শোনেননি। ইমাম জাহবি তাঁর মাগাজি গ্রন্থে এ হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, 'ইবনে ইসহাক সাহাবি আবু সাইদ খুদরির সূত্রে বর্ণনা করেন, উতবা নবীজির সামনের নিচের ডান দাঁত ভেঙে দিয়েছিল।' অতঃপর তিনি অবশিষ্ট ঘটনা উল্লেখ করেন এবং বলেন, 'এটি বিচ্ছিন্ন সনদে বর্ণিত হয়েছে।'
হাফেজ ইবনে হাজার ইসাবাহ গ্রন্থে বলেন, ইবনে আবু আসেম এবং বাগাবি মুসা ইবনে মুহাম্মদের সূত্রে বর্ণনা করেন, তাঁর মা উম্মে সা'আদ আবু সাঈদের কন্যার সূত্রে তাঁর পিতাকে বলতে শুনেছেন, 'উহুদের যুদ্ধে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রক্তাক্ত হয়ে পড়লে সাহাবি মালিক ইবনে সিনান এগিয়ে আসেন। এরপর নবীজির দেহ মুবারক থেকে রক্ত শুষে নিয়ে গিলতে থাকেন। তখন নবীজি বললেন, কেউ যদি এমন কাউকে দেখতে চায়, যার রক্তের সঙ্গে আমার রক্ত মিলে গেছে, সে যেন মালিক ইবনে সিনানকে দেখে।'
সাঈদ ইবনে মানসুর ইবনে ওয়াহাবের সূত্রে আমর ইবনে সায়েব থেকে এমনই বর্ণনা করেছেন।
ইবনে আবু হাতেম মুসা ইবনে মুহাম্মদ সম্পর্কে বলেন, 'আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি, মুসা হচ্ছেন মাদানি শাইখ। পরবর্তী সময়ে তিনি ইরাকের বাগদাদে গমন করেন এবং দারবুল আনসারে বসতি স্থাপন করেন। সা'আদ ইবনে মাসউদের মা এবং আবদুর রহমানের মা তথা আবু সাঈদের কন্যার ব্যাপারে আমি কিছু জানতে পারিনি।' এরপর তিনি বলেন, 'আমি আমার পিতাকে এ রকমই বলতে শুনেছি।'
সাঈদ ইবনে মানসুরের বর্ণনায়ও মুরসাল হয়েছে। তাঁর সূত্রে উল্লেখিত আমর ইবনে সায়েব সম্পর্কে হাফেজ ইবনে হাজার তাকরিব গ্রন্থে বলেন, 'আমর ইবনে সায়েব সত্যতার ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য। তিনি ষষ্ঠ স্তরের বর্ণনাকারী তাবেয়িদের অন্যতম। ১৩৪ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন।'
ষষ্ঠ পর্যায়ের বর্ণনাকারী বলতে কী বোঝায়, এ ব্যাপারে হাফেজ ইবনে হাজার ওই গ্রন্থের ভূমিকায় বিস্তারিত লিখেছেন। অর্থাৎ যাঁরা কোনো সাহাবির সাক্ষাৎ পাননি। তিনি তাঁর অপর গ্রন্থ তালখিসুল হাবির এর মধ্যে বলেন, 'আমর ইবনে সায়েবের সূত্রে বর্ণিত হাদিস মুরসাল।'
ইমাম হাকিম ওই ঘটনা আবদুর রহমানের মা তথা আবু সাঈদ খুদরির কন্যার সূত্রে তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন। তবে সনদের ব্যাপারে তিনি নীরব থেকেছেন। কিন্তু ইমাম জাহবি তাঁর এ সনদ সম্পর্কে বলেন, 'তাঁর সনদ অন্ধকারে আচ্ছন্ন।'
আল্লামা হাইসামি এ সনদকে ইমাম তাবারানির দিকে সংযুক্ত করেছেন। তবে এ ব্যাপারে কিছু বলেননি।
খন্দকের যুদ্ধের ব্যাপারে প্রচলিত ভিত্তিহীন কাহিনি
পরিখা খননের ব্যাপারে সাহাবি সালমান ফারেসির পরামর্শ
ইতিহাস ও সিরাতের গ্রন্থে প্রসিদ্ধ আছে, নবীজি যখন মদিনার দিকে কুরাইশ ও আরবের সম্মিলিত বাহিনীর আগমনের সংবাদ পান, তখন তিনি জরুরি পরামর্শের জন্য সাহাবিদের তলব করেন। তাঁদের মধ্যে সাহাবি সালমান ফারেসিও (রা.) ছিলেন। তিনি নিজের মত প্রকাশ করে বলেন, 'আমি পারস্যের অধিবাসী। পারস্যে আমি দেখেছি, শত্রু দ্বারা পরিবেষ্টিত হওয়ার আশঙ্কায় আমার জাতি নিজেদের বসতি অঞ্চলের চারদিকে পরিখা খনন করত। এতে শত্রু আমাদের এলাকায় প্রবেশের সুযোগ পেত না।'
নবীজির কাছে সালমান ফারেসির এ কৌশল খুব পছন্দ হলো। তিনি এ পরামর্শ গ্রহণ করে মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ প্রদান করেন।
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি তাঁর ফাতহুল বারি গ্রন্থে লেখেন, 'সিরাত গ্রন্থকারেরা খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের জন্য সালমানের পরামর্শ দেওয়ার যে কথা উল্লেখ করেছেন, তা সর্বপ্রথম যিনি বলেছেন, তিনি হলেন আবু মা'শার। আবু মা'শার পরিখা খননের জন্য সাহাবি সালমানের পরামর্শের কাহিনি উল্লেখ করেছেন।'
তবে তিনি এর সনদ সম্পর্কে কিছু বলেননি। আবু মা'শারের পুরো নাম নাজিহ ইবনে আবদুর রহমান সানাদি। ১৭১ হিজরিতে তিনি ইন্তেকাল করেন। ইমাম তিরমিজি, ইমাম আবু দাউদ, ইমাম নাসায়ি এবং ইমাম ইবনে মাজাহ প্রমুখ হাদিস গ্রন্থকারগণ আবু মা'শারের সূত্রে হাদিস বর্ণনা করেছেন। তবে অনেক মুহাদ্দিস তাঁকে দুর্বল বললেও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল তাঁর ব্যাপারে ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। তিনি বলতেন, 'আবু মা'শার নবীজির যুদ্ধ (মাগাজি) সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখেন।'
