📄 হিজরতের প্রথম বছর
নবীজির মদিনায় হিজরতের সময় মদিনাবাসী তাঁকে অভ্যর্থনা জানিয়ে একটি গান গাইতে থাকে। যার প্রথম লাইন হচ্ছে, তালা'আল বাদরু আলাইনা; অর্থাৎ আমাদের ওপর উদিত হলো পূর্ণিমার চাঁদ।
ইমাম বায়হাকি দালায়েল গ্রন্থে নিজ সনদে ইবনে আয়েশার সূত্রে বর্ণনা করেন, নবীজি (সা.) ও আবু বকর (রা.) যখন মদিনায় প্রবেশ করছিলেন, তখন মদিনার নারী ও শিশুরা একসাথে গাইতে লাগল :
طلع البدر علينا من ثنية الوداع
وجب الشكر علينا - ما دعا لله داع
আমাদের ওপর উদিত হলো পূর্ণিমার চাঁদ, ছানিয়াতুল ওয়াদার দিক থেকে।
আমাদের কর্তব্য এর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন, যত দিন আল্লাহকে ডাকার মতো কেউ থাকবে (তত দিন পর্যন্ত তাঁর শুকরিয়া আদায় করব আমরা)
দালায়েল গ্রন্থের অন্য জায়গায় তিনি আরও বর্ণনা করেন, 'নবীজি তাবুক যুদ্ধ থেকে ফেরার পর মদিনার উপকণ্ঠে নগরবাসী তাঁকে বিপুল সংবর্ধনা জানায়। তখন তারা এ গান গেয়েছিল। অতঃপর তিনি বলেন, 'আমাদের বিজ্ঞ মনীষীগণ বলেন, এ গান মদিনার লোকেরা নবীজির হিজরতের সময় যখন তিনি মক্কায় প্রবেশ করছিলেন, তখন গেয়েছিল। তাবুক যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে ছানিয়াতুল ওদার দিকে নয়। আল্লাহ তায়ালা ভালো জানেন।'
তবে হাফেজ ইরাকি এ বর্ণনার সূত্রের ওপর আপত্তি করে বলেন, 'এ সূত্রে উল্লেখিত উবাইদুল্লাহ ইবনে আয়েশা ইমাম আহমদের শাইখদের অন্যতম। তিনি ২২৮ হিজরিতে ইন্তেকাল করেছেন। অতএব, তাঁর ও এই ঘটনার মধ্যে সময়ের বিস্তর ব্যবধান।'
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি ফাতহুল বারি গ্রন্থে বলেন, আবু সাঈদ এ ঘটনা শারফুল মুসতাফায় এবং আমরা ফাওয়ায়েদে খিলায়ির মধ্যে উবাইদুল্লাহ ইবনে আয়েশার সূত্রে বিচ্ছিন্ন সনদে বর্ণনা করেছি। নবীজি মদিনায় প্রবেশ করার সময় সেখানকার শিশুরা এ গান গেয়ে আনন্দে মেতে ওঠে:
طلع البدر علينا من ثنية الوداع
وجب الشكر علينا - ما دعا الله داع
আমাদের ওপর উদিত হলো পূর্ণিমার চাঁদ, ছানিয়াতুল ওয়াদার দিক থেকে।
আমাদের কর্তব্য এর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন, যত দিন আল্লাহকে ডাকার মতো কেউ থাকবে (তত দিন পর্যন্ত তাঁর শুকরিয়া আদায় করব আমরা)
এ বর্ণনার সূত্রে সমস্যা রয়েছে। সম্ভবত নবীজি তাবুক থেকে ফেরার পথে এ ঘটনা ঘটেছিল।
ইমাম বুখারি তাঁর সহিহ বুখারি গ্রন্থে জুহরির সূত্রে সায়েব ইবনে ইয়াজিদ থেকে বর্ণনা করেন, 'তিনি বলেন, আমার মনে আছে, আমি মদিনার অন্যান্য শিশুর সঙ্গে নগরীর রাস্তায় নবীজিকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য ছানিয়াতুল ওদার দিকে গিয়েছিলাম। যখন তিনি তাবুক থেকে ফিরছিলেন।'