মূলত আবু মা'শারের দুর্বলতার ব্যাপারটি সনদের ত্রুটির জন্য দায়ী নয়; বরং দায়ী হলো তাঁর মুরসাল বর্ণনা। তিনি কোনো ধরনের সূত্র ছাড়াই ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন। তাই তাঁকে কেউ কেউ দুর্বল বলে আখ্যা দিয়েছেন।
এদিকে ইবনে ইসহাক খন্দকের যুদ্ধের ঘটনায় পরিখা খননের কথা বলেছেন ঠিকই; কিন্তু তিনি পরিখা খননের জন্য সালমান ফারেসির পরামর্শের কথা উল্লেখ করেননি। তিনি বর্ণনা করেন: 'নবীজি মদিনার দিকে কুরাইশ ও আরবের সম্মিলিত বাহিনীর অগ্রসর হওয়ার সংবাদ পেয়ে সাহাবিদের জরুরি পরামর্শ সভা ডাকেন। সবার কাছ থেকে মতামত নিয়ে অবশেষে নবীজি মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ প্রদান করেন। এরপর নবীজি অগণিত সাওয়াবের সুসংবাদ দিয়ে সাহাবিদের পরিখা খননে উদ্বুদ্ধ করেন।'
ইবনে হিশাম এ ঘটনা সনদ ছাড়া বর্ণনা করেছেন। তবে তিনি এভাবে বলেছেন, 'কারও কারও মতে নবীজিকে সালমান ফারেসি পরিখা খননের জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন।'
নবীজির মু'জিজার নিদর্শন প্রমাণিত নয়
ইবনে ইসহাক সাঈদ ইবনে মাইনার সূত্রে বর্ণনা করেন, সাহাবি নোমান ইবনে বাশিরের (রা.) বোন বিনতে বাশির (রা.) বলেন, 'আমাকে আমার মা আমরাহ বিনতে রাওয়াহা (রা.) ডাকলেন। এরপর তিনি আমার জামার মুঠির মধ্যে এক মুষ্টি খেজুর দিয়ে বললেন, “যাও! এগুলো তোমার পিতা ও মামা আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহাকে দিয়ে আসো। এগুলো তাদের জন্য দুপুরের খাবার।” তখন তারা খন্দকের যুদ্ধে ব্যস্ত ছিলেন।
'আমি খেজুরগুলো জামার মধ্যে ধরে খন্দকের প্রান্তরে রওনা হই। তখন দেখি, এক পাশে নবীজি দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, “কন্যা! জামার মুঠির মধ্যে কী এনেছ?” আমি উত্তর দিলাম, আমার পিতা ও মামার জন্য...। নবীজি বললেন, “এগুলো আমার হাতের মুঠোয় দাও।” আমি তখন খেজুরগুলো নবীজির হাতের মুঠোয় ঢেলে দিই। খেজুর এত অল্প পরিমাণ ছিল যে নবীজির হাতের মুঠোও খেজুর দ্বারা পুরো ভরেনি।
'তিনি একটি চাদর বিছিয়ে সেখানে খেজুরগুলো ছড়িয়ে রাখলেন। সঙ্গে সঙ্গে অনেক খেজুর দ্বারা চাদর ভরে গেল। এরপর নবীজি একজনকে নির্দেশ দিলেন, "পরিখা খননে ব্যস্ত সবাইকে জোরে ডাক দিয়ে বলো! তোমাদের জন্য খাবার উপস্থিত। চলে আসো।” নবীজির কথামতো একজন জোরে ঘোষণা দিয়ে সবাইকে খেজুরের চাদরের কাছে সমবেত করল। দীর্ঘক্ষণ মাটি খনন ও না খেয়ে থাকা ক্লান্ত সাহাবিগণ খেজুর খেতে শুরু করলেন। সবাই তৃপ্তিভরে খেলেন; কিন্তু এর পরও যেন খেজুর শেষ হচ্ছিল না।' বিনতে বাশির বলেন, 'সবার খাওয়া শেষে আমি দেখতে পাচ্ছিলাম, খেজুর চাদর থেকে বাইরে পড়ে যাচ্ছে।'
ইবনে কাসির তাঁর বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে বলেন, 'ইবনে ইসহাক এভাবেই ওই ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তাঁর সনদে বিচ্ছিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। ইমাম বায়হাকিও ইবনে ইসহাকের সূত্রে হুবহু উল্লেখ করেছেন। অতিরিক্ত কিছু বলেননি।'
ইমাম বুখারি তাঁর সহিহ বুখারি গ্রন্থে সাহাবি জাবের ইবনে আবদুল্লাহর সূত্রে পরিখার যুদ্ধের কাহিনি এভাবে বর্ণনা করেন, জাবের বলেন, 'আমরা খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খনন করছিলাম। হঠাৎ এক জায়গায় শক্ত অমসৃণ পাথর মাটির নিচে প্রকাশ পায়। আমরা অনেক চেষ্টা করেও তা ভাঙতে সক্ষম হইনি। পরে আমরা নবীজির কাছে এসে এ ব্যাপারে জানালে তিনি বললেন, "আচ্ছা! আমি নিচে নামব। দেখি, কী করা যায়।” এরপর নবীজি নিচে নেমে ওই শক্ত পাথরে আঘাত করলেন। নবীজি যখন নিচে নামছিলেন, তখন আমরা দেখি, তাঁর পেটে পাথর বাঁধা। এদিকে আমরা তিন দিন যাবৎ অনাহারে ছিলাম।
'নবীজির হাতের আঘাতে পাথরটি ভেঙে টুকরো হয়ে বালুকারাশিতে পরিণত হয়। অতঃপর আমি নবীজির কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে বাড়িতে আসি। স্ত্রীকে বলি, আজ নবীজিকে এমন অবস্থায় দেখেছি, যা সহ্য করার মতো নয়। ঘরে কি কোনো খাবার আছে? থাকলে প্রস্তুত করে দাও।' উত্তরে আমার স্ত্রী বললেন, এখন ঘরে কিছু যব ও একটি ছাগলছানা আছে। আমি স্ত্রীকে যব পিষতে দিয়ে ছাগলছানা জবাই করতে যাই। ছাগলের গোশত চুলায় ডেগচিতে দিয়ে দ্রুত নবীজির কাছে চলে আসি। এ সময় আটা থেকে খামির হচ্ছিল এবং গোশতও প্রায় রান্না হয়ে আসছিল।
'আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমার ঘরে কিছু খাবার আছে। আপনি এক বা দুজনকে সঙ্গে নিয়ে চলুন। নবীজি জিজ্ঞেস করলেন, কী পরিমাণ খাবার আছে? আমি তাঁকে সব খুলে বললে তিনি বললেন, এ তো অনেক উত্তম। এরপর তিনি আমাকে বললেন, "তুমি তোমার স্ত্রীকে গিয়ে বলো! আমি না আসা পর্যন্ত যেন চুলা থেকে গোশতের ডেগচি ও রুটি না নামায়।”
'অতঃপর নবীজি পরিখা খননে অংশগ্রহণকারী সবাইকে বললেন, “তোমরা চলো! জাবের তোমাদেরকে খাওয়ার নিমন্ত্রণ জানিয়েছে।” মুহাজির ও আনসার সাহাবিগণ নবীজির সঙ্গে চলতে লাগলেন। এদিকে আমি বাড়িতে এসে স্ত্রীকে বললাম, “তোমার সর্বনাশ হোক (এখন কী অবস্থা হবে?)! নবীজি তো মুহাজির-আনসার ও তাঁদের অন্য সাথিদের নিয়ে আমাদের বাড়িতে চলে আসছেন।” স্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, “নবীজি কি আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করেছিলেন?” আমি বললাম, হ্যাঁ।
'এরপর নবীজি বাড়িতে এসে সবাইকে বললেন, “তোমরা জাবেরের বাড়িতে প্রবেশ করো; তবে ভিড় কোরো না।” এই বলে তিনি রুটি টুকরা করে এর ওপর গোশত দিয়ে সাহাবিদের মধ্যে বিতরণ করতে লাগলেন। রুটি- গোশত পরিবেশন করার সময় তিনি ডেগচি ও চুলা ঢেকে রাখছিলেন। এভাবে তিনি রুটি টুকরা করে হাতভরে সবার সামনে পরিবেশন করতে থাকেন। সবাই পেটভরে খাওয়ার পরও আরও কিছু খাবার রয়ে গেল। তখন নবীজি জাবেরের স্ত্রীকে বললেন, “এবার তুমি খাও এবং অন্যদের হাদিয়া দাও। কারণ লোকদের প্রচণ্ড ক্ষুধা পেয়েছে।”'
সহিহ বুখারি গ্রন্থে বর্ণিত উপরিউক্ত হাদিসে নবীজির মু'জিজা সরাসরি প্রমাণিত সাব্যস্ত হয়। তা ছাড়া নবীজির হাতের বদৌলতে খাবার ও পানীয় পরিমাণে বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি আরও অনেক সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। এ অবস্থায় দুর্বল সনদে এ জাতীয় বর্ণনার পেছনে পড়া কিংবা এসব বর্ণনা না থাকলেও কোনো সমস্যা নেই। ইমাম বুখারি তাঁর সহিহ বুখারি গ্রন্থের অন্য জায়গায় 'নবুওয়াতের নিদর্শন' শীর্ষক অধ্যায়ে এ জাতীয় আরও ঘটনা বর্ণনা করেছেন।
📄 গাযওয়ায়ে আহযাব (খন্দকের যুদ্ধ)
ইবনে হিশাম বলেন, আবদুল আজিজ দারাওয়ারদি উম্মুল মুমিনিন আয়েশার সূত্রে তাঁর পিতা আবু বকর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, নবীজির কপালে শিরস্ত্রাণের দুটি কড়া বিদ্ধ হয়ে যাওয়ার পর সাহাবি আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ (রা.) নিজের দাঁত দিয়ে টেনে একটি কড়া বের করেন। এতে তাঁর দাঁত ভেঙে যায়। এরপর অপর কড়াটিও আগের মতো দাঁত দিয়ে টেনে বের করেন। এতে তাঁর আরেকটি দাঁত ভেঙে যায়। এ কারণে তিনি দুটি দাঁত ভাঙা নামে পরিচিতি লাভ করেন।
শাইখ আলবানি বলেন, ইমাম তায়ালিসি এ ঘটনা ধারাবাহিক সনদে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, 'ইবনুল মুবারক ইসহাক থেকে এভাবেই বর্ণনা করেছেন।'
ইমাম হাকিমও এ ঘটনা ধারাবাহিক সনদে বর্ণনা করেন। কিন্তু তাঁর সনদে কিছুটা পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। তবে এ প্রসঙ্গে ইমাম জাহবি বলেন, 'ওই সনদে উল্লেখিত ইসহাক হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যানযোগ্য।' আল্লামা হাইসামিও এমনটি বলেছেন। কিন্তু তিনি এর বর্ণনাকে বাজ্জারের দিকে সংযুক্ত করেছেন।
ইবনে কাসির ইসহাক ইবনে আবদুল্লাহর পক্ষ থেকে এ হাদিসের ব্যাপারে আলি ইবনে মাদিনির দুর্বলতা বলে মন্তব্য করার কথা বর্ণনা করেছেন।
নবীজির কপালে শিরস্ত্রাণের কড়া বিদ্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা উল্লেখ করার পর ইমাম জাহবি বলেন, 'এর সনদে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে।' শাইখ সা'আদ হুমাইদও একে দুর্বল বলেছেন।
সহিহ বুখারি গ্রন্থে সাহাবি আনাস থেকে বর্ণিত আছে, নবীজি উহুদের যুদ্ধে মারাত্মক আহত হন। তখন তিনি দুঃখ করে বলেছিলেন, 'ওই জাতি কীভাবে সফল হবে, যারা তাদের নবীকেও আহত করে!' এই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন:
لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ أَوْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ أَوْ يُعَذِّبَهُمْ فَإِنَّهُمْ ظَالِمُونَ
'হয়তো আল্লাহ তাদের ক্ষমা করবেন কিংবা তাদেরকে শাস্তি দেবেন। এ ব্যাপারে আপনার কিছুই করার নেই। কারণ তারা জালেম।"*