ইবনে হাজার আসকালানি আরও বলেন, 'দাউদি এ বিষয়টিকে অস্বীকার করে বলেন, ওই গানে যে ছানিয়াতুল ওয়াদার কথা বলা হয়েছে, সেটি মদিনা থেকে মক্কার দিকে অবস্থিত; তাবুকের দিকে নয়। তা ছাড়া পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তের মতো তাবুক নগরী মক্কার বিপরীত দিকে অবস্থিত।' ইবনুল কায়্যিমও তাঁকে অনুসরণ করেছেন।
এরপর তিনি আরও বলেন, 'তবে তাবুক নগরীর দিকে আরেকটি ছানিয়া রয়েছে। ছানিয়া বলা হয় এমন স্থানকে, যা সমতলভূমির চেয়ে কিছুটা উঁচু হয়।'
কারও মতে, পাহাড়ি রাস্তাকে ছানিয়া বলে। আমি বলি, 'হিজাজ থেকে কোনো পর্যটক সিরিয়ার দিকে রওনা হলে এই ছানিয়া যেদিকেই হোক, তা সামনে পড়া অসম্ভব কিছু নয়। কারণ সবার জানা আছে, ছানিয়ার দিক থেকে মক্কায় প্রবেশ করে মক্কার অপর প্রান্ত দিয়ে বের হয়ে পুনরায় যাত্রা করলে সেই ছানিয়া অতিক্রম করেই যেতে হয়। কারণ এ অবস্থায় যাত্রাপথ ছানিয়ার নিকটে এসে একই রাস্তায় এসে শেষ হয়।
'আর আমরা বিচ্ছিন্ন সনদে খিলাইয়্যাত গ্রন্থে বলছি, নবীজির মদিনায় আগমনের মুহূর্তে নারীরা এ গান গাইতে থাকে।' এখন কেউ বলছে, মক্কা থেকে মদিনায় আগমনের সময় এ গান গেয়েছে। আবার কারও মতে, তাবুক থেকে ফেরার পথে এ গান গাইছিল।
ছানিয়া মক্কার দিকে হওয়ার যে কথা ইবনুল কায়্যিম বলেছেন, ইবনে হাজার আসকালানিও তা নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ইবনুল কায়্যিমের এ কথা বাস্তবতার সম্পূর্ণ বিপরীত। কারণ তিনি বলেন, মূল ঘটনা হচ্ছে, নবীজি যখন মদিনার উপকণ্ঠে এসে পৌছালেন, তখন মদিনার অধিবাসী নারী ও শিশুরা রাস্তায় বেরিয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানায় এবং গাইতে থাকে :
طلع البدر علينا من ثنية الوداع
وجب الشكر علينا - ما دعا الله داع
আমাদের ওপর উদিত হলো পূর্ণিমার চাঁদ, ছানিয়াতুল ওয়াদার দিক থেকে।
আমাদের কর্তব্য এর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন, যত দিন আল্লাহকে ডাকার মতো কেউ থাকবে (তত দিন পর্যন্ত তাঁর শুকরিয়া আদায় করব আমরা)
কিন্তু এর পরই অনেক ঐতিহাসিক এ ক্ষেত্রে ভুল করে বসেন। তাঁদের মতে, এ ঘটনা নবীজির মক্কা থেকে মদিনায় আগমনের সময় ঘটেছিল। অথচ ছানিয়া মক্কা থেকে মদিনার পথে পড়ে না; কারণ এটি মক্কা থেকে মদিনার উল্টো দিকে সিরিয়ার পথে অবস্থিত। অর্থাৎ মক্কা থেকে উত্তরে মদিনা অবস্থিত এবং মদিনার আরও উত্তরে সিরিয়া। তাই মক্কা থেকে যে কেউ মদিনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে, তার যাত্রাপথে এই ছানিয়া পড়বে না। বরং যারা মদিনা থেকে সিরিয়ায় যাবে, তাদের এই ছানিয়া অতিক্রম করতে হবে।
ছানিয়াকে কেন এ নামে নামকরণ করা হলো এবং এটি যে তাবুকের দিকে যেতে সিরিয়ার পথে অবস্থিত, তার বিবরণ মুত'আ বিয়ে হারাম হওয়ার ঘটনায় এসেছে।
এ প্রসঙ্গে ইবনে হাজার আসকালানি বলেন, হাজেমি এ ব্যাপারে সাহাবি জাবেরের (রা.) হাদিসের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। জাবের বলেন, 'আমরা নবীজির সঙ্গে তাবুক যুদ্ধের উদ্দেশে যাত্রা করি। সিরিয়ার কাছাকাছি আকাবার প্রান্তরে পৌছার পর সেখানে যাত্রাবিরতি করি। তখন সেখানকার মেয়েরা আমাদের ছাউনির আশপাশে যাতায়াত করত। আমরা তাদের সঙ্গে রাত্রি যাপন করতাম। এরপর নবীজিকে এ বিষয়ে বললে তিনি রাগান্বিত হয়ে ভাষণ দেওয়ার জন্য দাঁড়ান। অতঃপর আল্লাহ তায়ালার প্রশংসা করে মুত'আ বিয়েকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এরপর আমরা সকলে যেসব মেয়ের সঙ্গে রাত্রি যাপন করেছিলাম, তাদের বিদায় দিই। সেই সূত্রে এই অঞ্চলের নাম ছানিয়াতুল ওয়াদা হয়ে যায়।'
তবে জাবেরের এই হাদিস সহিহ নয়। কারণ এর সূত্রে ইবাদ ইবনে কাসির রয়েছেন, যাঁকে প্রত্যাখ্যাত সাব্যস্ত করা হয়েছে।
শাইখ আলবানি বলেন, 'ওই হাদিস কোনোভাবেই সাব্যস্ত করা যায়নি।'
তা ছাড়া এ ঘটনা সহিহ না হওয়ার আরও কিছু কারণ রয়েছে। যেমন নবীজির মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত সম্পর্কিত সহিh বর্ণনাগুলোর কোথাও সামান্য ইঙ্গিতের সূত্রেও এ ঘটনার উল্লেখ নেই। শুধু এতটুকু বলা হয়েছে, নবীজির মদিনার কাছাকাছি পৌঁছার পর মদিনার অধিবাসীরা তাঁকে অভ্যর্থনা জানিয়ে এ অভিবাদন জানাতে থাকে।
ইমাম বুখারি তাঁর সহিহ বুখারি গ্রন্থে 'নবীজি এবং তাঁর সাহাবিদের মদিনায় হিজরত' শীর্ষক অধ্যায়ে সাহাবি আনাস ইবনে মালিকের (রা.) সূত্রে বর্ণনা করেন, 'মদিনায় কেউ ঘোষণা দিল, নবী এলেন, নবী এলেন। এই আউয়াজ শোনামাত্র সবাই রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল। তারা মক্কার দিকে দূরপথে লক্ষ করতে লাগল, কাউকে দেখা যায় কি না। এরপর সবাই বলতে থাকে, নবী এসে পড়ছেন।'
অপর সাহাবি বারা ইবনে আজিবের (রা.) সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, 'অতঃপর নবীজি মদিনায় আগমন করলেন। আমি ওইদিন মদিনাবাসীকে নবীজির আগমনে এত খুশি হতে দেখেছি, যেমনটি আগে কখনো ঘটেনি। এমনকি মদিনার নারীরাও আনন্দে বলতে লাগল, নবীজি আগমন করেছেন।'
অন্য বর্ণনায় রয়েছে, মদিনার পুরুষ-নারীরা বাড়িঘরের ছাদে উঠে নবীজিকে দেখার জন্য ভিড় করেছিল। দাস-দাসী ও সেবকেরা রাস্তায় বেরিয়ে চিৎকার করে ডাকতে শুরু করে : হে মুহাম্মদ! হে আল্লাহর রাসুল! হে মুহাম্মদ! হে আল্লাহর রাসুল!"