অপর বর্ণনায় আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি বলেছিলেন, 'এই জাতির ওপর আল্লাহ তায়ালার ভয়ানক আজাব ধেয়ে আসছে।' এর দ্বারা নবীজি তাঁর সামনের নিচের দুটি দাঁত ভেঙে যাওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করেছিলেন। সহিহ মুসলিম গ্রন্থে আছে, শিরস্ত্রাণটি নবীজির মাথার ওপরই চূর্ণ করা হয়।
ইমাম নববি বলেন, 'এ ঘটনায় উম্মাহর জন্য অনেক শিক্ষা রয়েছে। হক প্রতিষ্ঠায় শুধু মানুষ নয়; বরং আল্লাহ তায়ালার নবীদের ওপরও নানা রকমের বিপদ-আপদ এসেছে। তাঁরাও আমাদের মতো আল্লাহ তায়ালার পথে দুঃখ-যন্ত্রণা ভোগ করেছেন, যাতে তাঁরা বিপুল প্রতিদানের অধিকারী হতে পারেন।'
কাজি ইয়াজ বলেন, 'যারা দাবি করে, আল্লাহ তায়ালার নবীগণ ভিন্ন জাতির আওতাভুক্ত; অর্থাৎ তাঁরা আমাদের মতো মানুষ নন, তাদের জন্য উপরিউক্ত ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। তাঁরা যদি আমাদের মতো মানুষ নাই-বা হতেন, তাহলে আমরা যেভাবে আক্রমণের শিকার হয়ে আহত হই এবং আমাদের দেহ থেকে রক্ত ঝরতে থাকে, নবীরা এভাবে রক্তাক্ত হতেন না। অথচ আমরা দেখতে পাচ্ছি, স্বয়ং শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও যুদ্ধে শত্রুদের তির-বর্শার আঘাতে জর্জরিত হয়েছেন। অন্যদের মতো তাঁর দেহ মুবারক থেকেও রক্তের বন্যা বইয়ে যায়।' এতে বোঝা গেল, তাঁরাও আমাদের মতো সৃষ্টি এবং তাঁরাও প্রতিপালিত হন। নবীদের কাছ থেকে যেসব অলৌকিক ঘটনা ঘটে, সেগুলোর দিকে তাকিয়ে এমন চিন্তাধারায় উপনীত হওয়া যাবে না যে তাঁরা মানুষ নন। ইবলিস মানুষকে এসব কুমন্ত্রণা দেয়, যেমনটা দিয়েছে খ্রিষ্টানদের।
টিকাঃ
* সুরা আলে ইমরান: ১২৮
সালমান আহলে বাইতের সদস্য
ঐতিহাসিক ইবনে সা'আদ, হাকিম ও আরও অন্যান্য সিরাত গ্রন্থকার কাসির ইবনে আবদুল্লাহর সূত্রে আমর ইবনে আওফের দাদা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের জন্য নবীজি কাজ ভাগ করে দিতে প্রতি ৪০ হাত জায়গা ১০ জন সাহাবির মধ্যে বণ্টন করে দিচ্ছিলেন। ইত্যবসরে সালমান ফারেসিকে দলে নিতে মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে কাড়াকাড়ি শুরু হয়। তখন নবীজি বললেন, 'সালমান আমার পরিবারভুক্ত।' যেহেতু সালমান মক্কারও ছিলেন না যে মুহাজির গণ্য হবেন, আবার মদিনারও ছিলেন না যে আনসার গণ্য হবেন। তাই নবীজির প্রিয় এই সাহাবিকে নিয়ে একপ্রকার কাড়াকাড়ি শুরু হয়ে যায়। তখন নবীজি কারও পক্ষে না গিয়ে নিজের পরিবারভুক্ত বলে সালমানকে বরণ করে নিলেন। তিনি পারস্যের অধিবাসী ছিলেন। তাই এমন হয়েছে।
ইমাম জাহবি তালখিস গ্রন্থে বলেন, 'এ বর্ণনার সনদ দুর্বল।' আল্লামা হাইসামি এর সূত্রকে ইমাম তাবারানির দিকে সম্পৃক্ত করে তাঁর মাজমাউজ জাওয়ায়েদ গ্রন্থে লিখেছেন, 'এ বর্ণনার সূত্রে যে কাসির ইবনে আবদুল্লাহর কথা উল্লিখিত হয়েছে, অধিকাংশ আলেম তাঁকে দুর্বল বলে আখ্যায়িত করেছেন। তবে ইমাম তিরমিজি কাছিরের সনদকে হাসান বলে অভিহিত করেছেন। অবশ্য এ সূত্রের অন্য বর্ণনাকারীরা নির্ভরযোগ্য।'
ইমাম জাহবি তাঁর সিয়ারু আলামিন নুবালা গ্রন্থে সালমানের জীবনীতে এ প্রসঙ্গ টেনে বলেন, 'কাসির ইবনে আবদুল্লাহ মারাত্মক পর্যায়ের দুর্বল।'
অতঃপর তিনি আ'মাশের সূত্রে আবুল বাখতারি থেকে বর্ণনা করেন, লোকেরা সাহাবি আলিকে নবীজির আহলে বাইতের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'আহলে বাইতের কার ব্যাপারে জানতে চাইছ?' তারা উত্তর দিল, 'সালমানের ব্যাপারে।' আলি বললেন, 'সালমান! তিনি তো পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সকলের জ্ঞান পেয়েছেন। তিনি এমন জ্ঞানসমুদ্র, যার তলদেশের নাগাল পাওয়া সম্ভব নয়। তিনি আমাদেরই পরিবারভুক্ত।' (আহলে বাইত)
শাইখ শু'আইব আরনাউত সিয়ার গ্রন্থের টীকায় বলেন, 'এ বর্ণনার সনদের সবাই নির্ভরযোগ্য। ফাসাবি তাঁর মা'রিফাহ ওয়াত তারিখ গ্রন্থে আরও দীর্ঘ পরিসরে এ বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। তাঁর সূত্রের বর্ণনাকারীরাও নির্ভরযোগ্য। ইমাম তাবারানি ও আবু নু'আইম তাঁর হিলইয়া গ্রন্থে এ ঘটনা উল্লেখ করেছেন।'
শাইখ আলবানি ওই ঘটনার মূল সূত্র আলির দিকে হওয়ার বিষয়টিকে সহিহ বলে সাব্যস্ত করেছেন।
হাসসান ইবনে ছাবিতের প্রতি ভীরুতার অপবাদ
ইবনে ইসহাক ইয়াহইয়া ইবনে আব্বাদের সূত্রে তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, সাফিয়া বিনতে আবদুল মুত্তালিব একবার হাসসান ইবনে ছাবিতের দুর্গে একটি উঁচু স্থানে অবস্থান করছিলেন। তিনি বলেন, 'আমরা নারী-শিশুরা দুর্গে অবস্থান করছিলাম। তখন হাসসান ইবনে সাবিতও আমাদের সঙ্গে সেখানে ছিলেন। বনু কুরাইজের সঙ্গে মুসলিমদের যুদ্ধ চলছিল। তারা নবীজির সঙ্গে কৃত চুক্তি ভঙ্গ করে।'