অপর এক বর্ণনায় সালেহি মাকরিজির সূত্রে বলেন, 'নবীজির বদর যুদ্ধ শেষে মদিনায় ফেরার পথে মদিনার লোকেরা এ গান গেয়েছিল।' উল্লেখ্য, এটি হচ্ছে এ ঘটনা সম্পর্কে তৃতীয় বর্ণনা। আর এ বর্ণনা সঠিক হওয়ার বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই।
তবে সিরাতে নবী সম্পর্কে ইবনে ইসহাকের জানাশোনা ও গুরুত্ব থাকার পরও তিনি তাঁর সিরাতের বর্ণনায় মদিনার প্রসিদ্ধ এ গানের ব্যাপারে কিছুই বলেননি।
টিকাঃ
* সহিহ মুসলিম: হা- ৭৫২২
📄 মুহাম্মদ ﷺ-এর কোবায় পৌঁছা
ইবনে ইসহাক আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকরের সূত্রে ছফিয়া বিনতে হুয়াই ইবনে আখতাব থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'নবীজি যখন মদিনায় গমন করে বনু আমর ইবনে আওফের পল্লি কুবায় যাত্রাবিরতি করলেন, তখন আমার পিতা হুয়াই ইবনে আখতাব ও চাচা আবু ইয়াসির ইবনে আখতাব সন্ধ্যায় একটু অন্ধকার হওয়ার পর তাঁর কাছে গেলেন। নবীজি যে ঘরে অবস্থান করছিলেন, তাঁর সামনে এসে কিছুটা দূর থেকে তাঁরা নবীজিকে পর্যবেক্ষণ করে চলে এলেন। তখন কেবল সূর্য অস্ত গেছে। দেখলাম, তাঁরা দুজন অবসাদগ্রস্ত অবস্থায় হেলতে-দুলতে বাড়ির দিকে ফিরে আসছেন। মনে হচ্ছিল, তাঁরা খুবই ক্লান্ত; অথচ তা নয়। আমি প্রতিদিনের মতো প্রফুল্লচিত্তে তাঁদের দিকে এগিয়ে যাই। তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করব, কী দেখে এলে? কিন্তু তাঁরা কেউই আমার দিকে ফিরে তাকালেন না। আবার তাঁদেরকে দুশ্চিন্তাগ্রস্তও দেখাচ্ছিল না।
'একপর্যায়ে আমি চাচা আবু ইয়াসিরকে বলতে শুনলাম। তিনি আমার পিতা হুয়াইকে জিজ্ঞেস করছেন, “তুমি কি এই ব্যক্তি সম্পর্কে বলছিলে?” উত্তরে আমার পিতা বললেন, “হ্যাঁ, আল্লাহর কসম! এই সেই ব্যক্তি।” চাচা জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি তাঁকে ভালো করে চেনো?” পিতা উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ, চিনি।” চাচা আবার জিজ্ঞেস করলেন, “তো এখন তাঁর ব্যাপারে কী ভাবছ?” পিতা উত্তরে বললেন, “আল্লাহর কসম! যতক্ষণ আমি বেঁচে আছি, তাঁর প্রতি শত্রুতা পোষণ করব।”'
হাফেজ ইরাকি বলেন, 'এই ঘটনার সনদ বিচ্ছিন্ন। কারণ আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর এবং ছফিয়ার মধ্যে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে। তাঁদের পরস্পরে সাক্ষাৎ হয়নি।'
তা ছাড়া ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই নবীজি ও ইসলামের প্রতি ইহুদি জাতির বিদ্বেষ, শত্রুতা ও হিংসা ইতিহাসে দিবালোকের মতো স্পষ্ট। সে ক্ষেত্রে এ রকম দুর্বল সনদের ঘটনা বিশ্লেষণের তেমন প্রয়োজন পড়ে না।
আল্লাহ তায়ালা নবীজির প্রতি ইহুদিদের শত্রুতার ব্যাপারে খোলাখুলি বলেছেন। তিনি ইরশাদ করেন:
وَدَّ كَثِيرٌ مِّنْ أَهْلِ الْكِتَابِ لَوْ يَرُدُّونَكُم مِّن بَعْدِ إِيمَانِكُمْ كُفَّارًا حَسَدًا مِّنْ عِندِ أَنفُسِهِم مِّن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمُ الْحَقُّ فَاعْفُوا وَاصْفَحُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
'আহলে কিতাবদের অনেকেই প্রতিহিংসাবশত চায় যে মুসলিম হওয়ার পর তোমাদেরকে কোনো রকমে কাফের বানিয়ে দেয়। তাদের কাছে সত্য প্রকাশিত হওয়ার পর (তারা এটা চায়)। যাক! তোমরা আল্লাহর নির্দেশ আসা পর্যন্ত তাদের ক্ষমা করো এবং উপেক্ষা করো। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।'
وَلَمَّا جَاءَهُمْ كِتَابٌ مِّنْ عِندِ اللَّهِ مُصَدِّقٌ لِمَا مَعَهُمْ وَكَانُوا مِن قَبْلُ يَسْتَفْتِحُونَ عَلَى الَّذِينَ كَفَرُوا فَلَمَّا جَاءَهُم مَّا عَرَفُوا كَفَرُوا بِهِ فَلَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الْكَافِرِينَ
'যখন তাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে কিতাব এসে পৌছাল, যা সে বিষয়ের সত্যায়ন করে, যা তাদের কাছে রয়েছে এবং তারা পূর্বে কাফেরদের ওপর বিজয় কামনা করত। অবশেষে যখন তাদের কাছে পৌঁছাল, যাকে তারা চিনে রেখেছিল, তখন তারা তা অস্বীকার করে বসল। অতএব, অস্বীকারকারীদের ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত।'
الَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ يَعْرِفُونَهُ كَمَا يَعْرِفُونَ أَبْنَاءَهُمْ وَإِنَّ فَرِيقًا مِّنْهُمْ لَيَكْتُمُونَ الْحَقَّ وَهُمْ يَعْلَمُونَ
'আমি যাদেরকে কিতাব দান করেছি, তারা তাকে চেনে, যেমন করে চেনে নিজেদের পুত্রদের। আর নিশ্চয় তাদের একটি সম্প্রদায় জেনেশুনে সত্যকে গোপন করে।"
ইমাম বুখারি তাঁর সহিহ বুখারি গ্রন্থে সাহাবি আবু হুরায়রার (রা.) সূত্রে বর্ণনা করেন, নবীজি ইরশাদ করেছেন, 'ইহুদিদের ১০ জন যদি আমার ওপর ইমান আনে, তাহলে সমগ্র ইহুদি জাতি আমার ওপর ইমান আনবে।'
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি বলেন, 'এখানে ১০ জন বলতে ইহুদিদের গণ্যমান্য ১০ নেতাকে নবীজি বুঝিয়েছেন। কারণ সাধারণ ইহুদিদের মধ্যে অনেকেই নবীজির প্রতি ইমান এনেছিল। যাদের সংখ্যা ১০ জনেরও বেশি।'
ইমাম তাবারানি সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে উমরের সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
একবার নবীজি সাফিয়্যাহর চোখের কাছে সবুজ দাগ দেখতে পেলেন। তখন জানতে চাইলেন, 'তোমার চোখে এই সবুজ দাগ কোথেকে এল?' সাফিয়্যাহ তখন বলা শুরু করলেন, 'একদিন আমি আমার প্রাক্তন স্বামীর কাছে বললাম, রাতে আমি স্বপ্ন দেখেছি, একটি চাঁদ একেবারে আমার কোলে এসে পড়ল। এটা বলতেই আমার স্বামী আমাকে প্রচণ্ড জোরে চপেটাঘাত করে এবং (টিটকারি করে) বলতে থাকে, তুমি কি ইয়াসরিবের অধিপতিকে কামনা করছ?' (অর্থাৎ, মুহাম্মদকে চাও সঙ্গী হিসেবে?) সাফিয়্যাহ বলেন, 'রাসুলাল্লাহর চেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি আমার কাছে অন্য কেউ ছিল না; কারণ সে আমার পিতা ও স্বামীকে হত্যা করেছে। পরবর্তী সময়ে নবীজি এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বারবার আমার কাছে অব্যাহতভাবে ওজর পেশ করেন, “দেখো সাফিয়্যাহ, তোমার পিতা সমগ্র আরবদেরকে আমার প্রতি খেপিয়ে তুলে জড়ো করছিল। এ ছাড়া সে এই করেছে, সেই করেছে।” নবীজির অব্যাহতভাবে এমন ওজর পেশ করার একপর্যায়ে আমার অন্তরে যে ঘৃণা ছিল, সেটা একেবারে মিলিয়ে যায়।'
তখন নবীজি তাঁকে বললেন, 'তোমার পিতা আরব জাতিকে আমার বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলেছে। ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। যার পরিণতিতে বাধ্য হয়ে এ ব্যবস্থা নিতে হয়েছে।'
আল্লামা হাইসামি মাজমাউজ জাওয়ায়েদ গ্রন্থে বলেন, 'ইমাম তাবারানির বর্ণনা সূত্রের সকলেই সহিh হাদিসের সনদের বর্ণনাকারী।' শাইখ আলবানি এ ঘটনা তাঁর সহিh হাদিসের তালিকায় উল্লেখ করেছেন।
টিকাঃ
* সুরা বাকারা: ১০৯, ৮৯, ১৪৬
📄 হিজরতের দ্বিতীয় বছর
সিরাতের গ্রন্থে প্রসিদ্ধ আছে, নজির গোত্রের ইহুদি সম্প্রদায় নবীজিকে হত্যার ষড়যন্ত্র করার কারণে তাদেরকে মদিনা থেকে বহিষ্কার করা হয়। বনু নজিরের ইহুদি আমর ইবনে উমাইয়া দামরি অপর গোত্র বনু আমরের দুজনকে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডের ক্ষতিপূরণ আদায়ের উদ্দেশ্যে নবীজি বনু নজিরের এলাকায় গমন করেন।
তখন নবীজি বনু নজিরের দুর্গের এক প্রাচীরের পাশে বসে ছিলেন। প্রাচীরের অপর পাশে কয়েকজন ইহুদি নবীজিকে উদ্দেশ করে উন্মাদের মতো বলছিল, 'হ্যাঁ, এবার মুহাম্মদ তোমাকে পেয়েছি। তুমি জানো না, কেন আমরা তোমাকে ডেকে এনেছি?' নবীজি তাদের কাছে রক্তপণের টাকা চাইলে তারা বলল, 'হ্যাঁ আবুল কাসেম, তুমি যেমনটা চাও তেমনটাই হবে। আমরা তোমাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করব।' এরপর তারা নবীজিকে হত্যা করার সলাপরামর্শ করতে থাকে। তাদের কেউ বলল, 'তোমাদের মধ্যে কে আছ, যে প্রাচীরের ওপর উঠে মুহাম্মদের ওপর পাথর ছুড়ে মারবে?' তখন আমর ইবনে জাহহাশ ইবনে কাব এগিয়ে এসে বলে, 'আমি পারব।' এরপর সে একটি বড় পাথর নিয়ে দেয়াল টপকে প্রাচীরের ওপর উঠে পড়ে। এদিকে আমর ইবনে জাহহাশের ঠিক নিচে নবীজি প্রাচীরের অপর পাশে অবস্থান করছিলেন। তখনই আল্লাহ তায়ালা ওহির মাধ্যমে নবীজিকে সব জানিয়ে দেন।
ইবনে ইসহাক এ ঘটনা ইবনে ইয়াজিদ রোমানের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তা ছাড়া তিনি তাঁর থেকে সরাসরি এ ঘটনা শোনার ব্যাপারে স্পষ্ট বলেছেন। প্রকৃতপক্ষে এই ঘটনা মুরসাল ধারায় বর্ণিত। শাইখ আলবানি একে দুর্বল বর্ণনার তালিকাভুক্ত করেছেন।