অতঃপর সাফিয়া আরও বলেন, 'আমি দেখলাম, এক ইহুদি দুর্গের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে। তাকে প্রতিহত করার মতো আমাদের মধ্যে কেউ ছিল না। ওদিকে নবীজি ও তাঁর সাহাবিগণ যুদ্ধে ব্যস্ত ছিলেন। যার কারণে আমাদের কাছে তাঁদের কারও ফিরে আসার সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছিল না। তখন আমি হাসসানের দিকে এগিয়ে যাই। তাঁকে বলি, হাসসান! এক ইহুদি কুমতলব নিয়ে এখানে ঘোরাফেরা করছে। এখানে আমাদের নারী ও শিশু ছাড়া অন্য কেউ নেই। তাকে আমার সুবিধাজনক বলে মনে হচ্ছে না। সে আমাদের এমন অবস্থা অপরাপর ইহুদিদের কাছে বলে দেবে। তুমি গিয়ে ওই ইহুদির পশ্চাদ্ধাবন করো এবং তাকে হত্যা করো।'
উত্তরে হাসসান অপারগতা প্রকাশ করে বললেন, 'হে সাফিয়া! আল্লাহ তোমায় ক্ষমা করুন। তুমি তো জানোই, এসব হত্যাকাণ্ড আমার পক্ষে সম্ভব নয়।' এরপর সাফিয়া বলেন, 'হাসসান অপারগতা জানানোর পর আমি এদিক-ওদিক দেখতে থাকি। হঠাৎ এক স্থানে একটি বড় খুঁটির মতো কিছু দেখতে পেয়ে গিয়ে তা তুলে নিই।
'সেটা নিয়ে আমি কেল্লার নিচে তাকে লক্ষ্য করে নেমে আসি এবং তার মাথায় সে খুঁটি দিয়ে সজোরে আঘাত করি। এতে ইহুদি লোকটি ঘটনাস্থলেই নিহত হয়।'
সাফিয়া বলেন, 'এরপর আমি দুর্গে ফিরে আসি। হাসসানকে ডেকে বলি, তুমি নিচে নেমে এর অস্ত্র ও অন্যান্য জিনিসপত্র নিয়ে নাও। আমি নারী হওয়ার কারণে তা করতে পারছি না।' কিন্তু হাসসান এতেও অস্বীকৃতি জানান। বলেন, 'আমার এর কোনো প্রয়োজন নেই।'
ওই ঘটনার বর্ণনাসূত্রে ইয়াহইয়া ও তাঁর পিতা আব্বাদ উভয়েই নির্ভরযোগ্য। তবে ইয়াহইয়ার পিতা তাবেয়ি হওয়ায় এ বর্ণনাটি মুরসাল পর্যায়ভুক্ত।
ইবনে সা'আদ এ ঘটনা সংক্ষেপে এবং হাকিম এটি হিশাম ইবনে উরওয়ার পিতার সূত্রে সাফিয়া থেকে বর্ণনা করেছেন। উরওয়া বলেন, 'আমি সাফিয়াকে বলতে শুনেছি।' হাকিম এ প্রসঙ্গে বলেন, 'এ ঘটনার সনদ ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহিহ; তবে তাঁরা এ ঘটনা উল্লেখ করেননি।'
এরপর ইমাম জাহবি ওই কথার বিরোধিতা করে বলেন, 'উরওয়া সাফিয়া বিনতে আবদুল মুত্তালিবের সাক্ষাৎ পাননি।' তবে হাকিম এ ঘটনাটি অন্য সনদে ইসহাক ইবনে ইবরাহিম ফারবি থেকে উম্মে ফারওয়া বিনতে জাফর ইবনে জুবায়েরের সূত্রে তাঁর দাদা জুবায়ের থেকে বর্ণনা করেছেন। জুবায়ের সরাসরি সাফিয়া থেকে এটি বর্ণনা করেছেন।
অতঃপর তিনি বলেন, 'এ ঘটনা আরও দীর্ঘ পরিসরে উল্লেখিত হয়েছে। ওই সনদটি দুর্লভ। তবে অবশ্যই তা সহিহ সনদে বর্ণিত হয়েছে।' ইমাম জাহবি তালখিস গ্রন্থে বলেন, 'এই সনদটি দুর্লভ হলেও সহিহ।' তবে আমি (মূল গ্রন্থকার) উম্মে ফারওয়ার জীবনী কোথাও পাইনি।
তবে ইমাম জাহবি তাঁর সিয়ারু আ'লামিন নুবালা গ্রন্থে উম্মে ফারওয়ার জীবনীতে তাঁর নাম 'উম্মে উরওয়াহ বিনতে জাফর' লিখেছেন।
শু'আইব আরনাউত বলেন, 'উম্মে ফারওয়া সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। তবে তাঁর পিতা জাফরের কথা ইবনে আবু হাতিম তাঁর জারহ ওয়া তা'দিল গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তবে ভালো-মন্দ কোনো মন্তব্য করেননি। অর্থাৎ, জরাহও করেননি, তাদিলও করেননি।
আল্লামা হাইসামি এ ঘটনা মাজমাউজ জাওয়ায়েদ গ্রন্থে উল্লেখ করার পর জুবায়ের থেকে বর্ণিত ঘটনা প্রসঙ্গে বলেন, 'ইমাম বাজ্জার ও আবু ইয়ালা এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তবে তাঁদের দুজনেরই সনদ দুর্বল।' অতঃপর তিনি উরওয়ার সূত্রে বর্ণিত ঘটনায় বলেন, 'এ ঘটনা ইমাম তাবারানি উল্লেখ করেছেন। তাঁর বর্ণনাসূত্রে উরওয়া পর্যন্ত সবাই সহিহ হাদিস বর্ণনাকারীদের অন্তর্ভুক্ত। তবে ওই ঘটনাটি মুরসাল ধারায় বর্ণিত।'
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি তাঁর ফাতহুল বারি গ্রন্থে এ ঘটনার সূত্র ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের সনদে আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর থেকে বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন, 'এর সনদ শক্তিশালী।' (মূল গ্রন্থকার বলছেন) তবে ইবনে হাজারের কথার পরিপ্রেক্ষিতে এর সম্ভাব্য স্থান অনুমান করে আমি মুসনাদে আহমাদ গ্রন্থের যে বিন্যাস ইমাম সাআতি করেছেন এবং যেটার নাম হলো আল ফাতহুর রব্বানি, সেখানে খুঁজে পাইনি। ওই কিতাবের খন্দক এবং গনিমতের এক-পঞ্চমাংশ আবশ্যক হওয়া সংক্রান্ত অধ্যায়ে আমি তালাশ করেছি।'