বনু নজিরকে মদিনা মুনাওয়ারা থেকে বহিষ্কারের প্রকৃত কারণ সহিh সনদে নিরবচ্ছিন্ন ধারায় বর্ণিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি বলেন, ইবনে মারদুইয়া এ সম্পর্কে আবদুল্লাহ ইবনে আবদুর রহমান ইবনে কাব ইবনে মালেকের সূত্রে নবীজির এক সাহাবি থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন:
'বদর যুদ্ধের পূর্বে কুরাইশরা আবদুল্লাহ ইবনে উবাইসহ অন্যান্য নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি এবং যারা মূর্তিপূজকদের হুমকি দিয়ে চিঠি লিখল যে, তারা কেন মুহম্মদকে আশ্রয় দিল। তাদের কাছ থেকে বারবার ওয়াদা নিল যে তারা সমগ্র আরবকে মুহাম্মদের বিরুদ্ধে রণপ্রস্তুতির জন্য উদ্বুদ্ধ করবে। চিঠি পেয়ে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এবং তার সঙ্গীরা মুসলিমদের সঙ্গে যুদ্ধ করার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করতে লাগল। ঠিক এমন মুহূর্তে নবীজি তাদের কাছে এসে সোজা বললেন, “কুরাইশদের মতো কেউ যাতে তোমাদের ধোঁকা না দেয়। কুরাইশরা চায় তোমরা নিজেদের মধ্যে যাতে সংকটের মুখোমুখি হও।” নবীজির এ কথা শুনে তারা বাস্তবতা বুঝতে পারে। এরপর তারা সেখানে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।
'বিধ্বস্ত মনে তারা বদর প্রান্তর ত্যাগ করে। কুরাইশদের প্রথম সারির একাধিক নেতাকে হারিয়ে যেন তারা বেসামাল হয়ে পড়ে। মক্কায় ফিরে শুরু হয় তাদের নয়া চক্রান্তের পালা। তারা মদিনার ইহুদি গোত্র বনু নজির বরাবর দ্বিতীয়বার চিঠি প্রেরণ করে। ওই চিঠিতে কুরাইশ সম্প্রদায়ের নেতারা তাদেরকে নবীজি ও মুসলিমদের সঙ্গে গাদ্দারি করার জন্য উসকে দেয়। তারা চিঠিতে লিখে পাঠায়, “তোমাদের রয়েছে বিশাল চক্র। আবার রয়েছে দুর্গ।” এরপর বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি দেখানো হয় সেই চিঠিতে। এবার বনু নজির গাদ্দারি করতে প্রস্তুত হয়ে যায়।
'এরপর বনু নজির তাদের এক প্রতিনিধিদলকে নবীজির দরবারে প্রেরণ করে। তারা তাঁকে নতুন প্রস্তাব দেয়, আপনি আপনার তিনজন সঙ্গী বাছাই করুন এবং আমরা আমাদের তিনজন বিজ্ঞ মনীষী বাছাই করব। এরপর তারা আপনার সঙ্গে দেখা করে যদি আপনার ধর্ম মেনে নেয়, আমরাও তা-ই করব। নবীজি তাদের প্রস্তাবে সায় দেন। এরপর তারা ফিরে যায়। বনু নজির দুর্গে পৌছে তারা তিনজনকে গোপনে খঞ্জর নিয়ে প্রেরণ করার পরিকল্পনা করতে থাকে। এদিকে বনু নজিরের এক ইহুদি নারীর আনসারি ভাই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন নবীজির সাহাবি। ওই নারী দ্রুত তার মুসলিম ভাইয়ের কাছে লোক মারফত নিজ গোত্র বনু নজিরের সব পরিকল্পনা ফাঁস করে দেয়। তখনই ওই সাহাবি বনু নজিরের কাছে পৌঁছার পূর্বেই নবীজির দরবারে গিয়ে সব জানান। সব শুনে নবীজি বুঝতে পারলেন, আসলে তারা কী করতে চাচ্ছে।