ইবনে আবদুল বার ইসতি'আব গ্রন্থে হাসসান ইবনে ছাবিতের জীবনীতে লিখেছেন, অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও সিরাত গ্রন্থকারের মতে হাসসান খুবই ভীরু প্রকৃতির লোক ছিলেন। তাঁরা ইবনে জুবায়েরের সূত্রে এ কথা বলেছেন।
ইবনে জুবায়েরের সূত্রে বর্ণনাকারীরা তাঁর ভীরুতার বেশ কিছু দৃষ্টান্তও উল্লেখ করেছেন। কিন্তু কথাগুলো খুব খারাপ শোনা যায় বলে সেগুলো আমি (ইবনে আবদুল বার) উল্লেখ করলাম না। যাঁরা তাঁর ব্যাপারে উল্লেখ করেছেন, তাঁদের কেউ কেউ বলেন, 'হাসসান অতিরিক্ত ভীরু হওয়ায় নবীজির সঙ্গে কোনো অভিযানে অংশগ্রহণ করেননি।'
এসব কথার পরিপ্রেক্ষিতে আলেমগণ বলেন, যদি আসলেই হাসসান ভীরু হতেন, তাহলে ব্যাপকভাবে তাঁর নিন্দা এবং কুৎসা রটানো হতো। কারণ, তিনি নিজে কাফের, মুশরিক ও ইহুদি সম্প্রদায়ের ভীরুতা এবং অপরাপর অমুসলিম কবিদের বিরুদ্ধে নিন্দা কবিতার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলে প্রবল নিন্দা করতেন। অথচ তাঁদের পক্ষ থেকে হাসসানের ব্যাপারে এ জাতীয় কোনো নিন্দাবাদ করা হয়নি। সুতরাং তিনি যদি এমন ভীরু প্রকৃতির হতেন, তাহলে তাঁরও এমন কুৎসা রটানো হতো।
ইমাম সুহাইলি তাঁর রওজুল উনুফ গ্রন্থে বলেন, উপরিউক্ত ঘটনায় হাসসান ইবনে ছাবিতের ভীরুতার প্রসঙ্গ হচ্ছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। অর্থাৎ তিনি কি মূলত ভীরু প্রকৃতির ছিলেন? অনেক আলেম তা প্রত্যাখ্যান করে একে হাসসানের প্রতি ঠাট্টা-বিদ্রূপ বলে অভিহিত করেছেন। কারণ এ ঘটনার বর্ণনাসূত্রে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে।
যদিও-বা এ বর্ণনা পুরোপুরি সঠিক হয়, তাহলে মনে রাখুন, এটি তাঁর প্রতি বিধর্মী কবিদের বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য। কারণ হাসসান ইবনে সাবিত নিজেই দারার, ইবনে জাব'আরি ও আরও অনেক অবিশ্বাসী কবি-সাহিত্যিককে বিদ্রূপ করতেন। তাদের অশ্লীল রচনা ও ইসলামের বিরুদ্ধে করা কটূক্তির কড়া উত্তর তিনি প্রদান করতেন। তাই তারা ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে এমন অপবাদ আরোপ করে। অথচ কটাক্ষ করলেও এসব জাহেলি কবির কেউই তাঁকে এর পরও ভীরু বলে অপবাদ দেয়নি। আর এটিই ইবনে ইসহাকের বর্ণনাসূত্রের দুর্বলতার সপক্ষে প্রমাণ।
এমন হওয়াও অসম্ভব কিছু নয় যে, ওইদিন দুর্গে হাসসান ইবনে সাবিত নিশ্চয় কোনো কারণে অপারগ ছিলেন, যার ফলে তিনি নবীজির সঙ্গে অভিযানে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। বর্ণনার এমন ব্যাখ্যাই অধিক যুক্তিসংগত। আর যাঁরা এমন বর্ণনাগুলোকে সহিহ মানতে চান না, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন আবু আমর ইবনে আবদুল বার। তিনি তাঁর দুরার নামক কিতাবে বিষয়টি মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
এ ছাড়া আরও একাধিক কারণে নবীজির বরেণ্য এ সাহাবির ব্যাপারে এ জাতীয় অপবাদ কখনো সঠিক হতে পারে না। সার্বিক বিবেচনায় উপরিউক্ত বর্ণনার সনদ ও মূলপাঠ কোনোটিই সঠিক নয়। আর তা হচ্ছে:
এক. ওই ঘটনা ধারাবাহিক ও সহিহ সনদে বর্ণিত হয়নি; বরং এর মধ্যে বিচ্ছিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। যেমন আগে এ সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুই. মূলত হাসসান ইবনে সাবিত কাব্যছন্দে বিধর্মী ও অবিশ্বাসী ইসলামের বিরুদ্ধে কবি-সাহিত্যিকদের কটূক্তির প্রতিবাদ করতেন। তাই তারা ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁকে ভীরু বলে অপবাদ দেয়। তাই তাঁর ভীরুতার ব্যাপার যদি আসলেই সত্য হতো, তাহলে এসব কাফের মুশরিক কবিরা ব্যাপকভাবে তাঁর নিন্দা ছড়াত। অথচ তারাও এমন কোনো কুৎসা রটায়নি। এ ব্যাপারে হাদিসশাস্ত্রের বিখ্যাত দুই জ্ঞানতাপস ইবনে আবদুল বার এবং সুহাইলির আলোচনা আগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তিন. ইসলামে সংঘটিত মুখোমুখি কোনো সংগ্রামেই হাসসান ইবনে ছাবিতের পিছু হটার কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। বদর, উহুদ, খন্দক ও হুনাইনের মতো রক্তক্ষয়ী সব যুদ্ধেই তিনি নবীজির সঙ্গে অংশগ্রহণ করেন।
চার. খন্দকের অভিযানে মদিনা শহরের চারপাশে পরিখা খননের কারণে সেখানে বিধর্মী বাহিনীর সঙ্গে মুসলিমদের সরাসরি যুদ্ধ হয়নি। কুরাইশ ও আরবের সম্মিলিত বাহিনী ছিল পরিখার অপর পাশে এবং মুসলিমগণ ছিলেন মদিনার দিকে। উভয় পক্ষ থেকে শুধু তির নিক্ষেপ হয়েছে মাত্র। এতে মুসলিমদের পক্ষে সা'আদ ইবনে মু'আজ (রা.) আহত হয়েছিলেন। তাই এ যুদ্ধে কারও পক্ষেই পিছু হটার প্রশ্ন আসতে পারে না।
পাঁচ. এটি ছিল খন্দকের যুদ্ধের সময়ের ঘটনা। এ সময় সাহাবি হাসসান ইবনে ছাবিতের বয়স ৭১ মতান্তরে ৮৫ ছিল। অতএব, বার্ধক্যের এ বয়সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করাটাই স্বাভাবিক। কারণ তখন তা অপারগতা বলে গণ্য হবে। তাই তাঁর ব্যাপারে ভীরুতার যে অপবাদ দেওয়া হয়েছে, এর কোনো ভিত্তি নেই。
নু'আইম ইবনে মাসউদ গাতফানি কর্তৃক সম্মিলিত বাহিনীর সঙ্গে প্রতারণা
আরবের সম্মিলিত বাহিনী কর্তৃক মদিনায় আক্রমণের (খন্দকের যুদ্ধে) এ ঘটনায় আরেকটি প্রসিদ্ধ বর্ণনা পাওয়া যায়, যা ইবনে ইসহাক উল্লেখ করেছেন। তিনি বর্ণনা করেন, গাতফান গোত্রের নু'আইম ইবনে মাসউদ যুদ্ধ চলাকালেই নিজ পরিবারের কাউকে না জানিয়ে নবীজির কাছে ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণ করার পর তিনি নবীজির সঙ্গে খন্দকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এরপর তিনি নবীজিকে বললেন, 'ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি আমাকে যা ইচ্ছে আদেশ করুন। আমি তা পালন করতে প্রস্তুত।'
উত্তরে নবীজি বললেন, 'তুমি আমাদের মধ্যে একমাত্র ব্যক্তি, যে এই কাজটি করতে সক্ষম হবে। তুমি কুরাইশদের নেতৃত্বে সম্মিলিত বাহিনীর ভেতরে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে তাদের বিভ্রান্ত করে দাও। মনে রেখো, যুদ্ধের অর্থ হচ্ছে প্রতিপক্ষকে কূটকৌশলে আটকে ফেলা।'
নবীজির নির্দেশ পেয়ে নু'আইম ইবনে মাসউদ ইহুদি গোত্র বনু কুরাইজার কাছে যান। তিনি তাদের উদ্দেশে বলেন, 'কুরাইশ বাহিনী ও গাতফান গোত্র তোমাদের পরিত্যাগ করেছে। তারা তোমাদের সঙ্গে এ যুদ্ধে জড়াতে ইচ্ছুক নয়। তোমরা এক কাজ করো। কুরাইশদের যেসব লোক তোমাদের কাছে রয়েছে, তাদের বিনিময়ে তোমরা কুরাইশদের থেকে পণ আদায় করো। এতে তোমাদেরই লাভ হবে।' গাতফান গোত্রের সন্তান হওয়ায় কুরাইজার ইহুদিরা সহজেই নু'আইম ইবনে মাসউদের কথা বিশ্বাস করে ফেলে। তারা তাঁকে এ বলে উত্তর দেয়, 'তুমি আমাদের অনেক ভালো পরামর্শ দিলে।'
এরপর তিনি কুরাইশদের ছাউনিতে যান। তাদের উদ্দেশে বলেন, 'কুরাইজা গোত্রের ইহুদিরা মুহাম্মদের সঙ্গে যে শান্তিচুক্তি করেছিল, তা ভঙ্গ করার ফলে তারা খুবই লজ্জিত। তাই তারা এ যুদ্ধে মুসলিমদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।' নু'আইম কুরাইশ নেতাদের আরও বললেন, 'মুহাম্মদের সন্তুষ্টি আর ইঙ্গিত পেলে ইহুদিরা তোমাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গকে ধরে নিয়ে মুহাম্মদের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, যাতে সে তাদেরকে হত্যা করে। কাজেই তোমরা পণস্বরূপ তোমাদের কাউকে তাদের হাতে ছেড়ে দিয়ো না।'
অতঃপর নু'আইম কুরাইশদের মতো স্বীয় গোত্র গাতফানের লোকদেরও এভাবেই বনু কুরাইজার বিরুদ্ধে উসকে দেন। ফলে আরবের সম্মিলিত বাহিনীর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। তাদের জোটে ভাঙনের সম্ভাবনা দেখা দেয়।
ওই ঘটনা প্রসঙ্গে শাইখ আলবানি বলেন, ইবনে ইসহাক এ ঘটনা সনদ ছাড়া বর্ণনা করেছেন। তাঁর সূত্রে ইবনে হিশামও উল্লেখ করেছেন। তবে নবীজির উক্তি 'নিশ্চয় যুদ্ধ প্রতারণার অংশ' অবশ্যই সহিহ সনদে বর্ণিত হয়েছে, যা শাইখাইন (ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম) সাহাবি জাবের এবং আবু হুরায়রার সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
এ প্রসঙ্গে ড. আকরাম উমরি বলেন, ওই ঘটনা হাদিসের ধারাবাহিক বর্ণনায় পাওয়া না গেলেও সিরাতের গ্রন্থগুলোতে তা অনেক প্রসিদ্ধ।
অবশ্য আল্লাহ তায়ালা দুই শক্তির সাহায্যে আরবের সম্মিলিত বাহিনীর মধ্যে ফাটল ধরিয়ে দিয়েছিলেন, যা তিনি কোরআনের সুরা আহজাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন:
'হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্মরণ করো, যখন শত্রুবাহিনী তোমাদের নিকটবর্তী হয়েছিল। অতঃপর আমি তাদের বিরুদ্ধে ঝঞ্ঝাবায়ু এবং এমন সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেছিলাম, যাদেরকে তোমরা দেখতে না। তোমরা যা করো, আল্লাহ তা দেখেন।"*