'নবীজি সেদিনই বনু নজিরের দুর্গের উদ্দেশে বাহিনী প্রেরণ করে তাদের সকলকে দুর্গ অবরোধ করে বন্দী করার নির্দেশ প্রদান করেন। অতঃপর তিনি ইহুদিদের অপর গোত্র বনু কুরাইজার দুর্গ অবরোধ করেন। তাদের সঙ্গে চুক্তি হলে সেখান থেকে সেনা হটিয়ে ফিরে আসেন বনু নজিরের কাছে। এরপর পুনরায় বনু নজিরের এলাকায় এসে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। অবশেষে একপর্যায়ে তারা মদিনা থেকে বহিষ্কার হতে বাধ্য হয়। লড়াই শেষে নবীজি বললেন, “উট বোঝাই করে যা ইচ্ছা নিয়ে যেতে পারো; কিন্তু সব ধরনের অস্ত্র ও যুদ্ধ সরঞ্জাম রেখে যেতে হবে।” এরপর তারা নিজেদের আসবাবপত্র ঘরবাড়ির দরজা পর্যন্ত বয়ে নিয়ে যায়। এরপর নিজ হাতে আবাসস্থলগুলো ধ্বংস করে দেয়। এভাবেই প্রথমবারের মতো ইহুদিদের বনু নজির গোত্র মদিনা থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার হয়। এরপর তারা সিরিয়ার দিকে চলে যায়।'
ইবনে হাজার আসকালানি আরও বলেন: 'আবদে ইবনে হুমাইদ তাঁর তাফসির গ্রন্থে আবদুর রাজ্জাকের সূত্রে এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। অতএব, তিনি এই ঘটনার কোনো সহিh সনদ নেই বলে যে মত দিয়েছেন, তা সঠিক নয়। তাই ইবনে ইসহাক বনু নজিরের ইহুদিদের মদিনা থেকে বহিষ্কার করে দেওয়ার যে কারণ বর্ণনা করেছেন, তার চেয়ে এই বর্ণনার সনদ বেশি শক্তিশালী। কিন্তু এর পরও অধিকাংশ সিরাত লেখক ইবনে ইসহাকের অনুকরণ করেছেন।'
ইমাম আবু দাউদও এমনই বর্ণনা করেছেন। শাইখ শু'আইব আরনাউত জামেউল উছুল গ্রন্থে তাঁর সনদকে সহিh সাব্যস্ত করেছেন।
📄 গাযওয়ায়ে বদর
ইবনে ইসহাক ইকরিমার সূত্রে সাহাবি ইবনে আব্বাস এবং ইয়াজিদ ইবনে রোমানের সূত্রে উরওয়া ইবনে জুবায়ের থেকে বর্ণনা করেন, তাঁরা বলেন, 'কুরাইশ নেতা আবদুল মুত্তালিবের কন্যা আতিকা দমদমের মক্কায় আগমনের তিন রাত আগে এক স্বপ্ন দেখেন। এতে তিনি খুবই ভয় পান। তখন তিনি নিজ ভাই আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের কাছে এ স্বপ্নের কথা উল্লেখ করে বলেন, ভাই! আমার খুব ভয় করছে।' এরপর ইবনে ইসহাক আরও লম্বা কাহিনি বর্ণনা করেছেন।
ইবনে ইসহাক ওই বর্ণনার সনদে নিজ শায়খের নাম উল্লেখ করেননি। তিনি এমন প্রায়ই করে থাকেন। এ প্রসঙ্গে ইমাম বায়হাকির কথা আগেও উল্লেখিত হয়েছে। তিনি বলতেন, 'ইবনে ইসহাক তাঁর শায়খের নাম উল্লেখ না করলে আমাদের মন খারাপ হয়ে যায়।'
ইমাম হাকিম ইবনে ইসহাকের সূত্রে এ ঘটনা বর্ণনা করার সময় ইবনে ইসহাকের শায়খের নাম উল্লেখ করেছেন। তিনি হচ্ছেন হুসাইন ইবনে উবাইদুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস। তবে ইমাম হাকিম তাঁর সম্পর্কে কিছুই বলেননি।
ইমাম জাহবি হুসাইন ইবনে আবদুল্লাহকে দুর্বল বলে চিহ্নিত করেছেন। আল্লামা হাইসামি দুটি সূত্রে এ বর্ণনার সনদকে ইমাম তাবারানির দিকে উল্লেখ করেছেন। প্রথম সূত্রে আবদুল আজিজ ইবনে ইমরান রয়েছেন, যাকে পরিত্যক্ত সাব্যস্ত করা হয়েছে এবং দ্বিতীয় সূত্রটি মুরসাল। কারণ এই সূত্রে ইবনে লাহিয়া রয়েছেন, যিনি দুর্বল বর্ণনাকারী বলে চিহ্নিত। তা ছাড়া তাঁর বর্ণিত হাদিস হাসান পর্যায়ের আওতাভুক্ত।