ওই আয়াতে দুটি শক্তির কথা বলা হয়েছে। প্রথমটি প্রবল ঝঞ্ঝাবায়ু এবং দ্বিতীয়টি অদৃশ্য সৈন্যবাহিনী তথা ফেরেশতা। এ বাতাস প্রসঙ্গে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম সাহাবি আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন, নবীজি ইরশাদ করেছেন, 'আমি প্রবাহিত বাতাস দ্বারা সাহায্যপ্রাপ্ত হয়েছি। আর আদ জাতিকে পশ্চিমা লু হাওয়া দ্বারা ধ্বংস করা হয়েছে।'
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি ফাতহুল বারি গ্রন্থে লিখেছেন, ইমাম আহমদ সাহাবি আবু সাঈদের (রা.) সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'আমরা খন্দকের যুদ্ধে নবীজিকে বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমরা কি আল্লাহ তায়ালাকে কিছু বলতে পারি? পিপাসা ও ক্ষুধায় আমাদের প্রাণ যেন ওষ্ঠাগত হয়ে যাচ্ছে।' উত্তরে নবীজি বললেন, 'হ্যাঁ, অবশ্যই। কেন নয়?' এরপর তিনি দোয়া করলেন, 'হে আল্লাহ! আপনি আমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি গোপন রাখুন এবং আমাদের ভীতি-শঙ্কা দূর করে দিন।' নবীজির দোয়া শেষ হতেই আল্লাহ তায়ালা প্রবল বেগে বাতাস প্রেরণ করেন। তীব্র তুফানে বিধর্মী বাহিনীর ছাউনি লন্ডভন্ড হয়ে যায়। তারা এদিক-ওদিক বিক্ষিপ্ত হয়ে ছুটতে শুরু করে।
অতঃপর হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি বলেন, 'এখানে গ্রন্থকার কী উদ্দেশ্যে উপরিউক্ত হাদিস বর্ননা করেছেন, তা হাদিসের বাক্য দেখে সহজেই বোঝা যাচ্ছে। আল্লাহ তায়ালা প্রবল বাতাস ও তুফানের মাধ্যমে মুসলিম বাহিনীকে সাহায্য করেছিলেন।'
তবে হাফেজ ইবনে হাজার যে সূত্রে ওই হাদিস উল্লেখ করেছেন, তাতে রুবাইহ ইবনে আবদুর রহমান ইবনে আবু সাঈদ নামের একজন দুর্বল বর্ণনাকারী রয়েছেন।
শাইখ আলবানি এ ঘটনায় উল্লেখিত নবীজির দোয়াকে সহিহ বলে সাব্যস্ত করেছেন। ঘটনার ব্যাপারে সত্যায়ন করেননি।
এ ছাড়া কোরআনের আয়াতে যে অদৃশ্য সৈন্যবাহিনীর কথা বলা হয়েছে, তাফসিরকারদের ভাষায় তাঁরা ছিলেন ফেরেশতা। যাদের ব্যাপারে কোরআনের তিন জায়গায় আল্লাহ তায়ালা বলেছেন। এর মধ্যে সুরা তওবায় দুই জায়গার কথা বলেছেন। প্রথমটি হুনাইন যুদ্ধের সময় এবং দ্বিতীয়টি হিজরতের সময়। ইরশাদ হচ্ছে:
'তারপর আল্লাহ অবতারণা করলেন নিজের পক্ষ থেকে তাঁর রাসুল ও মুমিনদের প্রতি সান্ত্বনা এবং অবতীর্ণ করেন এমন সেনাবাহিনী, যাদের তোমরা দেখতে পাওনি। আর তিনি শাস্তি প্রদান করেন কাফেরদের এবং এটি হলো কাফেরদের কর্মফল।"*
আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীকে সাহায্য করেছিলেন মদিনায় হিজরতের সময়। যখন নবীজি (সা.) ও আবু বকর (রা.) ছাওর গুহায় আত্মগোপন করেন, তখন আল্লাহ তায়ালা তাঁদেরকে মাকড়সার জাল বিস্তৃত করার মাধ্যমে সাহায্য করেছিলেন। এ ব্যাপারে ইরশাদ হচ্ছে:
'যদি তোমরা তাকে (রাসুলকে) সাহায্য না করো, তবে মনে রেখো, আল্লাহ তাঁর সাহায্য করেছিলেন, যখন তাঁকে কাফেররা বহিষ্কার করেছিল। তিনি ছিলেন দুজনের একজন, যখন তাঁরা গুহার মধ্যে ছিলেন। তখন তিনি আপন সঙ্গীকে (আবু বকরকে) বললেন, বিষণ্ণ হয়ো না, আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।
'অতঃপর আল্লাহ তাঁর প্রতি স্বীয় সান্ত্বনা অবতীর্ণ করলেন এবং তাঁর সাহায্যে এমন বাহিনী পাঠালেন, যা তোমরা দেখোনি। বস্তুত আল্লাহ কাফেরদের মাথা নিচু করে দিলেন এবং আল্লাহর কথাই সদা সমুন্নত এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।"*
আরেকবার ফেরেশতাগণ মুসলিম বাহিনীর পক্ষে লড়েছিলেন খন্দকের যুদ্ধে। যার বর্ণনা আল্লাহ তায়ালা সুরা আহজাবে ইরশাদ করেছেন। এ প্রসঙ্গে আগেই বলা হয়েছে।
সর্বমোট এই তিন জায়গায় অদৃশ্য বাহিনীর ব্যাখ্যায় ফেরেশতাদের কথা বলা হয়েছে।
ইমাম বায়হাকি তাঁর দালায়েলুন নুবুওয়াহ গ্রন্থে এ ঘটনা আহমাদ ইবনে আবদুল জাব্বারের সূত্রে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি আহমাদ ইবনে আবদুল জাব্বার সম্পর্কে বলেন, 'আহমাদ দুর্বল বলে বিবেচিত। তবে তাঁর সূত্রে বর্ণিত সিরাতের ঘটনা সহিহ।'
ইবনে কাসির এ ঘটনা ইমাম বায়হাকির সূত্রে সামান্য পরিবর্তন সাপেক্ষে বর্ণনা করেছেন। এসব বর্ণনার আলোকে বোঝা যায়, আল্লাহ তায়ালা সাহায্য করার পর নবীজি আরব ও কুরাইশদের সম্মিলিত বাহিনীর মধ্যে গুজব ছড়িয়ে তাদের বিভ্রান্ত করে দেন। যার ফলে তাদের জোটে ভাঙন দেখা দিয়েছিল। আর নু'আইম ছিলেন শুধু নবীজির পক্ষ থেকে বার্তাবাহক মাত্র。
টিকাঃ
* সুরা আহজাব : ৯
* সুরা তওবা: ২৬
*সুরা তওবা: ৪০